মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

দেশবিভাগের পর বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু আসার পটভূমিতে ‘সার্বজনীন’ (১৯৫২) উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতে ‘লেখকের কথা’য় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন,

“সমাজ জীবনে ভাঙন ধরার সঙ্গে গড়ন চলাও থাকবেই।” (৮খ, পৃ-২৮৫)

দলে দলে ট্রেনে চেপে উদ্বাস্তুরা কলকাতায় এলো, এরা স্টেশনেই প্রতারণার শিকার হয়, আবার ভলেন্টিয়ার অনেককে রক্ষা করে এভাবে উদ্বাস্তু ঢোকে পশ্চিমবঙ্গে। লেখক এ উপন্যাসে সদানন্দ পুরুষ পরমেশ্বরের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জীবন থেকে সংসারের ফ্রেমে বন্দি হয়ে চাকরি করা দেখিয়েছেন।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

 

পরমেশ্বরের বাড়ি পূর্ববঙ্গে। সে লেখাপড়া করতে কলকাতা এসে বিবাবুর বাড়ি ভাড়া নেয় এবং নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করে। বাড়িতে সে যায় না, তার মতে বাড়িতে আনন্দ নেই—সেখানে সকলে দুঃখের সেবা করে। বিয়ে করে না, লোভ লালসা নেই, নারীতেও মজে না। সব নারী তার কাছে মা-বোন। এই সময় দেশ ভাগ হয়। তার ছোট ভাই মহেশ্বর পূর্ববঙ্গের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কম দামে বিক্রি করে দিয়ে সপরিবারে কলকাতা চলে আসে।

কলকাতায় পরমেশ্বর বিধুবাবুর বাড়িটি কিনে নেয়। সকলে এসে এ বাড়িতে ওঠে। ট্রেনে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় সবিতাদের সঙ্গে। সবিতা ছেলে সেজে মা আর ছোটবোনকে নিয়ে কলকাতা আসছিল। সবিতারা কলকাতায় তাদের কাকার বাড়ি উঠতে যায়, কিন্তু সেখানে আগেই উঠে গেছে অনেকে, জায়গা নেই। তাই তারা বাধ্য হয়ে মহেশ্বরদের একটি ঘর ভাড়া নেয়। সবিতা শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরে।

ফসল ফলিয়ে, জিনিস বানিয়ে, গান গেয়ে, ফেরি করে জিনিস বিক্রি করে। মহেশ্বরের বড় মেয়ে সুরমার সঙ্গে বিধুবাবুর ছেলে সমীরের বিয়ে হয়। সমীর রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য তিনশ টাকা বেতনের চাকরি ছেড়ে শ্বশুরের টাকায় ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু ব্যবসায় সফল হয় না। মহেশ্বরের টাকা ফুরিয়ে আসে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

 

পরমেশ্বরও নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে কোনো পরামর্শ দেয় না। তাদের সাতপুরুষের দুর্গা পুজা বাড়িতে হতো, কলকাতাতেও সে পূজা অব্যাহত ছিল। সমীরের জন্য তাদের অবস্থা খারাপ হতে থাকে গহনাও শেষ হয়। অবশেষে পুজাও বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরমেশ্বরের পরামর্শে তাদের সাত পুরুষের পূজাটি ভদ্রপাড়ার বস্তির এবং উদ্বাস্তু কলোনির সার্বজনীন পূজায় পরিণত হয়।

এদিকে সমীরও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তারপর শিয়ালদহের উদ্বাস্তুদের বাঁচার লড়াই দেখে হতাশাকে জয় করে। চিরকুমার, চিরসুখী, সংসার বিবাগী পরমেশ্বরের এবার সংসারের দিকে মন দিতে হয়। বাড়ির দোতলাটি ভাড়া দেবার ব্যবস্থা করে, নিজে চাকরি নেয়, আর ঘরের বারতি আসবাব নিলামে তোলে। মহেশ্বরের জন্যও সে চাকরির চেষ্টা চালাচ্ছে। সে বলে:

“কী ছিলাম, কেমন ছিলাম- ভেবে আর লাভ নেই।” (৮খ, পৃ-৪০৮) অন্যদিকে মহেশ্বরের ছেলে সাধন গান লেখে, সবিতা সেই গান গায়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সার্বজনীন উপন্যাস

 

“আনন্দের মূল্য আছে, কিন্তু শুধু গান শুনিয়ে, তারা রোজগার করছে না। সাধন বিক্রি করছে জুতোর সোল, সবিতা কীসের মোড়ক।” (৮খ, পৃ-৪০৯)

আবুল খায়ের মো: আশরাফউদ্দিন বলেছেন:

“এই উপন্যাসে উদ্বাস্তু সমস্যায় আক্রান্ত কতিপয় মানুষের সাহায্যে লেখক প্রধানতঃ শ্রেণী বিভক্ত সমাজের স্বরূপ অঙ্কন করেন। জীবন সম্পর্কিত বক্তব্যের প্রকাশভূমি হয়ে ওঠে এই উপন্যাসের মানুষগুলো। ২১

জীবনে যত বিপর্যয়ই আসুক মানুষ বাঁচবার পথ বের করে নেয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সার্বজনীন’ উপন্যাসে মানুষের জয়যাত্রাকেই দেখিয়েছেন।

Leave a Comment