আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী এর অন্তর্গত।

আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলী
উপন্যাসের নানা আঙ্গিক ও বিষয়-বৈচিত্রের কথা বিবেচনা করে সমালোচকগণ উপন্যাসকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। সমাজিক উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস, মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, ইত্যাদি অভিধায় অভিসিক্ত হয়েছে বিশেষ বিশেষ ধরনের উপন্যাস। আঞ্চলিক উপন্যাস ও উপন্যাসের এমনি একটি শাখা। আঞ্চলিক উপন্যাসের শিল্পশৈলীর পৃথক ফ্রক স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।
Novel of the local color বা Novel of the soil নামে অভিহিত যে সব উপন্যাস, তা মূলত অঞ্চল-বিশেষের স্তরে রঞ্জিত। আঞ্চলিক উপন্যাসে-নাম থেকেই স্পষ্ট হয়, অঞ্চলবিশেষের জীবনাশ্রয়ী এক বিশেষ শিল্পশৈলীর উপন্যাস। অঞ্চল বলতে কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ডের জলবায়ু, মাটি, প্রকৃতিক পরিবেশ, যা সেখানকার জনজীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে তাকেই বোঝানো হয় সেই ভূখন্ডের অধিবাসীদের দৈহিক গঠন, মানসিক বিন্যাস, ভাষার ব্যবহার বিশেষ উচ্চারণ ভঙ্গি, সামাজিক নিয়মনীতি, বিশ্বাস, সংস্কার, পোষাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাত্রার অকৃত্রিম রূপ বোঝায়।

ভাষা-সংলাপে স্থানীর প্রবাদ-প্রবচন এমনকি উচ্চারণ ভঙ্গিকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়, যাতে সেই অঞ্চলের পরিশেষ-ধৃত পটভূমি থেকে চরিত্রগুলো কোনো ক্রমেই পৃথক করা যায় না।
সেই অঞ্চলে বসবাসকারী নিউজনের নয়, অপেক্ষাকৃত নিম্নশ্রেণী ও কৌম-সামাজের জীবনের মধ্যেই আঞ্চলিকতার রূপ গাঢ়ভাবে পাওয়া যায়। আমরা বলতে পারি, কোন ঔপন্যাসিক যখন কোন বিশেষ দেশাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, আচার-ব্যবহার, নিয়মনীতি, সমাজ-প্রেক্ষিত ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে এমনভাবে তাঁর রচনায় রূপ দেন যাতে ঐ অঞ্চল যেন সেখানকার মানুষদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আত্মিক যোগে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হয়ে ওঠে এবং সেখানকার জনজীবনে তার সর্বাত্মক প্রভাবের মধ্য দিয়েও সর্বজনীন রসাবেদনে পৌঁছায় তখনই তাঁর রচনাকে ‘আঞ্চলিক উপন্যাস” বলা যেতে পারে।”

বাংলা উপন্যঅসে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এধরনের রচনার ধারাটি সূচনা করেন। উত্তরকালে তারশস্তক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮- ১৯৭১) ‘গণদেবতা’ ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) ‘আরণ্যক’ ইছামতি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) তিতাস একটি নদীর নাম : সতীনাথ ভাদুড়ীর (১৯০৬-৬৫) টোড়াই চরিত মানস’ প্রভৃতি উপন্যাস বাংলা আঞ্চলিক উপন্যাসের ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।
উনিশ’শ সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের পর বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকরা বাংলা উপন্যাসের এই প্রবহমান ঐতিহ্যকে অস্বিকার করে আঞ্চলিক উপন্যাস রচনায় সফল অবদান রাখেন। শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৫-১৯৭১) ‘সারেং বৌ’ (১৯৬২), আলাউদ্দীন আল আজাদের (জন্ম ১৯৩২) ‘কর্ণফুলী’ আঞ্চলিক উপন্যাসের উজ্জ্বল উদাহরণ। আমাদের আলোচ্য কালপর্বের (১৯৪৭-১৯৭১) মধ্যে প্রকাশিত উল্লিখিত দু’টি উপন্যাসের আলোচনা এখানে উপস্থিত করছি।