আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের পরিপ্রেক্ষিত ও ধারা । যা সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটক এর অন্তর্গত।

বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের পরিপ্রেক্ষিত ও ধারা
বিশ্বসাহিত্যে কাব্যনাট্যের অবিস্মরণীয় আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রাচীন গ্রিসে। গ্রিসের অবিসংবাদিত নাট্যকারদের মধ্যে এস্কিলাস (৫২৫-৪৫৬ খ্রিপূ), সফোক্লিস (৪৯৭-৪০৬ খ্রিপূ), ইউরোপিদিস (৪৮০- ৪০৬ খ্রিপূ), এরিস্টোফানিস (৪৪৬-৩৮৮ খ্রিপূ) প্রমুখ কবি কবিতার ভাষায় লিখেছেন কালজয়ী ট্রাজেডি ও কমেডি। প্রাচীন গ্রিসের পর প্রাচীন রোমেও আদি ফর্মের কাব্যনাটক রচিত ও অভিনীত হয়েছে।
ইতালির কিংবদন্তিতুল্য কবি ও নাট্যকার ভার্জিল (৭০-২১খ্রি.পূ) এক্ষেত্রে পালন করেছেন মুখ্য ভূমিকা। রোমান এ নাটকগুলোর মূল প্রতিপাদ্য ছিল স্বজাতির মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন প্রচারের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ ও সুশিক্ষার সম্প্রসারণ। গ্রিক ও রোমানদের পর ইংরেজি ভাষামাধ্যমে রচিত হয়েছে কবিতায় লেখা নাটক।
ইংরেজ কবিদের হাতেই মূলত আধুনিক কাব্যনাট্যের নানাবিধ রূপান্তর ঘটেছে। কেননা, তাঁরা কাব্যনাট্যের বিষয়কে কেবল ধর্মীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ না রেখে মানবিক বোধে প্রসারিত করেছেন, এবং নাটকের আঙ্গিকগত পরিবর্তন করেছেন অনন্য দক্ষতায়।
ক্রিস্টোফার মার্লো (১৫৬৪-১৫৯৩), উইলিয়ম শেকসপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬), বেন জনসন (১৫৭২-১৬৩৭) প্রমুখ কবি প্রাথমিকভাবে কবিতা ও নাটকে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন, এবং রচনা করেন অসামান্য কালজয়ী নাটক। বিশেষত উইলিয়াম শেক্সপিয়র কবিতাময় ভাষায় যেসব নাটক রচনা করেছেন, সেগুলো বিষয় ও ভাষাগুণে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও আধুনিক কাব্যনাট্যের প্রয়োজনীয় গুণগুলো রক্ষিত হয়নি।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০), স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪), প্রিসি শেলি (১৭৯২-১৮২২), জন কিটস (১৭৯৫-১৮২১), জর্জ গর্ডন বায়রন (১৭৮৮-১৮২৪), আলফ্রেড টেনিসন (১৮০৯-১৮৯২), রবার্ট ব্রাউনিং (১৮১২-১৮৮৯) প্রমুখ সাহিত্যিকগণ আধুনিক কাব্যনাট্যের আদলে কবিতার ভাষায় নাটক রচনার প্রয়াস নিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা সেভাবে সফল হতে পারেননি।
এরপর, বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এসে টি এস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫), ডব্লিউ বি ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯), জে এম সিঙ (১৮৭১-১৯০৯), ডব্লিউ এইচ অডেন (১৯০৭-১৯৭৩) প্রমুখ কবি আবারো কবিতার ভাষায় নাটক লেখা শুরু করেন। কাব্যনাট্যকার হিসেবে টি এস এলিয়ট এদের মধ্যে সফল ও পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
তিনি একাধারে যেমন কাব্যনাট্যের তাত্ত্বিক দিক নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তেমনিভাবে এই তত্ত্বের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখিয়েছেন মৌলিক কাব্যনাটক রচনা করে। বলাবাহুল্য সমকালে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত বিভিন্ন সাহিত্যিক আন্দোলোনের প্রভাব, বিশেষত ফরাসি প্রতীকবাদ, জাপানি ‘নো” নাটকের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য এঁদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বিংশ শতাব্দীর শেষপর্যায়ে ইংরেজি সাহিত্যে কাব্যনাট্যের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। যদিও বিশ্বব্যাপী এলিয়ট প্রবর্তিত কাব্যনাট্যের প্রভাব তখনো বিশ্বের এখনো অনেক অঞ্চলেই কার্যকর ছিল। যেমন আফ্রিকা অঞ্চলে কাব্যনাটক এখনো সমান জনপ্রিয়। এমনকি নাইজেরিয়ান নোবেলজয়ী (১৯৮৬) নাট্যকার ওলে সোয়াঙ্কি (জন্ম. ১৯৩৪) তাঁর প্রায় সব নাটকই কবিতার ভাষায় রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে দ্য লায়ন এন্ড জুয়েল (১৯৬২), এ ডান্স অফ দ্য ফরেস্ট (১৯৬৩) ডেথ এন্ড দ্য কিংস হর্সম্যান (১৯৭৫) প্রভৃতির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভারতবর্ষে, সংস্কৃত সাহিত্যে কবিতার ভাষায় প্রচুর কবি-নাট্যকার মঞ্চনাটক রচনা করেছেন। এঁদের মধ্যে অযোধ্যার নাট্যকার অশ্বঘোষ (৮০-১৫০ খ্রিস্টাব্দ), প্রাচীন কুষাণ সাম্রাজ্যের কবি-নাট্যকার ভাস (২০০-৩০০ খ্রিস্টাব্দ), নাট্যকার শূদ্রক (২০০-২৫১ খ্রিস্টাব্দ), মহাকবি কালিদাস (আনু. খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতক), উত্তরভারতের কবি হর্ষবর্ধন (৫৯০-৬৪৭), কবি ভবভূতি (খ্রিস্টীয় ৮ম শতক) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
আধুনিক বাংলা নাট্যসাহিত্য পাশ্চাত্য প্রভাবজাত একথা স্বীকার করেও বলা যায়, আধুনিক বাংলা নাটকে সংস্কৃত সাহিত্য, এমনকি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ, মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্যের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। নাট্যব্যক্তিত্ব সেলিম আল দীনের (১৯৪৯-২০০৮) একটি মন্তব্য প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে :
সচরাচর দেখা যায় আমরা ‘নাটক’ কথাটাকে এক পূর্ব নির্ধারিত ইউরোপীয় ধারণার অমোঘ রূপ ও রীতির আলোকে বিচারের পক্ষপাতী। […] আমাদের নাটক পাশ্চাত্যের মতো ‘ন্যারেটিভ’ ও ‘রিচুয়াল’ থেকে পৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয়। তা গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট্য, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। বাঙলা নাট্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর আঙ্গিক ও অভিনয়ের বর্ণনাধর্মিতা। ‘

বস্তুত, প্রাচীন যুগের চর্যাপদ, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য ও কৃষ্ণলীলা বিষয়ক রচনা, বাঙালির হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতি লোকনাট্য, লোকগীত, ঐতিহ্যবাহী নানান অনুষ্ঠানে অভিনীত যাত্রাপালা, পাঁচালী প্রভৃতিকে – আধুনিক কাব্যনাটকের শ্রেণিভুক্ত না করা গেলেও এ ধরনের রচনার মধ্যে কাব্যনাটকের একাধিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের লোককবিদের মননসৃজিত এসব রচনার ঘটনাসংগঠন, চমকপ্রদ নাট্যক্রিয়া, অলঙ্কার-শোভিত গীতময় সংলাপ, উপস্থাপন কৌশল সবকিছুর সঙ্গে আধুনিক কাব্যনাটকের সাজুয্য প্রত্যক্ষ করা যায়। তবে আধুনিক নাটকের মতো চরিত্রগুলোর দ্বান্দ্বিক অবস্থান, মানসসংকটের তীব্রতা এগুলোতে অনুপস্থিত। আর এসব কারণেই হয়তো লেখক-সমালোচক আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) আধুনিক বাংলা নাটকের উদ্ভব প্রসঙ্গে এককভাবে পাশ্চাত্য উৎসকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি তাঁর ‘আধুনিক নাট্যতত্ত্ব ও নাটক’ প্রবন্ধে এ সম্পর্কে বলেছেন :
সমকালীন পাশ্চাত্য নাটকের মতো সমকালীন বাংলা নাটকও আধুনিক বাংলা নাটকের সর্বশেষ স্তর। আধুনিক বাংলা নাটক যে পাশ্চাত্য ও সাহিত্যের প্রভাবে উৎপত্তি হয়েছে, তাও ঐতিহাসিক সত্য। আরেকটি জোরালো কারণ যা আমার মনে জাগছে তা হলো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে যে সব নাটক আমি অভিনীত হতে দেখেছি তার বিষয়বস্তু প্রকরণ ও প্রয়োগ কৌশলে এমন একটা অভিনবত্ব আছে, যাকে পুরোপুরি দেশীয় নিরিখে বিচার করা যায় না।
পাশ্চাত্যরীতিতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) তাঁর শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯) নাটক রচনার মাধ্যমে আধুনিক বাংলা নাটকের যাত্রাপথ উন্মোচন করেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) একাধিক ভিন্ন ভিন্ন ফর্মের নাটক রচনার মধ্যদিয়ে এ ধারাকে ঋদ্ধ করেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৌলিক নাটক ছাড়াও রচিত একাধিক কাব্য নাট্যগুণে সমৃদ্ধ। তাঁর মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১), তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), বিশেষত, বীরাঙ্গনা কাব্যের (১৮৬২) নাট্যিকগুণ পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। তদুপরি, এগুলোকে পরিপূর্ণ কাব্যনাট্য বলা যায় না, বরং নাট্যগুণসমৃদ্ধ কাব্য বলা যেতে পারে ।
আধুনিক কাব্যনাটক বলতে আমরা যা বুঝি বাংলা সাহিত্যে তার শুভসূচনা করেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধিকাংশ নাটকই কাব্যগুণসমৃদ্ধ। একজন প্রজ্ঞাবান সফল কবির হাতে রচিত নাটক এমন হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, টি এস এলিয়টের কাব্যনাটক রচনার পূর্বেই নিজস্ব মৌলিক ভাবনা ও নিরীক্ষাপ্রবণ মননের তাগিদে নাটকের ভাষা নিয়ে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। নাটকে কাব্যভাষার সম্ভাবনা নিয়ে যাচাই করেছেন।’ বস্তুত ‘মধুসূদনের পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা নাটকের উন্নয়নের লক্ষ্যে যে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন তারই ফলস্বরূপ বাংলা সাহিত্যে কাব্যনাটকের পথচলা শুরু হয়েছিলো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতময় সত্তার প্রভাবে তাঁর প্রায় সব রচনাতেই কাব্যসুর অনুরণিত হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৮৩), গান্ধারীর আবেদন (১৮৯৭), সতী (১৮৯৭), নরকবাস (১৮৯৭), কর্ণ- কুন্তী সংবাদ (১৯০০) নামে তিনি একাধিক নাট্যকবিতা রচনা করেছেন। এসব রচনায় কাব্যগুণ ও নাট্যগুণের অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হলেও এগুলোকে ঠিক আধুনিক কাব্যনাট্যের বিচারে কাব্যনাটক বলা যায় না। এখানে আধুনিক কাব্যনাট্যের বিশেষ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আভাসিত হয়েছে মাত্র ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত বিসর্জন (১৮৯০) নাটকটিকে তাঁর প্রথম ও সার্থক কাব্যনাটক বলা যেতে পারে।
আচারসর্বস্ব ধর্মের অপরীতি ও আগ্রাসনের বিপরীতে মানবধর্মের প্রতিষ্ঠায় প্রেমের জয়গান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
আলোচ্য নাটকে। কোনো ধরনের হত্যা ও রক্তপাতের মধ্যদিয়ে ঈশ্বরপূজা হতে পারে না; এবং জীবে দয়াই মানুষের প্রধান ধর্ম – এটিই বিসর্জন নাটকের মূল বক্তব্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিসর্জন নাটকের এই প্লট নিয়েছেন তাঁর আর একটি বিখ্যাত রচনা রাজর্ষি (১৮৮৭) উপন্যাস থেকে। রাজর্ষি উপন্যাসের প্লটের উৎস প্রসঙ্গে জীবনস্মৃতি গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন সেটি দ্বারা বিসর্জন নাটকের প্লটের প্রেক্ষাপট ধারণা করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন :
[…] স্বপ্ন দেখিলাম, কোন এক মন্দিরের সিঁড়ির উপর বলির রজচিহ্ন দেখিয়া একটি বালিকা অত্যন্ত করুণ ব্যাকুলতার সঙ্গে তাহার বাপকে জিজ্ঞাসা করিতেছে, ‘ বাবা, এ কী! এ যে রক্ত!’ বালিকার এই কাতরতায় তাহার বাপ অন্তরে ব্যথিত হইয়া অথচ বাহিরে রাগের ভাণ করিয়া কোনোমতে তার প্রশ্নটাকে চাপা দিতে চেষ্টা করিতেছে। জাগিয়া উঠিয়াই মনে হইল, এটি আমার স্বপ্নলব্ধ গল্প।’
মূলত শান্তি, কল্যাণ, ক্ষমা, দয়া আমৃত্যু এগুলোর সাধনা করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর এই অন্তরলালিত মানবিক বোধ ও বিশ্বাসের নান্দনিক উপস্থাপন ঘটেছে বিসর্জন নাটকে। কাব্যনাট্যের মূল যে বৈশিষ্ট্য অভ্যন্তরীণ ঘাত-প্রতিঘাত, চরিত্রের অন্তর্গত দ্বন্দ্বপ্রকাশ, তার শতভাগ উপস্থাপন ঘটেছে বিসর্জন নাটকে।
রবীন্দ্রসাহিত্য- সমালোচক নীহার রঞ্জন রায় এ নাটকের চারিত্রিক দ্বন্দ্বনির্মাণ-রীতি এবং এর মঞ্চসাফল্যের কার্যকারণ নির্ণয় প্রসঙ্গে বলেন :
কি মনের কি বাহিরের, এতখানি দ্বন্দ্ব রবীন্দ্রনাথের আর কোনো নাট্যেই এমন জীবন্তভাবে ফুটিয়া উঠে নাই, এই হিসেবে ‘বিসর্জন’ অতুলনীয়। জয়সিংহের মনের মধ্যে যে সংশয়ের নিষ্করুণ দ্বন্দ্ব, তাহার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ যে অপূর্ব চরিত্র-বিশ্লেষণের ক্ষমতা দেখাইয়াছেন, খুব কম নাট্যেই তাহার তুলনা আছে। আর কি জয়সিংহ, কি রঘুপতি, কি গোবিন্দমাণিক্য, কি অপর্ণা ইহাদের মনের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও সংগ্রাম তাহা মনের মধ্যেই শুধু লীলায়িত হয় নাই, বাহিরের কথার গতিভঙ্গি ও কর্মের মধ্যেও তাহা অভিব্যক্ত হইয়াছে। চিত্তের ও কর্মের দ্বন্দ্বগতির এমন অপূর্ব সমন্বয় রবীন্দ্রনাথের আর কোনো নাটকেই এতটা সম্ভব হয় নাই। ‘বিসর্জন’ যে অভিনয় সাফল্য লাভ করিয়াছে, ইহাই তাহার অন্যতম প্রধান কারণ। ২
বিসর্জন নাটকটি আবর্তিত হয়েছে নাটকের প্রধান দুই চরিত্র রাজা গোবিন্দমাণিক্য ও মন্দিরের আত্মম্ভরী পুরোহিত রঘুপতির মধ্যে প্রেম ও ক্ষমতার অন্তসংঘাতকে কেন্দ্র করে। একদিকে রাজার রাজ্যশাসনের ক্ষমতা, অন্যদিকে রাজ পুরোহিতের আধ্যাত্মিক প্রভাবের দ্বন্দ্ব নাটকটিকে যথার্থই আধুনিক কাব্যনাটকের মর্যাদায় মণ্ডিত করেছে।

বিসর্জনের নাট্যকাহিনি নির্মিত হয়েছে পঞ্চাঙ্ক নাটকের আদলে। এর ভাষাশৈলী অত্যন্ত চমৎকার ও প্রাঞ্জল। নাট্যকার এখানে চরিত্রানুগ ভাষাপ্রয়োগে কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। নাটকের অধিকাংশ সংলাপ কবিতায় রচিত। জয়সিংহ চরিত্রটি যখন প্রেম ও হিংসার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত, সে সময়ের একটি সংলাপ প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য :
মায়াবিনী, পিশাচিনী,
মাতৃহীন এ সংসারে এসেছিস তুই
মা’র ছদ্মবেশ ধরে রক্তপানলোভে।
ক্ষুধিত বিহঙ্গশিশু অরক্ষিত নীড়ে
চেয়ে থাকে মা’র প্রত্যাশায়, কাছে আসে
লুব্ধ কাক, ব্যগ্রকণ্ঠে অন্ধ শাবকেরা
মা মনে করিয়া তাকে করে ডাকাডাকি,
হারায় কোমল প্রাণ হিংস্রচক্ষুঘাতে –
তেমনি কি তোর ব্যবসা? প্রেম মিথ্যা,
স্নেহ মিথ্যা, দয়া মিথ্যা, মিথ্যা আর-সব,
সত্য শুধু অনাদি অনন্ত হিংসা! (বিসর্জন) ‘
আবার, আলোচ্য নাটকে সাধারণ প্রজাবৃন্দের কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে গদ্য সংলাপ, এক্ষেত্রে অলংকারবহুল ভাষার পরিবর্তে প্রযুক্ত হয়েছে সাধারণ গ্রামীণ কথ্যভঙ্গি। যেমন :
গণেশ। ইদিকে এ ভালোমানুষটি, কিন্তু নিতাইয়ের সঙ্গে কথায় আঁটবার জো নেই ।
হারু । নিতেই আমার পিসে হয়।
কানু। শোনো একবার কথা শোনো। নিতাই আবার তোর পিসে হল কবে? (বিসর্জন)
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেসব গদ্যসংলাপাত্মক নাটক রচনা করেছেন সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই কাব্যনাটকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হতে পারে। তবে সমালোচকগণ এ ধারার নাটককে বলেছেন কাব্যনাটকের লক্ষণাক্রান্ত সফল কাব্যময় গদ্যসংলাপাত্মক নাটক।
এ ধারার নাটকের মধ্যে ডাকঘর (১৯০২), শারদোৎসব (১৯০৮), রাজা (১৯১০), মুক্তধারা (১৯২২), রক্তকরবী (১৯২৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিশেষত ‘মুক্তধারা, রক্তকরবী প্রভৃতি নাটক এদের বক্তব্য পরিবেশ, ঘটনা সংস্থান, কাব্যময় সংলাপ ইত্যাদি নিয়ে একেবারে আদ্যন্ত কবিতায় সংস্থাপিত বলা যায়। আর এখানেই এরা আধুনিক কাব্যনাট্যের সগোত্র হয়ে উঠেছে। ‘
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যনাট্যের সর্বোত্তম বিকাশ ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে কবি-নাট্যকার বুদ্ধদেব বসুর (১৯০৮-১৯৭৪) হাতে। বুদ্ধদেব বসু তিরিশের দশকের কবি হলেও কাব্যনাট্য লেখা শুরু করেন ষাটের দশকে। কবি অলোক সরকার (১৯৩১-২০১৬) তাঁর অগ্রজ কবিরা ও কাব্যনাটক (১৯৬১) প্রবন্ধের পাদটীকায় বলেছেন, : […] বুদ্ধদেব বসু অনেকগুলি নাটক রচনা করেন, যাকে তিনি নিজে কাব্যনাটক বলে মনে করতেন। ২
বস্তুত, বিভাগোত্তরকালে আধুনিক বাংলা কাব্যনাট্যের শ্রেষ্ঠতম শিল্পী বুদ্ধদেব বসু। বাংলা সাহিত্যে এরপর যাঁরাই কাব্যনাটক রচনায় ব্রতী হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের রচনাতেই কমবেশি বুদ্ধদেব বসু রচিত কাব্যনাট্যের প্রভাব বিদ্যমান। বুদ্ধদেব বসু ১৯৬৬- ১৯৭৩ সময়পরিসরে সর্বমোট তেরোটি নাটক রচনা করেছেন যার মধ্যে ছয়টি নাটককে পরিপূর্ণভাবে শিল্পসফল কাব্যনাটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
বুদ্ধদেব বসুর উল্লেখযোগ্য কাব্যনাটকগুলো হলো – তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬), কালসন্ধ্যা (১৯৬৯), অনাম্নী অঙ্গনা (১৯৭০), প্রথম পার্থ (১৯৭০), সংক্রান্তি (১৯৭৩)। বাংলা কাব্যনাট্যের ইতিহাসে বুদ্ধদেব বসুর অবদান নির্ণয় করতে গিয়ে সাহিত্য-গবেষক ড. মাহবুব সাদিক নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
বাংলা কাব্যনাট্যের দ্বিতীয় পর্যায়টি সমৃদ্ধ করেছেন বুদ্ধদেব বসু তাঁর একক কৃতিত্বে। আধুনিক কাব্যনাট্য রচনার পথিকৃৎ তিনি। ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ বুদ্ধদেব বসু । […] জীবনের অন্ত্যপর্বে তিনি নিবিষ্ট হয়েছিলেন নাটক রচনায়। […] বাংলা কাব্যনাট্যের রূপকল্প গঠন ও বিকাশের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয় । ৩
মূলত, ‘কবি ও কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব আধুনিকতার পতাকা সগৌরবে বরাবর উড্ডীন করে শেষ বয়সে দেশী ও বিদেশী পুরাণের হলেন নিবিষ্ট পাঠক। আর সেখান থেকেই পেলেন কাব্যনাট্য রচনার প্রেরণা। বলাবাহুল্য বুদ্ধদেব বসুর সব কাব্যনাট্যে পুরাণের নবরূপায়ন ঘটেছে।
পুরাণের অপেক্ষাকৃত গৌণ কাহিনিকে তিনি কল্পনার আশ্রয়ে সমকালীন ও অতীব প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন। যেমন, তপস্বী ও তরঙ্গিণীর কাহিনি তিনি মহাভারতের ‘ঋষ্যশৃঙ্গ উপাখ্যান’ থেকে সংগ্রহ করেছেন। পুরাণে উল্লেখিত সামান্য এক অনামী পতিতাকে তিনি আলোচ্য নাটকে তরঙ্গিণী নাম দিয়ে সমগ্র নারীত্বকে শ্রদ্ধার আসনে আসীন করেছেন।
রাজগৃহে নানান অনুশাসন আর নিয়মের জালে বন্দি রাজকন্যা শান্তার পাশাপাশি আলোচ্য নাটকে অন্ত্যজ-অস্পৃশ্য পতিতা নারীও আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে; যা বিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একদিকে রাজকুমারী শান্তা যেমন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পিতার অযাচিত হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে, অন্যদিকে বিচিত্রগামিনী পতিতা নারী তরঙ্গিণী তার নতুন সত্তার আবিষ্কারে হয়েছে নিমগ্ন :
ক. শান্তা :
আমার বিবাহ! আর আমারই অজ্ঞাতে তার আয়োজন! […] এ কি ক্ষত্রনারীর স্বাধিকার নয় যে তার পতি হবে স্বনির্বাচিত? (তপস্বী ও তরঙ্গিণী, ১ম অঙ্ক)
খ. তরঙ্গিণী :
আমার মনে হয় আমার মুখের তলায় অন্য এক মুখ লুকিয়ে আছে। তুমি দেখতে পাচ্ছো ? […] আমার মনে হয় আমার অন্য এক মুখ ছিলো – আমি তা হারিয়ে ফেলেছি। আমি খুঁজি – – আমি খুঁজি সেই মুখ। (তপস্বী ও তরঙ্গিণী, ৩য় অঙ্ক)৩ –
স্বয়ং বুদ্ধদেব বসুও এ বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে এ নাটক রচনার মৌল উদ্দেশ্য সম্পর্কে তপস্বী ও তরঙ্গিণী নাটকের ভূমিকায় বলেছেন :
এই নাটকের অনেকখানি অংশ আমার কল্পিত এবং রচনাটিও শিল্পিত – অর্থাৎ একটি পুরাণকাহিনীকে আমি – নিজের মনোমতো করে নতুনভাবে সাজিয়ে নিয়েছি, তাতে সঞ্চার করেছি আধুনিক মানুষের মানসতা ও যদিও সমকালীন অনেক সমালোচক ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী পুরোপুরি কাব্যনাট্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এটি কাব্য ও নাট্যমাধুর্যের সমন্বয়ে পরিপূর্ণ কাব্যনাটক। যদিও এখানে লেখক গদ্যভাষা প্রয়োগ করেছেন, তবু এই গদ্যসংলাপে মিশে আছে কবিত্বের সুর। যেমন, প্রথম অঙ্কে প্রজাদের একটি সংলাপ উল্লেখ করা যেতে পারে :
কী দোষ করেছি আমরা – কেন দেয়া নির্দয়? ( তপস্বী ও তরঙ্গিণী, ১ম অঙ্ক)
এখানে ‘কেন দেয়া নির্দয়?’ অংশে স্পষ্টত কবিত্বের সুললিত মাধুর্য ধরা পড়েছে।

আবার, নাটকে ব্যবহৃত বিভিন্ন চরিত্রের মুখের গানগুলিও চমৎকার শিল্পমাধুর্যসম্পন্ন শব্দ-ছন্দে অলঙ্কৃত। যেমন, একদিকে প্রেমিকের প্রেম, অন্যদিকে স্বামীর কাছে স্ত্রীর অধিকার – উভয় হারিয়ে মেকি জীবনযাপনে সমর্পিত – রাজকন্যা শান্তার বিষাদাক্রান্ত মনোবেদনা প্রকাশের নিমিত্তে রচিত একটি গান উল্লেখ্য :
আসে যায় দিন-রজনী
আসে জাগরণ, তন্দ্ৰা
শুধু নেই হৃৎস্পন্দ,
লুণ্ঠিত সব স্বপ্ন। ( তপস্বী ও তরঙ্গিণী, ৪র্থ অঙ্ক) 8
এছাড়া তিনি মহাভারতের ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি নিয়ে রচনা করেছেন প্রথম পার্থ, অনাম্নী অঙ্গনা, কালসন্ধ্যা প্রভৃতি কাব্যনাটক। পুরাণ থেকে ঘটনাংশ সংগ্রহ করে সেগুলো নিয়ে বুদ্ধদেব বসু দেখিয়েছেন পুরাণ বর্তমান পৃথিবীতেও কতখানি প্রাসঙ্গিক; এবং মহাভারতের বর্ণনাগুলো কিছু স্থবির কাহিনির সমষ্টি নয়, বরং তার প্রভাব
আধুনিক কালপর্যন্ত বিস্তৃত।
কালসন্ধ্যা নাটকে লেখক কৃষ্ণ চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের কিছু শাশ্বত জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া কিংবা নিয়তির অমোঘ বিধানে কৃষ্ণের সম্মুখেই যদুবংশ ধ্বংস হয়, যে-অর্জুনের বীরত্বে পাণ্ডবরা অনায়াসে কৌরবদের পরাজিত করে, সেই গাণ্ডীবধারী অর্জুন যদুবংশের নারীদের রক্ষায় গাণ্ডীব উত্তোলন পর্যন্ত করতে ব্যর্থ হন। এ-যেন পূর্বনির্ধারিত নিয়তির অমোঘ বিধান; যা থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের এতদিন পর কেন আবার নতুন করে এই বিপর্যয়, সুভদ্রার এমন প্রশ্নে কৃষ্ণের উত্তরই যেন যাবতীয় প্রশ্নের মীমাংসা করে দেয় :
প্রতিহিংসা নয় – প্রতিদান ।
যুদ্ধ শেষ, যুদ্ধ অসমাপ্ত ।
দু-একটি প্রশ্ন ছিলো শূন্যে ঝুলে,
সর্বদাই থাকে ।
আজ কুরুক্ষেত্রের উত্তর এলো –
অনুবৃত্তি, উপসংহার ।
সাত্যকি ও কৃতবর্মা
সকলের সব প্রাপ্য শোধ ক’রে নির্ভার হলেন । (কালসন্ধ্যা)’
বস্তুত,‘মহাভারত-এর এক অণু-কাহিনিকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে বুদ্ধদেবের কালসন্ধ্যা কাব্যনাটক। মহাভারত -এর মৌষল-পর্বে পুত্রশোকে কাতর ক্রুদ্ধ গান্ধারী কৃষ্ণকে যে অভিশাপ দেন, বুদ্ধদেব সে- অভিশাপকে কেন্দ্রে রেখে কালসন্ধ্যা কাব্যনাটকে বিশ শতকের অস্থির সময়কে শিল্পিতা দিয়েছেন – পুরাণের ঘটিয়েছেন পুনর্জন্ম।
প্রথম পার্থ কাব্যনাটকের কাহিনিও মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন নাট্যকার। কুন্তীর মুনিপ্রদত্ত বর নিয়ে কৌতূহলমূলক পরীক্ষায় সূর্যদেবের সাহচর্যে জন্ম নেয় বীরপুত্র কর্ণ। কিন্তু কুমারী কুন্তী আকস্মিক এই পুত্রকে লোকলজ্জার ভয়ে সমাজে না নিয়ে তাকে জলে ভাসিয়ে দেন। ভাগ্যের নিমর্ম পরিহাসে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কুন্তীর সমাজস্বীকৃত পুত্রদের বিপক্ষ শিবিরে যোগ দেয় কর্ণ।
যুদ্ধের প্রারম্ভমুহূর্তে কুন্তী ও কর্ণ পরস্পর পরস্পরের পরিচয় সম্পর্কে অবগত হয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়। কর্ণকে জ্যেষ্ঠপাণ্ডব সম্বোধন করে পুত্র অর্জুনের বিপক্ষে যুদ্ধ না করতে অনুরোধ জানায় কুন্তী। কিন্তু এতদিনকার মাতৃস্নেহবঞ্চিত কর্ণ প্রচণ্ড অভিমানে তাকে ফিরিয়ে দেন। একদিকে যে কৌরবরা তাকে অসহায় মুহূর্তে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা না করার মতো মানসিকতা; অন্যদিকে জন্মদাত্রী কুন্তীর অর্জুনের স্বার্থে কর্ণকে পুত্র স্বীকার করে নেয়ার আগ্রহ – কর্ণকে দারুণভাবে করে তুলেছে ব্যথিত।
কর্ণের এই মানসদ্বন্দ্ব, হৃদয়জাত রক্তক্ষরণ নাটকটিকে আধুনিক কাব্যনাট্যের মর্যাদা দান করেছে। সমগ্র কুরুক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন চরিত্র কর্ণের হৃদয়-অভ্যন্তরে প্রোথিত এই দিগন্তবিস্তারী শূন্যতা প্রসঙ্গ চমৎকার কাব্যিক ভাষামাধুর্যে উপস্থাপন করেছেন নাট্যকার। কর্ণ উন্মুলিত হবার অসীম যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আর্তকণ্ঠে দ্রৌপদীর উদ্দেশ্যে বলে উঠেছে :
আমার মর্মকথা তুমি প্রকাশ করলে, পাঞ্চালী ।
আমিও তা-ই ভাবি মনে-মনে : আমি কে?
পাণ্ডব নই, কৌরব নই –
অনাত্মীয় এক আগুন্তক, কালস্রোতে ভাসমান এক পাত্র,
নির্বন্ধে ভরা, নিরুদ্দেশ, জল আর বাতাসের বেগে চালিত ।
এক অনাহূত অতিথি আমি হস্তিনাপুরে,
কুলগোত্রহীন, নিষ্প্রয়োজন,
দৈবক্রমে কুরুবংশের কাহিনীর মধ্যে প্রবিষ্ট – (প্রথম পার্থ) ‘
বস্তুত, ‘মিথের এক চরিত্রের মধ্যে উত্তর-সামরিক আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা বা alienation-এর প্রকাশ ঘটিয়ে বুদ্ধদেব কর্ণকে করে তুলেছেন একালের মানুষ। মিথের এই নবসৃষ্টিতে বুদ্ধদেবের প্রথম পার্থ অনন্য এক নির্মাণ । ২
মহাভারতের অন্যতম লোকশ্রুত চরিত্র ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুরের জন্মকাহিনির প্রেক্ষাপটে বুদ্ধদেব বসু রচনা করেছেন অনাম্নী অঙ্গনা কাব্যনাটক। তপস্বী ও তরঙ্গিণী নাটকে যেমন পুরাণে স্বল্পোল্লেখিত এক নারীকে ক্রেন্দ্রীয় চরিত্রে এনে মহিমান্বিত করেছিলেন, তেমনি আলোচ্য নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র অঙ্গনা ছিল রাজবধূ অম্বিকার নামহীন দাসী। প্রেম ভালোবাসা, অপত্য স্নেহ ও আত্মত্যাগে সামান্য এই দাসীই একটা পর্যায়ে হয়ে উঠেছে অসামান্য ‘অনাম্নী অঙ্গনা’
দাসী অঙ্গনার চরম আরাধ্য ছিল দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে কোনো সুদর্শন যুবা পুরুষের কন্ঠে বরমাল্য পরিয়ে চিরসুখে স্বাধীন জীবনযাপন। কিন্তু রাজবধূর অনুরোধে দাসত্ব থেকে মুক্ত হবার বিনিময়ে রাজবংশকে সুস্থ সবল পুত্র উপহার দিতে তাকে ভয়ঙ্করদর্শন মুনি ব্যাসদেবের সজ্জাসঙ্গী হতে হয়েছে। একসময় ব্যাসদেবের সঙ্গে মিলনের বাধ্যবাধকতাকে সে চরম অপমান বলে গণ্য করলেও মিলনমুহূর্তে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রেমিকা সত্তায়। এরপর পুত্র বিদুরের জন্মলাভে মাতৃত্বকে বরণ করে সে নতুনভাবে জীবনকে ভাবতে শিখেছে। ফলে প্রেমজসত্তা ও মাতৃত্বসত্তায় উত্তীর্ণ অঙ্গনা আবারো চেয়েছে রাজগৃহে দাসীর জীবনযাপন। রাজগৃহে পালিত পুত্র বিদুরের সান্নিধ্যলাভের বাসনা নিয়ে সে বলে উঠেছে :
আমি দেখতে চাই দূরযাত্রীকে তীরে দাঁড়িয়ে,
[…] সে
নম্র, মৃদুভাষী, ধীর –
পিতার মতো বিদ্বান, মাতার মতো নেপথ্যচারী, […]
আমার স্মরণচিহ্ন, আমার প্রমাণ, আমার অভিজ্ঞান। (অনামী অঙ্গনা)’
আর এর মধ্যদিয়েই বুদ্ধদেব বসু বিংশ শতাব্দীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, আত্মসচেতন প্রেমময় নারীর প্রতিচ্ছবি চিত্রিত করেছেন শিল্পিত ক্যানভাসে। এখানেও ঘটেছে পুরাণের পুর্নজন্ম।

বুদ্ধদেব বসুর সংক্রান্তি কাব্যনাটকটিও পুরাণের নবরূপায়ণ, মহাভারতের চরিত্র ধৃতরাষ্ট্র, সঞ্জয় ও গান্ধারীকে নিয়ে লেখা। গান্ধারীর মানবিকতা, ধার্মিকতা তাকে উজ্জ্বলতর চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে সে বার বার আত্মসংবরণের অনুরোধ জানিয়েছে, অবাধ্যপুত্র দুর্যোধনকে অধর্মের পথ পরিত্যাগের আদেশ দিয়েছে; কিন্তু শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগেছে। আলোচ্য নাটকে কবি বুদ্ধদেব বসু চমৎকারভাবে গান্ধারীর এই তীব্র মনোযন্ত্রণার চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যেমন, পুত্রের মৃত্যুতে শোকাহত গান্ধারীকে সঞ্জয়ের সামনে যখন ধৃতরাষ্ট্র উন্মাদিনী বলে শনাক্ত করেছে, তখন ধর্মবোধ ও মাতৃসত্তার দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত গান্ধারী বলে উঠেছে :
উন্মাদ নই – এক ধর্মহীন পুরুষের সহধর্মিণী,
এক নরাধম পুত্রের আমি মাতা। […]
আমি এক নারী, নারীত্ব যার নিষ্ফল,
এক পত্নী, পতি যার মতিচ্ছন্ন,
এক রাজী, রাজত্ব যার মর্মপীড়া,
এক মাতা, মাতৃত্ব যার অভিশাপ –
ধর্ম ছাড়া কোথাও যার আশ্রয় নেই,
সত্য ছাড়া কোথাও নেই নির্ভর। (সংক্রান্তি)’
অনিবার্য সত্যকে উল্লঙ্ঘনের উপায়হীনতাই স্পষ্ট হয়েছে আলোচ্য নাটকে, যার মাধ্যমে বুদ্ধদেব সমকালীন বিনষ্ট মানবচেতনা আর ধ্বংসপ্রবণতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ।
এগুলো ছাড়াও বুদ্ধদেব বসু কাব্যনাটকের আদলে প্রায়শ্চিত্ত (১৯৭৩), ইকাকু সেন্নিন (১৯৭৩), অনুরাধা (১৯৯৮), কলকাতার ইলেক্ট্রা (১৯৬৭) প্রভৃতি নাটক রচনা করেছেন। তবে এগুলোকে কোনো কোনো সমালোচক পরিপূর্ণ মৌলিক কাব্যনাটকের মর্যাদা দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ অনূদিত, রূপান্তরিত, একাঙ্কিকা গীতিনাট্য প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন।
আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯)-এর বিখ্যাত নাটক পারগেটারির (১৯৩৮) অনুলিখন নাটক প্রায়শ্চিত্ত। আর ইক্কাকু সেন্নিন নাটকটি রচিত হয়েছে জাপানি ‘নো’ নাটকের আদলে। বস্তুত, জাপানি লোকগাথা চরিত্র ইক্কাকুর সঙ্গে ভারতীয় পুরাণের শুদ্ধাচারী চরিত্র ঋষ্যশৃঙ্গের গভীরতর সাযুজ্য প্রত্যক্ষ করে নাট্যকার আলোচ্য নাটকটি রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
অনুরাধা নাটকটি মূলত একাঙ্ক গীতিনাট্য। আলোচ্য নাটকে সাধারণ মানুষের ওপর নিয়তির অমোঘ ও অমোচনীয় প্রভাব বর্ণিত হয়েছে অনুরাধা, মালতী, অনিরুদ্ধ, পুরন্দর প্রভৃতি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে গ্রিক মিথ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে বুদ্ধদেব রচনা করেছেন কলকাতার ইলেক্ট্রা নাটক।
গ্রিক পুরাণের প্রত্নপ্রতিমা চরিত্র ইলেক্ট্রাকে অবলম্বন করে তিনি এখানে বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিপর্যন্ত কলকাতার সমাজজীবনকে চিত্রিত করেছেন শিল্পের নিপুণতায়। মূলত, বিষয়বস্তু ও শিল্প নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষায় বুদ্ধদেব বসু তাঁর নাট্যমানসকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলা কাব্যনাট্যের ধারায় তাঁর অবস্থান সুনির্দিষ্ট, অবদান অনস্বীকার্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বুদ্ধদেব বসু কাব্যনাট্যধারায় প্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে অনেক কবিই কাব্যনাট্যরচনায় ব্রতী হয়েছেন। কিন্তু একথা নির্দ্বিধায় স্বীকার্য যে, ‘বাংলাদেশে কাব্যনাট্য রচয়িতার সংখ্যা সীমিত। মূল নাট্যধারার কেউ কেউ দু-চারটি কাব্যনাট্য লিখলেও তা তাঁদের সৃজিত সাহিত্যের তুলনায় অধিক মানসম্পন্ন নয়।
ব্যতিক্রম সৈয়দ শামসুল হক।” তবে বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের ধারায় অনেকের অবদান স্মরণযোগ্য। বিভাগোত্তরকালে বাংলাদেশের সাহিত্যে যাঁরা কাব্যনাট্যরচনায় উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে কবি আ ন ম বজলুর রশীদ (১৯১১-১৯৮৬), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) প্রমুখ কবি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কবি ও নাট্যকার আ ন ম বজলুর রশীদের সমগ্র সৃষ্টিকর্মের মধ্যে কাব্যনাট্য সংকলন ত্রিমাত্রিক (১৯৬৬) একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের লোকগাথাকে অবলম্বন করে তিনি ধনুয়া গাঙের তীরে, মেহের তোমার নাম ও কোনো এক দীপক সন্ধ্যায় নামক তিনটি কাব্যনাট্য রচনা করে ত্রিমাত্ৰিক কাৰ্যনাট্য সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ত্রিমাত্রিক কাব্যনাট্য সংকলনের নাটকগুলোতে মাত্রারিক্ত সংগীত ও সুরের প্রাধান্য লক্ষ করে এগুলোকে কোনো কোনো সমালোচক গীতিনাট্য বলতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু শিল্পমানের বিচারে কাব্যনাট্যের মর্যাদা না পেলেও এগুলোকে কাব্যনাট্যের লক্ষণাক্রান্ত বলা যায়। এ নাটকগুলো সম্পর্কে লেখক নিজেই নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
দেশের জনপ্রিয় লোকগাথার অনুকরণ বা অনুসরণ নয়, অনুসৃষ্টিই আমাদের লক্ষ্য এবং এভাবেই আমাদের লোক- কাহিনীগুলি নতুন রূপ ও রূপায়ণে দীর্ঘায়ু লাভ করবে। ফলে আমাদের কাব্য-সাহিত্যের ভাব ও রেখা-দিগন্ত আরো প্রসারিত হয়ে পড়বে। এই উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ‘দিওয়ানা মদীনা ও পশ্চিম পাকিস্তানের “উমর- মারুঈ’ লোকগাথা দু’টিকে কাব্যনাটিকায় আধুনিক আঙ্গিক ও রসরূপে প্রকাশ করতে প্রয়াস পেয়েছি।’
অর্থাৎ নাট্যকার স্বয়ং তাঁর এ রচনাগুলোকে কাব্যনাটক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের অনন্য নিদর্শন মৈমনসিংহ গীতিকার ‘দেওয়ানা মদিনা’ পালা অবলম্বনে লেখক তাঁর অন্যতম কাব্যনাটক ধনুয়া গাঙের তীরে রচনা করেছেন। এটি বাংলাদেশের প্রচলিত ও জনপ্রিয় লোককাহিনির অনুরচনা হলেও বজলুর রশীদ ভাষার শিল্পসৌকর্যে, ছন্দের নিপুণতায় নাট্যকাহিনিটিকে কাব্যনাট্যের উপযোগী করে তুলেছেন।
কোনো এক দীপক সন্ধ্যায় নাটকটির কাহিনি তিনি রচনা করেছেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয় লোকগাথা উমর-মারুঈ থেকে প্রভাবিত হয়ে। এটি একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি। সিন্ধু নদীর অববাহিকার মালি নামক গ্রামের মারু উপজাতির কন্যা মারুই ও একই গ্রামের রাখাল যুবক খেতসীনের প্রেমকাহিনি অবলম্বনে নাটকটি রচিত হয়েছে। কাব্যগুণ ও নাট্যগুণের সমন্বয়ে এটি উন্নীত হয়েছে শিল্পসফল কাব্যনাট্যের মর্যাদায় ।
অনেকটা ঐতিহাসিক নাটকের ঢঙে রচিত হয়েছে মেহের তোমার নাম কাব্যনাটক। মানবহৃদয়ের প্রেমাবেগ, মিলনব্যাকুলতা, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা প্রভৃতি নিয়েই নির্মিত হয়েছে এ-কাব্যনাট্যের মূল আলেখ্য। এর নাট্যঘটনা খুব বেশী দীর্ঘ নয় । এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে নির্মিত এ নাটকের ভাষা প্রাঞ্জল ও সাবলীল।
কবিতার পাশাপাশি কাব্যনাট্য রচনায় ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) বিরল কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন। তাঁর একাধিক দীর্ঘ কবিতা কাব্যনাট্যগুণ সম্পন্ন। দরিয়ায় শেষ রাত্রি (১৯৪৪), নয়া জিন্দেগী (১৯৫২) এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যনাটক নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১)। ফররুখ আহমদের দরিয়ার শেষ রাত্রি রচনার নাট্যগুণ প্রসঙ্গে কবি ও সাহিত্য-সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেন :
ফররুখের কবিতায় শুধুমাত্র নাট্যগুণের দিকে তাকালে তাঁর কাব্যগুণ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। যে-ক’টি কবিতায় ফররুখ এই দুই আপাতপ্রতীপ গুণকে মিলিয়েছেন, ‘দরিয়ায় শেষ রাত্রি’ তার মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।’
মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতারীতিতে প্রভাবিত হয়ে ফররুখ আহমদ তাঁর পূর্ণাঙ্গ কাব্যনাটক নৌফেল ও হাতেম রচনা করেন। বাংলাদেশের একজন কবির হাতে এমন একটি শিল্পসফল রসোত্তীর্ণ কাব্যনাট্য সমকালে অনেককেই বিস্মিত করেছিল। কোনো কোনো সমালোচক এটিকে দুঃসাহসিক কবিকর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

তিন অঙ্কে রচিত এ কাব্যনাট্যটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ইয়েমেনের দানশীল শাহজাদা হাতেমতায়ী ও আরব-রাজা নৌফেলকে ঘিরে। হাতেমতায়ীর বিপুল জনপ্রিয়তা এবং দেশ্যাপী ভূয়সী প্রশংসায় ঈর্ষান্বিত হয়ে হাতেমতায়ীকে ধরে আনার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন নৌফেল। মানবতা ও সেবার পথে নিবেদিত হাতেম অর্থকষ্টে পতিত এক দরিদ্র কাঠুরিয়াকে নৌফেলকর্তৃক ঘোষিত পুরস্কারের টাকা পাইয়ে দেবার জন্য নিজেই রাজদরবারে হাজির হন। হাতেমের এই আত্মত্যাগী মহানুভবতায় নৌফেল যারপরানাই বিস্মিত ও মুগ্ধ হন। নিজেই তখন স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজমস্তকের রাজমুকুট পরিয়ে দিলেন হাতেমতায়ীর উন্নত শিরে ।
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চৌদ্দমাত্রার অমিত্রাক্ষর ছন্দ নতুন করে বিনির্মাণ করে আঠারো মাত্রার অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবি ফররুখ আহমদ তাঁর নৌফেল ও হাতেম কাব্যনাটকের ছন্দ প্যাটার্ন রচনা করেছেন; যা ছিল ফররুখ আহমদের স্বাভাবিক কাব্যভাষার তুলনায় স্বতন্ত্র।
আবার, নাটকটির অঙ্গসজ্জার বহুক্ষেত্রেই মাইকেলের কাব্যের ভাষাবৈশিষ্ট্য অবলীলায় অনুসরণ করেছেন তিনি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন তাঁর রচিত মহাকাব্যগুলোতে দীর্ঘ-উপমা, উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার করেছেন, ফররুখ আহমদের আলোচ্য কাব্যনাটকটিতেও তেমনটা পরিলক্ষিত হয়। নাটকের শেষ কটি অন্তমিল যুক্ত চরণ প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে :
কাব্য নয়, গান নয়, শিল্প নয়, – শুধু সে মানুষ
নিঃস্বার্থ, ত্যাগী ও কর্মী, সেবাব্রতী – পারে যে জাগাতে
সমস্ত ঘুমন্ত প্রাণ, ঘুমঘোরে যখন বেহুশ
জ্বালাতে পারে যে আলো ঝড়-ক্ষুব্ধ অন্ধকার রাতে ;
যার সাথে শুরু হয় পথ চলা জাগ্রত যাত্রীর
দিল সে ইশারা আজ আত্মত্যাগ হাতেম তা’য়ীর। (নৌফেল ও হাতেম)’
ইসলামি আদর্শ ও মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ও জাতিসত্তায় ধর্মের ইতিবাচক মহিমা প্রচারের উদ্দেশে তিনি রচনা করেছেন নৌফেল ও হাতেম। আর এটি করতে গিয়ে তিনি প্রাক- ইসলামি যুগের কাহিনি বেছে নিয়েছেন।
‘বাংলা কাব্যে যেসব মহাকাব্য ও কাব্যনাটক রচিত হয়েছে তার বেশির ভাগেরই কাহিনী ও চরিত্র হিন্দু-পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি এবং কিংবদন্তি ও লোককাহিনী থেকে আহৃত, কবির কল্পনার রং মিশিয়ে কাহিনী ও ঘটনা বিধৃত করেছেন, চরিত্র চিত্রণ করেছেন, প্রতীক ও রূপক ব্যবহার ও চরিত্র-সৃজনের মাধ্যমে শুভ ও কল্যাণের বাণী এবং মানবতাবাদী আদর্শ তুলে ধরেছেন।
যদিও নৌফেল ও হাতেমে ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্য উপস্থাপনের কারণে রচনার শিল্পগুণ কিছুটা ক্ষুন্ন হয়েছে, তবু স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের ইতিহাসে এটি অপেক্ষাকৃত অধিক সার্থক ও জনপ্রিয় কাব্যনাট্য। এখানে চমৎকার ভাবে কাব্যগুণের সঙ্গে নাট্যগুণের অন্বয় সাধিত হয়েছে, যেটি কাব্যনাটকটিকে নান্দনিক ও শিল্পোত্তীর্ণ করতে সহায়তা করেছে।
বাংলা কাব্যনাট্যের ইতিহাস বর্ণনা প্রসঙ্গে একজন সমালোচক ফররুখ আহমদ এবং অপর কবি-নাট্যকার আলাউদ্দীন আল আজাদের ভূমিকা স্মরণ করে বলেছেন : ‘ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) এবং আলাউদ্দিন আল আজাদ কাব্যনাট্য রচনা করে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে এ আঙ্গিকে রচিত বাংলাদেশের সমৃদ্ধ নাট্যসাহিত্যের পথটি উন্মোচন করে দিয়েছেন।
ফররুখ আহমদের ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১) এবং আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ইহুদির মেয়ে’ (১৯৬২) কাব্যনাট্য বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যের বর্তমান বিকাশের ধারায় বিশেষভাবে স্মরণীয়, কেননা এদের প্রদর্শিত পথেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কাব্যনাট্য রচনায় একটা সজীব উজ্জ্বলতা আমরা লক্ষ করি।’
শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) একজন দেশবরেণ্য সার্থক কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও গত শতাব্দীর ষাটের দশকে তিনি একটি কাব্যনাটক রচনা করেছিলেন। তিনটি গোলাপ (১৯৬৫) নামক এই কাব্যনাটকটির প্রেক্ষাপট ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।
১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের হুদায়রা নামক একটি গ্রামের অধিবাসীদের ভীত-সন্ত্রস্ত জীবনযাপন এবং মসজিদের ইমামের নির্ভীক সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের পটভূমিতে রচিত হয়েছে আলোচ্য কাব্যনাটক। তিনটি গোলাপ নাটকে ব্যবহৃত কাব্যভাষা শিল্পগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। একজন প্রথিতযশা কবির কাব্যভাষায় রচিত এ-কাব্যনাট্যের নাট্যগুণ দুর্বল।
কবি মূলত কিছু চরিত্রের সন্নিবেশনে একটি সরলরৈখিক কাহিনি এতে বর্ণনা করেছেন। নাট্যদ্বন্দ্ব কিংবা নাট্যিক চমক এখানে একেবারেই অনুপস্থিত। চরিত্রগুলোও কাব্যনাট্যের বৈশিষ্ট্যানুসারে যথেষ্ট পরিণত হয়ে উঠতে পারেনি।
বাংলাদেশের আর একজন স্বনামখ্যাত কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯) ষাটের দশকে ইহুদীর মেয়ে (১৯৬২) নামক একটি কাব্যনাটক রচনা করেছিলেন। ইহুদীর মেয়ে কাব্যনাট্যের মূল বিষয় নরনারীর প্রেম ও ধর্মীয় প্রথার দ্বন্দ্ব। কবি এ-নাটকের কাহিনি সংগ্রহ করেছেন ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ থেকে। তবে এ নাটকের প্রেরণা তিনি পেয়েছেন ষাটের দশকে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের কোপানলে পড়ে কারাবাসকালে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত নানান বৈষম্যমূলক সংবাদের চেতনাগত প্রতিক্রিয়া থেকে। তিনি বলেন :
“ইহুদীর মেয়ে’ বইটা আকস্মিকভাবে লেখা, এমনকি, কতকটা দৈব যোগাযোগ বলা যেতে পারে, যদিও ওসবে বিশ্বাস নেই। জেলখানায় মনটা থাকে খেয়ালী ও স্পর্শকাতর; এবং খবরের কাগজ উত্তেজনার প্রধান অবলম্বন । খবরের কাগজে আমেরিকার একটি বিদ্যালয়ে বর্ণ-বিদ্বেষের বর্ণনা পড়ে যখন বিষণ্ণ, তখন ‘ওল্ড টেস্টামেন্টে’র একটি জরাজীর্ণ কপি আমার টেবিলে থাকত; মাঝে মাঝে অন্যমনস্কভাবে তার পাতা ওল্টাই। একবার জেনেসিসের একটি আখ্যানে দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করলাম এ বিষয়ে শিল্পায়নের একমাত্র প্রকরণ কাব্যনাট্য।’
এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সালেমী রাজ্যের রাজা হামরের পুত্র সেচেম এবং উচ্চবংশীয় সম্ভ্রান্ত ধনকুবের ইয়াকুব- কন্যা দিনা। তারা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসে বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তু তাদের অবিভাবকরা জাত্যভিমান, শ্রেণিবৈষম্য ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে ভালাবাসার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এমনকি তাদের এই ভালোবাসার সূত্রধরে দুই জাতির মধ্যে লেগে যায় তুমুল যুদ্ধ।
আলাউদ্দিন আল আজাদ প্রকৃতপক্ষে সালেম-দিনার প্রেমাবেগ ও তার করুণ পরিণতির মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের, বিশেষত আমেরিকায় সংঘটিত যাবতীয় বর্ণবৈষম্য, শ্রেণিবৈষম্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে চেয়েছেন। নাটকের অভ্যন্তরে নাট্যকারের মূল সে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে দিনার ভাই রুবেন নামক চরিত্রের মুখনিঃসৃত সংলাপের মাধ্যমে :
বর্ণে বর্ণে ইতরবিশেষ, জাতি-জাতি গোত্রে গোত্রে
আকৃতি অশেষ; তবু মানতেই হবে যদি যুক্তি
মূল্যবান, এ কেবল বাইরের রূপ, তার মানে
আমরা সবাই এক আদমের বীজ, সুনিশ্চিত
একই অস্থির রজ্জুতে আবদ্ধ স্বর্গভ্রষ্ট জীব। (ইহুদীর মেয়ে)*
আলোচ্য নাটকে কাহিনির প্রবাহ তৈরিতে ও নাট্যগ্রন্থি উন্মোচনে উপযুক্ত দক্ষতা দেখিয়েছেন নাট্যকার। এছাড়াও অত্যন্ত আকর্ষণীয় নাট্যমুহূর্তসৃষ্টি ও নিপুণ সংলাপনির্মাণে ইহুদীর মেয়ে নাটকটি বাংলা সাহিত্যে একটি সার্থক কাব্যনাটক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলা কাব্যনাট্যের শৈল্পিক রূপায়ণে সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) অনন্যসাধারণ ও অবিকল্প নির্মাণশিল্পী। কবিতা ও কথাসাহিত্যের মতোই অনুবাদ-নাটক, বিশেষত আঞ্চলিক ভাষায় বাস্তবগন্ধী কাব্যনাটক সৃজনে তাঁর আগ্রহ ও সাফল্য ঈর্ষণীয়। তাঁর কাব্যনাটকসমূহের অবয়বে প্রতিবিম্বিত হয়েছে বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, নিজস্ব সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্য, সমকালীন আর্থ-সামাজিক-রাজনীতি আর জাতিগত অপার সম্ভাবনার প্রতিচিত্র। ফলত তাঁর কাব্যনাট্য হয়ে উঠেছে বাঙালির শক্তি-সাহস, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, সংগ্রাম- সংক্ষোভ আর উজ্জীবনের অসামান্য রূপকল্প।
সৈয়দ শামসুল হক কেবল বাংলাদেশের বহুমাত্রিক লেখকদের একজন নন, বরং সমগ্র বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণভাবে নির্ধারিত। শব্দ ও বাক্যের সুমিত প্রয়োগে, মিথ-পুরাণের যুগোপযোগী উপস্থাপনায়, ইতিহাস-ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণে এবং বাঙালি জাতিসত্তার নৃতাত্ত্বিক উৎসানুসন্ধানে তাঁর প্রয়াস ছিল নিরলস ও নিরীক্ষাধর্মী। তাঁর রচনায় আবহমান বাঙালির পরিচয় যেমন সমুদ্রাসিত হয়েছে, ঠিক তেমনি তাদের ব্যর্থতা ও গৌরবিত অর্জনগুলোও অসাধারণ ব্যঞ্জনায় ভাষারূপ পেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের এই বিরল প্রতিভা এবং অর্জন নিয়ে নাট্যব্যাক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার মন্তব্য করেছেন নিম্নরূপ :
গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-চিত্রনাট্য-গান, যেখানেই তিনি বিচরণ করেছেন, সেখানেই তাঁর সৃষ্টিশীল মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। শুরু করেছিলেন গল্প দিয়ে, সর্বাধিক পরিচিতি পেলেন কবি হিসেবে, জনপ্রিয় হলেন নাট্যকার হিসেবে। মাত্র ৩১ বছর বয়সে পেয়েছিলেন প্রথম স্বীকৃতি ছোটগল্পের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আর ২০০০ সালে পেলেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার। ১৯৮৪তেই পেয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় একুশে পদক। অগণিত পুরস্কার আর সম্মাননার চেয়ে বড়ো পুরস্কার ছিল মানুষের ভালোবাসা – যার প্রমাণ মিলেছে তাঁর শবদেহকে ঘিরে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আর কুড়িগ্রামে গুণগ্রাহী মানুষের বিপুল সমাগমে।

বস্তুত, সৈয়দ শামসুল হকের হাত ধরেই বাংলা কাব্যনাট্যের সর্বোত্তম বিকাশ ঘটেছে। বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের ইতিহাসে তাঁর অবদান প্রসঙ্গে নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার তাঁর এক লেখনীতে বলেন
৭১ পরবর্তী সময়ে সৈয়দ শামসুল হক যখন নাটক লিখতে শুরু করেন, তখন তিনি কবি ও ঔপন্যাসিক হিসেবে আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিলেতে বসে তিনি রচনা করলেন তাঁর প্রথম নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাব্যনাট্য। বিষয় বাদ দিয়েও ফর্মের দিক দিয়ে তিনি আমাদের নাট্যাঙ্গনে পথিকৃত্রে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি মনে করেন কবিতার মধ্য দিয়ে আমাদের মানুষের সাথে যোগাযোগ খুব সহজ হয়, কারণ কবিতা আমাদের মাটির কাছাকাছি। তার মত নিয়ে মতান্তর হতে পারে, কিন্তু কাব্যনাট্যকে তিনি আমাদের মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
সৈয়দ শামসুল হক মাত্র ১৬ বছর বয়সে ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত অগত্যা পত্রিকায় ‘উদয়াস্ত’ নামক গল্পরচনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর তিনি একাদিক্রমে লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংগীত। বাংলা নাট্যসাহিত্যে তিনি প্রবেশ করেছেন অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সে; চল্লিশের কোঠায় পা দিয়ে। তাঁর পরিণত শিল্পমান ও রুচির সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে কাব্যনাটকে। হয়তো এজন্যে প্রথম পর্যায়ে রচিত তাঁর অন্যান্য উপন্যাস, ছোটগল্প কিংবা কবিতার শিল্পমান নিয়ে সমালোচকগণ বিরূপ মন্তব্য করলেও কাব্যনাটক নিয়ে প্রায় সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
বস্তুত, বাংলাদেশের সাহিত্যে সাহিত্যাঙ্গিক হিসেবে নাটক বরাবরই ছিল অনেকটাই উপেক্ষিত। এ কারণে উচ্চমানসম্পন্ন শিল্পী-সাহিত্যিকগণ নাটকের প্রতি অনেকটাই অনাগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। উপরন্তু নাট্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মঞ্চের প্রয়োজনে ফরমায়েশি নাটক রচনার দায়িত্ব পালন করায় নাটক হারিয়ে ফেলেছে তার শিল্পগুণ। এসময়ে বাংলাদেশের নাটককে শিল্পগুণমানসমৃদ্ধ সাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সৈয়দ শামসুল হক পালন করেছেন অগ্রগণ্য ভূমিকা।
মূলত, সমগ্র কাব্যনাট্যের ইতিহাস বিচারে বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক লেখকই কাব্যনাটক রচনা করেছেন। কিন্তু যাঁরাই লিখেছেন তাঁদের রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য, সামাজিক রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক নানান ঘটনা পরম্পরা ; যার মধ্যদিয়ে সুস্পষ্ট হয়েছে গণচেতনার স্বরূপ। আর সৈয়দ শামসুল হক এ ধারায় প্রধান ব্যক্তিত্ব। নাটক রচনা সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হকের নিজস্ব ভাবনা ছিলো নিম্নরূপ :
ভাষার মাধ্যমে নাটক আমার সর্বশেষের সংসার; অথচ এখন পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই নাটকের মাধ্যমে আমি তৈরী হয়ে উঠেছিলাম সেই ছোটবেলায় বালকের বিস্ময় নিয়ে লেখা ভোরের শেফালীফুল আর দেয়ালে ঝোলানো বিবর্ণ দুটি পদ্য রচনারও বহু আগে। ২
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকদিন থেকেই আমার মনে হচ্ছিল যে এই বর্তমানে বাংলা ভাষায়, খণ্ড কবিতার সব সম্ভাবনা আপাতত আমরা আবিষ্কার করে ফেলেছি, এখন একে কিছুদিনের জন্য পাশে রেখে অন্যদিকে মুখ ফেরানো প্রয়োজন – হতে পারে মহাকাব্য, কথাকাব্য কিংবা কাব্যনাট্য।”
কাব্যনাট্য সৃজনের পশ্চাতে উদ্দীপক হিসেবে অনেক সমালোচক-বোদ্ধা বিবিসির চাকুরিসসূত্রে তাঁর দীর্ঘ লন্ডনবাসী জীবন, লন্ডনের নাট্যমঞ্চে সরাসরি বিভিন্ন নিরীক্ষামূলক মঞ্চনাটক প্রত্যক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা, এবং সেইসূত্রে উইলিয়াম শেকস্পিয়র, টি এস এলিয়ট প্রমুখ পাশ্চাত্য নাট্যব্যক্তিত্বের রচনার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন।
সৈয়দ শামসুল হককে হয়তো শেকসপিয়রের নাটকের বিষয়াবলি উদ্দীপ্ত করেছে, আবার তাত্ত্বিক দিক দিয়ে হয়তো তিনি এলিয়টের অনুসারী, কিন্তু বিষয় নির্বাচনে তিনি সাগ্রহে বেছে নিয়েছেন এদেশের মাটি- মানুষ, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাবলিকে।
কেননা, তিনি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন কাব্যনাট্যের বীজ অনেক পূর্বথেকেই এদেশের সাহিত্যের মজ্জায় গ্রন্থিত ছিলো; তা মধ্যযুগের গীতিকাব্যেই হোক, , কিংবা শ্রমজীবী মানুষের মুখের গাঁথা অথবা ছড়ায় হোক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
আমাদের মাটির নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য এবং সংগীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়; আরো লক্ষ্য করি, আমাদের শ্রমজীবী মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে এক ধরনের কবিতাশ্রয়ী উপমা, চিত্রকল্প, রূপকল্প উচ্চারণ করা […] ময়মনসিংহ গীতিকা, যা বহুদিন থেকেই আমি নাটকের পাণ্ডুলিপি বলে সনাক্ত করে এসেছি।
সৈয়দ শামসুল হক নিজেই বিভিন্ন রচনায় ও সাক্ষাৎকারে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বেশকিছু কাব্যনাটকের বিষয় নির্বাচনে শেকসপিয়র তাঁকে অলক্ষ্যে প্রভাবিত করেছেন, কিন্তু তাঁর কাব্যনাটক রচনার ভাবনা কাব্যনাটকের জনক টি এস এলিয়টের প্রভাবজাত। এক লেখনীতে তিনি এ প্রসঙ্গে নিম্নরূপ মন্তব্য করেছেন :
কাব্যনাট্যই শেষ পর্যন্ত আমার করোটিতে জয়ী হয়; টি. এস. এলিয়টের কাব্যনাট্যভাবনা আমাকে ক্রয় করে; […] একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পঠিত ধ্রুপদী গ্রীক নাটক আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে; শেকস্পীয়র, যাঁর নাটকের কথা বাবা অক্লান্তভাবে বলে যেতেন একদা, আমাকে এক তীব্র আলোকসম্পাতের ভেতর দাঁড় করিয়ে রাখে; এই অবস্থায় আমি, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, বিদেশ থেকে ছুটিতে দেশে ফিরে, ঢাকার প্রবল নাট্যতরঙ্গে ভেসে যাই এবং ফিরে গিয়ে রচনা করি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ – এক সংকীর্ণ ঘরে, টেবিলের অভাবে দেয়ালে পা ঠেকিয়ে হাঁটুর ওপর খাতা রেখে, অফিস যাতায়াতের পথে পাতাল রেলে মনে মনে; এই রচনাটি শেষ করে উঠবার পরে মনে হয়, দীর্ঘদিন থেকে এরই জন্যে তো আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম।’
বস্তুত আধুনিক বিশ্বকাব্যসাহিত্যে, বিশেষত কাব্যনাট্যসাহিত্যে ইংরেজ কবি টি এস এলিয়টের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, ব্যাপক ও বিস্তৃত। সমকালে তো বটেই, পরবর্তী শতকগুলোতেও বিশ্বের অনেক দেশের স্বনামখ্যাত কবিদের কবিতায় এলিয়টের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমেরিকার বিখ্যাত The Washington পত্রিকার একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদনে ইয়োরোপীয় সাহিত্যে এলিয়টের ব্যাপক বিস্তৃত এই প্রভাব সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্তব্য করা হয়
Eliot is not only a perfect English poet. He is at the same time poet whose voice had become the voice of Europe in the heart of its past.
‘আধুনিক কাব্যচিন্তা ও এর বিকাশে এলিয়টের প্রভাব এতোটা সূক্ষ্ম, সাবলীল; এতোটা ব্যাপক ও গভীর যে তাঁকে বাদ দিয়ে এ সম্বন্ধে কোনো আলোচনাই অর্থবহ হয় না।” কাব্যনাট্য রচনায় শামসুল হক এলিয়টের অনুসারী হলেও তাঁর নাটকে নিজস্ব কণ্ঠস্বর অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বরং এলিয়টের কাব্যনাট্যভাবনার তুলনায় অনেকক্ষেত্রে তিনি স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। দু-একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এলিয়ট কবিতার ভাষাকে যখন নাটকের সংলাপে ব্যবহার করবেন বলে ভেবেছেন, তখন থেকেই তিনি নানান আঙ্গিকের রচনায় কবিতার ভাষা প্রয়োগ করেছেন। এমনকি দ্য রক (১৯৩৪) নামক একটি খণ্ডনাটক রচনা করে তিনি এতদ্বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
আবার, এলিয়টের অধিকাংশ কাব্যনাট্যের বিষয় পুরাণাশ্রিত কিংবা ধর্মীয় অনুষঙ্গে সমৃদ্ধ। সৈয়দ শামসুল হক এসবের ধারেকাছেও বিচরণ করেননি। তিনি কোনো স্বল্পাঙ্গিকে পরীক্ষা নিরীক্ষা না চালিয়ে কবিতার ভাষাকে ব্যবহার করে সরাসরি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্য রচনা করেন। এর বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন বাঙালির মুক্তির গৌরবময় বাস্তব ইতিহাসকে।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে দেশাত্মবোধ, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে। তিনি অবশ্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, কেননা ১৯৭১-৭২ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগে অনুষ্ঠান প্রযোজক ও সংবাদ পাঠক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু দেশপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ ছিল তাঁর সহজাত প্রবণতা।
ভাষা আন্দোলনসৃষ্ট বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তিনি লালন করেছেন তাঁর অন্তসত্তায়। তিনি হয়তো রণাঙ্গণের যোদ্ধা ছিলেন না, কিন্তু কলমকে হাতিয়ার বানিয়ে নিয়ত যুদ্ধ করেছেন প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, এবং প্রয়াস পেয়েছেন বাঙালিচিত্তে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা স্ফুরণের।
১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনে তাঁর ভাষা আন্দোলনবিষয়ক কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ তাস-এর একটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘সম্রাট’; যেটি রচিত হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাকপর্যায়ে বিশেষত ৬৯ ও ৭০-এর উত্তেজনামুখর সময়খণ্ডে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলা একাডেমির অমর একুশে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে।
১৯৭১-এর ২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাতের পূর্বেই দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রতিবাদী কবিতা পহেলা মার্চ ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিবিসি বেতারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংবাদ পাঠ করে এবং বিদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমতগঠনে ভূমিকা নিয়েছেন তিনি; এমনকি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিবিসি রেডিও থেকে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার খবরটি তিনিই পাঠ করেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নবগঠিত বাংলাদেশের শিল্পসংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দিতে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯২-এ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে রাজাকারদের বিচারের দাবিতে গঠিত ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার বিচারে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাতেই ঘটেছে তাঁর স্পর্ধিত বিচরণ। প্রায় একাশি বৎসরের আয়ুষ্কালে কবিতা- উপন্যাস-নাটক-ছোটগল্প-প্রবন্ধ ও জীবনীগ্রন্থ মিলিয়ে প্রায় শ-খানেক গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। এগুলোর মধ্যে ৩৫টি উপন্যাস, ২০টি কাব্যগ্রন্থ এবং মৌলিক ও অনুবাদ নাটক মিলিয়ে ১৪টির মতো নাটক রয়েছে।
তাঁর কাব্যনাটকের সংখ্যা ১০টি পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৫), গণনায়ক (১৯৭৬), এখানে এখন (১৯৮১), নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২), ঈর্ষা (১৯৯০), নারীগণ (২০০৫), চম্পাবতী (২০০৮), অপেক্ষমাণ (২০০৯), উত্তরবংশ (২০০৮), মরা ময়ূর (২০১৪)। এসব কাব্যনাট্যে উৎকীর্ণ হয়েছে তাঁর সৃজনী প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। এগুলো তিনি জীবিতাবস্থায় সম্পাদনা করে একই গ্রন্থভুক্ত করে প্রকাশ করেছিলেন।
গ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন সৈয়দ শামসুল হক : কাব্যনাট্যসমগ্র। প্রকাশক : চারুলিপি প্রকাশনী, ঢাকা; প্রথম প্রকাশ : একুশে বইমেলা ২০১৬।
সৈয়দ শামসুল হকের সমকালে যেসব কবি-নাট্যকার কাব্যনাটক রচনায় মনোনিবেশ করেছেন তাঁদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০), আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫), সাজেদুল আউয়াল (জ. ১৯৫৮), রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১) বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। যদিও সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যের সংখ্যার তুলনায় এদেঁর রচনা সংখ্যাগত দিক দিয়ে সীমিত, তদুপরি শিল্পমানবিচারে একেবারে অনুল্লেখ্য নয়।
কবিতা নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়েই কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) কাব্যনাটক রচনায় উৎসাহবোধ করেন। বস্তুত ‘আমরা আব্দুল মান্নান সৈয়দকে সৈয়দ হকের প্রতিদ্বন্দ্বী কাব্যনাট্যকার হিসেবে দাঁড় করাতে চাই না। তবে মান্নান সৈয়দকে কাব্যনাট্যকার হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়োজন বোধ করি।” তিনি বিশ্বাসের তরু (১৯৬৯), জ্যোৎস্না-রোদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯), ঢাকা (১৯৮৫), কবি ও অন্যেরা (১৯৯৬), আটতলার ওপরে (১৯৯৭) প্রভৃতি কাব্যনাটক রচনা করেছেন।
ষাটের দশকের অনন্য কবিপ্রতিভা আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫) ওরা কয়েকজন (১৯৭৫) নামক একটি কাব্যনাটক রচনা করেছেন। ওরা কয়েক জন কাব্যনাট্যের স্থান একটি জনবহুল রেলস্টেশনের ওয়েটিং রুম। আর এখানে অপেক্ষারত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষই এ নাটকের চরিত্র। মূলত এসব চরিত্রের মনোকথন, অন্তর্গত সত্তার রহস্য উন্মোচন লেখকের মৌল উদ্দেশ্য। সে-বিচারে এটি কাব্যনাটকের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করলেও এতে উল্লেখযোগ্য নাট্যদ্বন্দ্ব তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছেন হাসান। তবুও আবুল হাসানের ওরা কয়েকজন কাব্যনাটক বাংলাদেশের কাব্যনাটকের ধারায় অনন্য সংযোজন ।
অপরদিকে, কবি-নাট্যকর্মী সাজেদুল আউয়াল ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিতাস পারের মালোসম্পদ্রায়ের কর্মবৈচিত্র্যময় জীবন, সুখ-দুঃখ-হাসিকান্নার নির্মম বাস্তবতাকে উপজীব্য করে রচনা করেছেন তাঁর কাব্যনাটক ফণিমনসা (১৯৮৫)। সাজেদুল আউয়াল নিজে ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের সক্রিয় নাট্যকর্মী। একারণে অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে এই কাব্যনাটকের ক্যানভাসে বাংলার চিরাচরিত ইতিহাস, ঐতিহ্যকে অনায়াসেই ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন ।
স্বল্পায়ু তরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কাব্যনাট্য বিষ বিরিক্ষের বীজ (১৯৯২)। এর বিষয়বস্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তরকাল। স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আক্কেল মোড়লের যাপিত জীবনাচরণের মাধ্যমে রুদ্র সমকালীনবাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজবাস্তবতার এক নির্মম ছবি এ-নাটকে অঙ্কন করেছেন। গণআদালত পর্ব, বীরাঙ্গনা পর্ব, শুঁড়িখানা পর্ব, অস্ত্রসমর্পণ পর্ব, ক্যাম্প পর্ব, গর্ভপাত পর্ব ও ক্ষমা পর্ব – এই সাতটি পর্বের মাধ্যমে উপস্থাপিত এ-কাব্যনাট্যে কবি ও নাট্যকার হিসেবে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নিজের আলোকিত একটি অবস্থান তৈরিতে যে সক্ষম হয়েছেন একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের ইতিহাস কালধর্মের বিচারে দীর্ঘ নয়। ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যেমন জন্ম, এদেশের সত্যিকার নাটকের জন্মও স্বাধীন বাংলাদেশে। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের নবযুগ সূচিত হলো।” অতঃপর প্রতিভাবান কবি-নাট্যকারদের মিলিত প্রয়াসে রচিত হতে শুরু করল বিচিত্র বিষয়বাহিত কাব্যনাট্য। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের কাব্যনাট্যের ধারায় পথিকৃতের মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব সৈয়দ শামসুল হক।