আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিকথার পরের কথা উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিকথার পরের কথা উপন্যাস
‘ইতিকথার পরের কথা’(১৯৫২) উপন্যাসটি কৃষক সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে লেখা। উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন গ্রামের জমিদার, জমিদারের আধুনিক শিক্ষিত বৈজ্ঞানিক পুত্র শুভময়, গ্রাম্য ডাক্তার নন্দ, কৃষক পরিবারের নারী-পুরুষ এবং কৃষক পরিবারের অল্প শিক্ষিত কম্পোজিটর এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তী পরিস্থিতি দেখিয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঘৃণা উপন্যাসে ফুঠে উঠেছে। উপন্যাসের শুরুতেই একটি কারখানার কথা বলেছেন লেখক।
কারখানাটি ‘স্টোভ ল্যাম্প লণ্ঠনের কারখানা। স্বাধীনতার আগে শুভময় কারখানাটি করেছিল দেশপ্রেমের নিদর্শনরূপে। স্বাধীনতার পর আর এ কারখানা চলেনি। বন্ধ করে দিয়ে সে বিলেতে পড়তে যায়। শুভ লেখাপড়া শেষ করে স্বাধীন দেশে ফিরে আসে। কিন্তু দেশপ্রেমিক শুভ দেশে এসেই হতাশ হয়। সে বলে:
“কত কী ভেবেছিলাম, এখন বুঝতেই পারছি না কী রকম স্বাধীন দেশে এলাম।” (৮খ, পৃ-৩৪)

তার পর তার বাড়ির সবাইকে পাস কাটিয়ে ছেলেবেলার বন্ধু গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার নন্দকে বলে
‘নন্দ এসেছো? ভালো হয়েছে, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে অনেক।” (৮খ, পৃ-৩৪)
শুভ বন্ধু-বান্ধব সবাইকে এড়িয়ে চলতে থাকে, এমনকি ভূদেব ডাক্তারের মেয়ে মায়াকেও এড়িয়ে চলে, যদিও মায়ার সঙ্গে তার বিয়ে পাকা হয়ে আছে। গ্রামের ছেলে কৈলাশ তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখে, সুযোগ পেলে কথাও শোনার। কৈলাসের ব্যবস্থামতো নন্দের বাড়ির ভেতরে বসে বাড়ির বাইরে বিক্ষুব্ধ কথা শোনে শুভ।
কৃষকদের জন্য তার বেদনা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গ্রামের মেলায় গিয়ে শুভর দেখা হয় গ্রামের বালবিধবা মেয়ে লক্ষ্মীর সঙ্গে। লক্ষ্মী কাঁসার গ্লাস কিনছে। লক্ষ্মীর কাছে গ্রামের মানুষের কাঁসার বাসন সম্পর্কে আগ্রহ শুনে সে কাঁসার জিনিস তৈরির কারখানা শুরু করে। লক্ষ্মীকে সে কারখানায় চাকরি দেয়।
মায়া এসে লক্ষ্মীর সঙ্গে শুভর কথা বলা দেখে রেগে চলে যায়। অন্যদিকে কৈলাস আর লক্ষ্মীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তারা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ের চিন্তা করে। কিন্তু ধর্মান্তরিত হলে কৃষক নেতা কৈলাসকে কেউ নাও মানতে পারে- পরিস্থিতি দেখে কৈলাস বিয়ের চিন্তা বাতিল করে। গ্রামের সভায় কৃষকরা জমিদারকে গালি দেয় শুনে শুভ মনে মনে রেগে যায়। সে মঞ্চে উঠে বলে
“তার বাবার কোনো কর্মচারী যদি অন্যায় করে থাকে সেটা তার বাবার অজান্তেই ঘটেছে, সভার গাল না দিয়ে তার বাবাকে জানালেই বোধহয় প্রতিকার হতো। যাই হোক, চাষিদের স্বার্থ দেখা হবে, এ ব্যবস্থা করার ক্ষমতা তার নেই কিন্তু সে কথা দিচ্ছে তাদের লোকেরা যাতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকে সে তার ব্যবস্থা করবে।”(৮খ,পৃ-১৪৩)

কিন্তু জগদীশকে জানানো হয় শুভ তাকে প্রকাশ্য জনসভায় অপমান করেছে। জগদীশ শুভকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। শুভ হোটেলে গিয়ে ওঠে। সে এই প্রথম অনুভব করে সারাজীবন বাবার টাকা নিয়েছে কিন্তু কোনো উপার্জন করেনি। জগদীশ ছেলেকে ফিরিয়ে নেওয়ার সব চেষ্টা করে। কিন্তু জগদীশের কাছে শুভ যায় বিদায় নিতে। এরপর পিতা পুত্রের মধ্যে ব্যবধান গড়ে ওঠে।
জগদীশ ছেলেকে হারিয়ে অত্যাচারী জমিদার হয়ে ওঠে। অবশেষে শুভ আবার গ্রামে যায়। গ্রামের কেউ তাকে আপন মনে করে না। সে লক্ষ্মীর দাওয়ায় ছেঁড়া পাটিতে বসে ডাবের পানি খায়। সে লক্ষ্মীর সঙ্গে পরামর্শ করে কীভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়। এ সময় মায়া আসে।
মান্না, লক্ষ্মী একটা সমঝোতায় আসে। ঠিক হয় কাজ শেষ করে শুভ মান্নার সঙ্গে চলে যাবে। উপন্যাসে লেখক সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন, পাঠককে সোভিয়েত এবং চীনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।