আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তারাশঙ্করের বেদে কৌম। যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

তারাশঙ্করের বেদে কৌম
আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকেই অসংখ্য বিচিত্র আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। আর্য-আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই ওইসব আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নবাগত সত্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে অসম সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয়েছে। বহু বিচিত্র ওইসব গোষ্ঠীর মধ্যে বেদেরা অন্যতম। ভারতীয় উপমহাদেশে যত আদিবাসী গোষ্ঠী আছে তার মধ্যে বেদে সম্প্রদায় অনন্য স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত জনগোষ্ঠী।
রাঢ়-অঞ্চলের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের জীবনের রূপায়ণ ছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম অন্বিষ্ট। সাঁওতাল, কাহার, হাড়ি, বাগদী, ডোম ইত্যাদি বিভিন্ন প্রান্তিক মানুষের জীবনঘনিষ্ট শব্দচিত্র তিনি অন্ধন করলেও বেদে সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও আকর্ষণ ছিল সর্বাধিক। বেদে সম্পর্কিত তাঁর প্রদত্ত তথ্য এবং পর্যবেক্ষণ একজন অধ্যয়ননিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিকের বর্ণনা-বিশ্লেষণের মতো নির্ভরযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়।
তারাশঙ্কর যে-সব আদিবাসী গোষ্ঠীজীবনের সাহিত্যরূপ দিয়েছেন এদের মধ্যে একমাত্র বেদেরাই যাযাবর গোষ্ঠীর অন্তর্গত। তারা নিজেদের কৌম সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণেই নির্দিষ্ট একটি স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। তাদের গোষ্ঠীগত অন্তর্বিভাগও বিচিত্র, যেমন: মালবেদে, মাঝিবেদে, ইসলামি বেদে বিষবেদে প্রভৃতি।
বাংলার বেদে নামক ভ্রাম্যমাণ কৌমজাতির বৈশিষ্ট্য নিরূপিত হয়েছে এভাবে : ‘ They are jugglers, fortune tellers, rope dancers, beggers, wanderers and bird killers” ১৯০১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে বাংলা ও বিহারের এই বেদেদের Gipsies, Acrobats ইত্যাদি পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তারাশঙ্করের সাহিত্য রচনার প্রারম্ভ কালেই বেদেগোষ্ঠী ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছিল।
সাঁওতাল ও কাহারদের মত বেদেদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় বিশ্লেষণের জন্যও তাদের দৈহিক অবয়বের উপরই নির্ভর করতে হবে। দৈহিক দিক বিচারে বেদেগোষ্ঠী আদি অস্ট্রাল বংশোদ্ভূত। বেদেদের গায়ের রং গভীর কালো, চুল কোকড়ানো এবং ঢেউ খেলানো। তাদের দৈহিক গঠন সুঠাম, উচ্চতা মাঝারি ধরনের, চোখ আয়ত ও কৃষ্ণ। এ-সব দৈহিক লক্ষণ আদি-অস্ট্রালদেরই পরিচয়বাহী।
বেদেরা যাযাবর-স্বভাবী বলেই এদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান থাকে না। তারাশঙ্করের নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে বিধৃত বেদে সম্প্রদায়ের উপকথা অনুসারে জানা যায় যে, সাঁওতাল পরগণার পাহাড়ের পাদদেশ অঞ্চলকেই বেদেরা তাদের নিজস্ব দেশ বিবেচনা করে। বেদে কৌমের কিংবদন্তি অনুসারে চম্পকনগর ছিল তাদের পূর্বপুরুষের দেশ। সেখান থেকে তারা সাঁওতাল পরগণায় এসেছে। পেশাগত জীবনের স্বাতন্ত্র্যের জন্যই বেদেরা যাযাবর হতে বাধ্য হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে তাদের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল সাঁওতাল পরগণা, ছোটনাগপুর, বিহার, মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া ইত্যাদি অঞ্চল। বেদেরা প্রায় বিলুপ্ত এক কৌম গোষ্ঠী হলেও ওইসব অঞ্চলে এখনো এদের বিচরণ চোখে পড়ে।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে ভারতীয় উপমহাদেশে আদিবাসীদের মধ্যে যারা আদি অস্ট্রাল গোষ্ঠীভুক্ত তাদের ভাষাবংশ অস্ট্রিক শ্রেণির। ‘অস্ট্রিক ভাষা-গোষ্ঠীই ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ভাষাগোষ্ঠী। এক কথায় এটাই ভারতের আদিম দেশজ ভাষা। … ভারতে প্রচলিত অস্ট্রিক ভাষাসমূহকে দুই শাখায় বিভক্ত করা হয়: প্রথম, ‘মোন-খমের’। … দ্বিতীয়, ‘মুণ্ডারী’ গোষ্ঠীর ভাষাসমূহ।
এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে—- খারওয়ারি, কুরকু, খরিয়া, জুয়াও, শবর ও গড়াবা। খারওয়ারি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে— সাঁওতালি বা হর, মুনারি, ভূমিজ, বিরহর, কোডা, হো, তুরিম, আসুরি, আগারিয়া ও কোরওয়া। সাঁওতালি প্রধানত সাঁওতাল পরগণার ভাষা, হো সিংহভূমের পরকাদের ভাষা আর বাকীগুলি ছোটনাগপুর সংলগ্ন ওড়িসার পার্বত্য অঞ্চল ও মধ্যপ্রদেশের আদিবাসীদের ভাষা।
সেদিক থেকে উপমহাদেশের অধিকাংশ আদিবাসীই অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। বেদেদের ভাষার অপর বিশেষত্ব হল এদের দ্রুত বিবর্তনধর্মিতা। তাদের ভাষার বিবর্তিত রূপ হচ্ছে অপভ্রংশ বাংলা। ভ্রাম্যমাণ জাতি হওয়ার কারণে, সভ্য সমাজের সংস্পর্শে বেশি আসার ফলে দ্রুত তাদের ভাষার স্বকীয়তা বিসর্জিত হয়েছে।
দুই
বেদে সম্প্রদায় হচ্ছে বিচিত্র সংস্কারাচ্ছন্ন এক গোষ্ঠী। এই কৌম গোষ্ঠীর ধর্ম বিশ্বাসও বিচিত্র। ইতিহাসের এক বিশেষ কাল পর্ব থেকে এরা ‘মুসলিম’ ধর্ম সম্প্রদায়ের পরিচয়ে চিহ্নিত। তবে বেদেদের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, সংস্কার, নামকরণ ইত্যাদি হিন্দু ধর্মের অনুসরণে করা হয়। হিন্দুদের পুরাণ-কথা তাদের কণ্ঠস্থ, দেব-দেবীর পূজা ও ব্রত পালন তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ, অথচ মৌল ধর্ম পরিচয়ে তারা ‘মুসলমান’।
ভারত কোষেও এদের মুসলমান বলা হয়েছে। তবে বেদেদের মধ্যেও হিন্দু বেদে আছে। ১৯০১ সালের সেন্সাস রিপোর্টে মুসলমান বেদের সংখ্যা ৩২, ৬২১ জন আর হিন্দু বেদের সংখ্যা ১২,৩০১ জন উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্ম তাদের যাই হোক পেশা-বাস্ত বতার প্রয়োজনেই তারা দেবী মনসার একনিষ্ঠ ভক্ত। হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীর ওপর তাদের ভক্তি ও শ্রদ্ধা গভীর। মুসলমান বেদেরাও হিন্দু ধর্মের প্রথা-পদ্ধতিকেই মান্য করতে অভ্যস্ত।
বেদে সম্প্রদায় পরকালে বিশ্বাসী। পরজন্মে ভাল কিছু হয়ে জন্মাবার জন্য ইহকালে ভাল কাজ করবার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ সুগভীর। হিন্দু-মুসলমান উভয় বেদেগোষ্ঠীই শিবের প্রতি গভীর অনুরক্ত। তারা সাপকে একদিকে যেমন জীবিকার উপায়রূপে বিবেচনা করে, অপরদিকে তেমনি মা মনসার সস্তান বলেও সমীহ করে। নিরুপায় না হলে তারা সর্পনিধনে লিপ্ত হয় না। নানা কারণে মনসার আশ্রয় প্রার্থনা, বিশেষত সৌভাগ্যের জন্য মনসার সন্তুষ্টি কামনা তাদের প্রাত্যহিকতার অঙ্গ।
চাঁদ সওদাগর ও মনসার বিরোধ- সংক্রান্ত লোকপুরাণের পূর্বাপর ঘটনা দ্বারাই আবর্তিত হয় তাদের পেশা ও সাংস্কৃতিক জীবন। বেদেরা বিশ্বাস করে পুরাকথার সঙ্গে তাদের জীবন-নিয়তি বা ভবিতব্য সংযুক্ত। পেশাগত বাস্তবতা ও জীবনাচরণের স্বতন্ত্রতার কারণেই ভারতীয় উপমহাদেশে বেদে সম্প্রদায় এক অদ্ভুত ধর্ম-শঙ্কর জাতি। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ওলাদেবী, সত্যপীর প্রমুখ ধারণাকে উপলক্ষ করে যে সাহিত্যধারা সূচিত হয়েছিল, বাংলার বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে ওই ধর্ম সমন্বয়ের আশ্চর্য প্রকাশ ঘটেছে।
তিন
ভারতীয় আদিবাসী কৌমগোষ্ঠীগুলির মধ্যে জীবিকার দিক থেকেও বেদেরা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের ধারক। অন্যান্য আদিবাসীদের মতো সহজ এবং নিরাপদ পেশায় এরা অভ্যস্ত নয়। অভ্যন্তরীণ গোত্র বিন্যাসের ভিত্তিতে বেদেদের পেশাগত তারতম্য নির্ধারিত হয়। তবে সাপ-নির্ভর জীবিকা প্রায় সব বেদেরই আদি পেশা। বেদেরা সাপ ধরে এবং সাপের বিষ সংগ্রহ করে চিকিৎসকদের কাছে বিক্রি করে। তারা বিশ্বাস করে মা মনসা তাদের জীবিকা অর্জনের জন্যই সাপকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
আর্থিক সংকটকালে তারা ভিক্ষা করে চাল, নগদ পয়সা ও পরিধেয় বস্ত্র সংগ্রহ করে। বেদেদের জীবিকার সঙ্গে জড়িত রয়েছে নানা স্থল ও চাতুরী। পেশাগত স্বার্থেই পশু-পাখি শিকার বেদে পুরুষদের জীবনের এক অনিবার্য অংশ। আহার্য সংগ্রহের জন্য সাপ, শূকর, সজারু, শিয়াল, ইঁদুর, খরগোশ, ব্যাঙ, গোসাপ এবং নানাপ্রকার পাখি শিকার করে এরা। আরেকদল বেদে প্রশিক্ষণ দেওয়া বানর ও ভালুকের খেলা এবং যাদু দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।
বেদে-কৌমের মেয়েরা মাটির ঝুমঝুমি, খেজুর পাতার খলে ইত্যাদি হস্তশিল্প নির্ভর দ্রব্যাদি তৈরি ও বিক্রি করে। বিচিত্র কৌশলে ভদ্র গৃহিণীদের ঠকিয়ে নানারকম জিনিসপত্র আদায়ে তারা পারঙ্গম। তারাশঙ্কর তাঁর স্মৃতিকথায় সভ্য বেদেদের সম্পর্কে লিখেছেন, “এরা সব কেউ সাজত সন্ন্যাসী, কেই সাক্ষত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, কপালে তিলক, গায়ে তুলসী বা রুদ্রাক্ষের মালা, হাতে কমণ্ডলু, বেশ সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে এসে দোরে দাঁড়াত … বাড়ীর মঙ্গল হোবে রাম। সাধু বিদায় করো রাম। বলেই যেত, ব’লেই যেত রাজা পাবে, পুত্র পাবে, মনের মত পত্নী পাবে।
তেমন ভক্তিমান দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ঝুলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত বাড়িয়ে বলত ধরো, ধরো। রামজী স্বপ্ন দিয়া তুমকো দেনেকো লিয়ে, ধরো। গৃহস্থ শঙ্কিত হয়ে হাত বাড়াত। পেত একটা তামার মাদুলী। সঙ্গে সঙ্গে সাধু বলত দে দক্ষিণা। একশো পঞ্চাশ-পঁচিশ-পাঁচ। শেষে এক টাকায় এসে চোখ রাঙা করে বলত — ভস্ম ক’রে দেব। শাপ দেব। বেদে মেয়েরাও সাজ-গোজ ও নাচ-গান দিয়ে পুরুষদের সম্মোহিত করে বড়ো কিছু আদায়ে পারঙ্গম। মোট কথা বেদেদের জীবিকার সাথে কিছুটা ছল-চাতুরী ও ভেলকিবাজী সংযুক্ত।
এক দল বেদের জীবন ও জীবিকা সম্পর্কে তারাশঙ্কর তাঁর আমার কালের কথায় লিখেছেন, আর আসত সত্যকারের বেদের দল। তাবু, গরুর গাড়ী, গরু, মোষ, ঘোড়া, কুকুর নিয়ে আসত এক-একটা দল; দলে পুরুষে নারীতে পঞ্চাশ ষাট থেকে চার পাঁচশো পর্যন্ত লোক আসত। নানা ধরণের বেদে দেখেছি।
সে কালে বছরে তিনটে চারটে দল আসতই। একেবারে বর্বর, একফালি নেংটি পরা, কালো কষ্টিপাথরের মত দেহ, তারা আসত পায়ে হেঁটে আসত, সঙ্গে থাকত কিছু গরু মহিষ আর এক পাল দারুণ হিংস্রদর্শন কুকুর; এসে গ্রামপ্রান্তে গাছতলায় বাসা গাড়ত, প্রান্তরে প্রান্তরে শিকার করে আনত খরগোশ, সজারু, ইঁদুর, গোসাপ, শেয়াল, বড় বড় ধামিন সাপ। … দুপুরে স্তব্ধ গৃহদ্বারে হাঁক উঠত এ খোকার মা, ঝুমঝুমি লেবি? কিনলেও বিপদ, না- কিনলেও বিপদ, কোনক্রমে ঝগড়া বাধিয়ে কিছু-না-কিছু কেড়ে নিয়ে পালত।
সাপকে কেন্দ্র করেই প্রধানত পরিচালিত হয় বেদেদের জীবিকা। এ জন্য তারা সাপ ধরে, সাপের বিষ সংগ্রহ করে, সাপের খেলা দেখায়। তারা এরকম আচরণ করে যে তাতে বোঝা যায় তারা মন্ত্র-তন্ত্রের সাধক, যা মূলত তাদের জীবিকাকে নিরাপদ ও নিশ্চিত করবার পন্থা মাত্র। এ-সব মন্ত্রের ভয় দেখিয়ে কিংবা মন্ত্র দ্বারা বশীভূত করার ছলে তারা গ্রামবাসী মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে নেয়। অন্যদিকে, খেলা দেখানো সাপ বুড়ো হয়ে গেলে সেগুলোকে নদীর ধারে ছেড়ে দিয়ে আসাই বেদেদের প্রথা। কেননা, দেবী মনসার সন্তান হিসেবে সাপের প্রতি তারা লালন করে এক গভীর শ্রদ্ধা ও মমতা।

চার
বেদে সম্প্রদায়ের জীবনাচার বিচিত্র সব বিশ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ধর্মে মুসলমান হয়েও হিন্দু আচরণে তারা মূলত অভ্যস্ত। চাঁদ সওদাগর ও মনসার লোক পুরাণের গণ্ডিতে তাদের জীবনাচরণ আবদ্ধ। তাদের ধর্মাচার, উৎসব, নৃত্যগীত — সকল কিছুতেই শিব এবং মনসার প্রবল উপস্থিতি লক্ষণীয়। দেবাদিদেব মহাদেব বেদেকুলে বাবা অভিধায় সম্ভাষিত।
অপরদিকে মনসা তাদের মা। সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল বেদে ষষ্ঠীর ব্রত করে, কালী ও দুর্গাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে। চম্পক নগর তাদের কাছে পবিত্র একটি স্থান হিসেবে পরিচিত। কারণ চম্পকনগরেই মা মনসার আসন।
বেদে কৌমের প্রত্যেক গোত্রেই একজন সর্দার থাকে, শিরবেদে অভিধায় তার পরিচয় চিহ্নিত। বেদেরা বিশ্বাস করে যে, মা মনসার কৃপায় ও ইচ্ছায় বেদেকুলের মঙ্গল, সম্ভ্রম ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বিষবেদে গোত্রে একজন করে নাগিনী কন্যা প্রেরিত হয়। মা মনসাই তাকে পূজা প্রাপ্তির জন্য পাঠিয়ে দেন। মায়ের স্থানে পূজা দেবার অধিকার কেবল ওই নাগিনীকন্যারই আছে। আধিপত্যের প্রশ্নে গোত্রে শিরবেদেদের পরে নাগিনী কন্যার স্থান।
বেদেকুলের দিক নির্দেশনার জন্য একটি বিশেষ সময়ে কন্যার ওপর ভর করেন মা মনসা। তখন কন্যার বাস্তব বুদ্ধি লোপ পায়; মনসার বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে তার কণ্ঠ। বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে শিরবেদে যেমন সকল দণ্ডমুণ্ডের কর্তা তেমনি নাগিনীকন্যাও প্রবল অধ্যাত্ম-ক্ষমতার অধিকারী।
কৃষ্ণাপঞ্চমীর রাতে শিরবেদে ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রদীপ জ্বেলে, ধূপ পুড়িয়ে মা মনসার পূজায় বসে। ছুরি দিয়ে বুক চিরে সে রক্ত নিবেদন করে মনসাকে। মনসা শিরবেদের প্রার্থনায় তুষ্ট হলেই বেদেকুলে নাগিনী কন্যা প্রেরণ করেন। একজন শিরবেদের ক্ষমতাকালে কয়েকজন নাগিনীকন্যার আবির্ভাব ঘটতে পারে। শিরবেদে আর নাগিনী কন্যার মধ্যে সর্বদা বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করে, কখনো-বা তা সংঘাতেও রূপ নেয়।
আষাঢ়ের শুক্লাপঞ্চমী বা নাগপঞ্চমীর দিনে মনসা বা বিষহরির পূজা করে বেদেরা। বেদেদের আস্তানায় মা মনসার আসন থাকে। তাকে কেন্দ্র করেই বেদেদের পূজা পালিত হয়। মাকে প্রথম পূজা দেওয়ার অধিকার নাগিনীকন্যার। নাগিনীকন্যা পূজা সম্পাদন করলেই পূজা করার অধিকার শিরবেদের। শিরবেদের পরে সকল বেদে মায়ের পূজা দিতে পারে। মনসার পূজায় ধূপ-ধূনা পুড়িয়ে, চিমটা, বিষম চাকি ও তুমড়ি-বাঁশি বাজিয়ে বেদেরা গান করে।
বেদেরা পূজা-পার্বণে নিজেদের তৈরি মদ খায়। পূজা শেষে গোটা বেদে পাড়া অংশ নেয় নাচ-গানের আসরে। নারী-পুরুষ একত্র নেচে গেয়ে আনন্দ করে। তারাশঙ্করের নিজ জেলা বীরভূমের প্রায় সর্বত্রই নাগপঞ্চমীর দিনে মনসার পূজা হয়। সেখানে প্রচুর মনসামন্দিরও রয়েছে। এ-সব মন্দিরে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরাই সাধারণত পূজা দেয়।
নাগপঞ্চমীর দিনে পল্লির বধূরা বেহুলার স্মরণে শ্বশুরালয় থেকে পিতৃগৃহে যায়, উপবাস করে ও অর্ঘ্য নিবেদন করে। তাদের বিশ্বাস চম্পাই নগরে মনসার মূল আসন এবং এই বিশ্বাসেই তারা সেখানে পূজা পাঠায়। মনসা পূজার বিস্তৃতি, চাঁদসওদাগরের প্রচলিত মিথের জনপ্রিয়তা ও বেদে সম্প্রদায় কর্তৃক তার ব্যাপক ব্যবহার এই অঞ্চলে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত।
যাযাবর স্বভাবী বেদেরা নিজেদের প্রতিটি অভিযাত্রার পূর্বে মনসার পূজা সম্পন্ন করে। এছাড়া প্রতিদিন তাদের গোত্রপতি শিরবেদে ও নাগিনী কন্য সন্ধ্যায় মনসার আসনে ধূপ-ধূনা জ্বালিয়ে গান গেয়ে বাদ্য বাজিয়ে পূজা করে। জীবিকার প্রয়োজনে তাদের প্রধান যাত্রা শুরু হয় ভাদ্রের শেষে বিষহরির পূজার মধ্য দিয়ে। বছরের এই সময়ে সব গোত্রের বেদেই বিষহরির নাম নিয়ে যাত্রার শুভসূচনা করে।
এই সময়ে নৌকায় বা হাঁটা পথে কাঁধে ভার নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায় তারা, এই অভিযাত্রাই তাদের কুলপ্রথা। শীতের শেষে, তাদের বিশ্বাসমতে যখন গরুড় পাখিরা উড়ে যেতে শুরু করে তখন তারা আবার স্বভূমিতে প্রত্যাবর্তন করে। গড়ুর পাখির বংশধর।
নাগকূলের জননী আর গড়র পক্ষীর জননী — দুই সতীন। সৎভাইদের বংশে বংশে কালশত্রুতা সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে। সৃষ্টির শেষদিন পর্যন্ত চলবে। তাই এ মীমাংসা হয়তো দেবকুলের করে যাওয়া মীমাংসা। শীতের কয়েক মাস পৃথিবীতে অধিকার গড়ুর বংশের। তারা আকাশ ছেয়ে ভেরী বাজিয়ে এসে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে – বিলে নদীতে পুকুরে; ধানভরা মাঠে ধান খাবে। তারপর ফাল্গুন যাবে, চৈত্রের প্রথমে গরমের আমেজ ভরা বাতাস আসবে দক্ষিণ থেকে: মাঠের ফসল শেষ হবে; তখন তারা আবার উড়বে —- গগনভেরী পাখিরা নাকারা বাজিয়ে চলবে আগে আগে! তখন আবার পড়বে নাগেদের কাল।
” ফাল্গুনের শেষে শীতে নিদ্রা যাওয়া সাপেদের ঘুম ভাঙানোর দায়িত্ব নিতে হয় বেদেদের। প্রথমেই তারা সাঁওতালী বনভূমিতে আগুন লাগিয়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে দেয় বনভূমি। মাটির নীচের সাপ তখন আগুনের উত্তাপে জেগে ওঠে। সাপের এই ঘুম ভাঙাতে গিয়েও বেদেরা নানা পৌরাণিক বিশ্বাস ও সংস্কারের দ্বারা পরিচালিত হয়। এভাবে আগুন লাগিয়ে নানা প্রকার পাখি, যেমন – জল মুরগী, হাঁস, তিতির, মরালী, কাঁদাখোঁচা, হাড়িচাচা এবং বণ্যপ্রাণী খরগোশ ও সজারু ধরে তারা।
শিকারের এই মহোৎসবে অন্তত একটি হলেও সাপ ধরে তারা। এরপর ধৃত পাখি ও পশুর রান্না করা মাংস খেয়ে এবং নেচে-গেয়ে মা বিষহরির পূজা সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে সাপ ধরা ও সাপের বিষ সংগ্রহ করার শুভ সূচনা করে বেদেরা। ফাল্গুনের শেষে এ পূজা পরিচালনার দায়িত্ব থাকে নাগিনী কন্যার ওপর। নাকাড়া ও চিমটে বাজিয়ে, হাঁস ও পায়রা বলি দিয়ে মহাসমারোহে বেদেরা এই পূজায় অংশগ্রহণ করে।
জাগরণের রাতে পূজার পর তারা মদ মাংস খেয়ে খুব আনন্দ করে, সাপ নিয়ে খেলা করে এবং গান গায়। শীতের শেষে গরমে গুহাবাসী সাপেরা বেরিয়ে আসে বলে এই বিশেষ মৌসুমের পূজা বেদে কৌমে জাগরণের পূজা নামে পরিচিত। জাগরণের দিন সাপ ধরা পড়লে বেদেরা একে মঙ্গলের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে। তারা মনে করে তাদের সরকাজে মনসার ইচ্ছা ও অনিচ্ছা সম্পৃক্ত। তাই যে কোনো কাজ সম্পন্ন করবার সময় তারা পরম ভক্তিসহকারে মনসার কৃপালাভে প্রয়াসী হয়।
ভারতের বিচিত্র সব আদিবাসীদের মধ্যে বেদেরা তাদের জীবনাচার, ধর্ম, সংস্কার, খানা, পেশা ইত্যাদি সব কিছুতেই অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠীর তুলনায় বিচিত্র ও বিভিন্ন। যুগ যুগ ধরে তারা লালন করে আসছে মিশ্র ধর্মীয়-সংস্কৃতি। বেদেরা যেমন নামাজ আদায় করে, তেমনি মা মনসার পূজাও করে। পেশাগত তন্ত্ৰ-মন্ত্ৰ উচ্চারণের সময়ও বেদেরা আল্লাহ-রাসুল ও দেবদেবীর দোহাই দেয়, তাঁদের নাম স্মরণ করে।
তারাশঙ্করের ‘বেদেনী’ গল্পে শন্ত্র নামাজ পড়ার দৃশ্যটি প্রসঙ্গত স্মরণীয়। বেদেদের সম্পর্কে তারাশঙ্করের দেয়া তথ্য তাদের জীবনাচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারাশঙ্কর সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে বেদে কৌমের জীবনধারা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

পাঁচ
বেদে সম্প্রদায়ের জীবনাচার ও সমাজ-ব্যবস্থার ভিত্তি মূলত তাদের কৌম-নির্ভর উপকথার উপর প্রতিষ্ঠিত। মনসাকেন্দ্রিক নানা সংস্কার ও উপকথাই তাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক। উপকথা-আশ্রিত বিশ্বাসই তাদের প্রধান চালিকাশক্তি। ভারতীয় আদিবাসীদের মধ্যে বেদেগোষ্ঠী ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। অসংখ্য অন্ধ বিশ্বাস এবং ওই বিশ্বাস-উদ্ভূত ভয়ই নিয়ন্ত্রণ করে বেদে জীবন।
তাদের জীবনের প্রত্যয়সমূহও খুব অদ্ভুত। বেদেগোষ্ঠীর বিশ্বাস তাদের আদিপুরুষ শিরবেদের ভুলের জন্যই লক্ষ্মীন্দরকে কালনাগিনী দংশন করেতে সক্ষম হয়েছিল। সেই থেকে চাঁদ সওদাগরের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে আদি শিরবেদে স্বভূমি ছেড়ে অভিশাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারই উত্তরপুরুষ বেদে সম্প্রদায় হারিয়ে ফেলে বংশানুক্রমিক মন্ত্রগুণ। অর্থাৎ, সাপ আর অভিশাপের গণ্ডিতেই আবর্তিত হয় বেদেদের জীবন। অবশ্য মা মনসার কৃপায় তারা পুনরায় ফিরে পায় আবাস, জাত-কুল, মন্ত্রগুণ এবং জীবিকার নানা বিদ্যা।
বেদেদের বিশ্বাস চাঁদসওদাগর অভিশাপ দিলেও যা মনসা তাদের অনন্যসহায়। বিষহরির কৃপায় তাই তাদের গোত্রে যুগ যুগ ধরে নাগিনী কন্যারা মনুষ্য কন্যারূপে জন্ম গ্রহণ করে। পাঁচ বছর বয়সে বেদে সমাজে নাগিনী কন্যা বিধবা হয়। ষোল বছর বয়সে সে নাগ মাহাত্ম্য অর্জন করে। তাই বেদেসমাজে বিধবাদের ষোল বছরের আগে পুনর্বিবাহ হয় না।
নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাসে সরলা ও পিঙলা মনসার প্রেরিত সেই নাগিনী কন্যা । তারা বিয়ে করতে পারে না; মনসার পূজা করে এবং বেদেগোষ্ঠীর মঙ্গলের জন্য যা করণীয় তা সম্পাদনে সচেষ্ট থাকে। মনসার নির্দেশমতো বেদে সমাজ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের। জৈবিক কামনা তাদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
মনসার একান্ত স্নেহাস্পদা এই নাগিনী কন্যা। বেদেরা মনে করে কালনাগিনী লক্ষ্মীন্দরকে দংশন করে বেহুলাকে স্বামী হারা করেছিল বলেই বেহুলার শাপে কালনাগিনীর নিজের বংশে নাগ জন্মে না। অন্য বংশের নাগ জাত সন্তান জন্ম দেয়। সেই সূত্রে নাগিনী কন্যাও অভিযুক্ত। তাই তার বিয়ে হয় না। বিয়ে হলেও সন্তান হয় না; সন্তান হলেও সেই সন্তান ‘ভুক্ষু’ (অর্থাৎ ভক্ষণকারী) হয়।
বেদেদের প্রচলিত উপকথায় এবং ধ্রুপদী পুরাণেও আছে যে, বাসুকীর ফণার উপরে সমগ্র পৃথিবী দুলছে।” আবহমান কাল ধরে বেদেদের গানে গানে চলে আসছে সে কথা :-
বাসুকী দোলায় মাথা দোলে চরাচর রে—
তুই ঢল ঢলে পড়রে!
সমুদ্র মন্থনে দোলে ও সাত সাগর রে
তুই ঢল ঢলে পড়রে!”
বিচিত্র সংস্কার-কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ বেদে সম্প্রদায়ের জীবনাচার। বেদেদের ঝাঁপিতে সাপ মরলে তারা সেটাকে তাদের কৃত পাপের ফল হিসাবে গণ্য করে। নিজ গোত্রের নিয়ম-কানুনের বাইরে কিছু করলে সর্দার বা গোত্র কৃর্তৃক কঠিন শাস্তির বিধান বেদে কৌমে প্রচলিত ছিল।
বেদেগোষ্ঠীর জীবিকার নানা গোপন রহস্য রয়েছে। রহস্যমণ্ডিত তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে তারা মানুষকে সম্মোহিত করে। এ সব গোপন বিষয় বাইরে প্রকাশ করা বেদেদের জন্য নিষিদ্ধ। তাদের জীবন মূলত সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত হয় নানা ধরনের সংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দ্বারা।
তাদের সমাজে পেশাগত এমন বাধ্যবাধকতার প্রচলনও ছিল যে, সাপে কাটার সংবাদ শোনামাত্র তারা ঘটনাস্থলে চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হবে। তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা হচ্ছে তন্ত্র, মন্ত্র ও জড়িবুটির চিকিৎসা। সর্পদংশনের ঘটনা যদি নিয়তি-নির্ধারিত না হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসা অব্যর্থ সুফল লাভে সক্ষম ।
বেদে গোষ্ঠীর জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে নৃত্য-গীত। তারা গানে-গানে তাদের গোষ্ঠীগত ইতিহাস ও উপকথার বর্ণনা করে। নৃত্য-গীত তাদের জীবিকারও একটি বড় উপাদান। বেদে নারীর ঐতিহ্যগত নৃত্য ও সুললিত দৈহিক হিল্লোল পেশাগত স্বার্থে সম্পন্ন গৃহস্থ পুরুষের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যবহৃত হয়। তাদের গোষ্ঠী-গীতির প্রায় সবটাই জুড়ে আছে কৌমের উৎসব-সংক্রান্ত উপকথা আর মনসা-চাঁদ সংক্রান্ত বিরোধ-কথা। দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়:
জয় বিষহরি গ! জয় বিষহরি !
চাদো বেনে দণ্ড দিল
তোমার কৃপায় তরি গ!
অ গা
চম্পাই নগরের ধারে
সাঁতালী পাহাড় গ!
অ গা
বেদে সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ উপাদান এ সকল গান। বেদে নারীরা সাপের খেলা দেখাতে বা বাদর নাচাতে সাপের ফণার তালে তালে হেলে দুলে নেচে এসব গান পরিবেশন করে থাকে। এ-সব গানের মধ্যে মনসার ভাসান গানেরই আধিক্য। তাদের নির্বাশ্রিত গান পল্লির গৃহস্থ বধূদের চোখে জলের বন্যা বইয়ে দিতে সক্ষম। বেদেরা নিজেরা এসব গান রচনা করে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা উপকথা ও বিশ্বাসকে অবলম্বন করে। তাই তাদের প্রবল অন্ধবিশ্বাসের জগৎটা এসব গানে অকপটভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে।
বেদে নারীরা সারাদিন জীবিকার জন্য গ্রামে গ্রামে খেলা দেখায়, পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে। কিন্তু সূর্যাস্তের পূর্বে অবশ্যই তাদের গৃহে ফিরে আসতে হয়। এটাই কৌমের বিধান। কোনো কারণে যথাসময়ে ফিরতে ব্যর্থ হলে কোনো সৎ গৃহস্থের বাড়িতে যে সে আশ্রয় নিয়েছিল তা প্রমাণ করতে হয় বেদে নারীকে। অন্যথায় ওই নারীর ওপর নেমে আসে কঠিন শাস্তি। এছাড়া এক গোত্রের ছেলে-মেয়ের অন্য গোত্রে বিয়ে হলেও তাদের পতিত বলে গণ্য করা হয়।

ছয়
প্রাচীন কাল থেকেই নিষ্কর ভূমিতে বেদেরা অস্থায়ী ঘর-বাড়ি তৈরি করে বসবাস করে আসছে। জমিদার বা সরকারকে তাদের খাজনা দিতে হত না। ১৩ চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে বিবাদের পর বিতাড়িত হয়ে বেদেরা মনসার আশ্রয় লাভ করে। তখন থেকেই বেদেরা মনসার নির্দেশে দেবী-প্রদত্ত ভূমিতে বসবাস করছে। ফলে অন্য কাউকে খাজনা দেওয়ার কোনো যুক্তি বেদেরা খুঁজে পায় না।
জীবন ধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই বেদেদের সন্তুষ্টি সীমায়িত। বেদে জনগোষ্ঠী কখনোই কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়নি। তবে অন্যের জমি থেকে তার ফসল কুড়ায় এবং কখনো কখনো ফসল চুরিও করে।
প্রকৃতির দান এবং নিজস্ব সংস্কারকে অবলম্বন করে হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও বেদে সম্প্রদায় সুদীর্ঘকাল তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। ভদ্র সমাজের মানুষের কাছাকাছি বসবাস করলেও তারা ভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত ছিল দীর্ঘকাল। কিন্তু সভ্যসমাজের শোষণ ও লালসার জাল থেকে বেশিদিন নিজেদের মুক্ত রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
কখনো কখনো ধণিক শ্রেণির ভোগের শিকারও হতে হয় বেদে নারীদের বেদেদের যাযাবর মানসতার জন্যই কৃষিকাজে তারা অনাগ্রহী । ফলে ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হওয়ার বাসনাও তাদের মধ্যে দেখা যায় না। কৃষিজীবী কাহার ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের যেখানে ভূমির প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও সাাহ দৃষ্টি লালন করে, যাযাবর বেদেরা সেখানে সম্পূর্ণ পৃথক মানসিকতার অধিকারী এক আদিবাসী গোষ্ঠী।
বেদেদের এই যাযাবরবৃত্তির কারণে তাদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও ছিল সার্বক্ষণিক। ফলে সভ্যতা, অর্থনীতি ও রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এদের স্বকীয়ত্বে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে স্বভাবতই। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা ও আধুনিক বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার বেদেদের জীবনধারায়ও পরিবর্তন এনেছে। আধুনিক জটিল আর্থনীতিক ব্যবস্থার ‘সুদ সংস্কৃতি’ গ্রাস করেছে তাদের কৌম সমাজকে। বর্তমানে নিজস্ব সমাজেও তারা অপেক্ষাকৃত ধনী বেদেদের দ্বারা সুদের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়। ১
আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনে আধুনিক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। কিন্তু সকলেরই জানা আছে যে, সমাজস্তরের একটি পর্যায়ে বড় পরিবর্তন হলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে হলেও তার অনিবার্য প্রভাব পড়ে। তাই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পৃথিবী ব্যাপী যে ভাঙা-গড়া, অস্তিত্ব সংকট ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হচ্ছিল; বেদেগোষ্ঠী স্বভাবতাই তার প্রভাবমুক্ত থাকেনি।
তারা ভূমি, রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়েও ওইসব প্রভাপবিস্তারী ঘটনার শিকার হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আধুনিক সময় মানব জীবনে নিয়ে আসে নতুনতর জটিলতা ও বাস্তবতা। সেইসঙ্গে আসে বিনোদনের আধুনিক সব চমকপ্রদ উপকরণ।
সভ্যতার ছোয়ায় পাল্টে যায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষ আর বেদেদের সাপের খেলা, যাদু কিংবা ভেল্কিবাজিতে আনন্দ পায় না। যুগের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও পরিবর্তন সাধিত হয় ব্যাপক । ফলে বেদেদের জড়িবুটি ও ওঝাগিরিতে ভাটা পড়ে। এভাবে এদের আর্থ-অবস্থা ও জীবিকায় নেমে আসে বিপর্যয়। ১৮
অস্তিত্বের প্রশ্নে ভারতীয় বেদেসম্প্রদায় ইতিহাসের এই পর্বে নিজেদের কৌম জীবনসীমা-উৎকেন্দ্রিক ভিন্নতর পেশায় মনোনিবেশ করতে বাধ্য হয়, কখনো উদ্যোগী হয় স্বীয় পেশায় নতুন মাত্রা সংযোজনে । এতদসত্ত্বেও প্রকৃতির এই সরল কৌম সন্তানেরা জটিল আধুনিক জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পেরে নিক্ষিপ্ত হয় অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন সংগ্রামে।
অনার্য অধ্যুষিত রাঢ় অঞ্চলই ছিল বেদে সম্প্রদায়ের বৃহৎ বিচরণ ক্ষেত্র। উত্তরকালে রাঢ় অঞ্চল শাক্ত, তান্ত্রিক ও সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মের লীলাক্ষেত্র হয়েছে। নিম্নবর্গীয় জীবনে এই গ্রহণ-বর্জনের একটা প্রবল আন্দোলন তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন ধর্ম ও কৌমজনতার সহাবস্থানের কারণে। বেদে সম্প্রদায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। এরই ফলে হিন্দু ধর্মের নিম্ন পর্যায় ছাড়াও বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মের সঙ্গেও তাদের সংযোগ স্থাপিত হয়।
এছাড়া রাঢ় অঞ্চলে ধর্মঠাকুরের প্রতিপত্তির কারণে বেদেদের ওপর তারও প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। আবার কখনো কখনো সামাজিক পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে বেদেরা ধর্মান্তিরিত হতেও বাধ্য হয়েছে।” ওইসব কারণে অন্যান্য আদিবাসীর মতো বেদেদের জীবনেও নেমে এসেছে অনিবার্য পরিবর্তন। আর এটাই বেদে কৌমের সামাজিক জীবনের ট্রাজেডি। কারণ আদিবাসীদের গোষ্ঠীগত মৌলিক জীবনচর্চা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকলে তা থেকেই আসে সামাজিক গোষ্ঠীগত অবক্ষয়।
ব্যাপক বংশ বিস্তারের ফলে জনসংখ্যার আধিক্যও ঘটেছিল বেদেদের গোষ্ঠীগত জীবনে। ফলে একই পেশায় বর্ধিত জনসংখ্যার সংকুলান হয়নি জমিদারদের দেওয়া নিষ্কর ভূখণ্ডে। ফলে অনেকেই তখন ভিন্ন পেশা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। আবার একথাও সমভাবে সত্য যে, কালিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেদেদের পেশাগত জীবনেও রুচি- পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়। এ-কথাও বহুলাংশে সত্য যে, টিকে থাকার জন্যই বেশিরভাগ বেদে বৃত্তি বদল করেছিল।

সাত
নৃবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান-ক্ষেত্র হচ্ছে সামাজিক বিবর্তন। সমাজ ক্রমপরিবর্তশীল। আর এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না। এর পেছনে থাকে নানা কারণ। রাজনৈতিক পরিবর্তনও প্রভাব ফেলে আর্থনীতিক পরিবর্তনে। আর্থনীতিক পরিবর্তন সমাজ জীবনের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।
ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে এই আর্থনীতিক পরিবর্তন এসেছিল বহুমাত্রিক রূপ নিয়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতে বাণিজ্য ও শিল্পপুঁজির প্রসার ঘটিয়েছিল। ফলে সনাতন জীবনধারায়ও গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এতে সমাজের সর্বস্তরে একটা প্রবল আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। ভেঙে পড়ে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, হ্রাস পায় কৃষির ওপর নির্জনশীলতা।
আরও উত্তরকালে বাজার নির্ভর অর্থনীতির সূচনায় নির্দিষ্ট পেশার মানুষ স্বীয় পেশার বাইরে যেতে বাধ্য হয়। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনেও ওইসব সমভাবে প্রভাব বিস্তার করেছ এবং তাদের নিজস্বতায় আঘাত হেনেছে। নগদ উপার্জন, পেশাগত বৈচিত্র্যের চমক এবং নতুন জীবনের আস্বাদ লাভের অভিপ্রায়, সর্বোপরি অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই তারা ভিন্ন পেশা সন্ধানে বাধ্য হয়েছে।
যেকোনো আদিবাসী গোষ্ঠী যখন সভ্য জগতের কাছাকাছি এসে তাদের বৃত্তি পরিবর্তন করে, তখন তাদের স্বকীয়তা অপহৃত হয়। উচ্চবিত্ত শ্রেণী স্বার্থ চরিতার্থতার জন্য তাদের ব্যবহার করে। আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক আর্থনীতিক বাজারে প্রবেশ করে সরল এ জনগোষ্ঠী হয়েছে বঞ্চনার শিকার। পেশাগত পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে পারেনি তারা কখনোই।
বৃত্তি বদলের ফলে স্বীয় সংস্কৃতি, জীবনাচার ও ঐতিহ্য হারিয়ে উন্নলিত এক জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়েছে বেদেরা। এভাবে তারা পরিণত হয়েছে বাংলার এক লুপ্তপ্রায় সম্প্রদায়ে । তারাশঙ্কর ওই সত্যকেই আভাসিত করেছেন পাঠকে সম্মুখে বলেছেন আজকাল অনেকেই এদের জানেন না। বেদেদের বিলুপ্তির জন্য একক কোনো কারণ হয়তো দায়ী নয়, তবে সার্বিক সামাজিক বিবর্তন ধারায় আদিম বৃত্তিগত পরিবর্তনই এদের বিলুপ্তির জন্য যে দায়ী, তা অস্বীকার করবার উপায় নেই ।
অদম্য সাহস আর অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে অসাধারণ অভিযোজনক্ষম বেদে কৌম প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে দীর্ঘকাল টিকেছিল। কিন্তু মানুষের গড়া যান্ত্রিকতার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনে এদের স্বীয় সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনমানে আসে প্রচণ্ড আঘাত। সেই আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে তারাশঙ্করের সমকালেই (১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় উপমহাদেশীয় ঐতিহ্যের ধারক বিচিত্র এই কৌম সম্প্রদায়।