আজকে আমরা বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের সূচীপত্র আলোচনা করবো।

বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের সূচীপত্র
আমার এম.ফিল. অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ‘বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার (১৯৪৭-১৯৭১’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর তত্ত্বাবধানে আমি এ অভিসন্দর্ভ রচনা করি।
১৯৯৫-১৯৯৬ শিক্ষাবর্ষে আমি এম. ফিল. কোর্সে নিবন্ধন লাভ করি এবং বাংলা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন-এর কাছে এম.ফিল. প্রথম পর্বের কোর্সসমূহ অধ্যয়ন করি।
১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসেলন ফিল, প্রথম পর্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি অভিসন্দর্ভ রচনায় মনোনিবেশ করি। ব্যক্তিগত জীবনে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই আমি এই অভিসন্দর্ভ পরীক্ষার জন্য উপস্থাপন করছি।
বর্তমান অভিসন্দর্ভের সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপরেখা নির্মাণে আমার গবেষণা-তত্ত্ববধায়ক ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর নিরন্তর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা, অনাবিল আন্তরিকতা, সুচিন্তিত পরামর্শ ও প্রাজ্ঞ নির্দেশনা আমার গবেষণা কর্মকে অনেক সহজসাধ্য করে দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর স্নেহে ধন্য তাঁর কাছে অপরিশোধ্য ঋণে আবদ্ধ।

গবেষণা-কালে নানা পর্যায়ে প্রাজ্ঞ পরামর্শ ও মূল্যবান অভিমত দিয়ে প্রফেসর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, প্রফেসর আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, প্রফেসর সৈয়দ আকরম হোসেন, ডক্টর ভীষ্মদেব চৌধুরী, ডক্টর রফিকউল্লাহ খান প্রমুখ আমাকে গভীর কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন।
বাংলা একাডেমীর পরিচালক সুব্রত বড়ুয়া, সেলিনা হোসেন ও উপপরিচালক ফরহাদ খান এবং আমার বড় ভাই মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর-এর আন্তরিকতা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ এ-প্রসঙ্গে আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। আমার গবেষণা জীবনের সূতিকাগার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর মনিরুজ্জামান, ডক্টর ভূঁইয়া ইকবাল, ডক্টর শাহজাহান মনির, ডক্টর ময়ূখ চৌধুরী প্রমুখের স্নেহময় সান্নিধ্য ও আন্তরিক অনুপ্রেরণার কথাও আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।
গবেষণা -কালে আমি প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্থাগার এবং বাংলা একাডেমী গ্রন্থাগার ব্যাবহার করেছি। এ সূত্রে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

সূচীপত্র
বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচারের অবতরণিকা
প্রথম অধ্যায়
মহাকাব্য শিল্পশৈলীর উপন্যাস
ক. সংশপ্তক উপন্যাস
খ. ক্ষুধা ও আশা
দ্বিতীয় অধ্যায়
চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস
ক. চাঁদের অমাবস্যা
খ. কাঁদো নদী কাঁদো
তৃতীয় অধ্যায়
মিথ-ইতিহাস-ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নধর্মী নতুন শিল্পশৈলীর উপন্যাস
ক. ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান
খ. অভিশপ্ত নগরী
গ. পাপের সন্তান
চতুর্থ অধ্যায়
রূপক-প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস
ক. ক্রীতদাসের হাসি
খ. রাজা উপাখ্যান
গ. সমাগম উপন্যাস
পঞ্চম অধ্যায়
আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী
ক. সারেং বৌ উপন্যাস
খ. কর্ণফুলী উপন্যাস
উপসংহার
‘বাংলাদেশের উপন্যাস’ কথাটির মধ্যে ভুখক্তগত একটি পরিচয়ের ইঙ্গিত বর্তমান। উনিশ’শ সাতচল্লিশ সালে দেশ- বিভাগের পর বাংলাদেশের উপন্যাসের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ কাল- পরিসরে রচিত বাংলাদেশের উপন্যাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, আমাদের ঔপন্যাসিকরা বিষয়ের প্রতি যতটা আগ্রহী, ফর্ম বা প্রকরণ-পরিচর্যায় ততটা যত্নশীল নন।
আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক – সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেই পরিবর্তনকে আমাদের ঔপন্যাসিকরা নিজেদের রচনা ধারণ করলেও, তা আধুনিক ফর্মচেতনা দ্বারা কদ্ধ নয়। প্রবীণরা যেমন প্রথাগত আঙ্গিকে উপন্যাস রচনায় আরামবোধ করেছেন, তেমনি নবীন-প্রবংশের অধিকাংশ ঔপন্যাসিকই পূর্বসূরীদের পথ অবলীলায় অনুসরণ করেছেন।

এক্ষেত্রে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হচ্ছেন শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল্লা কায়সার, সত্যেন সেন,আবু জাফর শামসুদ্দীন এবং আলাউদ্দিন আল আজাদ। প্রধানত এই সব ঔপন্যাসিকের সাধনায় বাংলাদেশের উপন্যাসে আধুনিক প্রকরণ-শৈলী সূত্রপাত হয়।
প্লটবিন্যাসে কার্যকারণ-সূত্র, চরিত্রায়ণ, সময়-ধারণা, প্রকরণ-পরিচর্যা, দৃষ্টিকোণ-নির্বাচন, ভাষা ব্যবহার বাক্যগঠন- শৈলী-এসব বিষয় উপন্যাসের শৈলীবিচারের প্রধান প্রধান দিক। বাংলাদেশের অতি অল্পসংখ্যক উপন্যাসকে আমরা শৈলীবিচারের এই দৃষ্টিকোণের বিবেচনায় আনতে পেরেছি।
শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ক্ষুধা ও আশা’ উপন্যাসে মহাকাব্যিক ক্যানভাসে বাংলাদেশের সংগ্রাম আর স্বপ্নের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। সমাজবিকাশের বিশ্বস্ত দলিল হিসেবে মহাকাব্যিক এই উপন্যাসময় আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বল সম্পদ। চেতনাপ্রবাহ শিল্পশৈলীর উপন্যাস অপেক্ষাকৃত আধুনিক এবং এ শিল্পধারার নিঃসঙ্গ যাত্রী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। ফর্মনিষ্ঠা ও প্রকরণ-পরিচর্যায় তাঁর উপন্যাস সমগ্র বাংলা উপন্যাসের ধারাতেই স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী।
শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’, ‘রাজা উপাখ্যান’ এবং ‘সমাগম’ উপন্যাসে রূপক-প্রতীক শিল্পশৈলীর আধারে বাঙালির সংগ্রামশীল চেতনার দ্রোহ ও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আধারে আত্ম-অনুসন্ধান এবং পুরাণের সময়গর্ভে সুপ্ত সম্ভাবনার বীজকে সমকালের প্রেক্ষাপটে নতুন করে নির্মাণ করেছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন এবং সত্যেন সেন। ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’-এর মধ্যে যেমন: আমাদের জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে, তেমনি মিথ অঙ্গীকারে সমকালীন জীবন সংগ্রাম কল্লোলিত হয়েছে ‘অভিশপ্ত নগরী’ এবং ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসে। আঞ্চলিক জীবনরূপায়ণ মূলক শিল্পশৈলীর সার্থক উদাহরণ হিসেবে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সারেং বৌ’ এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘কর্ণফুলী’ আলোচ্য কালপর্বের শ্রেষ্ট সৃষ্টি ।

বস্তুত, বাংলাদেশের উল্লিখিত ঔপন্যাসিকবৃন্দ বিভাগোত্তরকালে ফর্ম নিষ্ঠা ও প্রকরণ-পরিচর্যার যে স্বাক্ষর রেখেছেন, তা বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যে অনন্য। আলোচ্য কালপর্বের এই ঔপন্যাসিকদের জীবনজিজ্ঞাসা আধুনিক আঙ্গিকচেতনায় সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল। শৈলী- -স্বাতন্ত্র্যে এই সব ঔপন্যাসিক তাঁদের সাধনা দিয়ে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রবংশের ঔপন্যাসিকদের ফর্ম-নিরীক্ষায় গভীরভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন।
বস্তুত, তাঁদের সাধনার সরণী বেয়েই বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের মাঝে ক্রমে সঞ্চারিত হয়েছে আধুনিক ফর্মচেতনা।