মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে রচিত ও প্রকাশিত উপন্যাসের নৈতিক বিবেচনার অন্তর্গত।

 

মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা

 

মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা

স্বাজাত্য সন্ধানী বাঙালি আবহমান কাল ধরে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন ও বিচিত্র সংকটময় মুহূর্তকে উত্তীর্ণ করে ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আদর্শ ও মূল্যবোধের ক্রম অপসৃয়মানতা রাষ্ট্রের স্নায়ুকেন্দ্রে। সেনাতন্ত্র ও ধর্মান্ধতার পুনরুজ্জীবন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাফল্যের অপব্যাখ্যা সংবেদনশীল শিল্পী চৈতন্যকে গভীর দ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষরণের মধ্যে নিক্ষেপ করে।

রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একাত্তরে মীমাংসিত প্রসঙ্গসমূহের পুনরাবির্ভাব ঘটে জাতীয় জীবনে উনিশ শতকের প্রারম্ভ থেকেই শুরু হয়েছিল পারিবারিক সামাজিক উপন্যাস রচনায় সৃষ্টির চেয়ে, সত্য ও কল্পনার সংমিশ্রনে ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার প্রাধান্য, অতীত ঐতিহ্য জিজ্ঞাসায়।

ভারত উপমহাদেশের রাজত্ব লাভে বৈদেশিক আক্রমণ অব্যাহত ভাবে, একেক সময়ের বিজিত শাসক ও পরাজিত শাসকের কাহিনীই ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ধারণানুক্রম যুগিয়েছে। এসব শাসকদের যুদ্ধ রাজ্য জয় আক্রমণ পর্যায় ক্রমে এসেছে।

 

মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা

 

ঐতিহাসিক আক্রমণে এসেছে শক, হুন, চর্যাপদের কাল। আইয়ামে জাহেলিয়াত, ইসলাম প্রতিষ্ঠাকাল, পাল ও সেন বংশের রাজত্ব কৈবর্ত বিদ্রোহ, মোঘল-রাজপুত কাহিনী, টডের রাজস্থান মহারাষ্ট্র উত্থান, পাঠান মারাঠী কাহিনী বিন্যাস, নবাব শাসনামল, বাংলার জমিদার শ্রেণীর শাসনামল, বারভূঁইয়াদের শাসনামল, ইংরেজ রাজত্ব ও তাদের অত্যাচার, নীলচাষ, তাদের থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগ।

পরবর্তীতে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা পূর্ব কালে কলোনি-শোষণ ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ হিসেবে মিথ ঐতিহ্য ও ইতিহাস অবলম্বী রূপক ও প্রতীকী উপন্যাসের উদ্ভব ঘটে। আধুনিক উপন্যাসের এ এক মননশীল প্রকরণ। এর শিকড় সংলগ্ন থাকে সংগ্রামী সভ্যতার সময় গর্ভে। মিথ-ঐতিহ্য ও ইতিহাস এ ক্ষেত্রে উপন্যাসের উপকরণ মাত্র নয়, বরং বিষয় বা author’s attitude towards life. লোক পুরাণের ফিনিক্স পাখি যেমন নিজের ছাই থেকে নতুন দেহ নিয়ে জেগে ওঠে তেমনি মৃত ইতিহাস থেকে জেগে ওঠে আর এক ইতিহাস।

স্বাধীনতা পরবর্তী কালে মিথ ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এ রূপক প্রতীকী প্রকরণ বিচিত্র উৎসে যুক্ত হয়ে বিষয়-বৈচিত্র্য লাভ করেছে। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ সম্ভবত এই যে পাক আমলের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর গুণগত কোন পরিবর্তন স্বধীনতা উত্তরকালে ঘটেনি, ঘটেছে কেবল পরিমাণগত পার্থক্য।

 

মিথিক ঐতিহ্যে ইতিহাস ও দেশাম্বেষা

 

বর্তমানে বাংলাদেশে জাতি শোষণ রূপ নিয়েছে শ্রেণী শোষণে, সামরিক শাসক পরিবর্তন করেছে তার কৌশল; স্তব্ধ করছে দেশের সত্যকণ্ঠ, প্রতিনিয়ত ঘোষিত হচেছ দাবিয়ে রাখার আইন। ফলে অনেক ঔপন্যাসিক identity-র জন্য আত্মসন্ধান ও শক্তিসঞ্চয়ের জন্য পুনরায় প্রত্যাবর্তন করেছেন ঐতিহ্য আর ইতিহাসের কাছে।

এই ব্যাখ্যাত পুরানো কাহিনী শিল্প সৌন্দর্য্য ও সামর্থে ক্ষোভ ও প্রতিবাদী মাধ্যম হিসেবে হয়ে উঠেছে বাঙালি জীবনের নবতর আখ্যান। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ (১৯৭৪), তাঁর ত্রয়ীর শেষ খণ্ড ‘সংকর সংকীর্তন’ (১৯৮০), সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৫), প্রাগ্রসর প্রকরণ ও দেশ বিভাগে মুসলমানের স্বপ্ন ভঙ্গ এসব উপন্যাসে রূপায়িত হয়েছে।

শ্রেণী শোষণ ও সামন্ত শোষণের বিশ্লেষণী রূপ দেখা যায় এই সব উপন্যাসে। যেমন শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ (১৯৮৪); রিজিয়া রহমানের ‘বং থেকে বাংলা’ (১৯৭৮), ‘একাল চিরকাল’ (১৯৮৪); সেলিনা হোসেনের ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ (১৯৮৩), ‘চাঁদ বেনে’ (১৯৮৪); অজয় ভট্টাচার্যের ‘অরণ্যানী’ (১৯৮৩); শওকত ওসমানের ‘পতঙ্গ পিঞ্জর’ (১৯৮৩)। সুতরাং সংগ্রামী জীবন চেতনায় একালের ঔপন্যাসিকদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞাসা ক্রমধারার শিল্পরূপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

Leave a Comment