আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৯১ এর নির্বাচন ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার বাংলাদেশের উপন্যাসের অর্থনৈতিক সামাজিক রাষ্ট্রিক পটভূমি ও নৈতিক বাস্তবতা ১৯৭২-৯২ এর অন্তর্গত।

১৯৯১ এর নির্বাচন ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন
বাংলাদেশে ১৯৭২ সনের পর ১৯৯১ সনে কার্যকর হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের জয়যাত্রা। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী, ৬ আগস্ট ১৯৯১ তারিখে অভূতপূর্ব সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুমোদন লাভ করে। ১৯৯১ সনের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোটে তা সমর্থিত হয়। অতঃপর ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তা বাংলাদেশে পুনরায় প্রবর্তিত হলো সংসদীয় গণতন্ত্র ।
১৯৯১ সালের ২ জুলাই তারিখে সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনী একাদশ ও সংবিধান সংশোধনী দ্বাদশ বিল নামে দু’টি বিল সংসদে উত্থাপিত হয়। ২৮ জুলাই এই বিল দু’টি সংসদে পেশ হলে ৬ আগস্ট তা সংসদে গৃহীত হয়। একাদশ সংশোধনীর উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।
গণঅভুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও ছিল তাই। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংশোধনী দ্বারা বাংলাদেশ মূলত মূল সংবিধানের বিধানাবলীকে পুনঃস্থাপিত করা হয়। যেহেতু বিলটিতে ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৯২(ক) ও ১৪২ অনুচ্ছেদের বিধানাবলী সংশোধনের প্রস্তাব ছিল, সেহেতু রাষ্ট্রপতি বিলটিকে ১৪২ (৬) অনুচ্ছেদের বিধান বলে গণভোটে পেশ করেন।
১৯৯১ সালের গণভোট এবং সামরিক ব্যবস্থায় গৃহীত গণভোটের ব্যবস্থাবলী ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। যেমন ১৯৭৭ সালের ৩০ মে এবং ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ এর গণভোট ছিল প্রশাসনিক, কিন্তু ১৯৯১ এর গণভোট ছিল সাংবিধানিক। ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোট এর লক্ষ্য ছিল শাসন ক্ষমতার বৈধকরণ।

অপর পক্ষে ১৯৯১ এর গণভোট হলো সংসদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব অর্থাৎ সংসদের বৈধ ক্ষমতা জনগণ কর্তৃক অনুমোদন। ১৯৯১ সালের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার ফলে পঞ্চম জাতীয় সংসদকে ঘিরে মানুষের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিলো। সন্দেহ নেই, এই সংসদ ছিলো ঘটনা বহুল। কিন্তু জন্মের অল্পদিন পরেই পঞ্চম সংসদ জনগণকে হতাশ করে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই অমীমাংসিত রয়ে যায়।
বিরোধী দলের ঘন ঘন ওয়াক আউট, সংসদ বর্জন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, হরতালে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সংসদীয় গণতন্ত্রের কোনো পরিচয় তখন দেশবাসী দেখতে পায়নি। এছাড়া আরও কিছু সমস্যা রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৯২ সালের প্রধান সমস্যার মধ্যে গোলাম আযম সমস্যা, বাবরী মসজিদ সমস্যা, সন্ত্রাসদমন অধ্যাদেশ, মাঝে মাঝেই হরতাল পালন। সন্ত্রাস দমন অধ্যাদেশ, ৫ম জাতীয় সংসদের ৭ম অধিবেশনে উত্থাপিত হয় এবং বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ১ নভেম্বর বিলটি পাস হয়।
৭ ডিসেম্বর ১৯৯২ অযোধ্যার বাবরী মসজিদ সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে সারাদেশে তুমুল গণ্ডগোল হয়। স্বাধীনতা বিরোধীদের ধ্বংস ক্রিয়ার বিপরীতে ১১ ডিসেম্বর শান্তিমিছিল সংঘটিত হয়। ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে চেয়ারম্যান করে সর্বদলীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কমিটি গঠন করা হয়। সংসদীয় গণতন্ত্র চলাকালে এভাবেই দিনের পর দিন শান্তিমিছিল ও পাশাপাশি সংঘাত- সংঘর্ষের মিছিল চলে প্রায় প্রতিদিন। কিন্তু সম্প্রীতির বন্ধন রক্ষা করতে যেন সরকারি দল এবং বিরোধীদল উভয়ই ছিল অপারগ।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বি.এন.পি সরকার দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের গুরুদায়িত্ব নিয়েছিলেন। এ সুযোগে তিনি ও তাঁর সরকার অনেক কিছু অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশিত ছিল। আবার প্রচুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল বলে আশঙ্কা করতে দেখা গেছে অনেককে।
সুতরাং আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপরিচালনায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারের মানসিক, নৈতিক অবক্ষয়ই দেখে আসছি। ১৯৭২ সালের জাতীয় সংসদকে সংবিধান অনুসারে একটি সার্বভৌম আইন প্রণয়নকারী সৈন্য ও জনসাধারণের শাসন ও বিচারকার্য সম্পাদনের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণকারী সংস্থা এবং অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রক্ষক হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু আমাদের সংসদীয় দলের প্রধানগণ দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি, নিয়ম-শৃঙ্খলার অবনতি, সরকার পদ্ধতির অবমূল্যায়ন করতে দ্বিধা করেননি। নাগরিক অধিকার খর্ব করাই ছিল যেন আমাদের রাষ্ট্র ও সংসদীয় প্রধানদের কর্তব্য। অথচ ঐতিহাসিক সত্য যে, দেশ স্বাধীন হয়েছিল সার্বভৌম সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে।
বস্তুতপক্ষে সংসদীয় গণতন্ত্র আধুনিক পুঁজিবাদী বা বুর্জোয়া সমাজের প্রসূণ। ইতিহাসের ঘটনা হলো : পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও শিল্প-কারখানার বিকাশের ফলে দ্বান্দিক প্রক্রিয়ায় নানা টানা পোড়েনের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছিল সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। পাশ্চাত্যে শিল্প সমাজের বিকাশের প্রভাব কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের যাতেই লক্ষ্যণীয় হয়নি, তা কোন কোন দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত গণতন্ত্র, কোথাও সংসদ ও প্রধান নির্বাহীর ভেতর ভারসাম্য মূলক ফরাসী পদ্ধতি এবং কোথাও বা সুইসব্যাংক গড়ে উঠেছিল।

দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরশাসনের অবসানে বাঙালি লেখকদের রচনায় এই সময় সংকটের আন্তর্বাস্তবতা ও যন্ত্রণার রেখাপাত ঘটেছে।
এ সময়ের উপন্যাসসমূহ হচ্ছে মোহাম্মদ আবদুল আউয়ালের আলো আমার ‘আলো’ (১৯৯০); মঈনুল আহসান সাবেরের ‘কেউ জানে না’ (১৯৯০), ‘অচেনা জায়গা (১৯৯১), নীল খাম’ (১৯৯১), ‘অপরাজিতা’ (১৯৯১); হুমায়ুন আহমেদের ‘অপরাহ্ন (১৯৯২), ‘কোথাও কেউ নেই’ (১৯৯২); কাজী সারওয়ার হোসেনের ‘আড়াল’ (১৯৯১); মকবুলা মঞ্জুরের ‘প্রেম এক সোনালী নদী। (১৯৯০); আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘আবেদ হোসেনের জ্যোৎস্না দেখা’ (১৯৯০); সৈয়দ শামসুল হকের ‘নির্বাসিতা (১৯৯০), ‘না যেয়ো না’ (১৯৯১), ‘প্রথম চুম্বন’ (১৯৯০); অরুন চৌধুরীর ‘ছায়াবন্দী’ (১৯৯০); শিরীন মজিদের ‘স্বর্গ থেকে ফেরা’ (১৯৯১), ‘অপুবিজয় দেখেনি’ (১৯৯০); শওকত আলীর ‘উত্তরের খেপ’ (১৯৯২), ‘পতন’ (১৯৯২) প্রভৃতি।
স্বৈরতান্ত্রিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরে রচিত এ সকল উপন্যাসে দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে বৃত্তবন্ধতা ও আত্মভুক চেতনার যন্ত্রণাদায়ক মানসিক বিস্তার ঘটেছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ যে স্বপ্নকে লালন করে আসছিল তা বাস্তবোচিত সময় স্বভাবের সাথে প্রতিহত হওয়া এ সময়ের উপন্যাসে কাহিনী বিশিষ্টতা পেয়েছে।