আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরোগ্য উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরোগ্য উপন্যাস
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আরোগ্য (১৯৫৩) উপন্যাসটি সমাজের অসংলগ্নতা নিয়ে লেখা। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে
“মানুষের মনোবিকারের স্বরূপ উদ্ঘাটনই এই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ২২ লেখক এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন মানুষের এই মনোবিকার সমাজের কারণেই সৃষ্টি। উপন্যাসের শুরু হয়েছে কেশব ড্রাইভারের দক্ষতার দৃশ্য দিয়ে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কেশব।
মন্ত সেরুন গাড়ির সামনে একটি মেয়ে আসায় এ্যাকসিডেন্ট হয়, কেশব দক্ষতার সঙ্গে মালিকের মেয়ে এবং তার তিন বান্ধবীকে বাঁচায়। কেশব শিক্ষিত যুবক, সে অনিমেষের গাড়ি চালায়। অনিমেষের মেয়ে ললনার গান তাকে মুগ্ধ করে, ললনার মানসিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব তার ভালো লাগে। সে ভোরে ঘুম থেকে উঠে শহরতলী থেকে শহরে ললনাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে আসার জন্য ব্যকুল হয়ে ওঠে।

আবার সন্ধ্যায় নিজের বাড়ি শহরতলীতে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। শহরতলীতে থাকে তার মা, ছোট ভাই, ভায়ের বউ, তাদের ছেলেমেয়ে, বোন। আর শেকবের জন্য অপেক্ষা করে থাকে গরিব বিধবা মায়া মায়া পঙ্গু জায়ের ছেলে মেয়েকে আগলে রাখে, ঝিয়ের মতো খাটে। মারার একমাত্র সুখের জায়গা কেশব। কেশবকে সে ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভারি করতে বারণ করে। ভোরে ডোবার ধারে গরুর টাটকা দুধ চুরি করে এনে খাওয়ায়, আর রাত জেগে অপেক্ষা করে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে কেশব তার ঘরে যায়। মায়ার সঙ্গে কেশবের প্রেম। কিন্তু কেশব মায়াকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে না।
মায়ার আদর যত্নকে তার কৃত্রিম, মেকি মনে হয়। কেশব এসব ভাবতে ভাবতে আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কেশবের বন্ধু কালু মিস্ত্রি জীবনবাদী। কালু বেলাকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করে এবং সফল হয়, নেশাও করে মাঝে মধ্যে।
লেখক কালুর চরিত্রে স্বাভাবিক মানুষের চরিত্র এঁকেছেন। কিন্তু কেশব হিস্টিরিয়াগ্রস্ত। সে সমাজের টানাপোড়েনে বিধ্বস্ত। তার মাথায় যন্ত্রণা করে, রাতে ঘুম হয় না। কেশব তখন ডাক্তার দেখায়। ডাঃ দত্ত বড় ডাক্তার, তার ভিজিটও বেশি বাড়ির সকলের সঙ্গে হৈ চৈ করে বাড়ি বাঁধা রেখে টাকা জোগার করে সে চিকিৎসা শুরু করে। ডাঃ দত্ত তাকে বুঝিয়ে দেয় যে সে একসঙ্গে শহুরে এবং শহরতলী দুই জীবন ভোগ করতে চায়।

যে কোনো একদিকে যেতে হবে। আবার কেশবের আরেকটি সমস্যা- সে স্বপ্নের মতো করে সবকিছু চায়-এটা ঠিক না, বাস্তবকে মেনে নিয়ে যেটুকু পাওয়া যায় তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কেশব মানসিকভাবে ভেঙে পরে সে চাকরি কামাই করে ঘরে বসে থাকে কয়েকদিন। এর মধ্যে সে বুঝে যায় মায়ার উপায়হীন জীবন। তারপর যায় অনিমেষের বাড়ি।
সেখানে ক দিনেই একটা পরিবর্তন হয়েছে। ললনাকে অপমান করেছে অনিমেষের চাকরির কর্তৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন শশাঙ্ক। অনিমেষ তাই শশাঙ্ককে বাড়ি আসতে বারণ করে দেয়। এ কারণে অনিমেষ চাকরিতে প্রমোশন পেয়েও অসুবিধায় পড়ে। মেয়ের জামাইয়ের চিকিৎসা বন্ধ হয়, বাড়ির চাকর চলে যায়। ললনাকে শখের সংগীত ছেড়ে অসুস্থ শরীরে টিউশনি ধরতে হয়।

অনুষ্ঠানে গান গাইতে সে টাকা নেওয়া শুরু করে। ললনার এই অধঃপতন দেখে কেশব আরো ভেঙ্গে পরে। এ বার জগৎকে সত্যিকারের চেনে কেশব। সে বুঝতে পারে
“যে অনিয়মের জন্য তার রোগ, সেটা রয়েছে সংসারে। সংসারটা না পাল্টিয়ে অনিয়মটা যাবে না। তার রোগও আরোগ্য হবে না। [… …. সংসারটা পাল্টাবার লড়াই তাকেও করতে হবে। ” (৮খ, পৃ-১৬৯)
তারপর সে যায় কানুর বাড়ি। কানুকে বলে
“সবার জীবন শুধরে দেবার লড়াই শুরু করব ঠিক করতে রোগ যেন অর্ধেক কমে গেছে, লড়াই আরম্ভ করলে নিশ্চয় আরোগ্য।”(৮খ, পৃ-১৭২)
এ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে লেখক সমাজের অনিয়মের বিশৃঙ্খলার আরোগ্য কামনা করেছেন।