আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ সমাজে নারী। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

সমাজে নারী
জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তথাপি নারীকে পুরুষের চেয়ে নিম্নস্তরের প্রাণিরূপে গণ্য করা হয়। নারীর নিজের মধ্যেই নিজের আশ্রয়। মানিকের প্রায় সকল উপন্যাসেই এর পরিচয় পাওয়া যায়
“জননী’ উপন্যাসের গঠন একেবারে নাটকীয়তাযুক্ত। কোন অসাধারণের চমক, বিপুল আত্মত্যাগ, গভীর দেশপ্রেম, জেলের বর্ণনা, দ্বন্ধ-জটিল প্রেমের টানাপোড়েন বা আয়োজন করেন নি। শ্যামার মনের জগতেই এ কাহিনীর পরিধি। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে সে পরিধির রঙ, সীমা আয়তন বদলেছে। তবু শ্যামার অস্তিত্ব শ্যামার মধ্যেই। কলকাতার শহরতলী থেকে বনগাঁ আবার শহরতলী, নিজের বাড়ি বিক্রির পর সেই বাড়িরই ভাড়াটে বাসিন্দা এতগুলি অবস্থান্তর অবশ্যই শ্যামার মনে আলোছায়া ফেলেছে। [… …] নিজের ক্ষমতা ও বিফলতার যেন আশ্রয় মেলে। ৩৭
সংসারে অপকর্মের শেষ নেই। রাখাল হঠাৎ কেন দ্বিতীয় বিয়ে করলো শ্যামার তা মাথায় আসে না। জননী শ্যামা আহত- বিষণ্ন হয়ে জননী মন্দার দুর্ভাগ্যের কথা ভাবে। সে রাখালের অপকর্মের একটা কারণ খুঁজে পেতে চায়। সে চিন্তা করে মন্দা তো দেখতেও কুশ্রী নয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো কুশ্রী হলেও স্বামী আরেকটা বিয়ে কেন করবে? সমাজের এই অসঙ্গতিতে প্রশ্ন তুলেছেন সরোজ দত্ত:
“কুরূপা বলেই স্ত্রীর অমর্যাদা ঘটিয়ে পুরুষের পুনর্বিবাহের স্বেচ্ছাচার শ্যামা মেনে নেয় কেন? কেন মর্যাদাহীনতার মুল্যেও নারীকে ধরে রাখতে হবে তার পুরুষ তথা স্বামী নামক অবলম্বনটিকে? একি কোনো বিভ্রম?”
লেখক দেখিয়েছেন, সমাজ নারীর মানসিক দিককেই পঙ্গু করে রেখেছে। অতঃপর তার আরেকটি ভাবনার উদয় হয়- মন্দা ছেলেদের নিয়ে মেতে থাকে, রাখালের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে তাই হয়তো তার স্ত্রীর দরকার হয়েছে। এ কথা ভেবে শ্যামার দেহ অবশ হয়ে আসে।
শীতলকে সে কোনোভাবে বঞ্চিত করবে না মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। পরদিন সকালে সে শীতলের ঘুম থেকে ওঠার নির্ধারিত সময়ের আগেই ডেকে গালাগালি শোনে। তারপর আবার সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে স্বামী যতটুকু চায় শুধু তাই দিতে হবে, অতিরিক্ত করলে তার বিরক্তের উদ্রেক হবে। স্বামীর যে কোনো আচরণে নারী সংশয়গ্রস্ত।

‘শহরতলী’ উপন্যাসে আশ্রমের কদমতলা থেকে মহেশ চৌধুরি যখন সদানন্দের দর্শন লাভ না করেই স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে চায়, তখন তার স্ত্রী যেতে চায় না। কারণ সে তার স্বামীকে চেনে, এতো কারে পর অভীষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছে বাড়ি ফিরে গেলে হয়তো তাদের সংসারও ভেঙে যেতে পারে। মহেশ চৌধুরি যখন বলে সে নিজে গেলেও বিস্তৃতির মা বসে থাকবে নাকি? তখন বিভূতির মা তা-ও স্বীকার করে
“এখন গেলেই চিরকাল তুমি আমায় দুষবে, বলবে আমার জন্য তুমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছিলে।” (তখ, পৃ. ৩০৭ )
নারীর এই অসহায়ত্বের শেষ নেই। প্রতিটি মুহূর্তে সে অসহায়। শীতলের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী শ্যামা। বিয়েতে শ্যামার পছন্দ-অপছন্দের কোনো মূল্য ছিল না, তাই তাকে বাধ্য হয়ে মদ্যপ, বদমেজাজি এবং দোজবরের সঙ্গে বিবাহে সম্মত হতে হয়।
সংসারের নানা বিপর্যয় শীতলের সৃষ্টি কিন্তু অসহায় শ্যামাকে তার ভার বহন করে চলতে হয় আমৃত্যু। বকুলের বেলায়ও একই পরিস্থিতি বিরাজমান। শঙ্করের প্রতি তার আকর্ষণ থাকলেও শ্রেণিবৈষম্য এবং পারিবারিক-সামাজিক নিষ্ঠুরতায় শঙ্করেরর সঙ্গে তার বিয়ে হয় না। বিয়ে হয় মোহিনীর সঙ্গে।
মোহিনী যদিও স্ত্রীকে ভালোবাসে, কিন্তু তার বাড়ির লোক বকুলকে সুখে রাখে না। এতে বকুলের কিছু করার নেই। স্বামী এবং সংসারকে আঁকড়ে তাকে বেঁচে থাকতে হয়। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ তার সামনে নেই। মন্দার স্বামী রাখাল দ্বিতীয় বিয়ে করলে সংসার আঁকড়ে থাকা ছাড়া তারও কোনো পথ নেই। আবার সুপ্রভার অবস্থাও একই রকম। সে রাখালের স্ত্রী, কিন্তু সংসারের কর্ত্রী হতে পারে না।
‘জীবনের জটিলতায় নগেনের আচরণে প্রমীলা অসহায়, সে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। পরিস্থিতির কারণে তারও আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হয়। উপার্জন করে স্বাধীন পথে চলা নিম্নমধ্যবিত্তের কালচারে নেই। শাস্ত্রা নিজের ইচ্ছেয় চলতে শুরু করায় জীবন দিতে হলো।
‘শহরতলী’ ২য় খণ্ডে যশোদার বাড়িতে দুপুরের আড্ডায় আসা মধ্যবিত্ত নারীরা সকলেই পুরুষ প্রতিনিধিদের আচরণের কাছে অসহায়। যশোদাও যে অসহায় নয় তা নয়। সে স্বামী- পুত্রহীন, একমাত্র ভাইও তাকে ফেলে চলে গেছে। শ্রমিকরা তাকে ত্যাগ করেছে। সত্যপ্রিয়র রোষে সে একা একটি নারী, তাকে এ ব্যাপারে কেউ সাহায্য করে নি।
মেয়েরা মূলত ঘরের কাজ করে। দুপুরে খাওয়ার পর থেকে বিকেলটা তাদের অলস সময়। গ্রাম এবং শহরতলীর মেয়েরা এ সময় অনেকেই একে অন্যের বাড়ি গিয়ে সুখ-দুঃখের গল্প করে। ‘জননী’তে আমরা দেখি শীতল জেলে গেলে শ্যামা দুপুরের পর বিষ্ণুপ্রিয়ার বাড়ি যায়, যদিও বাড়ির ঝি তাকে ওপরে উঠতে নিষেধ করে।

এ উপন্যাসে আরো আছে নকুল বাবুর বাড়িতে শ্যামার বেড়াতে যাওয়ার কথা। ‘জীবনের জটিলতায়’ প্রমীলার কাছে শান্তা আসে গল্প করতে। ‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে মেয়েদের এই দুপুরের আড্ডার কালচারের বড় অবয়ব চোখে পরে। যশোদার বাড়ি থেকে শ্রমিকরা বিদায় নিয়েছে, বাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসে অজিত আর সুব্রতা-দম্পতি। সুব্রতা খুব মিশুক, সে অল্প ক’দিনেই পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলে
“কয়েক মাসের মধ্যে দেখা গেল যশোদার বাড়িতে দুপুরবেলা রীতিমতো মেয়েদের বৈঠক বসিতে আরম্ভ করিয়াছে।” ( তখ, পৃ. ২৩৫)
এই বৈঠকে উকিল, ডাক্তার, মাস্টার, প্রফেসর, কেরানি, জীবনবীমার এজেন্ট প্রভৃতি বহু ভদ্রলোকের বাড়ির মেয়ে-বউ আসতে শুরু করে। সকলের বাড়ি খুব কাছেও নয়। বড়ো রাস্তার ধারের কাছ থেকে পর্যন্ত আসে। দুপুরবেলা যশোদার বাড়ি হাসি-গল্প-গান-বাজনায় মুখর হয়ে ওঠে। তাস খেলা এবং কেরাম বোর্ড খেলাও চলে সমানে। যেন মেয়েদের ছোটখাটো ক্লাব । তারা নানা বয়সীরা শ্রেণি অনুযায়ী আলাদা বসতে শুরু করল। যে ভদ্রলোকদের যশোদা কটাক্ষ করে তাদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে তার নতুন অনুভূতি সৃষ্টি হয়:
“হঠাৎ সে যেন আহত মনের ক্ষতে মিষ্টি মলমের মৃদু একটা স্বাদ অনুভব করিতে লাগিল।” ( ৩, পৃ.-২৩৭)
ভদ্রবাড়ির এই নারীদের শ্যাওলা ধরা জীবন একে অন্যের সঙ্গে এরা ভাগ করে নেয়। যশোদা বুঝতে পারে মানুষে মানুষে সুখ-শোকের প্রকাশভঙ্গি একই। চাঁদ মারা যাওয়ার পর যশোদা যেভাবে কেঁদেছিল, নগেন ডাক্তারের ফর্সা মোটা বউ অতসী তার ছেলে মারা গেলে সেইভাবেই কেঁদেছে। আড্ডায় একজনের সঙ্গে অন্যজনের ঈর্ষা-দ্বেষ কিংবা প্রতিযোগিতাও দেখা যায় । অতসীর বড় ছেলে রমেন ডাক্তারি পড়ে। তাই নিয়ে তার গর্বের সীমা নেই। স্বামী-সন্তানের গর্বে সে সকলের দিকে চেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসে।- এ নিয়ে আবার সুকুমার উকিলের বউ টিপ্পনী কাটে
“পশার তো ভারী, সারাদিন হা করে বসে থাকে রুগির জন্য।” ( তখ, পৃ. ২৩৮ )
বনলতা প্রফেসর সুনীল সেনের স্ত্রী অনুরূপার সঙ্গে কথা বলে না। অনুরূপার মেয়ে অলকা সুন্দর গান গায়, বনলতা তাকে প্যানপ্যানানি বলে। বনলতার মেয়ে খুকুও গান গায়। দুজনের মা তাদের মেয়েদের নিয়ে গর্ব করে। একে অন্যকে সহ্য করতে পারে না। যশোদা এ দুজনের মিল করিয়ে দেয়।
তারপর অলকা আর খুকুকে নিয়ে যশোদা তার বাড়িতে একটা গানের স্কুলের মতো করে। বেতন দিতে হবে না, পাড়ার মেয়েরা দুপুরবেলা গান শিখবে। তিন মাসের মধ্যে যশোদার বাড়িটি সংগীত বিদ্যালয় হয়ে ওঠে। বাড়ির সামনে কাঠের ফলকে নাম লিখে টানিয়ে দেওয়া হয়।
‘অহিংসা’ উপন্যাসেও নারীদের দুপুরে আড্ডা দেওয়ার প্রবণতার উল্লেখ আছে। মাধবীর বিয়ের পর সে দুপুরবেলাটা বিভূতির সঙ্গে কাটানোর পরিবর্তে শশধরের বউয়ের সঙ্গে কাটায় । ‘নাগপাশ’ উপন্যাসেও মেয়েদের এই দুপুরের আড্ডার উল্লেখ আছে। দিনের এই সময়টির জন্য যেন তারা প্রতীক্ষা করে
“পাড়ার আরও তিন চারটি বয়স্কা কুমারী মেয়েও গিয়ে জোটে যে যতক্ষণের জন্য পারে। তমালের ঘরে বসে তারা গল্প করে, মেয়েলি আড্ডা বসায়।” (৮খ, পৃ. ৪৫৯ )

ঘরের বাইরে মেয়েদের করুণ অবস্থা বিদ্যমান। বাসে বা ট্রামে মেয়েদের পদে পদে অপমানিত হতে হয়। প্রতিটি পুরুষেরই মা বা বোন বা গৃহিণী থাকে, তারপরও নারী দেহের লোলুপতা তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রমীলা আর বিমল ট্রামে করে স্টেশনে যাচ্ছিল।
তখন বিমল লক্ষ করে একটি রোগা, কাঁদো কাঁদো মেয়ের দিকে তাদের অশ্লীল দৃষ্টি। ‘চতুষ্কোণে’ অনেকবার বলা হয়েছে ট্রামে-বাসে হেংলা ছেলেরা মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
সংসারে মেয়েরাই মেয়েদের সঙ্গে শত্রুতা করে। সুব্রতা যশোদাকে বলে “আসলে আমার জাত-ই যত নষ্টের গোড়া।” ( ৩খ, পৃ. ২২৮)
অর্জিত সুব্রতার স্বামী। অজিতের ভাই অন্য মেয়ে ঠিক করেছিল, কিন্তু অঙ্গিতের পছন্দ সুব্রতাকে। তাই সে সুব্রতাকে বিয়ে করলো। সুব্রতাকে দেখে অজিতের বড় ভাই পছন্দ করলেও তার বউদি সুব্রতাকে মেনে নেয় না। কারণ হিসেবে সুব্রতা বলে,
“আমার জায়ের রংটা আমার চেয়ে একটু কম ফরসা কিনা, আর দেখতেও আমার মতো সুন্দর নয় কিনা-তা, তার এখন বয়েস হয়েছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে তিনটি, প্রথম বয়েসে যেমন ছিল এখনও কি তেমনই চেহারা থাকে, রূপ-যৌবন মানুষের দুদিন উবে যায় আমায় দেখেই তাই অপছন্দ হয়ে গেল।” ( ৩খ, পৃ.-২২৮)
মানিক এরূপ ছোট ছোট মন্তব্যের মাধ্যমে সমাজের সর্বজনগ্রাহ্য সত্যে উপনীত হয়েছেন । র্যাফল ফক্স বলেছেন:
“একমাত্র বাস্তব ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়েই সত্যে উপনীত হওয়া যায়। কারণ কোনো বিষয়বস্তুর জন্যে মানুষের যে নিজস্ব প্রগাঢ় অনুন্ধান, তারই প্রকাশ সত্য।
মার্কসের মতে বাস্তবের একটি ঘটনার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সামগ্রিকতা থেকেই সত্যের উদ্ভব। সমাজ জীবন এ রূপ একটি সত্য- মেয়েরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মতো হয়। বকুল শ্বশুরবাড়ি থেকে আসলে তার মধ্যে গৃহিণীপনা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কথাবার্তায়, চালচলনে, আচার-আচরণে সে যেন শ্যামারই নতুন রূপ। তার কথার ধরন, চাল-চলন সব ছাঁচে ঢালা হয়ে এসেছে
“দুটি ছেলেমানুষ ছেলেমেয়ের সহজ বন্ধুত্বে সে আঁশটে গন্ধ পায় এবং বেমালুম তাহা গোপন রাখিয়া ওদের দেখায় হাসিমুখ, নাক সিঁটকায় মার কাছে আর করে ষড়যন্ত্র। শ্বশুরবাড়ির লোকেরা গড়িয়া-পিটিয়া বকুলকে মানুষ করিয়া দিয়াছে সন্দেহ নাই।” ( ১খ, পৃ.-১১০ )
সুব্রতা যখন কথা বলে তখন যশোদা তার মধ্যে অন্য কারো ছায়া দেখে
“কে জানে মা না মাসি না পিসি কে নিজেকে এমনভাবে উজাড় করিয়া মেয়েটির মধ্যে ঢালিয়া দিয়াছে।” ( ৩খ, পৃ.-২২৮)
যশোদা ভদ্রলোকদের ঘরভাড়া দেবে না। সে বাড়িতে ছিল না, এসে দেখে অল্প বয়সী দুটি ছেলেমেয়ে ভেতরের বারান্দায় জলচৌকিতে বসে আছে। ধনঞ্জয় যশোদাকে জানায় এরা ঘর ভাড়া নিতে এসেছে এবং সে বলেছে এখানে ঘর ভাড়া মিলবে না। ছেলেমেয়ে দুটি বলে ওঠে, রাজেন তাদের এনেছে, এখন রাজেন বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে গেছে। এর পর মেয়েটির কথা শুরু হয়।
ছয় মাস আগে তাদের বিয়ে হয়েছে। পাকা গৃহিণীর মতো সে কথা বলে। মুখে যেন খই ফুটছে, হাত নাড়া, ঠোঁট নাড়া, চোখের পলক ফেলা, রাগ দুঃখ ক্ষোভ বিস্ময় কৌতুক ফুটিয়ে তোলা সবই যেন কারো অনুকরণ। মেয়েটির কথা শুনে যশোদা মুগ্ধ হয়।
‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে মেয়েদের সম্পর্কে নানা রকম মন্তব্য আছে। বিভিন্ন মেয়ের বিভিন্ন আচরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা আছে। গিরির বয়স পনের-ষোল বছর, কিন্তু তার দেহ অপরিপুষ্ট। তবু তার মধ্যে নারীত্বের সাধারণ বিবেকবোধ বিদ্যমান। তাই শেমিজ ছাড়া শুধু শাড়ি পরার জন্য সে রাজকুমারের সামনে অস্বস্তিবোধ করে আবার তার বুকে রাজকুমার হাত রাখলে সে রেগে যায়, তার মায়ের কাছে নালিশ জানায়। গিরির মা রাজকুমারকে অপমান করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।
অন্যদিকে মনোরমা তার নিরাবরণ স্তনে রাজকুমারকে স্পর্শ করানোর জন্য প্ররোচিত করে। গিরিদের বাড়ি রাজকুমার যায় বলে সে তাদের সম্পর্কে বলে,
“গেঁয়ো অসভ্য মানুষ ওরা, কুলি-মজুরদের মতো ছোট মন ওদের, সব কথার বিচ্ছিরি দিকটা আগে ওদের মনে আসে। বড়ো হলে ভাই বোন যদি নির্জনে বসে গল্প করে, তাতেও ওরা ভয় পেয়ে যায়।” ( ৪খ, পৃ. ১৮)

রাজকুমারকে মনোরমা সাবধান করে দেয়, ওদের বাড়ি যেতে বারণ করে। সে নিজের দুর সম্পর্কে বোন কালীকে রাকুমারের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে ।
এ উপন্যাসে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মেয়েদের সমাবেশ আছে। সরসী সমিতি গড়তে আর মিটিং করতে ভালোবাসে, ঘরে তার মন বসে না, কিন্তু সে ধীরস্থির, যুক্তিবান, ব্যক্তিত্ববান, রিপি গান গায়, ক্লাবে গিয়ে টেনিস খেলে, মালতী চঞ্চল, কালী ঘরোয়া। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এদের স্বরূপ সম্পর্কে বলেছেন,
রিপি খেয়ালী, অভিমানপ্রবণ, আদুরে মেয়ে, যাহার প্রবল আকাঙ্ক্ষা কোন বাধা-বন্ধ মানে না; মালতী কোমল, ভাবপ্রবণ, আত্মদানোন্মুখ, কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃতি সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ, সরসী-কর্মঠ, ব্যবহারিক জীবনে সহজ-নিপুণ, অবদমিত যৌন বুভুক্ষার মূল্যস্বরূপ স্বচ্ছ ও সুস্থ সহানুভূতি সম্পন্ন।
উপন্যাস শিল্পে সাহিত্যিক মানুষের ভেতর মানুষকে আবিষ্কার করে। মানিক তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে নারীর বিভিন্ন রূপ দেখিয়েছেন। প্রতিটি মানুষকে তার নিজস্ব কর্মে এবং স্থানে স্থাপন করতে হয়, নইলে মানুষের পরিপূর্ণতা আসে না। লেখক নারীর সামাজিক অবস্থা সেরূপেই স্থাপন করেছেন।