আবুল ফজল

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ আবুল ফজল। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

 

আবুল ফজল

 

আবুল ফজল

আবুল ফজল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার কেওঁচিয়া গ্রামে ১৯০৩ সালের ১ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রামেই ১৯৮৩ সালের ৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তাঁর জীবিতাবস্থায় অসামান্য দক্ষ ও সফল জীবনের পাশাপাশি সাহিত্য সাধনার বশবর্তী ছিলেন। চট্টগ্রাম জুমা মসজিদের ইমাম ছিলেন তাঁর পিতা মওলানা ফজলুর রহমান।

তাঁর প্রথম শিক্ষার সূচনা হয় মক্তবে কোরান পাঠ ও আরবি বর্ণ পরিচয়ের মাধ্যমে। নন্দন কাননের একটি প্রাইমারি স্কুলে তিনি এর পর ইংরেজী বিদ্যার সাথে পরিচিত হন। তার কিছু পরেই চট্টগ্রাম সরকারি মাদ্রাসায় দশ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তী হন। তিনি তখন থেকেই সাহিত্য চর্চায় মনেনিবেশ করেন এবং পাঠ্য বই পুস্তকের চেয়ে অনির্ধারিত সাহিত্য পাঠই ছিল তাঁর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।

তিনি ১৯৪০ সালে ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪১-এ কৃষ্ণনগর কলেজে বাংলার লোকচারার নিযুক্ত হন। ১৯৬৪ তে চট্টগ্রাম কলেজে বদলি হন। ১৯৫৯ সালে ১ জানুয়ারি এই পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ এর ১৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ এর ২৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ এর ২৩ জুন এই পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

অসামান্য আদর্শপরায়ণ ব্যক্তিত্ব আবুল ফজল যে কোন অবস্থায় সাহিত্যের সেবা করে গেছেন। তিনি কতিপয় উপন্যাসসহ অনেক প্রবন্ধ, গল্প ও গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি ১৯৬২ তে উপন্যাসে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, ১৯৬৩ আদমজী পুরস্কার, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন। তাঁর উপন্যাসসমূহ ‘চৌচির’ (১৯৩৪), প্রদীপ ও পতঙ্গ’ (১৯৪৭), ‘রাঙা প্রভাত’ (১৯৫৭), ‘জীবন’ পথের যাত্রী’ (১৯৪৮), এবং ‘পরাবর্তন’ (১৯৭৮) ইত্যাদি ।

আবুল ফজলের ‘পরাবর্তন’ (১৯৭৮) উপন্যাসে সময় স্বভাবের পটভূমিতে আদর্শবাদের সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর উপন্যাসে রয়েছে আদর্শবাদ ও মানবতাবাদের লক্ষনীয় সম্মিলন। দেশ স্বাধীনের আগে আভিজাত্য বা বংশ গৌরবে ক্ষয়িষ্ণু কিছু পরিবার, পরিবেশ পরিস্থিতির প্রতিকূলে পড়ে বংশ মর্যাদাকেই সর্বাচ্চ বলে জ্ঞান করে। তেমনি একটি কাজী বংশের ছেলে বজলে করিমের চরিত্রের মাধ্যমে ঔপন্যাসিক তা দেখিয়েছেন।

 

আবুল ফজল

 

কাজী বংশের নামানুসারে কাজী পুরের আভিজাত্য পরায়ণ নিষ্ঠাবান সত্যবাদী কষ্টসহিষ্ণু বজলে করিম বাস্তব অবস্থার সম্মুখীন হয়ে অনবরত হয়েছে অনটন অর্থাভাবে যন্ত্রণাদগ্ধ ক্ষতবিক্ষত এবং আহত। কিন্তু তার আদর্শবাদিতাই পরে তাকে পথ দেখিয়েছে। সে ছিল ঢাকার এক বেকার যুবক, মেসবাসী। বছর বোবা বোন নুরুকে বিয়ে করে নিয়ে এলো তার গ্রামে, যোগ দিল গ্রামের স্কুলে শিক্ষক রূপে।

শহুরে জীবনে সোনার হরিণ খোঁজার চেয়ে মাটির কাছাকাছি থাকাই ভালো, এই উপলব্ধি তাকে দেয় এক অনাস্বাদিতপূর্ব আনন্দ আর স্বস্তি।

বজালে করিম জানে তার বংশের নামের জন্য তাদের গ্রামের নাম কাজিপুর। সে বি.এ পাশ। ইচ্ছে করলেই যা তা করতে পারেনা আত্মসম্মানে বাধে। একটা মাত্র টিউশানি করে তার সারা মাস চলতে হয়।

মেসের ম্যানেজার রহমান ও তাকে বাস করতে ছাড়ে না। চাটগার খাতুনগঞ্জে তার দেশ। মেসের বয়ানের কথা উঠলেই রহমান বলে

দেমাগ, দেমাগ ঐ দেমাগই ওকে খেয়েছে। না হলে একটা বি.এ পান ছেলে এ যুগে কিছু করতে পারে না একি ভাবা যায়?এখানে এভাবে পড়ে না থেকে নিজের দেশে গিয়ে ঘোরাফেরা করতো মাসে অন্তত পাঁচশ হাজার রোজগার করা যায়।২

মেসের বাবুর্চি খলিল তাকে একটি সিগারেট খেতে সাধলেও সে পয়সা না দিয়ে তার থেকে খায়নি। টাকার অভাবের জন্য মনোরঞ্জনের পরিবর্তে স্বাস্থ্যোজ্বল একটি মেয়ের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছে। যৌন ক্ষুধারও টাকা লাগে। একটা সিগারেট দু’বেলা খায়। প্রেম করতেও টাকা লাগে। চাচাত বোন সালেহার বিয়ে হয়ে যায় টাকার জন্য একটা চোখ ট্যারা থাকার পরেও। কিন্তু তার বোন রৌশন আবার বিয়ে হয় না টাকা না দিতে পারার জন্য।

সচ্চরিত্রবান ও তেমনি বিত্তহীন এক ভাগিনার সাথে, বজলের বাবা মেয়ের বিয়ে দিলো। সে থেকে বজল বাড়ি যায় না। বজলের মায়ের থেকে পাওয়া বিদ্রূপ ও তাচ্ছিল্যজনক কথা আচরণে তার ঠোঁট বেঁকে যায়। বন্ধু রশিদের বাসায় এসে দেখে বড় টেবিলটার এক পাশে অনেকগুলো ফাইল আর তার পাশে একটা ফোনও রয়েছে। উত্তরের দেয়ালে কায়েদে আযমের বড় সাইজের একটা ফটোও টাঙানো। তার নিচে আয়নার ফ্রেমে রয়েছে এ কথা ক’টি মুদ্রিত Faith, Unity & Discipline লেখাগুলির উপর চোখ পড়তেই বড়ালের ঠোঁটে দেখা দিল অভ্যন্ত বক্র হাসি।

বজল অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক প্রতিবেশ পরিস্থিতিতে অসহ্যবোধ করে। বন্ধু আবদুল বাকী সরকার, যে নাকি ক্লাসে লাষ্ট না হয়ে লাট বাট ওয়ান’ হতো সেও টাকার জোরে প্রাক্তন মন্ত্রীর মেয়ে বিয়ে করে এবং বিয়ে বাড়িতে গিয়েও বলল চলে আসে। টাকের উপস্থিতি সর্বত্র হয়ে উঠেছে অস্বস্থিকর

বজলদের হলে একবার খাদ্যমন্ত্রী ভিজিট করতে আসে। খেতে বসে খানা প্রাণের কথা মনে হলে মন্ত্রী বলে উঠলেন “এখানে আরবী-ফার্সী-উর্দুর কোন অধ্যাপক উপস্থিত নেই।”

আরবীর অধ্যাপক তাদের মাছের বলেন না মানে হুজুর দেয়া। আর প্রাণ হারা মন্ত্রী বলেন জেনে রাখো আমাদের পাকিস্তান আন্দোলন শেফ রাজনৈতিক আন্দোলনও ছিল না, হিন্দু কটির প্র থেকে মুক্তির আন্দোলন ”

ভাষাতত্ত্ব পড়া বাংলার অধ্যাপক তাঁর অধীত বিদ্যার পরিচয় না দিয়ে থাকতে পারলেন না যেন বললেন। বেলা স্যার হিন্দী শব্দ। হিন্দী থেকেই উর্দুতে নেওয়া হয়েছে।

 

আবুল ফজল

 

তা হোক। উর্দুতে যখন তা এসেমান হয়ে গেছে, আমাদেরও দিতে হবে। এছাড়। হিন্দু কালচারের হাত থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই

বন্ধু রশিদের দুই বোনকে পড়িয়ে বললের একটু স্বাচ্ছলতা আসে। ভাতেও সে চিন্তিত। কারণ টাকার দৃশ্যতা সে যেন স্বীকার না করে। কিন্তু দেখা গেল রশিদের বোবা বোন নূরকে বিয়ে করে গ্রামেই ফিরে আসলো। গায়ে এসে যা দেখে ভাই ভাল লাগে। সে যে স্কুলে পড়াশুনা করেছে সেখানে চাকরি নেয়। তার অভাব মোচন হয়েছে বটে। কিন্তু টাকা পাবার উপর সে লোভ করেনি। বংশ মর্যাদাও পুনরায় বৃদ্ধি পেল। উপন্যাসে নামের স্বার্থকতা যথার্থ হয়েছে।

এ উপন্যাসে ঔপন্যাসিক আশির দশকের বিরুদ্ধ সময় প্রতিবেশে উপন্যাস লিখে অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিেেছন। তিনি অত্যন্ত আদর্শবাদী লেখায় আত্মমগ্ন হয়েছেন। আমাদের বাংলাদেশে পূর্বেও যেমন ছিল তেমনি দেশ স্বাধীনের পরেও বংশ মর্যাদার প্রাধান্য রয়েছে। বংশরক্ষার কথাই এদের বেশি মনে পড়ে যে কোন কিছু করার আগে। তারা দুর্নীতিমুক্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করে।

ঔপন্যাসিক কাজী বজলের মাধ্যমে এই শুদ্ধনীতি চারী জীবন যাপনের সাথে নিজের সততা বিবেক ও আদর্শবাদিতাই যেন প্রকাশ করেছন। বংশ মর্যাদা, তাদেরকে অবস্থান তৈরী করতে সাহায্য করতো। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতি যেমন শোষিত ও বিরুদ্ধ পরিবেশে ছিল, দেশ স্বাধীনের পরে ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন স্বৈরশাসকের অধীনে মানুষ তার দাবি পূরণ করতে পারছেনা।

এ সময়ে শিক্ষিত সুস্থ মানুষের উচিত বজলে করীমের মত নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করা। বজলে করিমের অসামান্য সততা, নীতির পরিচর্যা উপন্যাসকে অত্যন্ত নৈতিক মানদণ্ডে উন্নীত করেছে।

Leave a Comment