আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার প্রস্তাবনা। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার প্রস্তাবনা
১৯৭১ এর রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের পর বাংলাদেশের উপন্যাসের সূচনা। যুদ্ধ অঙ্গীকারে, মুক্তি- ব্যাকুলতায় বংলাদেশের সাহিত্যে খোঁজা হচ্ছিল আত্মাবিষ্কারের জাগরণ ও বিকাশের পথ এবং পূর্ববর্তী ভারতীয় ও পাকিস্তানী প্রভাব থেকে মুক্তিলাভের পথ আর জগৎসভায় আসন অর্জনের পথ।
কিন্তু বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা এই আত্মমর্যাদা ও আত্মাবিষ্কারে কতদূর এগিয়েছেন, কী তাঁদের বাধা ও সমস্যা, কোথায় অন্তবিরোধ ও আত্মপ্রতারণা, কোথায় সাফল্য ও ব্যর্থতা তা আলোচনাযোগ্য। এবং সে সাথে উপন্যাসের শাখাটি কতখানি নৈতিক মানদণ্ডে উন্নীত তাও বিচার্য বিষয়।
সাহিত্যধারায় উপন্যাসশিল্পের অন্বিষ্ট রাষ্ট্রীয় চিন্তা, ধর্মবোধ, শিল্প-সাহিত্যাদর্শ, নীতিচেতনা, কল্যাণবোধ এবং ‘পরিপূর্ণকে আবিষ্কার শাশ্বত সত্যকে চিহ্নিত করে সমগ্রতা স্পর্শী হওয়া। এই অধ্যায়ের আলোচ্য পর্ব ১৯৭২-১৯৯২ সময়সীমায় প্রকাশিত বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা বিষয়টি আলোচনার পূর্বে জানতে হবে নৈতিকতা বা ন্যায়বোধকে। সামাজিক রাষ্ট্রিক জীবনে ও ব্যক্তি-ভূগোলে নৈতিক বিবেচনা আসে সমাজ বিবর্তনে ।
নৈতিক চেতনার মধ্যে রয়েছে শ্রেয়োনীতি বোধ ও দুর্নীতিবোধের দ্বান্দ্বিক অবস্থান। প্রত্যেক নর- নারীর প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়েই হয় তার শ্রেয়োবোধের না হয় দুর্নীতিবোধের প্রাধান্যের প্রকাশ ঘটে থাকে। নৈতিক চেতনা পরিকল্পিত বা ভদ্রতার খাতিরে নয়, তা সহজ এবং স্বভাবজাত। কোন সমাজে নৈতিক উত্থানের নেতৃত্ব সমাজের অন্তর্ভুক্ত সেইসব ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীই দিতে পারেন, যাঁরা নিজেরা নৈতিক অনুশীলনে অগ্রবর্তী এবং সাধারণের চেয়ে অধিক নৈতিক শক্তির অধিকারী।
নীতিশাস্ত্রের বিধিবদ্ধ নিয়মে নৈতিক আদর্শ সম্বন্ধে অনেক নীতিবিদ মনে করেন, ‘রাষ্ট্রের বা স্রষ্টার বিধান অনুসারেই কোন কাজের নৈতিক মূল্য নিরূপিত হয়ে থাকে। যদিও নৈতিক বাধাবোধ থেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিরূপণ করা যায় না। তথাপি কান্ট, মার্টিন প্রমুখ দার্শনিক মনে করেন ধর্মের উৎস নীতি থেকে।
তবে কান্টের নৈতিকতায় যথেষ্ট মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁর মতে বুদ্ধিবাদ জ্ঞানজ বৃত্তির (cognitive faculty) ক্ষমতা পর্যালোচনা না করেই জগৎ, আত্মা, ঈশ্বর প্রভৃতি সম্পর্কে সঠিক, সার্বিক ও নিশ্চিত জ্ঞান পাওয়া যায় বলে ধরে নেয়। আবার অন্যদিকে অভিজ্ঞতাবাদ ঈশ্বর, আত্মা, বিশ্বপ্রকৃতি সম্পর্কে যে কোন রকম জ্ঞানকেই আবিষ্কার করে।৬
উনিশ শতকের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সকল প্রকার উপন্যাসেই এসেছে ধর্ম, আধ্যাত্মচেতনা, শ্রেয়-কল্যাণবোধের অস্তিত্ব ও তার প্রতি আস্থা। অপরদিকে বিশ শতকের উপন্যাস চেতনা প্রসূত হয়ে অন্ধ কুসংস্কারাছন্ন মনোভাব ত্যাগ করে ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে বিবেকের অন্যতম বৌদ্ধিক বিচার্য বোধ ও গভীর জীবনাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। দার্শনিক মূইর হেড় বিবেককে আইন প্রণয়নের যথার্থ ও প্রকৃত আত্মা আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন :
Conscience is the whole or true self claiming to legistate for its parts, its claim is the claim of self, as a conseious and rational being, to Judge any particular manifestation of itself in voluntary action [Muirhead, Elements of moral P 18]

বিবেক ও যুক্তির প্রত্যয়ে ঐশ্বরিক পূর্ণতাকে প্রত্যক্ষ করা যায় না বলে তা সর্বোচ্চ নৈতিক ধারণার অনুমেয় নিজস্বতা। বুদ্ধিবৃত্তির স্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী একজন বুদ্ধিমানসত্তা নিজেকে বুদ্ধিবৃত্তির জগতের সদস্য মনে করে এবং বুদ্ধিবৃত্তির জগতের নিমিত্ত হওয়ার জন্য তার কার্যকরণকে ইচ্ছা বলে থাকে। অন্যদিক থেকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে একজন অংশীদার হিসাবে সে তার নিজের সম্বন্ধে সচেতন। ৮
ব্যক্তিদর্শনে ভাল, সুখ, কল্যাণ, নীতি, মঙ্গল যা নিজের জন্য কামনা করা হবে তারই সাথে সঙ্গতি রেখে অন্যের জন্য তাই চাওয়া হবে। আর তাই হবে শর্তহীন, নিঃস্বার্থ, স্বাধীন ইচ্ছার নৈতিকতা যা সমাজ জীবনের গভীরতর সত্যের সঙ্গে বিধৃত।
সমাজ-চৈতন্য এক সার্বিক প্রবাহ যার অন্তর্গত রাষ্ট্রচিন্তা নৈতিকতা, ধর্মচিন্তা, শিল্প-বিজ্ঞান পরস্পর বহমান দর্শন প্রভৃতি গতিবান। ১০ এই প্রেক্ষাপটে গতিশীলতার মহত উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সর্বব্যাপ্ত সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন বাঙালির এক মহত্তম প্রাপ্তি ।
এই নবলব্ধ অনুভূতির সদর্থক প্রেরণা মুক্তিযুদ্ধোত্তর সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে আলোকিত সম্ভাবনার দিগন্ত নির্দেশ করবে। এ প্রত্যাশা স্বাভাবিক ও সঙ্গত। কিন্তু সমাজ ও সময় স্বভাবের বিপরীত গতি বাঙালি জীবনে যে ক্রমবর্ধমান ট্রাজেডি সৃষ্টি করে চলেছে, তা কেবল জাতির অস্তিত্ব কাঠামোকেই সংকটাপন্ন করেনি, তার সৃষ্টিশীল আবেগ, মননচর্চা, ইতিহাসবোধ, সমাজজ্ঞান এমন কি নান্দনিক মনস্তত্বকেও গভীর সংকটাবর্তে নিক্ষেপ করেছে। আমরা জানি, উপন্যাস জীবনঘনিষ্ঠ শিল্প অন্তর বাহির সমেত জীবনের বহুমাত্রিকতার রূপায়ণ তার স্বধর্ম.১১
ইংল্যান্ডে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই আধুনিক মধ্যবিত্তের উদ্ভব ও বিকাশের মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে বা ভারতে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অপেক্ষা উপনিবেশবাদী ইংরেজ শাসকদের প্রবর্তিত আইন, প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন আধুনিক মধ্যবিত্তের উদ্ভব ও বিকাশের মূলে বেশী ভূমিকা রাখে। ১২
উপন্যাস, সাহিত্য যে কোন ধরণের সাহিত্যের চেয়ে সমৃদ্ধতর বিকাশ, মধ্যবিত্তের প্রগতিশীল চেতনা, আদর্শ, বাস্তববাদিতা, বিপ্লব ও ত্যাগের মহিমা প্রচারের ক্ষেত্রে বেশী কার্যকর হয়। ঊনিশ শতক থেকে পাকিস্তান আমলের শেষ ভাগ পর্যন্ত (১৯৭০) বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বাধীন স্বদেশের ও জাতীয় মুক্তি অন্বেষায় মূলতঃ তিন ধরণের ভাবধারা অনুপ্রাণিত করে। এক জাতীয়তাবাদী, দুই স্বাতন্ত্র্যবাদী, তিন সমাজতান্ত্রিক।
জাতীয়তাবাদ অপেক্ষা সমাজতন্ত্র কালগত বিচারে আধুনিক, কিন্তু ধর্মভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যবাদ সবচেয়ে পুরনো ভাবধারা। স্বীকার্য যে স্বাতন্ত্র্যবাদের সঙ্গে সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থার জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ধনতান্ত্রিক ও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে শ্রেণী-শোষণহীন সমাজব্যবস্থার সম্পর্ক ওতপ্রোত। ১৩ সমাজতন্ত্রী বা মার্কসবাদীরা নিজেদেরকে ‘বিকাশশীল’ মতবাদের অধিকারী ভাবেন।
বিশ শতকের তৃতীয় দশকের প্রারম্ভ থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ-স্কুলো ত্তীর্ণ নব্য শিক্ষিতের সমবায়ে ক্রমবিকশিত হচ্ছিল ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সামন্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী ইয়োরোপীয় বুর্জোয়া ধ্যান-ধারণা, যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদকে অঙ্গীকার করে ১৯২৬ এ প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং প্রকাশ করে মুখপত্র ‘শিখা’। এ সাহিত্য সমাজের আদর্শ ছিল চিন্তাচর্চা, জ্ঞানের সমন্বয়সাধন ও সংযোগসাধন । ১০
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সাহিত্য তথা উপন্যাসশিল্পে মার্কসবাদী জীবন দর্শনের প্রভাবে লেখক ও শিল্পীদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবিলাসী ধ্যানধারণা ও জীবন চেতনায় আস্থাশীলতা দেখা দেয় পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের মধ্যে। তিরিশের যুগের ঔপন্যাসিকেরা চিন্তা-চেতনা শাণিতকরণ, বুদ্ধির বিকাশ, যুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রসরতায় তাঁদের লেখায় আসে প্রাগ্রসর জীবনাগ্রহের গভীরতা। সীমাবদ্ধতাকে বিশ্লেষণ করাই ছিল সে সময়ের ঔপন্যাসিকদের লক্ষ্য।
প্রাক ৪৭ পর্বে বিশেষ করে বিশ শতক থেকে চারের দশকে লেখক শ্রেণীর সমাজ বিকাশে দেখা দেয় অসমতা। এই সময়সীমায় পূর্ববঙ্গের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে দুই ধরণের মূল্যবোধ দেখা দেয়। এক শ্রেণীর ঔপন্যাসিক হচ্ছেন অনগ্রসর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামন্তমূল্যবোধে বিশ্বাসী। তাঁরা হচ্ছেন :
মোহাম্মদ নজিবর রহমান (১৮৭৮-১৯২৩), কোরবান আলী, শেখ ইদরিস আলী (১৮৯৫-১৯৪৫) প্রমুখ। আর এক শ্রেণীর ঔপন্যাসিক হচ্ছেন উদার, প্রগতিশীল, বুর্জোয়া মানবতাবাদী চেতনা প্রবাহে বিশ্বাসী। দ্বিতীয় শ্রেণীর লেখক ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পীসংঘ’ দ্বারা অনুপ্রাণিত কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), আকবর উদ্দীন (১৮৯৫-১৯৭৮), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) এবং হুমায়ুন কবীর (১৯০৬-১৯৬৯) এ শ্রেণীর লেখক।
প্রাক- সাতচল্লিশ পর্বে আমীণ, সংগ্রামশীল মানুষ এবং নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে ধারণ করেই এ পর্বের উপন্যাস সাহিত্যে প্রাধাণ্য পেয়েছে সামন্ত মূল্যবোধসমূহ তবু মানবতাবাদী চেতনার শিল্পরূপ অঙ্কনের প্রয়াস এ পর্বে সীমিত হলেও একেবারে উপেক্ষিত নয়। বিভাগ- পূর্ব কালের উপন্যাস প্রধানত গ্রামজীবন কেন্দ্রিক, তবে কখনো কখনো সেখানে এসেছে বিকাশমান নগরজীবনের খণ্ডিত ছবি।

প্রাক সাতচল্লিশ পর্বের এই উত্তরাধিকারের ওপরেই নির্মিত হয়েছে বিভাগোত্তর কালের উপন্যাস সাহিত্য ১০ বাংলাদেশের সাহিত্য বলতে ১৯৪৭ এর পরবর্তী পর্বকেই বুঝায়। সুতরাং ‘ধর্ম ঐক্যের নামে শ্রেণী স্বার্থের প্রয়োজনে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করল এ দেশীয় সামন্ত শ্ৰেণী ও সামন্ত মূল্যবোধে লালিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। দেশীয় সামন্ত ও পাকিস্তানি বড় বণিক বেনিয়াদের শোষণে, শিল্প পুঁজির প্রয়োজনে ইতোমধ্যে কাঁচামাল ও বাজারের লোভে পূর্ব বাঙলা গড়ে উঠল আধা ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্তবাদী সমাজরূপে।
পূর্ব বাঙলার সমাজ বিকাশ হল অবরুদ্ধ। ঘটানো হলো সামন্ত সমাজজাত মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ১৯ পূর্ব বাঙলার উপন্যাসে স্থান পেল দেশ-কাল নিয়ন্ত্রিত ঘটনাপুঞ্জ। স্বাজাত্য রক্ষায় ৫২-এর ভাষা আন্দোলন আইয়ুব সরকারের স্বৈর ও সামরিক শাসনকাল, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান এবং পাক-শাসনামলের বন্দী পরিবেশ থেকে মুক্তির অন্বেষা রূপায়িত হল এ সময়ের উপন্যাসে।
এই সময়ের উপন্যাস সময় ও কাল উপলক্ষে সমৃদ্ধ বলে, পর্ব বিভাগে দেখানো যেতে পারে। কারণ দেশ বিভাগের সাথে সাথেই নতুন ঔপন্যাসিক সৃষ্টি হয়নি। যে সব কথাশিল্পী বিভাগপূর্ব কাল থেকে লিখছিলেন। তাঁরাই দেশ বিভাগের পরে সময়কে ধারণ করে লেখার উপযোগিতা সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং যাঁরা এ সময়ের লেখায় অগ্রণী ভূমিকা রাখলেন তাঁরা হলেন :
আবুল ফজল, (১৯০৩-৮৩), আবুল মনসুর আহমদ (১৯৯৮-৭৯), আবু ইসহাক (১৯২৬), আকবর হোসেন (১৯১৭-৮১), কাজী আফসার উদ্দীন আহমদ (১৯২১-৭৫ ), আবু রুশদ (১৯১৯), ইসহাক চাথারী (১৯২২), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-৭১), সরদার জয়েনউদ্দীন (১৯২৩-৮৬), আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১৯-৮৮), শহীদুল্লাহ কায়সার (১৯২৭-৭১), আলাউদ্দীন আল আজাদ (১৯৩২), দৌলতুন্নেসা (১৯২২), শওকত ওসমান (১৯১৭-৯৯), শামসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-২০০১ ), আবদুল গাফফার চৌধুরী (১৯৩১) প্রমুখ।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৭ কাল পরিসরে সমাজ সত্যকে ধারণ করে লেখা উপন্যাসসমূহ হচ্ছে-
আবুল ফজলের ‘জীবন পথের যাত্রী’ (১৯৪৮), ‘রাঙা প্রভাত’ (১৯৫৭); শওকত ওসমানের ‘জননী’ (১৯৬১); আবুল মনসুর আহমদের ‘জীবন ক্ষুধা’ (১৯৫৫); সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র ‘লালসালু’ (১৯৪৮); আবু ইসহাকের ‘সূর্যদীঘল বাড়ী (১৯৫৫); আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’ (১৯৫২); কাজী আফসারউদ্দীনের ‘চরভাঙ্গা চর’ (১৯৫১); ‘কলাবতী কন্যা’ (১৯৫৬), ‘নোনা পানির ঢেউ’ (১৯৫৮); দৌলতুন্নেছার ‘পথের পরশ’ (১৯৫৭); ইসহাক চাখারীর ‘পরাজয়’ (১৯৫৪), ‘মেঘবরণ কেশ’ (১৯৫৫); আকবর হোসেনের ‘অবাঞ্ছিত’ (১৯৫০), ‘কি পাইনি’ (১৯৫১), ‘মোহমুক্তি’ (১৯৫২); আবু রুশদ এর ‘সামনে নতুন দিন’ (১৯৫৬); সরদার জয়েন উদ্দীননের ‘আদিগন্ত’ (১৯৫৬); শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ (১৯৫৪) এবং পর্যায়ক্রমে আরও তিনটি উপন্যাস ‘আশিয়ানা’ (১৯৫৬), ‘আলম নগরের উপকথা’ (১৯৫৫) এবং ‘জীবনকাব্য’ (১৯৫৬) প্রভৃতি ।

এই সব উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে মানবতাবাদী মার্কসবাদী মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর চিন্তা-চেতনা ও ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন আর একটি দিক ও উপন্যাসে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে তাহলো সাম্প্রদায়িকতা। কল্লোলীয় ধারায় অস্তিত্ব সংকট, সংশয় নৈরাশ্য নৈঃসঙ্গ এবং বহিঃর্মুখী জীবনবিমুখ গ্রামীণ জীবনের আবহে উঠে এসেছে ধর্ম ব্যবসায়ীদের শোষণ, প্রতারণা, কুসংস্কার, দারিদ্র, মহাজন মাতব্বর জোতদারের লোভ-লালসা, বিকৃতরুচি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়। প্রকৃতি পরিবেশের প্রাধান্য এবং মধ্যবিত্তের আশা- আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত না হওয়া ও জীবনযন্ত্রণার বৈচিত্র্য এর মূল কারণ।
১৯৪৭-১৯৫৭ পর্বের ঔপন্যাসিকদের অধিকাংশ চরিত্র ও ঘটনাংশ গ্রামমুখী, জীবন দৃষ্টিতে বুর্জোয়া মানবতাবাদী। জীবনের স্বান্দ্বিক বিকাশধারা, গ্রামজীবনের তথা সমাজের অস্ত-অসঙ্গতিজাত প্রবহমানতা নিরীক্ষণে অধিকাংশই অসমর্থ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং শামসুদ্দীন আবুল কালাম ব্যতীত কমবেশি সকলেই প্রাক সাতচল্লিশ পর্বের মূল্যবোধের পদাঙ্কচারী।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সমাজবিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গতা, আত্মানুসন্ধান ও আত্মমুখিতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মার্কসীয় চেতনার প্রতিশ্রুতি এবং শামসউদ্দীন আবুল কালামের পেটিবুর্জোয়া সুলভ আর্থিক রোমান্টিকতাপ্রসূত ত্রয়ী শূন থক রোমান্টিকতাপ্রসূত ত্রয়ী চেতনাবোধ ১৯৪৭-৫৭ কাল পরিসরের সমাজচেতনা প্রবাহে নতুন সংযোজন । এছাড়া এ সময়ের উপন্যাসে আবুল ফজলের গ্রামীণ জীবন ভাবনার সাথে নাগরিক জীবন ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাতচল্লিশ পর্বের উপন্যাসে যে প্রগতিশীল চেতনা জন্ম নিয়েছিল এবং তাতে উপন্যাস শরীর হয়ে উঠেছিল সত্যানুসন্ধানী। কিন্তু ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর থেকে আইয়ুব সরকারের সামরিক শাসন জারি হলে, শিল্পী সাহিত্যিকেরা তাঁদের স্বাতন্ত্র্যভিলাষী চিন্তাধারা পরিত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
পূর্ব বাঙলা জনশ্রেণীর উপর পাকিস্তানী সেনাদের নির্মম অত্যাচার আত্মকেন্দ্রিক ও জীবন পলাতক করে উঠলেন। ‘মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষের মতোই এরা তখন বেতার থেকে টেলিভিশন, বি. এন. আর, লেখক সংঘ এবং প্রেস ট্রাস্টের আচ্ছাদনে পরিণত হলেন ঔপনিবেশিক শাসকের বেতনভুক্ত সেবাদাসে।
সুতরাং ১৯৫৮-৭০ পর্বের সাহিত্যিকদের স্বকালকে আত্মস্থ ও বিচার করার উৎসাহ ছিল না। এদেশে বিজ্ঞান আছে, বিজ্ঞানে বিশ্বাস নেই। ধর্ম আছে, তা বহু ব্যবহৃত। রাষ্ট্র আছে, রাষ্ট্রনীতি নেই। বামপন্থী আন্দোলন বহুধা খণ্ডিত সিদ্ধান্ত আর তত্ত্ব গবেষণায় নেতৃবর্গ তখন ব্যস্ত। তাঁদের অন্তরঙ্গ চেতনাস্রোতে পাকিস্তান লুপ্তস্বপ্ন। এ সময়ের ঔপন্যাসিকদের আবার দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।
প্রথমত, ১৯৪৭-৫৭ পর্বের ঔপন্যাসিকদের চেতনা প্রবাহ ও শিল্প-জিজ্ঞাসার ধারা এ পর্বের নতুন ঔপন্যাসিকদের রেখাচিত্র অঙ্কন। ২০ কারণ ভাষা আন্দোলনের পর কিছু তরুণ ঔপন্যাসিক আধুনিক ও জীবনচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। ষাটের দশক থেকে আমাদের উপন্যাস গভীরতা পেতে থাকে নানা দিক থেকে। সংখ্যার দিক থেকেই শুধু নয়, গুণ ও মানের দিকেও এই দশকে উপন্যাস একটি বিশিষ্ট শিল্পের অবয়ব পেতে থাকে এবং তা পাকিস্তানী বর্বর ও পশুশক্তির বিরোধিতা করে।
প্রথম শ্রেণীর ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শওকত ওসমানের ‘জননী’ (১৯৬১), ‘ক্রীতদাসের হাসি’ (১৯৬৩), ‘সমাগম’ (১৯৬৮) এবং ‘রাজাউপাখ্যান’ (১৯৭০); সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) এবং কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮) উল্লেখযোগ্য। মানবমুখী এবং কল্যাণময় অস্তিত্ববাদী দর্শনে স্থিতধী ॥২২ সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে উত্তীর্ণ হয়ে আনোয়ার পাশা লিখলেন, ‘নীড় সন্ধানী’ (১৯৬৮), ‘নিশুতি রাতের গাঁথা’ প্রভৃতি (১৯৬৮)।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং শামসুদ্দীন আবুল কালাম এ পর্বে রোমান্টিক ও জীবন পলায়নবাদী। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘শেষ রজনীর নীল যমুনা’ (১৯৬৪), ‘চাঁদ’ (১৯৬২), ‘নাম না জানা ভোর’ (১৯৬২); সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘পান্নামোতি’ (১৯৬৫) এবং ‘নীলরঙ রক্ত’ (১৯৬৫) উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
তাঁর ‘অনেক সূর্যের আশা’ (১৯৬৭), উত্তমপুরুষে লেখা। শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাঞ্চন মালা’ (১৯৬১); দৌলতুন্নেসার ‘বধুর লাগিয়া’ (১৯৬২) এ সময়ের উপন্যাস। মধ্যবিত্তের আত্মপ্রবঞ্চনা, গ্লানি, সামাজিক সংকট নিয়ে ষাটের দশকে আবু রুশদের লেখা উপন্যাস হচ্ছে ‘ডোবা হল দীঘি’ (১৯৬৬), ‘নোঙর’ (১৯৬৮) এবং ‘অনিশ্চিত রাগিনী’ (১৯৬৯) ইত্যাদি ।
দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসে ঔপন্যাসিকদের প্রধান লক্ষণ অন্তর্মুখিতা। আত্মমগ্ন চেতনাপ্রবাহ এবং মনোবিকলন রীতিতে এঁরা অধিক আগ্রহী। রাজিয়া খান, সৈয়দ শামসুল হক এবং আলাউদ্দিন আল আজাদ এঁদের মধ্যে অন্যতম । এঁদের কেউ কেউ ‘সমাজবাদী জীবন ভাবনাকে সরাসরি প্রকাশ করতে ভীত হলেন, আশ্রয় নিলেন রূপক, প্রতীক, রূপকথা ও পুরানের জগতে।
কতিপয় ঔপন্যাসিকের অনিষ্টলোকে হাত ছানি হাত ছানি দিলেন ফ্রয়েড। ফলে আমাদের ঔপন্যাসিক চৈতন্যে এলো লিবিডোতাড়িত, বিরংসাপ্রিয়, পলায়নবাদী এবং বিবরসন্ধানী নঞর্থক জীবনভাবনা। এবং এ ভাবেই যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় বুর্জোয়া সমাজের পচনশীলতায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত হলেন পূর্ববাঙলার বেশকিছু ঔপন্যাসিক ২

এই সময়ের বিচিত্র গতিমুখী ঔপনাসিক ও উপন্যাসসমূহ হচ্ছে রাজিয়া খানের (১৯৩৬) ‘বটতলার উপন্যাস’ (১৯৫৯), ‘অনুকল্প’ (১৯৫৯); শওকত আলীর ‘পিঙ্গল আকাশ’ (১৯৬৩), ‘চৌরসন্ধি’ (১৯৬৮); সৈয়দ শামসুল হকের (১৯৩৫), এক মহিলার ছবি’ (১৯৫৯), ‘দেয়ালের দেশ (১৯৫৯), ‘অনুপম দিন’ (১৯৬২), সীমানা ছাড়িয়ে’ (১৯৬৪); আলাউদ্দিন আল-আজাদের (১৯৩২) ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ (১৯৬০), ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ (১৯৬২), ‘ক্ষুধা ও আশা’ (১৯৬৫)। এসব উপন্যাস মননধর্মী বস্তুনিষ্ঠ জীবনবোধে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। শহীদুল্লাহ কায়সারের (১৯২৬-৭১) ‘সারেং বৌ’ (১৯৬২) এবং ‘সংশপ্তক’ (১৯৬৫) যুগ ও শিল্পসচেতন উপন্যাস ।
রোমান্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা জহির রায়হানের (১৯৩৩-৭২) ‘হাজার বছর ধরে’ (১৯৬৪), ‘বরফ গলা নদী’ (১৯৬৯), ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৯); মীজানুর রহমান শেলীর ‘পাতালে শর্বরী’ (১৯৬৫); আবদুর রাজ্জাকের ‘কন্যাকুমারী’ (১৯৬০)’ রশীদ করীমের (১৯৩২), ‘উত্তম পুরুষ’ (১৯৬১), ‘প্রসন্ন পাষাণ’ (১৯৬৩); আহসান হাবীবের ‘অরণ্য নীলিমা’ (১৯৬১); আতাহার হোসেনের ‘পিপাসা’ (১৯৫৮), প্রভৃতি উপন্যাসে উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশের অবিকশিত নগর জীবনের বহু জটিলতা ।২৫
এ সময়ের উপন্যাসের এক বিশিষ্ট দিক উন্মোচিত হয় তাহলো আঞ্চলিক ভিত্তিতে জীবন চিত্রায়ন। যেমন শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাশবনের কন্যা’ (১৯৫৪), ‘কাঞ্চন মালা’ (১৯৬১); তাসাদ্দক হোসেনের ‘মহুয়ার দেশে’ (১৯৫৯); আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘কর্ণফুলী’ (১৯৬২); বদরুন্নেসা আবদুল্লাহর ‘কাজল দীঘির উপকথা’ (১৯৬২); রাবেয়া খাতুনের ‘মধুমতী’ (১৯৬৩); বদরুদ্দীন আহমদের ‘অরণ্য মিথুন’ (১৯৬৩); সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘পান্নামোতী’ (১৯৬৪); জসীমউদ্দীনের ‘বোবা কাহিনী’ (১৯৬৪); আলাউদ্দীন খানের ‘অববাহিকার উপকথা’ (১৯৬৫); শামসুল হকের ‘নদীর নাম তিস্তা’ (১৯৬৬) প্রভৃতিতে অঙ্কিত হয়েছে বিশেষ অঞ্চলের কতিপয়ের জীবনচিত্র।
দেশ বিভাগের পর অখণ্ড ভারতবর্ষকে নিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবয়নে সমৃদ্ধ হয়ে উঠে যে সকল উপন্যাস তাহলো: চৌধুরী শামসুর রহমানের ‘মস্তানগড়’ (১৯৬২); মেসবাহুল হকের ‘পূর্বদেশ’ (১৯৬৩); আবু জাফর শামসুদ্দীনের ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ (১৯৬৩); সরদার জয়েনউদ্দীনের ‘নীলরং রক্ত’ (১৯৬৫), ‘অনেক সূর্যের আশা (১৯৬৭); খালেকদাদ চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত অধ্যায়’ (১৯৬৬); সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ (১৯৬৭), ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯), জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৯) ইত্যাদি
সমাজতান্ত্রিক চেতনা ও মিথেয় নববিন্যাসে সমৃদ্ধ সত্যেন সেনের আরও উপন্যাস হচ্ছে ‘ভোরের বিহঙ্গী’ (১৯৫৯), ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ (১৯৫৯), ‘পদচিহ্ন’ (১৯৬৮), ‘বিদ্রোহী কৈবর্ত’ (১৯৬৯), ‘আলবেরুণী’ (১৯৬৯), ‘পুরুষমেধ’ (১৯৬৯), সাত নম্বর ওয়ার্ড (১৯৬৯), ‘কুমারজীব’ (১৯৬৯), ‘সেয়ানা’ (১৯৬৯), ‘উত্তরণ’ (১৯৭০), ‘মা’ (১৯৭০), ‘একূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে’ (১৯৭১) প্রভৃতি। সত্যেন সেনের লেখনী প্রচুর।
এসব উপন্যাসে প্রেম, অবরুদ্ধ সময়ের কারাযাত্রা ও মনন জীবনের অভিজ্ঞতাই ব্যক্ত হয়েছে বেশি। মার্কসবাদের দিকে জনচেতনাকে জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে সত্যেন সেনের মতো অধিকসংখ্যক উপন্যায় আর কেউ লেখেননি। ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টিতেও বাংলা সাহিত্যে সত্যেন সেন সংযোজন করেন এক নতুন মাত্রা ।
দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাঙলার যে সব ঔপন্যাসিক দ্বিজাতি তত্ত্বের উর্ধ্বে থেকে অসাম্প্রদায়িক এবং হীনমন্যতাবোধ অতিক্রম করে প্রগতিশীল চেতনায় লিখছিলেন, ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আইউব সরকারের সামরিক অভিযানের সময়ে তাদের অনেকেরই লেখা প্রকাশিত হয়নি। প্রাগ্রসর অভিযাত্রার ‘নবজাগ্রত’ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সামনে তখন অবরুদ্ধ সময়ের দুর্ভেদ্য দেয়াল, ধাতব অস্ত্রধারীর নিষ্ঠুর নিপীড়ন। বন্দী সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের শিল্পীরা শৃঙ্খল ভাঙার নির্দেশ নয়, বরং হন্যে হয়ে খুঁজলেন এক চিলতে নিরাপদ আশ্রয় ।
তাঁদের এ সময়ের উপন্যাসে আঞ্চলিক ও নাগরিক উভয় রূপেই ভাষা আন্দোলন এসেছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দ্বিজাতিতত্ত্ব, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, আর্থিক বিপর্যয়ে নীতিবোধের অবক্ষয়, বংশ গৌরব আদর্শবাদিতা, জীবন সংগ্রামের বিচিত্র রূপায়ণ। স্বৈর-শাসনের শৃঙ্খলে বাস করেও কোন কোন ঔপন্যাসিক ছিলেন সত্যসন্ধানী, সংরক্ত সমকালস্পর্শী এবং প্রগতিশীল সমাজ ভাবনায় নিঃসন্দিগ্ধ।
এই বিরুদ্ধ সময়ে সমাজ প্রতিবেশে ঔপন্যাসিকগণ নিজেদের কালকে ধারণ করলেন নৈতিক সচেতনায়। এই সময়ের ঔপন্যাসিকগণ মানসিক দিক থেকেও ছিলেন আদর্শপরায়ণ। তাঁদের দায়িত্ববোধে ধরা দিয়েছে এ সময়কালীন সমাজ বাস্তবতা। কিন্তু তা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭১ এর দেশ স্বাধীনের পরে। স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ শ্রেণীদ্বন্দ্বের পট পরিবর্তনে গণতন্ত্রের সাংবিধানিকতা রক্ষায় সরকারের পর সরকার এসেছে।
তাই অনাদর্শ, অকল্যাণকর মানসেই লেখা ফুটে উঠেছে। লেখক মানসিকতায় এসেছে যথেষ্ট পরিবর্তন। কিন্তু গণতন্ত্র মুক্তির বদলে এসেছে স্বৈরাচারী শাসন প্রক্রিয়া। তাদের শাসন কার্যক্রম। প্রক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে এবং সময়কাল পরিসরে সংগতি রেখে এ সময়ের লেখকদের উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।
অতএব আমাদের বাংলাদেশের উপন্যাসকে লেখকদের উদাত্ত কল্যাণ সাপেক্ষে নৈতিক বিচার্যবোধে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধপূর্ব উপন্যাস, যা স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার অবস্থান অনুযায়ী যুদ্ধোত্তর উপন্যাস হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধপূর্ব বা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ এর পর্বের ঔপন্যাসিকগণ ও তাঁদের উপন্যাস সমূহ হচ্ছে- আবুল ফজলের (১৯০৩-৮৩) ‘পরাবর্তন’ (১৯৮০); আবু জাফর শামসুদ্দীনের (১৯১৯-৮৮), ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ (১৯৭৪), ‘সংকরসংকীর্তন’ (১৯৮০); সরদার জয়েনউদ্দীনের (১৯২৩-৮৬), ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৫) ‘শ্রীমতী ক ও খ এবং শ্রীমান তালেব আলী’ (১৯৭৩); শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘সমুদ্রবাসর’ (১৯৮৬) এবং আবু ইসহাক এর (১৯২৬) ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ (১৯৮৬) ইত্যাদি।

এই উপন্যাসসমূহ সেই সময়ের কালকে ধারণ করলেও স্বাধীন দেশের সময়সূত্রে সঙ্গতিপূর্ণ। ঔপন্যাসিকগণ স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের নৈতিকতা ও বিচার্যবোধে কালিক ভাবনায় উপন্যাসসমূহে ন্যায়- অন্যায়, উচিত-অনুচিত, যুক্তি-অযুক্তির মানদণ্ডে উন্নীত করে সারসঙ্কলন রচনা করেছেন। তাঁরা অসম্ভব ক্ষুদ্ধ, জটিল রূঢ় ও বিরোধী সময় পরিবেশে নিজ দায়িত্বজ্ঞানে লেখায় হাত রেখেছেন। কিন্তু সময়ের স্বল্পতা ও সংকীর্ণতার অভাবে এসব উপন্যাস প্রকাশিত হয়নি।
আমাদের দেশ দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রামের পর স্বাধীন হলেও পূর্ববর্তী সময়ের অসংলগ্নতা ও অসঙ্গতি দূর হয়নি। তাই যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধ উত্তর সময় কালকে স্বাক্ষী রেখেই এসব উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে স্বাধীনতা উত্তর কালে। সে সময়ে প্রকাশিত উপন্যাসে আমাদের স্বাধীনতার সাথে উপন্যাস লেখার মান কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ তার মূল্যায়নও আবশ্যক।