আজকে আমরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শিল্প প্রকরণ সূচি আলোচনা করবো।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শিল্প প্রকরণ সূচি
২০০২-২০০৩ শিক্ষাবর্ষে বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. ফিল. কোর্সে আমি নাম নিবন্ধন করি। আমার গবেষণার শিরোনাম ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শিল্প প্রকরণ’। আমার গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ ও মানস-প্রবণতা অনুধাবন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর, আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ ডক্টর সৈয়দ আকরম হোসেন উক্ত শিরোনাম নির্ধারণ করে দেন। এ জন্য আমি তাঁর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
বর্তমান অভিসন্দর্ভের সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপরেখা নির্মাণে গবেষণা-তত্ত্বাবধায়ক প্রফেসর ডক্টর বিশ্বজিৎ ঘোষ-এর নিরন্তর প্রেরণা ও নির্দেশনায় আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে গবেষণা-কর্মে নিমগ্ন থাকতে পেরেছি। আমার ব্যক্তিগত অসুবিধা ও পঠন-চিন্তনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমণের শক্তি যুগিয়েছেন তিনি।
আধুনিক বাংলা কবিতার প্রতি তাঁর আন্তরিক আগ্রহ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্য বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত পরামর্শ, নির্দেশনা ও মীমাংসা আমার গবেষণায় গতি সঞ্চার করেছে। আমি তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারও ব্যবহার করেছি।
অভিসন্দর্ভ রচনাকালে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা দিয়ে আমার গবেষণাকর্মকে সচল রাখতে সাহায্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও চেয়ারম্যান ডক্টর পৃথ্বিলা নাজনীন নীলিমা। তাঁদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
- ব্যক্তিগত পর্যায়ে বই ও উৎসাহ-অনুপ্রেরণা দিয়ে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তাঁদের মধ্যে
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর,
- অধ্যাপক আহমদ কবির,
- অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী,
- অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ,
- সহযোগী অধ্যাপক ও কবি বায়তুল্লাহ কাদেরী,
- সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দীন (গিয়াস শামীম),
- প্রভাষক মোঃ আব্দুস সোবহান তালুকদার (উপল তালুকদার),
- প্রভাষক তারিক মনজুর,
- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও কবি ড. খালেদ হোসাইন,
- সহযোগী অধ্যাপক ড. অনিরুদ্ধ কাহালি,
- সহকারী অধ্যাপক ও কবি আৰু দায়েন,
- সহকারী অধ্যাপক ও কবি মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম (সুমন সাজ্জাদ),
- আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভার্সিটি বাংলাদেশ (AIUB)-এর অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোঃ শওকত আলী,
- সদরপুর সরকারি কলেজ,
- ফরিদপুর-এর অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ গিয়াস উদ্দীন,
- উপাধ্যক্ষ এ এস এম ইসহাক মিয়া,
- অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেক আবদুল মালেক,
- ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মাসউদুল হাসান,
- বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মর্জিনা বেগম,
- প্রভাষক মোঃ রেজাউল করিম,
- অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মোঃ তারিকুল ইসলাম খান এবং
- ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দীনবন্ধু বর্মন অন্যতম।
এঁদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যাঁদের সান্নিধ্য আমাকে আলোকিত মানুষ হতে অনুপ্রাণিত করে, তাদের মধ্যে আমার অগ্রজ আব্দুস সালাম তালুকদার, মজিবর রহমান তালুকদার, সরকারি ভিকু মেমোরিয়াল কলেজ, মানিকগঞ্জ-এর বাংলা বিভাগের প্রভাষক এবং সাহিত্যপত্র ক্রান্তিক-এর সম্পাদক কবি সোহেল হাসান গালিব, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা-র বাংলা বিভাগের প্রভাষক খাদিজা পারভীন পপি, বন্ধু প্রবীর দত্ত, আনোয়ারুল আজিম, আসাদুজ্জামান রানা ফরাজী, মুর্শিদ জাহান মিলি, ফিরোজ আলম এবং আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন প্রকৌশলী মোঃ শাম্স আরাফাত অন্যতম। এঁদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

আমি বিশেষভাবে স্মরণ করি আমার বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রভাষক, প্রাবন্ধিক-গবেষক মোহাম্মদ আজম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের প্রভাষক, কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক হিমেল বরকত-কে, যাঁরা কেবল গ্রন্থ ও পরামর্শ দিয়েই নয়, সময় এবং শ্রম দিয়েও আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঋণ স্বীকারের নয়।
গবেষণাকালে আমি প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, বাংলা বিভাগের সেমিনার গ্রন্থাগার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার গ্রন্থাগার, মানিকগঞ্জের গঙ্গারামপুর জনকল্যাণ সমিতি গ্রন্থাগার, ফরিদপুরের সদরপুর সরকারি কলেজ গ্রন্থাগার এবং কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ-র ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ব্যবহার করেছি। এসব গ্রন্থাগার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আমি ধন্যবাদ জানাই ।
আরো একজনের নিরন্তর উৎসাহ ও সহযোগিতা ছিল আমার অন্যতম শ্রম-উৎস, যিনি সংসারের কঠিন দায়িত্ব এবং নিজের পেশাগত কর্তব্য পালন করেও এই গবেষণাকর্ম সচল রাখতে আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করেছেন, তিনি নাশিদ রেজা, আমার অহঙ্কার, আনন্দ এবং অভিমানের অন্যতম অংশীদার।

সূচি
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শিল্প প্রকরণ অবতরণিকা
প্রথম অধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায় : সমকালীন কাব্যরূপের পরিপ্রেক্ষিত
দ্বিতীয় অধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মানসগঠন ও শিল্পবোধের স্বরূপ
তৃতীয় অধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শিল্প প্রকরণ
প্রথম পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার শব্দ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বাক রীতি
তৃতীয় পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার অলঙ্কার
চতুর্থ পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার চিত্রকল্প
পঞ্চম পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার প্রতীক
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার পুরাণ
সপ্তম পরিচ্ছেদঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার ছন্দ
উপসংহার
যুগধর্মের নানা চিহ্নকে ধারণ করেই মহৎ শিল্প যুগোত্তীর্ণ এবং রসোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। স্বকাল বিচ্যুত শিল্পসাহিত্য ভবিষ্যতের স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে স্পর্শ করতে পারে না বলেই তা অন্যের মনে সঞ্চারিত হয় না এবং তা শিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িতও হতে পারে না।
চিন্তাজগতের যে কোন অভিজ্ঞতা-অর্জন-অনুশীলন, পরিবর্তন-পরিবর্ধন- সংশোধনেই সময়ের হাত থাকে। বর্তমানকে উপলব্ধির মাধ্যমেই অতীতের সঙ্গে তাকে জুড়ে দিয়ে ভবিষ্যতের দিনগুলোকে নিজের অভিজ্ঞতার নির্যাসে নির্মাণ করা যায়। এই নির্মাণের প্রশ্নেই প্রাকরণিক প্রকৌশল বিবেচনা করতে হয়।
নির্মাণশৈলী বিষয়ানুগ না হলে কোন মহৎ সৃজন সম্ভব নয়। ফলে শিল্পসাহিত্যের বিষয় নির্ধারণে শিল্পী যেমন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে তাঁর কালের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন, তেমনি শিল্পরীতির ক্ষেত্রেও সময়ের প্রভাব অনস্বীকার্য।

প্রথম মহাযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বিশ্বব্যবস্থায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুভাষ মুখোপাধ্যায় কালের কণ্ঠে মনযাত্বহীনতার জয়ধ্বনি শুনলেও তিনি সময়ের স্রোতে ভেসে না গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কথাই ভাবলেন, বিড়ম্বিত এবং উৎকেন্দ্রিক মানুষকে বিপ্লবের পথে আহ্বান করলেন। তিনি আপন যৌবনকে ভাবাবেগ এবং উচ্ছ্বাস থেকে মুক্ত রেখে সংঘবদ্ধ জীবনের পথে ডাক দিলেন সবাইকে।
ফুলের গন্ধে ঘুমিয়ে পড়া মানুষকে তিনি হাতুড়ি ও কাস্তের গান শুনিয়ে জাগ্রত করলেন। শতাব্দীলাঞ্ছিত আর্ডের আহাজারি বন্ধ করার উপায় একটাই – মৃত্যুর ভয়ে বসে না থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার মধ্যে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরলেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের দিনবদলের কোন সম্ভাবনা নেই। তাই তিনি শোষিত ও বঞ্চিত জনতার একজন হিসেবে সকলের মুক্তি ও কল্যাণের কথা ভাবলেন, ঘোষণা করলেন: আমাদের থাক মিলিত অগ্রগতি’।
প্রথম মহাযুদ্ধের মর্মঘাতী পরিণাম প্রত্যক্ষ করেও যখন এড়ানো গেল না দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বৈনাশিক বিপর্যয়, তখন বিশ্বব্যাপী বি-মানবিক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। শিল্পসাহিত্যেও এই বিপন্ন বিসঙ্গত- বিযুক্ত মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যারা ভয়াবহ বর্তমানে দাঁড়িয়ে অন্ধকার ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নে নিমজ্জিত। এই মজ্জমান মানুষকে টেনে তুলে তাদের হাতে আলোকিত আগামীর নিশান ধরিয়ে দিলেন আমাদের প্রগতিশীল সাহিত্যিকগোষ্ঠী।
তাঁদের অনেককেই হয়তো একটি বিশেষ রাজনৈতিক ভাবাদর্শ চালিত করেছে, কিন্তু মনুষ্যত্বের যুক্তি ও কল্যাণের যে সর্বজনীন আবেদন, তাই তাঁদের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রমণের শক্তি জুগিয়েছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার প্রকরণ মূল্যায়নে তাঁর ভাবাদর্শের বিশ্বজনীনতা সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
চল্লিশের কবিরা দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং দেশবিভাগের প্রত্যক্ষদর্শী। এইসব সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতেই নির্মিত হয়েছে তাঁদের শিল্পদৃষ্টি। বক্তব্যধর্মী কবিতা বস্তুগত জীবনের নিকটবর্তী হয়েছে। ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বরকে তাঁরা সমষ্টির উচ্চারণে পরিণত করতে চেয়েছেন।
কবিতায় সাধারণ মানুষের ভীড় যেমন বেড়েছে, তেমনি পূর্বসূরি কবিদের দুর্বোধ্যতার বিপরীতে তাঁরা সহজ-সরল-স্বতঃস্ফূর্ততার দিকে অগ্রসর হলেন। বিবিক্ত শিল্পভুবনে সাধারণ মানুষের কোলাহল শোনা গেল। উপেক্ষিত জনতার নানা গল্প-কাহিনী উপকথায় এই সময়ের কবিতা হয়ে উঠল জনমুখী। চল্লিশের দশকের কবিতার এই ভাবগত স্বাতন্ত্র্য তার প্রকরণকেও প্রভাবিত করেছে বলেই বর্তমান গবেষণায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শৈলী -স্বাতন্ত্র্য অন্বেষণে চল্লিশের কবিতার মৌল প্রবণতাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিশিষ্ট চিন্তা যুগধর্মকে স্বীকরণ করেই স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছে। সমকালীন শিল্পসাহিত্যের সম্ভাবনাগুলোকে তিনি যেমন ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে অবাধে আত্তীকরণ করেছেন, তেমনি সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করে তা উত্তরণের নানা কৌশল আয়ত্ত করেছেন। কেবল শিল্পসাহিত্যই নয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও তাঁর অভিজ্ঞতাকে বিস্তৃত করেছে, যার প্রোজ্জ্বল প্রভাব তাঁর কাব্যশরীরে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা।
তিনি ক্রমাগত নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন, নির্মাণ করেছেন যুগোপযোগী ও যুগোত্তীর্ণ শিল্পসম্ভার। কবির সৃজনভাবনায় সমকালীন শিল্প-সাহিত্যের আলোক-প্রক্ষেপণ যেমন পরিষ্কার, তেমনি তাঁর নিজস্ব শ্রম ও মনীষায় তা অর্জন করে নিয়েছে প্রাতিস্বিক শিল্পঋদ্ধি।
কবির সৃজনভুবনকে মূল্যায়ন করতে হবে তাঁর শিল্পচিন্তার মৌল প্রবণতাকে বিবেচনায় রেখেই। শিল্পসত্তার আলোকেই নির্মিত হয় একজন স্রষ্টার সমগ্র কাব্যপ্রয়াস। উদ্দেশ্যহীন শিল্পীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। লক্ষ্য স্থির হলেই তা অর্জনের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো শনাক্ত করা যায়। সুভাষের শিল্পবোধের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে মানুষ। মানুষের মুক্তির জন্যই তাঁর যাবতীয় আয়োজন।
অর্থনৈতিক- রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি, সর্বোপরি মানসিক দাসত্বের অবসান ঘটানোই তাঁর শিল্পদৃষ্টির মৌল নিয়ামক। মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের পথে প্রধান শত্রুদেরকে তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এই শত্রুনিধনের একমাত্র উপায় সংঘবদ্ধ শক্তির উদ্বোধন। সুভাষের শিল্পচেতনার মুখ্য সঞ্চালক এই জনজাগরণের মন্ত্র, যা তাঁর কবিতায় অপ্রতিরোধ্য বেগ এবং অভিনব লাবণ্য সঞ্চার করেছে।

কবির আবেগ-অভিযোগ অভিজ্ঞতা- অনুপ্রেরণার যাবতীয় শক্তি ও সম্ভাবনাকে ধারণ করে শব্দ। শব্দশরীরেই তাঁর শিল্পবিশ্বাস প্রতিবিম্বিত হয়। শব্দের প্রচলিত অর্থের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তিনি তাতে সঞ্চার করেন অভিনব প্রাণশক্তি।
সাহিত্য-বিবেচনায় শিল্পসচেতনতার অন্যতম শর্ত তাই শব্দসচেতনতা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় শব্দের সজাগ, সতর্ক এবং অনুভূতিপ্রবণ অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিয়েই অর্জিত অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নির্মাণ করেছেন তাঁর নিজস্ব শিল্পভুবন, যেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার অবাধ ও আনন্দময়। শব্দ- সম্ভার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে কবির কথন-কৌশল বা ভাষাভঙ্গিকে। সুভাষ শ্রমজীবী জনতার সংঘবদ্ধ জাগরণ-প্রত্যাশী।
সমাজমনস্ক এবং রাজনীতিসচেতন কবি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি চিত্রিত করেছেন। তাই তাঁর কবিভাষা প্রচলিত প্রাত্যহিক কথনবৈশিষ্টের আলোকেই নির্মিত হয়েছে। তাঁর প্রগতিশীল শিল্পদৃষ্টি ও রাজনৈতিক বিশ্ববীক্ষার অনুকূল এই কবিভাষা তাঁকে অসাধারণ শিল্পঋদ্ধি দিয়েছে।
কবিতার ভাষায় যতই মুখের ভাষার অনুকৃতি থাকুক না কেন, তা সর্বাংশে দৈনন্দিন কথোপকথনের ভঙ্গিটিকে রপ্ত করতে পারে না। কবিতার ভাষায় অলঙ্করণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। আর অলঙ্কার যেহেতু মানুষের সৌন্দর্য-জিজ্ঞাসারই স্মারক, তাই কবিতায় অলঙ্কার প্রয়োগ সার্থক হলে তা স্বতন্ত্রভাবে নিজের অস্তিত্বকে ঘোষণা করে না, বরং কবিতার বিষয় ও প্রকরণের সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে কবিভাষায় অভিনবত্ব সঞ্চার করে।
সঙ্গত কারণেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যদেহও অলঙ্কৃত। তিনি সাধারণ জনজীবনের নানা প্রান্ত পরিভ্রমণ করে অলঙ্কার অন্বেষণ করেছেন। তাঁর অলঙ্কার প্রয়োগ পাঠকের রসানুভূতি জাগানোর যান্ত্রিক কৌশলমাত্র নয়, কবির আত্মিক অনুরণনে তা কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, যা কাব্যপাঠকের চিন্তা- কল্পনা- রসবোধ জাগ্রত করে কবিতাকে শিল্পোত্তীর্ণ মহিমা দান করতে সক্ষম হয়েছে।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় অলঙ্কার ব্যবহারে কোন রকম অতিরঞ্জনকে প্রশ্রয় দেন নি। কবিতার ভাষায় অভিনবত্ব সৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি পরিচিত শব্দেই দান করেছেন অনাস্বাদিত দীপ্তি, যা অনায়াসে আমাদের আলোড়িত করে, পরিতৃপ্ত করে। তাঁর অভিজ্ঞতার জগৎ অন্তভূমির প্রগাঢ় চেতনার স্পর্শে ঋদ্ধ হয়ে কাব্যভাষাকে প্রাতিস্বিকতা দিয়েছে। সুভাষের অলঙ্কার কবিতায় অপ্রত্যাশিত ইঙ্গিতের উদ্ভাসন ঘটিয়েছে।
কবিকল্পনা শব্দমাধ্যমে চিত্রিত হয়। শব্দের সন্নিবেশে অভিনবত্ব এনে তিনি পাঠকের চিন্তাকে উদ্দীপিত করেন। কবি-প্রাণের উষ্ণতায় তাঁর শব্দপ্রতিমা সজীবতা লাভ করে। আপন উপলব্ধিকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য করে কবিতার হৃদস্পন্দনে পাঠককে জাগ্রত করেন তিনি। সুভাষ মুখোপাধ্যায় শব্দের সঙ্গে আপন অনুভবের সেতুবন্ধ রচনা করেছেন, যা পাঠকের সামনে ছবি হয়ে উঠতে পারে।
সংহত অভিজ্ঞতার শিল্পসম্মত প্রকাশেই তাঁর চিত্রকল্প প্রগাঢ় ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। শিল্পবিশ্বাস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে সন্নিহিত করে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর বিচিত্র বাক প্রতিমা, যেখানে কবিচৈতন্যের নানা স্তরের অভিনব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন স্পষ্ট। সমাজ-সম্পৃক্ত যে সাহিত্যভাবনাকে তিনি ধারণ করেছেন, তাঁর চিত্রকল্প সেই ভাবনাকেই মূর্ত করে তুলেছে। আমরা লক্ষ করেছি, সুভাষের বাক্প্রতিমা তাঁর রাজনৈতিক ভাবাদর্শের নির্যাসে লাভ করেছে অভিনব ব্যঞ্জনা।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় ব্যবহৃত প্রতীকে তাঁর জীবনদৃষ্টি ও শিল্পভাবনার স্বরূপ যেমন উন্মোচিত, তেমনি প্রতীকের দূরসঞ্চারী আলোক প্রক্ষেপে তাঁর সৃজনভুবনও হয়েছে স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত। তিনি প্রতীকের ভেতর ঢেলে দিয়েছেন তাঁর বর্ণিল অভিজ্ঞতাকে, যা গভীরতর রহস্যের ধারক হিসেবে পাঠকের চিন্তাশক্তিকে নানা দিকে নিক্ষেপ করে।
কবির প্রতীক তাঁর প্রগাঢ় জীবনবোধ ও সুগভীর উপলব্ধির বর্ণিল প্রান্তরকে চিহ্নিত করেছে। তাঁর প্রতীক সৃজন-প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থেকেছে সমাজ-ইতিহাস-রাজনীতি সচেতনতার প্রভাব। তিনি তাঁর শিল্পভাবনাকে ঋদ্ধ করেছেন মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষার আলোকে এবং তাঁর প্রতীক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই জীবন-সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে, যা সমষ্টিগত চেতনার উদ্বোধক।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পুরাণ-ভাবনা মহাভারত ও রামায়ণের চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই উচ্ছ্ব প্রয়োগসাফল্য অর্জন করেছে। লোকপুরাণ প্রয়োগেও তাঁর জীবনবীক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। ভারতীয় এবং পশ্চিম এশীয়- উভয় পুরাণের মিথস্ক্রিয়ার দৃষ্টান্তও তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত নয়। পাশ্চাত্য পুরাণ তাঁর সৃজনভুবনে প্রবেশাধিকার পায় নি বলা যায়।
পুরাণকে অবিকৃত কাহিনীরূপে নয়, পৌরাণিক সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহের ভেতরে আধুনিক জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টির শেকড় বিস্তৃত করেছেন তিনি, আর সেই নৃতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মাণ করেছেন ব্যক্তিগত শিল্পভুবন যা আত্মকেন্দ্রিক নয়, সামাজিক ও সমষ্টিগত । পুরাণের আধুনিক রূপায়ণ ঘটিয়ে সমকালীন জীবনবেদ প্রকাশই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তি। পুরাণ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাফল্য স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ছন্দবিষয়ক পরীক্ষা নিরীক্ষা বার্থ হয় নি। সুর ও ভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে বৈচিত্র্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে প্রধান ছন্দ মাত্রাবৃত্ত হলেও তিনি ধীরে ধীরে অক্ষরবৃত্তের দিকে ঝুঁকেছেন এবং এই ছন্দের নিরূপিত কাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি চমৎকারিত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
স্বরবৃত্তের আড়ষ্টতা অতিক্রম করে তাকে তিনি অনায়াসে গভীর ও নিগূঢ় ভাবের বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গদ্যছন্দেই তিনি সমর্পিত হয়েছেন। তাঁর শেষ পর্যায়ের মৌলিক কাব্যগ্রন্থসমূহের প্রধান বাহন গদ্যছন্দ। তিনি আরো স্পষ্ট এবং বলিষ্ঠভাবে সামাজিক অসঙ্গতিকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, আর এ কাজে গদ্যছন্দকেই অধিকতর উপযোগী মনে করেছেন তিনি।
শিল্প-সাহিত্য ব্যক্তি, সমাজ ও সমকাল নিরপেক্ষ কোনো বিষয় নয়। সমাজের সঙ্গে বিচ্ছেদ জীবনের সার্থকতাকেই অস্বীকার করে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনদৃষ্টির ভিন্নতা তাঁকে সংগ্রামের পথে ডাক দিয়েছে, আর তিনি তাঁর আত্মার স্পন্দন ছড়িয়ে দিয়েছেন কাবা শরীরে।
এই কাব্যবোধের কারণেই সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলা কবিতায় ভিন্ন স্বরের স্রষ্টা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনবোধ ও সাহিত্যদৃষ্টি পরস্পর সন্নিবিষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ শিল্পভুবন। জীবনকে নিবিড়ভাবে অপরিসীম নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ করেছেন। তিনি, আর সেই জীবনাভিজ্ঞতা থেকেই সংগৃহীত হয়েছে তাঁর কবিতার পুষ্টি।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জীবনাচরণের সঙ্গে তাঁর সৃজনকর্মের কোনো ব্যবধান নেই । বাংলা প্রগতি-কবিতার ধারায় সুভাষ বিপ্লবী জীবনেরই নিপুণ ভাষ্যকার। বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে তিনি নির্মাণ করেছেন সংঘবদ্ধ জীবনের প্রতিকৃতি, যা মানুষকে সম্ভাবনার পথে, সমৃদ্ধির পথে আহ্বান করে।
এই আহ্বানকে কাব্যদেহে সঞ্চারিত করার যে প্রকরণ-প্রকৌশল আয়ত্ত করেছেন তিনি, তা বিষয়ানুগ বলেই মিলিত অগ্রগতি’র এই মহৎ প্রয়াস কার্যকর হতে পেরেছে। ক্রমাগত কঠিনের সঙ্গে লড়াই করে যে দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তাঁর কবিতা সেই ব্যক্তিত্বেরই উজ্জ্বল স্মারক।