আজকের আলোচনার বিষয়ঃ তারাশঙ্করের দৃষ্টিতে আদিবাসী মানুষ । যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

তারাশঙ্করের দৃষ্টিতে আদিবাসী মানুষ
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮-১৯৭১) বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শৈশব-কৈশোর ও প্রাক্-যৌবনকাল অতিবাহিত হয়েছে ওই অঞ্চলে। বীরভূম জেলার ভৌগোলিক বাস্ত বতার কারণেই সুদীর্ঘকাল ধরে বীরভূমে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস। ফলত নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে দেখার, তাদের জীবন ও সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাঁর কাছে ছিল অবারিত।
তারাশঙ্করের এই বিশিষ্ট সমাজদৃষ্টি কৈশোরপর্বেই প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ লাভ করায় সতর্ক ও আন্ত রিক বীক্ষণে তিনি এই আদিবাসী জীবনধারাকে উপলব্ধি করতে সমর্থ হন। উত্তরকালে যখন তাঁর এই সমাজদৃষ্টি শিল্পবোধের সঙ্গে সমন্বিত হয়, তখন সাহিত্যের উপকরণ হিসেবে স্ব-অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন তাঁকে প্রভূতরূপে আকৃষ্ট করে।
এই অনুরাগ ও আকর্ষণের শিল্পস্মারক তারাশঙ্কর সৃজিত তিনটি কালজয়ী উপন্যাস – হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৬-৪৭), নাগিনী কন্যার কাহিনী (১৯৫২) ও অরণ্য-বহ্নি (১৯৬৬)। উল্লিখিত তিনটি উপন্যাসে যথাক্রমে কাহার, বেদে ও সাঁওতাল কৌম-জনগোষ্ঠীর জীবনবেদ ও জনজীবন অনন্য শিল্পসৌন্দর্যে রূপায়িত হয়েছে।
আদিবাসী মানুষের প্রতি তারাশঙ্করের অনুরাগ ও আকর্ষণ শুধু ওই তিনটি উপন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনের বিভিন্ন পর্বে এর প্রতিফলন আমরা লক্ষ করব।
সমগ্র বীরভূম ও রাঢ়-মুর্শিদাবাদে নিম্নবর্গের মানুষের বসবাস বহুকাল ধরে। বীরভূমের উত্তর-পশ্চিমে সাঁওতাল পরগণার অবস্থান। বীরভূমের গ্রামাঞ্চলে বহু উচ্চবর্ণের হিন্দুগৃহে আদিবাসী সাঁওতালরা কৃষি ও গৃহস্থালি কাজে অংশ নিত। সমগ্র রাঢ়ের কাঁকর মিশ্রিত লাল মাটির সঙ্গে নিম্নবর্গের এসব মানুষের রক্তের সম্পর্ক ছিল ভারতীয় সভ্যতার উষাকাল থেকে। রাঢ়ভূমি ছিল অসংখ্য নিম্নবর্গ মানুষের মিলনমেলা।
বিচিত্র সব মানুষ রাঢ়ের সংস্কৃতিকে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া বিভিন্ন মৌসুমে বর্হিজেলা থেকে নানাবর্ণের পেশা ও জাতির মানুষ কাজের সন্ধানে ভিড় করত বীরভূমে। তারাশঙ্করের নিজ গ্রাম লাভপুরেও উচ্চবর্ণের মানুষের পাশাপশি বাস করত নানা বর্ণের ও পেশার অন্ত্যজ মানুষ ।

প্রাচীন জৈনসূত্র গ্রন্থ এবং বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকেও জানা যায় বীরভূম এককালে ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত ছিল। বীরভূমের ‘বীর’ শব্দটি হল মুণ্ডারী শব্দ। এর অর্থ হল জঙ্গল। প্রধানত অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীজাত অনার্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রাঢ় অঞ্চলের প্রাচীনতম আদিবাসী হওয়ায় এ অঞ্চল দীর্ঘকাল আর্যদের প্রভাব মুক্ত ছিল।
রাঢ়বঙ্গে বসবাসকারী আদি অস্ট্রাল কৌমগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, কাহার, বেদে, মুন্ডা, ওঁরাও, হাড়ি, বাগদী, ডোম, বাউল, পটুয়া, দ্রাবিড় ভাষাভাষী দাসদস্যসহ অসংখ্য নিম্নবর্গ মানুষ। বর্তমান পশ্চিম বাংলার মোট আদিবাসী জনসংখ্যার শতকরা পঁচাত্তর জনই বাস করে রাঢ় বঙ্গের তিনটি জেলা- বর্ধমান, বীরভূম ও বাঁকুড়ায়। আর সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর শতকরা পঁচাত্তর জনেরই বসবাস ও চলাচল মেদেনীপুরসহ ওই তিনটি জেলায়। সমাজ-বিন্যাসের এই বৈশিষ্ট্য তারাশঙ্করের স্ব-গ্রাম লাভপুরে আরও বৈচিত্র্য নিয়ে প্রকাশিত।
তারাশঙ্কর শৈশব থেকে দেখেছেন দিনমান এখানে আসত বাউল-বৈষ্ণব, শাক্ত- তান্ত্রিক, পদাবলী গায়ক, লাঠিয়াল, পীরমঙ্গল, গোরুমারা, যাযাবর, পটুয়া, বিষবেদে, মালবেদে, সাঁওতাল শ্রমিক, কাঁহার, ডোম, বাদী ইত্যাদি নানা বর্ণ ও গোষ্ঠীর অন্ত্যজ পেশাজীবী মানুষ। তারা কেউ গান-গল্প শোনাত, কেউ খেলা দেখাত। আবার কেউ কেউ দিন মজুর হিসেবে কাজ করত।
অনুসন্ধিৎসু তারাশঙ্কর বাল্যকাল থেকেই তাদের কথা শুনতেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন। এদের বিচিত্র জীবনধারা ও ভাষাবৈশিষ্ট্য শৈশব থেকেই তাঁকে আকর্ষণ করত। তারাশঙ্করের বাড়িতে আসত সেতারি, জ্যোতিষী, পটুয়া, লাঠিয়াল, ডাইনী, বেদেনী- – আরও কত রকমের মানুষ। সবার কথা শুনে, সবার সঙ্গে মিশে শৈশবেই সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর অভিজ্ঞতার জগৎ।
আদিবাসী অধ্যুষিত লাভপুর সম্পর্কে তারাশঙ্কর লিখেছেন— ‘লাভপুর গ্রামখানি অদ্ভুত গ্রাম। আমার জন্মস্থান- আমার জন্মভূমি- আমার পিতৃপুরুষের লীলাভূমি বলে অভিরঞ্জন করছিনা, সত্য কথা বলছি। এ গ্রামে জন্মেছি বলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি। আমার সাহিত্যজীবন গ্রন্থে তারাশঙ্কর আরও লিখেছেন “এদেশের মানুষকে জানার একটা অহংকার ছিল। এদের সঙ্গে মানুষ হিসেবে পরিচয়ের একটা বড় সুযোগ আমার হয়েছিল। … তাই এদের কথা লিখি। এদের কথা লিখবার অধিকার আমার আছে।’
তারাশঙ্করের শৈশবকালীন পারিবারিক পরিমণ্ডলও এ বিষয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে তাঁর পিসীমা শৈলজা ঠাকুরাণী নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে জমিদারির উপযুক্ত বৈষয়িক জ্ঞান-সম্পন্ন করে তুলতে চেয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর মা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন জমিদারি শাসনের বাইরে মানবিক দিক ও দেশপ্রেম বিষয়ে।
ফলে, তাঁর মধ্যে মানুষকে জানার আগ্রহ উত্তরকালের সাহিত্য রচনায় সহায়ক হয়েছে। লাভপুরের নিম্নবর্গের এসব মানুষের প্রতি তারাশঙ্করের দৃষ্টি ছিল প্রচণ্ড স্নেহশীল। আদিবাসীদের তিনি দেখেছেন জীবনসংগ্রামী মানুষ হিসেবে। আর এ-সব কারণেই নিম্নবর্গের মানুষের জীবনাচার ও তাদের সংস্কৃতি আত্মস্থ করা তারাশঙ্করের পক্ষে সহজতর হয়েছিল। তারাশঙ্কর জন্যসুত্রে ক্ষুদ্র জমিদারির উত্তরাধিকার লাভ করেছিলেন।
জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্যও তাকে অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। উত্তরকালে সমকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক স্রোতোধারার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্তি নিম্নবর্গীয় মানুষের আরও নিকটবর্তী হতে সহায়তা করেছে। তারাশঙ্করের হরিজন সেবা, দ্রুত চিকিৎসা- সহায়তা দান, অগ্নি-নির্বাপণ বাহিনীর তত্ত্বাবধান, জনগণের কাতারে নেমে আসার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল।

উত্তরকালে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে তিনি যখন মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তাল দলীয় রাজনীতির জগতে প্রবেশ করেন তখনও জীবনদৃষ্টির কারণেই অন্ত ্যজ শ্রেণীর মানুষকে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করে তাদের বঞ্চনার ইতিবৃত্ত ও মুক্তির সম্ভাবনা বিষয়ে তিনি ভেবেছেন। এরই উজ্জ্বল সাক্ষ্য তাঁর প্রথম উপন্যাস চৈতালী ঘূর্ণি। এতে উচ্ছ্বলিত কৃষকের শ্রমজীবীতে পরিণত হওয়ার কাহিনী তিনি সৃজন করেছিলেন।
১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শ্রীনিকেতনে পল্লীকর্মী সম্মেলনে তারাশঙ্কর উপস্থিত হয়েছিলেন পল্লীসমাজের সেবাব্রতী হিসেবে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন। “গ্রামকে গড়ে তোল। নইলে ভারতবর্ষ বাঁচবে না’। 1 রবীন্দ্রাথ ঠাকুরের এই পল্লীগঠনমূলক কাজের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে তারাশঙ্কর সচেতনভাবে আরো নিবিড়ভাবে অসংখ্য আদিবাসী মানুষের সান্নিধ্যে আসেন। তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সখ্যের সম্পর্ক।
ওই পল্লীসম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ কথায় কথায় তারাশঙ্করকে প্রশ্ন করেছিলেন— তুমি দেখেছ অনেক, এত দেখলে কি করে?” তারাশঙ্কর জবাবে বলেছিলেন, সমাজ সেবকের কাজ করেছি, বিষয়কর্ম দেখাশোনা করেছি।’ কবি বলেছিলেন, ‘সেটা সত্য হয়েছে তোমার। তোমার মত গাঁয়ের মানুষের কথা আগে আমি পড়িনি’। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পিমানস সংগঠনে আদিবাসী জনতার যে নিবিড় সংস্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে রবীন্দ্রনাথের উপর্যুক্ত মূল্যায়নেই তার যথার্থ স্বীকৃতি মেলে।
প্রান্তিক মানুষের প্রতি অকপট মমতা, কৌতূহল আর অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে তিনি তাঁর শিল্পবীক্ষণকে সমন্বিত করেছিলেন। তাই সাহিত্য সৃজনকালে এসব ব্রাত্যজনের জীবন-কথার শিল্পরূপায়ণে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে স্বচ্ছন্দ ও সফল হয়েছেন।
আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কিত। পরাধীন এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে সকল প্রকার পরিবর্তন এসছে এই ত্রিধারার আন্তঃসম্পর্কের সূত্র ধরেই। বীরভূম ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের জীবনধারার পরিবর্তনও বিচ্ছিন্ন কোনো উৎস থেকে উদ্ভূত হয়নি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে পৃথিবী ব্যাপী পরিবর্তনের সূত্র ধরে শুরু হয় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর প্রকৃত ভাঙা গড়া। যুদ্ধের ভয়াবহতা ও যুদ্ধসৃষ্ট নৈতিক অবক্ষয়ে বিপর্যস্ত হতে থাকে মানবীয় মূল্যবোধ। যুদ্ধকালীন অস্থিরতায় ভেঙে পড়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন। এই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমগ্র বিশ্বে। ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষকেও যুদ্ধের ফল ভোগ করতে হয় অনিবার্যভাবে।
জাতীয় জীবনের সর্বস্তরের সংকটের এ ঘনীভবন আদিবাসী জীবনকেও বিপুলভাবে স্পর্শ করে। বিশেষ অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও সামাজিক ব্যবস্থার যত স্বকীয় বৈশিষ্ট্যই থাক না কেন সাধারণভাবে তা জাতীয় এবং বিশ্বজনীন জীবনধারার সঙ্গেও একান্তভাবে সম্পর্কিত। তবু, ১৯১৪-১৮ সালের প্রথম মহাযুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিবর্তেনের পরও ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠী অদম্য প্রাণশক্তি ও সংকোচনশীল কৌমজীবন কাঠামোর মধ্যে কোনো রকমে টিকে ছিল। কিন্তু ১৯৩৯-৪৩ সালের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহতার হাত থেকে তারা রেহাই পায়নি।
যুদ্ধের প্রয়োজনে উজাড় হয়েছে অরণ্য, নদী ভরাট করে তৈরি হয়েছে সেতু, নির্মিত হয়েছে অসংখ্য রাস্তাঘাট যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মনুষ্যসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের কারণে সমগ্র বাংলা দেশ সহ আদিবাসী সমাজে ১৯৪৩ ভয়াবহরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সমগ্র ভারতবর্ষে ক্রমবিস্তৃত এই দুর্ভিক্ষে অকালে মৃত্যু হয় লক্ষ লক্ষ অনাহারী মানুষের। যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের এই ভয়াবহ পরিণতির হাত থেকে মুক্তি পায়নি বাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এ-সময় থেকেই তারা নিজস্ব সংস্কৃতি, পেশা ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে উলিত জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
তারাশঙ্করের জীবনকালের দুই-তৃতীয়াংশ সময়ই ব্রিটিশ কলোনিশাসিত গ্রামীণ সমাজ ছিল সামন্তবাদী সমাজকাঠামোর অন্তর্গত। ওই সমাজ ব্যবস্থার সামাজিক, আর্থনীতিক, রাজিৈতক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পুরোটাই সামন্ত শ্রেণী তথা মহাজন-জমিদারদের করায়ত্ত ছিল। ওই কালের সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়নে প্রজা ও খাতকরূপী আদিবাসী মানুষের জীবন ছিল সর্বাধিক দুর্বিসহ।
পশ্চাৎপদতা, অনগ্রসরতা, পরিবর্তনবিমুখতা, কুসংস্কারচ্ছন্নতা, অভাব-অনটন, দারিদ্র্য-ব্যাধি এবং নানপ্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় আদিবাসী সমাজের ও জীবনের সীমাহীন দুর্গতির প্রধান কারণ। ঔপনিবেশিক শাসনামলে আদিবাসী সমাজ শোষিত হয়েছে নানা দিক থেকে। দেশীয় মহাজন, জমিদার এবং ঔপনিবেশিক শাসক সবাই তাদের প্রতি ছিল নির্মম। উচ্চশ্রেণী-নিয়ন্ত্রিত বর্ণাশ্রম প্রথার পীড়ন, নারীর মর্যাদাহীনতা ও লাঞ্ছনা এইসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনধারাকে রাহুর মতো গ্রাস করেছিল।
সমস্ত উনিশ শতকে রাঢ়বঙ্গের সমাজ জীবনে উঠতি বণিকগোষ্ঠী দ্রুত প্রতিপত্তি অর্জন করে। এরই অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় বনেদি সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে নব্য পুঁজিবাদের সংঘাত দেখা দেয়। এই সংঘর্ষে নতুন পুঁজিবাদী শক্তিরই নিয়মমাফিক বিজয় ঘটে। এর ফলে আদিবাসী প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত পরিবর্তন আসন্ন হয়ে ওঠে।

সনাতন মূল্যবোধের সঙ্গে নবীন জীবনবোধের সংঘাত এ কালের এক জীবনয় প্রসঙ্গ। পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক হলেও পুরোনো সামস্তসমাজের বিধিবিধান ও অনুশাসন রাতারাতি উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল স্বল্প। তারাশঙ্করের গল্পে উপন্যাসে এই জরাজীর্ণ ঘুণেধরা সামন্ততন্ত্র-বেষ্টিত পরিবর্তন-উন্মুখ গ্রামীণ সমাজের ভাঙনের ছবি প্রাধান্য পেয়েছে।
তারাশঙ্কর তৎকালীন এই পরিবর্তনকে দেখেছেন স্বোপার্জিত সমাজদৃষ্টি ও কংগ্রেসী রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে। শ্রেণী-সংগ্রামের মার্কসীয় তত্ত্বে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তারাশঙ্কর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের অসহযোগ আন্দোলনের কাল থেকেই মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা ও আদর্শে আকৃষ্ট হন। রাজনীতিক চিন্তা ও মতাদর্শে তিনি পূর্বাপর গান্ধীকেই অনুসরণ করেছেন।
গান্ধীজীর অহিংস মতবাদ তারাশঙ্করের মনে গভীর রেখাপাত করে। সমাজের পরিবর্তনশীলতার স্বোপার্জিত সমাজদৃষ্টি এবং গান্ধীজীর অহিংস মতবাদ ও ভারতত্ত্ব সমন্বিত হয়েই সংগঠিত হয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তারাশঙ্করের দৃষ্টিকোণ। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই ওই জনগোষ্ঠীর কৌমজীবনের শিল্পরূপায়ণে প্রয়োগ করেছেন তারাশঙ্কর।
দুই
উনিশ শতকে সামন্ত জমিদারগণ মূলত তৎকালীন ব্রিটিশ রাজশক্তির সম্পূরক শক্তিরূপে কাজ করেছে। ব্রিটিশ শাসন ও শোষণ পাকাপোক্ত করাই ছিল জমিদারদের প্রধান কাজ। ফলে জাতীয় জীবনে শোষক ও শোষিত এই দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যায় এবং দ্বন্দ্বময় অবস্থান গ্রহণ করে। এই সপ্রাণ দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত হয় নবগঠিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ও সংগ্রাম।
রাজনৈতিক জ্ঞান বর্জিত সাধারণ আরণ্যক ও কৌমসমাজ বন্দি মানুষের দ্বারা পরিকল্পনাহীনভাবে সংগঠিত সাঁওতাল বিদ্রোহ ও নীল বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় পরাধীন দেশের জন্য জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখা দেয়। নীল বিদ্রোহের সমসময়ে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহও ভারতীয় জাতীয়তার চেতনাকে পরিপুষ্ট করে তোলে।
তারাশঙ্কর অঞ্চলভিত্তিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো সংগ্রামকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় তেমন উৎসাহ দেখাননি। তিনি সমাজ-রাজনীতির ওই ইতিহাস অধ্যয়ন করেছেন, বেদনাহত হৃদয়ে সনাতন গ্রামীণ ও কৌমসংস্কৃতির জন্য হাহাকার তুলেছেন। এই বোধটিই তাঁর নানা উপন্যাসে শিল্পিত হয়েছে।
“ওই দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই সাঁওতাল বিদ্রোহকে আদিম নৃ- গোষ্ঠীর জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামরূপে না দেখে অধিকার সচেতন নির্যাতিত মানুষের অন্যায় অবসানের আন্দোলন হিসেবে দেখেছেন তারাশঙ্কর । ফলত, ভারতে ইন্দিরাশাসিত কংগ্রেসী রাজনীতির সংহত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চতম আইন পরিষদ রাজ্যসভার সদস্য তারাশঙ্করের পক্ষে ১৯৬৬ সনে অরণ্য- বহ্নির শিল্পরূপায়ণে আদিবাসীর মুক্তিসংগ্রামের ভবিষ্যৎ-সঞ্চারী আবেদন সৃজন করা সম্ভব ছিল না। যদি তিনি তা করতেন তা হলে তা অখণ্ড ভারতচেতনার বিপক্ষে যেত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সপ্ত- ভগিনীতুল্য’ রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকেই তা মদদ যোগাত।” তাঁর এই কংগ্রেসীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই অরণ্য-বহ্নি জাতীয় গণসংগ্রামের সম্ভাবনাদীপ্ত শিল্প অভিব্যক্তি না হয়ে ঐতিহাসিক রোমান্সে পর্যবসিত হয়েছে।”
তারাশঙ্কর তাঁর স্মৃতিকথায় বীরভূমের সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করেছেন। কালিন্দী (১৯৪০) উপন্যাসেও সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা স্মৃতিচারণসূত্রে বিধৃত; অরণ্য-বহ্নি উপন্যাসেরও মূল কাহিনীবৃত্তের অন্তর্ভুক্ত। তারাশঙ্কর স্বীকার করেছেন যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে অরণ্য-বহ্নিতে আদিবাসী রাজনীতি ও তাদের সংগ্রাম দলের কাছে এবং নিজের কাছেও যথাযথ মূল্য পায়নি।
ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অখণ্ড ভারত-চেতনার কারণেই সাঁওতালদের স্বতন্ত্র স্বভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সাদর সম্ভাষণে মূল্যায়ন করা তারাশঙ্করের পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও শিল্পী হিসেবে আদিবাসীদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সহানুভূতিশীল। কিন্তু ভারত-চেতনার ধারক হিসেবে আদিবাসীদের স্বাধীনতা আন্দোলন তাঁর কাছে কেবলই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন।”
রচিত প্রধান উপন্যাসগুলিতে সমাজগতির ধারাকে অনুসরণ করতে গিয়ে তারাশঙ্কর রাঢ় বঙ্গের আদিবাসীসহ সমগ্র পল্লীর জীবনধারা অন্বেষণ করেছেন। বাংলার ভূমি- ব্যবস্থার ক্রম-পরিবর্তন এবং কৃষি ও শিল্পের দ্বন্দ্বময় সম্পর্ক কীভাবে আদিবাসীসহ সমগ্র গ্রামজীবনকে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল, তার স্বরূপ সন্ধানের পরিচয় রয়েছে তারাশঙ্করের লেখায়।
তারাশঙ্কর সমাজের সঙ্গে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর নানাবিধ সম্পর্কের বিশ্লেষণ, সমাজের শাসন-শোষণ ও সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন। আদিবাসী সমাজের অর্থনীতি, সমাজ-ব্যবস্থা, নৈতিক চেতনা, ধর্মবোধ, উৎসব-অনুষ্ঠান-পার্বণ এবং ওই সমাজের মানুষের গোষ্ঠীগত জীবনের বাস্তব ও বাস্তবতার ছবি অঙ্কনে তিনি সফল হয়েছেন। তাঁর উপন্যাসে কৌম জনগোষ্ঠীর মানুষের ক্ষুদ্রতা, হীনতা, দুর্বার জৈববৃত্তি, দুঃখ, যন্ত্রণা, দারিদ্র্য, হতাশা, অস্তিত্ব সংকটসহ নানা বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে প্রবল সংঘাত এবং তার মধ্য দিয়েই তাদের মনুষ্যত্বের অমলিন মহিমার প্রকাশ ঘটেছে।

তারাশঙ্কর ওইসব জীবনসংরাগ ও তার মহিমাকে মহৎ শিল্পীর সহানুভূতি দিয়েই অঙ্কন করেছেন। অধিকন্তু সমকাল-সচেতন তারাশঙ্কর আবার স্বনিরূপিত ইতিহাস চেতনারও ধারক। সামাজিক নানা পট পরিবর্তন এবং সমস্যাগুলো সম্পর্কেও যথাযথ মাত্রায় সচেতন ছিলেন তিনি। সামন্ততন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু রূপ, নতুন যন্ত্রনির্ভর শিল্পসভ্যতার বিকাশ, কৃষিজীবনের সঙ্গে তার সংঘর্ষের ঐতিহাসিক পটভূমির সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন রাজনীতিক ও আর্থনীতিক চিন্তাধারার বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতটিকেও।
‘আর্থনীতিক দুর্দশায় অনন্যোপায় কৃষকের শ্রমজীবী হওয়ার অসহায়ত্ব’ বর্ণনাই হোক, কিংবা আদর্শদীপ্ত অহিংস জাতীয়তাবাদের প্রকাশেই হোক – তাঁর জীবনাগ্রহ ছিল প্রবল।
তিন
আদিবাসী প্রধান রাঢ় অঞ্চলের গভীরে যে আদিম কৌম সংস্কৃতির উপাদান রয়েছে, তাকে তারাশঙ্কর যত্ন সহকারে তাঁর রচনায় উপস্থাপন করেছেন। আবার হিন্দুর ধর্ম-সংস্কৃতির সঙ্গে কৌম জনগোষ্ঠীর ধর্ম- সংস্কৃতির যে মিশ্রণ ঘটেছে তার অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। রাঢ়ের কৃষিকাজে আদিবাসী সাঁওতালদের কর্মদক্ষতা এবং তাদের শ্রমনিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অন্যান্য আদিবাসীদের পিছিয়ে পড়া ও অলস গতিহীনতা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তারাশঙ্করের।
অনার্য সম্প্রদায়ের উপযুক্ত জীবিকার অভাবে নিরুপায় হয়ে সামাজিক অপরাধের পথে পা বাড়ানোর প্রবণতাকেও তিনি নিরীক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছেন গভীর সহৃদয়তায়। পৃথিবী পরিব্যাপ্ত মহাযুদ্ধ এই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য যে বিশেষভাবে দায়ী, তারাশঙ্কর নিজের রচনায় তা বিশেষভাবে দেখাতে চেয়েছেন। যুদ্ধের প্রভাবে আর্থনীতিক পরিবর্তনের কারণে জীবনমান পাল্টে গেছে তাদের। বাধ্য হয়ে কৃষিজীবী আদিবাসীরা শিল্পকারখানায় শ্রমদাসে পরিণত হয়েছে।
তবে, সামন্ততন্ত্রের অবসানের পথ ধরে পুঁজিবাদের অভ্যুদয়ের ফলে তারাশঙ্করের জীবনজিজ্ঞাসায় পরিবর্তন আসলেও ওই ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের প্রতি অচ্ছেদ্য আত্মীয়তার সম্পর্ককে তিনি আমৃত্যু অস্বীকার করতে পারেননি। বিগত সমাজ, বিগত জীবনের জন্য তারাশঙ্করের সকরুণ মমত্ববোধ তাঁর রচনাবলিতে ব্যাপৃত। তিনি নিজে ছিলেন ক্ষয়িষ্ণু সামস্ত রক্তের উত্তরাধিকারী। ফলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারার বিপর্যয়ে তাঁর বেদনা স্বতঃস্ফূর্ত। নতুন কালকে গ্রহণ করেও পুরোনো কালের জন্য মর্মগত সহানুভূতি তারাশঙ্করের সাহিত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
প্রত্যেক জাতি বা সমাজের একটা প্রাণশক্তি থাকে। এর মধ্য দিয়েই সে প্রাণরস আহরণ করে। প্রত্যেক নৃ-গোষ্ঠীই মহামারী, দুর্ভিক্ষ, দুর্বিপাক, অভাব-অনটন, প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে যুগান্তব্যাপী টিকে থাকার চেষ্টা করে । বীরভূম ও তৎসংলগ্ন বিভিন্ন আদিবাসী অন্ত্যজ সমাজও একইভাবে অস্তিত্ব রক্ষা করেছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি তথা সংস্কার, কুসংস্কার ও লৌকিক বিশ্বাসের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ ক’রে।
তারাশঙ্কর আদিবাসীদের সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ দ্রষ্টা। সংস্কৃতিই যে কোনো জাতির প্রাণশক্তি, সে কথাই তারাশঙ্কর বিভিন্ন কৌন সংস্কৃতির সাহিত্যিক রূপায়ণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
কাহার সম্প্রদায় চন্দ্রবোড়া সাপের শিস দেওয়াটাকে তাদের কর্তাবাবা কালারুদ্রর রুষ্ট হয়ে কোপাই-এর কুল ছেড়ে যাওয়ার অশনি সংকেত রূপে কল্পনা করেছে। কালারুদ্র কেন্দ্রিক এই লৌকিক বিশ্বাসই হয়ে উঠেছে এক কৌম জীবনকাঠামোর মুখ্য অবলম্বন। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা (১৯৪৬-৪৭ ) জুড়ে আদিবাসী কাহার জনগোষ্ঠীর নানা উপকথা ছড়িয়ে আছে।
লৌকিক বিশ্বাস, কুসংস্কার, পালা-পার্বণ ও উৎসব- অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয় কাহারদের জীবন প্রবাহ। রাঢ় বাংলার আদিবাসী সংস্কৃতির প্রায় পুরোটাই লৌকিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাদের সামাজিক আর্থনীতিক জীবনকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে ধর্মীয় বিশ্বাস আর বিভিন্ন কুসংস্কার। কৃষি-নির্ভর আদিবাসী সমাজের গৃহস্থালি কাজ-কর্মের মধ্যেও এসব লোকবিশ্বাসের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও রয়েছে নানা বিচিত্র পেশার মানুষ। এদরে কেউ কেউ সাপখেলা দেখায়, কেউ পাল্কী বহন করে, কেউ বাদর নাচায়, যাদু দেখায় ও গান গায়। কারো রয়েছে স্থায়ী ঘর, আবার কেউ যাযাবর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। কাহার আর সাঁওতালদের মূল পেশা কৃষিকর্ম। কাহাররা কৃষির পাশাপাশি পাল্কীও বহন করে, কিন্তু সাঁওতালরা মূলত কৃষি শ্রমিক।

আদিবাসীদের ঘর-দোর কাঁচা, খড় বা পাতায় ছাওয়া। আর বেদে সম্প্রদাযের বেশিরভাগেরই বসবাস নৌকায় । এরা মূলত যাযাবরস্বভাবী আদিবাসীদের জীবনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নাচ-গান-পানাহারের ভূমিকা। তাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ধরনের পূজা-পার্বণ ও অনুষ্ঠান। এদের প্রায় সবই ভয় আর লৌকিক বিশ্বাস উদ্ভূত। বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পূজা অনুষ্ঠান পালন করে তারা। তাদের আর্থনীতিক জীবন যতই বিপর্যন্ত হোক না কেন এ সকল কৌম জীবনাচরণের আয়োজন বরাবরই ব্যাপক।
এ-সব বিষয় আকৃষ্ট করেছিল তারাশঙ্করকে। আর এ-জন্যই তিনি আদিবাসীদের জীবন, ধর্ম, দেবতা, ভাষা, বিশ্বাস, পেশা এবং ভূত- দৈত্য-দেও-দানব পরিবেষ্টিত জীবনরূপকে নিপুণতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন তাঁর সাহিত্যে।
তারাশঙ্কর আদিবাসীদের মধ্যে বেদে সম্প্রদায়ের জীবনাচার ও তাদের সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন। তাই বেদেদের লৌকিক জীবনের নানা কথা, উপকথা, ইতিকথা, বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কারের কাহিনী নিয়ে রচনা করেছেন বিশিষ্ট কয়েকটি গল্প ও উপন্যাস।” রাঢ় অঞ্চল সর্পসংকুল ছিল বলে বেদেদের আনাগোনা এখানে অধিক। বেদে জীবনের খুঁটিনাটি তারাশঙ্কর শৈশবকাল থেকেই জানার চেষ্টা করেছেন। সে সুযোগও তাঁর ছিল।
তারাশঙ্করের শৈশব কালে তাঁর গ্রামে নানা জাতের বেদেরা আসত। এদর কেউ কেউ সাপ ধরত, খেলা দেখাত, ভিক্ষা করত, নাচ-গান করত। এদের কারো কারো সঙ্গে তারাশঙ্করের সখ্যও ছিল পরবর্তীকালে তাদেরই কয়েকজন তাঁর রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে।” তাদের জীবনের আশ্চর্য সব সংস্কার-কুসংস্কার সুনিপুণ দক্ষতায় প্রাণবন্ত রূপ লাভ করেছে তাঁর গল্প উপন্যাসে।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আদিবাসী মানুষের লৌকিক বিশ্বাস আর সংস্কার-কুসংস্কারভিত্তিক জীবনকে শৈল্পিক মহিমা দান করেছেন তাঁর কথাসাহিত্যে। তিনি লোকায়ত জীবনের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী মানুষের জীবন সংগ্রামের কাহিনীকেই রূপদান করেছেন। আদিবাসীদের সঙ্গে মিশে তাদের ভাষা, জীবনাচার, সুখ- দুঃখ, ভয়-বিশ্বাস, দৈবকল্পনা, পেশা, আর্থনীতিক অবস্থা, সামাজিক প্রথা ও বিধি নিষেধকে তিনি শিল্পরূপ দিয়েছেন।