আজকে আমরা কবি হাফেজদ্দীন রচিত ‘বসন্তের দুঃখ’ সম্পাদনা ও মূল্যায়ন সূচি আলোচনা করবো।

কবি হাফেজদ্দীন রচিত ‘বসন্তের দুঃখ’ সম্পাদনা ও মূল্যায়ন সূচি
১৭৯৭-১৮১২ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে কবি হাফেজদ্দীন তাঁর “বসন্তের দুঃখ” কাব্যটি লিখেন। এটি একটি রূপকথা জাতীয় বীরত্বব্যঞ্জক উপাখ্যান। কাব্যটির প্রথম চার পাতা নেই। পাণ্ডুলিপিতে প্রথমে বা শেষের দিকে সংখ্যায় অথবা শব্দের মাধ্যমে সন তারিখ লেখার নিয়ম ছিল।
প্রাচীন থেকে মধ্যযুগের সকল পাণ্ডুলিপিতে এই নিয়মের ব্যবহার রয়েছে। এই কাব্যে হয়তো ছিল। কিন্তু খণ্ডিত হওয়ায় নির্দ্দিষ্ট সন তারিখ পাওয়া যায়নি। খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি থেকে সন তারিখ নির্ণয় করা অত্যান্ত দুরূহ ব্যাপার। তারপরও যদি একাধিক কপি পাওয়া যায়, তবে তার কোন না কোনটা থেকে হয়ত সন তারিখ পাওয়া সম্ভব হতে পারে। আর যদি একটি মাত্র কপি নিয়েই কাজ করতে হয় তাহলে তা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য।
পাণ্ডুলিপি সম্পাদনাক্ষেত্রে চারটি পদ্ধতি চালু রয়েছে
১. Heuristics, (মূলপাঠোদ্ধারে কালানুক্রমিক পদ্ধতি)।
২. Recensio. (মূল পাঠ পুনরুদ্ধার পদ্ধতি)।
৩. Emendatio (পাঠ সংশোধন পদ্ধতি)।
৪. Higher criticism (পরীক্ষণমূলক পদ্ধতি)।
এই মহাদেশের মনীষিগণ Heuristics Recensio, Emendatio পদ্ধতিতে পাণ্ডুলিপি- সম্পাদনা করেছেন। Higher criticism পদ্ধতি অবলম্বনে বাংলা ভাষায় কোন পাণ্ডুলিপি অদ্যাবধি সম্পাদনা হয়নি। কেবলমাত্র গ্রীক ও ল্যাটিন সাহিত্যে এই পদ্ধতিতে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা হয়েছে। Higher criticism পদ্ধতিতে কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন তথ্য ও উপকরণের পরীক্ষামূলক বিচার বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতিটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক। কৰি হাফেজদ্দীন রচিত ‘বসন্তের দুঃখ’ কাব্যটি সম্পাদনা ও মূল্যায়নে Higher criticism পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে।

Heuristics পদ্ধতিতে সম্পাদক সমস্ত তথ্য ও উপকরণের কালানুক্রমিক বিন্যাস করেন। তারপর বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি ও প্রতিলিপির সমন্বয়ে বংশপীঠিকা নির্ণয় করেন। শুধু কালানুক্রমিক বংশপীঠিকাই নয়; প্রয়োজনবোধে অঞ্চলভিত্তিক শ্রেণীকরণ করে সম্পাদক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। মহাভারত এর উদাহরণ।
অঞ্চলভেদে মহাভারত দুটি ভাগে বিভক্ত – (ক) উদীচ্য পাঠ (খ) প্রাচ্য পাঠ। সম্পাদক পাণ্ডুলিপির পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, স্থান, কাল, ও লিপি বিচারের সাহায্য গ্রহণ করেন। মূল পাঠ পুনর্গঠনের সহায়ক হিসাবে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ও উপকরণের সাহায্যে পাণ্ডুলিপিগুলির মধ্যে পারষ্পারিক সম্পর্ক নির্ণয় করেন।
Recensio পদ্ধতিতে সম্পাদকের প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের সাহায্যে মূল পাঠ পুনরুদ্ধার করে থাকেন। সম্পাদক পাণ্ডুলিপির পাঠ বিচার, বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের পুনঃপুন পরীক্ষা করে রচয়িতার মূল পাঠ বা তার কাছাকাছি বিশুদ্ধপাঠ নির্ণয় করে থাকেন।

Emendatio-পদ্ধতিতে সম্পাদক কবির মূলপাঠ উদ্ধারের জন্য পাণ্ডুলিপির পাঠের বিকৃতি, বিচ্যুতি ও প্রক্ষেপগুলি দূর করার চেষ্টা করে থাকেন। সম্পাদক পাঠ সংশোধনের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে প্রাপ্ত প্রত্যক্ষ প্রমাণকেও অস্বীকার করেন। এজন্য এই পদ্ধতিকে অনেকে নেতিবাচক পদ্ধতি বলে অভিহিত করেন। অনেক সময় পাণ্ডুলিপির লিখিত প্রমাণাদিকেও যাচাইয়ের জন্য সম্পাদক বিভিন্ন বাহ্য প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করেন। FW Hall বাহ্য প্রমাণের সাহায্য গ্রহণ করাকে অনুসন্ধানী বলে অভিহিত করেন।
উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতিতে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা যথেষ্ট নয়। কারণ উক্ত তিনটি পদ্ধতিতে রচয়িতার ব্যবহৃত বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণাদি উপেক্ষিত থাকে। ফলে, পাণ্ডুলিপির পূর্ণাঙ্গ বিষয় অজানা থেকে যায়। বিশেষ করে তারিখ বিহীন বা খণ্ডিত পাণ্ডুলিপির সময়কাল, রাজনৈতিক স্থিতিকাল ও ভৌগোলিক অবস্থান এবং লোককাহিনী, শ্রুতি ও স্মৃতি Higher criticism পদ্ধতির প্রধান অবলম্বন। এই পদ্ধতিতে রচয়িতার কাব্যে বিভিন্ন তথ্য ও উপকরণের পরীক্ষামূলক বিচার বিশ্লেষণ করে সময়কাল নির্ণয় করে, নিশ্চিত একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব।

সূচি
প্রথম অধ্যায় –
পাণ্ডুলিপির পরিচিতি
দ্বিতীয় অধ্যায় –
বসন্তের দুঃখ পাণ্ডুলিপির বিষয়, কাহিনী, উৎস ও চরিত্র
তৃতীয় অধ্যায়-
কাব্য বিচার ও শিল্পরূপ
কাব্য সংকলন
বসন্তের দুঃখ পাণ্ডুলিপির টীকা