মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ এর অন্তর্গত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রেণিসচেতন লেখক। তিনি তাঁর লেখায় প্রথম পর্যায় থেকেই সমাজজীবনের প্রতিটি শ্রেণিকে রূপায়ণ করেছেন:

ফ্রয়েড ও মার্কস তাঁর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে মানুষ ও সমাজের যে-সব বন্ধ প্রকোষ্ঠ খুলে তাঁকে দেখিয়েছিল সে-সবের জটিলতা, গভীরতা ও অন্তলীন রহস্য লৌকিক পৃথিবীর প্রকৃত বুনোট মেলে ধরেছিল তাঁর সামনে।”

‘জননী’ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাহিনী । শ্যামার পরিবারের সঙ্গে উচ্চবিত্ত বিষ্ণুপ্রিয়ার পরিবারেরও কিছুটা ইঙ্গিত আছে। এছাড়া গ্রামের ধনী পরিবার মন্দার সংসারের পরিচয়ও পাওয়া যায়। এই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের শ্রেণিবৈষম্য উঠে এসেছে। মানুষের বোধ, জীবন সংগ্রাম, সাফল্য-ব্যর্থতা, সংস্কারপ্রিয়তা, লোভ-লালসা, হিংসা- বিদ্বেষ, বিনোদন, দৈনন্দিন জীবনযাপন, বিভিন্ন পেশা, বিয়ে, উৎসব ইত্যাদির সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম উপন্যাস ‘জীবনের জটিলতা’। তরুণ-তরুণী নির্ভর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র কর এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। এই পরিবারের ছেলে বিমলের সঙ্গে পরিচয় আছে উচ্চবিত্ত নগেন, শৌখিন সজনি দম্পতি এবং আধুনিক লাবণ্যর। এদের মাধ্যমে উপন্যাসে উচ্চবিত্ত সমাজের হালচাল উঠে এসেছে। আর রয়েছে মধ্যবিত্ত অধর- শান্তা। বিমলের পরিবার, শান্তার পরিবার, সজনির পরিবার, নগেন এবং লাবণ্য মোট পাঁচটি আবহ নিয়ে এ উপন্যাস। এই পাঁচটি পরিবেশের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতার স্বরূপ পাওয়া যায়।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

 

বৃহৎ আকারের উপন্যাস ‘শহরতলী’। এখানে নিম্নবিত্ত কুলিমজুর, নিম্নমধ্যবিত্ত যশোদা, উচ্চমধ্যবিত্ত জ্যোতির্ময় এবং উচ্চবিত্ত সত্যপ্রিয়কে পাওয়া যায়। এ ছাড়া সমাজের সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির উকিল-মোক্তার, ডাক্তার, প্রফেসর ইত্যাদি পরিবারের নারীদেরও আমরা ‘শহরতলী’ দ্বিতীয় খণ্ডে দেখি।

‘অহিংসা’ উপন্যাসে সম্ভ্রান্ত মহেশ চৌধুরিকে পাওয়া যায় এবং সমাজের কামার, কুমার, চাষি সম্প্রদায় আছে। ‘চতুষ্কোণ’ উপন্যাসে রাজকুমার মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। মালতী, সরসী মধ্যবিত্ত শ্রেণিভূক্ত, রিণি উচ্চবিত্ত এবং গিরি ও কালী নিম্নমধ্যবিত্তের প্রতিনিধি ।

নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্তের ব্যবধানটা সব যুগেই স্পষ্ট। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র, কথা, ঘটনা আর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ব্যবধান উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন “তাঁর সমাজবোধের কেন্দ্র, ভিত্তি, মূল শ্রেণীবোধ এবং এই বোধকে তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে শাণিত, প্রখর, তীব্র, তিক্ত করে তুলতে চেয়েছেন।

শ্যামার ছেলে দেখতে বিষ্ণুপ্রিয়া আসলে, শ্যামা মন্দাকে কার্পেটের আসন আনতে বলে। মন্দা উত্তর দেয় আসন তোরঙ্গে তোলা আছে। শ্যামার মন সংকুচিত হয়ে যায়। নিম্নবিত্তের দরিদ্রতা তাকে দংশন করে। সে ভাবে:

“একটা তুচ্ছ কার্পেটের আসন তাও যে তাহারা তোরঙ্গে তুলিয়া রাখে বিষ্ণুপ্রিয়াকে এ কথাটা কি না শোনাইলেই চলিত না।”

তবে এ কথা ঠিক শ্যামার পারিবারিক দৈন্যতা এতোই প্রকট যে, একটি সামান্য আসন তাকে তোরঙ্গে তুলেই রাখতে হয়। এ সকল জিনিস আটপৌরে খরচের হিসাবে রাখলে তার সংসার চলে না। উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ব্যবধানকে একটি লাইনে লেখক সুস্পষ্ট করেছেন :

“যথাসময়ে শঙ্কর চলিয়া গেল সেই শীতল পাহাড়ি দেশে, এখানে বিধানের দেহ গরমে ঘামাচিতে ভরিয়া গেল।” (১৬, পৃ-৭৩)

শঙ্কর ধনী বিষ্ণুপ্রিয়ার ভাগ্নে। সে পরিবারের সকলের সঙ্গে চেঞ্জে যেতে পারে। পক্ষান্তরে, বিধান গরিব শ্যামার ছেলে, তার পিতা জেলে গেছে, অন্ন-বস্ত্রের কোনো সংস্থান নেই, মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে তারা টিকে আছে। এ অবস্থায় বেঁচে থাকাই তাদের জন্য পরম প্রাপ্তি, শীতল পাহাড়ের দেশে যাওয়া দুঃস্বপ্ন মাত্র।

সাজসজ্জাও শ্রেণি অনুযায়ী হয়। শ্যামা বিধানকে স্কুলে যাওয়ার আগে একটু পাউডার লাগিয়ে দিত। তার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ভাবত বড় লোকের ছেলেদের মাঝে গিয়ে বসবে, পাউডার দিতে হবে, কিন্তু বড় লোকের ছেলেরা তাই নিয়ে হাসাহাসি জুড়তো, কারণ এটা তাদের কালচার নয়। বিধান হাসাহাসি দেখে লজ্জা পেয়ে মাকে এসে জানায়, স্কুলে পাউডার দিয়ে গেলে সকলে হাসাহাসি করে। শ্যামা তখন উচ্চবিত্ত শ্রেণির কালচার সম্পর্কে বুঝতে পারে ।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

 

আবার, শ্যামার বাড়িতে ভাড়া এসেছিল কনকলতা। পাঁট-ছয় বছরের একটি সংসার নিয়ে। কনকলতার বয়স কুড়ি-বাইশ, শ্যামাও এই বয়সে প্রথম মা হয়েছিল। কিন্তু শ্যামার না ছিল আহ্লাদ, না নিশ্চিন্ত। কনকের খুকি-খুকি ভাব, প্রেমে ডগমগ, অফুরন্ত প্রাণশক্তি, নিশ্চিন্ত নির্ভরশীল জীবন। শ্যামা চিন্তা করে:

‘বড়লোকের মেয়ে বুঝি এমনি অসার হয়।’ (১খ, পৃ. ৮০)

‘জীবনের জটিলতায় উচ্চবিত্ত নগেন নিম্নমধ্যবিত্ত প্রমীলার কাছে অনেক উদারতা আশা করে। কিন্তু প্রমীলার মানস গঠন সেরূপ নয়। সংকীর্ণতায় তার জীবন বন্দি। তাই লাবণ্যর সঙ্গে নগেন লখনৌ যাচ্ছে শুনে প্রমীলার বুকের মধ্যে ‘টিপটিপ করে। আবার সে নিজেকে বোঝায় এভাবে:

“নরনারীর সম্পর্কটা কেবলই অবস্থাগত করিয়া রাখিতে চায়। না, নগেন যদি একা লাবণ্যকে সঙ্গে নিয়া লখনৌ ঘুরিয়া আসে তাহাতেও তার বুকের মধ্যে টিপটিপ করিবার অধিকার নাই।” (২খ, পৃ.-১২১)

তারপরও প্রমীলা স্টেশনে নগেনের সঙ্গে দেখা করতে যায়। একদিন যে স্ত্রী হবে তার প্রতি এই অহেতুক আচরণ বিমলকে ক্ষুব্ধ করে।

‘শহরতলী’ উপন্যাসে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ব্যবধান সবচেয়ে স্পষ্ট। এ উপন্যাসের মূল কথাই হলো বিত্তশীল এবং বিত্তহীনের দ্বন্দ্ব। প্রথমত যশোদা নিম্নবিত্ত হওয়ার কারণে তাকে সত্যপ্রিয়র বাড়ির সকলে তুমি সম্বোধন করে, যদিও অনেকের চেয়ে সে বয়সে বড়।

অন্যদিকে সত্যপ্রিয়র মেয়ের জামাই যামিনী বয়সে ছোট হলেও যশোদা তাকে আপনি সম্বোধন করে। জ্যোতির্ময়ের বাড়িতে বউভাতের নিমন্ত্রণে শুধুমাত্র বয়স আর শারীরিক গঠনের জন্যই নয়, তার সত্যপ্রিয়র মেয়ের জামাই যামিনী বয়সে ছোট হলেও যশোদা তাকে আপনি সম্বোধন করে।

জ্যোতির্যয়ের বাড়িতে বউভাতের নিমন্ত্রণে শুধুমাত্র বয়স আর শারীরিক গঠনের জন্যই নয়, তার শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে সে সবাইকে খাওয়ানোর ভার পায়। সে যদি উচ্চবিত্তের কেউ হতো, তবে তাকেই খাওয়ানোর জন্য সকলে ব্যস্ত হয়ে উঠতো। আবার সত্যপ্রিয়র বাড়িতে সে নিমন্ত্রিত হয়ে গেলে ‘বাড়ির একটি বিশেষ শ্রেণির আশ্রিতদের সঙ্গে তাকে খেতে বসানো হয় ।

সত্যপ্রিয়র মেয়ে, বোন বা বিত্তশীল কারো সঙ্গে যশোদাকে বসানো গেলো না। আবার শুধুমাত্র উচ্চবিত্তের অহংকারে সত্যপ্রিয় কোনো বাড়ি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে উপহার দিয়ে চলে আসে। এ রকম জ্যোতির্ময়ের বউভাতে গিয়ে সান্ধ্য আহ্নিকের অজুহাত দিয়ে সে চলে আসে।

মানিক তাঁর লেখায় শ্রেণিবৈষম্য সর্বক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। উচ্চবিত্তরা তাদের বিরে বাইরে সম্পর্ক স্বীকার করে না, শুধু সাময়িক সুখ আদায় করে। শঙ্কর বকুলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে, কিন্তু তাদের বিয়ে হয় নি। বকুলের বিয়ে হয়েছে পোস্ট অফিসের কেরানির সঙ্গে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমাজ শ্রেণি

 

আবার প্রমীলা আর নগেন প্রেমে জড়িয়েছে। প্রমীলা শিক্ষিত উচ্চবিত্ত আধুনিক যুবক নগেন্সের উপযুক্ত হওয়ার জন্য ইংরেজি বই পড়েছে, নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করার জন্য নগেনের উগ্র জীবনযাপনকে বিনাযুক্তিতে সমর্থন করেছে। নগেন প্রমীলার কাছে উদারতা আশা করে, কোনো সংকীর্ণতা নয়, প্রমীলা তাই উদার হয়েছে, লাবণ্যর সঙ্গে লখনৌ যাওয়ার ঘটনাকে সহজভাবে গ্রহণ করেছে-এতো কিছুর পরও নগেন প্রমীলাকে প্রতারিত করেছে।

প্রমীলা যখন নগেনের কাছে স্ত্রীর মর্যাদা পাওয়ার জন্য প্রস্তুত, তখনই নগেন আর লাবণ্যের বিয়ের কার্ড তার হাতে এসে পৌঁছেছে। এ রকমই সমাজের বিধি। তেল আর জল যেমন মিশ খায় না, তেমনি নিম্নমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মিলন সম্ভব হয় নি

“আধুনিক যুগে ব্যবহারিক জীবনে শোষণ, অত্যাচার ও নিপীড়নে জর্জরিত হয়ে মানুষ নিছক বস্তুতান্ত্রিক হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কলকারখানা স্থাপনের ফলে আর্থিক বৈষম্য মানুষের ব্যবহারিক জীবনে এনেছে গ্লানি, মনন-জীবন করেছে পঙ্গু। তাই অধিকারবাদের লড়াই শুরু হয়েছে দুনিয়াময়। ব্যবহারিক জীবনে এর যে মনোজীবন রয়েছে, তা’ দুঃখ-দৈন্য ও অভাব-উৎপীড়নের প্রতিক্রিয়ার ফলে আচ্ছ লাঞ্ছিত ও উপেক্ষিত। ১০

‘শহরতলী’ উপন্যাসে উচ্চবিত্তের অহংকারে সত্যপ্রিয় টাকার ওজনে মেয়ের জন্য জামাই কিনে আনে। কিন্তু মেয়েটি সুখী হতে পারে না। যোগমায়া আর যামিনীর মনের মিল হয় না। তবে, নিম্নমধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের মিলন ঘটেছে এ উপন্যাসে। নন্দ আর সুবর্ণের। নন্দর কীর্তনে মুগ্ধ হয়ে সুবর্ণ নন্দর প্রেমে পড়ে। দুই বাড়ির অভিভাবকরা এ মিলন মেনে নেবে না বলে তারা পালিয়ে যায় ।

Leave a Comment