গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে রচিত ও প্রকাশিত উপন্যাসের নৈতিক বিবেচনার অন্তর্গত।

 

গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা

 

গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকেরা লেখনী ধারণ করেছেন স্বদেশের উপন্যাস-সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার প্রত্যয়ে। দেশ কালকে উপলক্ষ করে গণতান্ত্রিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধে ত্যাগ ও যৌক্তিক কর্মে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঔপন্যাসিকগণ সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশে উপন্যাসের প্লট, কাহিনী ও চরিত্র নির্মাণ করেছেন। সাহিত্য দেশ কাল নিয়ন্ত্রিত।

দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক দলগত ও জনগণের মানবিক মূল্যবোধের ভাঙা গড়া, সম্মিলন, সংঘাত-সংঘর্ষ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের মানস ছবি অংকিত হয়েছে তাই আমাদের যুদ্ধোত্তর উপন্যাসে। কালের দিক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্য চল্লিশ দশকের শেষার্ধ, এরপর পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, আশির দশক এবং বর্তমান পর্যন্ত বিস্তৃত। যদিও এর পটভূমিকায় রয়েছে হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য।

বাংলাদেশের সাহিত্যের পটভূমিকায় যে দেশ কাল রয়েছে তা বিবেচনা করলে পাওয়া যায় চল্লিশ দশকের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, নতুন রাষ্ট্র গঠন এবং ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। পঞ্চাশ দশকে ভাষা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, সামরিক শাসনের উদ্ভব। ষাটের দশকে স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মহাপ্রলয় ও নির্বাচন।

সত্তর দশকের সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব। এছাড়াও সত্তর দশক দুর্ভিক্ষ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সংঘাতে রক্তাক্ত। আশির দশকের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্যে আন্দোলন। মোটামুটিভাবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত আমাদের কেটেছে ঐসব তীব্র রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাবলীর টানাপোড়েনে.১

মুক্তি সংগ্রামের পর থেকে বাংলাদেশে সাহিত্যিক মূল্যবোধে পরিবর্তন এসেছে পর্যায়ক্রমিক রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে। ভাষা আন্দোলন ছিল জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠাকল্পে অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন। পূর্ব বাঙলার জনসাধারণ ১৯৭১ এ যুদ্ধ করেছে বিস্মৃত জাতিত্ব রক্ষার জন্য ও ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতা নিয়ে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি হীনমন্যতাবোধ, অতীতমুখিতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বাধা দ্রুত অতিক্রম করে। ১৯৫২ তে যেমন উঠে এসেছিলেন বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীরা।

১৯৭১-এ পরাস্ত হয়েছিল স্বতন্ত্র জাতীয়তাবোধ ওরকে দ্বিজাতিতত্ত্ব। পূর্ব পাকিস্তানের বিলুপ্তি ও বাংলাদেশের জন্ম তার প্রমাণ। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের শিক্ষাবিমুখতা, অনগ্রসরতা, মোল্লাতন্ত্র নির্ভরতা সেদিন এক কথায় অপসারিত হয়নি। বারবার জঙ্গী শাসকের অভ্যুত্থান তার প্রমাণ। বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় জঙ্গী বাহিনীর ভূমিকা অনিবার্য ও অত্যাবশ্যক, এমন একটা মনোভাব কিছুটা প্রকাশ্যেই প্রশ্রয় পেয়েছে। মৌল ইসলামবাদী চিন্তা ও উদার মানবতাবাদী চিন্তার মধ্যে গোজামিল ও দেখা গেছে।

 

গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা

 

বাংলাদেশের উপন্যাস হাজার বছরের কিংবদন্তীর রুপমের সঙ্গে জড়িত। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের মিলিত সৃজনশীল প্রয়াস। এখানে কোন একটা মাত্র সম্প্রদায় চিন্তাক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনি। সকলেই বিংশ শতাব্দীর শেষ সময়ে বাংলাদেশের উপন্যাসকে সমৃদ্ধির পথে ত্বরান্বিত করেছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ কাল সময়ে বাংলাদেশের সমাজ, শ্রেণীদ্বন্দ্বের আভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে প্রবহমান ছিল।

এই সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিক প্রবাহ ১৯৪৮ এ, ১৯৫২-এ জীবনের উপরিতলে আছড়ে পড়েছিল। গণজাগরণ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৯-এ। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দ্বান্দ্বিক বিকাশের প্রথম অঙ্কের যবনিকাপাত হল। আজ অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত আবশ্যক। ৩

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে আজ অবধি বাংলাদেশ সৃষ্টির অতীত রোমন্থনে ‘পল্লী ও নগর প্রতিবেশের বাস্তবতা নতুন রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তির প্রায়োগিক বাস্তবতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন, ইতিহাস চেতনা, সমাজতান্ত্রিক জীবনাদর্শের প্রভাবে, ব্যক্তি মনের রূপ রহস্য, যুগ সত্য ইত্যাদি বিচিত্র নিয়োবলী বাংলাদেশের উপন্যাসে রূপায়িত সামাজিক-অর্থনৈতিক জীবনের ক্রমপরিবর্তনের স্রোতধারায় এবং বিশ্বজীবন ও শিল্পসাধনার বিচিত্র প্রভাবে আমাদের উপন্যাস শিল্পীদের জীবন চেতনা ও সৃজন-দক্ষতার ক্রম অগ্রসরতার পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাস রূপরীতি এবং বিষয়: চেতনার ক্রম পরিণতির ছাপ ও স্পষ্ট হতে থাকে।”

 

গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতা ও স্বদেশান্বেষা

 

সুতরাং নৈতিক চেতনার অন্বেষণ ও শ্রেয়ের সন্ধানে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের উপন্যাস সমাজ বাস্তবতায় সচেতন বোধে, জীবন সংগ্রামের সংঘাত দ্বান্দ্বিকতায়, শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কতখানি সত্যসন্ধ ও যুযোপযোগী নীতিনিষ্ঠ তা বিচার্য বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশ তার সূচনা লগ্নে দীর্ঘদিনের পাকিস্তানী অধিবাসীর দ্বারা শোষণ নির্যাতনের ফলস্বরূপ আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।

১৯৭২-৯২ সময় পর্যন্ত এই দুই দশকে সরকারের প্রশাসন ব্যবস্থা বাংলাদেশের প্রারম্ভিক অবস্থা থেকে বিশ বছরে পৌচেছে। উপন্যাসে স্বাধীনতা উত্তর সামাজিক পচন, স্খলিত আদর্শ, মুক্তিযোদ্ধার চিন্তার বিকৃতি এবং নর-নারীর দেহজ প্রেম বর্ণনা করেছেন এবং আমাদের লেখক সম্প্রদায় এই শাসকদের শাসন আমলের স্থিরতা অস্থিরতা উত্তেজনা শান্তি শৃঙ্খলা, দলগত মতভেদ, দর্শন, নিষ্ঠা, নৈয়ায়িক শব্দকোষে উপন্যাসের ধারা বিবরণী ও গতির বিকাশ ঘটিয়েছেন।

আমাদের ঔপন্যাসিকদের উপন্যাসে এসেছে খান সেনাদের নিষ্ঠুরতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যন্ত্রণা, বীরত্ব সাহসীকতা, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, নৈতিক চিন্তাধারার স্থিরতা অন্বেষণ, অননবাচিত সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন, পশ্চাৎমুখীতা, ধর্মান্ততার বিরুদ্ধাচারণ করে প্রগতিশীলতা আনয়ন ও গণতন্ত্রের মুক্তি।

এছাড়া সংগ্রাম সচেতনতায় স্বৈরতান্ত্রিকতা পরিহার, স্বেচ্ছাচারনীতির পরিবর্তন ও নৈতিক দৃষ্টান্তের উন্মেষ।তাছাড়াও উপন্যাসের স্থানিক পটভূমিতে ঢাকা সহ বাংলাদেশের যে কোন এলাকার সংলাপ, প্রকরণ, পরিচর্যা, আচার-ব্যবহার ও বিষয়াবলীর নির্মাণ, ভাষারূপ পেয়েছে অভিনব মাত্রায়।

সুতরাং আমাদের বাংলাদেশের উপন্যাস বিষয়বস্তুর পটভূমিকায় কয়েকটি ভাগে বিবেচনা করা যেতে পারে। যেমনঃ গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতায় আঞ্চলিকতা: নাগরিক সমাজজীবনে মধ্যবিত্তের বোধন ও অস্তিত্ব অন্বেষণ; মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও স্বদেশান্বেষা; রাজনৈতিক চেতনা; ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উপন্যাস; মুক্তিযুদ্ধ অনুষঙ্গভিত্তিক উপন্যাস প্রভৃতি ।

Leave a Comment