মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস

‘পেশা’ (১৯৫১) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি পেশার প্রতি দায়বদ্ধতামূলক উপন্যাস। উপন্যাসে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে কেদারের ডাক্তার হওয়া এবং আত্ম আবিষ্কারের মাধ্যমে সামাজিক প্রলোভনকে জয় করা দেখানো হয়েছে:

“কতগুলো পরিচিত চরিত্রের সান্নিধ্যে ডাক্তারি পেশা সম্বন্ধে কেদারের প্রতিক্রিয়াই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। ১৪

উপন্যাসের শুরু হয়েছে কেদারের ডাক্তারি পাশের খবরের উৎকণ্ঠা দিয়ে। ডা. সান্ন্যালের মাধ্যমে রেজাল্ট বের হওয়ার কয়েকদিন আগেই কেনার রেজাল্ট জানতে যাবে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তাকে নিয়ে সবারই আশা-ভরসা। কেদারের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পালের মেয়ে গীতার সঙ্গে কেদারের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। পাস করার পর সে ডা. পালের খরচে বিলেত যাবে বড় ডাক্তার হতে। কেদার পাসের খবর জেনে ডা. পালের বাড়িতে যায় খবরটা জানাতে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস

 

বাড়িতে ডা. পাল নেই, গীতার কথায় ডা. পালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে কেদার। এদিকে তার বাড়িতে সবাই উৎকণ্ঠিত। তার বাবা অফিসে যাওয়া বাদ দিয়ে ছেলের রেজাল্টের খবরের জন্য বসে আছে, ববর শুনে সে অফিসে যাবে। মা বারবার রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে, বাবাকে তাগাদা দিচ্ছে নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে।

একসময় মা শুভময়ী অসুস্থ হয়ে পড়ে। মোড় থেকে হর্ষ ডাক্তারকে ডাকা হয়। ডাক্তার আসার আগেই কেনার বাড়ি ফেরে। মাকে দেখে তার মুখ শুকিয়ে যায়। ডাক্তার এসে তার ব্লাডপ্রেসার নেয়। হাই ব্লাডপ্রেসার। বাবা এক ফাঁকে তাকে পাসের খবর জিজ্ঞেস করে, সে ভালোভাবে পাস করেছে জানায়। কিন্তু সে চিন্তিত হয়।

“মনে মনে কেদার বলে, তার পাস করাই উচিত হয়নি। নিজের বাড়িতে নিজের মা যার চোখের সামনে চব্বিশ ঘণ্টা এমন মারাত্মক রোগ শরীরে বয়ে বেড়িয়ে আজ মরতে বসেছে, তার অধিকার নেই পরীক্ষায় পাস করে ডাক্তার হওয়ার।” (৭খ, পৃ- ১৯)

শুভময়ী মারা যায়। কেদার ডা. পালকে মতামত জানাতে সময় নেয়। এ দিকে সে ডা. হর্ষের চেম্বারে নিয়মিত যাতায়াত করে, গরিব দুস্থ রোগীদের দেখে। ভেতরে ভেতরে মর্মাহত হয় দেশের করুণ দশা দেখে। ডা. হর্ষ তার মেয়ে জ্যোতির সঙ্গে কেদারের বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু জ্যোতি ভালোবাসে কেদারদের দোতলার ভাড়াটে কবিরাজ পরিমলকে। জ্যোতি পরিমলকে বিয়ে করে। ছেলে হতে গিয়ে জ্যোতি মারা যায়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পেশা উপন্যাস

 

সমাজ বাস্তবতা দেখে ডাক্তারি পেশা সম্পর্কে কেদারের সংশয় জাগে। সে চিন্তা করে যে বিলেতে সে বড় ডাক্তার হতে যেতে চায়, সেই বিলেত তার দেশকে টোটকা আর মাদুলির চিকিৎসার স্তরে নামিয়ে রেখেছে। তার পর সে সিদ্ধান্ত নেয়। গরিব-দুঃখীর চিকিৎসা করার জন্য সে অবশ্যই অনেক বড় ডাক্তার হবে, কিন্তু বিলেত যাবে না, রাশিয়া বা চীনে যাবে। গীতাকে এ সিদ্ধান্ত জানালে গীতাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারা দুজন একই মতে স্থির হয়।

“ কেদার বলে, আমি ভাবতাম যেটুকু শিখেছি এই পিছানো গরিব দেশে তাই নিয়ে কাজে নামাই যথেষ্ট। কিন্তু দেখছি আমার ভুল হয়েছিল। আমি যা করতে চাই তার জন্য যত শেখার আছে আমাকে শিখতে হবে। পিছানো দেশ বলে শিক্ষাতেও পিছিয়ে থাকলে আমার চলবে না। গীতার মুখে হাসি ফোটে।” (৭খ, পৃ-১০৭)

উপন্যাসটি শেষ হয়েছে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের ইঙ্গিত দিয়ে। লেখক ‘পেশা’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন ডাক্তারদের সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে।

Leave a Comment