মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

‘শুভাশুভ ‘ (১৯৫৪) উপন্যাসটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কেন্দ্র করে লেখা। উপন্যাসের শুরু হয়েছে এভাবে:

“বিলাতী কোম্পানিগুলি রাতারাতি ভোল পাল্টে ভারতীয় কোম্পানি বনে যাবার পর থেকেই যেন কেবলি তারা পা পিছলে পিছলে আছাড় খাচ্ছে ক্রমাগত। ” (১০খ, পৃ- (১৫)

এরকম একজন ব্যবসায়ী সমরেশ। তার যুবক বয়স, ব্যবসা সামলাতে গিয়ে শরীর এবং মন দুই-ই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তার বাবা মহিম বড় ব্যবসায়ী ছিল। মহিমের আমল থেকেই ভাঙনের শুরু হয়েছে, মহিমের মৃত্যুর পর মহিমের বিশ্বস্ত কর্মচারী বনমালী কারবার দেখছে, তাকে অনেক দেনা করতে হয়েছে। সমরেশের মামা ভবানী এখন বড় ব্যবসায়ী। সে মহিমের শাসনে তাদের ক্যাশ বাক্স ভেঙ্গে শ তিনেক টাকা নিয়ে চলে গিয়েছিল।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

 

সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা করে সে এখন মঞ্চ ব্যবসায়ী। ভবানী আর বোনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি। কিন্তু সমরেশদের পরিবারের এখন সেই ভবানীই একমাত্র ভরসা। ভবানীর স্ত্রী সরমা অসুস্থ, সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। বনমালীর অনুরোধে সমরেশ সরমাকে গিয়ে ধরে কার্য উদ্ধারের জন্য। সরমার কথায় ভবানী সমরেশের কারবার দেখতে যায়, এর বেহাল অবস্থা দেখে ব্যবসা বন্ধ করতে বলে, তার নিজের মাদ্রাজের ব্রাঞ্চে সমরেশকে বসতে বলে, বনমালীও সেখানে যাবে। কিন্তু বনমালী এতে রাজি হয় না ।

বনমালী অপেক্ষা করছে আরো একটি যুদ্ধের। বনমালীর মৃত্যুর পর ব্যবসার অবস্থা আরো খারাপ হয়। এদিকে সংসারটিও অনেক বড়। মা, কয়েকটি বোন, মাসি পিসি, তাদের পরিবার মিলে বহু লোকের দায় সমরেশের ঘাড়ে। সমরেশ আবার সরমার কাছে যায়। অসুস্থ সরমার সে দিনই মৃত্যু হয়।

সমরেশের বন্ধু কুমার আর বান্ধবী নন্দিতা। নন্দিতা সমরেশের চেয়ে বয়সে বড়, অতি আধুনিক বই লেখে। কিন্তু তার সংসারের অবস্থাও ভালো না। টাকার জন্য সে ভবানীকে বিয়ে করে। ভবানী তার বাধ্য হয়ে যায়। নন্দিতা আগের মতো স্বাধীন থাকে। ভবানী নন্দিতার বই বের করে। নন্দিতার কথায় ভবানী আবার সমরেশের কারবার দেখতে যায়। তারপর সমরেশকে সে পরামর্শ দেয়।

“দিন সাতেক পরে সকাল বেলা সমরেশকে বাড়িতে ডেকে নন্দিতার সামনে ভবানী তাকে বলে, কারবারের সঙ্গে বাড়িটাও যেত, অনেক চেষ্টা করে বাড়িটাকে বাঁচাবার ব্যবস্থা ঠিক করেছি। কারবার ছেড়ে দাও। আমি সামলে সুনলে মিটিয়ে দেব।” (১০খ, পৃ-৬৭)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

 

সমরেশদের বাড়িটি বেঁচে যায়। সংসারের বড় খারাপ অবস্থা। তার মা সজ্জা নিয়েছে, স্বামী পরিত্যক্তা বোন প্রীতি ধরেছে সংসারের হাল। এই অবস্থায় প্রীতি তার স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ আদায় করে। নন্দিতা নিয়মিত এ বাড়িতে আসে এটা কেউ পছন্দ করে না। কুমারের বোন সুমিত্রা সমরেশকে ভালোবাসে, সুমিত্রাকে বাড়ির লোকেরাও পছন্দ করে।

এদিকে নন্দিতা ভবানীর সংসারে হাঁপিয়ে ওঠে, সে ভবানীকে কিছু না করে পাটনা চলে যায়। ব্যাপার বুঝতে কুমার সমরেশের সঙ্গে ভবানীর বাড়ি যায়। নন্দিতাকে বাগে আনতে সরমার বোন অণিমাকে বিয়ে করে ভবানী। অণিমার কথায় ভবানী সমরেশকে প্রেস করে দেয়, আর প্রেসে কুমারকে চাকরি দেয়। সমরেশের অবস্থা ফেরে। নন্দিতা ফিরে এসে বাবার বাড়ি ওঠে।

প্রেসের উন্নতি না হওয়ায় সমরেশ বাড়িতে খাওয়ার সমারোহ বন্ধ করতে বলে, এতে প্রীতির সঙ্গে ঝগড়া হয়। প্রীতি নন্দিতাদের বাড়ি ওঠে। এদিকে ভবানীও প্রেস বন্ধ করতে চায়। কিন্তু সমরেশ নিজের মতো চালানোর জন্য ছয় মাস সময় নেয়। সে ঘরে বাইরে কঠোর হয়ে ওঠে। তার প্রেসে লাভ হয়।

কুমারকে ভবানী অন্য জায়গায় চাকরি দেয়। এদিকে ভবানীর অত্যাচারে অণিমা মদ ধরে, আর টাকা না দেওয়ার কারণে নন্দিতাও ভবানীর বাড়ি এসে থাকে। একের পর এক নন্দিতার বই বের হয়। সমরেশ এবার স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শুভাশুভ উপন্যাস

 

সে তরুণ লেখকদের বই বের করে, যা ভবানীদের সরাসরি বিরুদ্ধে যায়। সে ভবানীর বাড়িতে খেতে বসে ভবানীকে বলেঃ

“আমি নিজের বিচার বুদ্ধি অনুসারে কারবার চালিয়েছি, তোমার নাম জড়িয়ে আমার কোনো লাভ আছে? তোমার নাম এড়িয়ে চললেই বরং আমার মঙ্গল।” (১০খ, পৃ- ১৩৪)

ভবানীর সঙ্গে সমরেশের আপোস হয়ে যায়।

অন্যদিকে সুমিত্রাকে একটি চাকরি জোগাড় করে দেয় সমরেশ। সকলেরই স্বপ্ন পূরণের আশায় উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে অর্থনৈতিক কারণে পারিবারিক ভাঙন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন।

Leave a Comment