মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

‘চালচলন’ (১৯৫৩) উপন্যাসটি নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত শ্রেনির মানুষদের মানসিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে লেখা। এ উপন্যাসে

“মধ্যবিত্তের চিন্তা-চেতনার অসংলগ্নতাকে প্রকাশ করা হয়েছে সুনীলের মাধ্যমে। ২৪

সামাজিক চালচলনের কারণে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ মনে মনে কী চিন্তা করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় টুকরো টুকরো ভাবে চালচলন’ উপন্যাসে তা দেখিয়েছেন।

উপন্যাসের শুরু হয়েছে সুনীলের ভোরে উঠে বাইরে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে। জ্যোৎস্নার আলোকে ভোর বলে ভুল করে রাত তিনটায় বেড়িয়েছে সুনীল। শহরতলীতে তার বন্ধু মনোজের বাড়ি, সে কারখানায় কাজ করে। সুনীল মনোজকে ডেকে দেয় জানালা দিয়ে। তারপর ফুল কুড়িয়ে আসার পথে রেনুকে সে ফুল দেয়। তার পিসিকে পুজোর জন্য এ ফুল দিতে চাইলে নেয় না। তার ধারণা:

“ম্লেচ্ছ নাস্তিকটার ফুল দিয়ে পুজো করলে নাকি অপরাধ হবে।”(৯খ,পৃ-১৭৭)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

 

সুনীল সে দিন ফুল না কুড়িয়ে বাসে করে বাড়ি ফিরলো, রাত বলে সে মনোজকেও ডাকেনি। সবার কাছেই ধরা পড়লো সে আজ ফুল আনেনি। পিসির অসুখ, তাই নিজে ফুল তুলতে পারেনি, সুনীল পিসির জন্য ফুল তুলতে বেরুল। সে গেলো অবিনাশের প্রকাণ্ড বাগানওয়ালা বাড়িতে। সেখানে পরিচয় হলো অবিনাশের একমাত্র মেয়ে মিলনীর সঙ্গে। সুনীল রাতে বাঁশি বাঁজায় মিলনী তার বাঁশি শোনে। মিলনী রেনুর ছাত্রী, অন্যদিকে রেনু আবার সুনীলের কাছে পড়া জেনে নেয়। এই তাদের যোগসূত্র।

রেণু স্কুলে মাস্টারি করে, বিয়ে করেনি। সে সংসারের হাল ধরেছে, তার বিধবা বোন আর ছেলেমেয়ে আছে সংসারে। মনে মনে সুনীলকে সে পছন্দ করে। কিন্তু সুনীলের মন চলে যায় মিলনীর দিকে। মিলনীর বিয়ে ঠিক হয়ে আছে বিলেত ফেরৎ অনাদির সঙ্গে। বিয়ের আগে নিজেদের জানাশোনার জন্য মিলনী আর অনাদীকে কিছুদিন মেলামেশা করতে দেয় অভিভাবকরা।

পছন্দ হওয়ার কারণে অনাদি যৌতুকের টাকা নিয়ে মেলামেশা বন্ধ করে, মিলনী এতে শঙ্কিত হয়, মনে করে অনাদি টাকাকে ভালোবাসে তাকে নয়। সে সুনীলকে ব্যাপারটা বলে। সুনীল এ নিয়ে রেণু, অবিনাশ, মনোজের সঙ্গে কথা বলে, কিন্তু তারা কেউ অনাদীকে অবিশ্বাস করে না।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

 

অন্যদিকে সুনীলের ভাই অমিয় আর বোন লতা মানসিক রোগে পড়ে। অমিয়র মনে হয় সে পাস করতে পারবে না, তাদের টানাটানির সংসারে আরো দুর্যোগ আসবে। সুনীল অমিয়র পড়া বন্ধ করে দেয়। আর লতার সব সময় ভয় লাগে বুক ধরপর করে, সে লতাকে ডাক্তার দেখায়, পড়া বন্ধ করতে চায়। লতা এতে আরো ভয় পায়, কারণ পড়া বন্ধ হলে তাকে যার-তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে।

সুনীল ব্যাপারটা বুঝতে পারে। সে কয়েকদিনের জন্য বাঁশি বাজানো বন্ধ করে। যাতে লাতার ‘মন কেমন’ না করে। সকলের এতো সমস্যায় পরে সুনীলও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তার অকারণ ভাবপ্রবণতা কমে যায়। সে অনাদির বাড়ি গিয়ে জানতে পারে অনাদি মিলনীকে বিয়ে করবে। সে বলে:

“আমাদের সাধারণ বিয়ে, ভালোবাসার অত মিথ্যে রং লাগালে চলবে কেন?” (চৰ, পৃ-)

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালচলন উপন্যাস

 

সুনীল এবার সব বুঝতে পারে। সে মিলনীকে চিঠি লেখে

“অনাদি তোমায় ভালোবাসে। তুমিও অনাদিকে ভালোবাসো। নিজেরা বুঝে শুনে ব্যবস্থা কর।” (৯খ,পৃ-২২৫)

আবার বিয়ে না করার বিকারও থেমে যায় সুনীলের। বাবা বিয়ের কনে দেখছে শুনে হাসিমুখেই লতার সঙ্গে কথা বলে। এ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যেপাধ্যায় কয়েকজন মানুষের খণ্ড খণ্ড জীবন এঁকে সেই সময়ের অস্থির মানুষের পূর্ণাঙ্গ রূপ এঁকেছেন।

Leave a Comment