আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ আবু জাফর শামসুদ্দীন। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার যুদ্ধোত্তর কালে প্রকাশিত যুদ্ধপূর্ব কালের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা এর অন্তর্গত।

আবু জাফর শামসুদ্দীন
ঢাকা জেলার কালীগঞ্জ থানায় দক্ষিণবাগ গ্রামে ১৯১০ সালে আবু জাফর শামসুদ্দীন এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন ২০ বছর বয়সে দৈনিক ‘ছোলতান’ পত্রিকায়। সাংবাদিকতার সূত্রে ১৯৪৫ সন পর্যন্ত কোলকাতায় ছিলেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ইত্তেফাক’, ‘ইত্তেহাদ’, ‘পাকিস্তান অবজারভার’, ‘ইষ্টার্ন হেরাল্ড’, ‘পূর্ব দেশ’ ও ‘বাংলার বাণী’ প্রভৃতি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকারও সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন।
তিনি বাংলা একাডেমীর অনুবাদ বিভাগের ১৯৬১-৭২ সন পর্যন্ত অধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে ঘনিষ্টভাবে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে কাগমারীর সাংস্কৃতিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তিনি ‘কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডম’ এর ষাটের দশকে দপ্তর সম্পাদক হন। আফ্রো এশীয় লেখক সমিতির বাংলাদেশ শাখার সহ- সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত ছাড়াও কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেন। তিনি গল্প উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ শাখায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস সমূহ হচ্ছে :
১। পরিত্যক্ত স্বামী (১৯৪৬), ২। মুক্তি (১৯৪৭), ৩। ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান (১৯৬৩), ৪। পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৭৪), ৫। সংকর সংকীর্তন (১৯৮০), ৬। প্রপঞ্চ (১৯৮১), ৭। দেয়াল (১৯৮৬) ইত্যাদি ।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৬১-৬৮) বাংলাদেশের উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস। ৫টি খণ্ডে বিভক্ত, ৯৯ পরিচ্ছেদে গ্রাম ও নগরের পটভূমিতে বিন্যস্ত খণ্ড খণ্ড কাহিনী, চরিত্র ঘটনার সংযোগ সূত্রে আবদ্ধ এই উপন্যাস।
আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ক্ষুধা ও আশা’ (১৯৬৪); শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ (১৯৬৫), সত্যেন সেনের ‘উত্তরণ’ (১৯৭০) বিশাল পটভূমিকায় রচিত এপিক ধর্মী রাজনীতি সচেতন উপন্যাস এর ধারায়। স্বাধীনতার পরপরই বাঙালি সমাজ জীবনের intirety কে এপিক শৈলীতে রূপ দিলেন আবু জাফর শামসুদ্দীন, তাঁর পদ্মা-মেঘনা-যমুনা (১৯৭৪) উপন্যাসে। এ উপন্যাসের সমাজতাত্ত্বিক মূল্য যতবেশি, শিল্পমূল্য তত নয়।
উপকরণপুঞ্জ কেন্দ্রীয় রস-আবেগে ঘুর্ণিত দ্রবীভূত ও স্ফটিকায়িত হয়ে প্রার্থিত শিল্প রূপ পায়নি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে আরম্ভ করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের সূচনা লগ্নে এ উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসে কলোনি শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় অসংলগ্ন রীতি, আচার, কুসংস্কারপূর্ণ সঙ্গতিবিহীন শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে নায়ক মামুনের আত্মাবিষ্কার, সচেতনরোধ, চারিত্রিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ উন্মোচন করেছেন ঔপন্যাসিক।
নায়ক মামুনকে ঘিরে এ উপন্যাসের অসংখ্য চরিত্রসমূহের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মুক্তিকামী জনশ্রেণীর অধিকার সংগ্রামশীল জীবন প্রবাহের ঐতিহ্য চেতনা, আঞ্চলিকতাবোধ সমষ্টিগত অর্থনৈতিক স্বার্থবোধ এবং অভিন্ন সংস্কৃতি চেতনা প্রকাশ পেয়েছে। আরও দেখা যায়, সমাজতান্ত্রিক ধ্যান- ধারণা দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মীয় ভাবাবেগ, ধর্ম সর্বস্ব রাজনীতির বিনির্মাণ প্রচেষ্টা।
তিরিশ ও চল্লিশের দশকে শ্রমিক কৃষক আন্দোলন ছাড়াও যুব মহিলা প্রভৃতি আন্দোলনে ও কমিউনিষ্টরা নেতৃত্ব দেন। এ সময় দেশে যে সব বড় বড় বিক্ষোভ আন্দোলন যেমন আইন অমান্য আন্দোলন, আগস্ট বিদ্রোহ, আজাদ হিন্দ আন্দোন, শ্রমিক, পুলিশ ও নাবিক ধর্মঘট সমূহ গড়ে উঠে, সে সবের পুরোভাগে ছিলেন কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রীরা।
উপন্যাসটি আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ধারায় মহাকাব্যিক পটভূমিতে লেখা হলেও বর্ণনাত্মক গদ্যরীতিতে তা রূপায়িত । অনেক সময় নাট্যরীতি ভঙ্গির সমাবেশ থাকলেও চরিত্রে, ঘটনার বর্ণনায় উপন্যাসের জীবনবৃত্তে কেন্দ্রানুগ শক্তির বর্হিপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু নাটকীয়তা, তাত্ত্বিকতা, অতি উচ্ছাস বা ভাবোচ্ছ্বাস ঔপন্যাসিকের ইচ্ছা নয়। নায়ক মামুনের স্বপ্নে দেশের স্বাধীনতা ও মুসলমান সমাজের উন্নতি জাতির আত্মসংকটের মাধ্যমে ঐতিহাসিক শিল্পকর্মে ঔপন্যাসিকের জীবন দর্শনবোধ, উৎকৃষ্ট দলিল রূপ- পেয়েছে।

তিরিশ চল্লিশের দশকে বাঙালি মুসলমান সমাজে দেখা যায় মানুষ ও তাদের যে জীবনাচার তা লেখক মামুনের শায়েস্তাবাদ গ্রাম থেকে ঢাকা এর পরে কোলকাতা এবং কোলকাতায় সমাজ ও দেশপ্রেম স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ ও দেশ বিভাগের সন্নিকটবর্তী আবার ঢাকায় ফিরে আসার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ক্ষয়িষ্ণু সমাজে মানুষের যে জিজ্ঞাসা, আমাদের আকাঙ্ক্ষা তরুণ সমাজে বড় হতে চাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, প্রভাব, প্রতাপ ক্ষমতার লোড এ সবই কাছের মানুষের মধ্যে দেখেও মামুন হতে চেয়েছে। এক আদর্শ বাস্তববাদী মানুষ, নৈতিক ও নির্ভীক। দেশের স্বাধীনতা, উন্নতি ও সমাজের সুস্থতায় সে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। মামুন একজন কবি। পারিজাতে তার কবিতা ছাপা হয় অন্যান্য বড় কবিদের সাথে।
নিয়মিত বেতন না পাওয়ার অসুবিধায় সে দিন চালায় পত্রিকা ফেরি করে। মামুনের চারিপাশ ঘিরে আছে; বাঙালি হিন্দু মুসলমান রাজনৈতিক নেতা, লেখক, সাহিত্যিক, চাকুরিজীবী। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের আলাপচারিতার মাধ্যমে ঔপন্যাসিক মামুন চরিত্রের শৈল্পিক গুণসম্পন্ন উপলব্ধি বিশ্লেষণ করেছেন।
‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাসে মামুনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তাতে ৩টি অংশ দেখা দিয়েছে। ইদরিস মিঞা, হাজেরা বিবি ও জোবেদা বিবি এবং মামুনের বাবা, মা, দাদী রওশন আরা ও আবদুল হকের জীবন। সময় স্বভাবের বৃত্তাবদ্ধ রূপান্তরে ইদরিস মিঞার পুত্র মামুনের নব জিজ্ঞাসা ও উপলব্ধিতে জীবনাগ্রহ ধর্ম ও কর্ম।
গ্রামীণ জীবন ধারায় উপনিবেশ শৃঙ্কলিত সমাজ ব্যবস্থায় যে অসঙ্গতি ও অসংলগ্নতা রয়েছে তা নাগরিক জীবনের দ্বন্দ্ব, সংঘাতের, দ্বিধা-দ্বান্দ্বিকতায় বিশালতা পেয়েছে। এ উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র। প্রত্যেকটি চরিত্রই নির্দিষ্টভাবে উল্লেখযোগ্য না হলেও সময় স্বভাবে, জীবনবৃত্তে ও সমাজ সত্যের ইতিহাস বোধে চেতনাবদ্ধ ও সমসাময়িক ঘটনায় সমৃদ্ধ ।
উপন্যাস অত্যন্ত বিশাল আয়তনের হওয়াতে লেখকের সর্বত্র প্রকরণ পরিচর্যায় নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও জীবন দর্শন পরিচালনায় হয়ে উঠেছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও উৎকৃষ্ট সময়োপযোগী দলিল। ইদরিস মিঞা অবস্থাপন্ন কৃষক হওয়ার পরও তার চাচাত ভাইয়ের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে এবং সে এজলাসেও বলেছে তার কোন কালে এনামে ভাই ছিল না।
মামুন তার ব্যক্তিসত্তায় ও শিক্ষাজীবনে পরিচিত হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, বিংশ শতাব্দীর ৩০-৪০ দশকের বাঙালি মুসলমান তরুণ সমাজের সংকট, উৎকণ্ঠা, আশ্বাস। জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের সাথে মামুনের স্বদেশ ও সমাজের প্রেমবোধ পদ্মা মেঘনা যমুনায় অনন্য সময়োপযোগী ও জীবনধর্মী হয়ে উঠেছে।
ঔপন্যাসিক কালপর্বকে ধারণ করতে গিয়ে ১৯৪০ সালের গোল টেবিল বৈঠক, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হকের মতবিরোধের কারণে ১৯৩৭ সালের নির্বাচন, কংগ্রেস পরিবর্তন করে মুসলিম লীগে যোগদান, কৃষক-মজুরদের রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক চিন্তাধারায় আবদুল হামিদ খান ভাসানীও সামসুল হুদার চৌদ্দ দফার দাবির প্রেক্ষাপটে ভারত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেঘ ও রৌদ্র গল্পের নায়ক তৎকালীন ইনটেলেকচুয়াল যুবক শশিভূষণ আর ‘গোরা’ উপন্যাসের গোরার মতো হিতবাদী টুর্গেনিভের নিহিলিষ্ট চরিত্র এ উপন্যাসের অবিনাশ কাসেম, মামুন, মনসুর আলী। উপন্যাসে মহাকাব্যোচিত বিস্তারে পরাধীন জীবনের আবর্ত থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক আচরণে মধ্যবিত্তের অস্থিতিশীল রূপের মধ্যে স্বাধীনতার চিন্তা চেতনা হিতবাদী দৃষ্টি নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। বিপ্লবী রাজনীতির প্রবণতা এ চরিত্রগুলিকে ও অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিধাদ্বন্দের ঘাতপ্রতিঘাতে আলোড়িত করেছে।
এ সময় রাজনৈতিক মতাদর্শে বৃটিশ পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কৃষক শ্রমিকদের সামন্তবাদ বিরোধী আন্দোলন বাঁধে। এই আন্দোলন মূলত সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিঃস্ব শ্রমিক কৃষকদেরই পেটি বুর্জোয়া, প্রতিবিপ্লবী ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তাদের লক্ষ্য ছিল বুর্জোয়া চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে নিজের উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া।
এ উপন্যাসে কোন শ্রেণী সংগ্রামের আকর্ষণীয় মহত্ত্ব প্রকাশে সক্ষম হয়নি। কিন্তু হয়েছে কিছু সমাজতান্ত্রিক নেটিভদের আদর্শ, নৈতিক-অনৈতিক বাক্য বিন্যাস । মামুন ধর্মসভা, অভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বহুজাতির বহু ধর্মের অখণ্ড ভারতের জাতীয়তাবোধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থবোধে সর্বভারতীয় স্বাধীনতাকে গ্রহণ করতে চেয়েছে। গফুর রহমান ওয়ার্কাস এ্যন্ড পীজেন্টস পার্টিতে যোগ দেয় অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে।
সাম্প্রদায়িক মৌলবী আকরম খাঁ অত্যন্ত নীতিহীন লোভী, স্বার্থবাদী, খিলাফত দেশকর্মী। সে পাকিস্ত গানের স্বাধীনতা চায়। তার কাছে আত্মস্বার্থ অনেক বড়, ধর্ম-কর্ম এবং সমাজ রক্ষা করেও। সে একজন মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বমূলক পত্রিকা পরিচালনা করে। কংগ্রেস এবং সরকার উভয় তরফ থেকে পত্রিকার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে। বিদেশী ব্যাংকে দেশীয় টাকা জমিয়ে দেশের স্বাধীনতা বিরোধী কার্যে জড়িত রয়েছে। পত্রিকার সহকারী বজলু ফৌজদারী মামলায় জড়িয়ে পড়ে অর্থচিন্তার কথা বললে, আকরম খাঁ বলেন :
তোমার কেবল ঐ এক কথা। সমাজের দীন ইসলামের কাজ করতে চাও ত ওসব ব্যক্তিগত চিন্তা ছাড় মিঞা, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখো। নাসরুমিনাল্লাহে অ ফাতহন করীর
মনসুর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মনোভাবে প্রাগ্রসর এক যুবক। তার কাছে যে কোন ধর্মই হচ্ছে একটি বোধ মাত্র।আর সবই মানুষ বৈপ্লবিক পালিটিকস এবং ফ্যাসিবাদ কংগ্রেসের দ্বৈত চরিত্রের বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার বশবর্তী হয়ে রুশ বিপ্লবের ইতিহাস জ্ঞানে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী ভাবধারায় কৃষক প্রজা পার্টিকে সমর্থন করেছে।
সে অর্থনৈতিক দিক থেকে অসচ্ছল, পৃথক ভূখণ্ড কামনা করে। তার ভাবনায় নিজস্ব স্বদেশ ভূমিতে সমস্ত সম্প্রদায় অর্থনৈতিক রাজনৈতিক মুক্তির চরিতার্থতার অভিমুখী। মনসুর উদারনৈতিক। বন্ধুর বিধবা স্ত্রীকে বিয়ে করে। ডাকাতি শেষে আহত সবুরকে আলী আহমদের কাছ থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
অভাব অনটনের মধ্যেও চমৎকার বাচনভঙ্গি ও নির্লিপ্ত মনোভাব নিয়ে চলাফেরা করে। কিন্তু অর্থনৈতিক দুরবস্থার কাছে আত্মহত্যা করে পরাভব মেনেছে। আত্মহত্যার মত নির্মমতাকে বাস্তবোচিত করে ব্রিটিশ পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রয়াস প্রজ্জ্বলিত করেছে বিপ্লবী চেতনায়। স্বাধীন ভাবে পত্রিকা প্রকাশ করে মানবতার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছে।
মামুন সর্বৈব মুক্তির চরিতার্থতায় গভীর অনুভূতিতে স্বাজাত্য বোধের অন্বেষণ করেছে। অর্ধেক পৃথিবী সামাজিক জীবনকে আগ্রাসী সমগ্রতায় পরিণত করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বাকি অর্ধেকের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ রুদ্ধ ক্রমেই তীক্ষ্ণ হচ্ছে। তাই মামুনের কাছে সভ্যতা ও মূল্যবোধের কোন আবেদন পৌঁছায়নি। সংস্কৃতি সভ্যতা মূল্যবোধ একমাত্র সত্য হচ্ছে মানুষ মানুষকে হত্যা করে, বস্ত্র হরণ করে এবং নগ্নতার উপর কাপালিক হয়ে নৃত্য করে।
মামুনের গভীর উপলব্ধিতে ধরা পড়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ধ্বংসযজ্ঞ নৈতিক অবক্ষয় অধঃপতিত সমাজ ব্যবস্থার নির্মম পরিণতি যে হারে কমেছে তা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভাব অনটনের জন্য। পার্টি অফিসে কমরেডনীতিতেও দেখা যায় নিজস্ব নীতি নির্মাণ হয়। ‘মুদ্রা জান করতে ও প্রকৃত বিপ্লবী দ্বিধা করে না। প্রশ্ন নীতির নয়, প্রশ্ন পাওয়ার। মামুনের মধ্যে তখন বৌদ্ধিক ও জাগতিক ভাবনা পর্যবসিত হয়। প্রকাশ্য পথ বন্ধ হলে গোপন পথের আশ্রয় গ্রহণের বিষয়। সামাজিক ক্ষেত্রে তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক যৌনজগত।
যৌনক্ষুধা নিবারণের উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপিত থাকার ফলেই অবিবাহিত নর-নারী গোপনে সে ক্ষুধা নিবারণ করার চেষ্টা করে। বেশ্যাবৃত্তি সমাজ স্বীকৃত, কিন্তু বারবনিতালয়ে গমনাগমন গোপনে হতে হবে। খিজির পুরে জাপানী তাণ্ডব দেখার জন্য মামুন ও রেবা সর্বপ্রথম যুদ্ধের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করে। তাতে মামুনের দেখায় আদিম বর্বরতা ছাড়া আধুনিকাতর চিহ্ন অনুপস্থিত। ভয়াবহ বীভৎস নগ্নতা মামুনকে ভাবায়।
আবু জাফর শামসুদ্দীন সাহিত্য ও রাজনীতি সম্পর্কে বলেন রাষ্ট্রকেন্দ্র করেই রাজনীতি। রাষ্ট্র সামাজিক সংগঠন ব্যতীত কিছু নয়। সমাজের বাইরে ও ব্যক্তি মানুষের কল্পনা করা যেতে পারে এমনকি ঘটনাচক্রে অবস্থিতিও সম্ভব, কিন্তু ওরূপ এককের কোন সামাজিক ভূমিকা নেই।

সমাজবদ্ধ জীবনেই মানুষের সক্রিয় ভূমিকা… রাজনীতি মানব কল্যাণের জন্যই করা হয় এটাই দাবি এবং এটাই প্রচারিত মত। (আবু জাফর শামসুদ্দীনের সাক্ষাৎকার, লেখক সমাবেশ, মে, ১৯৮১) এ উপন্যাসে আর একটি উল্লেখযোগ্য রাজনীতির দ্বৈত চরিত্রে অবস্থিত আলী আহমদ আলী এক সময় সমাজতন্ত্র করেছে, এবং 1 পরবর্তীতে মুসলিম লীগ নেতা হয়েছে। তার বিশ্বাস একমাত্র স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে মানুষের জীবনাকাঙ্ক্ষা সহজ স্বাভাবিক, প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠতে পারে।
কবি আবদুল গফুর দেশপ্রেমী। অর্থাভাবে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনা। রমেশ, মনসুর, আলী, নিখিলেশ, আবদুর রহমান, গফুর এক সময় সমাজতান্ত্রিক দীক্ষায় অর্থনৈতিক সংকট চরিতার্থ কামনা করে। কিন্তু রাজনীতির পটভূমি পরিবর্তনে মুসলিম লীগ রাজনৈতিক সংগঠনে স্বাধীনতা অর্জন করতে চায়। তারা তাই স্বাধীনতা সংগ্রামে তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচীর জন্য পুঁজিপতিদের বাড়িতে সশস্ত্র ডাকাতি করে। আলীর সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিতে দুর্ভিক্ষের বাজারে বেশি মুনাফায় পারমিটের ব্যবসা করে।
মানুষ নিয়ে ভাবে, প্রেম, ভাষা-শব্দ সবই তার চরিত্রকে অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় আত্মস্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট করেছে। রমেশ স্বাধীনতা সম্বন্ধে ভাবে ইংরেজ বিতাড়নের পর আবার হয়তোবা আর একটি সংগ্রাম আসতে পারে এবং তা হবে আরও ভয়াবহ অধিকতর রক্তক্ষয়ী। মমতাজ প্রগতিশীল নারী চরিত্র। অবিনাশ স্বদেশকর্মী, অসাম্প্রদায়িক। সে অবিভক্ত বাংলা চায়। আবুল কাসেম মুসলিম লীগের বিপ্লবী নেতা।
লোভী নারী লোলুপ স্বার্থ-সর্বস্ব মানসিক চেতনায় সে জড়িত সন্ত্রাসবাদী গণবিপ্লবী রাজনীতিতে। তার কথা হচ্ছে ইসলামের মূল কথা রাববানিয়াত এবং এরই ভিত্তিতে সে মহাত্মা গান্ধীর কুইট ইন্ডিয়া যা নাকি সমগ্র মানুষের মাঝে সাড়া জাগিয়েছিল। তা দিয়ে কাসেম ও স্বাধীনতা লাভ করতে চায় ডিভাইড এন্ড কুইট, ভাগ কর এবং ছার বোধের মাধ্যমে।
এই উপন্যাসের অসংখ্য চরিত্রের অর্ন্তলোকে নানা সমস্যা, আত্মজিজ্ঞাসা, রক্তিম বাসনা বিলাস, ক্ষত বিক্ষত মানব হৃদয় দ্বিধাগ্রস্ত তবুও তারা ধাবমান। পদ্মা মেঘনা যমুনার প্রবাহে জোয়ার ভাটা থাকলেও স্রোত কখনও বন্ধ হয় না, মানুষের ইতিহাসকে উপেক্ষা করে নিরন্তর প্রবাহিত হয়।
রাতের পর যেমনি দিন আসে কাল প্রবাহের অনিবার্যতায় তেমনি সংগ্রামরত অস্তিত্বের অমোঘ টানে মানবজীবন থেমে থাকে না। সমস্ত ঝগড়া, কলহ, পরচর্চা, অসংলগ্ন অব্যবস্থায় মানুষ সাময়িক অসংগতিকে অনাচারকে উপেক্ষা করেই চলে। শুধু মানুষকে এড়াতে পারেনা। মানুষ হয়ে উঠে চিরাচরিত নিয়মের নিয়ন্ত্রক।
লেখক মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সাক্ষ্য দিয়েছেন নির্মোহ ভঙ্গিতে ‘আবহমান কাল থেকে এমনি করে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, বিস্ময় সবকিছু বুদ্বুদের মতো লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সাফল্য ও অসাফল্য কোনটাই স্থায়ী স্থান করে নিতে পারছেনা। যা তারা পরমুহূর্তে নৈমিত্তিক গতানুগতিকতার স্রোতে পড়ে ভুলে যায় সেগুলো সব অবচেতনায় অক্ষয় খনিতে জমা হয়ে অবশেষে একটি উম্মাদ এককের মাধ্যমে একদিন সমস্ত বিশ্বকে বিস্মিত করে দুর্বার মহাপ্লাবনের রূপ পরিগ্রহ করে।
ঔপন্যাসিক ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাসে রাজনৈতিক আর্থ সামাজিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের কালজয়ী চলমানতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চরিত্র ও সমাজদর্শন বোধে লেখক হয়ে উঠেছেন সর্বজ্ঞ। ঔপন্যাসিক তাঁর দর্শনবোধে নৈতিকতাকে গ্রহণ করেছেন ইতহাসের শিক্ষায়। জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের উপলব্ধি ও দ্বান্দ্বিকতা থেকে নতুন স্তরে উন্নীত হওয়ার চেতনা জাগ্রত হয়েছে পাঠক সমাজের এ উপন্যাস থেকে। মামুনের জাগ্রত, ভাল-মন্দ, কর্তব্য-অকর্তব্য, ন্যায়-অন্যায়ের চৈতন্য ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়িত্ব দানই ঔপন্যাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নীতির কার্যকর পর্যায়ে পরিণত হয়েছে।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘সংকর সংকীর্তন’ (১৯৮০) উপন্যাসটি তাঁর পরিকল্পিত কালিক ভাবনার ‘ত্রয়ী’র শেষখণ্ড। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মৌলভী কাজী আবদুর রশীদ এবং ঘটনা ও কাহিনীর গতির আবর্তন পেয়েছে ইংরেজদের রাজধানী কলকাতা ও তার বিস্তৃত অংশ।
‘হিন্দুস্তানী সভ্যতা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে’ উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের একাংশ ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত ভারত বর্ষে যে তাদের স্বতন্ত্র আত্মবিকাশের প্রকৃত জীবন সত্য চরিতার্থতায় রূপ পেয়েছে তা লেখক কাজী আবদুর রশীদের ব্যক্তিজীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দর্পণে ব্যক্তি জীবনের স্বরাজ উন্মোচন করেছেন। ঔপন্যাসিকের মন্তব্যে দেখা যায়, ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান এবং পদ্মা মেঘনা যমুনা সিরিজের শেষ উপন্যাস ‘সংকর সংকীর্তন’। তিনটি উপন্যাসের যোগসূত্র একটি পরিবার। কিন্তু প্রতিটি বই যার যার স্বকীয়তা নিয়ে আলাদা এবং আলাদাভাবে উপভোগ্য।
তিনটির মিলিত কাহিনীর মধ্যে বিধৃত আছে বাংলাদেশের মানুষের প্রায় এক শতাব্দীকালের জীবন। ১৯৪৭ সালে এসে পদ্মা মেঘনা যমুনার কাহিনী শেষ। লেখকের মন্তব্য : ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ এবং ‘পদ্মা মেঘনা যমুনার’ ভূমিকায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম ‘সংকর সংকীর্তন’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তা পূরণ করতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান জ্ঞান করছি। ১০
কলোনী শাসিত পরিবেশে বাঙালি মুসলমান তাদের বংশ গৌরব, আভিজাত্য বোধ, নীতিবোধের স্বার্থ কোনক্রমেই জলাঞ্জলী না দিয়ে তা রক্ষার তাগিদে ঐতিহাসিক কালাভ্যাসকে নৈয়ায়িক ক্রম প্রসারতায় দাঁড় করিয়েছেন। মান সম্মানার্থে ব্যস্ত মুসলমান জনশ্রেণী হিন্দু এবং ইংরেজের যাঁতাকলে পিষ্ট যে কোন আনুগত্য প্রকাশকে নৈতিক অবক্ষয় বলে মনে করেছে।
এরই মধ্য থেকে কাজী আবদুর রশীদ গন্ড গ্রাম ফরিদপুর থেকে ভাগ্যান্বেষণে এসে, ইংরেজ আধিপত্য ভারতবর্ষে ১৭৭১ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস প্রতিষ্ঠিত কোলকাতা মাদ্রাসা থেকে ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ করে আত্মাবিষ্কার ও আত্মসমীক্ষার পথ সন্ধান করেছে। তার অভিশপ্ত বেকার জীবনে একটি ভাল চাকরি কামনা করেছে সে।
চাকরির জন্যে শূয়োর শরার ঘোর নাসারার জবান শিখেছে ১১
যদিও লেখক দেখিয়েছেন মুসলমানের ইংরেজী শিক্ষা-দীক্ষা আর হিন্দুর ইংরেজী শিক্ষা পাশ্চাত্য শিক্ষার সমপর্যায়ের নয়। কিন্তু আবদুর রশীদের আত্মকেন্দ্রিক অক্লান্ত প্রচেষ্টা, অসাধারণ ইচ্ছাশক্তি, সামান্য মৌলভী থেকে বিট্রিশ প্রশাসনের প্রশাসক এবং পরে মুসলমান নবাব খেতাবে অধিষ্ঠিত হয়। এভাবে তার অসংলগ্ন, স্বতন্ত্র, অচরিতার্থ, জীবনসাধনা, কর্ম প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত বাস্তব সত্য ও তৃপ্ত জীবনের পর্যায় পেয়েছে।
ইংরেজদের বিশাল সময়ের রাজত্বকালে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনাক্রম, শাসন শোষণ, পীড়ন দ্বিজাতিত্বের কঠিন জটিল লোডীয় মানসিকতা মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্বন্দ্বময় পরিবেশ ছিল তাদের জন্য বিরূপ এবং অনুকূল বর্জিত। এই দ্বন্দ্বময় সময় পরিসরে আবদুর রশীদের মধ্য দিয়ে মুসলমান সমাজের বিকাশ, ধর্মীয় কুসংস্কার, অপরিশীম অনগ্রসর, অযাচিত নৈতিক নীয়ম নীতি থেকে মুক্তির জন্য বস্তুনিষ্ঠ জীবন বোধ ও জীবনাকাঙ্ক্ষা স্বীকৃতি পেয়েছে।
এ প্রসংগে টার্নার সাহেব এবং লে. গভর্ণরের কথোপকথনের একটি অংশ স্মরনীয়, ‘মানুষের ইতিহাসটাই ভেল্কিবাজি। ঐ খেলাই খেলতে বলছি। এ দেশ শাসন করার ওটাই একমাত্র কৌশল। যেদিন এ কৌশল ধরা পড়বে সেদিন আমাদের দিন ও ফুরোবে। আমার মনে হয়, কিছু কিছু মুসলমানকে মঞ্চে টানার সময় এসেছে। ….
চমৎকার ইংরেজী জানে। হেস্টিংসের মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করেছে। কি করতে চাও তাকে?
ডিপুটি। ওকে ডিপুটি ম্যাজিস্ট্রেট করতে বলি
ডিপুটি। মুসলমানকে। বলো কি?
হ্যাঁ, তাই বলছি। একটা নজীর সৃষ্টি করো! একজন মানুষ সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারবে না। শাসন করার কাজ মুসলমানই ভালো জানে। ১
নবোদ্ভূত মধ্যবিত্ত মুসলমান বিকশিত সমাজের উনিশ শতকীয় মধ্যপর্যায়ের কালিক স্বাতন্ত্র্য্য চিন্ত ধারা, আত্মকেন্দ্রিক জাতিসত্তা, ব্যক্তিঅস্তিত্ব, আত্মানুসন্ধান, অন্তসত্যের পরিচয়বাহী হয়ে উঠেছে।
সমকালীন রাজনীতি পরিপুষ্ট, সিপাহী বিদ্রোহ ফরাজি আন্দোলন ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ, ইংরেজের আনুকূল্যে চাকরি গ্রহণ করে, ইংরেজদের আনুগত্য লাভ এবং পরিশেষে নবাব পদে ভূষিত হয়ে সামন্তাদর্শে ভগ্নাবশেষ শহীদ নবাবকন্যা বিলকিস বানুকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে ঔপনাসিক সে সময়ের বাঙালি শিক্ষিত মুসলমানের জাগ্রত অস্তিত্ব সংগ্রাম, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, তার্কিক, নৈতিক মতাদর্শে জীবনরূপ বিধৃত করেছেন।
আবদু রশীদ নিজ ভাষা বদল করে উর্দুকে মাদারি জবান বানিয়ে অভিজাত হয়ে উঠেছে। আব্দুর রশীদ আভিজাত্যের দরবারে স্বীকৃতি লাভ করে। তার অতীত কেউ স্মরণ করে না। আর সকলের ন্যায় সেও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, সে আজন্ম নবাব। তার ভাষাও বদল হয়। বাংলার বদলে উর্দু হয় তার মাদারি-জবান। ২০
উপন্যাসের শেষে ভাওয়াল গড়ের অনুষঙ্গেই নুরুন্নাহার ও কামরুদ্দীনের পরিণয় সূত্র সংযোজিত হয়েছে। এদের জীবন পটে ঔপন্যাসিক বিংশ শতাব্দীর নিরাসক্ত বিবেকদর্শীয় সমষ্টি সত্তার পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তী এবং পরিবর্তিত জীবনের অমোঘ ও অনবিার্য শক্তির আবর্তনে অস্থিতিশীল সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে খণ্ড খণ্ড কালের যাত্রার অভিজ্ঞ বর্ণনাভঙ্গি ও জীবন দৃষ্টি লক্ষ্য করা যায়।

তবে সে রোমাঞ্চ বাল্য এবং যৌবন কালের রোমাঞ্চ নয়, সে রোমাঞ্চ হারানো অতীতকে ফিরে পাওয়ার দুরাশা। তার তাগিদে একমাত্র পুত্রকে সংগে নিয়ে তারা শায়েস্তাবাদের পথে কলকাতা ত্যাগ করে। তবে এবার পদব্রজে নয়, ঘোড়ার পিঠেও নয়, রেলগাড়ীতে কেননা তখন নিম্নবঙ্গ এবং কলকাতার মধ্যে ট্রেন এবং ষ্টীমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ইংরেজ রাজত্ব দোদুল্যমান পেন্ডুলাম নয়, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং সুদৃঢ়। তার বুনিয়াদ দেশী জমিদার তালুকদার এবং ইংরেজি শিক্ষিত আমলা। শতাব্দী কালের আলোকে এই ‘ত্রয়ী’ উপন্যাসের কাহিনী আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক নৈয়ায়িক বোধীয় বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমানের মানসিক সক্রিয়তায় বিরাজমান।
কাহিনী চরিত্র পরিকল্পিত ঘটনা প্রবাহে কালের দ্বন্দ্বময় রূপায়ণে জীবনের সমগ্রতা ব্যাপ্তি লাভ করেছে। পদ্মা মেঘনা যমুনা উপন্যাসে ইদ্রিস মিঞার জীবন যেমনই হোক কেটেছে। কিন্তু তার সন্তান মামুনের জীবন হয়ে উঠেছে কালের অনুষঙ্গে দুর্বিসহ। মামুনের ব্যক্তি অভীলা, রাজনীতি সামাজিক অর্থনৈতিক অস্তিত্বসংগ্রাম বাঙালি মুসলমানের সমসাময়িক কালের দীক্ষায় নীতি-জিজ্ঞাসার রূপ পেয়েছে।
শিল্পগুণ বিচারে, নাট্যগুণ প্রবাহে ভাষার পারিপাট্যে সাফল্যস্পর্শী না হলেও ঐতিহাসিক কাল পরিক্রমায় ত্রয়ী উপন্যাস সংগ্রামশীল আত্মাবিষ্কারে তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতামণ্ডিত জীবনবোধের পরিচায়ক। ঔপন্যাসিকের প্রকরণ পরিচর্যা অলংকার-নির্ভর না হলেও ভাবাবেগ বর্জিত ত্রয়ী র সামাজিক অভিনিবেশ সদর্থক পরিকল্পিত জীবন রূপায়ণে, সচেতন প্রয়োগকৌশল অপরিসীম মূল্যবান এবং সর্বদর্শী সময় উৎসারিত সর্বস্বসলিল ।
উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজের অস্তিত্ব-সংগ্রাম, আত্মসন্ধান-সংকট, আত্মাবিষ্কার আর্থ- সামাজিক-রাজনীতি জিজ্ঞাসায় সমাজচিত্র প্রতিভাত হয়েছে এই ‘ত্রয়ী’ উপন্যাসে। ওয়াহাবি আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, স্বদেশী আন্দোলন, ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের মধ্য দিয়ে শতাব্দী কালের সুপরিকল্পিত ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ (১৯৬৩) ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ও ‘সংকর সংকীর্তনে ইতিহাসভিত্তিক জীবনরূপ উল্লিখিত হয়েছে।
ঔপন্যাসিক আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘সংকর সংকীর্তন’ উপন্যাসে মুসলমানগণের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় সংস্কারের বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। কারণ বাঙালি মুসলমান জাতির শাসন ক্ষমতা অপসারিত হওয়ার পর থেকে ইংরেজ আধিপত্যে তাদের জীবন পরিচালিত হয় দীর্ঘসময়।
সুতরাং সমকালীন রাজনীতির শিক্ষা গ্রহণে, ইংরেজী শিক্ষার কৌশল গ্রহণে, ইংরেজ সরকারের অধীনে চাকুরিতে নিয়োজিত হয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরী করতে থাকে। সময় স্বভাবের পট পরিবর্তনে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের মাধ্যমে পুনরাবির্ভাবের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের অস্তিত্ব উদ্ভবের সূচনা ঘটতে যাচ্ছে। ঔপন্যাসিক সচেতন ঔচিত্যবোধে ইতিহাসের গতিধারার বিবর্তনে মুসলমানের পুনর্জন্মের শ্রেয়োসন্ধান করেছেন। কালের মানদণ্ডে ঔপন্যাসিক অত্যন্ত দক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।
আবু জাফর শামসুদ্দীন ‘প্রপঞ্চ’ (১৯৮০) উপন্যাসে পেশাজীবী অন্তঃসারশূন্য মিথ্যা বুলি আওড়ানো রাজনীতিবিদদের কটাক্ষ করেছেন। দেশে ভ রাজনীতির আধিক্যে, ঔপন্যাসিক আর্থ-সামাজিক- রাজনৈতিক কাঠামোয় অর্থলোলুপ রাজনীতিবিদেরা তাদের স্বার্থ হাসিলে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে বলে দেশের অবস্থার কথা চিন্তা করে এ উপন্যাস রচনার প্রয়াস পেয়েছেন।
আত্মজৈবনিক এ উপন্যাসের নায়ক শাহাদত অত্যন্ত অর্থলোভী-নারী লোভী সমাজতন্ত্রী রাজনৈতিক নেতার এক স্বার্থপর চরিত্র। সে শ্রমিক নেতা হয়েও জনগণের কাছে দেশ ও দশের দুরাবস্থার কথা বলে, নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছে। শাহাদাত পিতার অনাদর-অবহেলা ও অবজ্ঞাপ্রাপ্ত এক সন্তান। যার স্থান নাকি বাড়ির চাকর ও কাজের লোকদের সাথে জড়িত।
দেশের শ্রমজীবী নিঃস্ব অবহেলিত জনগণের সেবক ও মানব কল্যাণে নিয়োজিত শ্রমিক নেতা জামানের কাছে শাহাদতের রাজনীতির হাতে খড়ি। ভূমিহীন, সর্বহারাদের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মার্কন লেনিন, ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্র বিভিন্ন উপন্যাস পড়ে একজন স্নেহভাজন বিশ্বস্ত সহযোগীর ভূমিকা গ্রহণ করে।
নেতা জামানের সান্নিধ্যে সে নিখিল বঙ্গ মজদুর দলের স্থানীয় শাখায় আয়োজিত সভায় জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয় আমলাতন্ত্র নিপাত ও শ্রমিক রাজ কায়েমের কামনা করে। সে দেশের নিরীহ জনসাধারণকে বক্তৃতার জালে বন্দী করে একজন প্রতারক, অবিশ্বাসী বৈপ্লবিক নেতা হয়ে উঠে। যা নাকি আমাদের সমাজে অনেক উদ্ভট নেতাদের চরিত্রে সুষ্পষ্ট রূপ পরিলক্ষিত হয়।
শাহাদত একটু একটু করে সমাজে দ্বৈত চরিত্রের বিকাশ ঘটিয়ে অগ্রসর হয়। শোষণ মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার কথা বলে সে হয়ে উঠে অর্থলোভী, প্রপঞ্চক। তারমতে ‘ঘুষ খাওয়ার ব্যাপারে ঊর্ধ্বমধ্য অধঃ এক যোগসূত্রে বাঁধা’। শাহাদত অকৃতজ্ঞ। সে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে, আদর্শ নেতা জামান ও তার স্ত্রী, বোন হেনা যখন গাড়ী করে, একইসাথে বাড়ি ফিরছিল, তখন তার প্রলুব্ধ বৃষ্টির মধ্যে শাহাদতের মানসিক বিকার পরিলক্ষিত হয়। তার মতে, ‘বিচার করে দেখলে যে কোন পুরুষ যে কোন নারীর প্রয়োজন পুরণের যোগ্য এবং ভাইস ভার্সা’। (প্রপঞ্চ / পৃ: ৫৬)
যুদ্ধোত্তর পরিবেশের একজন শ্রমিক নেতা তার স্বার্থ সংরক্ষণে এতটাই ব্যস্ত যে তা ঔপন্যাসিক শাহাদত চরিত্রে দেখিয়েছেন। বামপন্থী প্রগতিশীল শাহাদত মিটিং বক্তৃতায় যদিও দুর্নীতি ও বুর্জোয়া আমলাতন্ত্রের নিপাত ও ব্ল্যাক মার্কেটিয়ার বণিক সমাজের ধ্বংস কামনা করে তথাপি সে চায়। (প্রপঞ্চ / পৃ ১৯)
শাহাদত তার অসুস্থ রাজনীতি শুরু করে সামন্তবাদী বি-পিতার হত্যার সাথে জড়িত থেকে। সে অর্থ নৈতিক শোষক হিসাবে নিজেকে পরিচিত করে বিভিন্ন ভাবে। নতুন সমিতির হয় অবৈতনিক ভাইস চেয়ারম্যান। জামান গ্রেফতার হলে শাহাদত তার বোনকে বিয়ে করে। এছাড়া আরও দুটি বিয়ে আছে তার। প্রতারণা করে সরকারি অফিস কর্মচারীদের ঘুষ দিয়ে নিজের বিপদ উদ্ধার করে সে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে। তার বিজনেস গড়ে উঠে কুটকৌশলে।
দেশের সাথে প্রতারনা জালিয়াতি করে বিদেশের সুইস ব্যাংকে টাকা জমায়। রেল শ্রমিক ব্যবসাও তার পক্ষে সম্ভব হয়। সে সমাজতন্ত্রের কথার দ্বারা জনগণকে বিদ্ধ করে। বিপুল ভোটে পাশ করে সে হয় একজন পার্লামেন্টের সাংসদ। স্টেট ব্যাংক স্পেশাল ব্রাঞ্চের লন্ডন জেনেভা থেকে ও তার গ্রেফতারি পরওয়ানা রহিত থেকে যায়। তার যথাসাধ্য কুৎসিত মনমানসিকতা সমিতির ব্যবসায় প্রকাশিত হয় আদর্শবাদী নেতা জামানের কথার প্রেক্ষিতে। যেমন :
“আমি কোপারিটিডের কথা তুললাম। জামান সাহেব সোৎসাহে বললেন: কাজের মতো কাজ শুধু ফিশার ম্যানস কেন তন্তু বায়দের কোপারিটিভ ও করো। সুতোর অভাবে তাঁতশিল্প লুপ্ত হতে চলছে, গরীব তাঁতী মরছে। ওদের বাঁচাতে হবে। এইতো দেশের কাজ। জনগণকে সংগঠন করার জন্য কোপারিটিভ সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম।
রাজনৈতিক চেতনা তৈরী করার সহজতম পথও বটে। অবশ্য থিয়োরিটিকালি স্পীকিং কোপারিটিভ হচ্ছে রিফরমিট আন্দোলন, কিন্তু কোপারিটিভ হচ্ছে ওয়ার্কার্স এ গিজ্যান্টস সোভিয়েত, মানে কৃষক শ্রমিকের সোভিয়েতে রূপান্তরিত করা সহজ এবং সম্ভবও। স্টেট উইদিন স্টেট-অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিতরে বিকল্প রাষ্ট্র ক্ষমতা অধিকার এবং ডিকটেটরশিপ অব দ্যা প্রলেতারিয়েত স্থাপনের মোক্ষম যন্ত্র বুঝলে? ২০
শাহাদতের সুবিধাবাদী রাজনীতিতে রয়েছে সর্বহারা বনাম অসুস্থ প্রভুত্বকামী নেতাদের নীতি বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র।
জামান সাহেবের কথা হচ্ছে সময় ও অবস্থাই মানুষের প্রয়োজন। তিনি কপাল কুসংস্কার মানেন না। তিনি একজন আদর্শ মার্কসসিষ্ট। কিন্তু, সর্বহারাদের নেতা হয়েও শাহাদত যা কিছু করেছে তা সবই নিজের সুবিধার জন্য। সে তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য ব্ল্যাকে সূতা বিক্রি করে। সে নিরীহ গ্রামবাসিকে দিয়ে উদ্ধার করে তার স্বার্থভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিসর। সে চরের গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে বলে
আমাদের সমিতির থাকবে বড় বড় জাল, বড় বড় নৌকা। নদীবেড় দেবো, নৌকোর নৌকো মাছধরা পড়বে প্রতিখেয়ে। একা কেউ মালিক হবে না। সকলে মিলে হবে মালিক মাছ বিক্রয়ের অর্থ সকলে মিলে ভাগ করে নেবো কারো অভাব থাকবে না। আমরা মালটি পারপাজ মানে বহুমুখী সমিতি ও করতে পারি: কেনা বেচা সবকিছু করা যাবে এমন কি ধান চাল তেল নুন কাপড় প্রভৃতি ব্যবসা ও সমিতি করবে লাভ সকলেই পাবে ১৬
শাহদাত তার চারিত্রিক পরিপক্কতা দিয়ে অসহায় জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান ও ইসলামী সমাজতন্ত্রের কথা বলে।
যুদ্ধোত্তর অসংগঠিত বাংলাদেশে অবক্ষয়ী সমাজে যেখানে সুস্থ কল্যাণকর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক নবোদ্ভূত নেতৃত্বের ফলপ্রসূ বাস্তবায়িত জীবনবোধের সাথে অসুস্থ অরাজনৈতিক, কালো টাকার অর্থকরী ফল ও মানুষ অন্বেষণ করেছে এবং কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই তা করেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিভাবে হতে পারে তারই প্রতিযোগিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক।
যদিও এ উপন্যাসে অনৈতিক কার্যক্রম সমূহ যুদ্ধের পরে অসম্পূর্ণ সমাজের প্রেক্ষাপট এঁকে ঔপন্যাসিক স্বার্থক ভূমিকা রেখেছেন, তথাপি লক্ষ্য করা যায় শিল্প সাফল্যেও প্রকরণ পরিচর্যায়, আঙ্গিক নির্মাণ প্রচেষ্টায় শিল্পিত ভঙ্গি ও যত্নাভাব রয়েছে।

কিন্তু ঔপন্যাসিক অসুস্থ রাজনীতি ও ব্যক্তিত্ববোধের অভাব যেখানে রয়েছে সেখানে সুস্থ কল্যাণকর নীতিবোধের প্রাধান্য চান। ন্যায়-অন্যায়, কর্তব্য-অকর্তব্য ও শ্রেয়-প্রেয়ের দ্বিধাদ্বন্দ্বে প্রতিটি মানুষ তার জীবন যাপনে জড়িত থাকে। মানুষ সহজ শর্তহীন স্বাভাবিকতায় মানবীয় মূল্যবোধে যা কিছু ভাল তাই গ্রহণ করবে এটাই লেখকের প্রকৃত ইচ্ছা ও সততা। বিপদ, অন্যায় অশুভ আহ্বানে মানুষ নৈতিক হতে পারে না। এজন্য তাকে প্রতিনিয়ত মানসিক উন্নতির পরিচর্যা করতে হবে। অন্যায়, অসুস্থ বিকৃতরুচি পরিত্যাগ করে।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের “দেয়াল” (১৯৮৬) উন্মোচিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সূচনালগ্নে ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের তাণ্ডব পূর্ণ ভয়াবহ হিংস্র কালো রাত্রির আনুষঙ্গিক প্রতিক্রিয়ায়। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক রূপায়ণে উপন্যাসের ব্যক্তিচরিত্র আবদুল্লাহ সাহেবের আত্মপরীক্ষা, ব্যক্তিঅস্তিত্ব, পূর্ববাঙলার সাড়ে চার কোটি জনসাধারণের পরিস্থিতি প্রক্রিয়ার স্বরূপ মুক্তিসংগ্রামের রূপায়ণে শ্রেষ্ঠ শিল্প সমৃদ্ধির অন্যতম উৎকর্ষ লাভ করেছে।
সময় কাল জীবন তৃপ্ত অবস্থানে আবদুল্লাহ নিজের গণ্ডিবদ্ধ আবহে স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, সন্তানসহ সুখে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সূচীভেদা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে তার জীবনে নেমে আসে অপরিসীম পরাজয়, গ্লানি, নিঃস্বতা। তার কাছে সে রাতকে অসম্ভব অন্ধকার মনে হয়। ‘অন্ধকারে অন্ধকারও অদৃশ্য। নতুন এক মাতৃজঠর যেন, কিন্তু মাতৃজঠরের নিরাপত্তা নেই। অদ্ভুত ব্যাপার। সযত্নে রচিত প্রাচীরটিই বা কোথায়। কিছু দেখা যায় না। দেয়াল দেখার জন্যও কি তাহলে আলো চাই ?১৭
এই চরিত্র প্রধান উপন্যাসে বাঙলার বিশাল ভূখণ্ডের ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ভাষার প্রশ্নে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, বিভিন্ন মতবিরোধাত্মক আন্দোলন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক মতাদর্শ এই সমস্ত ইতিহাসক্রম প্রসঙ্গ স্মৃতি বিজড়িত অভিজ্ঞতায় আবদুল্লাহ চরিত্রে বিন্যাস্ত হয়েছে। তার জীবনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলমানের দীর্ঘকালব্যাপী আত্মসমীক্ষা, আত্মানুসন্ধান, রুচিবোধের অবিবেচনা প্রচলিত পিতৃপুরুষের আজন্ম লালিত বিশ্বাস, ধর্মীয় আদর্শ উন্মেষ, ভাঙা গড়ার ঐতিহ্যের ক্রম রূপান্তর।
আল্লাহ ধর্ম ঈমানের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, সংস্কার ঘটনার অস্বাভাবিকতায় নিমজ্জিত হয় অন্ধকারের অতল গহ্বরে। পাকিস্তানী ধ্যান ধারণায় বশীভূত লাচার এতিম ব্যর্থ আবদুল্লাহ ২৫ মার্চের রাতেই এক নতুন তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যার সতাদর্শী আদর্শের উন্মুক্ত দ্বারে প্রবেশ করে।
“মুসলমান পাড়ায় গ্রামের একমাত্র শরীফ ঘর মিঞাবাড়ির সন্তান আবদুল্লাহর বাবা সৈয়দ আবদুল গনি ওরফে চান মিঞা সিকির্মী স্বত্ত্বে তালুকদার। মওলানা আশরাফ আলী থানভীর তিনি ছিলেন ভাবশিষ্য। তিনি ইংরেজ সমর্থক ছিলেন। পিতা প্রদত্ত প্রথাধর্মী সংস্কার আদর্শ কুসংস্কার বোধ সামস্ত ধর্মই হয় আবদুল্লাহ চরিত্রের পাথেয়।
পূর্বধারণা প্রসূত লাতিত্যবোধ থেকেই, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা ও শিক্ষিত হয়ে ও পূর্ব বাঙলার বিপর্যয় অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সমস্ত নীতি বর্জিত পাকসেনাদের দ্বারা বাঙালি জনগোষ্ঠী নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হলেও তার মানসিক পরিচর্যা বিকশিত হয় না।
সে এভাবেই হয়ে থাকে একজন ঈমানদার পাক্কা মুসল্লী, সরকারি চাকুরিজীবী এবং পাকিস্তানী রাষ্ট্রের যোগ্য শিক্ষিত সুনাগরিক। পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে তার হুক বাঁধা সীমাবদ্ধ জীবনের সঙ্গতি রক্ষা পায়নি। বর্তমান সময়ে যোগসূত্রের আবহে সে মুসলিম লীগ নয়, আত্তামি লীগ নয়, বামপন্থী বা কোন প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত নয়। তার একমাত্র কথা হচ্ছে পাকিস্তান, ইসলাম ও লক্ষ্যাভিমুখী প্রবৃত্তি অর্থ ও প্রতিপত্তি
তার মতে পাকিস্তানী ইসলামী রাষ্ট্রের বিরোধীতা করা নিমক হারামি। ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন উজ্জীবিত রাজনীতির সে পক্ষপাতি নয়। তার অনুন্নত বিশ্বাস ও আদর্শিক মনোভাব থেকে চায় পাকিস্তানী আদর্শ। ইল্লিন আর সিজ্জিন। রাজা আদেশ করবে প্রজা তা পালন করবে।
এদ্দিন ইংরেজি শিখেছি এখন উর্দু শিখব। তার সততা, সত্যবানী তাকে সরিয়ে রেখেছে অভিজ্ঞান থেকে অনেকখানি দুরে। সে বলে ‘দেশের মানুষ পাগল হলো নাকি। এতজলদি সব কিছু ভুলে গেল? মুসলমানের এক আল্লাহ, এক কেতাব, এক রাসুল, এক পার্টি এক নেতা এই সিরাতুল মুসতাকীম পাকিস্তান আনছে কেমন করে এত জলদি ভুলে গেল সে কথা । তার কাছে মানুষ প্রতারক, নীতিবর্জিত।
গভীর অন্ধকারের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ অসচেতন আবদুল্লাহর আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সমাজ-সময় জীবন সত্যে পরিণত রূপ পেয়েছে। আবদুল্লাহ সাহেব সুখ কামনা করে। সুখ শান্তিকে একটি সতত প্রবহমান নৈতিকতারূপে কল্পনা করতে তার বড় ভাল লাগে। কেন যে তার মধ্যে ছেদ পড়ে বোঝা যায় না। হিন্দুর কালীবাড়ির জন্য মানতের পাঠায় গলায় খড়গের কোপের মতো সহসা কোপ পড়ে সুখশান্তি দু’টুকরো হয়ে তড়পাতে থাকে।
সে জানে কোন জানানার ডাক্তারি করা আখেরাত ধ্বংস। তার চাকুরি নেই বিধায় তার বুদ্ধিমতী স্ত্রী আফিয়া হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিসের মাধ্যমে সংসার পরিচালনার কথা ভেবেছে। আফিয়া বেশি লেখাপড়া না জেনেও নৈতিক মানদণ্ড বিচারে সে সুবিবেচক। এখানে একটি উদ্ধৃতি প্রসঙ্গত হয়ে উঠেছে। ‘মাইয়ালোক অইয়া জন্মাইছি বইলা কি বাঁচার পইথ নাহি আমরা দুনিয়াড়া তোমাগ ও আযাগও। আল্লাহতালা মাইয়া লোকের পেটেই পুরুষ তৈয়ার করেন, নিজের আইনে নিজে বাঁধা হি হি
আবদুল্লাহর মানসিক চিন্তায় অনেক ধর্মীয় ন্যায়সঙ্গত তার্কিক অভিব্যক্তি যোগ হয়েছে। যেমন অযাচিত জিনিসপত্র সম্বন্ধে কেতাব, কোরানে যেহেতু লিখা নেই তা নিষিদ্ধ নয় হালাল। সে নিজকে খাঁটি একজন ইসলামী দেশের নাগরিক করে রাখতে চায়, ভাষার ব্যবহার, চারচলন সমস্ত কিছুর মধ্যে। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী জানেনা যে, আবদুল্লাহর নিঃস্ব অবস্থার পরেও কি পরিমান মনে প্রানে পাকিস্তানী।
সে ধারণা করে জনগণের ভালর জন্যই সরকার কায়েদে আজমের ছবি টাকার মধ্যে সিল মোহর মারা। কিন্তু সে আল্লাহর প্রতি ভক্তিতে ও নীতিতে অটল বিশ্বাসে জেনে আসছে ‘তসবিরআলা নোট পকেটে নিয়েই নামাজ রোজা করতে হয়। ইসলামী হুকুমত পাকিস্তানী কেন যে এ কাজ হচ্ছে আল্লাহ মালুম। খোদা হাফেজ । ইন্নামাল আমালু বে ন্নিয়াত” সৎ আবদুল্লাহ সাহেব অফিসে না গিয়ে বেতন গ্রহণ করাকে হারাম মনে করে। সরকারের সাথে বেঈমানি করা জায়েজ নয় সে মনে করে।
সৈয়দ আহম্মদ, সুফিয়া, বাল্য বান্ধবী বিনা এরা বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জেল খাটে। আবদুল্লাহ সাহেব মনে করে অপরাধের শাস্তি তো হতেই হবে। পরিবর্তনশীল সমাজ এবং প্রগতিশীল রাজনীতি থেকে নিজেকে তিনি অত্যন্ত অভিকৌশলে হেফাজতের সাথে সরিয়ে রেখেছেন। পিতার ও পরিবারিক আদর্শকে কাজে লাগিয়েছেন।
অর্ধ শতাব্দীকালের উপন্যাসে যা চিত্রিত হয়েছে তা তাঁর স্মৃতি রোমাস্থনের পরিচর্যা মাত্র। সমস্ত অধিকার সচেতনতা গণতান্ত্রিক আন্দোলন কিছুর সাথেই সে জড়িত নয়। দাসত্বমনোবৃত্তি, উপনিবেশ আমলে নির্বিরোধ, নির্দ্বন্দ্ব, নীতি আচার-ব্যবহার চাকুরি সমস্ত দায়িত্ব ও সুখ নিয়েই পাকিস্তানে থাকার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি।
কিন্তু ২৫ মার্চের রাতেই তাঁর জীবনের চরম অন্ধকার নেমে আসে এবং অমুক ব্যবস্থা, তাবে, চিরাচরিত সংস্কার বংশগত ধর্মীয় রীতিনীতি, গোরামী, আত্মকেন্দ্রিক নীতিবিরুদ্ধ নীতি থেকে উন্মলিত করে দেয়। দেয়ালরূপী পর্দা প্রথা, বিশ্বাস নিরাপত্তা বোধ পাকিস্তানী আদর্শে উদ্বুদ্ধ সরকারি কর্মকর্তার গতানুগতিক জীবনে নেমে আসে গভীর নির্মম মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা।
পাকিস্তানীদের ঘৃণ্য নিষ্ঠুরতা ও লালসার শিকার তার রক্তাক্ত, উলঙ্গ, স্ত্রী ও সন্তানদের দেহ পরে আছে চত্বরে তা তাকে প্রত্যক্ষ করতে হয়। এই বেদনা বহুল বাস্তব সত্য তার চৈতন্যে ঘটে অনিবার্যভাবে নতুন কর্মপ্রেরণা। চিরদিনের দাসত্ববোধ, কুসংস্কার শোষণের প্রতীক তার বাড়ির বাউন্ডারি দেয়ালের বেড়াজালের নিগর ডিঙ্গিয়ে তিনি প্রবেশ করেন শুদ্ধ, সুন্দর সত্য চৈতন্যলোকে।
আবদুল্লাহ সাহেব প্রবল শক্তি প্রয়োগ করে পাকসেনাদের রেখে যাওয়া পাচসের ওজনের লোহার শাবল দেয়ালে মারতে থাকেন।
ভাইসব আপনেরা আসেন। দেয়াল ভাঙ্গেন, হিঞ্চো! ভাঙ্গি দেয়াল হিঞ্চো! ভাঙ দেয়াল হিতো। এই মারো রে শাবল হিতো! হিচ্চো!
মাথার টুপি রক্তের দলার উপর পড়ে যায়। ভোরের বাতাসে দাড়ি নড়ে। আবদুল্লাহ সাহেবের বিরাম নেই। বাঁধন ঢিলে হতে হতে কোমরের লুঙ্গি মাটিতে গড়ায় ফজরের নামাজ ফৌত হয়। হাতে ফোসকা পড়ে। কোনদিকে খেয়াল নেই। আবদুল্লাহ সাহেব শাবল চালাতেই থাকেন মারো শাবল হেইয়ো! ভাঙ দেয়াল হেইয়ো!
আবদুল্লাহ সাহেব পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নির্মম নির্লজ্জ হিংস্র ছোবল, প্রত্যক্ষ করে আজীবন লালিত বোধহীন বিশ্বাস সংস্কার, চিরঞ্জীব সাধনার মধ্যে থেকে তার পরিবার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। তার এই জাতীয় অসার চেতনার ট্রাজেডি অসচেতন প্রথাবদ্ধ নীতিভিত্তিক কার্যকারণ জাতীয় অস্তিত্বের শোকগাঁথায় দীপ্রতা পেয়েছে। চেতনা ও বাস্তবের সংঘাতে তার বিশ্বাসের প্রাচীরের ভাঙন ও আত্মরূপান্ত রের (Self metamorphosis) প্রক্রিয়ায় রূপায়ণে নাট্যরীতির কুশলী প্রয়োগ এ উপন্যাসের পরিচর্যাকেও করেছে শিল্পসম্মত।২৪
ঔপন্যাসিক দেখাতে চেয়েছেন মুক্তিসংগ্রামের যেসব বাঙালি সরকারি চাকুরিজীবী ছিল তারা পাকিস্তান পন্থী হলেও অনেক সময়ই রেহাই পাননি। কারণ পাক সেনারা বাঙালিদের মুসলমান বলে স্বীকার করতে চাইতো না। তাদের ধারণা ছিল ওরাই মুসলমান, এছাড়া আর সব বিধর্মী। এদিকে আবদুল্লাহ সাহেব ও নিজের মৌলবাদিতা প্রকাশ করে মৌলবাদী হয়ে গেছেন। কারণ তাঁর ধারায় ছিল না সে কি ধরণের অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। যখন নিজের দিকে সজাগ হলো তখন তাঁর সব কিছুই শেষ।
ঔপন্যাসিক আবদুল্লাহ চরিত্রে দেখিয়েছেন, আবদুল্লাহ কৌশলী নন, নিজের ভাল মন্দ বুঝে কম আস্বস্থিকর পরিবেশে পরেও সে কি ধরণের বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন তার দিকেও লক্ষ্য ছিল না ঔপন্যাসিক লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যহীন মানুষকে সচেতন হতে বলেছেন। সচেতনতা ছাড়া নৈতিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। নিজের জন্য, না অন্যের জন্য। ব্যক্তি যত ভালই হোক তবুও সে বিচার্য বোধে নৈতিক বিবেচনাহীন হতে পারে।
লেখক এ উপন্যাসে অত্যন্ত জ্ঞানী ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ চরিত্রের মধ্যদিয়ে। তাঁর সর্বজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গি চারিত্রিক বিকাশ ও বিষয়াবলী কাহিনী বিন্যাসে ফুটে উঠেছে নৈতিক বিচার্যবোধ।