আজকে আমরা আলোচনা করবো বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সূচীপত্র

বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ সূচীপত্র
‘বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ (১৯৪৭-১৯৭১)’ শীর্ষক আমার গবেষণাকর্মের কেন্দ্রীয় বিষয় উপন্যাস। পাশ্চাত্য বুর্জোয়া সভ্যতার উত্থান ও তার অগ্রযাত্রার শিল্পাঙ্গিক হিসেবে সাহিত্যে উপন্যাসের উদ্ভব। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে নবতর সাহিত্য-সংস্কৃতি গড়ে উঠতে থাকে, সেখান থেকেই বাংলাদেশের উপন্যাসের যাত্রারম্ভ।
গবেষণা শিরোনাম অনুসারে বাংলাদেশের উপন্যাসে প্রতিফলিত শ্রেণীচেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ করাই আমার আলোচ্য গবেষণাকর্মের মূল লক্ষ্য। এর সময়কাল ১৯৪৭-১৯৭১ হওয়ায় বিভাগ পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে প্রাক স্বাধীনতা পর্যন্ত মধ্যবর্তী পর্বের সাতজন নির্বাচিত ঔপন্যাসিকের উপন্যাসসমূহ উক্ত গবেষণার মূল আলোচনায় বিশ্লেষিত হয়েছে
গবেষণা শিরোনামের শ্রেণী-চেতনা কথাটি দিয়ে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণীর অবস্থা, এক শ্রেণীর সাথে অপর শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও অবস্থানগত সচেতনতা এবং সেইসাথে এ বিষয়ে সজাগ হওয়াকে মূলত বুঝায়। ‘শ্রেণী-চেতনা’ বিষয়টি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ধারণার সাথে সম্পৃক্ত।
এটি স্বভাবতই শ্রেণীহীন সমাজগঠনে সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে সমর্থন করে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর থেকেই সারা পৃথিবীব্যাপী দ্রুতগতিতে সমাজতান্ত্রিক বা মার্কসীয় চিন্তাধারার প্রসার ঘটতে থাকে। মার্কসীয় চিন্তাধারা ও রুশ বিপ্লবের প্রেরণা তৎকালীন তরুণদের একাংশের মনেও সঞ্চারিত হয়। ১৯২৭-২৮ স গঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। তখন থেকে দেশের উৎসাহী ও ন্যায়কারী লেখকরা রুশ বিপ্লবের আদর্শ ও বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার নবনির্মাণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়।

এ অবস্থায় বাংলা সাহিত্যের একটি নবচেতনার ও নতুন ধারার সূত্রপাত লক্ষ করা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের রচনার মধ্য দিয়ে মার্কসীয় এই নতুন ধারাটি বিকশিত হয়। ঢাকাতেও এর ঢেউ এসে লাগে। এ সময় ঢাকায় মার্কসবাদী সাহিত্য সংগঠন ‘প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘ’ (১৯৩৯)- এর কার্যক্রম সাহিত্য শিল্পীর জীবনচেতনা ও শিল্পদর্শনকে অনেকাংশে আন্দোলিত করতে সক্ষম হয়।
ফলে সৃষ্টিশীল রচনায় মার্কসবাদের সাম্যবাদী চিন্তার ভাল প্রভাব লক্ষ করা যায়। গণমুখিতার ছোঁয়া এসে লাগে সাহিত্যে। নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের ছবি, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ধারণা সাহিত্যে স্থান পায়। উক্ত মার্কসীয় সাম্যবাদী চেতনার ধারাবাহিকতা বিভাগপরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের উপন্যাসেও লক্ষ করা যায়। ফলে শ্রেণীশোষণ, শ্রেণীসংগ্রাম ও তা থেকে উত্তরণের প্রয়াস প্রাসঙ্গিকভাবে এ সময়কালের উপন্যাসে আমরা রূপায়িত হতে দেখি।
এক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি, সামাজিক শোষণ-নিপীড়ন-বঞ্চনার বাস্তবতা তুলে ধরার সাথে সাথে ব্যক্তি বা সমষ্টির কিছু কিছু বিদ্রোহের চিত্রও ঔপন্যাসিকরা তাদের উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। সেইসাথে সমাজজীবনের মৌল শ্রেণীগত দ্বন্দ্বে বিভিন্ন শ্রেণী অস্তিত্বের বস্তুগত ও চেতনাগত পার্থক্য এবং শ্রেণীগত জীবন অন্বেষা, পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব সংঘাত, তার ঐতিহ্যবোধ ও ইতিহাস চেতনা, স্বদেশ চেতনা কিভাবে স্যা জনসাধারণ ও নিজেদের মুক্তিপথ নির্দেশনায় ভূমিকা রাখে তার পরিচয়ও তাদের উপন্যাসে পাওয়া যায়।
বলা যায়, আমাদের দেশের ঔপন্যাসিকরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ দেশের জীবনধারায় বিরাজমান শ্রেণীগত বৈষম্য সম্পর্কে প্রত্যেকেই কমবেশি সচেতন ছিলেন। এ দেশে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সমাজের যে নতুন শ্রেণীবিন্যাস সূচিত হয়, তাতে অতীতের বিরাজমান শ্রেণীগুলো ভেঙে নতুন শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। উক্ত শ্রেণী কাঠামোর ক্রম রূপান্তরই বিভাগ পরবর্তী বাংলাদেশে লক্ষ করা যায়।
আমাদের দেশের সমাজজীবনে প্রচলিত উক্ত শ্রেণীসমূহের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ, সংঘাত ও শ্রেণীসংগ্রাম রূপায়ণে ১৯৪৭-১৯৭১ সময় কালের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ঔপন্যাসিকের সৃষ্টিকর্মে শ্রেণী-চেতনা বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে যে সাতজন ঔপন্যাসিক আমার গবেষণাকর্মের আলোচনায় স্থান পেয়েছেন তাঁরা হলেন, সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), সরদার জয়েন উদ্দীন (১৯২৩-১৯৮৬), শাসসুদ্দীন আবুল কালাম (১৯২৬-১৯৯৮), শহীদুল্লা কায়সার (১৯২৬-১৯৭১), আৰু ইসহাক (১৯২৬- ২০০৩), এবং আহমদ ছফা ( ১৯৪৩-২০০১)। উক্ত সাতজন ঔপন্যাসিকের ক্রমনির্ধারণ করা হয়েছে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠতা অনুসারে।

আলোচনার সুবিধার্থে আমার গবেষণার পুরো বিষয়টি নিম্নরূপ অধ্যায়ে বিভক্ত ও বিন্যস্ত করেছি:
প্রথম অধ্যায়: ১৯৪৭-১৯৭১ কালসীমার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমির পরিচয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়: শ্রেণী ও শ্রেণী-চেতনা ।
তৃতীয় অধ্যায়: বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি।
চতুর্থ অধ্যায় : বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক ও উপন্যাসের সাধারণ পরিচিতি।
পঞ্চম অধ্যায়: বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী-চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ। উপসংহার অংশে গবেষণাকর্মের লক্ষ্য ও মূল্যায়ন বিধৃত করা হয়েছে।
সাহিত্য সমালোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে আমার গবেষণাকর্মের মূল বিষয়ের ধারণাটাই যেহেতু ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনার প্রতি ইঙ্গিত দেয়, সেহেতু আলোচ্য গবেষণা শিরোনামের স্বরূপ বিশ্লেষণে মার্কসীয় সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতির প্রাসঙ্গিক প্রয়োগও অনেকে ক্ষেত্রেই রয়েছে।
এবারে কৃতজ্ঞতা স্বীকার পালা। প্রথমেই আমি আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করছি। তিনি আমার গবেষণাকর্মের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালনে সম্মত হওয়ায় আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এছাড়া তাঁর অশেষ অনুপ্রেরণা ও সার্বিক সহযোগিতা, প্রয়োজনীয় গ্রন্থ সহায়তা ও বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা লাভ করে আমি গবেষণাকর্মটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পেরেছি।
এজন্য তাঁর কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য। সেইসাথে আমার এম.ফিল প্রথম পর্বের কোর্স শিক্ষক ডক্টর রফিকউল্লাহ খান ও অধ্যাপক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদের কাছে গবেষণা বিষয়ে অনুপ্রেরণা ও গ্রন্থ সহায়তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এছাড়াও আনি শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের কাছে তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ এবং উৎসাহের জন্য বিশেষভাবে ঋণী।
গবেষণা নির্বাহকালে ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছাড়াও আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও বাংলা একাডেমীর গ্রন্থাগার ব্যবহার করেছি। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীবৃন্দকে আমি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।

সূচীপত্র
প্রথম অধ্যায়
বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক সাংস্কৃতিক পটভূমি
দ্বিতীয় অধ্যায়
শ্রেণী ও শ্রেণী চেতনা
তৃতীয় অধ্যায়
বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার পটভূমি
চতুর্থ অধ্যায়
বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক ও উপন্যাস
পঞ্চম অধ্যায়
বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ১
বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণী চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ ২
উপসংহার
বাংলাদেশের অধিকাংশ উপন্যাস শ্রেণী বিভক্ত, শোষণমূলক সমাজ কাঠামোতে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামশীল মানুষের বহুমুখী চেতনার শিল্পরূপ। ১৯৪৭-১৯৭১ কালপর্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের জনজীবনে যে আলোড়ন, বিবর্তন ও সংগ্রাম সূচিত হয় এ সময়ে রচিত উপন্যাসে তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে।

বর্তমান অভিসন্দর্ভে আলোচিত সাতজন ঔপন্যাসিকের চেতনা ও সৃষ্টির বৈচিত্র্যময় রূপায়ণের মধ্য দিয়ে তার পরিচয় প্রতিফলিত হয়েছে। ঔপন্যাসিকরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনাভিজ্ঞতা থেকে সমাজে বিদ্যমান শ্রেণী অস্তিত্বের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ, সংঘাত ও শ্রেণীসংগ্রাম রূপায়ণের মাধ্যমে তাঁরা আমাদের সমাজের প্রচলিত শ্রেণীগত জীবন-সত্যকে সামনে এনেছেন।
গবেষণাকর্মের আলোচিত উপন্যাসসমূহের বিশ্লেষণ থেকে আমরা দেখতে পাই, বিভাগোত্তর সদ্য স্বাধীন দেশে নতুন রাজধানী শহর গড়ে ওঠার পটভূমিতে দেশের কয়েক হাজার পশ্চাৎপদ গ্রামে বসবাসরত মানুষের জীবনবাস্তবতার শিল্পিত প্রতিফলন ঘটেছে।
১৯৪৭-এর রাজনৈতিক মীমাংসা, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান প্রভৃতি ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অভ্যন্তরে যে শ্রেণীসংগ্রামের উপাদান কাজ করে এসেছে, মিশ্রিতভাবে বাংলাদেশের উপন্যাসে সে সবের প্রতিফলন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে সত্যেন সেন, শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাসসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।
বাংলাদেশের উপন্যাসে শ্রেণীচেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণ শীর্ষক অধ্যায়ে উক্ত ঔপন্যাসিকাদ্বয়ের উপন্যাস আলোচনায় তা বিশ্লেষিত হয়েছে। এছাড়া গবেষণাকর্মে আলোচিত অপর পাঁচজন ঔপন্যাসিক আবু ইসহাক, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সরদার জয়েন উদ্দীন, শওকত ওসমান, আহমদ ছফা প্রমুখের লেখায়ও জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল শ্রেণীচেতনার উপাদান কমবেশি প্রভাব রেখেছে। তাঁদের উপন্যাসে প্রতিফলিত জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম আন্দোলনের দৃষ্টান্ত হিসেবে কৃষক আন্দোলন, সাময়িক সংগঠন, শ্রমিক আন্দোলনের কথা বলা যায়।
আলোচিত উপন্যাসগুলোর জীবনচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমাজের নিম্নবিত্তের মানুষেরা নিজেদের শ্রেণী অবস্থান, সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে বিকল্প পথ অন্বেষণ করেছে; যেমন, গ্রাম থেকে তারা নগরে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু নতুন শ্রেণী সংগ্রামের সংগঠিত উদ্যোগ তারা প্রায়শই নিতে পারেননি।
আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ উপন্যাসে জয়গুনের গ্রাম ত্যাগ সে সত্যেরই পরিচয় বহন করে। অস্তিত্ব বিনাশী আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় জয়গুন পরিবারের সংগ্রাম ও গ্রাম ত্যাগের তোলে।
কাহিনী নবযাত্রার সম্মুখভূমিতে মীমাংসাহীন অন্ধকার ও শূন্যতাকেই যেন একমাত্র গন্তব্যরূপে স্পষ্ট করে
বাংলাদেশের বেশিরভাগ উপন্যাসের ক্ষেত্রেই শ্রেণী-সংগ্রামের ইঙ্গিত লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’, সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘আদিগন্ত’, ‘অনেক সূর্যের আশা’, শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘আলমনগরের উপকথা’ উপন্যাসে শোষণহীন সমাজগঠনে শ্রেণী-সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গ এবং আহমদ ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ উপন্যাসে সংঘবদ্ধ কৃষক আন্দোলনের সম্ভাবনা ও শোষণহীন সমাজগঠনের ইঙ্গিত উল্লেখ করা যায়।

শওকত ওসমান ও আবু ইসহাক শ্রেণী-অস্তিত্বের স্বরূপ উপস্থাপনে সমাজজীবনের বাস্তব প্রচ্ছদ তুলে ধরেছেন। আবু ইসহাকের উপন্যাসে গৃহীত হয়েছে বাস্তব চরিত্র পাত্র আর শওকত ওসমান রূপক- প্রতীকের আশ্রয়ে বাস্তবতার সীমা স্পর্শ করেছেন।
শ্রেণীবিভক্ত, শোষণমূলক ও ঔপনিবেশিক সমাজকাঠামোতে রাজনৈতিক তত্ত্ব ও ঘটনা, ব্যক্তি ও সমষ্টির জীবনকে কিভাবে আলোড়িত ও প্রভাবিত করে, তাকে সত্যেন সেন নির্মোহ পর্যবেক্ষণে রূপদান করেছেন। তাঁর উপন্যাসে মার্কসীয় তত্ত্বের আলোকে জাতীয় মানবপরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং একটি শোষণহীন সমাজপ্রতিষ্ঠার নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি ব্যক্ত হয়েছে।
গ্রামসমাজের শোষণ এবং শোষিতের সামাজিক অবস্থান সরদার জয়েন উদ্দীনের উপন্যাসে সুস্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরদার জয়েন উদ্দীনের প্রতিনিধিত্বকারী উপন্যাস ‘অনেক সূর্যের আশা’। উপন্যাসটিতে শোষণহীন শ্রেণীবৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আশাবাদের মধ্য দিয়ে শ্রেণীচেতনার অন্তর্নিহিত স্বরূপ প্রকাশিত ।
গ্রন্থ প্রকাশের ক্রম হিসেবে শামসুদ্দীন আবুল কালাম বাংলাদেশের উপন্যাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক জীবনধারার ঔপন্যাসিক। তাঁর উপন্যাসে স্বভাবতই শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণের আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। তবে শ্রেণীসংঘাত ও সমাজ বিবর্তনের ইতিহাস অন্বেষণে গভীর ঐকান্তিকতা সত্ত্বেও তাঁর জীবনদৃষ্টি বস্তুনিষ্ঠ নয়। তার উপন্যাসে প্রতিফলিত আশাবাদের মধ্যে দেশ বিভাগোত্তর বাঙালি মুসলমানের মনোবাস্তবতার সঙ্গে রোমান্টিক জীবনান্বেষার মৌলিক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বিভাগোত্তর কাল অর্থাৎ ১৯৫১ পর্যন্ত প্রায় এক যুগের বাঙালির জীবনসত্য শহীদুল্লা কায়সারের ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসে বিন্যস্ত হয়েছে। আমরা দেখি, সংশপ্তক’ উপন্যাসের শেষাংশে সমাজতন্ত্রী নেতা জাহেদ গ্রেপ্তার হবার পর সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে, “আমি আসব।” তাঁর এই উক্তি ভবিষ্যত সংগ্রামের আশাকেই বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছে। এভাবে সমাজ সময়ের প্রতিরূপে গণমানুষের মুক্তির বাণীতে শ্রেণীচেতনা বিষয়টি ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসে মহাকাব্যিক অবয়ব লাভ করেছে।
শ্রেণীচেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আহমদ ছফার প্রতিনিধিত্বকারী একটি মাত্র উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’ আলোচিত হয়েছে। হিন্দু কিংবা মুসলমান হিসেবে নয়, শোষক ও শোষিত শ্রেণীভুক্ত করে তিনি এ উপন্যাসটিতে সমাজসত্যের তাৎপর্যময় রূপ উন্মোচন করেছেন।

উপন্যাসটিতে নিম্নশ্রেণীর প্রতি উচ্চতর শ্রেণীর ঘৃণা ও নির্যাতন, মাতব্বরের স্বার্থপরতা ও নিপীড়ন এবং কৃষককর্মীদের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা, নিম্নশ্রেণীর জনসাধারণকে সংগঠিত ও শ্রেণীসচেতন করার উদ্যোগ-এ সবকিছুই একটি সামগ্রিক চেতনার আলোকে ‘সূর্য তুমি সাথী’ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে।
আলোচ্য গবেষণাকর্মের ‘শ্রেণীচেতনা’ বিষয়টি যেহেতু শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে সমর্থন করে, সেহেতু গবেষণাকর্মের দ্বিতীয় অধ্যায়ে শ্রেণীচেতনা’ বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উক্ত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে গবেষণার আলোচনায় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের প্রবক্তা কার্ল মার্কস ও লেনিনের তত্ত্বের কথা এসেছে।
পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের অপরাপর তাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবার এবং মার্কসীয় তাত্ত্বিক গ্রামসি এবং অন্য বহু তাত্ত্বিকের তত্ত্ব ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সে তত্ত্ব গবেষণার আলোচিত বক্তব্যের মধ্যে রয়ে গেছে প্রচ্ছন্ন।
পরিশেষে বলব, বিভাগপূর্ব সামস্ত সমাজ কাঠামো এবং বিভাগোত্তর রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার রূপান্তরের কারণে আমাদের সমাজব্যবস্থায় যদিও কিছু কিছু রদবদল হয়েছে, রাষ্ট্রও বদলেছে, কিন্তু পীড়িত মানুষের দুর্গতি কমেনি। নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে, অভ্যুত্থান পর্যন্ত ঘটিয়েছে। তাতে ওপরে ওপরে পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু দুর্বল মানুষ মুক্তি পায়নি প্রবলের জুলুম থেকে।
উক্ত বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের সমাজজীবনের মৌল শ্রেণীগত দ্বন্দ্বে সমাজের নানা শ্রেণীর জীবন বাস্তবতা, বিভিন্ন শ্রেণী অস্তিত্বের বস্তুগত ও চেতনাগত বৈষম্য এবং শ্রেণীগত জীবন অন্বেষা, পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, তার ঐতিহ্যবোধ ও ইতিহাসচেতনা, স্বদেশচেতনা কিভাবে সমগ্র জনসাধারণ ও নিজেদের মুক্তিপথ নির্দেশনায় ভূমিকা রেখেছে, সেসবই মূলত শ্রেণীচেতনার পরিচয় রূপে ১৯৪৭-১৯৭১ কালপর্বে আলোচিত উপন্যাসসমূহে প্রতিফলিত হয়েছে। আর এরই একটি সামগ্রিক কিন্তু সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন উপরিউক্ত আলোচনায় উপস্থাপিত হল।