আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধরা বাধা জীবন উপন্যাস। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধরা বাধা জীবন উপন্যাস
আচ্ছন্ন মানুষ একটি নির্দিষ্ট পন্থায় জীবন যাপন করে চলেছে। ‘ধরা-বাঁধা জীবন’ উপন্যাসে লেখক এই গণ্ডিবদ্ধ জীবনের কথা লিখেছেন। এ উপন্যাসে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভূপেন আর প্রভার মাধ্যমে সংসার জীবনের জটিলতা আর সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন।
মানুষ সংসারে নানা নিয়মে আবদ্ধ, আবার এই নিয়ম মানুষের সব সময় ভাঙতে ইচ্ছে করে। এই জটিল দিকগুলো এ উপন্যাসে অংকিত হয়েছে। উপন্যাসের শুরুতে বিয়াল্লিশ বছর বয়সী ভূপেনের বউ সরলা আর ছেলে কয়েক ঘণ্টার ব্যাবধানে মারা যায়। কিন্তু ভূপেন কাঁদছে না। ভূপেনের মনের বিভিন্ন জটিল অনুভূতি এবং স্ত্রী সন্তানের স্মৃতির প্রভাব কতটুকু তা উপন্যাসের মূল কথা। স্ত্রী- সন্তানের মৃত্যুতে ভূপেন কাদলো না। বাড়ির সকলে এবং বন্ধু প্রসন্ন অনেক চেষ্টা করেও তাকে কাঁপাতে পারলো না।

পরদিন অসন্ত্রের বোন প্রভা আসলো কাঁদতে কাঁদতে এবং স্তূপেনকে কাঁদতে বললো। প্রভার কান্নাবিকৃত মুখ দেখে ভূপেনের কান্নার ভাবটাও চলে গেলো। এই প্রভা ডাক্তার। ভূপেন দশ বছর আগে সরলাকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলো, তার দুবছর পর সে বুঝতে পারে প্রভা তাকে ভালোবাসে। এবং দু একবার প্রভা ভূগেনের খুব কাছাকাছি এসেছে, মাথা ঘুরছে বলে ভূপেনের কাঁধে মাথা রেখেছে কিন্তু ভূপেন শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে, আর কিছু করেনি।
এভাবে ভূপেন সহজ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কারণ সে জানতো সরলাকে সে ঠকাতে পারবে না। কিন্তু স্ত্রী-পুত্র মারা যাওয়ার পর ভূপেন এখন প্রভাকে বিয়ে করতে চায়। সকালে প্রভা চলে যাওয়ার পর বিকেলে ভূপেন প্রভাদের বাড়ি গেলো। এরপর থেকে কারণে- অকারণে প্রভাকে ডেকে পাঠায় কিংবা তাদের বাড়ি যায়। প্রভা ভূপেনের কাছে কিছুদিন সময় চেয়ে নেয়।
অন্যদিকে ভূপেনের দাদা-বউদি শংকিত হয়ে ওঠে, কারণ ভূপেনের টাকায় সংসার চলে। আবার প্রসন্নও শংকিত হয়, কারণ প্রভা সংসারে বেশি টাকা দেয়। দুই পরিবার বিয়ে ভেঙে দেবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। প্রসন্ন ভুপেনকে ধীরেনবাবুকে জড়িয়ে প্রভার সম্পর্কে খারাপ কথা বলে।

ভূপেন প্রভাকে ধীরেনের কথা জিজ্ঞাসা করলে প্রভার কাছে সংসারের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সে ভয় পায়। বিয়েটা সে পিছিয়ে দিতে বলে। ভূপেন রাজি হয়। আবার প্রভা এও বলে যে, বিয়ে করে কী হবে সংসারের ধরা-বাঁধা নিয়মে তাদের পোষাবে না। ভূপেন বাড়ি ফিরে আসে কিন্তু স্থির হতে পারে না আবার বিকেলে হেঁটে শহরের অন্য মাথায় প্রভাদের বাড়ি যায় প্রভার কাছে শেষ কথা জানতে।
প্রভাদের বাইরের ঘরে কেউ নেই। উপরে প্রভার ঘর থেকে কয়েকজনের কথা আর হাসি শোনা যাচ্ছে। প্রভার আনন্দময় জীবন দেখে ভূপেন ফিরে আসে। ভূপেন বুঝতে পারে সংসারের বাইরে প্রভার একটি সুন্দর জগৎ আছে। ধরা-বাঁধা জীবন তার জন্য নয়। লেখক এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন সংসারের সীমাবদ্ধতার বাইরে মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায়।