আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ উপসংহার। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ উপসংহার
সহজ-সরল ভাষা এবং স্বচ্ছন্দ গতিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনসত্যকে সাহিত্যে স্থাপন করেছেন। তাঁর সাহিত্য কর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য মানুষের অন্তর্জীবন প্রকাশে দায়বদ্ধতা। শৈশব থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গতানুগতিকতাকে পরিহার করে নিজে অস্তিত্বশীল হয়েছেন এবং সাহিত্যকর্মে এনেছেন নতুনত্ব।
তাছাড়া, সত্তাসন্ধানী মানুষের জন্য তিনি কেবল পরিবেশ-পরিস্থিতিই অঙ্কন করেন নি, তাঁর স্বপ্নের ভুবনও রচনা করেছেন। পাঠককে জানিয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত পৃথিবীর কথা। তাই তিনি সমকালের হয়েও কালোত্তীর্ণ। তাঁর চরিত্রগুলো পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে নি, সমস্যার ভেতরে প্রবেশ করে বেঁচে থাকার স্বাদ গ্রহণের চেষ্টা করেছে।

আলোচিত উপন্যাসগুলোতে (‘জননী’, ‘জীবনের জটিলতা’, ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোণ’) উল্লিখিত নারীচরিত্র- শ্যামা, মন্দা, সুপ্রভা, শান্তা, প্রমীলা, লাবণ্য, যশোদা, সুবর্ণ, সরসী, মালতীসহ প্রায় সকলেই কম-বেশি তাদের অবস্থানে সংগ্রামশীল এবং পরিস্থিতির মোকাবেলা করে অস্তিত্বশীল হয়ে ওঠার সাধনায় সদা তৎপর। তারা জীবন ও সংসারকে অস্বীকার করে নি, বরং এগুলোকে স্বীকার করেই সে সংসারে স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে।
পুরুষচরিত্রগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা যায় কেবল শীতল আর জ্যোতির্ময় ছাড়া সকলেই আপন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠায় নিয়ত তৎপর। এমনকি শিশুচরিত্রের ক্ষেত্রে বিধান, বকুল, বিমল, প্রমীলাও তাদের অবস্থানে সক্রিয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরাধ্য জীবনচেতনা। সমাজের ক্ষতচিহ্নগুলো পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করে তিনি এ থেকে পরিত্রাণের অনুভব জাগ্রত করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, আলোচিত উপন্যাসগুলো একটি থেকে অন্যটি স্বতন্ত্র। ‘জননী’ এবং ‘জীবনের জটিলতা’ দুই-ই নিম্নমধ্যবিত্তের কাহিনী। কিন্তু তাদের সামাজিক পরিবেশ, জীবনবোধ, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব, মূল্যবোধ সবই ভিন্নতর। তেমনি ‘শহরতলী’, ‘অহিংসা’, ‘চতুষ্কোণ’ এ সমাজজীবনও আলাদা। এ সমাজ এবং সমাজের মানুষগুলো শুধু সাহিত্য সৃষ্টির জন্য আসে নি, জীবন থেকেই উঠে এসেছে।

সমাজব্যবস্থার স্তরে স্তরে আলাদা আলাদা জীবন এবং পরিবেশে মানুষ বেড়ে ওঠে, তাই সেই সমাজ যেমন ভিন্ন, তার জীবনও তেমনি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আবর্তিত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজের প্রতিটি জায়গায় তাঁর দৃষ্টির আলো ফেলেছেন এবং সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। আলোচিত উপন্যাসে সে প্রমাণ আমরা পেয়েছি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিচিত্র পেশা ও শ্রেণির চরিত্র স্থান লাভ করেছে। আমাদের পর্যালোচিত পাঁচটি উপন্যাসে এই পেশা ও শ্রেণির মানুষের সমন্বয় দেখা যায়।
শুধু তাই নয়, উপন্যাসে সক্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে লৈঙ্গিক বিবেচনায় নারী ও পুরুষ চরিত্র প্রায় সমান। তিনি তখনও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন নি (যোগদান ১৯৪৪), তখনও পার্টির বাধ্যবাধকতা তাঁর সাহিত্যজীবনে আরোপিত হয় নি, নির্দিষ্ট দর্শনে তখনও তিনি আবর্তনের পথসূচনা করেন নি- এজন্যেই সম্ভবত একটি সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি এ উপন্যাসগুলোর চরিত্রাবলির উপর পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তবে, লেখকের নৈয়ায়িক শিল্পবোধ এবং শুভচেতনা; যাকে একত্রে শিল্পীর নিরাসক্ত দৃষ্টি বলা যায়, এই দৃষ্টির আলোকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময়ের চরিত্রাবলিকে সাজিয়েছেন ইতি-নেতির পারম্পর্যে, ভালো-মন্দের সাজুয্যে, শুভ-অশুভের পরম্পরায়।

যে কারণে কোনো বিশেষ ধরণের বা শ্রেণির চরিত্রের প্রতি লেখকের পক্ষপাত পরিদৃষ্ট হয় না, লেখক কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে ঝলসে নেন না চরিত্র-বিশেষকে। আলোচিত উপন্যাসের বিশ্লেষিত চরিত্রগুলোকে তাই উঠে আসতে দেখা যায় সামাজিক দ্বন্দ্ব সমন্বয়ের মধ্যে। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোকে অতিক্রম করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে সময় উপন্যাস রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন, সে সময় নারীদের মধ্যে সম্ভবনার বীজ অনেক লেখক অনুধাবন করলেও মূল চরিত্র হিসেবে নারীকে স্থান দিতে কুণ্ঠিত ছিলেন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রে নারীকে স্থাপন করে উপন্যাস রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এ শুধু দক্ষতা নয়, বাংলা উপন্যাসে এ এক নিরব বিপ্লবের সূচনাও। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে যে নতুন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করে মানবজীবন ও তার সমাজকে তুলে আনেন তা মানিকের পূর্বসুরিদের থেকে পৃথক; উত্তরসূরিদের জন্য অনুকরণীয় ছিল। আমাদের আলোচিত পাঁচটি উপন্যাসেও সেই নবদৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় ।