আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলুদ নদী সবুজ বন উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলুদ নদী সবুজ বন উপন্যাস
‘হলুদ নদী সবুজ বন (১৯৫৬) উপন্যাসটি নদী, বনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কারখানা এবং এর মালিক শ্রমিক-শ্রেণিকে নিয়ে লেখা হয়েছে। উপন্যাসের শুরু হয়েছে বাঘ শিকারের ঘটনার মধ্য দিয়ে। বাঘ মারার কৃতিত্ব সকলেই নিতে চায়, কিন্তু সকলে তো আর মারতে পারে না। কারখানার শ্রমিক ঈশ্বর পাকা শিকারি। সে বাঘের গতিবিধি সম্পর্কেও অবগতঃ
“বিধাগ্রস্ত প্রভাস ও রবার্টসনকে সেই জোরগলায় জানিয়েছিল যে বাঘটা আবার ফিরে আসবে, একটু বেশি রাত্রে আসবে মরা গরুটাকে যদি ওইখানে ঠিক ওই ভাবে ফেলে রাখা হয় এবং সারাদিন আশেপাশে মানুষের হইচই বন্ধ থাকে।”(১০খ,পৃ-২৪৩)
বাঘ আসার পর তিনজনই গুলি ছোঁড়ে, ঈশ্বরের গুলিতে বাঘ মারা যায়। রবার্টসন গোপনে সুখেন্দুকে দিয়ে ঈশ্বরের স্বীকারোক্তি আনে যে রবার্টসনের গুলিতে বাঘ মারা গেছে। বিনিময়ে টঈশ্বর আড়াইশ টাকা পায়। ঈশ্বরের স্ত্রী গৌরী অসুস্থ, এই টাকা দিয়ে সে গৌরীকে হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু হাসপাতালে আরো টাকা দিতে হবে। এবার প্রভাস ঈশ্বরকে ডেকে পাঠায় এবং সে আড়াইশ টাকার বিনিময়ে প্রভাসকেও লিখে দেয় যে প্রভাসের গুলিতে বাঘ মারা গেছে।

ঘটনা রবার্টসন এবং প্রভাস দুজনই জানতে পারে, ফলে ঈশ্বরের চাকরিটি চলে যায়। এতে কারখানার অন্য শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেরাও কারখানায় যাওয়া বন্ধ করলে ঈশ্বর তাদের কারখানায় পাঠায়। এবার গুণ্ডা নিয়ে ঈশ্বরকে মারধোর করে, বাড়ি পুড়িয়ে দেয় এবং লাইসেন্স বাতিল করে বন্দুক কেড়ে নেয়।
শ্রমিকরা ঈশ্বরের বাড়ি ঠিক করে, তাকে শা সাহেবের কাছে একটি চাকরি জোগার করে দেয়। তার চাকরিটি নদীর ঘাটে, কেউ যেন বিনে পয়সায় ঘাট পাড় না হয় তার দেখাশোনা করা। কিন্তু ঘাটে জেটি আসে, ঈশ্বরের চাকরি শেষ হয়। এর মধ্যে নদীতে প্রভাব পড়ে গেলে ঈশ্বর তাকে বাঁচিয়েছিল তাই ঈশ্বরকে প্রভাস নিজের বাড়িতে দাঁড়োয়ানের চাকরি দেয়।
আবার প্রভাস ঈশ্বরকে নিয়ে শিকারে যায় এবং যথারীতি ঈশ্বরের গুলিতে বাঘ মারা যায়। কিন্তু প্রভাস নিজের নামে বাঘ মারা কাহিনী প্রচার করে আর যারা বাঘ দেখতে আসে তাদের লুচি-পায়েশ খাওয়ায়। প্রভাস ঈশ্বরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।

এবার রবার্টসন ঈশ্বরকে কারখানার পাহারাদারের চাকরি দেয়। সেই সাথে সে লাইসেন্স আর বন্দুকও ফিরে পায়। বিধবা লখার মা ঈশ্বরের প্রেমে পড়ে। সে আসরে পালাগান গেয়ে পেট চালায়। এই নিয়ে গৌরীর সঙ্গে ঈশ্বরের বিরোধ শুরু হয়। হলুদ নদীতে বান আসে। ঘরবাড়ি ভেঙে যায়। গৌরী ঈশ্বরকে জড়িয়ে ধরে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রাণ রক্ষা করে। তারপর লখার মা নৌকা নিয়ে আসে উদ্ধারের জন্য। লখার মা বলে:
“ মানুষের আশ্রয় মিলবেই, বন্যা হোক আর ভূমিকম্প হোক।”(১০খ, পৃ-৩৪১) একটি জীবনমুখী বক্তব্যে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপন্যাসে দেখিয়েছেন মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে ।