মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

‘ছন্দপতন’ (১৯৫১) উপন্যাসটি একজন কবির জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন একজন কবি, তার চারপাশের জগৎ এবং তার মানস জগতের বিভিন্ন রূপ। উপন্যাসের শুরুতে কবি নবকুমার নিজের সম্পর্কে বলেছেন:

“আমি একজন কবি।” (৭৬, পৃ-৩৯৫)

কবি নিজের স্বরূপটি প্রথমেই তুলে ধরেছেন, তার বয়স মাত্র পঁচিশ এবং তিনি বস্তুবাদী কবি। তিনি আরো বলেছেন: “শুধু কবিতায় নয়, জীবনেও আমি বস্তুবাদী।” (৭খ, পৃ-৩৯৫)

উপন্যাসের শেষ হয়েছে নবকুমারের সত্য সন্ধানের মধ্য দিয়ে:

“শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় মানুষের আপন না হয়ে কী করে জানবো সেই প্রাণের ভাষা- যে ভাষা ছাড়া জীবন কবিতায় কথা কয় না।” (৭খ, পৃ-৪৫৭)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

 

এই কবি নবকুমার মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। মা আর দাদা-বউদির সংসার। বউদি তাকে বিশেষ স্নেহ করে। কিসে তার ভালো হয়, মন্দ হয় সব বউদি দেখে। নবকুমারের বন্ধু মানসী বড় ডাক্তারের মেয়ে বড় অফিসারের বোন। এ বিষয়ে বউদি তাকে আগে মানসীদের যোগ্য হতে বলে। কিন্তু নবকুমার মানসীকে নিয়ে ঘর বাধার স্বপ্ন এখনো দেখে নি। এই মানসীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল কবিতা নিয়েই।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা নবকুমারের মুখে শুনে মুগ্ধ হয়েছিল। মানসী মানসীর সঙ্গে পরিচয়ের পরদিন নবকুমার হারাণের পরিবারের সঙ্গে দার্জিলিং চলে যায়, তার ছয় বছরের ছেলে আর সাত বছরের মেয়ের দেড় মাসের টিউটর হয়ে। এখানে হারাণের বড় মেয়ে রমা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই টিউশনি ছুটিয়ে দেয় তৃপ্তি নামে নবকুমারের আরেক বান্ধবী। নবকুমার এভাবে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসে।

নবকুমারের বন্ধু অধীরের বাড়িতেও তার যাতায়াত আছে। তারা বাংলাদেশ থেকে কলকাতা এসেছে। এক ঘরের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। বাবা, মা, বোন আলেয়া, তার স্বামী নিখিল আর ছোট বোন মলয়া। নিখিল চানাচুড় বানিয়ে বিক্রি করে। বাড়িতে বলে অফিসে চাকরি করে। একসময় বাড়িতে ধরা পড়ে যায়। এই পরিবারটিকে দেখে নবকুমার জীবন সংগ্রাম বুঝতে চেষ্টা করে ।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

 

একদিন বাংলাদেশ থেকে আসা সর্বস্বান্ত কলোনিতে থাকা মেয়ে তমালের কল থেকে জল ভরা নিয়ে কবিতা লেখে নবকুমার। কবিতাটি সুধী মহলে বিশেষ সাড়া জাগায়। সে মানসী, তৃপ্তি আর বউদিকে একসঙ্গে শোনায়, তারাও স্তব্ধ হয়ে যায়। রাত করে যায় নিখিলের বাড়ি। সেখানে সকলে কবিতাটি শুনে সম্মোহিত হয়। কিন্তু কেউ এই কবিতার মূল কথাটি বুঝতে পারে না।

অবশেষে তমালকে শোনাতে সাধ জাগে। তমাল শুনে বলে কেমন খিটিমিটি ধরনের কবিতা। পথে আসতে আসতে সে কবিতাটি ছিঁড়ে ফেলে। নবকুমার বুঝতে পারে মানুষকে ভালো না বাসলে মানুষের অন্তরের মানুষ না হলে মানুষের জন্য ঠিক কবিতাটি লেখা যায় না।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছন্দপতন উপন্যাস

 

-তৃপ্তির কাছে এই সত্য ধরা পড়ে, নবকুমার তার সন্ধান পায়। সে আবার নতুন করে চিন্তা করে। একজন সমালোচক মন্তব্য করেছেন।

“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছন্দপতনের কবি নবকুমারের মতই বস্তুবাদী বা সত্যবাদী লেখক। মধ্যবিত্তসুলভ ভাবপ্রবণতাকে কাটিয়ে মাটির পৃথিবীর মানুষের জীবন নিয়ে সাহিত্যের ফসল ফলাতে চেয়েছেন। ১৯

এই উপন্যাসে সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে লেখকের মানস যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে।

Leave a Comment