আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা । যা বাংলাদেশের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনার উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা শ্রেয়ের সন্ধান এর অন্তর্গত।

উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা
উপন্যাস সৃষ্টির প্রারম্ভে রয়েছে মানুষের সমাজ, সংঘ, জীবন, জগতের অবিরাম নৈতিক সত্যানুসন্ধান, সভ্যতার সাথে মানুষের অন্তরলোকের উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়ার অনিবার্য আলোড়িত সত্যের বিধৃত রূপ । একমাত্র উপন্যাসেই সচরাচর জীবন চিত্রণে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রকাশ পেয়েছে। শিল্পরূপের বিচার্যবোধ, নীতির প্রাধান্য ও বিচিত্র পরিবেশ উপন্যাসেই পরিচিতি লাভ করেছে। সৈয়দ আকরম হোসেন লিখেছেন :
স্রষ্ঠার জীবনসংক্রান্ত বোধ ও অভিজ্ঞতার মানসিক রূপই অখণ্ড উপন্যাসের মধ্যে প্রবাহিত হয়। সুতরাং কোন উপন্যাসের স্বরূপ বা প্যাটার্ন নির্ভরশীল স্রষ্টার জীবন-দর্শনের ওপর আমাদের বিচার্য বিষয় হলো যে লেখকের কোন উদ্দিষ্ট প্রয়াস সমগ্রতাবোধে অখণ্ডিত কিনা, চরিত্র বিকাশে কার্যকারণ সূত্র আগাগোড়া প্রয়োগ সূত্র অনুসারে রক্ষিত হয়েছে কিনা, সর্বোপরি জীবন সৃষ্টি হয়েছে কিনা যা আমাদেরকে বাস্তবানুগ সত্য বিশ্বাসে আন্দোলিত করতে পারে।
লেখার আদি অবস্থান থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পর্যন্ত নৈতিক বিষয়াবলীর মাধ্যমেই মানুষ বাস্তবকে তুলে ধরার জন্য নীতিমূলক কাহিনীকে শিক্ষার বাহন করেছেন। দার্শনিক কান্টের মতে:
যে প্রকৃত শ্রেয়োনীতি আলোক প্রাপ্ত স্বার্থান্বেষণ কিংবা সর্বজনীন প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠেয় নয়, তার মূল স্তম্ভ হ’লো প্রত্যেকের বাঁচবার সুখী হবার, নিজেকে নিজের মতো ক’রে প্রস্ফুটিত করবার অধিকার স্বীকার করা শুধু মুখে নয়, অন্তরে ও আচরণে।
অন্যের সঙ্গে দৈনন্দিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে তোমার মনে যেন এমন ভাব না থাকে যে সে তোমার কোনো ক্ষুদ্র বা বৃহৎ দূর বা নিকট, স্বার্থ সিদ্ধির যন্ত্র। মানুষ মাত্রেই উপেয় (end), কেউ কারো স্বকীয় উদ্দেশ্য সাধনের উপায়মাত্র নয়। ২
পশুপক্ষী, দেব-দেবী, প্রাকৃত-অতিপ্রাকৃত, পঞ্চতন্ত্র ও ঈসপের গল্প, বৌদ্ধধর্মে ভিক্ষুদের জীবনকাহিনী বিন্যাসে নীতির প্রাবল্যই একমাত্র ধরা পড়ে। কথা সরিৎসাগর, বেতাল পঞ্চবিংশতি, দশকুমারচরিত বিভিন্ন পুরাণ গ্রন্থে, নীতিশিক্ষা কিভাবে দিবে তার বিন্যাস। কারণ এ সময়ে নীতি গর্হিত অনেক কথাকে বর্ণনার জন্য রূপকের আশ্রয় নিতে হতো।

মানুষের জীবন চিত্রণ বাদ দিয়ে লেখায় গ্রহণ করত দেব দেবীর বর্ণনা। কবিয়াল, শায়ের, মুসলমান কবিদের রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানে, নাথসাহিত্যে নীতিরই জয়জয়কার যেন। শ্রী শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ গ্রন্থে বলেন :
পঞ্চতন্ত্র’ এ নীতিজ্ঞান বাস্তবতাকে অভিভূত করিয়াছে; গল্পের অতি ক্ষীর্ণ ও সূক্ষ্ম আবরনের ভিতর দিয়া নীতিশিক্ষার কঙ্কাল সুস্পষ্ট ভাবেই দৃষ্টিগোচর হইতেছে। … শিক্ষা দিবার প্রবল আগ্রহেই তাহারা আপনাদের জীবনী শক্তিকে নিস্তেজ করিয়া নিয়াছে। অবাধ্য, দুঃশীল রাজপুত্রদিগকে নীতিশিক্ষা দিবার জন্যেই যে তাহাদের জন্ম এবং প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিষ্ণুশর্মা যে তাহাদের লেখক তাহাদের এই গৌরবময় ইতিহাস সম্বন্ধে তাহারা মুহূর্তের জন্যও আত্মবিস্মৃত হয় নাই.৩
দেশ ও দশের সার্বিক সমস্যা উপন্যাসে আসতে পারে। কিন্তু শিল্পকর্ম ব্যতিরেকে নয়। কারণ উপন্যাস নীতি প্রধান প্রবন্ধ নয়। উপন্যাসের বিষয়বস্তু চিন্তা ও মননশীলতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের ভাষা সংযোগে ব্যক্ত হয়। চরিত্র এমন একটি প্রকাশ মাধ্যম যা উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীকে পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে নির্বাচন করাতে সাহায্য করে।
‘চরিত্র তাই যা নৈতিক উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে, দেখিয়ে দেয় ব্যক্তি কোন রকমের বস্তু পছন্দ করে আর কোন্ বস্তু অপছন্দ করে। যে সংলাপে এ উদ্দেশ্য ব্যক্ত হয় না অথবা যাতে বক্তা কোন কিছু কামনা করে না বা কোন কিছু বর্জন করতে চায় না, তা চরিত্রদ্যোতক নয়।
শ্রেয়নীতিক বা কল্যাণকামী মানুষ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কাজ না করলেও পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। শিল্পীও সমাজ বিবর্তনে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। সুতরাং দুঃখ ও পাপের চেতনা কর্মী এবং কবির একই প্রকার হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
কর্মীকে শুধু খোলা চোখে নয়, উত্তল কাঁচের ভিতর দিয়ে একটু বড়ো ক’রে দেখতে হয় অমঙ্গলের চেহারা, দৃষ্টিকে একাগ্র করতে হয় সেই স্থানে যেখানে মানুষ দুঃখ পাচ্ছে যে দুঃখের প্রতিকার সম্ভব, যেখানে অন্যায় ঘটছে যে অন্যায়ের প্রতিরোধ অত্যাবশ্যক। কর্মীর অমঙ্গল বোধ মাত্রারিক্ত হ’লে লাভ বৈ ক্ষতি নেই। কিন্তু কবির পক্ষে এই অতিরেক শুধু অনাবশ্যক নয়, অযথার্থ সুতরাং অনর্থকারী।
সমাজে যখন সামাজিক রীতিনীতিতে ভাঙন ধরে তখন মানুষের মূল্যবোধের এবং নৈতিক গুণাবলীর অবমূল্যায়ন ঘটে। তখন লেখক সমাজে দেখ যায়, সহজ স্বাভাবিক সুন্দর জীবন যাপনের প্রতি লেখনী ধারন না করে, ব্যঙ্গাত্মক কটূক্তির আশ্রয় নেন।
সামাজিক যাঁতাকলে পিষ্ট স্ত্রীবিরোধী মনোভাবও এই সময়ের রচনার কটূক্তিতে ধরা পড়েছে। তৎকালীন সমাজের লেখকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাপূর্ণ অশ্লীল ব্যঙ্গমিশ্রিত কাহিনীগুলি সাংবাদিকতাধর্মী। কারণ সে সময় নৈতিক জীবনের প্রতি উপলব্ধিতে সমাজের শিক্ষনীয় দিককেই প্রকাশ করা হত। প্যারিচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এ দেখা যায়,
‘কাহিনীর শেষাংশে লেখক ব্যঙ্গাত্মক পদ্ধতি ত্যাগ করে নায়ককে যন্ত্রণার শেষ সীমায় নিক্ষেপ করে কাশীতে পাঠিয়ে শোধন করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে এনেছেন। নৈতিকতার প্রাবল্য ব্যঙ্গ-রসকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বাল্যজীবন, প্রলোভন, অধঃপতন, চরমদুর্দশার ভিতর দিয়ে চৈতন্য লাভ এবং পরিশেষে নৈতিক পুণর্জন্ম। কাজেই ঢিলে ঢালা গ্রন্থন সত্ত্বেও কাহিনীটির মধ্যে যে একটি শিল্প সঙ্গত সম্পূর্ণতা আছে তা অস্বীকার করা যায় না ।
সুতরাং শ্রীশচন্দ্র দাশ তাঁর ‘সাহিত্য সন্দদর্শন’ গ্রন্থে বলেন,
*উপন্যাসে যে নীতি প্রাধান্য থাকিবে, উহা উপন্যাসের বহির্গত কোন প্রকার নৈতিকতা (morality) নহে, উহা লেখকের জগৎ ও জীবনের সর্বাঙ্গীন অনুভূতির সংশ্লেষণাত্মক পরম সঙ্গতির নীতি মাত্র উহা জীবনের পরম স্বীকৃতি। এই হিসাবে ঔপন্যাসিক জীবন নীতির প্রতি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিতে পারেন না।৭
সমস্যা, চরিত্র বর্ণনা, বাস্তবতা বোধ ইত্যাদি উপন্যাসে ভাষার মাধ্যমেই পরিলক্ষিত হয়। সাহিত্যে যখন ভাষা তৈরী হয়নি তখন ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘নববাবু বিলাস’ খণ্ড খণ্ড সংগ্রথিত লেখায় প্রকাশিত হয়। ভাষার প্রচলন না থাকায় তিনি খুব সহজেই তাঁর সুবিধা মত চলিত ভাষা ও ইতর সমাজের প্রচলিত অশ্লীল ভাষা’ ব্যবহার করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীস গুপ্ত প্রমুখ উপন্যাসস্রষ্টা বিদগ্ধ সংলাপ সৃষ্টির বিবেচনায় বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার।
তারাশঙ্করের দেশী বা উপভাষা বেশি থাকলেও বর্ণনায় তিনি তৎসম শব্দকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সংলাপে তাঁর কথা এবং প্রচলিত জনভাষায় দখল বিস্মিত করলেও বর্ণনায় ভাষা ধারণার প্রাচীনতাকে মেলে ধরে। মানিকের ভাষা প্রয়োগে অবলুপ্তিতের মত শব্দ থাকলেও তদ্ভব ও দেশী শব্দ প্রয়োগ সামর্থ্যে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।
‘মানিক কিন্তু বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের অব্যবহৃত নিষিদ্ধ শব্দকে (Taboo word), নূতন শব্দকে অনায়াসে উপন্যাসে এনেছেন। শব্দের পবিত্রতা অপবিত্রতা পুরোপুরি ব্যক্তিগত রুচিনির্ভর যুক্তিহীন আবেগের ব্যাপার। সবচেয়ে বড়ো কথা শব্দের সঠিক স্থানে ব্যবহারিক উপযোগিতা। সেক্ষেত্রে বিশেষ সুচিবায়ুগ্রস্ততা নীতিজ্ঞানের পরিচয় হ’লে ও স্বাভাবিক ঔপন্যাসিক আবহাওয়ায় কৃত্রিমতা আনে।৯

শ্রীশ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা গ্রন্থে বলেন :
নীতিজ্ঞানপূর্ণ মন্তব্য সমূহ যে উপন্যাসের উৎকর্ষ বর্ধন করে তাহা নহে, তবে তাহারা লেখকের ধর্ম প্রবণ ও তত্ত্বাম্বেষী চিত্তের একটি সম্পূর্ণ চিত্র প্রদান করে। ১০
উপন্যাস রচনায় কাহিনী বিন্যাসের ধরণ, বর্ণনাভঙ্গি চরিত্র বিচার সবই অত্যন্ত বিবেক ও বিবেচনা সম্মত হতে হবে। নয়ত তা কোন যুক্তিসঙ্গত সত্তায় পর্যবসিত হয় না। দার্শনিক মুইর হেড় Elements of moral গ্রন্থে বলেন :
বিবেক হইল সমগ্র বা প্রকৃত আত্মা যাহা নিজের বিভিন্ন অংশের জন্য আইন প্রণয়নের দাবিদার। ইহার দাবি এই যে, আত্মসচেতন ও বিচার-শক্তিসম্পন্ন সত্তা, ইহা ঐচ্ছিক ক্রিয়ার মধ্যে নিজের বিশেষ অভিব্যক্তিকে বিচার করে। ১১
নীতিবিদ কান্ট বলেন:
“যাহা সঠিক তাহা যদি উচিত না হয় তবে সঠিকের কোন অর্থ হয় না। ১২
তাই দেখা যায়, উপন্যাসের গৃহীত কাহিনী বিন্যাসে জটিল সমস্যার মূল সূত্রে নিবন্ধ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বোধীয় সত্তার তাৎপর্য। ভ্রমর বলেছিল তার স্বামীকে যে, যতদিন তার স্বামী শ্রদ্ধার পাত্র ছিল ততদিন সে শ্রদ্ধা করেছে । আবার কুমুর ক্ষেত্রে সমস্যাটা এসেছিল এইভাবে যে, জীবন যাত্রার এক বিপরীত বিন্যাসের বা ছকের মাঝখানে গিয়ে কেমন করে সে নিজেকে তার সঙ্গে মেলাবে।
বিবেক হইল সমগ্র বা প্রকৃত আত্মা যাহা নিজের বিভিন্ন অংশের জন্য আইন প্রণয়নের দাবিদার। ইহার দাবি এই যে, আত্মসচেতন ও বিচার-শক্তিসম্পন্ন সত্তা, ইহা ঐচ্ছিক ক্রিয়ার মধ্যে নিজের বিশেষ অভিব্যক্তিকে বিচার করে। ১৩
ভ্রমর তাঁর সারা বিবাহিত জীবনে স্বামী গোবিন্দ লালের কাছ থেকে যে নীতিশিক্ষা পেয়েছিল তা দিয়েই মৃত্যু মুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীকে বিচার করে গেছে। পারিবারিক ও সামাজিক পটে গোবিন্দ লাল যে- নীতিশিক্ষা গ্রহণ করেছিল, রোহিনীর সাথে পরিচয়ের পর থেকে সে তা দিনে দিনে বিসর্জন দিয়েছে। উইলিয়াম লিলি বলেন,
“that moral ideal is thus to be progressively attained only in a social life with other self conscious beings.”
মানুষ জন্মগতভাবে সবসময় নৈতিক নয়। ক্রমান্বয় নৈতিক ব্যক্তিই সঠিক। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য সৌন্দর্যে রয়েছে ধর্মবোধ ও কল্যাণকামী মনুষত্ববোধ। তাঁর
‘হিতবাদ সৌন্দর্য এবং ধর্মের ভিত্তি চিত্তশুদ্ধি। চিত্তশুদ্ধিতে শান্তি, প্রীতি এবং ভক্তি। ১৫
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ একটি গতিশীল শিল্পসত্তা দান করে গেছেন। তিনি অবিরত শিল্পকে সৃষ্টি করে, সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও অগ্রসর করে তুলেছেন। তাঁর মতে
‘যাহারা সাহিত্যের নিত্যবস্তুর সহিত পরিচয় লাভ করিয়াছেন, নিত্যত্বের লক্ষণগুলি তাহারা জ্ঞানসারে এবং অলক্ষ্যে অন্তঃকরণের সহিত মিশাইয়া লইয়াছেন। স্বভাবে এবং শিক্ষায় তাহারা সর্বকালীন বিচারকের পদ গ্রহণ করিবার যোগ্য।১৬
রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক শাসনামলের দুর্যোচনীয় অশনিসংকেত নিপীড়িত বাস্তব জীবনের সময়সত্যকে তাঁর উপন্যাসের লেখনীতে ধারণ করেছেন। ‘চোখের বালি’, ‘গোরা’, ‘যোগাযোগ’, ‘চতুরঙ্গ; চার অধ্যায় উপন্যাসগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ আমলের দুঃশাসনের অখণ্ড ব্যক্তি জীবনের চিত্র অঙ্কন করেছেন। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চাটুজ্যে বংশের মেয়ে কুমুদিনীর বিবেচনা শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে
দুই শতাব্দীর বাংলাদেশের যা কিছু সঞ্চয় তার ছায়া পড়েছে এই দর্পণে। কুমু রবীন্দ্রনাথের যথাযথ আত্মমর্যাদা সচেতন নায়িকা। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের প্রধান নায়িকাদের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষনীয়। যদিও তাদের জীবনযাত্রা উচ্চমধ্যবিত্ত ছক বা প্যাটার্নেই কল্পিত হয়েছে, কিন্তু প্রায় তাদের সকলকেই লেখক দারিদ্রের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন তাদের মানসিক বলিষ্ঠতা নির্মাণের জন্য ১
সামন্ত শ্রেণীর কষাঘাতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কমলেও বংশমর্যাদার কমতি হয়নি সে সময়ের কিছু উচ্চ বংশের মানুষদের। তেমনি আমরা একজন কুমুকে দেখতে পাই।

“বংশের দুর্গতির জন্য নিজেকে যতই অপরাধী করে, ততই হৃদয়ের সুধাপাত্র উপুড় ক’রে ভাইদের ওর ভালোবাসা দেয়। কঠিন দুঃখে নেংড়ানো ওর ভালবাসা। কুমুর পরে তাদের কর্তব্য করতে পারছে না বলে ওর ভাইরা ও বড়ো ব্যথার সঙ্গে কুমুকে তাদের স্নেহ দিয়ে ঘিরে রেখেছে। ১৮
রবীন্দ্রনাথের লেখায় প্রতিছত্রে নৈতিক বিন্যাসের প্রাধান্য পেয়েছে অনেক বেশি। সর্বত্রই যেন, শিক্ষনীয় সমগ্রতা রয়েছে তাঁর লেখনীতে। তাঁর পরবর্তী আরেক ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাহিত্য সমাজের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসাবে অত্যন্ত সহানুভূতির সাথে সামাজিক সমস্যাগুলিকে পাঠক সমাজে তুলে ধরেছেন।
তিনি নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে মহত্ত্বপূর্ণ সৃষ্টি প্রক্রিয়া নির্মাণ করেছেন। তাঁর নারীদের ভীষণ প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও দেখা যায় নৈতিক গুণাবলী রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। প্রতিকূল পরিবেশেও তারা নারীত্বের বা সতিত্বের মহিমা অক্ষুন্ন রেখেছে।
আবার পুরুষ চরিত্রে ও পাপ এবং অন্যায়ের অনুশোচনা রয়েছে।যেমন মহিমের বাড়িতে আগুন লাগলে সুরেশ নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিল না। মহিম তাকে সন্দেহ করে নাকি এ কথা জানতে চাইলে মহিম বলে
“সুরেশ, একটা সত্যকার অপরাধ অনেক মিথ্যা অপরাধের বোঝা বয়ে আনে। কিন্তু অনেক দুঃখ পেয়ে তুমি যাই করনা কেন, যাকে ‘ক্রাইম’ বলে, সে তুমি কোনদিন করতে পারনা বলে আজও আমি বিশ্বাস করি। একটুখানি থামিয়া কহিল, সুরেশ, তুমি ভগবান মানো না বটে, কিন্তু যে যথার্থ মানে সে অহর্নিশি প্রার্থনা করে, এ বিশ্বাস তিনি যেন তার না ভেঙ্গে দেন। ১৯
সুরেশের বারংবার দুঃসাহসে ও অচলার নৈতিক ও অনৈতিক বিরোধপূর্ণ দোলাচল মন আরও দ্বিধান্বিত হয়ে উঠল। সে তার প্রতিজ্ঞাকে কিছুতেই বলিষ্ঠ সংকল্পে স্থিরতা দিতে পারেনি। তাই দেখা যায়, সুরেশের অবিবেচক কদাচার মানসিকতায় অচলার
“লজ্জার পরিসীমা রহিল না, এবং ইহাকে সে কুৎসিত বলিয়া গর্হিত বলিয়া অভদ্র বলিয়া সহস্রপ্রকারে অপমানিত করিতে লাগিল এবং অতিথির প্রতি গৃহস্বামীর এ চৌর্যবৃত্তিকে সে কোনদিন ক্ষমা করিবে না বলিয়া নিজের কাছে বারংবার প্রতিজ্ঞা করিল; কিন্তু তথাপি তাহার সমস্ত মনটা যে এই অভিযোগে কোনমতেই সায় দিতেছে না, ইহাও তাহার অগোচর রহিল না এবং কোথায় কিসে যে তাহাকে এতদিন উঠিতে বসিতে বিধিতেছিল, তাহাও যেন একেবারে সুষ্পষ্ট হইয়া দেখা দিল। ২০
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দু সমাজ ও তাদের তৈরী সংস্কারের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লেখনী চালনা করেছেন। যেখানে সমাজে যতটুকু অন্যায়, নির্মমতা দেখেছেন সে স্থানকেই তিনি সুক্ষ্ম দৃষ্টি ও কলমের আঁচড়ে তুলে ধরেছেন । সামাজিক সমস্যাকে তিনি অন্তর্দৃষ্টির আলোকে দেখেছেন।
“বিধবা প্রেম শরৎসাহিত্যে একটা উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। তিনি এই বিধবা প্রেমের প্রথম পাঠ নিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র থেকে। রবীন্দ্রনাথ এঁকে আরো গাঢ় করেছে। শরৎচন্দ্রের নিজস্ব কীর্তি সমাজ এবং সংস্কার। ২১

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সুনীতি দুর্নীতির মানদণ্ডে তাঁর উপন্যাস চরিত্রকে নির্মাণ করেছেন যদিও, তথাপি তিনি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ পড়ে আহত হয়েছেন এবং এ বইকে নীতিপুস্তক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন :
ছেলেবেলায় ‘কৃষ্ণকান্তের উইলের’ রোহিনীর চরিত্র আমাকে অত্যন্ত ধাক্কা দিয়েছিল। সে পাপের পথে নেমে গেল। তারপর পিস্তলের গুলিতে মারা গেল। গরুর গাড়িতে বোঝাই হয়ে লাশ চালান গেল। অর্থাৎ হিন্দুত্বের দিক দিয়ে পাপের পরিনামের বাকী কিছু আর রইল না। ভালই হল। হিন্দু সমাজও পাপীর শাস্তিতে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলো । কিন্তু আর একটা দিক? যেটা এদের চেয়ে পুরাতন, এদের চেয়ে সনাতন নর-নারীর হৃদয়ের গভীরতম গূঢ়তম প্রেম?
…… মৃত্যুর জন্য আক্ষেপ করিনে, কিন্তু করি তার অকারণ, অহেতুক জবরদস্তির অপমৃত্যুতে। হতভাগিনীর অস্বাভাবিক মরনে পাঠক পাঠিকার সুশিক্ষা থেকে আরম্ভ করে সমাজের বিধি ও নীতির con- vention সমস্তই বেঁচে গেল, সন্দেহ নেই, কিন্তু ম’ল সে আর তার সঙ্গে সত্য, সুন্দর art। উপন্যাসের চরিত্র শুধু উপন্যাসের আইনেই মরতে পারে, নীতির চোখ রাঙানিতে তার মরা চলে না। ২২
মানুষের চরিত্র ক্ষুরনই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রকাশ। মনুষ্যনীতিবোধ মানবিক বৈশিষ্ট্যের সর্বোচ্চ আইনীতন্ত্র। ব্যক্তিনীতি ও শিল্পনীতি এক নয়। শুধু সনাতন পদ্ধতিতে নীতিকে সর্বোচ্চ মূল্য দিতে, নীতি পুস্তকে সাহিত্য ব্যতিরেকে নীতির আফালন লক্ষ্য করা যায়। আবু সয়ীদ আইয়ুব বলেন :
শ্রেয়োনীতিক মানুষ জৈবনীতিকে অতিক্রম করে যায়। স্বার্থ ও পরার্থকে সমদৃষ্টিতে দেখে। ‘অবশ্য আত্ম বলিদান মহত কর্ম, অন্যকে বলিদান মহাপাপ’। ‘নান্দনিক দৃষ্টি যতদূর পর্যন্ত ক্ষমাশীল, যতবিচিত্র বিসদৃশ উপাদান গ্রহণে ও আত্মীকরণে সক্ষম, শ্রেয়োনীতিক দৃষ্টি ততটা নয়।২৩
উপন্যাসে শ্রেয়কল্যাণকামী কাহিনী বিন্যাসে যে সব সমস্যাকে তুলে ধরে তা বিষয় বৈচিত্রের সার্থকতা আনায়নে, সদিচ্ছা ছাড়া নৈতিক বিবেচনা, আত্মশক্তি নির্ভরকাজ উপন্যাসে তুলে ধরা যায় না। সমস্যা সৃষ্টির মাধ্যমেই লেখক রূপ শিল্পের সুসম্বন্ধ গড়ে তোলেন।
এই সমস্যা গুলি সামাজিক মানুষরূপেই ঔপন্যাসিকে বর্তায়। যদি ঘটনা ইতিহাসের ঔপন্যাসিক ব্যাখ্যান হয়, তবে তা ঐতিহাসিক উপন্যাস। প্রেমকোন উপন্যাসে জটিলতা নিয়ে মৌল সমস্যা, আবার অন্যত্র তা সহচর ঘটনারূপে ও হাজির হতে পারে। কেন্দ্রীয়সমস্যা হ’ল রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, প্রেম এবং ধর্ম। গৌণ সমস্যার মধ্যে আছে বিশ্বাস ( চলে আসা সমাজব্যবস্থা, ধ্যান ধারণার প্রতি আস্থা), ব্যাখ্যা (২৪
উপন্যাসে বাস্তবতা, নৈতিকতামূলক গল্প, নৈতিক উপদেশ, লোক কথা, গান বা কবিতাংশ তুলে ধরা হয়।
মানুষ সময় সন্ধিক্ষণেই সত্যিকারের প্রয়োজনকে সৃষ্টি করতে পারে। সৃষ্টি, মানুষের মধ্যে কখনই আত্মনির্ভরতা আস্থা, চেতন ও বিশ্বাস ছাড়া আসে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল কতগুলি ঐক্যের ফলপ্রসু চিন্তা চেতনায়। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পরে তা মানুষের চিন্তার অনুবৃত্তি না হওয়াতে ও তা বাস্তবোচিত ভিত্তিতে রূপান্তরিত না হওয়ায়, মানুষ হয়ে উঠেছে আস্থাহীন ও অনৈতিক।
সংস্কৃতি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষ হয়েছে বিভ্রান্ত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় আদর্শে এসেছে, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও বঙালি জাতীয়তাবাদ। ষাটের দশক থেকে সব ইচ্ছাই মানুষের স্বপ্ন হয়ে আছে, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা পায়নি একটিও। তাই
‘সমাজে বিশৃংখলা বেড়েছে: চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রে ও বিশৃংখলা বেড়েছে, মূল্য বোধের বিপর্যয় ঘটেছে; নৈতিক চেতনা বিপর্যস্ত হয়েছে; সর্বস্তরের মানুষের মনে আজ হতাশা বিরাজ করছে। ১৯৭১ সনের যুদ্ধের সময়ে ঘোষিত রাষ্ট্রীয় আদর্শ অচিরেই আর ঘোষিত থাকেনি। ২০

স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থান মানুষকে উন্নততর সমৃদ্ধ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। তাই আমাদের উপন্যাসে নৈতিক বিবেচনা বোধ ও সুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় লিপিবদ্ধ থাকেনি। সামাজিক নিপীড়ন, নীতিবিরুদ্ধ কার্যকরণ, অবক্ষয়িত মানসিকতা বাংলাদেশের উপন্যাসে উঠে এসেছে। নৈতিকতাকে প্রাধান্য দানে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন :
এ অবস্থায় বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনগণের নবতর মুক্তিসংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য সরকার নবতর উপলব্ধি, উন্নততর চিন্তা-চেতনা, ভিন্নতর কর্মধারা, এবং বর্তমানে ক্রিয়াশীল গতানুগতিক ধারার রাজনৈতিক গোষ্ঠী সমূহকে পেছনে ফেলে মহত্তর প্রবলতর স্বতন্ত্র চিন্তাগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগ আয়োজন। রাজনীতিতে বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীদের বহুকাল ধরে চলে আসা গতানুগতিক অভ্যাস, গতানুগতিক সংস্কার বিশ্বাস, গতানুগতিক চিন্তা-চেতনা, গতানুগতিক কর্মধারা ও গতানুগতিক সাংগঠনিক উদ্যোগ প্রচলিত অবাঞ্ছিত সমাজব্যবস্থাকে ও গতানুগতিক জীবনধারাকেই সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবে কোনো কোনো মহল থেকে যত উচ্চ কণ্ঠেই বিপ্লবের কথা চিৎকৃত হয়ে চলুক না কেন। ২৬
মানুষের মানসিক পরিবর্তন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব হয়ে উঠে। মানবিক নৈতিক দৃষ্টি শক্তি দিয়ে বর্তমান জটিল সমাজ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা, ত্রুটি ভুল শোধন করে, জাতীয় পরিস্থিতিকে উন্নত, সামাজিক করে ও কলুষতা মুক্ত হয়ে, বিশ্ব নৈতিকতাকে গ্রহণকরা সম্ভব হয়ে উঠে। এবং তাতেই আমাদের উপন্যাসে নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিবেচনা বোধ রক্ষা পাবে।
আদর্শ ও শ্রেয়োবোধ অনির্বাণ অনুপ্রেরণারূপে জাগ্রত হবে।