শামসুদ্দীন আবুল কালাম

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃশামসুদ্দীন আবুল কালাম। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

 

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

শামসুদ্দীন আবুল কালাম ১৯২৬ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ‘কাশবনের কন্যা’ (১৯৫৪) রচনা করে পঞ্চাশের দশকেই সুনাম অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু হয় কলকাতায়। মোহাম্মদী সওগাত পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে পদার্পণ। বিভাগ পরবর্তী পূর্ব বাঙলার সাহিত্য জীবনে তিনি সম্ভাবনাময় কথা শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটার অভিমানে ইটালীতে স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলীর মধ্যে ‘আলম নগরের উপকথা’, ‘কাশবনের কন্যা’, ‘সমুদ্রবাসর’ ইত্যাদি। সমুদ্র বাসর উপন্যাসটি উনিশ শতকের প্রথাগত অনুষঙ্গে সমুদ্রকূলবর্তী জনগোষ্ঠীর আঞ্চলিক সাদৃশ্যে ১৯৪৭-৪৮ সালে সৃজিত। সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী জনসাধারণের জীবন প্রবাহ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। তাদের রূপান্তরিত জীবনে বসবাসযোগ্য ভূমিতে দেখা যায় এই ধ্বংসপ্রলয় আবার নূতনের আবিষ্কার।

পৃথিবীর ইতিহাসের মতই ঔপন্যাসিক সমুদ্রবাসরের কাহিনী শিলালিপি, তাম্র, স্বর্ণ পাত্র, রাজ রাজাদের বহু কীর্তি প্রাচীনত্ব ধ্যান ধারণায় লিপিবদ্ধ করেছন। প্রকৃতির ভাঙা গড়ার সাথে মানুষের মনের অবস্থান সম্পর্কে ভাঙা গড়াকে বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে রূপায়িত করেছেন। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মঙ্গল, কল্যাণ-অকল্যাণ নিহিত থাকে, প্রকৃতির লীলা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছাসের মানদণ্ডে।

ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে জগৎজীবন স্রষ্টার রূপ যেমন বিভিন্ন কেউ সন্তুষ্ট আকারে কেউ মগ্ন নিরাকারে সেই একই ভাবে জীবজগৎকে লইয়া নিজ নিজ প্রয়োজন এবং ধ্যানানুসারে নানা রকম সংস্কার ও পার্বণ জন্মলাভ করিয়াছে কখনও গোপন উপাসনার মত কখনওবা আনন্দমুখর উৎসবে। খণ্ড খণ্ড সমতল অঞ্চলে তাহার একটা মূল রূপ না থাকিলেও নদীমাতৃক ভুবনে তাদের প্রকৃতি নির্ভর জীবন-যাপনকখন ও বিধি ব্যবস্থার আকর্ষণের দিকে খুব ঝুঁকিয়া পড়াকে অমঙ্গল স্বরূপ জ্ঞান করিয়াছে।

ঔপন্যাসিক সে সময়ের কাহিনীই বিধৃত করেছেন, যে সময়ে মানুষের বিচার্য বোধের অভাব ছিল অনেক বেশি। কেউ নীতিকথা বললেও তা গ্রহণযোগ্য হতো না। তেমনি অদম্য ইউসুফ সুজার এর একমাত্র পুত্র অভাবী জনমানুষের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী সুজাত আলী। সে বোধহীন যুগে ধীবর সমাজে

বালিকা কন্যাকে বাছায়া লইয়া তাহাকে কুমারীজ্ঞানে ভক্তিপূজা করিয়া ও একসিন রজঃস্বলা হইবা মাত্র

শাস্ত্র বা ধর্মের বিধানানুযায়ী সে উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে। কেউ ক্ষুধার যন্ত্রণায় স্ত্রী-পুত্র কন্যাকে এক তার বিনিময়ে জমিদার নায়েবের কাছে বিক্রি করে। কোন এলাকায় ঝি বা বৌ কে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ খুন হয়ে গেল তার বিচার কার্য থানা বা দরবার পর্যন্ত পৌঁছাত না।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

 

সুজাত আলী ও বাল্য সখী করিমনের জীবন চিত্রণের মধ্য দিয়ে এসেছে প্রকৃতির ও মানব মনের লীলা বৈচিত্র্য। অসংখ্য চরিত্র সময়ের বিবর্তনে ঘটনার সমাবেশ জীবনঘনিষ্ঠ প্রেম ব্যয়নে, অস্তিত্ব সংগ্রামে এই উপন্যাস সমৃদ্ধ। জোতদার, মাতব্বর তাদের কার্য সম্পাদনের জন্য জমি দখল, খুন, ইজারা দেয়া যুদ্ধ- ঝগড়া এসবের বল প্রয়োগেই সুজাত আলীর বাবা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সুজাত আলী সমস্ত অত্যাচার অন্যায় বিরোধী। সে বলে

এতো খুন জখম হইল কেবল যাগো আছে তাগো আরো দেবার জন্য নিজেগো জন্য হইলেও কথা ছিলো।

সে কৃষিকাজ বা চাষাবাদ করে জীবিকার্জন করতে চায়, তেমনি তার বাবা কৃষি কাজকে ছোট লোকের কাজ বলে মনে করত। সুজাত আলী সমুদ্রের চরে নিজের চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মনে হত

ইউসুফ সুজা কোথাও হইতে তাহাকে দেখিয়া ঠা ঠা করিয়া হাসিয়া সারা হইতেছে।

অথচ সুজাত আলি চরের কাজ নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। সে ক্ষীর সদৃশ মাটি দেখে ভাবে তাহাদেরও সম্পূর্ণ উচ্ছেন বা নির্মূল করিবার কার্যে ভবিষ্যতের কোনও কল্যাণ নিহিত নাই ।

সুজাত আলীর কাজের মাঝে, স্ত্রী সোনার চেয়ে বেশি মনে পড়ে করিমনকে। তার অনেক কাজ কর্ম শেখা করিমন থেকে। সে করিমনকে ভাবে অবসর অনবসর বা ব্যস্ততায়। পঙ্গু সিকুর স্ত্রী করিমনের জীবনাচার ও সুজাত আলীর জীবনাচার ভিন্ন ছিল। তারা কখনই স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মনের চাহিদা, ইচ্ছা, আবেগকে জানাতে পারেনি, খাওয়া দাওয়া দু’দণ্ড কথা বলা ছাড়া।

তাই দেখা যায় দীর্ঘ সময় পরিসরে জীবনে অনেকটা পথ অতিক্রমের পরে এক দিকে নতুন চরের আগমন অপর দিকে সুজাত আলীর বিশাল প্রকৃতির সাজানো বাগান সদৃশ চরে যখন প্রলয় আসে তাতে বেঁচে থাকে শুধু সুজাত ও করিমন অভিন্ন দু’জন মানুষ। কল্যাণ ও শুভের সান্নিধ্যে তারা নতুন চরে আবার বাসর গড়ে।

 

শামসুদ্দীন আবুল কালাম

 

‘দুইজনই পরস্পরকে বিড়বিড় করিয়া নানা কথা বলিবার চেষ্টা করিল বটে, কিন্তু একটা তীব্র আনন্দ উচ্ছ্বাসের মধ্যে সবই চাপা পড়িয়া যাইতে লাগিল। করিমনকে সেই ভাবে গাঢ় আলিঙ্গনে আড়াইয়া নিজের সঙ্গে একাত্ম করিবার কোনও সুযোগ কখনও হয় নাই, না পাইয়াছে করিমন তাহাকে এমন ঘনিষ্ঠে। জলকাদার মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খাইল দুইজনে। সুজাত আলী পাগলের মত হাসিতে হাসিতে করিমনের মুখ আর দেহের কানা সযন্তে ধুইয়া দিতে লাগিল ।

আজন্ম লালিত প্রেম করিমন ও সুজাত আলী জনমানব শূন্য সমুদ্রচরে সৃষ্টি করে চলল নতুন উপায়ে মুক্তি অন্বেষণ। এ উপন্যাসে ঘটনা, চরিত্র যদিও মূল ঘটনা থেকে অনেক সময়ই দূরবর্তী, কখনও বিচ্ছিন্ন, তারপরেও শামসুদ্দীন আবুল কালাম নৃতাত্ত্বিক আবেগ ও ভৌগলিক সীমা সংহতিকে শিল্প অভিপ্রায়ের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন । প্রকৃতির স্থানিক বৈশিষ্ট্য ও অনেকটা সাফল্যের সঙ্গ চিত্রিত হয়েছে।

মানুষের অস্তিত্ব রূপ, জীবন ও জীবিকার আদিম প্যাটার্ন বহিঃপৃথিবীর ব্যাপক ভাঙা গড়ার মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন অপরিবর্তনের স্বভাব লক্ষণকে ধারণ করে আছে নদী, সমুদ্র ও মৃত্তিকার পরিচর্যায় গড়ে ওঠা এ উপন্যাসের চরিত্র পাত্রদের জীবন তারই রোমান্টিক আখ্যান। ঔপন্যাসিকের ভাষায়

আঞ্চলিক সাদৃশ্য রক্ষার উদ্দেশ্যেই প্রাচীন গনারীতি ব্যবহৃত

ঔপন্যাসিক শামসুদ্দীন আবুল কালামের উপন্যাস মুক্তি পায় বিরুদ্ধ সময় সেনাতন্ত্রের শোষণযন্ত্রের সমাজ প্রতিবেশে। এই প্রতিকূল সময়ঘনিষ্ঠ উপন্যাসটি দেশ বিভাগকালীন সময়ে রচিত হলেও যুদ্ধোত্তর অসংলগ্ন পরিবেশের অনুষঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। মানুষের সেই আদিযুগ থেকে এখন পর্যন্ত ক্রম রূপান্ত র হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু ঔপন্যাসিকের ভাষায় এই রূপান্তর প্রকৃতিও মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যেই নিহিত।

ঔপন্যাসিক ইতিহাসের জঠর থেকে এ উপন্যাসে প্রকৃতির বর্ণনায় মনোমুগ্ধকর মানুষের সাথে সাদৃশ্য রেখেছেন। ঔপন্যাসিকের ইচ্ছায় এ জীবনে করিমনও সুখ পায়নি, সুজাত আলীও সুখকে গ্রহণ করেনি। প্রচণ্ড প্রলয়ে দু’জনে একত্রিত হয়ে নতুন জীবনের সন্ধানে লিপ্ত। এ দু’জন নিজেদের ভালবাসার কথা সামাজিক নিন্দার কারণে বলতে পারত না।

উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীকে দিয়ে সামাজিক ন্যায়-নীতি, অন্যায়, শুভ-অশুভ থেকে মুক্ত থাকার প্রেরণা সৃষ্টি আত্মোন্তিক লক্ষ্যই ঔপন্যাসিকের ইচ্ছা।

Leave a Comment