আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের প্রস্তাবনা। যা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের এর অন্তর্গত।

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের প্রস্তাবনা
জীবনের নানান রূপবিচিত্র কথনে ছন্দে-রসে-ভাবে প্রকাশের শিল্পিত মাধ্যম সাহিত্য। সাহিত্য জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। জীবন যেমন থেমে থাকে না, তেমনই সাহিত্যের অবয়ব ও প্রকৃতিও ক্রমপরিবর্তনশীল। সভ্যতার বিকাশ ও প্রযুক্তিগত উন্নতি মানুষকে ক্রমান্বয়ে ব্যস্ত থেকে ব্যস্ততর করেছে।
তাই সুপ্রাচীন দীর্ঘ মহাকাব্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র হয়েছে, দীর্ঘ কাব্যশরীর হয়েছে ক্ষুদ্রতর। তারপর ছন্দকে ছাড়িয়ে আবেগ আশ্রয় করেছে যুক্তিনির্ভর গদাকে, ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছে ছোটগল্প। রাজা-মহারাজাদের কাহিনীকে ছাড়িয়ে সাহিত্য এক সময় গ্রহণ করেছে সাধারণ মানুষকে। অবয়বের নানান পরিবর্তন হলেও মূলে একটি বিষয়ে স্থিতি থেকে গিয়েছে, তা হল- সাহিত্য সবসময়েই মানুষ, মানুষের জীবনের কথাই বলেছে, আর যুগকে, যুগের পাওয়া না-পাওয়া, আশা-হতাশাকেই ধারণ করেছে; কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও বা পরোক্ষভাবে।
সাহিত্যিক তাঁর কল্পনার কিছু রঙের মিশেল দিয়ে, শিল্পীমনের তুলির ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলেন জীবনের তাৎপর্যময় কোন চিত্র- মানুষের একটি আবেগ বা একটি আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন বা বিচূর্ণতা। কথাশিল্পের বৈচিত্র্যপূর্ণ কারুকার্যময় মোড়কের অন্তরে মানবজীবনের রূপনির্মিতিই সাহিত্যিকের প্রতিভার প্রয়াস।
ছোটগল্প অবয়বে ক্ষুদ্র। এতে লিপিবদ্ধ হয় জীবনের কোন বৈশিষ্ট্যময় ঘটনা বা আবেগ। বস্তুতঃ আদি সাহিত্যসম্ভার থেকেই মানুষ গল্পরস আস্বাদন করেছে। ধর্মীয় গ্রন্থ, মিথ, লোককথা, রূপকথা সর্বত্রই গল্পরসের উপস্থিতি, একটি সুগঠিত কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায়। আধুনিক ছোটগল্প যেন চিরপুরাতনের এক অতি নতুন সংস্করণ। আধুনিক ছোটগল্প জীবনের খণ্ড রূপকে রূপায়িত করে, যাতে প্রতিফলিত হয় সমগ্রতা।
তাই তা সূক্ষ্ম তীক্ষ্ণ ও সঙ্কেতময়। মানুষের হতাশা-গ্লানি, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, প্রেম-ভালোবাসা, অপমান, ক্ষোভ-এসবের যে কোন একটি হতে পারে ছোটগল্পের প্রতিপাদ্য। ছোটগল্পের স্বরূপ ও প্রকৃতি নিয়ে শ্রীশচন্দ্র দাশ তাঁর ‘সাহিত্য সন্দর্শন’ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন, – আধুনিক ছোটগল্প এক প্রকার নতুন রূপ-সৃষ্টি। প্রাচীনকালের গল্পের মত ইহারা যথেচ্ছ বিহারী, প্রগলভ্ ও নিরুদ্দেশপন্থী নহে।

আধুনিক গল্প-লেখক বিষয়বস্তু, চরিত্র-সৃষ্টি, কথোপকথন, পরিবেশ-সৃষ্টি, বাণীভঙ্গি প্রভৃতি প্রত্যেকটি বিষয় সম্বন্ধে একান্তভাবে আত্ম-সচেতন।
গল্প এবং আকৃতিতে ছোট হইলেই ছোটগল্প হয় না।
আসল কথা এই যে, ছোটগল্প আকারে ছোট হইবে বলিয়া ইহাতে জীবনের পূর্নাবয়ব আলোচনা থাকিতে পারে না: জীবনের খণ্ডাংশকে লেখক যখন রস নিবিড় করিয়া ফুটাইতে পারেন, তখনই ইহার সার্থকতা। জীবনের কোন একটি বিশেষ মুহূর্ত কোন বিশেষ পরিবেশের মধ্যে কেমনভাবে লেখকের কাছে প্রত্যক্ষ হইয়াছে, ইহা তাহারই রূপায়ণ। আকারে ছোট বলিয়া এখানে বহু ঘটনা-সমাবেশ বা বহু পাত্রপাত্রীর ভিড় সম্ভবপর নহে।
ইহাতে অনাবশ্যক কথা, অনাবশ্যক ভাষা, অনাবশ্যক চরিত্র ও ঘটনা প্রভৃতিকে নিষ্ঠুরভাবে বর্জন করিয়া লেখক শুধু একটি রসঘন নিবিড় মুহূর্তের One Poe-established design – এর জয়োল্লাস পরিকল্পনায় মগ্ন থাকেন এবং আত্মকেন্দ্রিক মনোভিনিবেশের সাহায্য গ্রহণ করেন। ছোটগল্পের আরম্ভ ও উপসংহার নাটকীয় হওয়া চাই।
স্বল্পসংখ্যক সুনির্বাচিত ঘটনার সাহায্যে ইঙ্গিত-পূর্ণ পরিণতি লাভই ছোটগল্পের উদ্দেশ্য। বিশেষতঃ সারাটি গল্পে লেখকের যে মানস-স্পর্শ থাকে, তাহাই তাহাকে গীতি-কাব্যোচিত মাধুর্য দান করে। উপন্যাস বা নাটকে পরিতৃপ্তি আছে, ছোটগল্পে ইঙ্গিত-মধুরতা আছে। অথচ, এই ক্ষুদ্র কলেবরের মধ্যে নিগূঢ় সত্যের ব্যঞ্জনায়ই ইহার সার্থকতা।
লেখক ব্যঞ্জনাত্মক সূচনা হইতে গল্পের জাল বুনিয়া যাইবেন এবং উহা যেন স্বাভাবিক পরিণতি লাভ করে। Plot বা বিষয় বস্তু সাধারণত স্থান কাল ও ঘটনার ঐক্য মানিয়া চলিবে। লেখক স্বাতন্ত্র্য-বিশিষ্ট কয়েকটি চরিত্র দুই একটি রেখায় বা ইঙ্গিতে আঁকিয়া যাইবেন।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বর্ষাযাপন’ কবিতায় ছোটগল্পের যে প্রকৃতি নির্মাণ করেছেন তার কিছু অংশ :
‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যাথা ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাই উপদেশ”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শেষ কথা’তে ছোটগল্প সম্বন্ধে বলেছেন : মানুষের জীবনটা বিপুল একটা বনষ্পতির মতো। তার আয়তন তার আকৃতি সুঠাম নয়। দিনে দিনে চলেছে তার মধ্যে এলোমেলো ডালপালার পুনরাবৃত্তি। এই স্তূপাকার একঘেয়েমির মধ্যে হঠাৎ একটি ফল ফলে ওঠে যে নিটোল, যে সুডোল, বাইরে তার রং রাঙা কিংবা কালো, ভিতরে তার রস তীব্র কিংবা মধুর। যে সংক্ষিপ্ত, যে অনিবার্য, সে দৈব লব্ধ, সে ছোটগল্প।”

রবীন্দ্রনাথের আলোচনার সূত্র ধরে শিশির কুমার দাশ ছোটগল্প সম্বন্ধে পর্যালোচনা করেছেন তাঁর ‘বাংলা ছোটগল্প’ গ্রন্থে : “রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যকে সূত্রাকারে সাজালে দাঁড়ায়, ছোটগল্পের আকৃতি ছোট, ছোটগল্প হয়েও অখণ্ড তার স্বাদবাহী, ছোটগল্পের সার্থকতা সেইখানে যেখানে মানুষের বাইরের জীবন নয়, ভেতরের জীবনের অলক্ষিত রূপটি ধরা পড়ে, আর প্রাত্যহিকতার থেকে স্বতন্ত্র একটি মুহূর্ত তার উপজীব্য।”
বাংলা ছোটগল্পের বয়স শত বছর। বাংলা সাহিত্যের নতুনতম এ শাখাটি যুগবৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে আপন স্বভাবধর্মেই। যান্ত্রিক যুগে জন্ম হওয়ায় এতে প্রথম থেকেই স্থান পেয়েছে সমাজচেতনা, সাধারণ মানুষ, তাদের কর্মক্ষেত্র ও গার্হস্থ্যজীবনের নানান সরলতা ও জটিলতা। বাংলা ছোটগল্পের প্রথম সার্থক নির্মাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম ‘ছোটগল্প’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এ বিষয়বৈচিত্র্য, শিল্পাঙ্গ সৌষ্ঠব, স্বচ্ছন্দ গতি ও সরসতা এবং পাঠকপ্রিয়তা সকলগুণেই রবি ঠাকুরের ছোটগল্প শতবর্ষে অনন্য। তাঁর সমসাময়িক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ছোটগল্পের ক্ষেত্রে এনেছেন একটি চমৎকার স্নিগ্ধ চমক।
তারপর এসেছেন জগদীশ গুপ্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌরিন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর অতর্থী, প্রমথ চৌধুরী, রাজশেখর বসু প্রমুখ। বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো কল্লোলগোষ্ঠীর ছোটগল্পকারবৃন্দ বাংলা ছোটগল্পে বৈচিত্র্য এনেছেন।
প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ এই প্রগতিশীল গল্পকারদের অন্যতম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভুতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বনফুল, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ বাংলা ছোটগল্পকে ঐশ্বর্যময় করেছেন। সমরেশ বসু, মনোজ বসু, অনুদাশঙ্কর রায়, বিমল মিত্র, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, শওকত ওসমান, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ বাংলা ছোটগল্পকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভিক্ত হলে বাংলা ও দ্বিখণ্ডিত হল, আর তখন বাংলা সাহিত্যেও বিভাজন দেখা দিল- পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সাহিত্য। ” বাংলাদেশী সাহিত্যের যাঁরা পিতৃপুরুষ তাঁদের সকলেই সাহিত্য সাধনার কেন্দ্র ছিল অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কোলকাতা, তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতির বহু ব্যবহৃত চারণভূমি। উনিশ শ’ সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের কারণে পূর্ববাংলার ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় সূচিত হয়। তখন থেকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাঙালি সংস্কৃতির আরেকটি প্রাঙ্গণ ক্রমশ জনাকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। ” ৪
‘৪৭-এর দেশবিভাগের পর তৎকালীন পূর্ববাংলার বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিকদের রচিত ঢাকা কেন্দ্ৰিক সাহিত্য পরচিতি পেল বাংলাদেশের সাহিত্য নামে। আবুল ফজল, শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আবদুল হক প্রমুখ চল্লিশের দশকের প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিক।
পঞ্চাশের দশকে আলাউদ্দিন আল আজাদ, শাহেদ আলী, মিরজা আবদুল হাই, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু ইসহাক, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, নাজমুল আলম, রাবেয়া খাতুন, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, লায়লা সামাদ, জহির রায়হান বাংলা ছোটগল্পকে দৃঢ় অবয়বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।
ষাটের দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উদ্বেল পটভূমিতে উজ্জ্বল আবির্ভাব ঘটেছে হাসান আজিজুল হক, বশীর আল হেলাল, রাহান খান, মুতজা বশীর, শওকত আলী, সুচরিত চৌধুরী, রিজিয়া রহমান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন, হাসনাত আবদুল হাই, আল মাহমুদ, আবদুশ শাকুর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, মাহমুদুল হক, বুলবুল চৌধুরী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং আরো অনেকে।”
এ কথা বলতে হবে যে চল্লিশের ও পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশী ছোটগল্প বিষয়, বক্তব্য ও রচনারীতিতে প্রশংসনীয় শিল্পকর্মের স্বাক্ষর। এই ছোটগল্প শিল্পীরা কিন্তু বাংলাদেশের বহমান ঐতিহ্যকে বরণ করেই গল্প লিখেছেন এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁদের দেশজ জীবনবোধ ও প্রবল সমাজানুরাগ।
বাংলা গল্পে সমাজচেতনা, মানবতা এমনকি সমাজতান্ত্রিক আদর্শও নতুন বিষয় নয়, কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে সেগুলো কিভাবে মেলানো যায় কিংবা কিভাবে সেই জীবনকে এবং জীবনের সত্যকে তুলে ধরা যায় তা-ই দেখবার বিষয়। উল্লেখিত গল্পকারদের সম্পর্কে এই কথা সত্য যে তাঁরা ছিলেন প্রবলভাবে জীবনবাদী ও সমাজ সংলগ্ন। তাঁদের গল্পের বিষয়ে যেমন দেশ বিভাগ পূর্বকালের জীবনচিত্র রূপায়িত তেমনি আছে বিভাগ পরবর্তীকালের।

উদ্বাস্তু সমস্যা, মন্বন্তর, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দাঙ্গা ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা গল্প লিখেছেন, তবে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের গ্রামজীবন। গ্রামের বা শহরের যে ধরনের বিষয় তখনকার গল্পকারেরা অবলম্বন করুন না কেন, গল্পে যাপিত জীবনের সঙ্কট ও সমস্যার আলেখ্যই তাঁরা রচনা করেছেন। কোন কোন শিল্পীর রচনায় শ্রেণীসংগ্রাম ও প্রমূর্ত হয়েছে ।
ষাটের দশকে এসে বাংলাদেশের ছোটগল্পের ধারায় একটি পালাবদল সংঘটিত হয়। এই পালাবদলে দেশের রাজনৈতিক সামাজিক অবস্থাও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। ৫
বাংলাদেশের ছোটগল্পে আধুনিকতার ছাপ চল্লিশের দশক থেকেই স্পষ্ট। চল্লিশের দশকের কথাশিল্পীরা ছিলেন। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। বস্তুতঃ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ ও মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশবিভাগ প্রভৃতি সমকালীন ঘটনা তাদেরকে দেশ ও কাল জাগর করে তুলেছিল। এদের জীবন উৎক্ষিপ্ত হয়েছে গ্রাম থেকে নগরে, এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে। ফলে তাদের জীবন যে চলিষ্ণুতা ও চাঞ্চলের আস্বাদ পেয়েছে তা তাদের গল্পকে স্পর্শ করেছে।
পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের ছোটগল্প এক ভিন্নতা ও নতুনত্ব লাভ করে। বস্তুতঃ পূর্বে সাহিত্যিকগণ দেশ-কাল-সমাজ সচেতন ছিলেন, পঞ্চাশের দশক থেকে গল্পকারেরা অস্তিত্ব ও স্বকীয়তাকে আবিষ্কার করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক- সাংস্কৃতিক সংগ্রাম দানা বাঁধতে শুরু করে, ছোটগল্পে তার সুগভীর প্রভাব পড়ে। ষাটের দশকের ছাত্র-জনতার আইয়ুব- স্বৈরাচারবিরোধী উত্তাল সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন দেশমানসে যে আত্ম-অধিকার সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল, তারই প্রতিবিম্ব ছোটগল্পে দেখা যায়।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সমাজজীবনেও পরিবর্তন এনেছে। গ্রামভিত্তিক জীবন ক্রমান্বয়ে নগরমুখী হয়েছে। এর অনিবার্য প্রভাব সাহিত্যে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের ছোটগল্পের বিষয়বৈচিত্র্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গল্পের পটভূমি হিসেবে চল্লিশের দশকে গ্রাম ও নগর দুই-ই ব্যবহৃত হলেও পঞ্চাশের দশক থেকে ধীরে ধীরে শহরকেন্দ্রিক পটভূমিই আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।
বস্তুতঃ বাঙালী মুসলমান সমাজে আধুনিক শিক্ষার সম্প্রসারণে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। শিক্ষিত এ গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিভাবান গল্পকারেরা আবির্ভূত হয়েছেন। তারা গ্রামে বা মফঃস্বলে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং শিক্ষা বা কর্মসূত্রে কোলকাতা বা ঢাকাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। দেশ বিভাগউত্তর ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদেরকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছে।
ফলে পঞ্চাশের দশক থেকে ধীরে ধীরে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তজীবনের যন্ত্রণা, জটিলতা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাই গল্পের উপজীব্য হিসেবে সিংহভাগ দখল করতে শুরু করে। ষাটের দশকে তা পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। সত্তর, আশি, নব্বই দশক ও তার পরবর্তী সময়ে নাগরিক সাহিত্যিকেরা নগরজীবনের স্বরূপ ও সমস্যাকেই অধিক উপাস্থাপন করেছেন। কেননা, জীবনঘনিষ্ঠতা প্রতিভাবান সাহিত্যিকের প্রকাশমান বৈশিষ্ট্য। সাহিত্যিক তার সাহিত্যকর্মে মূলত নিজ অভিজ্ঞতাকেই শিল্পিত উপায়ে লিপিবদ্ধ করেন।
এছাড়াও, আধুনিক শিল্পায়নের যুগে বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক জীবনাচরণে এসেছে শিল্পের প্রভাব। গ্রাম বাংলার অনেক ভূমিহীন কৃষকই পৈতৃক পেশা ছেড়ে কল-কারখানায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত হয়েছে। দেশে যতই বৃহৎ শিল্পের প্রসার ঘটছে, কল-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে শ্রমিকের সংখ্যা। ফলে সমাজের একটি বৃহৎ অংশ গড়ে উঠছে শ্রমিক শ্রেণী নিয়ে।
তাছাড়া দুর্ভিক্ষ, ঋণের দায়ে সর্বসান্ত, ভাগ্য পরিবর্তনের আশা প্রভৃতি কারণে গ্রামের নিরক্ষর দরিদ্র জনগণের অনেকেই গ্রাম থেকে সমূলে উৎপাটিত হয়ে শহরে এসে বসতি স্থাপন করছে। শ্রমিক ও গ্রাম থেকে আসা এ সকল মানুষ যারা রিক্সাচালক, গৃহপরিচারিকা, দারোয়ান ইত্যাদি কাজে নিযুক্ত হচ্ছে তাদেরকে নিয়ে শহরে গড়ে উঠেছে নিম্নমধ্যবিত্ত আরেকটি শ্রেণী।

তাদের বাসস্থানের জন্য গড়ে উঠেছে বস্তি। সমাজ সচেতন অনেক লেখকই অত্যন্ত দরদ দিয়ে শোষিত-দরিদ্র- নিরক্ষর পল্লীবাসীদের পাশাপাশি জীবিকার সন্ধানে শহরে ধাবমান শিকড় উৎপাটিত দিকভ্রান্ত এসকল মানুষের জীবনকে তাদের গল্পে-উপন্যাসে প্রতিপাদ্য করেছেন। তাই আবহমানকাল ধরে শোষিত গ্রামজীবনের দরিদ্রতার পাশেই মানবেতর জীবনযাপনকারী নব-উদ্ভূত বস্তিবাসিন্দাদের জীবন সাহিত্যের পাতা অধিকার করেছে।
সত্তরের দশকের প্রতিশ্রুতিশীল গল্পকারদের মধ্যে মঞ্জু সরকার, হরিপদ দত্ত, মইনুল আহসান সাবের, কায়েস আহমেদ, নাসরীন জাহান, হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, বারেক আবদুল্লাহ, সৈয়দ ইকবাল, আহমদ বশীর, আতা সরকার, জাফর তালুকদার, মনিরা কায়েস উল্লেখযোগ্য।
আশির দশকে মুস্তাফা পান্না, ইমতিয়ার শামীর তারেক শাহরিয়ার, পারভেজ হোসেন, মহীবুল আজিজ, মনীম রায়, সুশান্ত মজুমদার, সৈয়দ মনজরুল ইসলাম, শাহাদুজ্জামান, আকমল হোসেন নিপু প্রমুখ গল্পকার এবং নব্বই দশকে ধ্রুব এষ, রায়হান রাইন, প্রশান্ত মৃধা, শহীদুল ইসলাম, নাসিমা সেলিম তাদের ছোটগল্পে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে এদের রচিত গল্প-উপন্যাসে গ্রামীন জীবনের উপস্থিতি স্বল্প, তবে উপেক্ষিত নয়।
আবহমান পল্লীবাংলার শ্যামলপ্রান্তর আর সেই শ্যামল ছায়ায় বসবাসকারী মানুষের জীবনের স্বরূপ তাদের দুঃখকষ্ট, হাসি আনন্দ, আকাঙক্ষা-প্রাপ্তিকে ঘিরেও বেশকিছু গল্প রচিত হয়েছে। সংখ্যায় তা কম হলেও বিষয় ও বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ ।