সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার রচনাটি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক : ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প [পিএইচডি অভিসন্দর্ভ] এর অংশ। গবেষনাটির অথোর জান্নাত আরাসোহেলী। এই অভিসন্দর্ভের (পিএইচডি) বিষয় বাংলা নাটক – ইতিহাস ও সমালোচনা। প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-২০১৮। গবেষণাকর্মটি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা সাহিত্য গুরুকুলে পুন-প্রকাশ করলাম।

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

সৈয়দ শামসুল হক ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনকে উপজীব্য করে লিখেছেন নূরলদীনের সারাজীবন। ইতিহাসের উপাদানের সঙ্গে কল্পনার সহযোগ সন্নিপাতে এটি হয়ে উঠেছে অসাধারণ শিল্পগুণান্বিত নাটক। বস্তুত, ‘কাহিনিকেন্দ্রিকতা কাব্যনাটকের মূল অভিষ্ট নয়, কাহিনির চেয়ে ব্যক্তি চরিত্রের অন্তর্গত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ অধিকতর প্রয়োজনীয়।

এ কারণে সৈয়দ শামসুল হক কাহিনির চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়েছেন বিভিন্ন চরিত্রের অন্তচেতনা আবিষ্কারে। ফলে নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যের প্রায় প্রতিটি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মানসিক সংকট, হৃদয়ের ক্ষরণ চোখে পড়ে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচ্য নাটকে নূরলদীনের অন্তর্জাগতিক দাহ ও দ্বন্দ্বই প্রধান হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার মন্তব্য করেছেন নিম্নরূপ :

নূরলদীনের আত্মা ও প্রেরণা আমি ইতিহাসের ভেতর থেকে সংগ্রহ করেছি, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক সংকট আমি সম্ভবপরতার ক্ষেত্র থেকে আবিষ্কার করে নিয়েছি। (সবিনয় নিবেদন, কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬৩)

নূরলদীনের সারাজীবন নাটকে নাট্যকার নূরলদীনের ছবি এঁকে দেখিয়েছেন – মিছিলের সম্মুখ সারিতে যারা স্থান করে নেয়, তারা আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই অতিসাধারণ। অর্থাৎ নায়ক হবার যোগ্যতা কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবারই থাকে, কিন্তু প্রয়োজন কেবল বৃহত্তর কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গের প্রস্তুতি ও অঙ্গীকার।

সৈয়দ শামসুল হক চেয়েছেন প্রত্যেক সাধারণের অভ্যন্তরে যে অমিত সম্ভাবনা সেটিকে আবিষ্কার করতে। তিনি জানতেন প্রত্যেকের ভেতরেই বাস করে একজন দেশপ্রেমিক নূরলদীন। প্রয়োজন শুধু তাকে চিনে নেওয়া। নূরলদীন কেবল অতীতের পাতা থেকে উঠে আসা এক ইতিহাস নয়, নূরলদীন আজকের অসম ও বিভক্ত মানুষের অনিঃশেষ সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, বাংলার নিরন কষকের পূর্বপ্রজন্ম।

আলোচ্য নাটকে নূরলদীন চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলি নাট্যকার এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা সত্যিকার অর্থেই একজন গণমানুষের নেতার মধ্যে বিদ্যমান থাকে। গণমানুষের নেতা হবেন সত্যবাদী, দেশপ্রেমিক, নির্ভীক, যুক্তিবাদী, কুশলী, সর্বোপরি ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এক চরিত্র। নূরলদীন চরিত্রের মধ্যে এই প্রত্যেকটি চারিত্র্যবৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। নূরলদীনের পিতৃবিয়োগের শোক, দারিদ্র্য, হতাশা যেমন তাকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তেমনিভাবে জনগণের সার্বিক দুঃখ-কষ্ট তাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করেছে। ফলে বারবারই সে জনগণের হয়ে জনগণের জন্য ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সত্তায় জেগে উঠেছে। নূরলদীন পরিপূর্ণ এক দেশপ্রেমিক সত্তা। দেশকে সে বরাবরই নিজ জননীর সঙ্গে তুলনা করেছে। জনগণকে সে বুঝিয়েছে, ব্রিটিশের এই অযাচিতভাবে সাম্রাজ্যবাদ স্থাপন যেন নিজ জননীরই বুকের ওপর চেপে বসা। ফলে দেশমাতৃকার একজন সন্তান হিসেবে সে জনগণকে অশ্রুসিক্ত নয়নে জেগে ওঠার আহবান জানিয়ে বলেছে :

তোমরা ক্যানে ও ঠাঁই বাহে ? মায়ের দুগ্ধ খান,

শোনেন শোনেন, মা জননী মাও কান্দিয়া কয়, [ … ]

এমন কালা ব্যাটা উয়ার না শুনিবার পায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৯)

নূরলদীন সম্পূর্ণরূপে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার। শোষিত ও শোষণকারীর ধর্ম-বর্ণ-জাত-পাত তার কাছে বড়ো হয়ে ওঠেনি। তার দেশের জনগণ – কে হিন্দু কে মুসলিম এটি যেমন তার কাছে বিবেচ্য নয়, তেমনিভাবে অত্যাচারী স্বদেশি নাকি বিদেশি তাও তার ভাবনায় নেই।

সে জনগণের উদ্দেশে বলেছে – যে শোষণ করছে সে-ই শোষক। তার কোনো জাত-পাত নেই। তাই এই আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যেকের উচিত সম্মিলিত প্রতিবাদ গড়ে তোলা। সে যখনই সাধারণ জনগণকে উদ্দেশ্য করে সম্বোধন করেছে, কিংবা ব্রিটিশদের কাছে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেছে, তখনই সে ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের বাইরে কেবল ‘মানুষ’ পরিচয়কে বড়ো করে দেখেছে :

মানুষ হো-ও ।

মাঠের মানুষ, দেশের মানুষ, হামার মানুষ হো-ও। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১00 )

একজন সত্যিকার নেতার মতোই নূরলদীনের রয়েছে অসীম সাহস। সে ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নিয়ে যেমন ভাবেনি, তেমনি অসীম সাহস নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে নিজেই এক অসম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মৃত্যুভয় তাকে সামান্য পরিমাণ টলাতে পারেনি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, শোষকের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রতিবাদে এতটুকু বুক কাঁপেনি তার। অস্ত্রধারী ব্রিটিশের সম্মুখে দাঁড়িয়ে দৃপ্তস্বরে তাদের এদেশে অন্যায়ভাবে জেঁকে বসার ও, দেশ দখলের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাদের প্রকৃত অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে :

একদিন কালাপানি পার হয়া সওদাগরি করিবার জন্যে জাহাজ

ধরিয়া আসিলেন হামার মুলুকে।

[…] একদিন সওদাগরি করিতে করিতে তোমরা করিলেন বড় এক সওদাগরি ।

একদিন অবাক হয়া দেখিলোম, কোন তালে কখন হামাক

গুষ্টি সমেত নিছেন খরিদ করি। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১০১ )

নূরলদীন যুক্তিবাদী, কুশলী এক নেতা। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার, আগ্রাসী শক্তিকে প্রতিহত করার তার নানান কৌশলমূলক প্রস্তুতি নাটকের দৃশ্য থেকে দৃশ্যায়িত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, কেবল অসীম সাহস আর দেশপ্রেমকে অবলম্বন করেই একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা শত্রুর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে নামতে পারেন না; তাকে যুক্তিবাদী ও কুশলী হতে হয়। নূরলদীনের মধ্যে আমরা এই গুণের উপস্থিতি লক্ষ করি।

বিভ্রান্ত, ভীত, বিচ্ছিন্ন, শোষিত জনগোষ্ঠীকে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে এক কাতারে সামিল করতে তার কুশলতা অনায়াসেই পাঠকমাত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ব্রিটিশ কর্মচারীর বন্দুকের ভয়ে যখন জনগণ ভীত হয়, তখন বাস্তবতার আলোকে নূরলদীন তাদের যুক্তি দিয়ে ব্রিটিশের লড়াই সম্পর্কে বুঝিয়েছে :

গোরার এ রীতি এই, অকস্মাতে জমিন ভুঁড়িয়া তাঁই উঠিবে তখন

মারি ধরি লাশ করি, অগ্নি দিয়া গ্রাম গঞ্জ করিবে উচ্ছন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৯)

নূরলদীন নির্লোভ এক নেতা। সাধারণ জনগণ তাকে নবাবের আসনে বসালেও নবাব হবার কোনো ইচ্ছেই তার ছিল না। এমনকি স্ত্রী আম্বিয়া যখন নূরলদীনের নবাব হবার সম্ভাবনা দেখে নিজে রাজ-রানী হবার স্বপ্নে বিভোর হয়েছে, নূরলদীন তখন তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে।

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

বন্ধু আব্বাসের আশংকার জবাবে বলেছে *নবাবের সিংহাসনে বসিবার কোনো লোভ নাই যে হামার’। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর জবানেও আমরা এমন কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন : আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, গণমানুষের মুক্তি চাই। ঠিক তেমনিভাবে নূরলদীনও চেয়েছে রাজসিংহাসনে নয়, বরং জনগণের হৃদয় সিংহাসনে নিজেকে বসাতে। কেননা, সে বিশ্বাস করেছে :

শিকল আনিয়া দিবে পুনরায় রাজায়, নবাবে।

অন্তরে আসন দিও, নয় কোনো রাজসিংহাসন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১৬)

নাট্যকার এই নিঃস্বার্থ, পরোপকারী গণমানুষের নেতার হৃদয়ের একান্ত শূন্যতা, হাহাকার সমান দক্ষতার সঙ্গে নাটকে উপস্থাপন করেছেন। নূরলদীন গণমানুষের নেতা; জনগণের কল্যাণে, জনগণের জন্যই যে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু সেও রক্ত-মাংসে গড়া সাধারণ মানুষ। তার ভেতরেও আছে ভালোবাসাপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা।

সৈয়দ শামসুল হক একজন দক্ষ নেতাকে আঁকতে গিয়ে তার এই একান্ত ব্যক্তিগত মানবিক সত্তাকে চিত্রিত করতে ভোলেননি। এমনিতে দেখা গেছে, স্ত্রী আম্বিয়া ও নূরলদীনের স্বভাব-চরিত্র বিপরীতমুখী। যে কারণে আম্বিয়ার নামে নূরলদীন তার বন্ধু আব্বাসের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত করেছে। অথচ, জ্যোৎস্নাস্নাত নির্জন রাতে ব্যক্তিহৃদয়ের শূন্যতা পূরণে সে আশা করেছে স্ত্রী আম্বিয়ার সান্নিধ্য, প্রেম-ভালোবাসা, আশ্রয়। নূরলদীনের এই আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ নাট্যকার চিত্রিত করেছেন নিম্নরূপে :

আম্বিয়া, তুইও সঙ্গে থাকিস হামার । […]

আম্বিয়া, জাগিবি নিশি সঙ্গেতে হামার ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১২১ )

অন্যদিকে, আব্বাস চরিত্রটি যুক্তিবাদী চরিত্র। সে হুজুকে মেতে, আবেগে ভেসে কোনো হঠকারী পদক্ষেপ নেবার পক্ষপাতী নয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ধীরে-সুস্থে সে লড়াইয়ে নামতে চেয়েছে। তার চরিত্রের দার্শনিকতা, বিচক্ষণতা, দায়িত্বশীলতা অনন্য।

বন্ধু নূরলদীনের সমুদ্রসম উত্তালতার বিপরীতে দিঘির মতো শান্ত, নিবিড় ও স্নিগ্ধ তার চরিত্র। ফলে যখনি নূরলদীন এই অসম লড়াইয়ে ক্লান্তি অনুভব করেছে, শূন্যতা তাকে গ্রাস করেছে, তখনই সে আব্বাসের সঙ্গে আলাপ করে নিজেকে ঝালিয়ে নিয়েছে। আবার, নূরলদীনের মৃত্যুর পর যথার্থ উত্তরসূরি হয়ে আব্বাসই লড়াইয়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। মূলত, আব্বাস চরিত্রটি ঐতিহাসিক নয়, লেখকের কল্পনাপ্রসূত।

একজন আবেগদীপ্ত নেতার ছায়ারূপে এমনই একজন যুক্তিবাদী, হিসেবি ও বিচক্ষণ বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন নাট্যকার। আব্বাস পদে পদে দামাল নূরলদীনকে সাবধান ও সতর্ক করে গেছে একজন প্রকৃত বন্ধুর মতোই :

গোরার বন্দুক আছে, পিস্তল কামান আছে, কিবা তার নাই ?

গোলার আঘাতে সব করি দিবে ধুলা ।

হুঁশ নাই? বুদ্ধি নাই? লাঠি হাতে তবে তাঁই নাচের পুতুলা ? ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৭)

নূরলদীন চরিত্রে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর ছায়া পাই, তবে আব্বাস চরিত্রটির গতি-প্রকৃতি-অবস্থান দেখে আমাদের বার বার বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের (১৯২৫-১৯৭৫) কথাই স্মরণে আসে। ইতিহাসের তথ্যানুসারে বঙ্গবন্ধু যতটা আবেগী ও উদ্যমী ছিলেন, তাজউদ্দীন আহমেদ ততটাই ছিলেন শান্ত ও সুস্থির।

নূরলদীনের মৃত্যুর পর আব্বাস যেমন সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে লড়াই অব্যাহত রেখেছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসক কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তাজউদ্দীন আহমেদ নেতৃত্বগুণ ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

আলোচ্য নাটকে আব্বাস চরিত্রটিও তেমন প্রাজ্ঞ ও দুরদর্শী। সে জানে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে হুজুকে লড়াইয়ে নেমে প্রকৃত বিজয় সম্ভব নয়। তার আগে দেশের মানুষকে উপযুক্ত দেশপ্রেমিকরূপে গড়ে তুলতে হবে। কেননা, এ জাতির বড়ো শত্রু – এ জাতির মধ্যেই বেড়ে ওঠা কতিপয় বিশ্বাসঘাতক, স্বার্থান্ধগোষ্ঠী। এদের সবার মধ্যে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম উন্মেষিত হলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন সম্ভব। এই বিজয় অর্জনের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রতীক্ষাও করতে হতে পারে :

লাগে না লাগুক, বাহে, এক দুই তিন কিম্বা কযেক জীবন ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১৬)

অন্যদিকে, দয়াশীল চরিত্রটি নাট্যকার ইতিহাসের পাতা থেকে নিয়েছেন। তবে নাটকে তার অবস্থান আব্বাসের মতো অতটা গুরুত্ববহ নয়। কিন্তু একজন জননেতার প্রকৃত সহযোদ্ধা হিসেবে তাকে অবশ্যই বিশেষ মর্যাদা দেয়া যায়। নাটকে দয়াশীল দেওয়ান অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ একটি চরিত্র; যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে তার গভীর ধারণা এ কথাই প্রমাণ করে।

নূরলদীনের পাশে থেকে প্রবীণ এ চরিত্রটি যুদ্ধকুশলতা সম্পর্কে তাকে বিজ্ঞ পরামর্শ প্রদান করেছে। যেমন – সশস্ত্র ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সে নিজের সাদামাটা বাহিনীকে কৌশলের সঙ্গে মোকাবেলার আহবান জানিয়েছে নিম্নরূপে :

যার যার লাঠি পলো কান্ধে করি, ছোট ছোট দল।

কাঁইও না সন্দেহ করে, সব আশেপাশে।

য্যান মাছ ধরিবার য

হয় হয়, নদীতে নিশীথে মাছ মারিবার যান। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৯৬)

আলোচ্য নাটকে নূরলদীনের স্ত্রী আম্বিয়া ও কুঠিয়াল টমসনের স্ত্রী লিসবেথ দুই বিপরীতধর্মী নারী চরিত্র। আম্বিয়া মনে-প্রাণে একেবারেই বাংলার গ্রামীণ কৃষকবধূর প্রতিচ্ছবি। লিসবেথ ইয়োরোপীয় সমাজে বেড়ে ওঠা ভারত- প্রবাসী গৃহবধূ। দুজনেরই ভরসা তাদের স্বামী। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, তুলনামূলক আধুনিক সমাজে বেড়ে ওঠা লিসবেথের স্বনির্ভরতা ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ মানসিকতার সঙ্গে এদেশের মাটিগন্ধা, গ্রামীণ কৃষকবধূ আম্বিয়ার নমনীয়তা ও কোমলতার পার্থক্য নজর এড়ায় না।

লিসবেথ স্বামীকে ভরসা করে সুদূর বিলেত থেকে জাহাজে চেপে এদেশে এসে সংসার সাজিয়েছে। অন্যদিকে আম্বিয়ার একমাত্র অন্বেষণ নূরলদীনের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা। দেশপ্রেমে, মানবপ্রেমের ঊর্ধ্বে তার পতিপ্রেম। সাধারণ বাঙালি নারীর মতোই সে চেয়েছে রানির মতো জীবনযাপন করে ‘আসিলে মরণ- অন্তত সধবা নারী / সধবায় থাকি, ফিরি / যায় ভাগ্যবর্তী মাটির কবরে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১২৯ )

নাটকে লিসবেথ শক্তিময়ী, বাস্তববাদী; গুডল্যাডের ভাষায় ‘মহিলার করোটিতে পুরুষের মস্তিষ্ক’ কিংবা ‘ইস্পাতের পাখি”। আম্বিয়ার তুলনায় লিসবেথ সাহসী, প্রতিবাদী চরিত্র। গুডল্যাডের অন্যায় দেখে সে চুপ থাকেনি, বরং প্রতিবাদ করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বদেশী পুরুষ কর্মকর্তার বুদ্ধির সীমাবদ্ধতাকে কটাক্ষ করতেও সে ছাড়েনি। ব্রিটিশদের এদেশে রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যে সমান ভূমিকা পালন করছে, তাদের আত্মত্যাগও যে পুরুষের তুলনায় কম নয়, নারীবাদী লিসবেথ তা স্পষ্টাকারে জানিয়ে দিয়ে বলেছে :

এ আমরাই আসলে

সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলে,

আমাদেরই দেহ ও আত্মার পরে নির্মিত এ রাজ্যপাট

আপনাদের খ্যাতির আড়ালে।

আমরা না এলে ইণ্ডিয়ায়

ইংরেজ মোগল হতো,

হুঁকো টেনে, পালকি চড়ে, গোধূলি বর্ণের পুত্র জন্ম দিয়ে দিয়ে

ইন্ডিয়ান হতো, তাই ইন্ডিয়ান এম্পায়ার হতো না। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৪০)

আম্বিয়ার চিন্তা একান্তই ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধাকেন্দ্রিক। নূরলদীনের ব্যক্তিগত দুঃখ-সুখ, স্বপ্ন, দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। অর্থাৎ নূরলদীনের যথার্থ সহধর্মিণী হয়ে উঠতে সে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, লিসবেথ তার স্বজাতি, স্বদেশ সম্পর্কে সচেতন। পুরুষ চরিত্রগুলোর সমান্তরালে সেও দেশের মঙ্গল, কোম্পানির উন্নতি নিয়ে সমানভাবে ভাবিত। লিসবেথ ইতিহাস হতে চেয়েছে।

কোম্পানির শাসনের বাইরে সে স্বপ্ন দেখেছে সেদিনের, ‘যেদিন এ ইন্ডিয়ায় দিকে দিকে বৃটেনের পতাকা উড়বে, […] ইতিহাস লিখবে এ কথা ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৩৯-৪০)। বস্তুত সৈয়দ শামসুল হক নূরলদীনের প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে বিদেশে বসে গবেষণার সময় ইয়োরোপীয় প্রাচ্য-প্রবাসী এক নারীর ব্যক্তিগত চিঠিপত্র থেকে লিসবেথ চরিত্র নির্মাণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

আবার, নাটকে নেতিবাচক চরিত্রগুলোর মানস-বিশ্লেষণেও নাট্যকারের আগ্রহ লক্ষণীয়। সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত সংবেদনশীল হৃদয় দিয়ে দেখিয়েছেন নেতিবাচক প্রত্যেকটি চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন কার্যকলাপের – পশ্চাতেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট কারণ। তিনি দেখিয়েছেন, আপাত অত্যাচারী চরিত্রের অভ্যন্তরেও রয়ে গেছে মনুষ্যত্বের কোমল দিক। যেমন, কোম্পানির তরুণ অফিসার মরিস চরিত্রটি যখন অন্যদের সম্মুখে তার কল্পনার রঙে রাঙানো সুখ-স্বপ্নের কথা জানান দেয়, বলে – দীর্ঘসমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই দূরদেশে যুবক বয়সে পরিবারহীন একা পড়ে আছে, তখন তার হৃদয়জুড়ে বিদ্যমান বিশাল এক শূন্যতা, দারিদ্র্য, অতৃপ্তি, স্বদেশে লাঞ্ছিত ও বঞ্চনাময় জীবনকথাই প্রকাশ পায়।

বস্তুত, গুডল্যাড, টমসন, মরিসসহ অন্যান্য চরিত্রের পারস্পরিক কথপোকথনে সুস্পষ্ট হয়েছে কোম্পানি শাসনামলের অন্য এক অন্ধকারময় দিক। উপনিবেশগুলোতে ব্রিটিশ অত্যাচারের কাহিনি লেখার সময় ইতিহাসবেত্তারা যা বরাবরই এড়িয়ে গেছেন। সৈয়দ শামসুল হক অত্যন্ত দরদ দিয়ে দেখিয়েছেন, ইংলিশ ক্লাবের আভিজাত্য আস্বাদনের স্বপ্নসাধ কীভাবে ইংরেজ যুবকদের পরিণত করেছে উৎপীড়ক, অত্যাচারী আর লুটেরাশ্রেণিতে। নেতিচরিত্রের প্রতি লেখকের এই সহমর্মিতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন :

একজন যখন পাপ করে এবং পাপের শাস্তি হিসেবে সে যখন দোযখে যাবে, ভাবার কোন কারণ নেই যে ঈশ্বর তাকে হেসে হেসে দোযখে পাঠাবে। ঈশ্বরের অবশ্যই মায়া হবে কারণ তার সৃষ্টির তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। যেহেতু হয়ে গেছে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাজা দিতে হলো। তো আমি যখন লিখি তখনতো আমি ঈশ্বর।১

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

বস্তুত, ইয়োরোপীয় বাস্তবতায়ও ছিল শ্রেণি-বিভাজন, বংশীয় ভেদ, ধন-বৈষম্য। অভিজ্ঞ কর্মকতা গুডল্যাড নবাগত তরুণ মরিসকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে তাদের এই বৈষম্যের কথা : দেহে নীল রক্ত নেই, পিতার সম্পদ নেই, / শীতের আগুন নেই, বর্তমান ভিন্ন কোনো বাস্তবতা নেই’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯২)। ফলে এই সম্পদশালী দেশে তারা কেবল এসেছে নিজেদের ভাগ্যপরিবর্তনের জন্য।

এ কারণে তারা কোম্পানির ধার্যবেতনের বাইরে দ্রুত সম্পদ অর্জনের জন্য অপশাসন, অত্যাচার, অবিচারের স্টিম রোলার চালাতে দ্বিধা করেনি। নিজেদের উন্নতির স্বার্থে দেবীসিংয়ের আচরণ অন্যায় জেনেও তাকে অবৈধ সমর্থন দিয়ে গেছে। নাট্যকার তরুণ কর্মচারী মরিসের জবানিতে প্রবাসী বেতনভুক ইংরেজ কর্মচারীর স্বপ্ন সম্পর্কে জানিয়েছেন নিম্নরূপে :

আমিও তো কল্পনায় দেখি, আমি ফিরে গেছি স্বদেশে আবার।

পল্লীতে আমার আছে সুরম্য ভবন।

আকাশে চিমনির ধোঁয়া, সবুজ বিস্তৃত মাঠ,

সোনার পাতের মতো পড়ে আছে রোদ,

হেঁটে যাচ্ছি, আমার বাহুতে পত্নী ভর দিয়ে পাশে।

[…] আমার তো সাধ হয়, মাঝে মাঝে রাজধানী যাই,

লণ্ডনের ক্লাবে গিয়ে বসি –

সুরা, তাস, অবসর, বঙ্গদেশ স্মৃতিমাত্র, বাটলার বাহিত ডিনার ।

আমিও তো চাই, পত্নীর সোহাগ চাই,

পুত্রের দু’হাত ভরে দিতে চাই নিশ্চিন্ত জীবন,

প্রাসাদে কন্যার চাই নাচে নিমন্ত্রণ, […]

আমার এ দেহে নীল রক্ত আমি চাই,

আমিও ব্যারন হতে চাই,

আমি চাই ব্যারনের জীবনযাপন। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৩)

নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকের সংগঠনশৈলী লক্ষ করলে দেখা যাবে কাব্যনাট্যটি দুটি পর্ব সহযোগে গড়ে উঠেছে। এখানে ‘প্রথম পর্ব – কালের মানচিত্র, দ্বিতীয় পর্ব মনের মানচিত্র। নাট্যকারের অভিপ্রায় ছিল, – কালের পটভূমি রচনা করে মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও অন্তস্তল তার প্রেক্ষিতে স্থাপন করা । নাটকে চৌদ্দটি দৃশ্যের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে প্রকাশ করেছেন নাট্যকার।

সূত্রধরের চরিত্র দিয়ে তিনি একালকে সেকালের সঙ্গে মিশিয়েছেন নাটকের ফ্ল্যাশব্যাক আঙ্গিকে।’ তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও স্বদেশীয় আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে গণমানুষের সামূহিক প্রতিবাদ অবলম্বনে রচিত নাটকটি যেন আদ্যোপান্ত গণমানুষের নাটক হয়ে ওঠে। ফলত, আধুনিক রঙ্গমঞ্চের বন্ধকামরা থেকে এ নাটকটিকে তিনি খোলা ময়দানে মঞ্চস্থ করতে অধিক আগ্রহী ছিলেন।

পূর্বের কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ে নাট্যপরিচালক যেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, সে বিষয়টি তিনি সুস্পষ্ট করেছিলেন। কিন্তু, নূরলদীনের সারাজীবন নাটরেক মঞ্চায়ন কৌশল নিয়ে তাঁর বিশেষ দাবি ছিল। নাটকের ‘সবিনয় নিবেদন’-এ তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন :

মনোযোগী পাঠক ও নাট্য নির্দেশক লক্ষ্য করবেন যে, এই কাব্যনাট্য লেখা হয়েছে খোলা আকাশের নিচে যে কোনো সাদামাটা চত্বরে অভিনীত হবার উপযুক্ত করে। নাট্যশালা বা মিলনায়তনে অভিনয় যদি করতে হয়, মঞ্চ অন্ততপক্ষে দর্শকের ভেতর পর্যন্ত প্রসারিত হওয়া জরুরি। প্রতিভাবান নির্দেশক যে কোনো ধরনের মঞ্চ এই কাব্যনাট্যের জন্যে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি আর যাই করুন, আমার পরামর্শ, ছবির ফ্রেমের মতো মঞ্চ যেন কল্পনা না করেন।

‘সবিনয় নিবেদন’ ছাড়াও নাটকের দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে নাট্যকারের তাৎপর্যপূর্ণ মঞ্চনির্দেশ চোখে পড়ার মতো ; ফলে নাট্যপরিচালক যখন পরবর্তীকালে মঞ্চে নাটকটি উপস্থাপন করতে গেছেন তখন পরিচালকের দক্ষতা ও নাট্যকারের কল্পনা মিলেমিশে নাটকটি অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।

নাট্যকার মঞ্চসজ্জা, সংগীতের সার্থক প্রয়োগ, আলোক প্রক্ষেপণ, চরিত্রের সাজসজ্জা, কোরিওগ্রাফি প্রতিটি বিষয়েই পরিচালকের উদ্দেশে কিছু কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যেমন, নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে নূরলদীনের জেগে ওঠার মুহূর্তটিতে নাট্যকার যেভাবে দৃশ্যায়িত করতে চেয়েছেন, তাতে মঞ্চায়নরীতি সম্পর্কে তাঁর সুগভীর জ্ঞানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি লিখেছেন :

সংগীত উচ্চগ্রাম থেকে প্রবাহিত ধারার মতো নেমে আসে নিচে এবং ধীরে উঠে দাঁড়ায় নূরলদীন। রক্তাক্ত চাদর তার গায়ে। সবাই তরঙ্গের মতো পিছিয়ে যায়। নূরলদীন ধীরে চোখ খোলে। রক্তাক্ত চাদর সে ছুঁড়ে ফেলে দের । প্রার ফিসফিস করে সংলাপ শুরু করলেও কয়েক পংক্তি পরে তার স্বর উচ্চগ্রামে পৌঁহার। […] নূরলদীন সকলকে পরিক্রমণ করে এসে কেন্দ্রে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্ত নাটকীয় নীরবতার পর হঠাৎ সে ঊর্ধমুখ হয়ে কাল্পনিক শিঙায় ফুঁ দেয়। শিঙা বেজে ওঠে। নৃত্যের ভঙ্গিতে সে লাফ দিয়ে উঠে কাল্পনিক ঢাকে কাঠি বাজায়। ঢাক বেজে ওঠে টিট্রি ডিডিম ডিম, ট্রিট্রি ভিডিম ডিম। ঘুরে ঘুরে সে নেচে চলে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : (৭৫)

এছাড়াও, সংলাপ রচনায়ও নাট্যকারের চমৎকার মঞ্চায়ন কৌশল দৃষ্টি এড়ায় না। যেমন, নাটকের একপর্যায়ে আছে নূরলদীনের উদ্দীপ্ত কথার আহবানে প্রভাবিত হয়ে কোনো কোনো নীলকোরাস লালকোরাসে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মঞ্চে এই পোশাক বদলের সময়টুকু যেন দৃষ্টিকটু না হয়ে স্বাভাবিক হয়, এবং নাটকের ধারাবাহিকতা যেন ক্ষুণ্ণ না হয়, সেজন্য নাট্যকার এই সময়টুকুতে নূরলদীনের মুখের সংলাপ ধারাবিবরণীর মতো করে সাজিয়েছেন :

আরে, আরে, নীলের ফেটা এই খুলিয়া দেয়,

এই খুলিয়া দেয় রে ফেটা, সাজ ফেলিয়া দেয়,

সাজ ফেলিয়া লাঠি পলো কাছে তুলি নেয়।

হারে – গোরার সাজে সাজ করিলেই গোৱা তো আর নয়,

নীল পিরানের তলে দ্যাখোঁ হামার মানুষ হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৮)

বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাট্যদল ‘নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় ১৯৮২ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রথম নূরলদীনের সারাজীবন নাটকটি মঞ্চায়ন করেছিল।

দলের প্রত্যেক সদস্যের কর্মনিষ্ঠা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর অধ্যাবসায়ের ফলে দীর্ঘ তিনমাস অনুশীলনের পর নাটকটির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল বাংলাদেশ মহিলা সমিতি মঞ্চে। প্রথম প্রদর্শনীতে টিকিটের মূল্য ছিলো ৫০ ও ৩০ টাকা; এবং প্রথম শো-এর দর্শকসংখ্যা ছিল তিনশতাধিক। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নাটকটির প্রদর্শনী হয়েছিল ৭৫ বার। নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যের প্রথম প্রদর্শনীর কলাকুশলীদের একটি তালিকা প্রসঙ্গত নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :

নূরলদীন চরিত্রে আলী যাকের, আম্বিয়া চরিত্রে লাকী ইনাম, আব্বাস চরিত্রে আসাদুজ্জামন নুর, লিসবেথ চরিত্রে সারা যাকের। ইংরেজ চরিত্রগুলোতে রূপদান করেছিলেন আতাউর রহমান, ইনামুল হক, আল মামুন ও আলম খুরশীদ। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন মিজানুর রহমান মিনু, গোলাম সারোয়ার, ফারুক আহমেদ, মাসুদ ইকবাল, মিজানুর রহমান পিন্টু, আনোয়ারুল ইসলাম খোকন, আবুল কাশেম, মনসুর আহমেদ, এস এস আখতার, লুৎফর রহমান, খালেদ মাহমুদ, শৈবাল দেব শুভ্র।

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

এছাড়া মঞ্চের নেপথ্যে কাজ করেছেন – নির্দেশক : আলী যাকের, মঞ্চ পরিকল্পনা : মনসুর আহমেদ, আলোক – পরিকল্পনা : সৈয়দ লুৎফর রহমান, আবহসঙ্গীত পরিকল্পনা : কে. বি. আল-আজাদ, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা : শায়লা নিমার, রূপসজ্জা : বঙ্গজিৎ দত্ত এবং দেবদাস, আলোক প্রক্ষেপণ : সিরাজ আহমেদ।

এদের প্রত্যেকের অনন্য অভিনয় দক্ষতা ও কারিগরি কুশলতার কারণেই মূলত নাটকটি মঞ্চে এতটা সফল হয়েছিল। বিশেষ করে নূরলদীন চরিত্রে আলী যাকের, আব্বাস চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর ও লিসবেথ চরিত্রে সারা যাকেরের সুঅভিনয় দর্শক-সমালোচকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। নাটকটির নির্দেশক আলী যাকের এক লেখনীতে জানিয়েছিলেন এ নাটকটি মূলত তাঁর জন্যে এক ধরনের পরীক্ষা ছিল। তিনি লিখেছেন :

বাংলা ভাষায় রচিত কোনো বীরগাঁথা এতখানি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রচিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। […] কী অসাধারণ মুন্সিয়ানা নিয়ে নাট্যকার ইতিহাসের পাতা থেকে বেছে নিয়েছেন একটি বিশেষ সময়, একটি বিশেষ স্থান এবং কিছু চরিত্রকে। তারপর প্রায় অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে বিছিয়ে পরীক্ষা করেছেন ঘটনা প্রবাহের, মানুষের মন-মানসিকতার। প্রত্যেকটি চরিত্র তখন তার আচ্ছাদন ছুঁড়ে ফেলে একবারে অন্তরের কথাটি তুলে ধরেছে। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার হৃদয়ের ছবি।

বুঝিবা তার অন্তর্গত অস্তিত্বে লালিত স্ববিরোধিতাও। […] নূরলদীনের সারাজীবন যদিও একটি সুগ্রথিত নাটক যাকে মঞ্চায়িত করা যায় ওয়েল মেড প্লে’ হিসেবে, তবু এর নির্দেশনা ছিল আমার জন্যে একটি পরীক্ষা। কারণ-এর গ্রন্থনায় যে ব্যাপ্তি (ল্যাটিচ্যুড) তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সত্যিই দুস্কর। এই নাটকের শুরু ক্লাইম্যাক্স দিয়ে। তারপর প্রায় প্রতি দৃশ্যেই লোভ হয় ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছতে অথচ নাট্যকার তা হতে দেন না।

ঘটনার মধ্যে সম্পৃক্ত কোনো এলিয়েনেশন উত্তেজনাকে প্রশমিত করে। ঘটনার যখন হচ্ছে বিস্তার, চরিত্র তখন তার আত্মগত সংঘাতে পৌঁছে গেছে। একপক্ষ যখন ভাবাবেগ মথিত, তার প্রতিপক্ষ তখন ধীর, স্থির। যখন নূরলদীনের গণবাহিনী সম্মুখ সমরের জন্য প্রস্তুত, কেবল ইংগিতের অপেক্ষায়, তখন নূরলদীনের সখা আব্বাস একান্তে দাঁড়িয়ে যুক্তি খুঁজে চলেছে, নিন্দা করছে এই হঠকারী সিদ্ধান্তের, এইভাবে এগিয়ে গেছে নাটক।’

নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যের ভাষাশৈলী বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। এ এমনই এক বাস্তবগন্ধী ভাষা, যার মূলকাঠামো রচিত হয়েছে উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিকতাকে ঘিরে, অথচ আঞ্চলিক শব্দের দুরূহতা কাটিয়ে তা হয়ে উঠেছে সর্বজনবোধগম্য ভাষা।

সৈয়দ শামসুল হক একদিকে বৃহত্তর উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষায় নাটকের সংলাপ রচনা করে বাংলা কাব্যনাট্যের ধারায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন; অন্যদিকে ব্রিটিশ বেনিয়াদের মুখে যে সাধু বাংলা ভাষা স্থাপন করেছেন, তাতে পরিষ্কার ভাবে অনুধাবন হয় – এইসব চরিত্র এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, কিংবা এদের মুখের ভাষাও ঠিক এদেশের আপামর জনগণের মুখের ভাষা নয়; এরা বহিরাগত।

বলাবাহুল্য, নাটকের চরিত্রগুলোর মধ্যে ভাষার এমন সুষম প্রয়োগের মাধ্যমে বৈপরীত্য নির্মাণের রীতি বাংলা কাব্যনাট্যে কিছুটা অভিনবও বটে। কেননা বাংলাসাহিত্যে ইতঃপূর্বে যখনই কোনো লেখক ইংরেজ অথবা বিদেশি চরিত্র সংযোজন করেছেন, তখন তার মুখের সংলাপে হয় – হিন্দি-বাংলা মিশ্রিত ভাষা দিয়েছেন; নয়তো তাদের দিয়ে ইংরেজি ধাচের উচ্চারণে বাংলা ভাষার সংলাপ বলিয়ে বুঝিয়েছেন এরা ভিনভাষী জনগোষ্ঠী ।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) একেই কি বলে সভ্যতার (১৮৬০) পুলিশ সার্জেন্ট চরিত্রের সংলাপ কিংবা দীনবন্ধু মিত্রের (১৮৩০-১৮৭৩) নীলদর্পণ (১৮৬০)` নাটকের ইংরেজ চরিত্রের সংলাপ লক্ষ করলে বিষয়টি অনুধাবন করা যায়। কিন্তু সৈয়দ শামসুল হক পূর্বজনদের এ ধারা থেকে বের হয়ে ব্রিটিশ চরিত্রের মুখে মান বাংলাভাষার সংলাপ সংযুক্ত করেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের এই অভিনব চিন্তাধারার প্রশংসা করে নাট্যপরিচালক আতাউর রহমান এক লেখনীতে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছিলেন :

এই কাব্য নাটকে নাট্যকার প্রধানত রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা সংলাপ রচনায় ব্যবহার করেছেন। ব্রিটিশ সাহেবদের সংলাপ হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন পরিশুদ্ধ বাংলা ভাষা। তিনি শচীন সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ বা তৎকালীন অন্যান্য ঐতিহাসিক নাটকে ব্যবহৃত ব্রিটিশ চরিত্রের সংলাপ রচনায় ‘হামি’, “টুমি’, ইত্যাদি পরিহার করেছেন। […] আমি দৃঢ় প্রত্যয়ে ব্যক্ত করতে চাই যে, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষদের কাছে এই নাটকটির জনপ্রিয়তা কোনোদিনই হ্রাস পাবে না।’

এই নাটকের একদিকে রয়েছে শোষক শ্রেণি, অন্যদিকে রয়েছে শোষিত শ্রেণি। এ দুটি শ্রেণির মধ্যে যেমন রয়েছে ভাষার পার্থক্য, তেমনি ভাবে চলনে-বলনে, আচারে-বিচারে তারা পরস্পর পরস্পরের দূরবর্তী। কিন্তু আশ্চর্যরকম শিল্পকুশলতায় নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক একই ফ্রেমে তাদের বেঁধে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।

একদিকে তিনি সাধারণ কৃষক চরিত্রের মুখের সংলাপে রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা সংযুক্ত করে কাহিনিটিকে একটি শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন; অন্যদিকে ইংরেজ চরিত্রগুলোর মুখের সংলাপে ইংরেজি শব্দমিশ্রিত ধ্রুপদী ভাষা প্রয়োগ করে নিম্নবিত্ত শোষিত শ্রেণির সঙ্গে উচ্চবিত্ত শোষকশ্রেণির ভাষাগত দ্বন্দ্বাভাস নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

আবার নাট্যকার নাটকের পাঁচজন ইংরেজ চরিত্রের মুখের সংলাপে যে ধরনের ভাষা প্রয়োগ করেছেন, আপাত বিচারে সেটি পরিশুদ্ধ বাংলাভাষার প্যাটার্ন মনে হলেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই সংলাপের গাঁথুনি মূলত ইংরেজি ভাষার বাক্যগঠনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অবশ্য এই বিষয়টি প্রথম অনুধাবন করেছিলেন নাট্যপরিচালক সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়।

১৯৯৯ সালে নিউইয়র্কের অফ-অফ-ব্রডওয়ের নিরীক্ষামূলক প্রেজেন্ট থিয়েটারের থিয়াটোরিয়াম মঞ্চে সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হকের উপস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে প্রথম নূরলদীনের সারাজীবন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় তখন নাটকের ইংরেজ চরিত্রের সংলাপগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে দেখেন, নাট্যকার বাংলা ভাষায় সংলাপগুলো লিখলেও তার ভেতরে ইংরেজি বাক্যের প্যাটার্ন হুবহু রক্ষা করেছেন।

এমনকি সংলাপে তিনি সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে ভারত-প্রবাসী ইংরেজকর্তৃক ব্যবহৃত ঔপনিবেশিক শব্দ, উপমাগুলো পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় এ-অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় লিখেছেন :

নাটকটিতে ইংরেজদের দৃশ্যগুলো সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন এক ধরনের stylized বাংলায়, যেখানে ভাষা কাব্যিক, শব্দচয়ন সততই ধ্রুপদী, ছন্দোময়; ইংরেজি নাটকে যে ধরনের কাব্য ব্যবহার হয়ে থাকে, সেই কাব্যাধারে প্রোথিত। হক সাহেব হয়ত ভেবেছিলেন ইংরেজিতে, লিখেছিলেন বাংলায়।

আমি একবার তাঁকে এই প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কতকটা তাই’। […] বুঝতে পারলাম, হক সাহেব যে ‘মশালচি” শব্দটা ব্যবহার করেছেন, সেটা উনি জেনেই ব্যবহার করেছেন। ক্ষুরধার গবেষকের দৃষ্টি কিছুই এড়ায়নি। উনি নাটক লেখার সময়েই জেনে নিয়েছিলেন যে, অনুবাদের মাধ্যমে নয়, মশালচি শব্দটি ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ভাষার মধ্যে এনে ফেলেছিলেন। ঠিক যেমন আমরা বাংলায় হজম করে নিয়েছি, টেবিল, গেলাসের মতো শব্দ। ‘

নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের ইংরেজ চরিত্রের মুখে সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় অনূদিত ইংরেজি ভাষার সংলাপ এবং সৈয়দ শামসুল হক রচিত মূল বাংলা সংলাপ পাশাপাশি রাখলে বোঝা যাবে, নাট্যকার কতখানি গভীর মেধা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে আলোচ্য নাটকে ইংরেজ চরিত্রের সংলাপ নির্মাণ করেছিলেন। যেমন :

হো হো মশালচি।           Ho-ho- mussaulchee.

লণ্ঠন, লণ্ঠন, দেখাও।      Lantern, show the lantern.

অতিথিরা চত্বরে আসুন।  Guests, come out here.

চমৎকার পূর্ণিমা এখানে।   Wonderful moonlight here.

আপনারা এখানে আসুন।   All of you, come out here. ( পঞ্চম দৃশ্য)’

আবার, ইংরেজ চরিত্রের মুখে তৎসমশব্দবহুল সংলাপের একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যেতে পারে। কুঠিয়াল টমসনের স্ত্রী লিসবেথের আপ্যায়নের প্রশংসা করে কালেকটর গুডল্যাডের উক্তি :

আপনার পত্নীর আতিথ্য,

ঝলসানো বৃষমাংস লোহিত কোহল,

স্বদেশে না বংগদেশে আছি কোনো খেয়াল ছিল না। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৮৬)

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

তৎসম শব্দের পাশাপাশি ইংরেজ চরিত্রের মুখের সংলাপে প্রয়োজনানুসারে ইংরেজি শব্দও বসিয়েছেন তিনি, এবং সেখানে বজায় রেখেছেন ব্রিটিশ কথ্য উচ্চারণের ঢং। গুডল্যাড ও মরিসের পারস্পরিক আলাপ উল্লেখ্য :

ডিয়ার মরিস, কোম্পানির রেভেনিউ সুপারভাইজার,

স্বার্থ আছে আমাদেরও। নির্ধারিত রাজস্ব আদায় ।

কোম্পানির কুঠির ফ্যাকটর, […]

তাছাড়া, নিশ্চয় তুমি জানো,

অন’বল ওয়ারেন হেস্টিংস, তার বড় প্রিয়পাত্র এই

দেবী সিং – এবং আমারও। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১০)

আবার, ইংরেজ চরিত্রগুলোর সংলাপে যে আভিজাত্যপূর্ণ প্রমিতভাষা ব্যবহার করেছেন নাট্যকার, তাতে শাসকগোষ্ঠীর আত্ম-অহম, দম্ভ, গাম্ভীর্য বিশেষত, উপনিবেশবাদী আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি, ইয়োরোপীয় সংস্কৃতি, আর স্বপ্নের নিবিড় পরিচয় মেলে।

এদেশের ভূপ্রকৃতি, মানুষ ও তাদের সারল্যকে তারা তুলনা করেছে ‘ঈশ্বরবর্জিত ভূমি’, ‘গোক্ষুর সর্প’ কিংবা ‘অলস কুকুরের সঙ্গে। কোনোরূপ তত্ত্বকথা, বর্ণনা-বিবৃতির আশ্রয়ে নাটককে ভারাক্রান্ত না করে সাধারণ সংলাপের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক মানস ও দৃষ্টিভঙ্গির এমন উপস্থাপন সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। যেমন কুঠিয়াল টমসন এদেশীয় কর্মচারীদের সম্পর্কে মন্তব্য করেছে নিম্নরূপ ভাষায় :

এই কৃষ্ণ কুকুরেরা এতটাই অলস বধির,

ভূমিকম্প বিনা কিছু শোনে না, এবং

ভূমি থেকে – নিতম্ব তোলে না। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৮৮)

আলোচ্য নাটকে এদেশীয়দের মুখের সংলাপ নির্মাণে নাট্যকার মৈয়মনসিংহ গীতিকা-দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, যেটি তিনি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে কেবল লোকায়ত সংলাপের ধাঁচ নয়; বরং মৈয়মনসিংহ গীতিকায় ব্যবহৃত প্রারম্ভিক বন্দনা, লোকজ সংগীতের ব্যবহার ও বাক্য কাঠামোর সঙ্গে এই কাব্যনাটকের অনেকাংশের সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, মৈমনসিংহ গীতিকার প্রারম্ভ বন্দনায় আছে :

দক্ষিণে বন্দনা গো করলাম ক্ষীর নদী সাগর।

যেখানে বানিজি করে চান্দ সদাগর ।

উত্তরে বন্দনা গো করলাম কৈলাস পর্বত ।

যেখানে পড়িয়া আছে গো আলীর মালামের পার

নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাট্যের চতুর্দশ দৃশ্যে নূরলদীনের একটি সংলাপ নাট্যকার এই বন্দনাগীতির ঢঙে নির্মাণ করেছেন :

এ দ্যাশে হামার বাড়ি উত্তরে না আছে হিমালয়,

উয়ার মতন খাড়া হয় য্যান মানুষেরা হয়।

এ দ্যাশে হামার বাড়ি দক্ষিণেতে বঙ্গপোসাগর,

উয়ার মতন গর্জি ওঠে য্যান মানুষের স্বর।

এ দ্যাশে হামার বাড়ি পূর্ব দিকে ব্ৰহ্মপুত্ৰ আছে,

উয়ার মত ফির মানুষের রক্ত য্যান নাচে।

এ দ্যাশে হামার বাড়ি পশ্চিমেতে পাহাড়িয়া মাটি,

উয়ার মতন শক্ত হয় য্যান মানুষের ঘাঁটি। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৪৯)

আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নাটকে নাট্যকার অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘রংপুরের স্থানীয় ভাষার নাসিক্য ধ্বনির প্রাধান্য এই নাটকে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কাঁই, পাওঁ, মরো, কইছিলু, মুই, চাও, প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাছাড়া হামার, বাহে, কোনঠে, এলাও – এইসব শব্দের ব্যবহারেও রংপুরের ওই আঞ্চলিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। আবার উচ্চারণের প্রলম্বনের মধ্য দিয়েও নাট্যকার এই নাটকে আঞ্চলিকতাকে ব্যবহার করেছেন। সে কারণে তেসরা হয়েছে তেসোরা, […] শিব হয়েছে শিবো।” “শুতিয়া আছে নূরলদীন কব্বরেরও তলে’ (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৭২) এখানে শোয়া – ভুতিয়া, – কব্বরের – কবরের হয়েছে।

আবার, চরিত্রমুখে স্থানের নাম ব্যবহার করেছেন আঞ্চলিক টানে : ‘খেয়াল করি দ্যাখেন, বাহে, পাটোগ্রামের লড়াই।’ (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৭২) এখানে পাটগ্রাম হয়েছে পাটোগ্রাম।

নাটকের বিভিন্ন সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার বাস্তবতা আনয়নে গ্রামীণ মানুষের ব্যবহৃত অপভাষা ও কথ্যরূপও অবিকল রেখেছেন। যেমন, নীলকোরাস ও লালকোরসের মুখোমুখি অবস্থানকালে লালকোরাসের একটি সংলাপ উল্লেখ করা যেতে পারে :

হারে শালার শালা,

নীল ফেটাতে সাজ করিছো শালা। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ৭১)

বাস্তবতার প্রয়োজনে নাটকে আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ করলেও তা যেন সার্বিক বাঙালির বোধগম্য ভাষা হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে যথেষ্ঠ মনোযোগী ছিলেন নাট্যকার। এ বিষয়টি তিনি নাটকের প্রারম্ভে ‘সবিনয় নিবেদন’ অংশে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন :

ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় নামটি লিখেছেন – নূরলউদ্দিন, আমরা বলব ওটা হবে নূরুদ্দিন, কিন্তু আমি ব্যবহার করেছি – নূরলদীন, রংপুরের সাধারণ মানুষেরা যেমনটি উচ্চারণ করবে। রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা এই কাব্যনাট্যে ব্যবহার করা হলেও, আমি চেষ্টা করেছি যথাসম্ভব বাঙালী সবার বোধগম্যতার ভেতরে থাকতে অনেক শব্দের বেলায় নিকটতর পরিচিত রূপটি প্রয়োগ করেছি, যেমন ‘বলিল’-এর জায়গায় ‘বলিলোমা কিংবা ‘সেঠায়’-এর জায়গায় ‘সে ঠাঁই’; একটি শব্দ ‘ডিং খরচা’-ইতিহাসে আছে, নূরলদীন যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্যে এই নামে কৃষকদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেন। ‘

রংপুর অঞ্চলে ব্যবসার প্রসারে, শাসনের প্রয়োজনে, এমনকি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে নানান জাতির আগমন ঘটেছে। ফলে এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে এসব জাতির ভাষা মিশ্রিত হয়ে এখানকার লোকজভাষা হয়ে পড়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ। যেমন, এ অঞ্চলের ভাষায় ফার্সি ভাষার শব্দাবলি, ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রবেশ করেছে মূলত পারস্যের সুলতানি রাজন্যবর্গের শাসনামলের প্রভাবে।

মুসলিম প্রধান এদেশের মানুষ অনায়াসেই তাদের ভাষার শব্দসম্ভারে ফার্সিভাষার শব্দ গ্রহণ করে নিয়েছে। ফলে কী ধর্মীয় কাজে, কী দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মে, সবখানেই ফার্সি শব্দের প্রয়োগ লক্ষণীয়। সৈয়দ শামসুল হক রচিত নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের সংলাপেও এই বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।

লালকোরাসের মুখের সংলাপে দেবতা শিবের সঙ্গে মিলিয়ে হযরত আলীর বন্দনা করার বিষয়টি যেমন এদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিচয় দেয়, তেমনিভাবে এ অঞ্চলে পারস্যের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রভাবও’ অস্বীকার করা যায় না। যেমন :

আলী, মাথায় তুলি ধর,

শিবো, মাথায় তুলে ধরো

আলী শিবো স্মরণ করি আস্তে চলো ঘর। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৮১)

আলোচ্য নাটকে কোরাস চরিত্র সংলাপ প্রক্ষেপণে সবসময় একটি নির্দিষ্ট তাল ও ছন্দ মেনে চলেছে। এ কারণে তাদের যূথবদ্ধতা, দ্রোহ, সংগ্রাম অনুভূত হয়েছে ভাষার গতিময়তায়। একদল মানুষের চলার গতি, লাঠি ঠোকার গতি সংলাপের মধ্যে অত্যন্ত সুষ্পষ্ট। যেমন, নীলকোরাস যখন নূরলদীন ও তার বিদ্রোহী কৃষকবাহিনীকে অনুসন্ধান করেছে তখন তাদের গতিময়তা ও যূথবদ্ধতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে স্বরবৃত্ত ছন্দ। শব্দের দ্বিত্ব উচ্চারণে, অনুপ্রাসের মাধুর্যে এ অংশের ভাষা হয়েছে গতিময় ও সংহত :

তালাশ করো তালাশ করো তালাশ করি দ্যাখো।

তালাশ করো তালাশ করো তালাশ করি দ্যাখোঁ।

দস্যু নূরলদীনে দ্যাখো আশেপাশেই আছে –

আছে আছে আছে

কঙ্গুর নয় উড়িয়া গেছে

মিছরিও নয় গলিয়া গেছে

আছে আছে আছে […]

তালাশ তালাশ তালাশ । (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১২৩)

ভাষার এই গতিময়তা, সংলাপের তাল সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হক নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :

‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এ আমি পাশ্চাত্যের সাম্প্রতিক রক মিউজিক্যাল নাটকের গঠন-কৌশল আমাদের ময়মনসিংহ গীতিকার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি।

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

দীর্ঘ প্রবাসযাপনে পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি স্বভাবতই সৈয়দ শামসুল হকের একধরনের অনুরাগ জন্ম নিয়েছিল। এ নাটকে সে-অনুরাগের ছাপ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পরবর্তীকালে তাঁর রচিত আরেকটি কাব্যনাটক অপেক্ষমান (২০০৯)এ-ও কোরাস চরিত্রের (ব্রেক ডান্সারের দল) মুখে রক মিউজিকের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

বস্তুত, ‘রক মিউজিক্যাল ড্রামার অনুসরণ করার জন্য সৈয়দ শামসুল হক এ নাটকে নূরলদীনের স্ত্রী আম্বিয়ার মুখে গান ব্যবহার করেছেন। এ গানও আঞ্চলিক গানের মতো। নাটকের সঙ্গে এ গানের বক্তব্য ও আঙ্গিক মিলে গেছে, সহজে।
উল্লেখ্য যে, সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যে ব্যবহৃত রংপুর অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বহুপূর্বেই সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষার পরিচয় ঘটেছে মূলত ‘ভাওয়াইয়া” ‘চটকা’ প্রভৃতি জনপ্রিয় লোকগানের মাধ্যমে।

আর্ন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞানী স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন কর্তৃক সংগৃহীত এবং প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে গীত এমনই একটি ‘ভাওয়াইয়া’ গানের সঙ্গে নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের আম্বিয়া চরিত্রের মুখে গীত লোকগানের সাযুজ্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, ১৯৪০ সালে আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে রেকর্ডকৃত ভাওয়াইয়া’ গানটির কথা ছিলো নিম্নরূপ :

আবো (দাদিমা) নওদারিটা মরিয়া

মোর যে হইছে দানি (ক্ষতি)

আন্ধার ঘরে পড়ি থাকো

পড়ে চৌখেন পানি

আবো টাপ্‌পাস কি টুপ্‌পুস করিয়া ।

বস্তুত, বর্ণ তথা ধ্বনির এমন দ্বিত্বের প্রয়োগ ‘চটকা’ গানের আকর্ষণ বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। সৈয়দ শামসুল হক নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটকে রংপুর অঞ্চলের সাধারণ কৃষিজীবনের সংস্কৃতি চিত্রিত করতে এমনই একটি *চটকা’ গানের প্রয়োগ করেছেন। নূরলদীন যখন কৃষকের ন্যায্য অধিকারের আন্দোলনে ব্রিটিশ বেনিয়াদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য গৃহত্যাগী হয়, তখন নূরলদীনের স্ত্রী আম্বিয়ার মনের সংশয় ও সম্ভাবনার মিশ্র অনুভূতি প্রকাশের নিমিত্তে প্রয়োগকৃত চটকা-শ্রেণির গানটি নিম্নরূপ :

মোর পতিধন জংগতে যায় ডিমলা শহরে,

মুই নারী হে এলায় একা নিশীথ পহরে।

কোন কালে সে আসিবে আর বিজয় করিয়া ?

চোখ ফাটিয়া পড়ে পানি টুপুস করিয়া –

ওকি টাপলাস কি টুপলুস করিয়া। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৩৩)

বস্তুত, ‘রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত পয়ার ছন্দে বিন্যস্ত ব্যতিক্রমী এই কাব্যনাট্য বাংলা নাটকের ইতিহাসে সঞ্চার করেছে নতুন এক মাত্রা’। তবে আলোচ্য কাব্যনাটকের সংলাপে অলংকার, উপমা, চিত্রকল্পের ব্যবহার সৈয়দ হকের প্রথম কাব্যনাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-এর তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।

মূলত, অলংকারবহুল ভাষা নয়, আঞ্চলিক শব্দের সুষম প্রয়োগেই এ নাটকের ভাষায় বাস্তবতা এসেছে, এসেছে গীতময়তা। বক্তব্যকে আরও নান্দনিক ও বাস্তবসম্মত করে তুলতে নাট্যকার সংলাপে কিছু কিছু উপমা অলঙ্কারের প্রয়োগ করেছেন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে। নিম্নে এমন কিছু উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অলঙ্কার দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হলো :

উপমা :

১. ধবলদুধের মতো জ্যোৎশা তার ঢালিতেছে চাঁদ-পূর্ণিমার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬৭)

২. তাদের পিচ্ছিল দেহ কৃষ্ণবর্ণ বিদ্যুতের মতো এই দ্যাখা যায়, এই নিমিষে মিলায়, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৮৭)

৩. আকাশে চিমনির ধোঁয়া, সবুজ বিস্তৃত মাঠ,

সোনার পাতের মতো পড়ে আছে রোদ, ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯২)

৪. দ্যাখেন দ্যাখেন আরো কতক আছে উয়ার পরে,

গাং টিটির পংখী যেমন তোমাক লক্ষ্য করে। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৮)

৫. বাপজান, বাপ মোর, ভাগাড়ে অন্তিমকালে পশুর মতন,

ডাক ভাংগি উঠিল হাম্বায় । (কাব্যনাট্যসমগ্র: 120 )

৬. পুন্নিমার মতো হয় সন্তানের মুখ রোশনাই। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১২)

উৎপ্রেক্ষা :

১. নূরলদীনেরও কথা যেন সারা দেশে

পাহাড়ী ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়, (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬৮)

২. দূরান্ত দূরান্ত হতে য্যান ঢল পাহাড়ী তিস্তার

হাজার হাজার জন লক্ষ লক্ষ সর্বহারা আসিছে ছুটিয়া ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৪৭)

 

নূরলদীনের সারাজীবনের শৈলিবিচার

 

চিত্রকল্প

১. নিলক্ষা আকাশ নীল, পনে পন জ্বলি আছে তারা। সুমার না করা যায়, হয়া যায় সবে দিশেহারা । মোহরের ছালা খ্যান পড়ি গেছে কোম্পানীর মাঠে, উয়ার ভিতর দিয়া গারবুলি করি চান হাঁটে। […] দ্যাখো, চান ভাসি যায় নীলে। (কাব্যনাট্যসমগ্র: ১১১ )

এখানে নূরলদীনের বন্ধু আব্বাসের পর্যবেক্ষণে মধ্যরাতের পূর্ণিমার আকাশের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাট্যকার অপার্থিব এক জগৎ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত আব্বাসের চোখে দেখা আকাশে তারার মেলাকে মনে হয়েছে কোম্পানির ময়দানে ছড়িয়ে রাখা সোনার মোহর! আর তার ভেতর দিয়ে চাঁদ যেন হেঁটে যাচ্ছে গারবুলি করতে! সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) যেমন চাঁদকে ঝলসানো রুটির সঙ্গে তুলনা করেছিলেন তাঁর ছাড়পত্র (১৯৪৭) নামক কাব্যে, তেমনি সৈয়দ শামসুল হক অর্থকষ্টে নিপতিত আব্বাসের চোখের তারকারাজিকে স্বর্ণমোহরের সঙ্গে তুলনা করে অনন্য চিত্রকল্প নির্মাণ করছেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের ক্যানভাসজুড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে চোখে পড়ে জ্যোৎস্নার ব্যবহার। বস্তুত, জ্যোত্মার এই নান্দনিক ব্যবহার নাট্যকারের জীবনবাস্তবতা থেকে উৎসারিত; যেটি তিনি পরবর্তীকালে নিজের আত্মজীবনীমূলক রচনায় উল্লেখ করেছেন।

সৈয়দ হকের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, লেখকের বয়স যখন ১৮ বছর তখন তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটে। মায়ের বয়স তখন মাত্র চৌত্রিশ। নাট্যকার প্রথম সন্তান হিসেবে সে সময়ে মায়ের খুব কাছাকাছি থেকে বিশাল পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন; এবং পরিবারের চিন্তায় অসংখ্য রজনী বিনিদ্র কেটেছে মায়ের পাশে বারান্দায় বসে জ্যোৎশ দেখে। এই দিনগুলিতে দর্শনীয় প্রকৃতির রূপবিভা তাঁর মস্তিষ্ককোষে থেকে গেছে বহুকাল। লেখক এ প্রসঙ্গে বলেন :

আমার তখন আঠার বছর বয়স; আমার মা মাত্রই চৌত্রিশ। […] আমি তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র থেকে হয়ে উঠেছি যেন তাঁরই সহোদর, পিতার সংসার পরিচালনা করেছি। মনে পড়ে সেসব মধ্যরাতের কথা জ্যোৎশায় ভেসে যাচ্ছে কুড়িগ্রামের উঠোন, শব্দহীন পৃথিবী, আমরা দুটিতে বসে আছি বারান্দার হেলনা বেঞ্চিতে, তাকিয়ে আছি বিশ্বের ওই অপার সৌন্দর্যের দিকে, ভুলে গেছি আগামী কাল কী করে আহার জুটবে সেই দুর্ভাবনা । […] আমি আর মা, অনুভব করেছি, জীবন এখনো এখানেই আছে।

ওই জ্যোৎস্না আমার মর্ম নিশ্চয় আলোকিত করে থাকবে; তাই দেখি জ্যোৎস্না বারবার ফিরে এসেছে আমার লেখায় – কবিতায়, নাটকে। ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ কাব্যনাট্যে যে জ্যোৎস্নার উল্লেখ, নিশীথে জ্যোৎস্না রাতেই যে কৃষকযোদ্ধাদের চলাচল, নাটকটির অধিকাংশ দৃশ্যই যে জ্যোৎস্নারাতেই ঘটে – শুরুতেই সূত্রাধার যে বলে : ‘ধবল দুধের মতো জ্যোৎস্না তার ঢালিতেছে চাঁদ পূর্ণিমার।’ […] নাটকের প্রায় অন্তিমে নূরলদীন যখন আব্বাসকে বলে

‘পুন্নিমার চান বড় হয় রে ধবল –

জননীর দুগ্ধের মতন তার দ্যাখোঁ রোশনাই।’

তখন কি সন্দেহ থাকে, এই জ্যোৎস্না সেই জ্যোৎ পৃথিবীর সকল জ্যোৎস্নার ভেতরে সদ্য কৈশোর পেরুনো যুবক আমি, আমার তরুণী বিধবা জননীর সাথে বাংলার গভীরে কোনো এক শহরের নিশীথে জ্যোৎস্নায় স্থান করে ওঠার সেই স্মৃতিটিকেই বপন করে উঠেছি?’

রূপক/ প্রতীক :

১. বৃক্ষ যদি বড় হয়, শিকড় তুলিতে তার সময় তো লাগে ?/ বোঝেন নিশ্চয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১৩০) ব্রিটিশ রাজশক্তি পুরোপুরি এদেশে গেড়ে বসার পূর্বে তাদের সমূলে বিনাশ করার ইচ্ছা আব্বাসের সংলাপে বৃক্ষের প্রতীকে ব্যবহৃত হয়েছে।

সমাসোক্তি :

১. স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি ? কোন শব্দ ? কিসের প্রপাত ? (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৬৭)

২. আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে

যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে, (প্রাগুক্ত)

৩. নিলক্ষারে নীল বৃক্ষ করি দিলো গুম / অকস্মাতে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৮৪)

৪. পুন্নিমার চান হাঁটি যায় / মাথার উপর দিয়া, নিচে না তাকায়। ( কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১২)

প্রবাদ/ প্রবাদপ্রতিম বাক্য :

১. রাস্তায় নামিলে পরে রাস্তা নাই ফিরিয়া যাবার। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৭)

২. এককালে সুই, / অন্যকালে তাই ফাল হয়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১৪)

৩. না নাচিয়া লোকের কথায় / হঠাৎ ঝাঁপ না দেও পাহাড়ী সোঁতায়। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১৫)

৪. নেটিভের চরিত্র লক্ষণ / সংবাদে নড়ে না, কিন্তু গুজবে সে ওড়ে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯৪)

৫. মাঝির অন্তর যদি ভাংগি যায়, নৌকা তার টুকরা হয়া নদীজলে ভাসে। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১১৩)

৬. স্বার্থটা উভয় পক্ষে এক হলে, মিত্র হয়ে যায় / পরম শত্রুও। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ৯০)

এছাড়া, নাট্যকার চরিত্রের সংলাপে বিরামচিহ্নের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে সংলাপের ভাব ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত সফল ভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন, পরস্পর বিরোধী দুই পক্ষের দূরত্ববজায় রেখে সংলাপ বিনিময়কালে তিনি সংলাপের প্রতি শব্দের পর ড্যাশ চিহ্ন প্রয়োগ করে স্বরের প্রলম্বন বুঝিয়েছেন।

আবার নূরলদীন যখন সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে আহবানমূলক বক্তব্য রেখেছে, সেখানেও স্বরের প্রলম্বিত অবস্থা বোঝাতে ড্যাশ চিহ্নের তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োগ করেছেন নাট্যকার। ৬ষ্ঠ দৃশ্যে কুঠিয়ালসহ ইংরেজ কর্মচারীদের সঙ্গে নূরলদীন ও তার সঙ্গীদের সংলাপ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে।

এখানে নাট্যকার শুরুতেই মঞ্চনিৰ্দেশক হিসেবে বলে দিয়েছেন দূর থেকেই পরস্পরের হাঁক শোনা যাবে। এবং এ বিষয়টি সংলাপেও ড্যাশ চিহ্নের ব্যবহারে উপস্থাপন করেছেন নিম্নরূপে :

লেফটেন্যান্ট। থামো – হোথামো ও। […] আর অগ্রসর নয়। – কে তোমরা ? বলো হো – ও।

নূরলদীন। মানুষ হো – ও।

মাঠের মানুষ, দেশের মানুষ, হামরা মানুষ হো – ও

লেফটেন্যান্ট । কি চাও হো ও ? কি উদ্দেশ্য – ও।

নূরলদীন। দূর হতে কি বলা যায় হামার উদ্দেশ্য – ও। (কাব্যনাট্যসমগ্র : ১০০ )

এভাবে কোনোরূপ তাত্ত্বিক গুরুগম্ভীর আলাপে না গিয়ে নাট্যকার সহজ বচনে বিভিন্ন চরিত্রের মানসলোক বিশ্লেষণ করেছেন। সংলাপের এমন সহজতর উপস্থাপনের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের স্বপ্ন-সাধ, আচার-উচ্চারণের স্বরূপ উপস্থাপনে বিস্ময়কর সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক।

মূলত ভাষা, সংলাপ ও অলংকারের মিলিত সমবায়ে ‘অবহেলিত ব্রাত্য অথচ বিদ্রোহী নূরলদীন হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক।” বাংলা নাট্যাঙ্গনে নূরলদীনের সারাজীবন নাটকের কালজয়ী অবস্থান এর বিষয়গুণে যেমন, তেমনি উপস্থাপনার অনন্যতায় ।

Leave a Comment