আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাধীন প্রেম উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাধীন প্রেম উপন্যাস
‘পরাধীন প্রেম’ (১৯৫৫) প্রেমকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন প্রেম অর্থনীতির কাছে, সংস্কারের কাছে পরাধীন। বিনয়-বকুল, অনিল- কান্তা, উমা-অজিত, সুমতি-সমীর, পাচী-কার্তিক এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির প্রেম লেখক দেখিয়েছেন। বিনয় শিক্ষিত সংস্কারমুক্ত যুবক। বকুল তার পাশের বাড়ির মেয়ে। উপন্যাসের শুরুতে বকুল বিধবা হয়ে বাড়ি ফিরছে। একসময় বকুলের সঙ্গে বিনয়ের বিয়ের কথা উঠেছিল, তখন সে বলেছিল:
‘ছোট বোনকে বিয়ে করবো’ (১০৩, পৃ-১৪৭)
এরপর বিনয় সে বিয়ে বাতিল করে দিয়েছিল। কিন্তু বিধবা হয়ে বাড়ি ফেরার পর বকুলের পরিপুষ্ট গড়ন তাকে মুগ্ধ করে, সে কৌশলে বকুলকে প্রেম নিবেদন করে। বিধাযুক্ত মন দিয়ে বকুল বিনয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়। বকুলের বড় ভাই অনিল। অনিল কাস্তাকে ভালোবাসে, সে প্রতিবার ইচ্ছে করে ক্লাসে সেকেন্ড হয়, কাস্তাকে ফাস্ট করার জন্য। কান্তার ছোটবেলায় মাতাল অঘোরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল।

একদিন কাস্তা অসহ্য হয়ে অঘোরকে টেলে ফেলে দিয়ে হাসপাতালে পাঠায় এবং নিজে বাবার বাড়ি চলে আসে, কুমারী সাজে, আবার টিউশনি করে লেখাপড়া শুরু করে। অনেক দিন পর অঘোরের মৃত্যু হলে কাস্তা আর অনিল সিদ্ধান্তে আসে তারা বিয়ে করবে। অন্যদিকে উমা ভালো ছাত্রী, অজিত তার বন্ধু। সে প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল ধনী বাবার ছেলে। আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য উমা পড়া ছেড়ে দিতে চাইলে অজিত তাকে পড়ার খরচ দেয়। উমা খরচ নিতে অস্বীকার করলে সে বলে:
“থার্ড ইয়ারে যে মেয়ে চাপে পড়লেই পড়া সাঙ্গ করে দেয়, সে রকম গেঁয়ো মেয়েকে আমি শ্রদ্ধা করতে পারবো না। শ্রদ্ধা ছাড়া ভালোবাসা হয় না উমা।” (১০, পৃ-১৫৩)
সে আরো বলে
“স্বামীর খরচে পড়া চালিয়ে যাবার কথা ভেবে মাথা ঘোরবার কী আছে? বিয়ে তো আমাদের হয়েই গেছে উমা। তোমাকে ছাড়া আর কোনো বউ কি এ জীবনে আর চাইতে পারব?” (১০২, পৃ-১৫৪ )

অবশেষে উমা রাজি হয় অজিতের টাকা নিতে। রেজাল্টের পর অজিত তাকে অস্বীকার করে, তাকে সে ভালোবাসে, কিন্তু বিয়ে করবে না। উমা তাই অজিতের টাকায় বিলেত যাওয়া বাতিল করে দেয়। অজিত তখন পরোক্ষভাবে উমাকে আড়াই শ টাকা বেতনের চাকরি জোগার করে দেয়। এর কিছুদিন পর অজিত অন্য মেয়েকে বিয়ে করে।
উমাও অন্য কোম্পানির একজন ম্যানেজারের সঙ্গে ভালোবাসার আবদ্ধ হয়। তাদের বিয়েও ঠিক হয়, কিন্তু বিয়ে করলে তার চাকরিটি থাকবে না। বাবা মা ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে বিয়ে বাতিল করে সে চাকরিকেই আকড়ে থাকে।
অন্যদিকে বকুলের বিয়ের ব্যাপারটা সকলে মেনে নিলেও বকুলের বড় বোন মুকুল মেনে নেয় না। মুকুল বকুলের শ্বশুড় বাড়ি খবর পাঠায়। বকুলের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বকুলকে চিঠি দিয়ে জানায় তার স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, বসতবাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স সব বকুলের নামে। সে যেন এসে এ দায় মাথায় নেয়।

বকুল তখন বিষয়কে বিয়ে না করে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। বিনয় মদ আর সপ্তা মেয়ে নিয়ে দিন কাটাতে শুরু করে। অন্যদিকে, অনিলের টি.বি. হয় সে ভেঙে পরে। কান্তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। উপন্যাসের শুরুতেই নিম্নবিত্ত কার্তিক আর গরীব বিধবা পাঁচির প্রেম করে বিয়ে দেখানো হয়েছে।
আর উপন্যাসের শেষে অনিলের বোন সুমতি আর উমার ভাই সমীরের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় উমা আর অনিল। মানসিক হতাশা, সংসস্কার, অর্থনৈতিক বিপর্যয় সবকিছুকে কাটিয়ে একটি সুন্দর জীবনে পদার্পণের প্রত্যাশায় উপন্যাস শেষ হয়েছে।