বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ। যা বাঙালির উৎসব এর অন্তর্গত।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

উৎসব

প্রাত্যহিকতার মাঝে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া যাপিত জীবনে উৎসব নিয়ে আসে প্রত্যাশার আলো। স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে জীবনবোধের অঙ্গীকার নিয়ে পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায় উৎসব। জীবনে উৎসব না থাকা মানে জীবনের বর্ণ, বৈচিত্র্য ও আশীর্বাদকে যেন দূরে ঠেলে দেওয়া। প্রাত্যহিক উদ্ভ্রান্তির মাঝে স্থিতি আর আনন্দঘন সম্মিলনের তৃপ্তি পেতেই মানুষ উৎসবক্ষেত্রে আহ্বান করে তার সহগামীকে।

উৎসবের মিলনে সত্যের উপলব্ধি, প্রেমের পূর্ণতা আর সেখানেই উৎসবের সার্থকতা; বলে মনে করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উৎসব প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন :

সংসারে প্রতিদিন আমরা যে সত্যকে স্বার্থের বিক্ষিপ্ততায় ভুলিয়া থাকি উৎসকের বিশেষ দিনে সেই অখণ্ড সত্যকে স্বীকার করিবার দিন – এইজন্য উৎসবের মধ্যে মিলন চাই। … মিলনের মধ্যে যে সত্য তাহা কেবল বিজ্ঞান নহে, তাহা আনন্দ, তাহা রসস্বরূপ, তাহা প্রেম। … এই প্রেমই উৎসবের দেবতা-মিলনই তাঁহার সজীব সচেতন মন্দির। (রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭:৩৩৫)

তাই উৎসব একার নয়। এ এক কল্যাণী অনুভূতি, প্রেমের আনন্দ উপলব্ধি ও বিকশিত করার সমন্বয়ী প্রতিভা। আর বাঙালি সেই প্রাণপ্রাচুর্যের ধারক, কারণ সে উৎসবে উৎসাহী। আর উৎসবের ইতিবাচক দিক হল, তা সব ধর্মকে সম্মান জানাতে শেখায়। এ প্রসঙ্গে মুনতাসীর মামুনের উক্তি প্রণিধানযোগ্য

The Bengalis were religious but they had hardly shown interest for religious reasond only. Due to the infiltration of a lot of popular elements in their religion and festival there has been a growth of tolerance among the different communities and people have learnt to respect each other’s religion. (Muntassir, 1996: 13)

উৎসবকে আনন্দের সহযাত্রী বলেছেন আতোয়ার রহমান ( ১৯৮৫ : ১)। কিন্তু সেই আনন্দের স্বরূপ আর ব্যাপকতার বিষয়ে বাংলা অভিধানেও স্পষ্ট ধারণা নেই, এমন আক্ষেপ করে উৎসব সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন তিনি। পারিবারিক আঙিনায় সীমিত ব্যক্তিগত আনন্দানুষ্ঠান যেমন উৎসব, তেমনি সমাজের দশজনকে নিয়ে বা সর্বজনীন অনুষ্ঠানও উৎসব ( ১৯৮৫ : ২)।

আভিধানিক সংজ্ঞায় বিয়ে আর নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা, উৎসবের বিচারে সগোত্র। ইংরেজি অভিধানে উৎসব, a joyful or honorific celebration হলেও সে সংজ্ঞায় ভোজও সংযুক্ত; উল্লেখপূর্বক আতোয়ার রহমান যোগ করেন, ব্যক্তি বা পরিবার ছাপিয়ে, ওই উৎসবগুলোয় সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্যতা মুখ্য।

বাঙালি উৎসব সেখানে নির্দিষ্ট ঋতু বা দিনের অনুষ্ঠানমালার সমাহার। এসব অর্থে উৎসব ব্যক্তি, পরিবার বা স্থানের সীমার উর্ধ্বে। প্রধানত সর্বসাধারণ বা বহুজনের জন্যে নির্দিষ্ট দিন, সময় বা ঋতুতে এক বা একাধিক স্থান কিংবা বিশেষ কোনো সমাজে বা সম্প্রদায়ে অনুষ্ঠেয় আনন্দজনক ক্রিয়াকর্মই উৎসব। (আতোয়ার, ১৯৮৫ : 2-3)

ফোকলোরবিদ উইলিয়াম উইগিনস উৎসবের সঙ্গে মুক্তির বিষয়টি যুক্ত করেছেন, উল্লেখ করে শামসুজ্জামান খান (২০১৩ : ১৫) সে উদ্ধৃতি তুলে ধরেন : … the festival of freedom was an event which the community understood to be an essentional part of its past and p present.”

আভিধানিক অর্থে উৎসব আনন্দময় অনুষ্ঠান হলেও, সে আনন্দের ভাবাদর্শ সবক্ষেত্রে সমপর্যায়ের হয় না উল্লেখ করে, খোন্দকার রিয়াজুল হক (১৯৯৫ : ভূমিকা) লিখেছেন: উৎসবে সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপাদানই শুধু নয়, এতে মিশে আছে মানুষে মানুষে সম্পর্কের উত্তম দিকগুলোও। জনজীবনের মৌলিক ঐক্যের সন্ধান মেলে উৎসবে। তাই দেশের জনজীবনের সঠিক পরিচয় জানতে সে দেশের উৎসবের উৎস, স্বরূপ ও ঠিকানা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি। দেশব্যাপী উৎসবে সমগ্র দেশ ও জাতি বৈচিত্র্যের মধ্যেও এক অখণ্ড ঐক্যের অনুভূতিতে যেন নিজের স্বার্থকতা খুঁজে পায়।

সমাজজীবনের সঙ্গে উৎসবের যোগসূত্রের বিষয়টি সুমহান বন্দ্যোপাধ্যায় এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন : উৎসবের “মধ্য দিয়ে আমরা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক জীবনের একটা আন্দাজ পাচ্ছি।’ এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে এডিস টার্নারের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজ নিজেকে প্রসারিত করে।

সে নিজের দিকে তাকায়, সেই সঙ্গে বৃহত্তর জগতের দিকে মেলে ধরে তার দৃষ্টি। ফলে উৎসব হয়ে দাঁড়ায় এক ধরণের আত্ম প্রতিফলন (সুমহান, ২০১৪ ৯১, ৯৩)। লেভিনসন এবং এম্বার-এর কোষগ্রন্থে উৎসব নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গক্রম তুলে ধরেন তিনি। যেখানে বলা হয়েছে, মানবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল উৎসব। যা কোনো জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার আবশ্যিক উপাদানগুলিকে প্রকাশ করে।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

সমাজবিজ্ঞানীরা এই ধরনের দিকগুলোকে বলেন সামাজিক সংস্থান – অর্থাৎ প্রথাগত, নির্দিষ্ট আচার সমন্বিত, নিয়মিত সংঘটিত ব্যবহার-রীতি। (সুমহান, ২০১৪ : ৯১ )

উৎসবের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আদৌ সম্ভব নয় বলে মনে করেন মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন (২০০৭ : ৭৯), ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারিত এলাকার বসবাসরত মানবজাতির উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যৌথ উপলব্ধিতে আনন্দ বিনিময় ক্রিয়াই উৎসব। তবে সিরাজুল ইসলামের উৎসবের সংজ্ঞায় আনন্দ সম্মিলনের পাশাপাশি বেদনাবোধে একাত্ম হবার বিষয়টিও সম্পৃক্ত। বিশদভাবে তিনি উল্লেখ করেন

মানব জাতির সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ব্রতাচার, পূজা-পার্বণ উপলক্ষে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশে দল-মত নির্বিশেষে সকলের ঐকান্তিক মিলন মেলার সংযোগে সকলের মনে আনন্দের ঢেউ কিংবা বেদনার বার্তা সকলের মধ্যে মিলিয়ে দেয়ার মাঝে তথ্য সমবেত হওয়ার যাবতীয় ক্রিয়াকর্মকে উৎসৰ বলে। কোনো নির্দিষ্ট অনির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে অথবা বাহিরে বসবাসরত জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং গোত্রের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় কৃষ্টি-কালচারের সম্পৃক্ত সর্বজনীন অনুষ্ঠান, যেখানে আগত দর্শক অংশগ্রহণকারী আমজনগণকে আনন্দ দান করে অথবা হর্ষ-বিষাদের মাঝে একই সূত্রে গ্রথিত করে সকলের মাঝে সেতুবন্ধন রচনা করে তাকে উৎসব বলে। (সিরাজুল, ২০০৭: ৮০)

কোনো বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ধর্মমত, গোত্র, বর্ণ এবং জাতিভেদে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত জনসমাগম এবং আনন্দ-বেদনার সমবন্টনই উৎসব। সেই আয়োজনে প্রচলিত বিধি নিয়ম এবং ব্রতাচারের আনুষ্ঠানিক রীতি সম্পাদনও উৎসবের অংশ বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম।

মানুষের প্রকৃতির সঙ্গেই মিশে আছে উৎসব করার বৈশিষ্ট্য। উৎসবকে সর্বজনের মিলন ক্ষেত্র উল্লেখ করে একে অসংকোচ ও উচ্ছ্বসিত আনন্দের প্রকাশ বলে বিশেষায়িত করেছেন আলী আনোয়ার (২০০৮ : ১৬১)। তাঁর মতে, উৎসবে আনন্দমাত্রই সংক্রামক, যা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাইকে এক উন্মুক্ত চাতালে আহ্বান করে। যে আহ্বান অগ্রাহ্য করা অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে দুর্দমনীয়।

মূলত সামাজিক, সাম্প্রদায়িক বা পারিবারিক সমাবেশে মানুষে মানুষে বিরোধমুক্ত ও সংস্কারমুক্ত আনন্দ আয়োজন উৎসব। একের আবেগ, অনুভূতি ও শুভভাবনা অপরের সাথে ভাগ করে, অখণ্ড ঐক্যের চেতনাবোধে অন্তরাত্মাকে পরিপূর্ণ করে তোলাই উৎসবের মাহাত্ম্য।

সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্ম-সম্প্রদায়গত ভাবনায় সকল ক্ষুদ্রতা ও বিচ্ছিন্নতার উর্ধ্বে উঠে উৎসবের আশ্রয় হয় মানব ধর্ম। ক্ষমা আর ত্যাগের মহিমায় একে অপরের সহযোগি হয়ে, মননের উৎকর্ষ সাধন প্রক্রিয়ার অপর নাম উৎসব। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেন, “দিনে দিনে যে ব্যক্তি সত্যে প্রেমে প্রস্তুত হইয়াছে, এই উৎসবের দিনে তাহারই উৎসব।’ (১৯৬৭ : ৩৩৯)

উৎসব মূলত সমষ্টি-চেতনার ফল। একে অতি প্রাচীন সাংস্কৃতিক রীতি উল্লেখ করে শামসুজ্জামান খান (২০১৩ : ১৭) লিখেছেন, পৃথিবী জুড়ে উৎসবের রয়েছে নানা রূপ বৈচিত্র ও স্থিতিস্থাপকতা। তবে পল্লিকার দিনক্ষণ অনুযায়ীই উদযাপিত হয় উৎসব। পারিবারিক, সম্প্রদায়গত বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর উৎসবগুলো রীতি-প্রথা অনুযায়ী আলাদা হলেও, সমবেত আয়োজনে সম্পন্ন উৎসবে মানুষে মানুষে মিলন এবং আনন্দলাভই মুখ্য। তিনি যোগ করেন (২০১৩ : ১৭), ‘মানুষের সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যসাধন ছাড়াও ব্যক্তিপ্রতিভার জীবন- বন্দনায় অন্য মানুষের আনন্দলাভও উৎসবের আর এক বড় অংশ।’

উৎসবের দিনে আমরা প্রতিদিনের কৃপণতা পরিহার করে যে উদারতার মানসিকতায় বহু লোকে মিলিত হই, সত্যি অর্থে তা আনন্দ এবং প্রেম। তাই উৎসবের দিনে ওঠে সাজ সাজ রব। হয়তো এ কারণেই রবীন্দ্রনাথের কাছে উৎসব অপরূপ :
উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুলপাতার দ্বারা সাজাই, দীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সংগীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এইরূপে মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিনকে বৎসরের সাধারণ দিনগুলির মুকুটমণিস্বরূপ করিয় তুলি। (রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭)

মনুষ্য সমাজে বিশেষ উপলক্ষের প্রায় অংশ জুড়ে যে আন্তরিক আনন্দযজ্ঞ, সেই আনন্দের কার্যকারণ ও দৃশ্যমান ক্রিয়া সবটার ভাষাগত প্রকাশ-উৎসব; যা একটি জাতির লোকধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যবান উপাদান ।

কৃষিকাজের শুরুতে জীবিকার উৎসব থেকে শুরু করে, উৎসবের রূপরেখায় প্রাধান্য পেয়েছে ধর্ম, সংস্কৃতি, ঋতুবৈচিত্র্য, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, স্মরণানুষ্ঠান, পারিবারিক লোকাচারসহ বিবিধ প্রসঙ্গ। কালের অনন্ত প্রবাহে বাঙালির উৎসবে পড়েছে প্রাদেশিকতার ছাপ, বিবর্তিত সংস্কৃতির প্রভাব। কখনো উৎসব পেয়েছে নাগরিক রূপ; যেখানে যুক্ত হয়েছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মাত্রা।

এমনি ভাবেই নিয়ত অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তনের শত-সহস্র স্রোত মানুষের জীবন ও সমাজের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। কালের গরিমায় অনেক কিছু বিবর্তিত হলেও, ম্লান হয় না উৎসবের ঐতিহ্য। এই উৎসব যেন প্রাচুর্য আর স্মৃতি কাতর আমেজ নিয়ে অতীত থেকে বর্তমানে টেনে দেয় মায়ারেখা। ইতিহাসে কান পাতলে শোনা যায় সেই উৎসব উদ্ভবের বিচিত্র গল্পের কথা।

উৎসবের শুরুর কথা

এ যাবৎকাল যে সব উৎসব উদযাপিত হয়ে এসেছে, এগুলো বহু দিনের সংস্কারের ফল এবং বিভিন্ন যুগে নানা বর্ণপ্রথার মানুষের বৈচিত্র্যময় সমাজব্যবস্থায় এর উদ্ভব এমন দাবি সমাজ বিজ্ঞানীদের। তবে উৎসবের উদ্ভবকাল বিষয়ে নিখুঁত ধারণা দেয়াও প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।

এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় আহমদ শরীফের লেখায় এই বহু ও বিচিত্র বিশ্বাস-সংস্কার, রীতি-রেওয়াজ, আচার-আচরণ, উৎসব-পার্বণ, প্রথা-পদ্ধতি, দারু- টোনা-ঝাড়-ফুঁক তাবিজ-মাদুলী-বাণ-উচাটন প্রভৃতির সম্ভাব্য উৎস নির্দেশ, তার আদি ও রূপান্তর নিরূপণ, টোটেম-টেবু-যাদুর জড় আবিষ্কার প্রভৃতি আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য বা প্রায় অসাধ্য বটে।’ (আহমদ শরীফ, ২০০৬ঃ১৬)

উৎসব উদ্ভবের আদি ইতিহাস খুঁজতে নৃতাত্ত্বিক, জাতিতাত্ত্বিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানে সমৃদ্ধ তথ্য পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করা হয়েছে। তাঁদের তথ্যমতে, উৎসবের উদ্ভব হঠাৎ করে একদিনে হয়নি। মানব জাতির পৃথিবীতে আগমনকাল থেকেই এর গোড়াপত্তন; এমন ধারণা দেন মাধুরী সরকার :

বিচিত্র বাধা-বিপত্তিসঙ্কুল প্রকৃতির বুকে যেদিন থেকে মানুষের উৎপত্তি, সেদিন থেকেই সে ক্ষুধার শিকার। তাই যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংগৃহীত হয়েছে খাদা এবং প্রকাশিত হয়েছে খাদ্যপ্রাপ্তির উল্লাস। আমাদের পাওয়া সবেচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ স্বরূপ গুহাচিত্রগুলির মধ্যে লক্ষিত হয় শিকারজীবী মানুষের শিকার প্রাপ্তির উল্লাস এবং সেই শিকারে পাওয়া জীবজন্তুকে যখন পুড়িয়ে খাওয়া শুরু হয়েছে, তখন আগুন জ্বালিয়ে খাদ্য হিসেবে প্রাপ্ত পশুটিকে পোড়াতে দিয়ে তার চারপাশে বহু অপেক্ষিত মানুষের জমায়েত।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

খাদ্যকেন্দ্রিক এই একত্রিত হওয়া মানবসভ্যতায় জন্ম দিয়েছিল বর্ণনাভিত্তিক বাক্য বিনিময়- কালক্রমে গল্পকথা। এছাড়া শিকার ধরার অভিজ্ঞতার বর্ণনার অঙ্গভঙ্গি জন্ম দিল অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক জাদুবিশ্বাস এবং কালক্রমে নৃত্যশিল্পের – যার অনেকটাই জুড়ে আছে পশুচালের মুদ্রা। (মাধুরী, ২০১৪ : (৭৫)

আদিম মানুষ অজ্ঞ, আনাড়ি ও অসহায় ছিল বলে, তারা ছিল একান্তই প্রকৃতির আনুকূল্য-নির্ভর। আর এমন দুর্বল মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতির নানা উপাদান সম্পর্কে যুগপৎ বিস্ময় ও ভয় অনুভব করত উল্লেখ করে আহমদ শরীফ বলেছেন :

ঝাড়-বৃষ্টি-বন্যা-শৈত্য-খরা-কম্পন ছাড়াও ছিল অপ্রতিরোধ্যশ্বাপদ- সরীসৃপ আর নিনাদবিহীন লঘু-গুরু নানান রোগ। গা-পা যেমন ছিল নিরাবরণ, মন-মেজাজও তেমনি ছিল আত্মপ্রত্যয়বিহীন। এমন মানুষ ভয়-বিস্ময়-কল্পনাপ্রবণ হয়, আর বিশ্বাস-ভরসা রাখে ও বরাভয় খোঁজে অদৃশ্য অরিমিত্র দেবশক্তিতে। তার চাওয়া-পাওয়ার অসঙ্গতির ও ব্যর্থতার এবং অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তির কিংবা বিষণ্নতার অভিজ্ঞতা থেকেই এই অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্বের ও প্রভাবের ধারণা অর্জন করে সে। তখন থেকেই তার জীবন-জীবিকা ইহ- পরলোকে প্রসারিত। (আহমদ শরীফ, ২০০৬ঃ১২ )

প্রকৃতির ভয়াল পরিস্থিতিতে বসবাসকারী মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবর্তন ও বিপর্যয়কে যেমন ভয় পেয়েছে তেমনই আবার প্রকৃতির কাছেই খুঁজে পেয়েছে নিরাপত্তার আশ্রয়। মাধুরী সরকার ( ২০১৪ : ৭৬) লিখেছেনঃ এই ভয় ও কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত এক অনুভূতি থেকে জন্ম নিয়েছে সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাস।

যে বিশ্বাসের কারণেই প্রাকৃতিক সমস্ত সম্পদ বা পশু, পাখি, গাছপালা যা মানুষের উপকারে এসেছে অথবা নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তারই মধ্যে মানুষ কল্পনা করেছে মানা-র (Mana) বা দেবতার যাঁরা – তাকে যেমন শাস্তিও দিতে পারেন, আবার দিতে পারেন নিরাপত্তা, খাদ্য, শক্তি, সন্তান (ঐশ্বর্য) প্রভৃতি। এমন কাল্পনিক শক্তিকে সন্তুষ্ট রাখার উপায় হিসেবে মানুষ বেছে নিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি খাদ্যকে সেই শক্তির উদ্দেশ্যে নিবেদন করা :

মানুষের জৈবিক চাহিদার সর্বপ্রথম ক্ষুধার অন্ন (খাদ্য) কে সে ভাগ করে নিয়েছে তার আরাধ্যের সঙ্গে। এই একই কারণে ফলদানকারী বৃক্ষ, শস্যদানকারী ওষুধি, উচ্ছিষ্ট খাদ্যদানকারী পশু এরা সবাই মানা (Mana) এবং কালক্রমে দেবতা, যাদের সমষ্টির জন্য দান করা হয়ে এসেছে প্রাপ্ত খাদ্যের প্রথম অংশ, মানুষের ভবিষ্যৎ খাদ্যপ্রাপ্তির নিরাপত্তার কথা মনে রেখে। (মাধুরী, ২০১৪ : ৭৬)

নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই বলেই জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার ও স্বচ্ছন্দ্য কামনা তাকে দৈবাশ্রিত হতে বাধ্য। করেছে। তবে তার সহজাত বুদ্ধি, নিরাপত্তা প্রয়াস, জীবিকা-চেতনা এবং অনন্য মননশক্তি তাকে একান্তই প্রবৃত্তি-নির্ভর প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র করে বলে মনে করেন আহমদ শরীফ (২০০৬ : ১২)।

এমন কথার মিল আছে অতুল সুরের লেখায় :

মানুষের প্রথম সমস্যা ছিল আত্মরক্ষা ও খাদ্য আহরণ। জীবন-সংগ্রামের এই সমস্যা সমাধানের জন্য, তাকে তৈরী করতে হয়েছিল আয়ুধ। আয়ুধগুলো একখন্ড পাথর অপর একখন্ড পাথরের সাহায্যে তার চাকলা ভুলে হাতকুঠার ও অন্য আকারে নির্মিত হত। ….. আয়ুধ নির্মান ছাড়া, প্রত্নোপলীয় যুগের মানুষের আরও কয়েকটা ভৈশিষ্ট্য ছিল, যদা ভাবপ্রকাশের জন্য ভাষার ব্যবহার, পরিবার গঠন, পশু শিকার সুগম করার জন্য পর্বত-গুহায় বা পর্বতগাত্রে শশুর চিত্রাঙ্কন দ্বারা ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় গ্রহণ ও আগুনের ব্যবহার। (অতুল, ২০০৮)

প্রকৃতি তাকে খাদ্য ও আশ্রয় দিত বলে প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং এক প্রকার ভয় তাকে প্রকৃতির নানা সজীব ও নির্জীব উপকরণকে পূজা করতে শেখায় উল্লেখপূর্বক ইন্দুভূষণ অধিকারী (১৯৮৮) জানান, বৃক্ষ এবং জন্তুপূজা সেই আদিমতম পূজার অন্যতম :

চারপাশের ঘটনা প্রবাহ কখনো কখনো তাকে ধন্দের মধ্যে ফেলে দিত: কার্য ও কারণকে বুদ্ধি দিয়ে যুক্ত করতে পারত না সে। এই শূণ্যস্থানে যাদু-বিশ্বসের জন্ম। নিজের শক্তিসামর্থের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধির সাথে সাথে নানা পূজাচার ও যাদু ক্রিয়ার মাধ্যমে বিরুদ্ধ ও প্রাকৃতিক শক্তিকে পোষ মানতে বা কল্যাণধর্মী করতে সচেষ্ট হয়েছে। টেটেম-পূজাও শুরু হয়েছে। (ইন্দুভূষণ অধিকারী, ১৯৮৮)

হাজার বছর আগের সেই প্রাকৃতিক শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিবর্তিত রূপ-ই হয়তো আজকের ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো; যা বাঙালি জীবনের একটা বিশাল অংশজুড়ে বিরাজমান।

নৃতাত্ত্বিক তথ্য মতে সভ্যতা পূর্ব সময়ে, বলা যায় ভাষা সৃষ্টিরও আগে, আনন্দ প্রকাশের জন্য মানুষ নৃত্য বা দেহভঙ্গীর প্রকাশ ঘটিয়ে আনন্দের আমেজ তৈরি করত, উল্লেখ করে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম (২০০৭ ৭৮, ৮০-৮১) লিখেছেন- দুহাতে তালি মুখে বিশেষ ধরনের শব্দ এবং পেটে হাত চাপড়িয়ে বিশেষ বাদ্য সৃষ্টি করে এক ধরনের আবহ তৈরি করত তারা। যা ছিল উৎসবের আদি আয়োজন। মানুষের উৎসব আর উৎসব প্রীতির ইতিহাস তার নিজের সমবয়সী উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন :

অতীতে উৎসবে জাকজমকের ব্যবস্থা না রেখে উপলক্ষ বিচারে নৃত্য-সঙ্গীত, দেহভঙ্গী প্রকাশ শেষে ভাদ্যদ্রব্য তক্ষণের রীতি ছিল। বিশেষ করে পশু বধ পশু-শিকার, জুম ক্ষেতে কৃষি-কাজ শুরু এবং মানুষের জন্য ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হত উৎসব। ( সিরাজুল, ২০০৭ : ৮২)

মানবশিশুর মাতৃগর্ভে আসা থেকে জন্য এবং তার মৃত্যুপরবর্তী আত্মার কল্যাণে নানা আনুষ্ঠানিকতার যে রীতি এখনও প্রচলিত, ধারণা করা যায়, এর উৎপত্তি হয়তো তখন থেকেই।

আদিম মানুষের বিশ্বাস-সংস্কারগুলো সে সময় তার কাছে ছিল খাদ্য সংগ্রহের হাতিয়ার। সেই বিশ্বাসের ধারায় প্রথম কৃষি উৎসবগুলি ছিল অভিনয়মূলক এবং বিনোদনের উৎস এই মর্মে আতোয়ার রহমান জানান : খাদ্য সংগ্রহের বাস্তব অনুকরণ যখন কিছুটা নিয়মবদ্ধ অভিনয় বা নৃত্যগীতে রূপ নেয় তখন এই অভিনয় হয়ে ওঠে তার মানসিক খোরাক। সেগুলো ভুল, অমার্জিত বা রূপরেখা বর্জিত হলেও, ক্লান্তিকর একঘেয়ে জীবনে, দিন যাপনের গ্লানি অপসারণে তাই ছিল আদি সহায়ক, এক কথায় আশীর্বাদ। (আতোয়ার ১৯৮৫ – ৮৭)

তখন প্রকৃতির কৃপাপ্রত্যাশী মানুষ শিকারের প্রয়োজনেই যূথশক্তিতে আবদ্ধ হয়। হিংস্র পশু বধে এই যূথবদ্ধতা এক ‘ফলপ্রসূ অস্ত্র হিসেবে তাকে খাদ্য আহরণে শক্তিমান করে। আত্মরক্ষার প্রয়োজন-জ্ঞানেই তৈরি হয় যুথের ওপর নির্ভরশীলতা, আর সেখানেও শুরু হয় কিছু আনুষ্ঠানিকতার। আতোয়ার রহমান যোগ করেন

জ্ঞান যখন গভীর হয়, তখন সে যূথশক্তি বৃদ্ধির স্বার্থে আপন যুদ্ধের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে থাকে। এর ফল যুগে মানবশিশুর জন্মে আনন্দ। পরবর্তী কালে যা শিশু তথ্য মানবজীবনের সাথে জড়িত একাধিক শ্রেণির উৎসবের জন্ম দেয়। যেগুলির একটি- জন্মোৎসব এখন সারা পৃথিবীতেই প্রচলিত। (আতোয়ার, ১৯৮৫ :৭-৮)

যূথশক্তি চেতনায় অন্তত আরও দুই ধরনের উৎসবের উদ্ভব ঘটে। উল্লেখ করে আতোয়ার রহমান (১৯৮৫ (৭-৮) জানাচ্ছেন, একটি শিকারের দেবদেবীর পূজামূলক একটি যুদ্ধের দেবদেবীর পূজাকেন্দ্রিক।

সভ্যতার সৃষ্টিলগ্নে মানুষের সব উৎসবই যে শিকার-কেন্দ্রিক ছিল, এর প্রমাণ- মানুষ তার জীবিকাসংগ্রহ চেষ্টার প্রথম অভিনয় শুরু করে শিকারের চিত্র দিয়ে। শিকারে কখনো সাফল্য লাভ, কখনো ব্যর্থ হওয়ার ফলে এক পর্যায়ে শিকারি মানবযূথের মনে প্রশ্ন জাগে, তার সাফল্য বা ব্যর্থতা কোনো অদৃশ্য শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় কি না! এই ভাবনা তাকে তাড়িত করে অদৃশ্য কিছু শুভ-অশুভ শক্তির অস্তিত্ব কল্পনায়।

কালক্রমে এই শক্তিগুলিই পরিণত হয় শিকারের দেবদেবীতে। পরবর্তীতে তাদের তুষ্টি বিধানের চেষ্টার মাধ্যমেই উদ্ভব ঘটে তাদের সাড়ম্বর পূজা তথা উৎসবের।

উৎসব শুরুর ইতিহাসের খোঁজে ঠিক কবে থেকে মানুষ শিল্প সৃষ্টি করেছে তা জানতে আদিম সংঘবদ্ধ মানুষের সমাজ-জীবনের বিভিন্ন স্তরগুলি সমন্ধে অবহিত হবার গুরুত্ব তুলে ধরেন সাধনকুমার ভট্টাচার্য। তিনি (১৯৬৩ : ১২, ১৫) ধারণা করেন, আদিম সমাজের চেতনা সমষ্টিগত চেতনা, গোষ্ঠীর প্রত্যেক ব্যক্তির মন যেন একক, একটি গোষ্ঠী যেন মনেরই অংশ, তার স্বাধীন কোনো সত্তা ছিল না।

ফলে খাদ্য আহরণ, আত্মরক্ষা, আত্মপ্রজনন, মৌলিক, জৈবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রয়োজন তারা সমষ্টিগতভাবেই সম্পন্ন করেছে। গোষ্ঠীর জীবিকার্জনের শ্রমে যোগদান করা, গোষ্ঠীর নানা বিধি-নিষেধ মেনে চলাসহ জীবন সংগ্রামের পদ্ধতিতে গোষ্ঠীর সাথেই তাকে খাপ খাওয়াতে হয়েছে। তাই মনে করা হয়, “শিল্পের জন্য কোনো ব্যক্তি মনের আত্মসমাহিত ধ্যান-কল্পনা থেকে হয়নি।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

সভ্যতা, সংস্কৃতির প্রসার বা শিল্প জন্মেছে গোষ্ঠী-মনের সামষ্টিগত আবেগ প্রকাশের যৌথ প্রচেষ্টা থেকে’ (সাধন কুমার, ১৯৬৩ ১৫)। মূলত আদিম মানুষ দলবদ্ধভাবে অভিযোজন করতে সচেষ্ট হবার পাশাপাশি দলবদ্ধভাবেই অতিপ্রাকৃত শক্তিকে তুষ্ট করবার জন্য অনুষ্ঠান করেছে। যা ছিল, যৌথভাবে আনন্দ উপভোগ বা যৌথ দুঃখভোগ ।

পশু শিকার যুগের অনেক পরে কৃষি কাজের সূচনায়ও অবচেতনভাবেই সে প্রভাবিত হয় কৃষি সম্পর্কিত নানা ভাবনায়। আতোয়ার রহমান ( ১৯৮৫ : ৯) লিখেছেন, নির্দিষ্ট সময় পর পর প্রকৃতির পরিবর্তন, সূর্যের প্রদক্ষিণে তাপের হ্রাসবৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি, সেইসাথে কৃষিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব, ঋতুভেদে ফল-ফসলের বৈচিত্র দৃষ্টে মানুষের বিশ্বাস গড়ে ওঠে যে, তার অনুকূলে বা প্রতিকূলে অদৃশ্য কিছু শক্তি তার কৃষিকাজের নিয়ামক। সেখান থেকেই হয়তো তৈরি হয় জন্ম-মৃত্যু-পুনর্জন্মের ধারণা, বিরুদ্ধ প্রকৃতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম।

উপর্যুক্ত তথ্যের মিল পাওয়া যায় প্রদ্যোত কুমার মাইতির লেখায়ও :

বিভিন্ন ঋতুর নানা রকম ছোটখাট ঘটনা মানুষের মনকে আকৃষ্ট করত, চঞ্চল করত ও ভাবিয়ে তুলত- এই আকর্ষণ, চঞ্চলতা ও ভাবনা থেকেই মানুষ বহু দেবতা, অপদেবতা সৃষ্টি করে কখনও বা অনুকরণ- প্রবন আচার অনুষ্ঠান (imitative rite) উদযাপন করে পৃথিবীর প্রাচীনকাল থেকে নানা কামনা-বাসনা চরিতার্থের জন্যে ব্রত উদযাপন করে চলেছে। এদের মধ্যে শস্য কামনা বৃষ্টি কামনা সৌভাগ্য কামনা, সন্তান কামনা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। (প্রদ্যোত কুমার ১৯৮৮ 152)

তবে, এই ব্রতগুলির উৎপত্তি কখন হয়েছিল তা বলা কঠিন হলেও, এ কথা বলা যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রথা সমাজে প্রচলিত ছিল এবং এর নিদর্শন এখনও আছে। বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, এ ধরনের ব্রত উৎসব প্রাক্-বৈদিক আদিবাসী কোমদের সময় থেকে সমাজে চলে আসছে।’ (প্রদ্যোত কুমার, ১৯৮৮ঃ১৫২)।

এসব মত পর্যবেক্ষণে বলা যেতে পারে, শিকার এবং কৃষি থেকেই পৃথিবীর প্রাচীনতম উৎসবগুলোর উদ্ভব। যার কোথাও মিশে আছে লাঙলের ফলার দাগ, কোথাও ঐন্দ্রজালিক আচার বা যাদুবিশ্বাস, কোথাও বা সামাজিক রীতি-প্রথা, রাজনীতির আঁচড়।

তবে, পুরাতন প্রস্তর যুগে গুহাবাসী মানুষ অতিপ্রাকৃত বা যাদুবিশ্বাসের সংস্কৃতিতে প্রভাবিত থাকলেও এর সাথে ধর্মের যোগসূত্র ছিল না। ধর্মের মতো পবিত্র জ্ঞানেই সব আচার ও রীতি পালিত হতো, এমন ধারণা বুলবন ওসমানের। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বুলবন জানান

যাদুবিশ্বাস আর কিছু নয়, প্রাকৃতিক ক্ষমতা বা অর্থনীতিক ব্যবস্থার নবল তোলা। গুহাচিত্রের পেছনেও আমরা এই একই মানসিকতার পরিচয় পাই। পশুশিকারের চিত্র তৎকালীন মানুষের আশা পূরণের প্রতিফলন। অর্থাৎ গুহাবাসীর বিশ্বাস- রেখার মাধ্যমে যে বাইসনের চিত্র আঁকা হচ্ছে তার ফলে উক্ত প্রাণী মায়াজালে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে, সুতরাং তাকে শিকার করা সহজ। (ওসমান, ২০০১:৪৯ )

“উৎসবের ভিত্তি যৌথ রিচ্যুয়াল’ এমন মত মুনতাসীর মামুনেরও। তিনি তাঁর বাংলাদেশের উৎসব গ্রন্থের ভূমিকা অংশে Rabert Briffault এর Festivals”, Encyclopadeia of the Social Science vol 6, New York. P1931, pp 198-201-এ প্রাচীন উৎসবের ভাবনায় ম্যাজিক বা জাদুবিশ্বাসের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ছিল চন্দ্রের প্রভাব, এমন তথ্য তুলে ধরেছেন

প্রাচীন আমলে, ম্যাজিকের ওপর বিশ্বাস অভিঘাত হেনেছে পরিবার বা গোষ্ঠীর ওপর এবং সে কারণে, অধিকাংশ প্রাচীন রিচ্যুয়ালই যৌথ কর্ম। মানুষের প্রধান কর্ম বৃদ্ধির সঙ্গেও যোগ ছিল অনেক রিচায়াল, উৎসবের। শুধু তাই নয়, এসব বিচ্যুয়াল নিয়ন্ত্রিত হ’ত চান্দ্রমাসের দ্বারা। প্রাচীন যৌথ বিচ্যুয়াল ছিল অতি প্রাকৃতিককে বশে আনার ম্যাজিকাল প্রক্রিয়া। পরবর্তী পর্যায়ে সংস্কৃতিতে সেই প্রক্রিয়ার চারিত্রিক উপাদান রয়ে গেছে। (মুনতাসীর, ১৯৯৪ ভূমিকা )

লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও দৃশ্যগত বৈচিত্র উৎসবকে আকর্ষণীয় এবং বর্ণাঢ্য করলেও, উৎসবের উৎস আজও অনুসন্ধেয়, এমন মত শামসুজ্জামান খানের ( ২০১৩ : ১৭)। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের সমর্থনে যুক্ত করেন। (২০১৩ : ১১), উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ব্যাপার। তবে এর ইতিহাস, উদ্ভব, রূপান্তর প্রক্রিয়া ও বিকশিত রূপ খুঁজে বের করা খুব জটিল।

জাদুবিশ্বাস, আচারক্রিয়া, ধর্মীয় উপাদান, অর্থনৈতিক বিষয় এবং বিশ্বাস-সংস্কারসহ কোনো কোনো স্পর্শকাতর বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে মনে করা হয়। সেই সঙ্গে আনন্দময়তা, ঐতিহ্যে অংশ নেওয়া এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংযোগ ও সংহতিও উৎসবের মৌল উপাদানের অন্তর্গত।

সময়ের পরিক্রমায় নানা সংস্কার, আচার বা যৌথ জীবনব্যবস্থায় উৎসবের সূচনা এক অর্থে প্রয়োজনের অনুসঙ্গ হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে খুঁজে পেয়েছেন উৎসব উদ্ভবের রহস্য। উৎসবের দিন প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘জগতের যেখানে অব্যাহত শক্তির প্রচুর প্রকাশ, সেখানেই যেন মূর্তীমান উৎসব’ (১৯৬৭ : ৩৯২)। উৎসব আয়োজনে প্রকৃতির শক্তি আর মনুষ্য শক্তির মাঝে কবি সাদৃশ্য খুঁজেছেন এভাবে :

হেমন্তের সূর্যকিরণে অগ্রহায়ণের পরশসাসমূত্রে সোনার উৎসব হিল্লোলিত হইতে থাকে সেইজন্য অনেগু নিবিড় গন্ধে ব্যাকুল নববসন্তে পুষ্পবিচিত্র কুঞ্জবনে উৎসবের উৎসাহ উদ্দাম হইয়া উঠে। প্রকৃতির মধ্যে এইরূপে আমরা নানাস্থানে নানাভাবে শক্তির জয়োৎসব দেখিতে পাই।

মানুষের উৎসব করে? মানুষ যেদিন আপনার মনুষ্যত্বের শক্তি বিশেষভাবে স্মরণ করে, বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেইদিন । … প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী – কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একর হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া মহৎ (রবীন্দ্রনাথ ১৯৬৭ ৩৯২ ৩৯৩)

প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য উৎসবের মতো, মনুষ্যত্বের গৌরবে গরীয়ান মানুষও স্বার্থপরতার বন্ধন ছিন্ন করে নিজেকে করে তুলতে পারে অবারিত। তখনই জ্ঞানে, প্রেমে, কর্মে মনুষ্য শক্তির জয়ধ্বনিতেই হতে পারে উৎসবের সূচনা। সমগ্র মানবের মধ্যে যেদিন তাহার বিরাট বিকাশ দেখিতে সমাগত হই, সেইদিন আমাদের মহোৎসব’ (রবীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ ৩৯৭)। মনুষ্যশক্তির এই গৌরব যেন উৎসব ধ্বনি হিসেবে অনুরণিত হয়। মানবাত্মায়- এমন আহ্বানের মাঝে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন; হিংসা, ভয়, জরা, শোক কাটিয়ে মানব মনের মঙ্গল শক্তিকে অনুভব করাই উৎসব।

বাংলাদেশের উৎসব

বারো মাসে তেরো পার্বণ আর বৈচিত্র্যময় উৎসব সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গৌরময় ঐতিহ্যের অধিকারী। ভৌগোলিক অবস্থান বা জলবায়ুর প্রভাব এমনকি অর্থনীতি উৎসবের প্রসারে বিশেষ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন প্রত্নতাত্ত্বিক আর সমাজবিদরা। এছাড়া রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কারণেও উৎসব সংগঠিত হয়। সমাজবদ্ধ মানুষের মাঝে এ এক স্বভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে প্রচলিত উৎসব বাংলার ধর্ম, সমাজ ও অর্থনীতির সাথে বিশেষভাবে জড়িত।

প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমাজবিদদের রায় মেনে নিয়ে আতোয়ার রহমান (১৯৮৫ : ১৪) উৎসবকে শ্রেণিকরণ করেছেন ৬টি পর্যায়ে

১. জীবিকার উৎসব বৃষ্টি কামনার উৎসব নবান্ন ইত্যাদি ।

২. ধর্মীয় উৎসব : ইদ, বড়দিন, দুর্গোৎসব, পৌষমেলা ইত্যাদি।

৩. সাংস্কৃতিক উৎসব : নববর্ষের উৎসব, বিভিন্ন দেশের এবং যুগের নাট্যোৎসব ইত্যাদি।

৪. ঐতিহাসিক বা স্মরণ উৎসব নদীয়ার ঘোষপাড়া গ্রামে দোলপূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত বাউল সমাবেশ, নেপালে অনুষ্ঠিত রামের বিয়ে, মোহররম, একুশে ফেব্রুয়ারি, অক্টোবর বিপ্লব দিবস, মে দিবস ইত্যাদি।

৫. রাজনৈতিক উৎসব বিভিন্ন দেশের জাতীয় দিবসের উৎসব, যুব উৎসব ইত্যাদি।

৬. সামাজিক-পারিবারিক উৎসব বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা, অন্নপ্রাশন, থানা ইত্যাদি উপলক্ষের অনুষ্ঠান, মলটির রায় পরিবারের দেবী মৌলীক্ষার পুজো উপলক্ষে উৎসব।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

অপর এক তথ্যে (উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশের উৎসবের তালিকা), বাংলাদেশের উৎসব সমূহের নিম্নলিখিত শ্রেণিবিভাগ পাওয়া যায় :

ধর্মীয় উদ্‌যাপন

ইসলামী

  •  ইদুল ফিতর – ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী শাওয়াল মাসের প্রথম দিন
  • ইদুল আযহা – ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী জিলহজ্জ মাসের দশম দিন
  • চাঁদ রাত – ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী রমজান ২৯ বা ৩০তম রাত
  • আশুরা – ইসলামী পঞ্জিকা অনুযায়ী মুহররম মাসের দশম দিন।
  • ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী – হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমন ও ওফাত দিবস
  • শব-ই-কদর
  • শব-ই-বরাত
  • বিশ্ব ইজতেমা

হিন্দু

  •  দুর্গাপূজা – বাংলা মাস অনুযায়ী কার্তিক মাসের ২য় দিন থেকে ১০ম দিন
  • কালীপূজা
  • সরস্বতী পূজা
  • রথযাত্রা
  • দোলযাত্রা
  •  জন্মাষ্টমী হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের জন্মদিন উদ্‌যাপন

বৌদ্ধ

  •  বুদ্ধ পূর্ণিমা
  • মধু পূর্ণিমা
  • কঠিন চীবর দান
  • মাঘী পূর্ণিমা

খ্রিষ্টান

  • বড়দিন
  • মানচিতালি
  • ইস্টার

দেশাত্মবোধক ও জাতীয়

  • ভাষা-শহিদ দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
  • স্বাধীনতা দিবস
  • সশস্ত্র বাহিনী দিবস
  • শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
  • বিজয় দিবস

দেশীয় ঐতিহ্য

  •  বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ
  • বর্ষা উৎসব
  •  নবান্ন উৎসব
  •  পৌষ মেলা
  • বসন্ত বরণ পহেলা ফাল্গুন
  •  নৌকা বাইচ
  •  বাউল উৎসব
  •  জাতীয় পিঠা উৎসব
  •  ঘুড়ি উৎসব

অন্যান্য

  •  জাতীয় লোকজ উৎসব ( সোনারগাঁ)
  • ফোক সঙ্গীত উৎসব
  •  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, ঢাকা
  • রবীন্দ্রজয়ন্তী
  • নজরুল জয়ন্তী
  •  অমর একুশে গ্রন্থমেলা
  •  বৈসাবি – বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান ৩টি আদিবাসী সমাজের বর্ষবরণ উৎসব

স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত উৎসব

  •  লালন উৎসব
  • মধুমেলা
  •  জসিম মেলা
  • হাসন রাজা উৎসব
  •  বাউল আব্দুল করিম লোকজ উৎসব

বিশ্বজুড়ে উৎসব পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, এর রয়েছে কমপক্ষে ৫টি উপাদান : সজ্জা, সম্মিলন, শুভেচ্ছা, সম্পাদন ও ভোজ, যার যোগফলে সৃষ্ট হয় সামাজিক আনন্দ যা কখনও ব্যক্তিগতভাবে সৃষ্টি করা যায় না। উল্লিখিত এই ৫টি উপাদান ছাড়া উৎসব হয় না। এমন তথ্য দেন মাসুদ রানা (২০১৬), তাঁর ‘উৎসব-জাতি-সম্প্রদায়-সম্প্রীতি নিবন্ধে। এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরে মাসুদ লিখেছেন, বাহ্যিক উপকরণ সহযোগে সাধারণ রূপের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হল সজ্জা।

উৎসবে গণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোনো গণস্থানে কেন্দ্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের আয়োজন হল সম্মিলন। সেখানে অন্যের সঙ্গে নিজের সুখ ও আনন্দ বিনিময়ের মাধ্যমকে শুভেচ্ছা বলেছেন তিনি। উৎসবের ক্রিয়াকাণ্ডের সংঘটনে উৎসবের সম্পাদন এবং সেখানে থাকবে আকর্ষণীয় কিছু উৎসবী খাবার। প্রাণি হিসেবে মানুষের আনন্দ আয়োজন খাদ্য বর্জিত হয় না বলেও মত তাঁর।

বিভিন্ন পর্যায়ে উদযাপিত বাঙালি উৎসবের তালিকাদৃষ্টে একথা অনুমেয় যে, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে ধরে উৎসব। তাই উৎসবে এত বৈচিত্র্য। সেই আদিম সমাজ থেকে আবেগের প্রকাশগুলো, ধীরে ধীরে প্রাণচঞ্চল রূপ গ্রহণ করে। প্রীতি সম্মিলন প্রগাঢ় করে আত্মিক মিলনের বাসনা, আর এভাবেই সমৃদ্ধ ও আনন্দময় হয় উৎসব।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

উৎসবের বিকাশ

পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। একথা উৎসবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উৎসব বিকাশের উপযুক্ত কারণ ও পরিপ্রেক্ষিত বিষয়ে এই ধারণা করা যায়, প্রবহমানতার চিরন্তন প্রক্রিয়াই এর কারণ।

এর কারণ হিসেবে শাহাবুদ্দীন আহমদ লিখেছেন :

আজকের সংস্কৃতি শুধু দেশীয় বা ধর্মকেন্দ্রিক সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে স্বস্তি পায় না। মানব-প্রকৃতি সব সময় ঊর্ধ্বারোহী। প্রাণীর মধ্যে যেহেতু মানুষ সর্বোত্তম সে জন্যে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার মধ্যে থাকাটা তার স্বভাব বিরুদ্ধতা। নব নব রূপে আত্মপ্রকাশ করা এবং স্থানকে অতিক্রম করে অগ্রসর হওয়াতে সে আনন্দ পায় বলে সে আত্মচিন্তার বা আত্মসম্প্রসারে উন্মুখ থাকে। … অন্ধকার থেকে আলোয়, অদৃষ্ট আলো থেকে সুস্পষ্ট আলোর উত্তরণে মানুষের অবিরাম চেষ্টায় মানুষের জীবনের রূপান্তরের সঙ্গে সামাজিক রূপান্তর ঘটায় মানুষের নতুন সমাজ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে আর তা শিল্পে সাহিত্যে কাব্যে সংগীতে রূপ লাভ করে। (শাহাবুদ্দীন, 2008)

আদর্শগত ধারণা, ঐতিহাসিক তেজস্বিতা বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত অনড় হতে পারে। কিংবা নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসকারী সম্প্রদায়ের সহজাত কিছু বৈশিষ্ট্যাবলী মৌলিক হতে পারে। তারপরও শেষাবধি তা অকৃত্রিম থাকবে এমনটা নয়। এর কারণ হিসেবে কে. এম. মোহসীন (২০০৭ ৬২১) জানাচ্ছেন, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি, অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, চাকরি বাজারের বিস্তার, শিক্ষার প্রভাব, গণমাধ্যম ও মুদ্রণশিল্প প্রসারের সাথে সাথে সমাজের রূপান্তর এবং পরিবর্তন ঘটে।

একই সাথে তিনি এও মনে করেন, মানব প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য হলো নতুনকে কামনা করা, জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করা ইত্যাদি। যে বৈশিষ্ট্য রেখাপাত করে সামাজিক-সংস্কৃতিক জীবনে। আর সমাজ যেহেতু চলমান এক সংগঠন, তাই সমাজ পরিবর্তনে অনুঘটক হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে বেশ কিছু বিষয়। মোহসীন উল্লখ করেন :

পরিবেশগত উপাদান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক বলয়ের উন্নয়ন, সভ্যতা, গোষ্ঠীগত ও জাতিগত কুসংস্কার, ধর্মীয় আবেগ, শ্রেষ্ঠত্ব ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কারণেও সমাজ পরিবর্তিত হয়। অভিবাসী, ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক উদ্যোক্তা, মিশনারি, ভাগ্যান্বেষী এবং বাংলায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাকারীরা সমাজেলা কাঠামোগত গঠনে পরিবর্তন ঘটায় এবং সমাজে নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে যথেষ্ট অবদান রাখে। তারা গতানুগতিক প্রথা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস এবং স্থানীয় লোকদের আচারাদিতে পরিবর্তন আনে। সংস্কৃতির পরিবর্তনের এ প্রক্রিয়া কখনো শেষ হয় না। (মোহসীন, ২০০৭ : ২১)

উৎসবের বিবর্তন বা বিকাশ হতে সময় লাগে হাজার হাজার বছর। একথা সত্যি যে, বহিস্থ সংস্কৃতি দেশীয় সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তাই দেশীয় উৎসবের মৌল কাঠামোয়ও খানিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া প্রাণি হিসেবে মানুষের সহজাত বুদ্ধি, জীবন প্রবণতা, ভাষার ব্যবহার এবং সৃষ্টিশীলতাও উৎসব বিকাশে সহায়ক। আহমদ শরীফের ( ২০০৬ ১৪) মতে, মনন শক্তির বিকাশে, যুক্তি-বুদ্ধির ও রুচির উন্মেষে টোটেম পেয়েছে স্রষ্টার ও দেবতার মর্যাদা, সংস্কার উন্নীত হয়েছে শাস্ত্রে, বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ধ্রুব সত্যে।’ তিনি এও মনে করেন :

অনেক আচার সংস্কারই হয়ে পড়েছে আপাত নিরুদ্দিষ্ট ও তাৎপর্যহীন। ফলে সম্পর্ক স্বরূপ নির্ণয় হয়েছে দুঃসাধ্য। যেমন নাচ-গান-চিত্র- এগুলো ছিল আদিতে শিকার-সাফল্যের, অনুকূল রোদ-বৃষ্টির আবহসৃষ্টির ও বিপদমুক্তির প্রাকৃত বা দৈবিক আবহসৃষ্টির বাঞ্ছাপ্রসূত উদ্ভাবন। এখন নাচ-গান-চিত্র আমাদের মানসিক- নান্দনিক বিলাসক্রিয়া মাত্র।’ (আহমদ শরীফ ২০০৬ঃ১৭ )

আর মাধুরী সরকার উল্লেখ করেন :

ভিজে মাটির ওপর পাখির পায়ের ছাপ একদিন শিকারজীবী মানুষকে খাদ্যের সন্ধান দিয়ে মানুষের বিশ্বাসে জাদুচিহ্নে পরিণত হয়েছিল। সেই পাখির পদচিহ্নই কালক্রমে লক্ষ্মীর পদচিহ্নে রূপান্তরিত হয়য়ছে, একথা বলার কোনো অবকাশ রাখে না। পাখির পায়ের চিহ্নের জাদু থেকে ক্রমশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত পাখিই হয়ে উঠেছে আরাধ্য। তাই নবান্ন’-র আলপনায় পেঁচা বা কাকের পদচিহ্ন আঁকার রীতি সুন্দরবন অঞ্চলের পরিবারগুলির মধ্যে লক্ষিত হয়।

… উর্বরতাতন্ত্রেও বিশ্বাসের ওপর ভর করে আলপনায় এসেছে কলা গাছ ধান, ধানের শীষ, সর্পিল রেখা (সাপপেরই রূপান্তর) প্রভৃতি। আলপনায় এ ধরনের বিষয়গুলি এসেছে এমনই এক জাদুবিশ্বাস থেকে, যেখানে মানুষ মনে করে বেশি সংখ্যায় ফসল বা সন্তান উৎপাদনকারী গাছ অথবা প্রাণীকে আঁকলে তাঁদেও নিজেদেরও সমৃদ্ধি ঘটবে ।

… . যথার্থভাবে কৃষিকেন্দ্রিক সভ্যতায় পদার্পণের পর মানুষের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুভাশুভ এবং জাদুবিশ্বাসের পর্যন্ত রূপ বদল ঘটেছে। আলপনায় তাই শুধুমাত্র আদিম জাদুবিশ্বাস সম্বলিত বিষয় ছাড়া ‘নবান্ন’-র আলপনায় স্থান পেয়েছে চাষের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি (লাঙ্গল, জোয়াল, মই, ধান মাপার কুনকে ধান ঝাড়ার কুলো এবং ধান রাখার পাত্র ধামা প্রভৃতি। মাধুরী ২০১৪ ০-৮১)

উচ্চারও এভাবেই নবকলেবরে বিকশিক হয়ে নতুর রূপ নেয়। সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়ণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে দেশে দেশে উৎসব সৃষ্টি হয়ে ক্রমবিবর্তন হয় উল্লেখ করে সিরাজুল ইসলাম (২০০৭ : ৮১) বলেছেন, নতুন নতুন উপলক্ষে নানা উৎসব সৃষ্টি হয়, বংশ পরম্পরায় অবারিত থাকে, স্বেচ্ছায় ও সানন্দে সকলের অংশগ্রহণ অব্যহত থাকে, যার কারণে নিশ্চিত করে বলা যায় তখন থেকেই উৎসবের ক্রমবিকাশ ঘটে।

উল্লেখিত বক্তব্য পর্যালোচনা সাপেক্ষে একথা প্রতীয়মান, অতীতের অনেক সাক্ষ্যের মধ্যে সুপ্ত রয়েছে উৎসবের অস্তিত্ব। সভ্যতার ঊষালগ্নে জীবিকা কেন্দ্রীক আচার, জাদুবিশ্বাস, শক্তিপূজা এবং নানা লোকাচারের মধ্যে তা বিকশিত হয়; সংস্কার ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি করে নিজস্ব ধারা।

পাশাপাশি উৎসবের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গোত্র। গোত্রে সংঘবদ্ধ মানুষ দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ উদ্ভূত প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করত। যা জোরালো ভূমিকা রেখেছে সংস্কৃতি তথা উৎসব বিকাশে। এভাবেই, সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়ণ, আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থার উন্মেষ, ধর্মের সৃষ্টি, সংস্কৃতির উৎপত্তি, মানবজাতির মানসিক উন্নয়ন, জাতিতাত্ত্বিক ক্রমবিকাশ ইত্যাদি কারণের পরিপ্রেক্ষিতে উৎসবের ধারা বিকশিত হয়।

 

বাঙালির উৎসব : উদ্ভব ও বিকাশ

 

উৎসবের অর্থনৈতিক ভূমিকা

আর্থিক টানাপোড়েন আর সীমাবদ্ধতায় হোঁচট খাওয়া ক্লান্তিকর জীবনে উৎসব-পার্বণ যেন সঞ্জীবনী। বাংলাদেশের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি এই উৎসব, যা কৃষি বা শিল্প খাতের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে, দেখা দেয় নব কর্মপ্রেরণা। উৎসবে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়, শ্রমিক সরবরাহ বাড়ে। মুদ্রা সরবরাহে গতিশীলতা আসার ফলে দেশজ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধিও পাশাপাশি জাতীয় জীবনযাত্রায় উন্নয়নমূলক পরিবর্তন সূচিত হয়। এটিকে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব হিসেবে দেখেন অর্থনীতিবিদরা।

দিবস ও উৎসবের সঙ্গে অর্থনীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যে কোনো ব্যয়ই অর্থনীতির জন্য আয়। তেমনি উৎসব আয়োজনে যে ব্যয়, তা দেশজ উৎপাদনে অনিবার্য অবদান রাখে, উল্লেখ করে উৎসবের অর্থনীতি’ নিয়ে মতামত প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আবদুল মজিদ লিখেছেন :

যে কোনো উৎসব অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন করে, মানুষ জেগে উঠে নানা কর্মকাণ্ডে, সম্পদ বন্টন ব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। এই আবহকে স্বতঃপ্রণোদিত পতিতে চলতে দেয়ায় দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে এই কর্মকাণ্ড এই মুদ্রা সরবরাহ, ব্যাঙ্কের এই তারল্য তারতম্য, পরিবহন খাতের এই ব্যয় প্রবাহ একে স্বাভাবিক গতিতে ধরে রাখতে পারলে অর্থনীতির জন্য তা পুষ্টিকর প্রতিভাত হতে পারে। (মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, 2019 )

উৎসব তো কেবল ঈদ, পূজা আর বর্ষবরণ নয়, চলচ্চিত্র উৎসব, নাচ-গান-নাটকের উৎসব, আছে মা দিবস, বাবা দিবস, আন্তর্জাতিক নারী দিবস শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, বন্ধু দিবসের মতো অনেক অনেক উৎসবের দিন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, ভগ্ন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে উৎসব।

আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে জড়িত দেশের উন্নতি। উৎসবের অর্থনীতি বিষয়ে পাহ্ আফজাল ( ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, দৈনিক জনকণ্ঠ) লিখেছেন, উৎসব ঘিরে নানা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক গতি প্রবাহ বাড়িয়ে তোলে। দিন দিন মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে ক্রয়ক্ষমতা।

ফলে ব্যবসার আকার বাড়ছেই শুধু নয়, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ব্যবসা বাণিজ্য সেক্টরে যে মূল্যস্ফীতি হয়, তাতে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হয় অর্থ। ব্যাঙ্ক লেনদেন বৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে রেমিটেন্সের পরিমানও বাড়ে। ব্যবসার সাথে বিভিন্ন সেবাখাত, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতেও সংশ্লিষ্টদের আয় বৃদ্ধি পায়। জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি সৃষ্টি হয় নতুন কর্মসংস্থান ।

সর্বজনীন উৎসবগুলো দেশব্যাপী উদযাপিত হওয়ায় গতি আসে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও উল্লেখ করে নিতাই চন্দ্র রায় (এপ্রিল ১৪, ২০১৮, শেয়ার বিজ) গ্রামীণ অর্থনীতিতে পয়লা বৈশাখের গুরুত্ব’ নিবন্ধে লিখেছেন, উৎসবের অর্থনীতি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায় না।

তাই উৎসব ঘিরে কী পরিমান অর্থের লেনদেন হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও এটা নিশ্চিত যে, এর পরিমাণ বিশাল। উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ শিল্পীদের তৎপরতা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার করে, প্রচার ও প্রসার ঘটে লোকজশিল্পের। লাভবান হয় বিনোদন কেন্দ্র। উৎসব মৌসুমে দেশের মধ্যে পর্যটন শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি বিনিয়োগও বাড়ে।

তবে, সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হলে নানা দৃষ্টিতে উৎসব- সম্মেলন-মেলা, পূজা-পার্বণ উদযাপনের ইতিবাচক দিক মাত্রাতিক্রমনের ফলে নেতিবাচক হয়ে পড়তে পারে, উল্লেখ করে ঈদের আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য’ শিরোনামে অপর এক প্রবন্ধে মোহাম্মদ আবদুল মজিদ (২৫ জুন, ২০১৭, কালের কণ্ঠ) লিখেছেন :

উৎসবে দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে আবাসনসহ সব ভোগ্যপণ্যে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা বেড়ে যায়, সেবাগ্রহণকারী আকর্ষণে ব্যর্থ হলে পর্যটন শিল্পে ধ্বস নামতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হতে পারে, পুঁজির সংকট সৃষ্টি হতে পারে এবং ব্যয় প্রাক্কলনে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা নেতিবাচক প্রভাবেরই নামান্তর।

শুধু তাই নয়, উৎসব উদযাপনকারীদের মধ্যে অবনিবনার পরিবেশ সৃষ্টি হলে, আক্রমণাত্মক কিংবা বিরোধাত্মক মনোভাব উদ্ভব হলে, সাংস্কৃতিক অবসন্নতা বা বিরোধাত্মক প্রতিকূল পরিবেশের উদ্ভব ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। পাশাপাশি উৎসব পালনকারীদের মধ্যে কিংবা তাদের সঙ্গে অন্যদের অবনিবনা ও ভুল বোঝাবুঝির পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেলে উৎসব উদযাপনের নেতিবাচক প্রভাব প্রকট হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয় বলেই মনে করেন তাঁরা।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়, উৎসব একান্ত নিজের মতো করে গড়ে ওঠে না। ধর্ম, জীবনদর্শন, আর মতবাদই উৎসবের উদ্ভব ও বিকাশের অবলম্বন। মূলত পরিবার কেন্দ্রিক, সামাজিক- সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতাগুলোই বাঙালির উৎসব। ধারণা করা হয় উৎসব এক প্রাচীন রীতি এবং মানুষের উৎসব উদ্ভবের ইতিহাস তার পৃথিবীতে আবির্ভাবের সমপর্যায়ের।

অর্থাৎ, ভাষা সৃষ্টিরও আগের। নিয়ত অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সমাজব্যবস্থার বিবর্তনের সাথে সাথে প্রভাবিত হয়েছে উৎসব। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুর বা অর্থনীতির মতো অনুঘটকগুলো উৎসবের প্রসারে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি এর মাত্রাতিরিক্ত চাহিদায় বিলুপ্তির মুখেও পতিত হয়েছে অনেক উৎসব।

ধর্মীয় উৎসব, দেশাত্মবোধক বা জাতীয় উৎসব, স্থানীয় পর্যায়ে আয়োজিত উৎসব বা ঐতিহ্যবাহী উৎসবের বাইরে আরও কিছু উৎসব উপলক্ষ হয়ে এসেছে বাঙালির জীবনে। স্বামীকে ভগবান জ্ঞানে জামাইষষ্ঠী উৎসব, ভাইবোনের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করতে রাখিবন্ধন উৎসব, ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে ভাইফোঁটার মতো লোকাচার উৎসব তো আছেই। আছে আকিকা, মুখেভাত বা জন্মোৎসবের মতো পারিবারিক উৎসব।

বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাঙালির জীবনে আনে উৎসবের বারতা। ঋতু পরিবর্তনের সাথে মানুষের যে সার্বিক পরিবর্তন, সেই পরিবর্তনের সহগামী উৎসব। প্রতিটি সমাজেই নিজ নিজ সংস্কৃতি ও অবকাঠামোয় উদযাপিত হয় উৎসব, যেখানে মানবতার উৎকর্ষ সাধন, মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানবিক চেতনা-প্রসূত মূল্যবোধ এবং সম্প্রীতির বিকাশ ঘটে, মতপার্থক্যের অবসানে তৈরি হয় সমঝোতার পরিবেশ।

উৎসব উদ্ভবের প্রাথমিক লগ্নে এত আয়োজন যেমন ছিল না, তেমনি ছিল না উৎসব কেন্দ্রীক অর্থনৈতিক তৎপরতাও। কালক্রমে উৎসবে ঘটে নানান মিশ্রণ। উৎসবে সঞ্চারিত আনন্দ সকল নৈরাজ্য ও অস্থিরতা কাটিয়ে হৃদয়কে করে প্রসারিত। যুগে যুগে উৎসবের এই প্রসারতা লাভ করতে পেরিয়ে গেছে অনেকটা কাল।

Leave a Comment