উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু। যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা শ্রেয়ের সন্ধান এর অন্তর্গত।

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

মানুষ এবং বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে আঠারো শতকে লন্ডনে উপন্যাস নামে এক অভিনব সাহিত্যধারার সূত্রপাত। ডানিয়েল ডিফো (১৬৬১-১৭৩১), স্যামুয়েল রিচার্ডসন (১৬৮৯-১৭৬১), হেনরি ফিল্ডিং (১৭০৭-১৭৫৪) প্রমুখ সাহিত্যিকদের হাতে দেবদেবীর আখ্যান বর্ণনার পরিবর্তে স্থান পেল বাস্তব সম্মত নিত্যদিনের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষের অখণ্ড চরিত্রের জীবনপ্রণালী। রণেশ দাশগুপ্ত, ‘উপন্যাসের শিল্পরূপ’ গ্রন্থে বলেন :

সংলাপ এবং ঘটনা বর্ণনার এক অভূতপূর্ব নবগুণাত্মক সমৃদ্ধ সমাবেশে রচিত সাহিত্য-শিল্পরূপ যে উপন্যাস, তার মৌলিক অবয়ব বেরিয়ে এসেছিল সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে। বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারে স্পষ্টতর হয়ে ওঠা জগৎ ও মানবজীবন এবং শিল্প-বিপ্লবের প্রাথমিক যন্ত্রপুরীর ছাঁচের পণ্যোৎপাদক চুল্লী মধ্যযুগীয় রূপকথা, কিংবদন্তী, উপাখ্যান ও কেচ্ছার একক জবানবন্দীর ধারাকে বহুজনের জবানবন্দীর ধারায় পরিণত করে কিংবা একক জবানবন্দীতে বহুজনের সংলাপ আরোপ করে তাকে বহুকণ্ঠী করে পৌঁছে দিয়েছিল উপন্যাসে।১

উপন্যাস পুরোপুরি বাস্তব নয়। কল্পনাশক্তির বিন্যাসে বাস্তবের নির্মাণ। মানুষের জীবন সৃষ্টি, চরিত্র চিত্রণ এবং ঘটনার রূপায়ণই উপন্যাসের উদ্দেশ্য। এতে মানুষের বাস্তব জীবন প্রতিষ্ঠা পাওয়ায় দেবদেবীর বর্ণনা হয়ে গেল অনুপস্থিত। বাংলা উপন্যাসের ধারা গ্রন্থে অচ্যুত গোস্বামী বলেন :

উপন্যাসে প্লট এবং চরিত্র স্বাধীনও নয়, প্রধানও নয়। এদের নিয়ন্ত্রিত করে উপন্যাসের থীম এবং লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী বা জীবনদর্শন বা জীবনাভিজ্ঞতা। এই থীম এবং দৃষ্টিভঙ্গির পথ ধরে আমরা লেখকের বিশিষ্ট শিল্প ভাবনায় পৌঁছুতে পারি । ২

ইউরোপের ফ্রান্সে উনিশ শতকে বাস্তবতাবাদী আন্দোলনে কিছু সংখ্যক লেখক অংশ নেন। এই শতকের প্রথমভাগে স্তাঁদাল ( ১৭৮৩-১৮৪২) ও বালজাক (১৭৯৯-১৮৫০ ) বাস্তববাদী জীবন দৃষ্টি সম্পন্ন উপন্যাসের সূচনা করেন। ব্যক্তিস্বরূপকে জানার অদম্য ইচ্ছা থেকেই জীবনাগ্রহের আবিষ্কার। তাই সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে:

উপন্যাস তখনই শিল্পকলাগতভাবে মধ্যযুগীয় উপাখ্যান এবং কিংবদন্তী কিংবা নাটক অথবা মহাকাব্য থেকে একটা পৃথক সত্তা নিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বেরিয়ে এল, যখন এর তিনটি উপাদান অজস্রভাষিতার মাধমে একটি চিরায়তিক শিল্পরূপ গড়ার আয়োজন সম্পন্ন করলো। এই তিনটি উপাদানের একটি বিস্তৃত বাস্তব দ্বিতীয়টি মানবমানবীয় দ্বিতীয়জন অথবা বহুজন সম্পর্কসম্পন্ন সুদূর প্রসারী ব্যক্তিকতা; তৃতীয়টি লোকগদ্যের ভাণ্ডার থেকে মানব-মানবীর অভিব্যক্তির যাবতীয় ভাষা বের করে আনা ।

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

মানুষের আনন্দ-বেদনা, হাসিকান্না, তার নিত্যদিনের জীবন মগ্নতাকে নিয়েই উপন্যাস শিল্প সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। মানুষের মুখের ভাষা দিয়ে মানুষ হলো মানুষের নিতান্ত আপনজন । প্রতিদিনের পরিচিত দেখা মানুষ শিল্পীর কলমে হয়ে উঠলে শাশ্বত মানবতার প্রতিমূর্তি।

কীটস সুন্দরের উপাসক ছিলেন এবং সুন্দরকে সত্যের সঙ্গে এক করে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই সমীকরণে আস্থা রাখার জন্যে তিনি প্রয়োজন বোধ করলেন সত্যের অর্থাৎ বাস্তব সত্তার সীমানাকে চারদিক থেকে গুটিয়ে ফেলার তাঁর সৌন্দর্যের ধ্যানমূর্তিকে খণ্ডিত করতে পারে এমন বাড়তীয় তথ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেবার। রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিকতা ছিলো ভিন্ন ছাঁচে ঢালাই করা। তিনি কিছুই বাদ দিতে চান নি দৃষ্টিকে সংকুচিত নয়, সম্প্রসারিত করতেই ছিলেন উদ্যোগী ।

সুন্দর হচ্ছে জীবন্ত এক ধরণের অনুভূতি। নীতি, আদর্শ, কল্যাণ, ও ন্যায়ের মতো কোন সুন্দরই ক্ষুদ্র সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার মতো নয়। সৌন্দর্য পিপাসা বৃহৎ এক শিল্পবোধ। প্লেটোর দার্শনিক সংস্কারের তুলনায় এরিষ্টটলের দার্শনিক সংস্কারের পার্থক্য তাঁর শিল্প চিন্তাকেও স্বকীয়তামণ্ডিত করেছে।

প্রথমত: বিশেষ নিরপেক্ষ সামান্যকে পারমার্থিক সত্য বলে এবং শিল্পকে নিছক বিশেষের অভিব্যক্তি বলে ধারণা করায়, প্লেটো যেখানে শিল্পের জগৎকে মিথ্যার জগৎ ব’লে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন, সেখানে এরিষ্টটল বিশেষাশ্রয়ে সামান্যের অভিব্যক্তি সম্ভব বলে স্বীকার করায় শিল্পকে ইতিহাসের চেয়েও অধিকভর দর্শনধর্মী বলে মনে করেছেন … এরিষ্টটল সেখানে আবেগ জনকতাকে চিত্তশুদ্ধির অন্যতম উপায় হিসাবে গণ্য করে শিল্পকলার সামাজিক উপযোগিতা প্রতিপাদন করেছেন। দেখিয়েছেন শিল্প আবেগ উদ্ভিক্ত করে আমাদের নৈতিক মান অবনত করে না, আবেগ পরিশোধনের ভিতর দিয়ে নৈতিকমান উন্নতই করে।

দর্শনবোধ মানুষের বোধীয় শক্তিকে করেছে অনেক দৃঢ়। দর্শনতত্ত্ব ছাড়া সামান্যের মাঝে অসামান্যকে অবলোকন সম্ভব নয়। সৌন্দর্যকে নৈতিক বিচারের মানদণ্ডে উপস্থাপন না করে উপায় ছিলনা। Shaftesbury, Hutcheson, Herbert, Ruskin প্রমুখ নীতিবিদগণ সৌন্দর্য-চেতনার উপাসক ছিলেন। Shattesbury বলেন:

যাহা সুন্দর তাহা হইল সুসঙ্গত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ, যাহা সুসঙ্গত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ তাহা হইল সত্য এবং যাহা সুন্দর ও সত্য তাহা হইল মনোরম ও ভাল । ৬

সৌন্দর্য সুসমতা ও সামঞ্জস্যের উপর নির্ভর করে বিস্তার লাভ করে। আদর্শ ও নৈতিক চেতনা ছাড়া যেমন মানবকল্যাণ সম্ভব নয়, তেমনি অনুভূতির বিবেচনা ছাড়া সুন্দর ভাল ও সত্য প্রকাশ সম্ভব নয়। শ্রেয়োবাদী ও কল্যাণকামী মানুষ নিজের অর্ন্তলোকের সাহায্যে সব কিছুকেই কৰ্তব্য, উচিত, বলে উপলব্ধি করেন। দুঃখ, কুৎসিত, কদর্য ইত্যাদি তুচ্ছতা তাদেরকে স্পর্শ করে না।

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

শাস্ত্রমানা ধার্মিকদের মধ্যে অনেকের ধ্রুব বিশ্বাস যে ঈশ্বর যখন মঙ্গলময় এবং অনন্ত শক্তিমান তখন তাঁর সৃষ্ট জগৎ সৃষ্টির প্রথম থেকেই পরিপূর্ণ ও উৎকৃষ্ট। দোষ-ত্রুটির লেশমাত্র তাকে স্পর্শ করেনি। কোথাও কোন দোষ যদি আমাদের চোখে পড়ে তবে সেটা আমাদের চোখেরই দোষ। যাঁরা দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছেন তাঁরা সর্বত্রই কেবল মঙ্গল আর আনন্দই দেখতে পান।৭

সাহিত্যনীতি যতক্ষণ পর্যন্ত শ্রেয়ো ও সুন্দরের কাছে না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাহিত্যের মহত্ত্ব ও শিল্পাদর্শ স্ফুরণ লাভ করবে না। সাধনকুমার ভট্টাচার্য ‘এরিস্টটলের পোয়েটিক্স ও সাহিত্যতত্ত্ব’ গ্রন্থে বলেন:

আদর্শরীতি হচ্ছে তাই যা খুব স্পষ্ট অথচ হেয় নয়। স্পষ্ট রীতিতে শুধু প্রচলিত বা সুষ্ঠু শব্দ প্রযুক্ত হয়; এ রীতি হেয় হয়েও যেতে পারে। অন্যপক্ষে সেই রচনাশৈলী ও গুণাগুণ সম্পন্ন এবং সাধারণের বোধশক্তির ঊর্দ্ধে, যাতে অপ্রচলিত শব্দ ও বোধের প্রয়োগ থাকে।

ঔপন্যাসিকের উদ্দেশ্য জীবনের সার্বিক সমস্যা সংক্রান্ত অনুভূতির চরিত্র চিত্রণ ও লেখকের দর্শন প্রকাশক্ষম অভিব্যক্তি। জীবন সৃষ্টির অভিলক্ষে একটি মাত্র বিশিষ্ট দিককে বেছে নিলেই উপন্যাস শিল্প পরিপূর্ণ হয়ে উঠে না। সাধারণের প্রচলিত মুখের ভাষা, স্বাভাবিক বাগভঙ্গি থেকেই শিল্পশৈলী সার্বজনিনতা লাভ করবে। অপ্রচলিত ভাষাভঙ্গি দিয়ে সাহিত্য মানুষের কাছাকাছি আসতে পারেনা বরং তা হয়ে যায় দুর্বোধ্য। শিল্প সৃষ্টির জন্য ঔপন্যাসিককে কয়েকটি নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন, সৈয়দ আকরম হোসেনের মতেঃ

গল্পাংশ, চরিত্র, বর্ণনা, সংলাপ ইত্যাদি উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বিচ্ছিন্নভাবে তাদের কোন গুরুত্ব নেই, যতক্ষণ-না-তা কোন ব্যক্তিত্ব কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পক্ষান্তরে কেবলমাত্র, জীবনদৃষ্টি দিয়েও উপন্যাস সৃষ্টি হতে পারে না। বস্তুত, লেখকের পুরুষার্থ; জীবনদর্শন উপন্যাসের গঠনশৈলী অর্থাৎ গল্পাংশ, চরিত্র, বর্ণনা, সংলাপ, পরিবেশ ইত্যাদির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়, একটি থেকে আর একটির পৃথকীকরণ সম্ভবপর নয়।

শিল্পাত্মক রূপ দিতে গিয়ে জীবনদর্শন ও জীবনানুভূতির বর্ণনায় শ্রীশচন্দ্র দাশ বলেন: “উপন্যাসে ঘটনাই মুখ্য, চরিত্র সৃষ্টি গৌণ।” আবার কেউ কেউ উপন্যাসে কয়েকটি বিশেষ চরিত্রকে ঘটনা-সংঘাতে জীবন্ত করে তোলেন, অথবা চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণের সাহায্যে তাদের ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রদান করেন। তিনি বলেন :

আমাদের মনে হয়, ঘটনা ও চরিত্র সৃষ্টি পরস্পর নিরপেক্ষ নহে- একটি অপরটির সাথে অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। চরিত্রই ঊর্ণনাভের মত আপনার চারিদিকে ঘটনার জাল বুনিয়া ঘটনা প্রবাহ সৃষ্টি করে এবং ঘটনাই আবার চরিত্র সৃষ্টিতে সাহায্য করে। ১০

সৃজনশীল বিষয়বস্তু ব্যতীরেকে উপন্যাসের শিল্পশৈলী সুসংগঠিত হতে পারে না। ঘটনা, চরিত্র, সংলাপ বিশেষ করে বিষয়বস্তুর যুগচিত্ত অংকনই গদ্য মাধমে উপন্যাসের সামগ্রী। উপন্যাসের যুগারম্ভ হয় শিল্পরূপের বিচারে। অচ্যুত গোস্বামীর মতে :

উপন্যাস আদি-অন্ত সম্পন্ন একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ জগৎ। উপন্যাস একটি কাল্পনিক প্যাটার্ন, যার মধ্যে লেখকের বাস্তব সম্পর্কিত ভাবনা বা সম্ভাব্য সত্য চিন্তা বিধৃত হয়। উপন্যাস আর বাস্তবের এই পার্থক্য দেখে অনেকে মনে করেন উপন্যাসের বিষয়বস্তু একটি বিশিষ্ট শিল্পরূপ। কিন্তু মুশকিল এই যে উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে বাদ দিয়ে রূপকে পাওয়া যায় না। আবার রূপকে বাদ দিয়ে বিষয়বস্তুকে পাওয়া যায় না।

উপন্যাসের শিল্পরূপ সমাজ সভ্যতার সাথে রূপান্তরিত ও পরিবর্তিত হয়। আর শিল্পের বিষয়বস্তুও ব্যক্তি পরিবেশ এবং সভ্যতার সাথে জড়িত। কোন লেখকই তার লেখার বিষয়ের জন্য সমাজ পরিমণ্ডলের বাইরে যান না। রণেশদাশগুপ্ত বলেন:

যে বিশেষ তিনটি কারণে যে কোন যুগে যে কোন শিল্পরূপে পরিবর্তন আসতে বাধ্য। এবং সমাজ বিপ্লবের প্রেরণার সঙ্গে সঙ্গেই সাধারণত শিল্পরূপের ক্ষেত্রে যে তিনটি তাগিদ পুরাতনকে ভেঙ্গে নতুনের পত্তন করে, সেই প্রযোজকগুলি উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীতেও সক্রিয়। এই তিনটি প্রযোজকের প্রথমটি হচ্ছে এই যে, সৃজনশীল শিল্পী প্রচলিতের পুনরাবৃত্তি করে চলতে পারেন না। দ্বিতয়িটি হচ্ছে এই যে, পাঠক পাঠিকাদের সংখ্যাগত এবং গুণগত চাহিদা শিল্পী গ্রহীতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন দিগ্বলয় সৃষ্টি করে শিল্পরূপের প্রচলিত বলয়গুলিকে ভেঙ্গে দেয়। তৃতীয়টি হচ্ছে এই যে, নতুন বিষয়বস্তু চায় নতুন প্রকাশভঙ্গী। ১২

বাস্তব মানব প্রকৃত জীবনাখ্যান ও তার আদ্যোপান্তই উপন্যাসের ব্যাপ্তি।

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

বাস্তব জীবনের বিচ্ছিন্ন, অকিঞ্চিৎকর ও খণ্ড ঘটনাগুলি, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, সহজ-স্বাভাবিক বর্ণনাভঙ্গি, প্রতিদিনের হাসি কান্না, সুখ-দুঃখ, উপলব্ধি ও উপভোগের রস সামগ্রীতেই উপন্যাস শিল্পরূপের দাবি করতে পারে। কিন্তু খণ্ডচিত্রের সমন্বিত ঘটনাবলীর সাথে জীবনের সমস্যা সৃষ্টির প্রাধান্য তৈরীতে লেখকের আধুনিক উপন্যাসের ভূমিকা। বাস্তবতা নির্ভর যৌক্তিক বুদ্ধির বিকাশই আধুনিক উপন্যাসে পরিলক্ষিত হয়েছে। মধ্যযুগীয় কোন কাহিনীতে সমস্যার অস্তিত্ব নেই, তবে মহাকাব্যে কিছু কিছু নৈতিক সমস্যার সাক্ষাৎ মেলে। আধুনিক উপন্যাসে নৈতিক, রাজনৈতিক, সমাজিক, আত্মিক নানা সমস্যা প্রাধান্য লাভ করেছে। ১০

সমাজ ও বাস্তব জীবনের নীতি-দুর্নীতি সত্য মিথ্যার উপভোগ্য কাহিনীই উপন্যাসে মানবমনের প্রতিবিম্বকে প্রকাশ করে। মহাকাব্য থেকেই রোমান্স যা আমদের বিস্ময়ান্বিত করতে চায় তার উদ্ভব। এ কথার প্রমাণ স্বরূপ বলা চলে যে, আরব্যকাহিনীর সিন্দবাদ নাবিকের সমুদ্রযাত্রার মধ্যে অডিসি-র ইউলিসিসের অ্যাডভেঞ্চারের বেশ কিছু উপাদান রয়েছে।

অথচ, এপিক থেকে রোমান্সে বিবর্তনের বিষয়টি ইংরেজ ঔপন্যাসিক স্মেন্টে (Smollett tobias george 1721-71) অন্যভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। তাঁর অভিমতের সারাংশ হল, মহাকবির কল্পনামহিমা যখন ‘আঁধার যুগে’ হারিয়ে গেল, তখন রোমান্স লেখকেরা উদ্ভাবন দক্ষতাকে আশ্রয় করলেন।

‘লেটার্স অন শিভালরি অ্যান্ড রোমান্স’ (১৭৬২) গ্রন্থে দশম পত্রে হার্ড যা বলেন, তার তাৎপর্য হল অবিশ্বাস্য বিষয় আমাদের অভিভূত করতে পারে না। সুতরাং বিশ্বাস্য হবার জন্য বাস্তবকে যথার্থ বর্ণনা করতে হবে। ১৪

অষ্টাদশ শতাব্দীতে সাহিত্যশিল্পে, রাজনৈতিক-দার্শনিক মানবতাবাদের উদ্দীপনায় নৈতিক, মানসিক ও ধর্মীয়বিশ্বাস উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল জীবনাগ্রহের তাগিদে। এ যুগের প্রধান ঔপন্যাসিকবৃন্দ যথা ডিফো ফিল্ডিং; রিচার্ডসন এবং স্মোলেট সকলেই তাঁদের উপন্যাসের জীবন জীবনেরই মতো প্রতীয়মান করানোর জন্য বেশি তৎপর ছিলেন। স্বভাবতই স্বকালীন মর্মবাণীতে এঁরাও বিশ্বাসী ছিলেন দৃঢ়ভাবে। সে মর্মবাণী হল :

Follow nature অথবা Portray the world as you see it যে বিশ্বসংসার দর্শন করেছো তাকেই রূপায়িত করো। একে অনুসরণ করে Restoration comedy জীবনের প্রতি বিশ্বস্ত ছিল। দুই যুগের উপন্যাসে Restoration comedy -র প্রভাব প্রকৃতপক্ষে জীবনকে যা দেখেছো, সেভাবেই চিত্রিত করো এ বাণীরই অনুসরণ মাত্র। ১৫

আঠার শতকে উপন্যাসের বিষয় ছিল রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি, ঈশ্বর, ধর্ম ও দেবদেবীর অনুসন্ধান। কিন্তু উনিশ শতকের উপন্যাসে সেই জীবনাকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে দেখা দিল ভাববাদী কাল্পনিক বিকাশের মনোভাব। বাস্তব জীবনের অসম্পূর্ণতা থেকে রোমান্টিকতার জন্ম।

ঊনবিংশ শতাব্দী জীবন বোধের ঐ দুঃসাহসিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। জীবনের সঙ্গে উপন্যাসের শিল্পরূপের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ বলে জীবনের স্রোত শুকিয়ে যাবার মুখোমুখি হলে, অথবা জীবনের ভারসাম্যে কিঞ্চিৎ ব্যত্যয় ঘটলে জীবন-স্পর্শপ্রবণ উপন্যাসশিল্পে তার প্রভাব অনুভূত হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে ইংলন্ডের উপন্যাস-সাহিত্য সে জাতীয় প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হল। বাণিজ্যপন্থী ভদ্রলোক এবং আত্মসচেতন ভূস্বামী অভিজাতের সুবর্ণ দিবস ততক্ষণে গত হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের প্রচণ্ড তাড়নায় এক অতিশক্তিধর শিল্পপ্রভূশ্রেণীর আবির্ভাব ঘটল । ১৬

বিশ্বের সমাজ এবং সভ্যতা স্বর্বস্তরে সর্বাবস্থায় মানবহৃদয়ের অনুপ্রেরণা দানে সহজ সত্যকে গ্রহণ করেছে। উনিশ শতক অপূর্ণতার কাল এই অপবাদ ঘুচালেন, এ সময়ের আদর্শ শৈল্পিক পুরুষ বাল্‌জাক, তাঁদাল, লিও টলস্টয় প্রমুখ বাস্তবতাবাদের মানবিক গুণাবলি সম্বলিত শিল্পরূপ লিও টলস্টয়কে প্রভাবিত করেছিল।

একটা শিল্পরূপ যে শিল্পীর উপর কতবেশী প্রভাব বিস্তার করতে পারে, লিও টলস্টয়ের উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়ে সে কথা বুঝতে পারা যায়। ১৭

বিংশ শতাব্দী মানুষকে পরীক্ষামূলক অন্তর্মুখিতার দিকে নিক্ষেপ করেছিল। এ সময়ে বুদ্ধির প্রখরতা, মননধর্মীতা, মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা প্রধান ভূমিকায় অগ্রসর হল। আমাদের বাংলাদেশে উপন্যাসের আবির্ভাব বিদেশের উপন্যাসের সমসাময়িক নয়। প্রায় শতবর্ষ পর থেকে উপন্যাসের সৃষ্টি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে

‘বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস খুব দীর্ঘকালের না হলেও সামাজিক ইতিহাসের দলিল রূপে বাংলা উপন্যাসকে ব্যবহার করার প্রবণতা একেবারে সাম্প্রতিক নয়। বাংলা উপন্যাসের আবির্ভাব কাল থেকে সমাজের যে চিত্র এতে ধরা পড়েছে, অনেক সময় সে সবের মূল্য উপন্যাসের শিল্পমূল্যের চেয়ে অধিক বলে বিবেচিত হয়েছে। ১৮

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

১৮১৭ খ্রীঃ হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভের পর বাঙালি সমাজে পাশ্চাত্য শিক্ষানুরাগের আলোড়ন দেখা দিল। এর আগে থেকেই রামমোহন রায় পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পুঁজি করে বাংলা ভাষায় বিপ্লবী পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষা সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল’ কাব্যে দেবতা মানুষের অধীন। উপন্যাস সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রমথনাথ শর্মার ‘নববাবু বিলাস’ এবং প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এ সময়ের বাস্তবোচিত জীবন-বিন্যাস ও সমাজের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়েছে। এবং তাতে উপন্যাস- বিষয়ানুগ উপাদানও নিহিত। পরবর্তীতে রমেশচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় তাদের অব্যবহিত পূর্বের সময় ও সমাজকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য ভাবধারার মর্মমূল বাংলা উপন্যাসের আধুনিকায়নে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

‘রবীন্দ্রনাথ ও এই অর্থে বাংলা উপন্যাসে এক নূতন ‘আধুনিক’ প্রবনতার সঞ্চার করেছেন। এখানে রবীন্দ্রনাথ জগৎ ও জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধুস্বাদী কাহিনী ও নানা রঙের চরিত্র অভনের কাজে বিশিষ্টতা অর্জন করতে উৎসুক হননি। এখানে তিনি বুদ্ধি ও মননের সাহায্যে কতকগুলি বক্তব্য বা তত্ত্বকে অনুধাবন করে সেগুলিকে সংক্ষিপ্ত কাহিনী ও ‘অসাধারণ’ কয়েকটি নর-নারীর চরিত্রের মাধমে উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন। জীবনকে মননের ও তত্ত্বচিন্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এই বিশিষ্ট ভঙ্গি কথা-সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে ‘আধুনিক’ হিসাবে নিশ্চিত প্রতিষ্ঠাদান করে।

জীবনের সমগ্রতাকে নিয়েই রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস লেখার চিন্তা-চেতনা উদ্‌গত ও প্রসার লাভ করেছে। তাঁর পূর্ববর্তী ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে দেখা যায়,

ব্যক্তির সামগ্রিক স্বরূপ রহস্যের অন্বেষণ কিংবা তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা বডিমের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। ‘সনাতন’ সমাজ ধর্ম ও প্রচলিত নৈতিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করেই বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তি চেতনার সৌধ গড়ে ওঠে। প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধ ও সমাজ কল্যাণের চেতনার সূত্রেই ব্যক্তিকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন। সমাজ চেতনা-পরিচ্ছিন্ন ব্যক্তির কথা তিনি ভাবেন নি।২০

রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরি শরৎচন্দ্র মানবহৃদয়ের রহস্যলোকে বিচরণ করেছেন। সমাজজীবনে নর নারীর যে হৃদয়বত্তার স্থান রয়ে গেছে সেখানে প্রথাপদ্ধতি আইনি নিয়মকেই দেখলে চলবেনা। তাঁর মতে সুগভীর অর্ন্ত লোকের সহজ স্বাভাবিক যে হৃদয় উৎসারণ রয়েছে তাও বিষয়বস্তুর বিচার্য। তিনি ‘বাঙালি সুলভ যে সুগভীর হৃদয়বত্ত্বার অধিকারী ছিলেন সেই প্রবল প্রগাঢ় হৃদয়ধর্ম তাঁকে এত গভীর যন্ত্রণায় পীড়িত করেছে যে তিনি তাই বলতে বাধ্য হয়েছেন,

সমাজ জিনিষটাকে আমি মানি, কিন্তু দেবতা বলে মানিনে। এই হৃদয়বান বাঙালি লেখক তাই প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার হৃদয়হীনতার প্রতিবাদ করেছেন প্রত্যক্ষ পরোক্ষ নানাভাবে। এবং এই প্রসঙ্গেই ব্যক্তি মানুষের স্বাতন্ত্র্য-স্পৃহা তাঁর মনে জেগেছে। ২১

উপন্যাসের সাংগাঠনিক দিক থেকে শিল্পরূপ হবে লেখকের জীবন দর্শন, অনুভূতি, সমাজ, ব্যক্তি চরিত্রে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োগের সমাবেশ। লেখকের সচেতন মানস পর্বে উপন্যাসের কাহিনী এবং চরিত্রের সংলাপ, কাল্পনিক বক্তবের রূপরেখাই উপন্যাসের সাংগঠনিক বিষয়বস্তু ।

উপন্যাসে লেখকের বক্তব্য কীভাবে রূপ নিয়েছে, বিষয় সুষ্ঠুভাবে প্রকাশ পেল কিনা, এটা জানা গঠনের বিষয়। আবার ভাষার আশ্রয়েই যাবতীয় সৃষ্টির সার্থকতা। কাজেই গঠন ও ভাষা নিয়ে উপন্যাসের আলোচনা দরকার। গঠনের ঔপন্যাসিক কৌশল এবং ভাষার বিচিত্র প্রয়োগ এই দুটিই ঔপন্যাসিকের বৈশিষ্ট্য মেলে ধরে। ….শব্দের আভিধানিক অর্থ, লেখকের বিশেষ প্রয়োগ, বাক্যের বক্রতা এ সব ছাড়িয়ে উপন্যাস কর্ম আরও কিছু জানায়।

শব্দ-বাক্য উপন্যাসের উপাদান হ’লেও কাহিনীর গঠনবৈচিত্র্য, বিশেষ উপন্যাসে বিশেষ তত্ত্ব লেখকের মানসভূমির অনেকখানি মেলে ধরে। লেখকের জীবনদর্শনই তার উপন্যাসের মূল। সেখানে ভাষা ছাড়া ও গঠন নানা রকম হতে পারে। লেখকের মনে উপন্যাসের একটা পরিকল্পনা কাজ করে বলেই অধ্যায় পরিচ্ছদ, অনুচ্ছেদ লেখক নিজস্ব রীতিতে গঠন করেন। ২২

 

উপন্যাসের শিল্পরূপ ও বিষয়বস্তু

 

মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখের অক্লান্ত অবিরাম যে কথোপকথন তাই উপন্যাসের কাহিনী। উপন্যাসের দাবি প্রতিষ্ঠা পায় তখনই যখন জীবনপোলব্ধির আকস্মিকতা, সমাজের জটিলতা মানব মনের দ্বন্দ্ব সংঘাত ও অনন্ত জিজ্ঞাসার আশ্রয়ে শিল্পমণ্ডিত হয়ে উঠে। সুতরাং

মানব মন সর্বদাই বিচিত্রমুখী। তার আকাঙ্ক্ষার যেমন শেষ নেই, তেমনি তার ব্যর্থতারও অবধি নেই। তার কামনা বাসনার যেমন শেষ নেই, তেমনি তার চরিতার্থতার পথ অন্বেষণেরও সীমা পরিসীমা নেই। মানুষ তার মনের কোন গূঢ় রহস্যের সন্ধানে সর্বদা ব্যাপৃত তা অনেক সময় বুঝা না যাবার কারণও এটাই। এ কারণে মানুষের মনের যে কোন কামনা বাসনাকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিশ্লষণ করা বাঞ্ছনীয়। এই নিরপেক্ষতা একজন শিল্পীর পক্ষে অপরিহার্য। শিল্পী যতক্ষণ বস্তুনিরপেক্ষ হতে পারেন না, ততক্ষণ তাঁর শিল্পে উৎকর্ষ অচিন্তনীয় । ২০

অতএব ঔপন্যাসিকের বক্তিজীবন দর্শনবোধ তাঁর লেখার উৎকৃষ্ট বিষয়াবলী। জীনব চেতনার বিষয় ও কর্মেই উপন্যাসের শৈল্পিক বীজ নিহিত। নর-নারীর কল্পলোকের কামনা-বাসনা পর্যায়ক্রমে বিস্তার এবং তাতে সাফল্য ও অসাফল্যের প্রবাহ রীতির রূপায়নই উপন্যাসের বিষয় ভিত্তি। আখ্যান ভাগের বর্ণনায় নর-শোর নর- নারী যে গভীর জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ তাদের চরিত্র-চিত্রনে, ভাষা-সংলাপের বিস্তৃত পরিসরে প্রকৃতি- পরিবেশের রসাস্বাদনই হচ্ছে উপন্যাসের শিল্পরূপের ও বিশ্বস্ত বিষয়বস্তুর অলংকার।

Leave a Comment