আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাধীনতার স্বাদ উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাধীনতার স্বাদ উপন্যাস
হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ (১৯৫১) উপন্যাসটি লেখা। একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো পরিবারের বেঁচে থাকা এবং তাদের সূত্র ধরে আরো কিছু হিন্দু-মুসলিম মানুষের জীবন লেখক এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন।
উপন্যাসের শুরু হয়েছে গা ছমছম করা কারফিউ নগরীর বর্ণনা দিয়ে। মণিমালার মামা প্রমথ মধ্যভারত থেকে এসেছে মণিমালাদের উদ্ধার করে সরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু গলির মুখেই তাকে প্রাণ দিতে হলো। সাথে ছিল মণিমালার স্বামী সুশীলের ভাই প্রণব। প্রণব রাজনীতি করে বলে তাকে এড়িয়ে সুশীল সপরিবারে বাড়ি ছেড়ে আলাদা পাড়ায় এসেছে। শহরের এমন অবস্থায় প্রণব আবার সুশীলদের নিয়ে বাড়ি ফিরলো।

প্রণবদের বাড়িতে অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। মণিদের একটি ঘর ছেড়ে দিলো আগে সেখানে ছিল ইংরেজি দৈনিকের সহকারী সম্পাদক গিরিন ও তার স্ত্রী নীলিমা। তারা ছাদের উপর একটি চালা ঘর তুলে নেয়। প্রতি রাতে প্রণবদের ছাদে মিটিং বসে। সর্ব বয়সের সর্ব শ্রেণির মানুষ এখানে বক্তৃতা দেয়। মণি ঠিক সে সব কথা বুঝতে পারে না। নিজের ওপর অভিমান হয়। বাড়িতে একদিন চাল ছিল না, মণি সুশীলকে তার বন্ধু চোরাকারবারি যতীনের কাছে পাঠায়। কিন্তু বাড়ির লোকেরা এভাবে চাল পেয়ে খুশি হয় না । তাদের কাছে আদর্শ অনেক বড়।
অন্যদিকে গিরিনের বন্ধু কবি মনসুর কবিতা দিতে গিয়ে মার খায়। গিরিন তাকে হাসপাতালে নেয়। তবু মনসুর আর তার স্ত্রী রৌশন হিন্দুদের গালমন্দ করে। পাড়ার মুসলমান খুঁটে বিক্রি করা বুড়ি একদিন খুন হয়। তার ছেলে তাকে দেখতে এলে ছেলেটির ওপরও নামে পাশবিক অত্যাচার। এভাবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করে। দুধের অভাবে ছেলে মারা গেলেও সেই মৃত ছেলে নিয়ে রাজনীতি করে রাজনীতিকরা। আস্তে আস্তে মণি আর তার ছেলেমেয়েদের মধ্যে আদর্শ ঢুকে পড়ে।

অন্যদিকে সুশীল যতীনের সঙ্গে মিশে চোরাকারবারি হয়ে যায়। মণি এতে বাধা দেয় কিন্তু সুশীল মানে না। সে আলাদা ফ্লাটে গিয়ে ওঠে। সুশীল মণির গহনাসহ সবকিছু নিয়ে যতীনের সঙ্গে যোগ দেয়। আর মণির আদর্শের জন্য সুশীলের সঙ্গে মণির সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। এদিকে দেশভাগের দিন ঠিক হয়, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঝিমিয়ে পরে।
অন্যদিকে যতীন সুশীলকে সর্বস্বান্ত করে জেলে পাঠায়। সুশীল আবার আদর্শ জীবনে ফিরে আসবে প্রত্যয়ে মণি প্রণবরা সুশীলকে আনতে যায়:
“এমনি করে মানিক রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার তাৎপর্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, পারিবারিক ও ব্যক্তিজীবনে কী দ্রুত পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে তার সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেন।”

লেখক সর্বদাই সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। মানিক এ উপন্যাসে সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন।