অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

আজকে আমরা আলোচনা করবো অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ। যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর তারাশঙ্করের উপন্যাসে কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

সাঁওতাল জীবন ও ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে লেখা অরণ্য বহ্নি (১৯৬৬) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। আদিবাসী এক নৃ-গোষ্ঠীর গৌরবময় ইতিহাস অবলম্বনে রচিত অরণ্য বহ্নি বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান সৃষ্টি। সাঁওতালদের নিয়ে ১৯৪০ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন কালিন্দী উপন্যাস।

কালিন্দীতে সামন্ত জমিদার ও শিল্প মালিকদের সংঘর্ষে সাঁওতালরা কীভাবে উলিত হয়েছে তাই দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক। আর অরণ্য বহ্নি-তে তিনি অরণ্যচারী স্বাধীনচেতা সাঁওতালদের সরল জীবনধারা ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী, দেশী মহাজন, জোতদার, পশ্চিমা ব্যবসায়ী ও মহেশ দারোগার মতো মানুষ কীভাবে বিধ্বস্ত ও বিপন্ন করে তুলোছিল এবং অরণ্যচারী এই নিরীহ জনগোষ্ঠী কীভাবে অস্তিত্ব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল, তারই বিশ্বস্ত চিত্র এঁকেছেন।

১৮৫৪-৫৫ সালের ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহই এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়। আদিম নিরুত্তাপ এই জনগোষ্ঠীর ওপর শত রকমের নৃশংস অত্যাচার, শোষণ ও বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ হয়েই সাঁওতাল ভ্রাতৃ্যুগল সীধু ও কানুর নেতৃত্বে ১৮৫৪ সালে বিদ্রোহের দাবাগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় শৈশবে তাঁর পিসীমার কাছে এই বিদ্রোহের গল্প শুনেছিলেন। শ্রুত গল্পের সঙ্গে ইতিহাসের তথ্য ও কল্পনার রং মিশিয়ে রচনা করেন তিনি অরণ্য বহ্নি উপন্যাস।

বীরভূম ও সাঁওতাল পরগণার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এবং সাঁওতালদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ব্যক্তিগত নিবিড় পরিচয়ের সূত্রে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁওতালদের নিখুঁত ও বাস্তবানুগ জীবনচিত্র অঙ্কনে সক্ষম হয়েছেন। বীরভূম ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের কাহার, বেদে, সাঁওতাল, হাড়ি, বাগদী, ডোম ইত্যাদি অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের নিকটজন ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

তিনি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন সাঁওতাল কৌমের জীবনযাত্রা এবং তারই প্রতিফলন ঘটেছে অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে। আর তাই রচনাকাল থেকে একশ পঁচিশ বছর পূর্বে সংঘটিত সাঁওতাল বিদ্রোহের চিত্র পাঠকের সামনে বাস্ত বতার স্পর্শ বুলিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে যে অঞ্চলের কাহিনী তার অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসের সূচনা-পর্বেই বলেছেন – তখন বাংলাদেশ বলতে বাংলা বিহার উড়িষ্যা তিন প্রদেশ একসঙ্গে। যে অঞ্চলের কথা বলছি, সে অঞ্চল উত্তরে ভাগলপুর থেকে গঙ্গার পশ্চিমে তিন পাহাড়, রাজমহল থেকে দক্ষিণে বীরভূম জেলার মৈয়ূরাক্ষীর উত্তর এবং গোটা সাঁওতাল পরগনা এবং দেওঘর নিয়ে একটি বিস্তীর্ণ এলাকা।

… রাজমহল থেকে সমস্ত দক্ষিণ এলাকা তখন জেলা মুর্শিদাবাদের এলাকা। এবং দেওঘর সাঁওতাল পরগনা নিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল বীরভূম জেলার অন্তর্গত। ইংরেজ দেওয়ানীর পর পারমানেন্ট সেটেলমেন্টের সময় থেকে এসব অঞ্চলে বন কেটে চাষের ক্ষেত তৈরি হচ্ছে।

পাহাড়ের মাথায় সাঁওতালদের গ্রাম থেকে সাঁওতালরা সমতলে নেমে এসে গ্রামে বসতি তৈরি তরে জমি ভাঙছে।’ তবে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে সাঁওতাল পরগণা গঠিত হয় ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পরে। ওই সময় সাঁওতালদের স্বতন্ত্র এলাকা হিসেবে জেলাটির সীমান্ত ও নির্ধারিত হয়। বিদ্রোহের পূর্বে সাঁওতালরা বাস করত উত্তরে ভাগলপুর, দক্ষিণে বীরভূম, পূর্বে দেওঘর ও মধুপুর অঞ্চল এবং পশ্চিমে ভাগীরথীর সমস্ত অরণ্য অঞ্চলে।

সাঁওতাল পরগণা নবাবী আমলেও ছিল জনমানবশূন্য বনভূমি। ১৭৯৩ সনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় সাঁওতালরা পাহাড়ের মাথা থেকে সমতলে নেমে এসে বন কেটে বসতি স্থাপন ও চাষের জমি তৈরি করতে শুরু করে। বীরভূমসহ প্রায় গোটা সাঁওতাল পরগণাই রুক্ষ কঠিন মাটিতে গঠিত।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের বর্ণনা থেকে এ অঞ্চলের ভূমিবৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায় – ‘অঞ্চলটাই পাথর কাঁকর আর লালমাটির অঞ্চল। শক্ত কঠিন রুক্ষ মাটি। লাল ধুলোয় ভরা। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতে শালবনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। মধ্যে মধ্যে পড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তর।

সে প্রান্তর ধূসর রুক্ষ, মধ্যে মধ্যে বড় বড় পাথরের চাঁই মাথা ঠেলে বেরিয়ে যেন থাবা গেড়ে বসে আছে। এর মধ্যে আপনার চোখে পড়বে দু-চারটে পঁচিশ থেকে তিরিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু পাথরের ঢিবি; তাকে ঘিরে জন্মেছে শালগাছ — কুচিৎ কোথাও একটা বড় বটগাছ ও আপনার চোখে পড়বে। তারপরই আবার মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ শালজঙ্গল। এই কঠিন অরণ্য অঞ্চলে সাঁওতালরা তাদের বীরত্বপূর্ণ শ্রমের বিনিময়ে জঙ্গল কেটে পাথর সরিয়ে চাষের জমি তৈরি করে।

এ-রকম শ্রমকঠিন কাজে সাঁওতালদের সমতুল্য ছিল না কেউ। তাই সাঁওতালদের জমির লোভ দেখিয়ে ইংরেজরা পাহাড় থেকে সমতলে নামিয়ে এনে জমি তৈরির কাজে লাগিয়ে দেয়। প্রথম দিকে তাদের খাজনা দিতে হত না। নবাবী আমলেও তারা খাজনা দিত না। এদিকে ইংরেজ আমলে হিন্দু মহাজন জমিদাররাও এ অঞ্চলে ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে চাষের জমি তৈরি করে গোটা অঞ্চলের চেহারা পাল্টে দিচ্ছিল।

ক্রমে স্বাধীনচেতা সরল সাঁওতালেরা স্বভূমি থেকে বিচ্যুত হয়ে বঞ্চিত জীবনের মুখোমুখি হয়। অধিক হারে কর আরোপ করা হয় তাদের ওপর। সামাজিক রাজনৈতিক ও আর্থনীতিক ভাবেও শোষণের শিকার হয় তারা। হিন্দু মহাজনরা সাঁওতালদের উৎপন্ন ফসল কম দামে কিনে অভাবের সময় বিক্রি করত চড়া দামে। ঋণভারে জর্জরিত করে দেনার দায়ে তাদের মুনিষ বা ক্রীতদাসে পরিণত করে রাখত বংশপরম্পরায়।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

ইংরেজ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট মহেশ দারোগা থেকে শুরু করে ওই অঞ্চলে সবাই ছিল মহাজন জোতদারদের সহায়। কোথাও অন্যায়ের কোনো প্রতিকার সাঁওতালেরা পেত না। জোর করে উঠিয়ে নিয়ে সাঁওতাল রমণীদের সম্ভ্রমহানি করলেও ইংরেজ কর্মচারীদের বিচার হত না। জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হত শত শত সাঁওতালকে। কালক্রমে বহুদিনের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট, ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নিল। জমি ধর্ম সম্ভ্রম সব হারিয়ে নিরীহ সাঁওতালরা ক্রোধে প্রতিশোধ গ্রহণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

পুলিশ মহাজন আর ইংরেজের ত্রিমুখী অত্যাচারে অতিষ্ঠ নিরুপায় সাঁওতালরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে গোষ্ঠীগত অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই। তখন মূলত, চুনার মুর্মু মাঝির দুই তরুণ ছেলে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘোষণা করে ১৮৫৪ সালে। বিদ্রোহের প্রারম্ভে বিক্ষুব্ধ সাঁওতালরা মহিষের হালে আট আনা ও গরুর হালে চার আনা হারের বেশি খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। হাজার হাজার বিদ্রোহী সাঁওতাল পদব্রজে কলকাতা অভিমুখে রওনা হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের আগুন।

সঙ্ঘবদ্ধ বিদ্রোহী সাঁওতালেরা প্রথমে আক্রমণ করে হিন্দু জমিদার মহাজনদের। এরপর সুপ্রশিক্ষিত ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় স্বভূমির অধিকারের দাবিতে। ইংরেজদের সঙ্গে আদি যুদ্ধাস্ত্র তীর-ধনুক, টাঙ্গী নিয়ে যুদ্ধ করে তারা জয়ও লাভ করে বেশ কিছু জায়গায়। অত্যাচারী দারোগা, মহাজন আর জোতদারদের হত্যা করে বেশ কিছুদিন অরণ্যভূমি নিজেদের দখলে আনতেও সমর্থ হয় তারা।

“পূর্বে মুর্শিদাবাদ জঙ্গিপুর কাঁদী থেকে রামপুরহাট নারায়ণপুর হয়ে গণপুর তিলকুড়ি বিষ্ণুপুর আব্দারপুর কাপিষ্ঠা রাজনগর আমজোড়া ঘাট থেকে পশ্চিম দেওঘরের ধার পর্যন্ত ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার সাঁওতাল সুদীর্ঘ দিনের শোষণের অত্যাচারে ঘৃণার জন্য পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত ক্ষোভে ইতিহাসের অমোঘ বিধানে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মত আকাশে উঠে ছড়িয়ে পড়েছিল গলিত লাভার মত। “৪

কিন্তু শেষে সরল দৈববিশ্বাসী সাঁওতাল সম্প্রদায় ১৮৫৫ সালে সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজিত হয় নির্মমভাবে। হাজার হাজার সরল নির্বোধ সাঁওতাল স্বভূমির স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেয়। ইংরেজ বাহিনী কাপুরুষের মত ধোকা দিয়ে সমতলে নামিয়ে এনে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে তাদের। কানু নিহত হয় গুলিতে এবং সিধু ধরা পড়লে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহ সমাপ্ত হয়। তবে ওই বিদ্রোহের পরপরই ব্রিটিশ সরকার সাঁওতালদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি ‘সাঁওতাল পরগণা’ নামের নতুন জেলা গঠন করে।

১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের বর্ণনায় ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে লিখেছেন – ‘অরণ্য-রাজ্যে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্য তারা জমি করেছে, গ্রাম বসিয়েছে, শান্তির দেশ গড়ে তুলেছে। সেই শান্তি আজ নষ্ট হতে চলেছে, তাদের শ্রমের অংশ লুট করে নেবার জন্য কোম্পানীর অনুগত জমিদার ও মহাজনী ব্যবসাদারের দল হাত বাড়িয়েছে— এ যে অসহ্য। তারা প্রতিবাদ জানাল, কিন্তু বৃটিশ শাসক তাদের কথায় কর্ণপাত করল না। দিনে দিনে অত্যাচার বেড়ে যেতে লাগল। আর সহ্য করতে পারে না নিরীহ অশিক্ষত সাঁওতালরা। তাদের সহ্যের সীমা যখন অতিক্রম করল তখন তারা বহুদিনের জমানো বিক্ষেভে ফেটে পড়ল বিদ্রোহের সূর্য নিনাদে ১৮৫৫ সালে।

দুই

একটি আদিম, সরল, পরিশ্রমী ও স্বাধীনতাপ্রিয় জনজাতি আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য কীভাবে দুঃসাহসিক সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ইতিহাসের অবজ্ঞাত সভ্যতার আলোকবঞ্চিত আদিবাসী মানুষের রচনা করা সত্যিকারের ইতিহাস অবলম্বন করেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেছেন অরণ্য বহ্নি উপন্যাস।

সাঁওতালরাই এই উপন্যাসের প্রধান কুশীলব। সাঁওতালদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, চিন্তাচেতনা, জীবনধারা, পারিবারিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান – অর্থাৎ সাঁওতাল জীবনচর্যার সঙ্গে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যাযের সম্পৃক্তি ছিল। নিবিড়। তাই তিনি সাঁওতালদের মহান সংগ্রাম ও স্বাধীনতার স্পৃহা নিয়ে রচনা করেন তাঁর এই ঐতিহাসিক উপন্যাস ।

সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সমবায়ী এক জনগোষ্ঠী। আরণ্যক জীবনের ধর্ম অনুযায়ী তারা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত। কৃষ্ণকায় সাঁওতাল আদিবাসীরা দুর্দান্ত পরিশ্রমী, সাহসী, সত্যবাদী এবং সরল। অরণ্যচারী এই জনগোষ্ঠীর জীবিকার প্রধান অবলম্বন কৃষিকাজ। শিকারের ক্ষেত্রেও সাঁওতালদের রয়েছে যথেষ্ট সুনাম। পরিশ্রমের জন্য তাদের সুখ্যাতি সর্বজন বিদিত। প্রাচীনকাল থেকেই সাঁওতাল সমাজে বিভিন্ন গোত্রের অস্তিত্ব ছিল।

সাঁওতালদের মধ্যে মুর্মু, টুডু, হাঁসদা, হেমব্রম, সরেন, কিন্তু ইত্যাদি মোট বারোটি সাঁওতাল গোত্র বিদ্যমান। এইসব গোত্রের একজন করে গোত্রপতি বা সর্দার থাকে। ওই সর্দারই স্ব স্ব গোত্রের কর্তাব্যক্তি। তাকে সবাই মান্য করে। গোত্রপতির উপাধি হচ্ছে মাঝি। মাঝি গোত্রের বিচার-আচার ও শাসন কার্য পরিচালনার অধিকারী।

বিভিন্ন গোত্রের কয়েকজন মাঝির মধ্য থেকে একজন ‘পরগনাইৎ’ মনোনীত হয়। পরগণা বা বৃহত্তর অঞ্চলের ‘মালিক’ বলেই তাকে ‘পরগনাইৎ’ বলা হয়। মাঝিরা ‘পরগনাই’কে মেনে চলে এবং প্রয়োজনে তার পরামর্শ নেয়। সাঁওতালেরা ফৌজদারী দেওয়ানী কোর্ট-কাচারি ইত্যাদি মানে না। সমাজে তাদের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা বিদ্যমান। মাঝি অথবা পরগনাইত্রাই ওইসব বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকে।

মাঝিরা কোনো বিচারকার্যে অক্ষম হলে পরগনাইতের শরণাপন্ন হয়। মাঝি-পরগনাইতের সুশৃঙ্খল শাসনে পরিচালিত হয় সাঁওতালদের আদিবাসী সমাজ। মাঝি এবং পরগনাইতের মধ্যেও সুশৃঙ্খলপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় থাকে। একেকটি গোত্র মিলে গড়ে ওঠে একেকটি গ্রাম এবং ওই গ্রামের প্রধান মনোনীত হয় মাঝি। তারা দেবস্থান ‘জহার সর্ণা’য় মজলিস বসিয়ে নিজেদের সমস্যার সমাধান করে।

সাঁওতালদের সমাজে পূর্বকালে রাজাও ছিল। সকলেই তাঁকে মান্য করত। মুর্মুরা বিশ্বাস করে যে, পূর্বে রাজা তাদের গোত্রের মধ্যেই ছিল। সিধু-কানুর পিতা চুনার মুর্মু মাঝির কথায় এই বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যায় :

চুনার বলে— শুন কুষ্ঠি মুমুঠাকুর রাজগোষ্ঠী

মরংবোঙ্গার ছিষ্টি – অদৃষ্টের দোষে এই দশা

প্রথমে দিকুরা তাড়ে তুরুকেরা তার পরে

বনে বনে ঘুরে ঘুরে হাতি থেকে হইলাম মশা।

তথাপি ধরমে মানি দিন খাই দিন আনি।

দিকুরা করে টানাটানি দিনরাত সবকিছু ধরে——

সব দিই দিইনা ধর্ম মুর্মু বুঝে তার মর্ম —

করে নাক ছোট কর্ম সাঁওতালে এই মান্য করে।

সাঁওতালদের বিশ্বাস তাদের সুখী সমৃদ্ধ ও গৌরবময় একটা স্বাধীন আরণ্যক জীবন ছিল। গভীর অরণ্যে পাহাড়ের চূড়ায় তারা ভয়ানক জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে লড়াই করে টিকে ছিল। সেসব দিনের জন্য আজও সাঁওতালরা হাহাকার করে। কৃষি-প্রিয় শ্রমনিষ্ঠ সাঁওতালরা আবাদযোগ্য জমির লোভে পাহাড়-অরণ্যের সঙ্গম স্থলে ‘দামিন ই কোহতে এসে মহাবিক্ৰমে কাঁকর পাথর ও অরণ্য পরিষ্কার করে জমি তৈরি করে, ঊষর ভূমি কর্ষণে-কর্ষণে উর্বর করে তোলে। কিন্তু ইতিহাসের এক বিশেষ কালে এসব বুনো আদিম সত্যিকারের ভূমিপুত্ররা ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে।

বন্যপ্রাণী, বিরূপ প্রকৃতি এবং ক্ষুধার সঙ্গে সাঁওতালদের সংগ্রাম চিরন্তন। হতদরিদ্র এই অরণ্যসম্ভ ানেরা জমিদার মহাজনদের বিলাস ব্যসনে সহায়ক শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও তাদের কাছে সাঁওতালরা অদ্ভূত। শ্রমজীবী এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদাও ছিল খুবই সামান্য। ছল-চাতুরী, মিথ্যাচরিতা ধূর্ততা ছিল তাদের স্বভাববিরুদ্ধ বিষয়। তারা এমনই বিশ্বাসমুগ্ধ এক জনগোষ্ঠী, যারা বিদ্যুৎ চমকানোর মধ্যেও নিজেদের দেবতা ‘বোঙ্গার’ ইশারা খোঁজে।

স্বীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির প্রতি তারা লালন করে গভীর অনুরাগ। তথাকথিত সভ্য সমাজের দৃষ্টিতে সাঁওতালরা নিম্নশ্রেণির মানুষ হিসেবেই পরিগণিত। শত বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যের মধ্যেও সদাহাস্য ও আনন্দমুখর থাকতে তারা ভালবাসে। হাড়-ভাঙা পরিশ্রমের পরেও তারা বিভিন্ন পূজা-পার্বণ-উৎসবে নাচ-গান ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে।

সভ্য সমাজ চিরকালই তাদের কাছ থেকে নিয়েছে অঢেল, দেয়নি কিছুই। সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশের স্তরে স্তরে সাঁওতালদের অবদান অনস্বীকার্য, তথাপি তারা থেকেছে বঞ্চিত ও নিগৃহীত। অশিক্ষিত, বিষয়বুদ্ধিহীন ও অন্ধবিশ্বাসনির্ভর সাঁওতালরা নিজেদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে নির্বিবাদে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে চেয়েছে। কিন্তু তারা ইতিহাসের এক বিশেষ লগ্নে ইংরেজ রাজশক্তি ও দেশীয় মহাজনের শোষণের শিকার হতে শুরু করে।

তথাকথিত সুসভ্য ইংরেজ শাসকদের প্রতিনিধি মি. সাদারল্যান্ডের উক্তি থেকে সাঁওতাল সমাজের প্রতি ইংরেজদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করা যায় :

‘ওইসব ব্ল্যাক নিগারদের নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। ওরা মরবার জন্যই জন্মেছে এবং অন্যের জন্য খেটে মরবে। সাঁওতালরা সভ্য মানুষের খাওয়া-পড়া, বিলাস ও আরামের ব্যবস্থা করে দেয় অথচ নিজেরা থাকে চির অবহেলিত। সামান্য দশটি টাকা ঋণের জন্য গোটা জনগোষ্ঠীর অর্ধেক আজীবনের জন্য, ক্ষেত্রবিশেষে বংশানুক্রমে ক্রীতদাসে পরিণত হয়।

আদিবাসী আরণ্যক জনগোষ্ঠী চিরকালই তাদের জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরের প্রচণ্ড শক্তিকে মহাশক্তিমানরূপে কল্পনা করে এসেছে। অন্ধবিশ্বাস আর সংস্কারচালিত সাঁওতালরা মেঘ বিদ্যুৎ আর বজ্রপাতকে দেবতদার শক্তির প্রকাশ হিসেবে বিশ্বাস করে। এসবের মধ্যেই তারা দেবতার আদেশ- নির্দেশের এবং ধর্মীয় বিধানের বিশেষ ইঙ্গিত খুঁজে নেয়। সাঁওতালরা সূর্যকে পুরুষ ‘বোঙ্গা’ বা পুরুষ দেবতা বলে মান্য করে। আর বোঙ্গা হচ্ছেন তাদের শ্রেষ্ঠ দেবতা। বৃহৎ শক্তিমান অনেক কিছুতেই সাঁওতালরা বোঙ্গার প্রতিনিধি শক্তি বলে গণ্য করে।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

তিন

বিভিন্ন সাঁওতাল গোত্রের মধ্যে নানা টোটেম বিদ্যমান হাঁসদা গোত্রের টোটেম হাঁস, মুর্মুদের টোটেম নীল গাভী ইত্যাদি। তারা বিশ্বাস করে স্ব স্ব টোটেম থেকেই তাদের উৎপত্তি। শালপাতা তাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যবহ। সাঁওতালরা প্রয়োজনের সময় দূরবর্তী কোনো স্থানে সাংকেতিক বার্তা প্রেরণের জন্য শালপাতা ব্যবহার করে।

সাঁওতাল সমাজে প্রচলিত নিয়মকানুন, বিধি-নিষেধ ও সংস্কারগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। সামাজিক অনুশাসনের প্রতি সাঁওতালেরা গভীর শ্রদ্ধাশীল। প্রথা, পদ্ধতি বা বিধি-নিষেধগুলো উপেক্ষিত হলে পাপ হয় এবং তা থেকে সমাজে অশান্তি নেমে আসে বলে তাদের বিশ্বাস।

নিজস্ব জীবনাধারা কিংবা সংস্কৃতির সীমারেখা অতিক্রম করা সাঁওতালদের জন্য মহাপাপ। মাটিকে তারা অন্নদাত্রী হিসেবে শ্রদ্ধা করে। এ কারণেই ধরিত্রীর বুকে লাঙলের কর্ষণ তাদের জন্য নিষিদ্ধ। চূড়া মাঝির মায়ের কথা থেকে সাঁওতালদের এসব চিন্তা, রীতি ও বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায় পাহাড়ের মাথাতে ছিলাম, এইসব দিকুদের সঙ্গে মুসলাদের সঙ্গে সাত ছিল না, পড়খান জেটে এই সায়ের লোকের সঙ্গে সাত ছিল না।

শিকার করতিস— জোয়ার ভুট্টা লাগাতিস— বোঙ্গার পূজো করতিস, এখন জমিনের লোভে পাহাড় থেকে নামলি, জাব্দ মুলুকে গেরাম করলি, ধরতির বুকে ফাল চালছিস, ধান করছিস— তাথে কি হছে তুদের? আ? কি হচ্ছে?’৯

এক গোত্রের সাঁওতাল স্বগোত্রে বিয়ে করতে পারে না। এ ধরনের অবৈধ বিয়ে সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট। ব্যক্তি সমাজে হেয় হয়, নিন্দিত হয়। অরণ্য বহ্নি উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র লাল মাঝির বাবা হাঁসদা হয়ে হাঁসদা মেয়ে বিয়ে করেছিল বলে তাদের বংশে এই স্থায়ী খুঁত কখনোই মুছে যায়নি। চুনার মাঝির মা সাঁওতালদের সংস্কার ও পূর্ব ঐতিহ্যের ধারক। তাই বজ্রপাতের মধ্যেও সে দেবতার রোষ প্রত্যাশা করে, ওইসব ঘটনা-দুর্ঘটনা সাঁওতালদের কৃতকর্মর ফল বলে বিশ্বাস করে।

সাঁওতালদের ওপর নানাবিধ শোষণ-অত্যাচারকেও তাদের কৃতকর্মের ফল হিসেবেই ধরে নেয় তারা। চুনার মাঝির মায়ের কথা থেকে তৎকালীন সাঁওতালদের সামাজিক অবস্থার স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায় সব লিয়ে লিছে দিকুরা সব লিয়ে লিয়ে।

শুধু জমিন লিছে? জনম লিছে। লিছে না! তুরা জব্দিতে এসে দেনা করছিস— দিকুদের কাছে জনম বিকাইছে। গুলাম হছিস। তুরা রাস্তা বন্দিতে কাম করতে যাচ্ছিস! লোহার সড়ক হবে লোহার ঘোড়ার গাড়ি ছুটবে। তুরা পাহাড় কাটছিস, পথ বানাইছিস— পুয়সার লোভে ছুটছিল দলে দলে— মেয়্যাগুলোকে লিয়ে ছুটছিস।

আমি কুছু জানছি না——- তু কুছু জানিস না– সিখানে ডবকা ডবকা মেয়্যাগুলাকে লিয়া ওই পুরখানা শালারা দিক্ শালারা দাড়িওলা শালারা কি করছে তোরা জানিস না। পাপ হচ্ছে না। পুন্যি হচ্ছে। তুরা দু ভাই তু আর কান্হুর সঙ্গে ওই করন রায় মাঝির দুই বিটী ফুল আর টুশকির হাড় কাবাদি করলে তুদের বাপ; সেই তখন তুরা এতটুকুন — তুরা বড় হলি মরদ হলি। তুরা দুভাই সাদী করলি না- পিরীত করলি লিটিপাড়ার বিশু মাঝির দুটো ময়্যার সঙ্গে। কি হল? তাদের বাপ খাটতে গেল রাস্তা বন্দিতে— ময়্যা দুটোকে লিয়ে গেল সোঙ্গে । দেখগা কি হল তোদের? আক্কায় হল না? ১১ –

অরণ্যের বিপদসঙ্কুল পরিবেশে কেউ কখনো বিপদে পড়লে সাঁওতালরা আন্তরিকতার সঙ্গেই তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করার বিনিময়ে সাঁওতালরা কখনো কারো কাছ থেকে অর্থ অর্থ গ্রহণ করে না। সাঁওতাল সম্প্রদায় নীতিনিষ্ঠ আদিম জাতিগোষ্ঠী। নারীর প্রতিও তারা শ্রদ্ধাশীল । যুদ্ধের মহা উন্মাদনার সময়ও তারা পারতপক্ষে নারী হত্যা করেনি। সাঁওতাল কৌমগোষ্ঠী নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রতি গভীরভাবে আস্থাশীল।

এ কৌমসমাজের বিশ্বাস-জীবন-জীবিকা নিয়ে স্বতন্ত্র ঐতিহ্যমণ্ডিত এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা তাদের উপকথা ও নিজস্ব পুরাণকথার মধ্যেই কেন্দ্রীভূত । সাঁওতাল কৌম নিজের উপকথা ও লোককথাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। এ-সব উপকথা-লোককথাকে ঘিরেই তাদের অদ্ভুত বিশ্বাসের জগৎ আবর্তিত।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁওতালদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসেছিলেন বলে তাদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, উপকথা ও লোককথাকে গভীরভাবে জানতে ও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অরণ্য বহ্নি উপন্যাসেও তিনি সাঁওতালদের জীবন, জীবিকা, বিশ্বাস, উপকথা, খাদ্য, পোশাক, বিনোদন, অনুষ্ঠান ইত্যাদির বাস্তব চিত্র এঁকেছেন। এটি তার বাস্তব অভিজ্ঞতারই ফল।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে সাঁওতাল কৌমের বিভিন্ন উপকথা উপস্থাপন করেছেন। সাঁওতাল সমাজে প্রচলিত লোককথায় আছে যে, সাঁওতালদের দুঃখে যখন পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল তখন মা চণ্ডীর টনক নড়ল, তাঁর আসন টলে উঠল, মুকুট পড়ে গেল। দেবী চণ্ডী জয়া বিজয়াকে খড়ি পেতে দেখতে বললেন পৃথিবীতে কী অনাচার ঘটেছে যার জন্য তার আসন পর্যন্ত টলে উঠল ।

জয়া বিজয়া খড়ি পেতে দেখে বললেন —’মা শ্বেতদ্বীপের সাদা মানুষেরা দত্যির মত দাপাদাপি করছে, – পৃথিবীর বুক জুড়ে লোহার বাঁধন বাঁধছে। তাতে পাহাড় কেটে খাল কাটছে খাল পুড়িয়ে পাহাড় তুলছে। মানুষদিগে চাবুক মারছে। কুঠি করছে- সেখানে তারা গরীবের জাত মান গতর সবকিছু বরবাদ করছে— তাই তাঁরা কাঁদছে।’ দেবী চণ্ডী তখন অভয় দিলেন এবং তাদেরকে জানিয়ে দিতে বললেন— তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

নির্যাতিত গরীবদের অর্থাৎ সাঁওতালদের রক্ষা করার জন্য তিনি কালকেতু আর বিরুপাক্ষকে মর্ত্যে পাঠালেন। সঙ্গে পাঠালেন দেবীর সঙ্গিনী ডাকিনীকেও। রামচন্দ্রপুরের ধার্মিক ব্রাহ্মণ ত্রিভুবন ভট্টাচর্যের মাধ্যমে চণ্ডী এ কথা সাঁওতালদের জানিয়ে দিলেন। এই ত্রিভুবন ভট্টাচার্যই বলেছিলেন— সিধু-কানুই সেই দেবী-প্রেরিত বিরুপাক্ষ-কালকেতু। ব্রাহ্মণকন্যা ভৈরবী হচ্ছে মা চণ্ডীর সঙ্গিনী ডাকিনী।

সাঁওতালরা তাই সিধু-কানুকে তাদের ত্রাণকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। সাঁওতালদের লোককথায় আছে দেবী চণ্ডীর অট্টহাসিতে সেদিন এ অঞ্চলের বনে বনে ঝড় উঠেছিল, বজ্রপাত হয়েছিল। সাঁওতালদের লোকপুরাণে আছে পৃথিবী যখন পাপে ভরে যায়, ধর্মের স্থলে অধর্ম আসে তখন দেবী কখনো নিজে আসেন, কখনো ওই কালকেতু-বিরুপাক্ষকে পাঠান।”

ত্রিভুবন ভট্টাচার্য ঝড়ের রাতে ওই প্রত্যাদেশ পেয়েছিলেন। তিনি সিধু-কানুকে কালকেতু-বিরুপাক্ষ বলে চিনেও ছিলেন। সিধু-কানুকে দেখে ভট্টাচার্য বলে উঠেছিল, ‘তুদের লেগে বসে আছি রে আমি। সেই ঝড়ের রাত থেকে। আজ আলি, আয়, আয়। ওরে যে তোদের মরংবোঙ্গা সেই আমার ন্যাংটা বেটী! কালী মা! হাঁ রে। তেমনি তোদের চেহারা বটে। বটে! লে তোদের লেগে আমি কবচ নিয়ে বসে আছি….. চণ্ডীর বীজ লেখা সেই কবচ তাদের হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। যা তোরা দিগ্বিজয় করবি।

আমি শুনেছি রে লিটি পাড়ায় যা হয়েছে শুনেছি। মা আমাকে স্বপ্ন দিয়েছেন। ঝড় উঠেছে, বাজ পড়েছে, তোদের নাচবার সময় হয়েছে। নাচ গা তোরা ।’১৪ অন্যদিকে সাঁওতালরা পৃথিবী সৃষ্টির এক অদ্ভুত ইতিহাসেও বিশ্বাসী। তাদের উপকথায় আছে— পৃথিবীর সর্বত্র প্রথমে ছিল পানি আর পানি। তারপর ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন দুটি ‘হাস-হাঁসিল’। হাঁস ঠাকুরকে বললে আমাদের তো বানালে কিন্তু কিন্তু আমরা থাকব কোথায় খাবো কী? ঠাকুর তখন কুমিরকে ডেকে বললেন সমুদ্রের তলদেশ থেকে মাটি ওঠাতে। কুমির মাটি নিয়ে ডাঙায় উঠতে উঠতে গলে খসে পড়ল সব মাটি।

এরপর ঠাকুরের নির্দেশে চেষ্টা করল কাঁকড়া- সেও ব্যর্থ হল। সবশেষে – ঠাকুর ডাকলেন ‘লেগুং’ অর্থাৎ কেঁচোকে ঠাকুর সেই সাথে ডাকলেন কচ্ছপকেও। কেঁচো পানির ওপর কচ্ছপকে দাঁড় করিয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখল কচ্ছপের পা। কেঁচোর লেজটি রাখল কচ্ছপের পিঠের ওপর, আর মুখ রাখলে সমুদ্রের তলদেশে। মুখ দিয়ে মাটি খেয়ে লেজ দিয়ে সেই মাটি কচ্ছপের পিঠের ওপর রাখতে লাগল। মাটি আর গলল না। এভাবে কেঁচো কচ্ছপের পিঠে মাটি তুলে তৈরি করল পৃথিবী।”

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতালদের জীবনধারা ও বিশ্বাসকে স্পষ্ট করবার জন্য এসব উপকথা ব্যবহার করেছেন। তাদের একটি উপকথায় আছে সাত ভাই’র এক বোন ছিল। – ভাইদের খুব ভাল বাসত বোনটি। কিন্তু ভাই ও বৌদিদিরা বোনটিকে সহ্য করতে পারত না। সাত ভাই রাজার পুকুর খনন কাজে গেল। বোনটি প্রতিদিন ভাইদের জন্য নিয়ে যেত খাবার। কিন্তু পুকুর খনন শেষে সাত ভাই মিলে বোনটাকে মেরে পুকুরে পুঁতে রাখল।

বাড়ি গিয়ে সবাই জানাল বোনকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। বউরাও খুশিতে হাসল। মরংবোঙ্গা দেখলেন সবই, তিনি বললেন, ‘তু বাঁচ গ, তু ভাল মেয়্যা। মেয়েটি বাঁচল, তবে মানুষ হয়ে নয়, একটি পদ্মফুল হয়ে। রাজা পুকুর দেখতে এসে ফুটন্ত লাল পদ্মটি দেখতে পেলেন। চাকরকে সেটি তুলে আনার নির্দেশ দিলেন তিনি। চাকর ফুলটিকে ধরতে গেলে ফুলটি সরে গেল এবং বলল— রাজা ছাড়া কেউ তাকে ধরতে পারবে না। রাজা স্বয়ং নেনে সযত্নে তুলে নিয়ে এলেন পদ্ম ফুলটিকে। ফুলটি তখন মেয়ে হয়ে গেল।

রাজা তখন মেয়েটিকে বিয়ে করে রানির মর্যাদা দিলেন। মেয়েটি বলল মরংবোঙ্গা এজন্যেই তাকে পুকুরে পদ্মফুল রূপে ফুটিয়েছিল। রাজবাড়িতে বিশাল ভোজসভার আয়োজন হল, সেখানে রানির সাত ভাই এল নিমন্ত্রিত হয়ে। হিংসায় তারা বোনকে পাতকুয়ায় ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা করল। বোঙ্গার তাতে ক্রোধ হল, বোঙ্গা বললেন, ‘মাটি তু ফেটে যা। মাটি ফাঁক হলে সাত ভাই বউসহ মাটির গভীরে তলিয়ে গেল। ” চুমার মুর্মুর সাঁওতালদের প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা বলে সাবধান করে তার মেয়ে মানকীকে। অতীতের গৌরব-গাথা প্রকাশ পায় তার ওইসব কথকতায়।

মুর্মু মাঝি বলে, ‘মুর্মু ঠাকুর সাঁওতালদের রাজা ছিল। সেই বালী রাজা ছিল সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের কাছে। হিন্দুদের এক রাজা সেখানে তাদের পরাজিত করল। সেখান থেকে পালিয়ে বালী রাজার ছেলে রাজা হল আবার। সেখানে সাঁওতালদের জাতভাইরা তখনো সেখানে অবস্থান করছে। সেখানেও তুরুকদের সঙ্গে তাদের ভীষণ লড়াই হল। রাজার ছিল এক কন্যা। ছত্রী রাজারা সে পরমা সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে চাইল।

কন্যা বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে ছত্রী রাজার সঙ্গে যেতে রাজি হল। ভুরুক রাজা সম্মত হয়ে সাঁওতাল রাজাকে মুক্তি দিল। সাঁওতাল রাজ কন্যার পাকি এলো তুরুক রাজার কাছে। পালকি খুলে তুরুক রাজা দেখলেন রাজকন্যা বিষ খেয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় রাজকন্যা বলল— ‘তুরুক আমি মুর্মুঠাকুর রাজার বিটী আমি ধরম দিব না হে। আমি মরলম। –

সাঁওতাল সংস্কৃতি বিচিত্র এবং সমৃদ্ধ। কাজের ফাঁকে নানা পূজা-পার্বণ ও অনুষ্ঠানে তারা আনন্দ খোঁজে। স্বভাবগতভাবেও সাঁওতালরা আমোদপ্রবণ জাতি। নানারকম লৌকিক পূজা-পার্বণ উৎসবে তারা নাচ-গানে মেতে ওঠে। তাদের একান্ত গোষ্ঠীগত পূজা হল মরংবোঙ্গার পূজা। বোঙ্গার অবস্থানস্থলকে তারা ‘জহরসর্ণা’ বলে। পূজার সময় ওই ‘জহর সর্ণা’য় তারা পশু-পাখি বলি দেয়।

এ সময় দেবস্থানে মিলিত হয়ে তারা হাড়িয়া বা মদ পান করে, নাচে গানে উন্মাতাল হয়। তখন কর্মপ্রিয় শ্রমজীবী সাঁওতালরা অন্যমানুষ । বুনো আদিম উন্মাদনায়ই তারা আনন্দ খুঁজে পায় সবচেয়ে বেশি। বিপদে-সংকটে আনন্দ-সমৃদ্ধিতে সাঁওতালরা তাদের দেবতার সাহায্য কামনা করে।

এছাড়াও সাঁওতাল সম্প্রদায় হিন্দুদের প্রভাবে দুর্গাপূজা ও কালীপূজা করে। দুর্গা পূজার আনন্দ যাপনে কৌমের বালক-বালিকা, যুবক- বৃদ্ধ সবাই অংশ নেয়। তারা নাচ-গান করে মাদল বাজিয়ে। আলোচ্য উপন্যাসে দেখা যায় সাঁওতালরা যুদ্ধযাত্রা ও যুদ্ধজয় উভয় ক্ষেত্রেই দুর্গাপূজা ও কালীপূজার আয়োজন করেছে।

নৃত্য-গীত সাঁওতালদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন পূজা-পার্বণে তারা নাচ-গানের মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করে। তবে দিনব্যাপী কঠোর পরিশ্রমের পর প্রতিরাতেই সাঁওতাল নারীপুরুষ মদ পান করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে। সিধুর স্ত্রী ফুলের মতো সব সাঁওতাল নারীই নাচে পারদর্শী। ফুল স্বামী সিধুর সঙ্গে হেলেদুলে নাচে। সাঁওতাল গৃহে কোনো অতিথি এলেও এভাবেই তারা নেচে-গেয়ে অভ্যর্থনা জানায় অতিথিকে।

বাঁশি ও মাদলের তালের সাথে সাথে নেচে গেয়ে অতিথির সঙ্গে হাস্য রসিকতাও করে সাঁওতালরা। এর মূল উদ্দেশ্য অতিথির আনন্দ বর্ধন। খুব আপন লোককে ওরা গান গেয়ে মাটিতে বসতে দেয়। সাঁওতালদের গানেরও রয়েছে নানা ধরন। সাধারণভাবে সবসময় গাওয়ার জন্য রয়েছে ‘লাগডে’ গান, বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ের গান বা ‘বাপরা সিরিং’ আর বীজ ছড়ানোর জন্য ও ধান ভানার জন্য গীত হয় ‘রহয় সিরিং’।

এছাড়া বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন রকম ঋতুর গানও তারা গায়। বিদ্রোহের বা হুলার গানও আছে তাদের। ১৮৫৪ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহের গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তারা। সিধুর প্রণয়িনী রুকনী কিশোর-সৈনিকের বেশ ধারণ করে বিদ্রোহের গান গেয়েছিল:

দিকুরা সব লুঠলো, সাদা মানুষ জুটলো

কালো মেয়্যা লুটলো হড়ে ধরম চাড়লো—

মরংবোঙ্গা ক্ষেপলো

জল হল নাই। তাথেই জল হল না-ই

মরংবোঙ্গা রাগলো— শুভোবাবু জাগল

টাঙ্গি নিয়ে ছুটলো—

সায়ের দিড়ে কাড়লো —কালো মেয়্যা কাড়লো;

চোখের পানি মুছলো

আবার তারা হাসলো ইবার জল হবে রে

ওরে ডর না-ই

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

চার

আরণ্য-সন্তান সাঁওতালদের জীবনযাত্রাও আদিম ও আরণ্যক। বনের শিকার করা পশুর মাংস আগুনে পুড়িয়ে লবণ-মরিচ মাখিয়ে খায় সাঁওতালরা। অভাব ছিল শুধু লবণের। লবণ তাদের কাছে দুর্মূল্য দ্রব্য । ফেনে লবণে সামান্য ভাত খেয়ে সাঁওতালরা মাঠে কাজ করে। গরু, মহিষ, খরগোশ, শূকর, মুরগি ইত্যাদি নানা রকম প্রাণীর মাংস তাদের প্রিয় আহার্য। এছাড়া তাদের প্রিয় পানীয় হাড়িয়া বা মদ ।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে সাঁওতালরা নিজেদের তৈরি চুটি’ বা বিড়ি খায়। বুট কলাই ইত্যাদি শস্য সিদ্ধও তাদের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। খাদ্যের বিষয়ে সাঁওতালদের তেমন বাছবিচার নেই। নিজেরা শস্য উৎপাদন করে প্রচুর, কিন্তু তারপরও নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবারের ঘাটতি থেকেই যায় তাদের। উৎপন্ন শস্যের প্রায় সবটুকুই চলে যায় জমিদার-মহাজনের ঘরে। সাঁওতালেরা নিজেদের উৎপন্ন দ্রব্যের নগণ্য দাম পায়, কিন্তু তাদেরই উৎপাদিত যে-কোনো দ্রব্য হাট-বাজার থেকে ক্রয় করতে হয় আকাশচুম্বী। দামে।

সাঁওতালরা আদিম প্রাকৃত মানুষ। গায়ের রং তাদের কষ্টিপাথরের মতো কালো ; পরনে থাকে একফালি মাত্র কাপড়, মাথায় বাবরি চুল। ছোট বাবরিতে তারা গুঁজে রাখে ফুল, গলায় পরে পুতির মালা। মেয়েরা কষ্টিপাথরে খোদাই করা সুঠামগঠন নারীমূর্তি। ডাগর চোখ, কাপল ছোট, মাথার চুল ঘন কিন্তু লম্বায় খুব দীর্ঘ নয়। সিথি কাটেনা, সমান করে উজিয়ে টেনে চুল পাকিয়ে খোঁপা বাঁধে। খোঁপায় থাকে জিজির গাঁথা কাঁটা ফুল। কিন্তু তাও দেখা যায় না।

সেখানো থোকা থোকা হলুদ ফুল আর লাল ফুল গুঁজে রাখে।… এদের পরনে দুপ্রস্ত সাঁওতালী তাঁত বোনা মোটা সূতোর কাপড় ; রঙিন, একপ্রস্থ কোমর থেকে নিচের দিকে, অপর প্রস্তটাকে কোমরে একপ্রান্তে গুঁজে বুক ঢেকে পিঠ বেড়ে কোমরে আঁটসাঁট করে জড়িয়ে গোঁজে।” সাঁওতাল মেয়েদের সাজগোজ খুব পছন্দ।

উজ্জ্বল রঙিন কাপড় অধিক পছন্দ তাদের। সাঁওতাল যুবকদের হাতে সর্বদা তীর ধনুক শোভা পায়। বিভিন্ন পূজাপার্বণ ও অনুষ্ঠানে তারা অপেক্ষাকৃত ভাল কাপড় পরতে পছন্দ করে।

আদিম এই জনগোষ্ঠীর বিনোদনেরও কমতি নেই। কাজের অবসরে তারা নৃত্য-গীত ও পানাহারের মাধ্যমে আনন্দে মেতে ওঠে। মাদল ও বাঁশির সুরে পাহাড়ের নীরব পরিবেশকে তারা আনন্দে ভরিয়ে তোলে। সাঁওতাল নরনারী হাস্য-রসিকতা করতে পছন্দ করে। আবার তারা অশ্লীল কথার মধ্যেও একধরনের আনন্দ খুঁজে পায়। সাঁওতাল যুবকদের অধিকতর আনন্দের বিষয় হল শিকার করা। গোটা জাতিটাই আনন্দপ্রবণ একটা জাতি। শিঙ্গা, মাদল, বাঁশি হচ্ছে সাঁওতালদের প্রধান সাংস্কৃতিক উপাদান।

সাঁওতালরা মূলত কৃষিজীবী। কৃষিই তাদের আদি পেশা। চাষযোগ্য জমির প্রতি সাঁওতালদের রয়েছে গভীর অনুরাগ। তাদের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে হাজার হাজার একর অরণ্যভূমি উর্বর চাষযোগ্য জমিতে পরিণত হয়েছে।

আলোচ্য উপন্যাসে দেখা যায়, ভূমি কর্ষণের প্রয়োজনেই সাঁওতালরা প্রথমে ‘দামিন-ই-কোহ’তে এসে জড়ো হয়েছিল। অথচ, জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কূটকৌশলে অসংখ্য সাঁওতাল শেষ পর্যন্ত ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে শ্রমদাসে পরিণত হয়। ফলে তারা জীবিকা হিসেবে রেললইন তৈরির কাজ, মাটি কাটার কাজ ইত্যাদি ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়। শিকার ও কৃষিকাজ ছেড়ে সাঁওতালরা যখন অন্যান্য পেশায় যাচ্ছিল তখন থেকেই তাদের জীবনধারায় পরিবর্তনের সূত্রপাত। ইতিহাসের এই কালপর্ব থেকেই তারা ক্রমে বিচ্যুত হয়ে পড়ছিল স্বকীয় সংস্কৃতি থেকে।

সাহিত্যের সর্বত্র ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, চরিত্রের সঠিক চিত্রায়ন ও শিল্পের যথার্থতার জন্যই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ অঞ্চলের নিম্নশ্রেণির মানুষদের নিয়ে অধিক লিখেছেন। এদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল বলে এদের ভাষাও তিনি আয়ত্ত করেছিলেন।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে বীরভূমের আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়েই সাঁওতালি ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি। বাঙালি জমিদার-মহাজনের সঙ্গে নানামাত্রিক নৈকট্যের কারণে সাঁওতালি ভাষাও অবিমিশ্র থাকেনি উপন্যাসে। তথাপি এ-কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতে হবে যে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁওতালি ভাষা ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন। তাই তিনি মিশ্রভাষা ব্যবহার করতে পেরেছেন। অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে ত্রিবিধ ভাষা ব্যবহার লক্ষণীয়।

‘আমি’ রূপী সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিকের ভাষা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর নিজের ভাষা যা বিশুদ্ধ চলতি ভাষা । পটশিল্পী নয়ন পালের পদ্যাশ্রয়ী পটচিত্রের বর্ণনা বাংলা কাহিনীকাব্যের প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। আর তৃতীয় ভাষাটি সাঁওতালদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা। আদিবাসী সাঁওতালদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনাচার সম্পর্কে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা।

তাই এই উপন্যাসে ঔপন্যাসিক সাঁওতালি শব্দ, বাক্যাংশ ও সংলাপ, ছড়া ও গান অবলীলায় ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পাঠকের নিকট তা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। বরং আঞ্চলিকতার স্বাদ ও অনুভবযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্বোধ্যতার আশঙ্কা থেকে থেকে কখনো তিনি দুর্বোধ্য ও অজ্ঞাত শব্দের অর্থ সরাসরি প্রতিশব্দ যোগে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

যেমন: … আর আমাদের বাড়ি যাবি তো আয়। দাকা (অর্থাৎ ভাত) দিব, সিম (অর্থাৎ মুরগী) দিব, আর হাড়িয়া (অর্থাৎ পচুই মদ) খাস তো দিব।

এখানে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু সাঁওতালি শব্দ প্রতিশব্দসহ ব্যবহার – – আকাশে কালো মেঘ দেখে সাঁওতালরা বলছে, +20 করেছেন। আবার এমন বাক্যের ব্যবহারও লক্ষণীয় “বাবারে, কারীড়াং বিমীল বাকাপ পানা! (ভীষণ কালো মেঘ উঠল হে!) বিজলী মালকাও কানা! (বিদ্যুৎ চিকুরছে হে!) দা গায় (জল হবে) মারংহায়েদা গায় (ঝড় হবেক হে!)”।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় – এভাবেই সাঁওতালি ভাষাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন রাঢ়ী অপভ্রংশ ব্যবহার করে, যা পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও মানানসই হয়েছে। অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতালদের কর্ম-উদ্দীপনা, বিদ্রোহ, হাস- যন্ত্রণার কথা প্রকাশিত হয়েছে তাদের নিজস্ব ছড়া, গান ও সাঁওতালি ভাষার সংলাপ সহযোগে। আত্মীয়কে অভ্যর্থনায় সাঁওতালরা গান গায় :

সিগিডো দুবুই জান, কুপুলকো হিজা জা

সাও নারিগা পার্টী বিলাকম

গান্‌ডুরো বানো জান পটিয়া বানো জান

সাঁওতালদের ভাষায় তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা, সারল্য, সৌর্য ও স্বকীয় সংস্কৃতির পরিচয় মেলে।

সাঁওতালরা সৌন্দর্য সচেতন ও পরিচ্ছন্ন এক জনগোষ্ঠী। কারুশিল্পেও তারা দক্ষ। ঘরের দেওয়ালে মাটি ও গোবর দিয়ে আঙুলের সাহায্যে তারা খেজুর পাতার নকশা আঁকে; যত্ন করে মনোহর বাঁশি ও ধনুক তৈরি করে। সুন্দর ডালা, কুলা ও পাটি তৈরি করতেও তারা ওস্তাদ। তাদের তৈরি এসব সামগ্রী থেকে তাদের সৌন্দর্য ও শিল্পচেতনার পরিচয় পাওয়া যায়।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

পাচ

সাঁওতাল সমাজে পিতৃতান্ত্রিক প্রথা প্রচলিত। তথাপি নারী সেখানে অবহেলিত নয়। অশিক্ষিত অরণ্যবাসী আদিম এই কৌমের নর-নারীর সম্পর্ক অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর চেয়ে বেশ সংহত। বর্তমান উপন্যাসে আমরা প্রত্যক্ষ করি সাঁওতাল পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান পরিশ্রমী। নারী প্রাত্যহিক সকল কাজেই পুরুষকে সহযোগিতা করে। শ্রমের ক্ষেত্রে কেউ পিছিয়ে নেই। যার ফলে নারীর অবস্থান এই সমাজেও বেশ সুসংহত। তথাকথিত শিক্ষিত না হয়েও তাদের মধ্যে হাস্যরস, সম্মিলিত আনন্দ উল্লাসের প্রবণতা লক্ষণীয় । তবে তা বহুলাংশে আরণ্যক আমেজমণ্ডিত।

সাঁওতাল কৌমে গোত্রপতির প্রাধান্য বেশি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে গোত্রপতির শাসন মান্য করে। কঠোর গোত্র শাসনের ফলে কখনো নারীর সামাজিক জীবনও হয় শৃঙ্খলাবদ্ধ। কেনারাম ভক্ত মহেশ দারোগার কামনা চরিতার্থের জন্য মাহাতো, হাড়ী, বাগদী, বাউরী ইত্যাদি নিচু শ্রেণির আদিবাসী নারীদের ধরে নিয়ে আসত। কিন্তু কখনো সাঁওতাল নারীদের দিকে হাত বাড়াতো না কারণ সাঁওতালদের নিজেদের সমাজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দৃঢ় ও সংঘবদ্ধ ছিল।

আর সাঁওতাল নারীরা ছিল স্বাধীনচেতা, একরোখা, উদ্ধত, সহজ-সরল ও রসিকতা প্রিয়। সাজ-সজ্জা ও সৌন্দর্যের প্রতি যেমন তাদের আগ্রহ তেমনি তারা কর্মপ্রিয়ও। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তাদের চরিত্রের সহজাত একটা প্রবণতা। কানুর স্ত্রী টুশকি ‘জহর-সর্ণা’ থেকে ফেরার পথে পিছিয়ে পড়া সিধু-কানুকে যে সুরে ডেকেছিল। তা থেকেই সাঁওতাল নারীর অবস্থান ও স্বভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

শুনছ হে-হেই! হেই দু ভেয়েরা! বলি পিছাও কেন হে? ঘর দুয়ারে পাটকামগুলা করবেক কে? বলি দিগরা চারটে কাঁদছেক, ভুখ লাগল, তাদের খেতে দিব, না ঘর কাম করব? ই। আমাদিগে কিনে আনছিস না কি? দিগ্রাগুলা আমরা +28 বাপের ঘর থেকে আনলম লয়? লাজ লাগে না তুদের? এই অংশটুকু থেকে আমরা সাঁওতাল নারীর উদ্ধত স্বভাব ও স্কুল রসবোধের পরিচয় পাই।

সাঁওতাল নারীর সবকিছুতে পুরুষের সাথে আছে সম অংশগ্রহণ। পরিশ্রমের ক্ষেত্রে যেমন নারী-পুরুষের সমতা ছিল, তেমনি আনন্দ উল্লাসেও তারা একত্র অংশ নিত। একসঙ্গে গ্রামের নানা অনুষ্ঠানে নারীরা নাচে গায়, মদপানে আনন্দ করে। অরণ্যবাসী হলেও সাঁওতাল সমাজে নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিদ্যমান। সাঁওতাল নারী সম্বন্ধে ইংরেজরা ভাবতো এদেশের সন্টাল মেয়েগুলো মাথায় কাপড় ঢাকা দেয় না, সামনাসামনি কথাবার্তা বলে লজ্জা করে না, হাসে।

কিন্তু তারা বুনো জাত, অসভ্য জাত, তাদের স্বাস্থ্য আছে, যৌবন আছে তারা লোভনীয় কিন্তু অত্যন্ত একগুয়ে।’
তথাকথিত সভ্য মানুষের দৃষ্টিতে সাঁওতালরা বুনো জাত, অশিক্ষিত-বর্বর হলেও অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে নরনারীর মধ্যে উন্নত মানবীয় প্রেম পরিলক্ষিত হয়।

এ সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক কেবল কামনাসর্বস্ব নয়। সিধু-কানু প্রথম যৌবনে রুকনী-টুকনীর প্রতি প্রেমাসক্ত হয়েছিল। রুকনী-টুকনীও সিধু- কানুকে মন দিয়েছিল। কিন্তু বাবা চুনার মুর্মুর ইচ্ছায় দুই ভাই ফুল ও টুশকীকে বিয়ে করে। কিন্তু তারা কেউই অতীতপ্রেমের সুখস্মৃতি ভুলতে পারে না।

রুকনি-টুকনি খ্রিস্টান হয়ে রাস্তাবন্দির কাজে চলে গিয়েছিল তাদের বাবার সাথে। সেখানেও তারা, সিধু-কানুকে মন দিয়েছিল বলে অন্য কাউকে বিয়ে করেনি। রুকনী-টুকনী-মানকী ইংরেজ সাহেব কর্তৃক অপহৃত ও ধর্ষিত হয়। রুকনী ঘুমন্ত সাহেবকে কিরিচ দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে আসে। দুরন্ত সাহসী সাঁওতাল নারী তার সম্ভ্রম হারানোর প্রতিশোধ নেয় হত্যার মাধ্যমে।

সাঁওতালরা অরণ্যবাসী হলেও তাদের জৈবিক কামনা বাসনা নিতান্ত আরণ্যক প্রকৃতির ছিল না। নারী- পুরুষের মধ্যে আমরা হার্দিক প্রেম-ভালোবাসাই দেখতে পাই। মানকী-লালমাঝির মধ্যে গভীর প্রেম প্রত্যক্ষ করা যায়। মানকী লালমাঝির জন্য ঘর ছেড়েছে, বিয়ে করেছে, কিন্তু কোনো পঙ্কিলতা তাদের স্পর্শ করেনি।

জৈবিক কামনা উপন্যাসে নর-নারীর প্রেমের হার্দিক পথ ধরেই এসেছে। সিধু-কানু ও তাদের প্রথম প্রেম রুকনী-টুকনীর প্রতিও কোনো সমাজ নিষিদ্ধ আবেগ প্রকাশ করেনি, এমনকি পিতৃআজ্ঞা রক্ষার্থে ফুল আর টুশকীকে বিয়ে করবার পর স্ত্রীর সঙ্গেও স্বাভাবিক ভালবাসাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাঁওতালদের বৈবাহিক সম্পর্ক ও বন্ধন সুদৃঢ় ।

সাঁওতাল সমাজে পিতাকে যথেষ্ট সম্মান করা হয়। পারিবারিক ও সামাজিক কঠোর অনুশাসন এবং বড়দের প্রতি সম্মানবোধই সাঁওতাল কৌমে নরনারীর মর্যাদাপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাঁওতাল পরিবারের কেন্দ্রীয় শক্তি ছিল পিতা বা জ্যেষ্ঠর হাতে।

এই প্রথার প্রতি সম্ভ্রমবোধ সাঁওতালদের সমাজজীবনকে অন্য অনেক কৌম থেকেই করেছিল নীতিসিদ্ধ, উদ্দাম, ব্যাভিচারিতামুক্ত ও সুশৃঙ্খল। তবে, সাঁওতালদের মধ্যে বর্ণভেদ কিছুটা লক্ষণীয়। একগোত্রের পুরুষ অন্যগোত্রের নারীকে, বিশেষত উঁচু-নিচু শ্রেণির মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন তারা একদম পছন্দ করে না।

উপন্যাসে তাই মুর্মু বংশের মেয়ে মানকীকে চুনার মুর্মু হাঁসদা বংশের ছেলের কাছে বিয়ে দিতে চায়নি। তারা পালিয়ে বিয়ে করেছিল। কাহার বা বেদের মতো সাঁওতাল নর-নারীর মধ্যে আমরা কামনার উদগ্র ও নগ্ন আকাঙ্ক্ষা প্রত্যক্ষ করি না। তাদের মধ্যে একটি পরিশীলিত মানসিকতা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজব্যবস্থা বিরাজমান।

কর্মজীবনেও নারী পুরুষের মধ্যে আছে সহযোগিতা ও সহমর্মিতাপূর্ণ সম্পর্ক। সাঁওতাল নারী-পুরুষ উভয়ই প্রচণ্ড পরিশ্রমী। নারী গৃহকর্মের পাশাপাশি বাইরের কাজে এমনকী শিকারের কাজেও পুরুষকে সহায়তা করে। ১৮৫৪-৫৫ সালে সাঁওতালদের সেই অগ্নিঝরা বিদ্রোহের দিনেও আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি নারী পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করছে তীর ধনুক টাঙ্গি তলোয়ার এগিয়ে দিয়ে সশরীরে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছে।

রুকনী পুরুষের বেশে সিধুর দেহরক্ষীর ভূমিকা পালন করেছে। সাঁওতালদের গ্রামে গ্রামে ঘোড়ায় চড়ে সংবাদ আদান প্রদান করছে সে। যুদ্ধের সময় আমরা রুকনীকে পাই একজন অসম সাহসী নারী রূপে। তার দূরদর্শিতা সাঁওতালদের যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। টুকনীকে দেখি কানুর পাশে থেকে যুদ্ধ করতে। এমন বীরাঙ্গনা নারীর মধ্যে আবার কোমল রূপও লক্ষণীয়।

সিধু যখন রুকনীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয় তখন রুকনী জবাব দেয় না। ফুল কাঁদবেক। আমি তুমার চাকরানী শুভোবাবু! ফুলের চাকরানী। শুধু আমাকে তুমার চাকর কর শুভোবাবু, সিপাই কর। তুমি লড়াই করবে, আমি তুমার সাথে থাকব। টাঙি লিব, ধেনুক কাড় লিব— লড়ব আমি তুমার পাশে দাঁড়ায়ে। সিধু রুকনীকে সোনার হার দিয়েছিল। রুকনী তা চাদরে বেঁধে রেখেছিল সিধুর স্ত্রী ফুলের জন্য; আর বলেছিল, ‘আমার ফুলরানীর দাও আগে রাজাবাবু, আমি তাকে দিব! ই হারটোও দিব। সিপাহী হার পরে গ! আমি কি মেয়া বটি।

সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় সিধু-কানু দুই ভাইয়ের প্রেরণা ও শক্তি হিসেবে পাশে থেকেছে রুকনী টুকনী দুই বোন। রুকনী সিধুর দেওয়া সিঁদুর পরেনি। সাঁওতালদের মুক্তি ও সিধু-কানুর সেবাই ছিল তখন তার ব্রত। তাই নয়ন পাল ছড়ায় তাদের সম্পর্কে বলেছেন :

সাধকের শক্তি যারা তারা নয় বধূ। তারা হয় জীবনের মনোরমা শুধু।

রুকনী একদিকে নিজের স্বার্থমগ্ন প্রেমের চেয়ে দেশকে বড় করে দেখেছে, অন্যদিকে ফুলকেও সে কষ্ট দিতে চায়নি। সিধুর ফাঁসির পর তার স্ত্রী ফুল রুকনীকে আশ্রয় দিয়েছিল, কাছে রেখেছিল। স্বামীর প্রত্যাশিতাকে স্থান দিয়ে আদিম সাঁওতাল নারী ফুল অনন্য মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

প্রকৃতির আদিম সন্তান সাঁওতালেরা সত্যিকারের বীর ছিল। তাদের চরিত্রে কোনো শঠতা ছিল না। বন্য হলেও তারা ছিল সুশৃঙ্খল জাতি। নারীর প্রতি পুরুষের অপরিসীম আন্তরিকতা ও মর্যাদাবোধ ছিল। সেকালের ‘সংবাদ প্রভাকর’ যাই বলুক বাস্তবিক অর্থে বিদ্রোহে উন্মাদনায় দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া তারা নারী হত্যা থেকে বিরত থেকেছে যুদ্ধের সময়ও। সংবাদ প্রভাকরে’ সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় সাঁওতালদের অত্যাচারের অতিরঞ্জিত খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

পত্রিকাটি বিদ্রোহ দমনে ইংরেজ বাহিনী প্রেরণের এবং হিন্দু জমিদার প্রেরিত কাল্পনিক খবরই প্রকাশ করত। নারীর ওপর অত্যাচারের খবরটি অতিরঞ্জিত ছিল। আবদারপুরের দুর্লভ সত্যবাদী ধ্বজু মল্লিক জানান যে, ‘মেয়েছেলের ওপর অত্যাচার শুনিনি।’ যুদ্ধের সময়ও সাঁওতালরা নারী ও শিশু হত্যা থেকে বিরত থেকেছে। এ থেকে সাঁওতালদের উন্নত মানবীয় পরিচয়ই পাওয়া যায়। তারা নারীকে অবজ্ঞা করত না। স্বীয় সমাজের নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য তারা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল।

উপন্যাসে বিধৃত বিদ্রোহের কাহিনীতে রুকনী, টুকনী ও মানকী অপহৃত হলে তারা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। রাতের আঁধারে সাহেরদের হত্যা করে তারা মেয়েদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে। বৃদ্ধ চুনার মুর্মুর অসহায় বিধবা বোনকে সাংসারিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়েছিল। এসব ঘটনা তাদের সমাজে নারীর প্রতি মর্যাদাবোধেরই প্রমাণ দেয়।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

ছয়

সাঁওতাল সম্প্রদায় মিশ্র ধর্মের অনুসারী ছিল। শিক্ষাবঞ্চিত এই আদিম জাতিগোষ্ঠী তাদের চিন্তার বাইরে যা কিছু ঘটে তাকেই অলৌকিক বলে মেনে নেয়। ওই সবকিছুতেই তারা খুঁজে পায় দেব মাহাত্ম্য। সাঁওতালদের প্রধান দেবতা মরং বোঙ্গা । তাদের ধর্মীয় জীবনে হিন্দু সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। দুর্গা ও কালীকেও তারা মান্য করে, পূজা দেয়। হিন্দু ধর্মের মতো পৌত্তলিকতার প্রচলন আছে তাদের ধর্মেও।

ঝড়, বৃষ্টি, দাবানল, বজ্রপাত সবকিছুর মধ্যেই তারা বোঙ্গার ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন লক্ষ করে। রোগ-শোক, ক্ষুধা-দারিদ্রা, ভাল ফসল পাওয়া ইত্যাদি সবকিছুর জন্যই তারা বোঙ্গাকে স্মরণ করে, বোঙ্গার পূজা করে। তাদের সবরকম দুঃখ-দুর্দশার কারণ হিসেবে বোঙ্গার অসন্তুষ্টিকে বিবেচনা করে তারা। আবার এই সরল বিশ্বাসী সাঁওতালরা প্রয়োজনে সবকিছু লও-ও করে দিতে পারে।

তাই সিধু ও কানু বোঙ্গার টাঙ্গি’ প্রাপ্তির প্রার্থনা করে যাতে অত্যাচারী ইংরেজ ও জোতদারদের কেটে ফেলতে পারে। তাদের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাসের অবস্থান। তাই তারা যে কোনো কাজে এবং প্রত্যেক ঋতুতে বোঙ্গার পূজা দেয়। শূকর, মুরগী, হাঁস ইত্যাদি দেবস্থান জহর সর্নায় বোঙ্গার উদ্দেশে বলি দেয়।

ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়া এবং বেঁচে থাকার জন্য সাঁওতালদের কেউ কেউ পাদরিদের প্ররোচনায় খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে, মিশনারিতে যায়। সেখানে তারা ঈশা ও মেরিকে ডাকতে শেখে। কিন্তু তারা সাঁওতাল-ধর্ম, বোঙ্গার প্রতি বিশ্বাসকে ছাড়তে পারে না। বিপদে আপদে, যে কোনো সংকটে একইসঙ্গে ঈশা, মেরি, বোগা, দুর্গা, কালীকে ডাকে। তাঁদের কাছেই সাঁওতালরা আশ্রয় খোঁজে, সাহায্য প্রার্থনা করে।

এভাবে সাঁওতালদের কাছে সব ধর্ম যেন একাকার হয়ে যায়। সব ধর্মকেই তারা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে আছে। কোথাও এই মিশ্রণ কোথাও তাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা তৈরি করেনি। হিন্দুদের দূর্গা পূজার সময় তারা মহানন্দে দলে দলে যোগ দেয়, মাদল বাজায় বাঁশি বাজায়, নাচে-গায়, ‘হাড়িয়া’ পান করে। অরণ্য বহ্নি-তে সিধু-কানু সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় মূর্তি গড়িয়ে পুরোহিত আনিয়ে দুর্গা পূজা করেছিল।

ভৈরবী মায়ের অনুকরণে লাল ও রুকনী দেবী কালীকে বুকের রক্ত দিয়ে তুষ্ট করেছিল। সাঁওতালদের কাছে বোঙ্গা, কালী, দূর্গা এক মহাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। যুদ্ধের সময় বোঙ্গার নির্দেশ ও সাহায্য কামনা করে তারা। বোঙ্গার আশীর্বাদে ইংরেজদের বন্দুকের গুলি জল হয়ে যাবে বলেও তারা বিশ্বাস করে।

সমগ্র সাঁওতাল সম্প্রদায় বিশ্বাস করে মরং বোঙ্গা সিধু-কানু দুই ভাইকে শুভোবাবু অর্থাৎ রাজা করেছেন। তারা সাঁওতালদের রাজা। সাঁওতালদের বিশ্বাস তাদের চিরকালীন দুঃখ দূর করার জন্যই বোঙ্গা তাদের পাঠিয়েছেন। আদিম সরল অরণ্যচারী সাঁওতাল জাতিকে তাদের অন্ধ বিশ্বাস দ্বারাই পরাজিত করেছিল ধূর্ত মানবতাশূন্য ইংরেজ বাহিনী। সাঁওতালরা বিশ্বাস করেছিল বোঙ্গা ও দুর্গার মিলিত আশীর্বাদে গুলি জল হয়ে যাবে, তাদের গায়ে লাগবে না।

ইংরেজরা সাঁওতালদের এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছিল। প্রথমে তারা ফাঁকা গুলি করেছিল। সাঁওতালরা তা বুঝতে না পেরে দলে দলে সমতলে নেমে আসে। তারা মনে করেছিল সত্যি সত্যি গুলি জল হয়ে গেল। এই সুযোগে সরল পরাক্রমশালী হাজার হাজার সাঁওতালকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল কূটকৌশলী ইংরেজ বাহিনী। ইতিহাসের সে এক কলঙ্কজনক ঘটনা অধ্যায়।

সাত

সাঁওতালরা বিচিত্র এক আদিবাসী জনগোষ্ঠী । তাদের জীবনাচারও বিচিত্র রকমের। তাদের মধ্যে গোষ্ঠীগত ঐক্য প্রবল। সহজ, সরল, প্রাণবন্ত তাদের জীবনধারা। নিরন্তর সংগ্রাম তাদের শুধু বেঁচে থাকার জন্য। জমিদার ও মহাজনরা তাদের সরলতার সুযোগে সর্বস্ব কেড়ে নিলেও তারা প্রতিবাদ করতে চাইত না।

সাঁওতালদের ধোকা দিয়ে ঋণ দিয়ে ক্রীতদাসে পরিণত করত তারা। বিক্রয়ের সময় দ্রব্যাদি ওজনে কম দিত মহাজন, তাদের বিক্রিত এক কেড়ে ঘিতে এক সেরও হত না। সকল অত্যাচার সাঁওতালরা মুখ বুজে সহ্য করত। তারা এত সহজ সরল আর নির্বোধ ছিল যে, মহাজন ঠাকাচ্ছে বুঝলেও কীভাবে ঠকাচ্ছে তা বুঝত না।

সাঁওতালরা কখনো মিথ্যা কথা বলে না এবং মিথ্যা বলা তারা পছন্দও করে না। মিথ্যা শুনলেও তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়। তাদের জীবনাচারে মিথ্যা, ফাঁকি, শঠতা এসবের কোন স্থান নেই। নারী-পুরুষ উভয়ই সমান হারে পরিশ্রম করতে পারে বলে স্বার্থপর সভ্য সমাজ তাদের পরিশ্রমের কদর করত । কেননা কাঁকর মিশ্রিত পাহাড়ি শক্ত অনুর্বর মাটি তাদের হাতের ছোঁয়ায় উর্বর স্বর্ণ প্রসবিনী হয়ে উঠত। কিন্তু যুগ যুগ ধরে বঞ্চনা ছাড়া জীবনে আর কিছুই তারা পায়নি।

সাঁওতালরা পরোপকারী ও অতিথিপরায়ণ। অরণ্য বহ্নি উপন্যাসোক্ত উত্তমপুরুষ লেখক যখন পাহাড়ি রাস্তায় মোটর গাড়ি নষ্ট হয়ে পড়ায় সন্ধ্যার সময় আটকে যান, তখন তারাই তাঁকে বাংলোর সন্ধান দেয়, গাড়ি ঠেলে বাংলোর নিকট পৌঁছে দেয়।

সাঁওতালরা তাঁকে বলে— “সিখানে যা তুরা। গাড়ি রেখে থাকবি কাল বাসে চাপে যাবি সায়েবগঞ্জ — মিস্ত্রি নিয়ে এসে মেরামত করিয়ে লিবি। লইলেই এখানেই থাক। আর আমাদের বাড়ী যাবি তো আয়। দাকা (অর্থাৎ ভাত) দিব, সিম (অর্থাৎ মুরগী) দিব, আর হাড়িয়া (অর্থাৎ পচুই মদ) খাস তো তা দিব’ ৩১। গাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য লেখক পারিশ্রমিক দিতে চাইলে সাঁওতালরা টাকা নেয়নি। কারণ বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করা তাদের ধর্ম। সাঁওতালরা লেখকরূপী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানিয়েছে তাদের টাকা নিতে নিষেধ আছে।

তারা বলেছে— বারণ করে গেইছে আমাদের শুভোবার। সিধু আর কানহু আমাদের শুভোবাবু ছিল।… তারা বইলে গেইছে কি দেখ মানুষের যখুন বিপদ হবে তখন তাকে বাঁচাবি, রাখবি, নিজের জানটা দিবি, কিছু লিবি না তার কাছে; রাতে মানুষ এসে ঠাঁই চাইলে তাকে ঘরে ঠাঁই দিবি, নিজে বাহার শুবি ৩২। বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই অরণ্যচারী সাঁওতালদের মধ্যে পরোপকারের এমন চমৎকার মানসিকতায় ।

অরণ্যবাসী আদিম অশিক্ষিত সাঁওতালদের কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস থাকাটাই স্বাভাবিক। তাদের ভাল মন্দের জন্য তারা দেবতার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিকেই দায়ী করে। সবকিছুতেই তাদের দেবতা বোঙ্গার প্রতি তাদের পরম নির্ভরতা। সাঁওতালদের মধ্যে গোত্র বিভাজন থাকলেও অন্যান্য আদিবাসীদের মতো তাদের মধ্যে গোত্রগত চরম কোনো বৈরীভাব নেই।

গোত্র শাসনের প্রতি তারা সবাই শ্রদ্ধাশীল। দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর রাতে নারী-পুরুষ একত্র নিজেদের তৈরি মদ খেয়ে নাচ-গান করে। গান-বাজনা- নাচ, আনন্দ উল্লাস তাদের সহজাত প্রবণতা। সাঁওতালদের চাওয়া পাওয়া খুব সামান্য। তবে তারা নারী- পুরুষ উভয়েরই সৌন্দর্য প্রিয়। বেদে বা কাহারদের তুলনায় সাঁওতালরা বেশি সৌন্দর্যপ্রিয় ও পরিচ্ছন্ন কৌমগোষ্ঠী।

আদিবাসী এই জনগোষ্ঠী যেমন সরল, তেমনি আবার প্রচণ্ড একগুঁয়ে ও রাগী। তবে তারা প্রকৃত বীরের জাত। হাজার হাজার বছরের শোষণ, বঞ্চনা, অত্যাচার যখন তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছিল তখন অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, বিদ্রোহ করেছিল মহাজন জমিদার এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে। হাজার হাজার সাঁওতাল সেদিন বেদনার আক্রোশে ফুঁসে উঠেছিল। সাঁওতালরা নির্দ্বিধায় মরতে জানে কিন্তু পিছু হটতে জানে না।

সাঁওতালদের নিজেদের আত্মমর্যাদা বোধ সম্পর্কে যেমন সচেতনতা ছিল, তেমনি অন্যের প্রতিও তাদের মানবিকতাবোধ ছিল। তাদের উন্নত মানবিকতাবোধের পরিচয় পাওয়া যায় হান্টারের লেখা থেকেও।

হান্টার সাঁওতালদের সম্পর্কে লিখেছেন, ‘Even in their moment of success, however, the Santals were not wanting in a sort of barbaric chivalry and gave fair warning of purpose to plunder a town before they actually
Dhaka University Institutional Repository came. বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তখন অপরাধপ্রবণ আদিবাসী গোষ্ঠীও বাস করত। কিন্তু সাঁওতালরা তাদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির।

চারিত্রিক দৃঢ়তা, সততা ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন তাদের সহজাত স্বভাব। সাঁওতালদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে দিলীপ সরেন ছয়টি বিষয় উল্লেখ করেছেন :

১. সাঁওতালদের কাছে প্রাণের চাইতে স্বাধীনতার মূল্য অনেক বেশি।

২. সাঁওতালরা দলিত, শোষিত, নির্যাতিত জনগণের দুঃখমোচনের জন্য নেতৃত্ব দিতে জানে।

৩. অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করতে দ্বিধাবোধ করে না। প্রয়োজন হলে তারা হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে।

৪. সাঁওতালেরা অনাচার, অত্যাচার ও শঠতাকে ঘৃণা করে।

৫. সৎ, সামাজিক স্বাধীনতা ও স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য অধিকার সাঁওতালদের জীবনে এক চিরন্তন সত্য ।

৬. সাঁওতালেরা ভাঙে, কিন্তু মচকায় না।

অরণ্যবহ্নিতে আমরা সাঁওতালদের স্বভাব ও জীবনাচরণের যে পরিচয় পাই তার সঙ্গে দিলীপ সরেন এর মন্তব্যের পূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কালিন্দী উপন্যাসেও সাঁওতালদের সম্পর্কে এমনই বিশ্বস্ত চিত্র এঁকেছেন

আট

সাঁওতাল সম্প্রদায় এককালে অরণ্যে স্বাধীন জীবনযাপন করত। তাদের রাজা ছিল, রাজ্য ছিল। শিকার আর কৃষির ওপর নির্ভর করে দূরন্ত সাহসী আর কঠোর পরিশ্রমী এই সাঁওতালরা শান্তিতেই ছিল। তাদের এই গৌরবময় অতীতের কথা স্মরণ করে তারা এখনো বেদনা অনুভব করে।

বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ তারা আসুরিক শক্তি দিয়ে অরণ্য থেকেই সংগ্রহ করে নিত। তাদের জীবনে অভাব ছিল শুধু লবণের। কিন্তু একদা তথাকথিত সভ্য মানুষের ভরসায়, সভ্য মানুষের সঙ্গ লাভের প্রত্যাশায় প্রলোভনে পড়ে সাঁওতালরা অরণ্য ঘেরা পাহাড় থেকে সমতলে নেমে এসেছে। কঠিন ঊষর মাটিকে করেছে উর্বর, চাষোপযোগী। আর ইতিহাসের ওই সময়পর্ব থেকেই তারা আর্থনীতিক শোষণের শিকার হয়েছে।

তাদের প্রতি বিস্তারিত হয়েছে হিংস্র স্বার্থলোভীদের থাবা। সভ্য মানুষরা স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তাদের অমানবিকভাবে ক্রীতদাসে পরিণত করেছে। সাঁওতালদের দিয়ে জমি তৈরি করিয়ে নিয়ে তারা অবশেষে কেড়ে নিয়েছে তাদের জমি। অরণ্য জীবনে যতটুকু হলে বেঁচে থাকা যায়, সেই আরণ্যক স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে কোন প্রকারে বনের ফলমূল সংগ্রহ করে এবং পশুপাখি, জন্তু-জানোয়ার শিকার করে তা আগুনে পুড়িয়ে তার ক্ষুন্নিবৃত্তি পূরণ করে।

তাদের সাদামাটা জীবনে চাহিদাও অত্যন্ত সীমিত। তথাপি প্রাণপ্রাচুর্যের অভাব নেই সাঁওতালদের। সভ্য মানুষের সংলগ্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জটিল আর্থনীতিক মারপ্যাচে ও শোষণকৌশলে সাঁওতালদের জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজদের কর সংগ্রহের কৌশলগত কারণে এদের সমতলে নামিয়ে আনা হয় জমির লোভ দেখিয়ে।

অসুর বিক্রমে পাহাড় কেটে, কাঁকর সরিয়ে তারা তৈরি করে দেয় খাস জমি। কিন্তু খাজনা দেওয়ার কথা না থাকলেও তাদের বসতবাটী ও কৃষিজমির ওপর খাজনা আরোপ করা হয়। মহাজন ও জমিদারশ্রেণি তাদের শোষণের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্মমভাবে। এভাবেই যখনই সাঁওতালেরা আধুনিক জীবনের জটিলতার প্রবেশ করে, তখন থেকেই তাদের অবস্থা খারাপ হতে থাকে।

বেঁচে থাকার জন্য খাবার আর লজ্জা নিবারণের জন্য এক টুকরো কাপড় হলেই যাদের চাহিদা মিটে যায়, তাদেরকে স্বীয় জীবনধারা থেকে কৌশলে টেনে আনা হয়েছিল অর্থনৈতিক শোষণের জন্য। সাঁওতালরা নিজেদের ধান বিক্রি করবার সময় ওজনে বেশি দিত, কিন্তু যে-কোনো দ্রব্য ক্রয় করবার সময় মহাজনেরা কম দিত ওজনে। এর জন্য দুই ধরনের বাটখারা রাখত মহাজনেরা। বাটখারার নাম ছিল বেচারাম কেনারাম। চড়া সুদে মহাজনরা সাঁওতালদের টাকা ধার দিত। দশ টাকা ধার নিলে একজন মানুষ সুদে আসলে সে টাকা বংশ পরম্পরায়ও শোধ করতে পারত না। ফলে সাঁওতালদের ক্রীতদাস হিসেবে থাকতে হতো বংশানুক্রমে ।

ইংরেজ শাসক, জমিদার, মহাজন ও শাসক প্রতিনিধি মহেশ দারোগাসহ সবাই সাঁওতালদের আর্থনীতিকভাবে শোষণ করত। এক কেড়ে ঘি বিক্রি করে এক সের লবণ পেতনা সাঁওতালেরা। একটি পুঁতির মালা কিংবা একটি নাকছাবি কেনার স্বপ্ন সাঁওতাল নারী বা যুবকের স্বপ্নপূরণ হয় না মাসব্যাপী সঞ্চিত অনেক জিনিস বিক্রি করেও। তাই এক কেড়ে ঘি, এক আটি ময়ূরের পালক ও শিকার করা বাঘের নখ বিক্রি করেও সিধু আড়াই সেরের বেশি লবণ পায়নি। সিধু স্ত্রীর জন্য হাঁসুলী, সন্তানদের জন্য বালা কিনতে পারেনি।

শুধু ঘুরেছে আর দেখেছে— ‘দোকানে দোকানে কত জিনিস। কত রং কত ৩৫ সুন্দর। কিন্তু তাদের পয়সা নেই। শুধু দেখেই বেড়ালে।’ এই ছিল তাদের আর্থনীতিক অবস্থা। সাঁওতালদের আর্থনীতিক অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় দশ টাকায় একজন মানুষ বিক্রি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় এবং বেচারাম কেনারামের প্রবর্তন থেকে।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

নয়

সাঁওতালরা কৃষিজীবী বলেই ভূমির প্রতি তাদের দুর্নিবার আকর্ষণ। পাহাড়ের যেখানেই সুবিধামত জায়গা পাওয়া যায় সেটুকুকেই তারা চাষযোগ্য করে নেয়। পরিশ্রমী হিসাবেও তাদের জুড়ি নেই। কালিন্দী উপন্যাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁওতালদের সম্পর্কে লিখেছিলেন ‘সত্য সত্যই উহারা মাটির কীট। মাটিতেই উহাদের জন্ম, মাটি লইয়াই কারবার, মাটিই উহাদের সব।৩৬

মাটির টানেই পাহাড় থেকে সমতলে নেমে এসেছিল সাঁওতালরা। বিহারের ভাগলপুর জেলার আশেপাশে ও বীরভূমের উত্তর পর্যন্ত অসংখ্য গ্রাম তৈরি করেছিল সাঁওতালেরা। ‘পাহাড়ের কোলে কোলে বসতি স্থাপন করলে— অসংখ্য গ্রাম গড়ে উঠল। গড়লে তারাই। বন কাটলে সূর্যের আলোকে করলে অবারিত; উঁচু নিচু মাটি কেটে করলে সমতল। পাহাড়ের ঝর্ণাকে পাথর দিয়ে বেঁধে করলে জলাধার। চারি পাশ থেকে বাঘ ভালুক তাড়ালে ।

সরীসৃপ মারলে— তাদের হঠালে। পাথর কাঁকর মেশানো জমিকে অসুর বিক্রমে কর্ষণে কর্ষণে উর্বর করলে। ৩৭ কিন্তু তারা জানল না এত পরিশ্রমে গড়া জমি তাদের নিজেদের নয়। ১৮৫৪-৫৫ সালে ডালহৌসী ব্রহ্মদেশ পর্যন্ত হাত বাড়িয়ে ভারতবর্ষ জয় সুসম্পন্ন করলেন। পরে, কৌশলী ইংরেজরা রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যেই অরণ্য অঞ্চলের দিকে হাত বাড়ায়।

সাঁওতালদের পাহাড় থেকে জমির লোভ দেখিয়ে সমতলে টেনে আনা হয় এই উদ্দেশ্যে। কিন্তু সাঁওতালদের তৈরি জমি যখন উর্বরতায় পূর্ণতা পেয়েছে তখনই মধ্যস্বত্বভোগী জমিদার-মহাজন শ্রেণি তা কেড়ে নিতে চেয়েছে নানা কৌশলে। এক পুরুষের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি জমি পরবর্তী পুরুষরা ভোগ করতে পারেনি কখনোই। বারবার তারা নিজেদের জমি থেকে উৎখাত হয়েছে।

কালিন্দী উপন্যাসেও আমরা দেখতে পাই সাঁওতালরা নতুন জেগে ওঠা চরের ঘাস কেটে পরিষ্কার করে কঠোর পরিশ্রমে গোটা চরটাকেই সুফলা করে তোলে। সদগোপ চাষীরা যেখানে ভয়ে প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে সাঁওতালরা সাপ, বাঘ, জন্তু-জানোয়ার পোকা-মাকড় তাড়িয়ে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু দুই জমিদারের দ্বন্দ্বের সুযোগে নব্য ব্যাবসায়ীর কূটচালে নিজেদের গড়া পৃথিবী থেকে উন্মলিত হয়ে পড়ে সাঁওতালরা।

শত শত বছর ধরে সরল সাঁওতালদের সাথে চলে আসছে এমনই আচরণ। সভ্য জাতির শোষণ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা পাহাড়ের ধারে জমি তৈরি করে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করে বার বার ; কিন্তু তারা অচিরেই প্রত্যক্ষ করে স্বার্থলোভী নির্মম অত্যাচিরীর হস্ত। নিজেদের তৈরি ভূমিতে স্বাধীন বসবাসের অধিকার হারিয়েছে তারা বারবার। রুক্ষ কঠিন মাটি আর ভয়ানক অরণ্যই তাদের প্রাণপ্রিয় ভূমি।

সেই ভূমির ওপর আরোপিত কর বছরে বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। সারল্য, কর্মনিষ্ঠা এবং শ্রমবলিষ্ঠতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই কেবল স্বার্থের জন্য তাদের প্রতি শোষণের হাত বাড়িয়েছে। অত্যাচার এবং শোষণের মাত্রা ক্রমে কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। বেনিয়া ইংরেজ রাজত্বের সীমানা বৃদ্ধি, ব্যবসার প্রসার ও রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাঁওতালদের ব্যবহার করেছে শ্রমদাস হিসাবে। ভূমি তৈরির পরই তারা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে সাঁওতালদের।

ফলত পিতৃ-পুরুষের প্রিয় অরণ্য অঞ্চলের অধিকার ও স্বাধীন জীবন যাপনের অধিকার হারিয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে; নিজেদের অরণ্যভূমি রক্ষার্থে বিদ্রোহী হতে বাধ্য হয়েছে। অরণ্য বহ্নি-র ঐতিহাসিক বিদ্রোহী সিধু বলে, ই আমাদের দেশ বটে। এ দেশটো আমাদের। ই আমাদের দেশ আমরা লিব।

আমাদের দেশ ইটো সিধুর সঙ্গে সঙ্গে কানু একসাথে বলে উঠল—ই, ইটো আমাদের দেশ বটে। আমাদের দেশ। ‘হা, তাদের সে • পূর্বে এই গঙ্গা নদী— দক্ষিণে হুই বর্ধমানের এলাকায় দিকুদের এলাকা— এর মধ্যে এই পাহাড় জঙ্গল বনবাদাড়, নদীনালা, মাঠঘাট, ক্ষেতখামার, গাছপালা জন্তুজানোয়ার পাখি ফড়িং— সব তাদের। সব তাদের। হ্যাঁ, তাদের।

দশ

মাটির মতো নিরীহ, শান্ত, নিরক্ষর অরণ্যবাসী সাঁওতালদের শোষণ করে সভা জগতের সবাই। মহাজন, জমিদার, ইংরেজ শাসক ও শাসন-সহায়ক দারোগা নানা প্রক্রিয়ায় শোষণ নির্যাতন চালিয়েছে নির্বোধ শান্তিপ্রিয় এই আদিবাসীদের ওপর। সাঁওতালদের হাজার বছরের ইতিহাস শুধুই বঞ্চনা আর নির্যাতনের ইতিহাস।

কেনারাম ভক্ত আর তার জ্ঞাতি ভাই মহেন্দর ভকত এই দুই মহাজন হিসেবের জটিলতায় – ফেলে নিঃস্ব করে দিয়েছিল সাঁওতালদের। দেনার দায়ে এদের ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়েছিল। কেনারামের বাড়িতে অর্ধশতাধিক সাঁওতাল ক্রীতদাস ছিল।

সুদের অংকটা এমনভাবে কথা হতো যাতে একজন সাঁওতালের ঋণ কখনোই শোধ না হয়। অত্যাচারের ভয়ে তারা কিছুই বলতে পারত না। ভতের বাড়িতে থাকত পশ্চিমা দারোয়ান। ‘এই যে আশে পাশে দেখছেন সাঁওতালরা কাজ করছে- জনকতক উপু হয়ে হাতজোড় করে বসে আছে, এরা সবাই হল কেনারামের দাদন দেনার মুনিষ। বাবু, দাদন দেনার মুনিষ হল কেনা মুনিষ। দশ টাকা ধার নিলে একটা মুনিষ জনমকার মতো বিকিয়ে যেত; টাকায় মাসে ছ’ আনা সুদ, সে সুদ আসলে ভুক্তান হয়ে তের টাকা বারো আনা।

পরের মাসে কুড়ি টাকার কাছ বরাবর পৌঁছত। ফের মাসে কুড়ি টাকা হত সাতাশ টাকা চার আনা। এই শোধ দিতে সাঁওতালরা মহাজন বাড়ি খাটতো পেটভাতা। মজুরি নগদা নাই। তার মানে আজীবন টাকা শোধ হত না মরলেও না; তার ছেলে পিলেদের শোধ দিতে হত। পালাবার জো ছিল না; তখন জঙ্গিপুরে ‘মুনসুবি’ (মুনসেফী) আদালত, সেখানে নালিশ ডিক্রি করে, পরওয়ানা এনে গ্রেপ্তার করে জেল খাটাতো।

মহেশ দারোগা তার কনেস্টেবল নিয়ে এসে বেঁধে নিয়ে যেত। কেনারাম দশ টাকা তাকে নজরানা দিয়ে সেলাম করত।’ সর্বত্রই এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। জমিদার রাজা সাঁওতালদের ওপর উদ্ধত হস্ত। সাঁওতাল শ্রমিকদের খাটিয়ে মজুরি দিত না ঠিকমত। –

কেনারাম এক নয় -প্রতি গাঁয়ে গাঁয়ে রয় –

জুড়ে সারা দেশময় এই এক হাল

বামুন কায়েত বদ্যি ধনে মানে যার বৃদ্ধি

সব এককার।

সাঁওতাল মুনিষরা মহাজনদের বাড়িতে ও দোকানে কাজ করত। এমন কোনো সুযোগই তারা পেত না যাতে অতিরিক্তি খেটে ঋণশোধ করতে পারে। নিমু হাঁসদা তেমনি মুনিষ হিসেবে ভকতের বাড়িতে ছেলে ও বউসহ দিনমান খেটেও কেবল খাওয়ার জন্য ধান পেত। অমানুষিক পরিশ্রম করানো হত এসব দাদন দেনার মুনিষদেরকে দিয়ে।

এর মধ্যে কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে সাঁওতালরা মহাজনদের কাছ থেকে ধান ধার নিত বাধ্য হয়ে। সুদ-আসলে খাতার মহাজনি জটিল হিসাব বর্বর অশিক্ষিত সাঁওতালদের বোঝার সাধ্য ছিল না। আকাড়ার বছর ভীম মাঝি কেনারামের কাছ থেকে বার শালি ধান নিয়েছিল। এক বছরে সুদে আসলে তা পরিণত হয়েছিল একশ শালিতে। ভীম মাঝির জমিও অনেক ছিল, ধানও ভাল হয়েছিল। হিসাব মতো একশো শালি ধান পরিশোধও করেছিল সে ভক্তকে।

তারপরও ওই বছর ভীম মাঝি দুটি ধানের গোলা বেঁধেছিল। কেনারাম ওই সংবাদ শুনে দু-মাস পরে এসেই ভীম মাঝির কাছে আবার একশো শালি ধান চাইল। ভীম বললে — সি কি ভকত, সিদিন যি দিলাম তোকে এতশো শালি । ভকত বললে— তা দিলি, সি তো তু তিন বছর আগে যে ধান লিয়েছিলি, তার দরুণ বাকি ছিল আধ শালি— সি ডুকে বলেছিলম আর দিতে পারব নাই গ! সিবার আট শালিতে ঢুকে একশো শালি দিলাম।

আধ শালি বলেছিলাম দুব নাই। ভকত বললে — তু বললি আমি বলি নাই। সিটো খাতায় লেখা ছিল আমার মনে ছিল নাই। ইবার ধান নিয়ে গিয়ে খাতা লিখতে গিয়ে দেখি সেই আধ শালি ফ বছরে একশো শালি হয়ে হাঁ করে রয়েছে। তুর ইবারকার একশো শলি যেমন লিখলাম ওমনি পুরনো হিসাবে গিলে দিলে। কি করব? খাতার হিসেব সি যদি খেয়ে দেয় তো আমি কি করব।

এখন সেটোই শোধ গেল, ইবারের একশো শালি আবার ই কতমাসে বাড়ল। বেড়ে দেড়শো শালি ছড়ায়ে গেইছে হে। তু তো ধরম মানিস । লক্ষ্মীর খাতা— সে যাতা খেয়ে দিলে আমি কি করব। তাকে খেতে দিতে কোথা থেকে ধান আনব।… আবার একশো শালি দিব তো খাব কি গো ভকত? ভকত বলছে আবার লিবি । দিব। আর না-হয় তো তুর জমিন চার বিঘে লিখে দে। কি গো সব মাঝিরা বল কেনে, আমি অধরমের বাত বললম? ৪২

ভীম মাঝি প্রতিবাদ করল। কেনারাম গরু, মহিষ, ধান একটা কিছু নিয়েই যেতে চাইল । সে ভীমের ধান, গরু, কাড়া ক্রোক করল। হয় ধান নং জনি, একটা কিছু সে চায়ই। কিন্তু ভীম জোর করে তাড়িয়ে দিল কেনারামকে। কেনারাম বারহেটে তার জ্ঞাতিভাই মহিন্দর ভকতের কাছে গেল এবং পরামর্শ করে আদালতের ক্রোক পরওয়ানা নিয়ে এল। মহেশ দারোগা ভীমকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে রাখল জেলে। এভাবেই সাঁওতালদের ওপর চক্রাকারে নেমে এসেছে নির্যাতনের ওপর নির্যাতন।

সিভিল সার্ভিসের পুরোনো লোক মিস্টার পোটেন্ট। সাঁওতালরা তাকে মান্য করে। তিনিও সাঁওতালদের প্রতি কিঞ্চিৎ সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাই তারা পোর্টেন্ট সাহেবের কাছে ভট্টাচার্যের দ্বারা লিখিত অভিযোগ জানিয়ে দরখাস্ত করে। হাজার হাজার সাঁওতাল সমবেত হয়ে তার কাছে অভিযোগ জানায়। কিন্তু তাদের অভিযোগ যথাস্থানে পৌঁছায় না। কোনো প্রতিকার তারা পায় না।

ভীম মাঝির ছেলে বলে – – ‘আমার বাবাকে জেহেলে লিয়ে গোল। মিছামিছি জেহেলে লিয়ে গোল। ছেড়ে দে। উকে ছেড়ে দে।৪ বারহেটের গর্ভ মাঝি জানাল — ‘আমার জামন গুলান সব লিয়ে লিলে। আমি কিছু ধারি না। তবু লিলে। আমি লিই নাই। তবু জঙ্গিপুরের তুদের মুনসবি প্যায়াদা এসে বুললে — হাঁ তু টাকা লিলি। আদালতের হাকিম বুলেছে তু লিলি। এই লিখে দিছে। সঙ্গে সঙ্গে আর একজন নয়, দুই তিন চার পাঁচে দশ বিশ পঞ্চাশ একশো পাঁচশো সাঁওতাল উঠে দাঁড়াল। তারা সবাই বলবে। তাদের বুকের +88 তুষানল আজ বাতাসে জ্বলে উঠতে চাচ্ছে। তারা বলবে।৪৪ এভাবেই জীবনের চারদিক থেকে সাঁওতালদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়ে শোষণের বিচিত্র বিষাক্ত তীর।

ব্রিটিশ শাসকশ্রেণি, মহাজন জমিদার শ্রেণির হাতেই ছেড়ে দিয়েছিল দরিদ্র নিরীহ সাঁওতালদের। সে যুগে জমিদার মহাজনরাই ছিল কৃষকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ব্রিটিশামলে ফসলের পরিবর্তে নগদ অর্থে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা থাকায় সাঁওতালরা মহাজনদের কাছ থেকে অর্থ ঋণ নিতে বাধ্য হত। এই সুযোগে মহাজনেরা অধিক সুদে টাকা ধার দিয়ে সাঁওতালদের ফসল ও সম্পত্তি কেড়ে নিত। কারণ আইনে ঋণগ্রস্ত কৃষকের সম্পত্তি ক্রোকের ব্যবস্থা ছিল।

ঋণ নিলেই সাঁওতালেরা শোষণের জালে আটকা পড়ত সারা জীবনের জন্য। আবার ঋণ না নিলেও তারা রক্ষা পেত না। এমন অবস্থাপন্ন সাঁওতালও ছিল যাদের গরু ধান সবই ছিল। ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও ছিল না, নেয়ওনি। কেনারাম মহাজনের লোভ ছিল। পাঁপড়ার হাড়মা মুর্মুর জমির ওপর। তাই কৌশলে জঙ্গিপুরের কোর্ট থেকে তার সব কিছুর ওপর ক্রোক করার আদেশপত্র নিয়ে এসেছিল।

ভীম মাঝির মতো তাকেও বেঁধে নিয়ে যায় মহেশ দারোগা। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর কালিন্দী উপন্যাসেও আমরা লক্ষ করি মিল মালিক ও মহাজনরা সাঁওতালদের বহু কষ্টে গড়া চরের ভূমি থেকে তাদেরকে উৎখাত করে।

দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ইংরেজ মিশনারিরা সাঁওতালদের ধর্মান্তরিত করছিল। উজ্জ্বল পোশাক- পরিচ্ছদ, শ্রমিকের কাজ ও খাবারের লোভ দেখিয়ে তারা নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাসপ্রিয় একাংশ সাঁওতালদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করছিল। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলে তাদেরকে রেলপথ তৈরির শ্রমিক হিসেবে কাজ দিত ইংরেজরা।

নগদ মজুরির লোভে অনেকেই বেঁচে থাকার তাগিদে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল। সেখানে সাঁওতাল নারীরা ইংরেজ কর্মচারির দ্বারা শারীরিক নির্যাতন, এমনকী ধর্ষণের শিকারও হয়। তাই সাঁওতালরা পোর্টেন্ট সাহেবের কাছে আর্তনাদ করে উঠেছিল— “দিকুরা আমাদিগে চুষে খেলেক, পিষে মেলেক, পাদরীরা আমাদের জাত লিলেক, ধরম ইজ্জত লিলেক রাস্তাবন্দির সায়েরা।

ইংরেজ শাসনের মহিমায় জমিদার মহাজন পেয়াদা পুলিশ ম্যাজস্ট্রেট সকলে মিলে নিরীহ ও হতদরিদ্র এই আদিবাসীদের ওপর নির্মম অত্যাচার ও শোষণ চালিয়েছিল। ইংরেজরা শোষণে এদেরকে সাহায্য করেছিল। কেননা, এরাই ছিল ইংরেজদের শাসনের হাতিয়ার।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে আছে যে, সাঁওতালদের নেতা সিধু-কানু দেবতার নির্দেশ পায় এসব অত্যাচারিত মানুষ উদ্ধারের। হাজার বছরের নিপীড়িত সাঁওতালদের জাগিয়ে তোলে তারা। দিকে দিকে তারা বিদ্রোহের বাণী প্রচার করতে থাকে। ক্লান্ত শ্রান্ত অত্যাচারিত যে সাঁওতালরা বন্য প্রাণীর সাথে সংগ্রাম করে এবং আরণ্য-সম্পদকে অবলম্বন করে সহজ-সরল জীবনর নিয়ে বেঁচেছিল, সেই নির্যাতিত গোষ্ঠী মুক্তির আহ্বানে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সেদিন।

১৮৫৪-৫৫ সালে অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করলে হাজার হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহে মেতে ওঠে। রুকনী-টুকনী-মানকীকে ইংরেজরা অপহরণ করলে তাদের উদ্ধারের মাধ্যমেই সূচনা ঘটে সাঁওতাল বিদ্রোহের। হাজার হাজার সাঁওতাল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বেদনায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিতে থাকে। কিন্তু আত্মসমর্পণ করেনি তারা কখনো। আধুনিক প্রশিক্ষিত ইংরেজ সৈন্যদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে তীর-ধনুক টাঙ্গি-তলোয়ার নিয়ে অসীম সাহসের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছে তারা।

বিশ্ববিজয়ী ইংরেজ বাহিনী নিরীহ, নির্বোধ সাঁওতালদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে সর্বশেষে। সংস্কারাচ্ছন্ন আদিম বিশ্বাস-নির্ভর হাজার হাজার সাঁওতালকে কৌশলে সমতলে নামিয়ে এনে নির্বিচারে পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছিল তারা। যুদ্ধে সাঁওতালরা। পরাজিত হয়েছিল কিন্তু আত্মসমর্পণ করেনি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এগিয়ে গেছে তারা মহাবিক্রমে।

নিজেদের পরিচিত পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁওতালরা গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ করে ইংরেজ বাহিনীকে প্রথম দিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছিল। সম্মুখ যুদ্ধেও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল তারা। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদেরকে ইংরেজের চাতুরীর কাছেই পরাজিত হতে হয়। ফলত, ঘটে ইতিহাসের এক নৃশংস ঘটনা।

একজন ইংরেজ কর্নেল তীর-ধনুক, টাঙ্গি, তলোয়ারধারী অশিক্ষিত, অন্ধ ধর্মবিশ্বাসী সাঁওতালদেরকে নির্বিচারে হত্যা সম্বন্ধে লিখেছেন- ‘There was not a single sepoy in the war who did not feel ashamed [ এই ঘৃণ্য সংগ্রামপুরের যুদ্ধে কানু নিহত হল গুলিতে, সিধু আহত হয়ে কয়েক দিন পর of himself.” ধরা পড়ে। পরে ফাঁসি হয় তার। এভাবেই ঘটে ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি।

 

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে সাঁওতাল জীবনের রূপায়ণ

 

এগার

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা অপহৃত হওয়ার পর ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুগের পর যুগ ছোট ছোট বিদ্রোহ হয়েছে। এর কোনোটি পরিপূর্ণভাবে সফল হতে পারেনি কিংবা সত্যিকারের গণজাগরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। কারণ এগুলি সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত আন্দোলন ছিল না।

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে ওইসব বিদ্রোহের কোনো প্রত্যক্ষ অবদান না থাকলেও মূলত এসব আন্দোলনই ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথকে প্রশস্ত করেছিল। ওই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ১৮৫৪-৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের রয়েছে গভীর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য। সাঁওতাল বিদ্রোহ কেবল একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ছিল না। এমনকী দেশীয় জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধেই তাদের বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ছিল না।

ইংরেজ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম ও নিজস্ব স্বদেশচেতনাও এই আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কারণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের যুদ্ধের প্রেরণা-উৎস ছিল স্বদেশচেতনা। আর চূড়ান্ত যুদ্ধ তারা ইংরেজদের বিরুদ্ধেই করেছিল। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ভূমির প্রতি অধিকারহীনতায় স্বাধীনতাপ্রিয় সাঁওতালরা বিদ্রোহ করেছিল।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসের পটচিত্র প্রদর্শক ও বর্ণনাকারী নয়ন পালের জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য নফর পালও সাঁওতালদের সাথে একত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। সিউড়ী আপালতে তার সাত বছরের জেল হয়েছিল।

অন্যদিকে, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এর কালিন্দী উপন্যাসে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হলেও সোমেশ্বর চক্রবর্তী সাঁওতালদের নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন ওই স্বাধীনতার চেতনা থেকেই। সোমেশ্বরের মতো সভ্য জগতের মানুষদেরও রাজনৈতিক চেতনায় যা দিতে সক্ষম হয়েছিল আরণ্যক সাঁওতালদের বীরত্বপূর্ণ বিদ্রোহ। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এরই ধারাবাহিকতায় প্রভাবিত হয়েছে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহসহ পরবর্তী অন্যান্য ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলন।

মূলত সাঁওতাল বিদ্রোহের অন্তর্নিহিতাহিত দেশপ্রেমের চেতনাই এ-সকল আন্দোলনকে উজ্জীবিত করতে সহায়তা করেছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত সেনানীদের দেশপ্রেমের রোমাঞ্চকর অনুভবের প্রমাণ মেলে অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে চমকে উঠল বিশু। শুধু বিশু কেন, সিধু কানু নিজেরা বলেও নিজেরাই এ-কথায় চমকে উঠল— আমাদের দেশ। বুলা বাবা বোঙ্গা, বুল! সেই রাত্রির অন্ধকারে নিজেদেরই এই আশ্চর্য কথা দুটি তাদের সারা অন্তরে চকিত একটি বিদ্যুৎরেখা টেনে দিয়ে মেঘের ডাকের মত বেজে উঠল— ই আমাদের দেশ। ৪৭

এ-প্রসঙ্গে ডক্টর ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন— ‘ভারতীয় উপনিবেশে অসংস্কৃত আদিবাসী সাঁওতালদের ওপর সামাজিক নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রশক্তির প্রতিভূস্থানীয়দের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই সংঘবদ্ধ বিদ্রোহের পশ্চাতে সুসংঘটিত রাজনৈতিক বোধ সক্রিয় না থাকলেও নিপীড়নমূলক পরিবেশে সীমাবদ্ধ ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক স্বাধীনতা-প্রাপ্তির স্পৃহা সাঁওতাল মানসিকতায় বর্তমান ছিল।’

‘সাঁওতাল বিদ্রোহের পশ্চাতে ছিল জমির ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাঁওতালদের স্বাধীনতার স্পৃহা, যার ফলে তারা ধ্বনি তুলেছিল : ‘নিজ দলপতির অধীনে সাঁওতাল রাজ্য চাই।’ সাঁওতালরা স্বাধীনভাবে বাঁচার আর স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্যের দাবি তুলেছিল। আর দেশীয় মহাজন-জমিদার এবং ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে অপরিসীম বীরত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

ওল্ডহাম লিখেছেন, ‘পুলিশ ও মহাজনের অত্যাচারের স্মৃতি যাদের দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিল, আন্দোলন তাদের সকলকেই আকৃষ্ট করল, কিন্তু যে মূল ভাবধারাকে কাজে পরিণত করবার চেষ্টা চলছিল তা ছিল সাঁওতাল অঞ্চল ও সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা। ‘ ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পূর্বেও বাংলাদেশ ও ভারতের বহু স্থানে অনেক আদিবাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এই সাঁওতাল বিদ্রোহ।

সাঁওতাল বিদ্রোহের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় বিদ্রোহ-পরবর্তী ইংরেজ শাসন- কৌশল এবং দেশীয় গণমানুষের সংগ্রামী চেতনার ইতিহাস লক্ষ করলে। বাস্তব ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই ১৮৫৫ সালের পর ইংরেজ শাসক শ্রেণি সাঁওতালদের জন্য সাঁওতাল পরগণা প্রতিষ্ঠা করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহের পূর্ব পর্যন্ত শাসকগোষ্ঠী এদের ঐক্যের শক্তিকে অনুধাবন করতে না পারলেও বিদ্রোহের পর তাদের আধিকার বিষয়ে কিছুটা সচেতন হয়েছিল। তাই ১৮৫৭ সালে মুন্ডা বিদ্রোহ দমনে ইংরেজরা ছিল আরও বেশি সতর্ক ও যত্নবান। কিন্তু তাদের এই সচেতনতা সত্ত্বেও এ সময় সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়েই জাতীয়তাবাদী চেতনার আবাহন অনিবার্য হয়ে উঠছিল। এমনকী বাংলার নির্যাতিত কৃষকসমাজও এই কালে শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ এভাবে যুগে যুগে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে প্রেরণা সঞ্চার করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় আদিবাসীরা বৃটিশ শাসকদের এদেশ থেকে বিতাড়নের আহ্বান জানিয়েছে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে।৫১

সাঁওতালরা বুঝতে সক্ষম হয়েছিল তাদের জীবনের সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা ও বঞ্চনার জন্য বিদেশী শাসক ও দেশীয় জমিদার-মহাজনদের শোষণই দায়ী। তাই তারা ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল; চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শাসক শ্রেণির ঘৃণ্য স্বেচ্ছাচারিতার স্বরূপ জনসমক্ষে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও সেদিন একারণেই সাঁওতালদের পতাকাতলে সামিল হয়েছিল।

শোষণ উৎপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের এই সংগ্রাম সমস্ত বঞ্চিত ও স্বাধীনতা-প্রিয় মানুষকে একসূত্রে গ্রথিত করার প্রেরণা যুগিয়েছিল। অগণ্য সাঁওতালের বিদ্রোহ এবং সাঁওতাল নেতাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

বারো

পৃথিবীর সব আদিবাসীদের সাধারণ প্রত্যাশা হচ্ছে নিজস্ব অঞ্চল, সংস্কৃতি ও জীবনধারার মধ্যে স্বাধীনভাবে বাস করার অধিকার। তথাকথিত সভ্য সমাজ ও সভ্যতার জটিলতা থেকে তারা চিরকালই দূরে থাকতে চেয়েছে। এভাবেই তারা দীর্ঘ দিন নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। প্রকৃতির খাঁটি সন্তান আদিবাসীরা অকৃপণ প্রকৃতির স্বস্থানে বসবাসে তুষ্ট এবং প্রকৃতির কোলে জীবনাবসানে পরিতৃপ্ত। অথচ সভ্যতা ও সভ্য মানুষের সংস্পর্শে এসেই এইসব আদিম জনজাতির পরিবর্তন ঘটেছে। সাঁওতালরাও এর ব্যতিক্রম নয়।

অরণ্য বহ্নি উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই পাহাড়ের মাথায় সাঁওতালদের সুখ সমৃদ্ধপূর্ণ যে আরণ্যক জীবন ছিল তার জন্য তারা আক্ষেপ করেছে। আবার একইভাবে সেইসব সোনালি দিনের জন্য তারা গর্বও অনুভব করে। কৃষিজীবী এই আরণ্য- সন্তানেরা বারবার নানাভাবে সভ্য মানুষের দ্বারা প্রতারিত ও বঞ্চিত হয়েছে।

আদিবাসী মানুষদের ওপর তথাকথিত সভ্য মানুষের শোষণ, নির্যাতন, ভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণ, ধর্মান্তরিতকরণ প্রভৃতি অপকৌশল তাদেরকে বিরূপ অভিজ্ঞতার ভারাক্রান্ত করেছে। পাহাড় থেকে সমতলে নেমে এসে দরিদ্র সাঁওতালরা আরও বেশি দরিদ্র হয়েছে; ছিটকে পড়েছে কৃষিকাজ থেকে, নিযুক্ত হয়েছে মহাজন-জমিদারদের কৃষি শ্রমিক, গৃহপরিচারণা কিংবা দোকান ও ব্যবসার কাজে। এভাবেই কৃষিজীবী সাঁওতালরা দাসত্বপূর্ণ শ্রমজীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।

ইংরেজরা এদেশে তাদের শাসন ও শোষণের বুনিয়াদ শক্ত করার জন্য রেলপথ তৈরি করেছিল। সাঁওতালরা অত্যধিক পরিশ্রমী বলেই রেলপথ নির্মাণের কাজে তাদের কদর ছিল। কম মুজুরি দিয়ে এদের খাটানো সহজ ছিল। কর্মহীন দরিদ্র মানুষদের নগদ মুজুরির লোভ দেখিয়ে স্বীয় পেশা থেকে টেনে আনা হয় নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে। রাস্তাবন্দির কাজে এসে সাঁওতালদের মধ্যে পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

হাতে আসা কাঁচা পয়সা তাদের মানসিকতা ও জীবনধারায় এনে দেয় এই পরিবর্তন।। ইংরেজ কর্মচারিরা দরিদ্র সাঁওতালদের কাজ ও পয়সা দিয়ে বশীভূত করল। তাদের মর্যাদা, অধিকার সম্ভ্রম সবই লুণ্ঠিত হতে থাকল ক্রমে ক্রমে। বেঁচে থাকার তাগিদে একাংশ সাঁওতাল আধুনিক কূটকৌশলী আর্থনীতিক শক্তির কাছে বাধ্য হয়েই স্বীকার করে নিয়েছিল পরাভব ।

বহিরারোপিত সংস্কৃতি ও আগ্রাসনের ফলে বারবার সাঁওতালদের জীবনে নেমে এসেছে দুঃখ, দারিদ্র ও হতাশা। কালিন্দী উপন্যাসেও আমরা লক্ষ করি শোষণ ও আগ্রাসনের ফলে সাঁওতালরা নিজেদের গড়া চর থেকে কীভাবে বিতাড়িত হয় তার মর্মন্তুদ দৃশ্য। যন্ত্রমালিক বিমলবাবু কৌশলে কালিন্দীর চর দখল করে নিলে সাঁওতালদের নিজেদের গড়া চর থেকে একদিন চলে যেতে বাধ্য হয়। পরিশ্রমী ও সৎ সাঁওতালদের জীবনে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে তাদের নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে।

তাই কমল মাঝি আক্ষেপ করে অহীন্দ্রকে বলে “ইয়ারা সব আর সি সাওতাল নাই। ইয়ারা মিছা কথা বলে, কাজ করতে গিয়ে গেরস্তকে ঠকায়, খাটে না, ইয়ারা লেডী হইছে। পাপ হইছে উয়াদের। উয়ারা খেপতে পারবে না। উয়ারা ধরম লষ্ট করলে। এই সাঁওতালদের এই পরিবর্তন ঘটেছে বাহিরারোপিত আগ্রাসন ও সংস্কৃতিরই প্রভাবে। সেজন্যই সাঁওতাল কন্যা সারি মিল মালিক বিমলবাবুর রক্ষিতা হয় নির্দ্বিধায়। টাকা পেয়ে তার স্বামী ও পিতামহ পালিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে বিনা প্রতিবাদে। কাঁচা টাকার লোভে কৃষিকাজ ছেড়ে তারা বিমলবাবুর মিলে কাজ করতেই বেশি আগ্রহী হয়।

কালিন্দী উপন্যাসে আমরা সাঁওতালদের যে পরিবর্তন লক্ষ করি তা মূলত শুরু হয়েছিল অরণ্য বহ্নি থেকেই। কালিন্দী ও অরণ্য বহ্নি উপন্যাস দুটিতে বহিরারোপিত সংস্কৃতি ও তার আগ্রাসন কৌম- জীবনকে কীভাবে বিপর্যস্ত করেছিল তার বিশ্বস্ত চিত্র তুলে ধরেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আগ্রাসনের ফলে তাদের সমাজ সংস্কৃতি মূল্যবোধ অর্থনীতি ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের বিবর্তনের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অরণ্য বহ্নিতে।

ক্লান্ত শ্রান্ত অত্যাচারিত যে কৌমজীবন শত শত বছর ধরে একমুঠো অন্ন, বনজ ফল ও শিকারের উপর নির্ভর করে বেঁচেছিল বহিঃশক্তির প্রভাবে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে গেল। তারা উলিত হয়ে গেল নিজস্ব জীবন ও সংস্কৃতি থেকে। শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তারা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল।

স্বাধীন সরল ও প্রত্যয়ী অনন্য জীবনীশক্তি সম্পন্ন এক কৌমগোষ্ঠী হারালো তাদের নিজেদের সংস্কৃতি ও আত্মপ্রত্যয়। তবু পরাজিত হয়েও ঐতিহসিক বিদ্রোহের মধ্যে তারা যে স্ফুলিঙ্গ-বীজ বপন করে রেখেছে স্বজাতির ভাবীকালের মানুষের জন্য নিশ্চয়ই তা এক অনিঃশেষ প্রেরণা-উৎস।

Leave a Comment