আবু ইসহাক

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ আবু ইসহাক। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

 

আবু ইসহাক

 

আবু ইসহাক

আবু ইসহাক ফরিদপুর জেলায় ১৯২৬ সনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বিভাগোত্তর কালীন করাচী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি সরকারি চাকুরিরত ছিলেন।

তাঁর শিল্প কুশলতায় এসেছে গ্রামীণ জীবনপটে ভুতুড়ে কুসংস্কার, আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়, ধর্মীয় গোড়ামী, অন্ধবিশ্বাস প্রভৃতি।

আবু ইসহাকের ‘সূর্যদীঘল বাড়ী (১৯৫৫) বহু বিতর্কিত উপন্যাসের পর ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ (১৯৮৬) দ্বিতীয় উপন্যাস। সূর্যদীঘল বাড়ী উপন্যাসে গ্রামজীবনের ছবির সমাজব্যবস্থা উন্মলিত হচ্ছে কৃত্রিম ব্যবস্থাবলীর জন্য, এসব তিনি দেখাতে গিয়ে শিল্পকুশলী হয়ে উঠেছেন। তিনি এ উপন্যাসে নারীবাদী চরিত্রে জীবন সংগ্রামী চেতনায় জয়গুনের কেন্দ্রানুগ চরিত্র অংকন করেছেন। এ উপন্যাসে এসেছে পঞ্চাশের মন্বন্তর দেশ-বিভাগ, স্বাধীনতা, প্রাপ্য ও প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা।

দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের উন্মলিত চরিত্রের অন্তঃস্বরূপ বিষয়বস্তু। পুরুষশাসিত সমাজে ও ধর্মাশ্রিত বাক্যালাপে মেয়েমানুষের কাজ করা এক ধরণের অসাধ্যসাধন। কিন্তু জয়গুন ধর্মের কঠোর অনুশাসন ভঙ্গ করে জীবনচর্চায় অপশক্তির বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। সে সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে অস্তিত্বকে পরম শক্তি এবং ধর্ম বলে মানে। তাঁর মতে :

ক্ষুধার অন্ন যার নেই, তার আবার কিসের পর্দা? কিসের কি? সে বুঝেছে জীবন রক্ষা করাই ধর্মের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ মূলমন্ত্ৰ” (সূর্য দীঘল বাড়ী, পৃ. 187 )

 

আবু ইসহাক

 

তাই জয়গুনের অস্তিত্ব অন্বেষণেই সবচেয়ে বড় ধর্ম আমরা দেখতে পাই। আবার পদ্মার পলিদ্বীপ একটু ভিন্ন ধরণের উপন্যাস। ষাট দশকের দিকে সমাজতন্ত্র বা মার্কসীয় প্রভাব ব্যাপক বিস্তার লাভ করে যদিও তিনি সমাজতন্ত্রী মনোভাব নিয়ে এ উপন্যাসের পটভূমি তৈরি করেননি, তবু এ ধারার উজ্জ্বল সংযোজন ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’।

‘পদ্মার তীরবর্তী মানবপ্রবাহের অস্তিত্ব, সংগ্রাম, সংস্কার, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক আবেগ এবং দ্বন্দ্ব সংঘাতময় জীবন পরিক্রমার রূপায়ণে এ উপন্যাস অনুসৃত হয়েছে। পদ্মার পলিদ্বীপের জনমানুষের জীবন সংগ্রাম গড়ে উঠেছে। পূর্বনাম ‘লট বনিয়া’ ও পরবর্তী নামধারী খুনের চর’কে কেন্দ্র করে।

এই চরের সাথে সংশ্লিষ্ট সাধারণ জনশ্রেণীর অস্তিত্বে চেতনা প্রবাহ তাদের পরিশ্রান্ত জীবনের সংগ্রাম এবং সে সাথে সংগ্রামী চেতনাময় শারীরিক অনিবার্য, অদম্য জৈবিক চেতনায় ফুরিত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। যা তাদের মুরুব্বি শ্রেণী কর্তৃক ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জোর পূর্বক হস্তক্ষেপে অনিয়ন্ত্রিত অপ্রকাশ্য গোপন আশ্রয়কে গ্রহণ করেছে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র এরফান মাতব্বরের ছেলে ফজল বিবাহিত। দশ বছর আগে লবনিয়া চরে এরফান মাতব্বর ও চেরাগ আলীর দলের পাঁচজন খুন হলে এর পর থেকে এ চরের নাম হয় খুনের চর। সুতরাং মাছ বিক্রি করতে গিয়ে জেগে উঠা চরকে ফজল আবিষ্কার করে। এ চরের মালিকানা এরফান মাতব্বরের জেনেও নতুন অর্থশক্তির অধিকারী জহুরুল্লাহ ফজলের শ্বশুর আরশাদ মোল্লার সাথে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ডাকাতি মামলার আসামী বানিয়ে তাকে জেলে পাঠায়। এরফান মাতব্বরের গ্রাম্য আঞ্চল ভিত্তিক সামাজিক নীতি নিষ্ঠা আছে। আবার গ্রাম্য কিছু চালাকি ধূর্ততা ও শঠতা আছে।

সারদা আইনের বছর বাংলা ১৩৩৬ সাল। সবার মুখে এক কথা আইন পাশ হয়ে গেলে ছেলে মেয়ের বিয়ে শাদী দেয়া মুশকিল হবে।

 

আবু ইসহাক

 

এই কথা ভেবে সে সময়ে সদ্যভূমিষ্ঠ বা অজাত শিশুর ও বিয়ে হয়ে থাকে। সে সময়েই ফজলের বয়স এগারো ও জরিনার বয়স দশে তাদের বিয়ে হয়। এরফান মাতব্বর ফজলের বার্ষিক পরীক্ষার আগে একদিন জরিনাকে ফজলের পায়ের কাটা তুলতে দেখে কয়েকদিনর মধ্যেই জরিনার ভাইকে কিছু টাকা দেয় এবং ফজলকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে খেজুর গাছ কাটা চকচকে ধারালো দা হাতে নিয়ে মাতব্বর গর্জে ওঠে

অ্যাসে ফউজা, ছ্যান দেখছস? তালাক দে, কইয়া ফ্যাল তিন তালাক বায়েন। তেড়ং বেড়ং করলে তিরখণ্ড কইরা ফালাইমু।

এর পরে আবার বিয়ে দেয়া হয় আরশাদ মোল্লার রূপবর্তী মেয়ে রূপজানের সংগে। কিন্তু শ্বশুর গহনা বিক্রির অপরাধে মেয়েকে আটকে রাখে। আরশাদ মোল্লা এর পরে আর একটি অপরাধ করেছে যা নাকি গ্রাম্য মানসম্মানে আঘাত হানে, তা হচ্ছে মাছ বিক্রির অজুহাতে ফজলের সাথেই দুর্ব্যবহার শুরু করে দেয়। কারণ শ্বশুর মাছ বিক্রিকে পুঁজি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক ভিত্তিতে দেখেছে।

আরশাদ মোল্লা জোর পূর্বক ফজলকে জঙ্গকল্লা ও থানার লোকজন সহকারে তালাকের চাপ দিতে থাকে। মেয়েকে জানানো হয় ফজল তালাক দিয়েছে। ফড়ালকে জানানো হয় মেয়ে আর শ্বশুরবাড়ি যেতে চায়না। এরকম অবস্থায় ফজলকে মানসিক শারীরিক ভাবে শুধু গ্রাম্য দুর্বোধ্য অভিযোগে, মিথ্যা ষড়যন্ত্রে, প্রেম, আবেগ উচ্ছ্বাসের আশা, কামনা বাসনার বিরুদ্ধে কারারুদ্ধ করা হয়।

এখানে মুরুব্বী শ্রেণী তাদের ইচ্ছা অভিলাষ মেজাতা, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছে। কিন্তু তারা তাদের প্রেমকে জয়যুক্ত করেছে বিভিন্ন কৌশলে। চর প্রকৃতি ও মানবসমাজ, এ উপন্যাসে লেখক বিভিন্নভাবে দেখালেও তাদের সংস্কার নৃতাত্ত্বিক আবেগের বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে চরের ভাঙা গড়ার খেয়ালের মতই। মানবিক অবমূল্যায়নের প্রথাভিত্তিক এ ধারার অত্যন্ত চমৎকার সময় ও কালকে ধারণ করেছে ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসটি।

ঔপন্যাসিক চরের দখলের সাথে মানব সমাজের দুটি পর্যায়কে দেখিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে এক জেনারেশন অতি রক্ষণশীল ও অবিবেচক। নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে সমাজে বিচরণ করে। যে সময়ে বাবা, শ্বশুর, অন্যান্য মাতব্বর শ্রেণী তাদের বলপ্রয়োগ, অন্যায় মান সম্মান ও প্রতিপত্তির বিকাশ ঘটায়, খুন চর জমি দখল আগুন দলাদলির হারজিত এসব সর্বস্ব জেনে সিদ্ধ হস্তে লিপ্ত থাকে। আর একটি জেনারেশন মানোন্নয়ন রিচার রোধে মানবিক কামনা বাসনা সম্বদ্ধে ভাল ধারণা পোষণ করেন।

লেখক এ উপন্যাসে ইজ্জত, মান-সম্মান, পাপ-পুণ্যের বিচার ক্ষমা ন্যায়-অন্যায় চিন্তা চেতনার বিকাশ দেখিয়েছেন। দাম্পত্য সুখ লাভে বঞ্চিত ফজল শ্বশুরবাড়িতে এসে রূপজানের পরিবর্তে পরিত্যক্ত স্ত্রী জরিনা দেহের সুখ স্পর্শ লাভ করে। তার পরে আবার পাপের শান্তির জন্য অনুতপ্ত হয়।

জহুরুল্লার বাড়িতে আগুন দিতে গিয়ে ও ফজল নিষ্পাপ শিশুর কান্না, মাতৃস্নেহে বশীভূত হয়ে সবগুলি ঘরের শিকল খুলে দেয় এবং প্রতিজ্ঞা করে ‘প্রতিশোধ অবশ্যই নিতে হবে, কিন্তু কাপুরুষের মতো নয়। জরিনাকে তেমনি অনুশোচনা ও অনুতপ্ত হতে দেখি। যদিও স্বামীর অনুপস্থিতিতে জরিনা ফজলের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জন্ম দিয়েছে অবৈধ সন্তানের।

 

আবু ইসহাক

 

ফজলকে ধরে নেয়ার পর রূপজানের মনের অবস্থাও ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সে তার শ্বশুরবাড়িতে বাবা- মাকে না জানিয়ে গহনা পাঠিয়ে দেয়। যাদের সাথে সম্পর্ক নেই তাদের গহনা কেন থাকবে। রূপজানের এত বড় ত্যাগ ও উচ্চ মানসিকতার জন্য সে পাঠকহৃদয়ে অনেক বেশি সহানুভূতি পেয়েছে।

ফডল জেলখানায় গিয়ে অনেক কিছু জানতে পারে। আমাদের মানুষদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থান তার সাথে পরিচয় হয় স্বদেশী আন্দোলনের নেতাদের সাথে। সে কাগজ পড়ে তা থেকে জানতে পারে ‘সারা দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। দু’টি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে।

কংগ্রেস চায় অখণ্ড ভারত আর মুসলিম লীগ চায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলিমদের জন্য আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র পাকিস্তান। তার অজ্ঞতা আরও দূরীভূত হয় যখন সে স্বদেশীদের সাথে জেল থেকে পলায়ন করে। ফজলের জীবনাগ্রসরতা তার মুরুব্বীদের চেয়ে অনেক বেশি। ফজল শুদ্ধ, সত্য, সুন্দরকে অনেক বেশি জেনেছে তার গ্রাম্য চরাঞ্চলে থেকেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন অবস্থা থেকে দেশ বিভাগ পর্যন্ত নদী-মানুষ-মন-প্রকৃতি ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে আবহমান কালের বাস্তব সত্য উপন্যাসের জীবন প্যার্টানে বিবৃত।

উপন্যাসের জীবন পরিক্রমার রূপায়ণে আবু ইসহাক শেষের দিকে নাটকীয়তার আশ্রয় নিয়েছেন রূপজানকে উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে। সহজ সরল রেখার অঙ্কনে পরিবেশ, ভাষারীতির আঞ্চলিক জীবনবেদ পেয়েছে। এ উপন্যাস মহাকাব্যিক পটভূমিতে বর্ণনাভিত্তিক কাহিনীতে চিত্রিত হয়েছে ‘অন্তর্মুখী জীবন জিজ্ঞাসা আর বাঙময় জীবন সত্য, দু’টোকেই ধারণ করেছে পদ্মার পলিদ্বীপের সাধারণ সংগ্রামী চরিত্র ফজল, জরিনা, রূপজানরা। এতে উপন্যাস শিল্পময় রূপলাভ করেছে বহির্বাস্তবতার নৈতিক বিন্যাসে।

ঔপন্যাসিক শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ও নির্মম দ্রষ্টার দায়িত্বে শোষিতের জয় লাভে অংশ নিয়েছেন। এ উপন্যাস যে সময়ে রচিত তা তখন রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। ষাটের দশকে মানুষ সমাজতন্ত্র ও মার্কসীয় সত্যাদর্শে অনুপ্রেরণা লাভ করেছে কম। তাতে দ্বন্দ্ব সংঘাত সংঘর্ষের নিরাপত্তার অভাবও ছিল অনেক। কিন্তু আমাদের যুদ্ধোত্তর সমাজ পরিবেশে এখনও সাম্যকে মানুষ গ্রহণ করতে পারছেনা। গণতান্ত্রিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে প্রতি পদে পদে। কিন্তু ঔপন্যাসিক তাঁর আদর্শ মনোলোকে সত্য কল্যাণ ও সুন্দরকেই স্থান দিয়েছেন।

Leave a Comment