আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরফ উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরফ উপন্যাস
‘হরফ’ (১৯৫৪) উপন্যাসটি লেখকদের জীবন নিয়ে লেখা। উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন লেখকের সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক জীবন, পাবলিশার্সদের মানসিকতা এবং একজন মানুষের ইচ্ছে শক্তির জোড়ে আস্তে আস্তে লেখক হয়ে ওঠা। উপন্যাসের শুরু হয়েছে এভাবে:
“কলম আর চলতে চায় না। ” (৯, পৃ-৪১৩)
বাক্যটি দিয়ে। মানব শিক্ষিত ভদ্র ঘরের ছেলে। লেখক হওয়ার কারণে তাকে আত্মীয় আপনজন ছাড়তে হয়েছে। সে বস্তিতে ঘরভাড়া করে থাকে। পেটের ক্ষুধায় তার কলম চলছে না। মানবের পাশের ঘরে থাকে ধনদাসের ছাপাখানার কম্পোজিটর কালাচাঁদ এবং তার পরিবার। কালাচাঁদের মেয়ে আত্তি মানবের যত্ন নেয়, ঘর ঝাড় দেয়, রান্নাবান্না করে দেয়। এতে আত্তির মা ক্ষুব্ধ হয়। আত্তি সকলের মুখ বন্ধ করার জন্য বলে সে টাকার বিনিময়ে কাজ করে। কালাচাঁদের লেখক হওয়ার শখ, সে মানবের কাছে লেখা শেখে। লেখক উমাকান্ত মানবের পরিচিত।

উমাকান্তের স্ত্রী অসুস্থ। সে একটি অসমাপ্ত উপন্যাস নিয়ে আসে ধনদাসের কাছে। ধনদাস সুযোগ বুঝে দু শ টাকায় কপিরাইট কিনে নিতে চায়। মানব, খালেক আর ধনদাসের মাসিক পত্রিকা রসসাহিত্যের সম্পাদক মহেশ অন্য কোথাও চেষ্টা করতে বলে। মানব আর খালেকও টাকা জোগার করে উমাকান্তের বাড়ি যায়।
উমাকান্ত কোথাও টাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে আবার ধনদাসের কাছে আসে। ধনদাস মাত্র দেড় শ টাকায় কপিরাইটটি কিনে নেয়। সে বাড়ি গিয়ে দেখে পুতুল মারা গেছে। উমাকান্ত ধনদাসকে খুন করতে চায়। সকলে তাকে ধৈর্য ধরতে বলে। উমাকান্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। মহেশের বড় মেয়ে চন্দ্রার বিয়ে হয় নব্য কবি জহরের সঙ্গে।
তারা দুজন মনে মনে নিজেদের ব্যক্তিত্ব দেখানোর জন্য কেউ কারো কাছে ধরা দেয় না। চন্দ্রা প্রায় এক বছর বাবার বাড়ি এসে থাকে। তখন মানব এবং লেখক অপর্ণার মধ্যস্থতায় তাদের মিলন হয়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে মানবের গল্প আর খালেকের কবিতা রসসাহিত্যে ছাপানোর অপরাধে মহেশের চাকরি চলে যায়। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উমাকান্ত রসসাহিত্যের সম্পাদক পদে আসে। কিন্তু পত্রিকাটি আগের চেয়ে বিক্রি বেড়ে যায়, বিজ্ঞাপনও বাড়ে। এতে কালাচাঁদ ক্ষুব্ধ হয়।
কালাচাঁদের বউয়ের বসন্ত হলে ধনদাস কালাচাদকে একমাসের ছুটি দেয়। চিকিৎসার অভাবে কালাচাঁদের বউ মারা যায়। কালাচাঁদ ধনদাসের ওপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। সে একটি গল্প লেখে ‘হরফ’। এতে পরোক্ষভাবে ধনদাসের কুকীর্তির কথা আছে। মহেশ আর জহর মিলে একটি মাসিক পত্রিকা শুরু করে। কালাচাঁদের গল্পের নামটি মহেশের পছন্দ হয়।

সে পত্রিকার নাম দেয় ‘হরফ’। গল্পটিও প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। এরপর কালাচাদ ‘হরফ’ নামে আরো একটি গল্প লেখে। এ সব ধনদাসের নজরে পরে কিন্তু কিছু বলতে পারে না। সে উমাকান্তকে লাভের শেয়ার দিয়ে রসসাহিত্যের আরো উন্নতি করতে বলে। এবার কালাচাদ প্রেসের অন্য সকলের সঙ্গে একজোট হয়ে রসপত্রিকায়ই ধনদাস আর তার পূর্বপুরুষদের সকল কুকীর্তি ছেপে দেয়।
ধনদাসের সন্ন্যাসী বাবা এসে ধনদাসকে ধমকায়। ধনদাস কালাচাদকে জেলে পাঠায়। মানব আন্তিকে বিয়ের ইঙ্গিত দেয়। মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত যুবক আর বস্তির নিম্নবিত্ত অশিক্ষিত আত্তির বিয়ের ইঙ্গিতে উপন্যাস শেষ হয়েছে।
উপন্যাসে লেখক পরিস্থিতির কাছে মানুষের অসহায়তা এবং তাদের জীবন সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন।