আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের জটিলতা উপন্যাস । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের জটিলতা উপন্যাস
মানুষের মনের জটিল চাওয়া-পাওয়াকে কেন্দ্র করে ‘জীবনের জটিলতা’ (১৯৩৬) উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। উপন্যাসটি মধ্যবিত্ত জীবনের একটি চালচিত্র।
“এখানে আছে মধ্যবিত্ত জীবনে প্রেমের জটিলতা, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের জ্বালা। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিমল আর প্রমীলা দুই ভাইবোন। উপন্যাসের শুরু হয়েছে বিমলের মা অনুরূপা তাদের দুজনের হাতে দুটি পয়সা দিয়েছে সকালে খাবার কিনে খাওয়ার জন্য। পথে প্রমীলা একটি সিকি কুড়িয়ে পায়। সিকিটি বিমল নিয়ে নেয়, প্রমীলার মন খারাপ হয়। কিন্তু দেখা যায় সিকিটি অচল। বোনের জন্য বিমল মায়ের টাকা চুরি করে, অনুরূপা বিমলকে মারে। সে রাতে দু ভাইবোনের জ্বর আসে। লেখক মন্তব্য করেছেন
“পথে কুড়াইয়া পাওয়া একটা অচল সিকিকে আশ্রয় করিয়া এত ব্যাপার ঘটিয়া যায়। এমনই মানুষের জীবন, এমনই জীবন মানুষের।” (২, পৃ-১০৩)
বড় হয়ে বিমল হয় কবি। সে বেকার। টাকার জন্য প্রমীলার প্রেমিক নগেনের কাছেও সে হাত পাতে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে মানুষ কত অসহায়। তাদের পাশের বাড়িতে থাকে অথর আর তার স্ত্রী শান্তা। শান্তা বিমলের ছাপা হওয়া সব কবিতা পড়ে। বিমল আর শান্তার জানালা মুখোমুখি। জানালায়ই তাদের নিঃশব্দ চেনাজানা হয়। তার পর শান্তা প্রমীলাকে বন্ধু বানায়। তাদের বাড়ি এসে বিমলের সঙ্গে কথা বলে যায়।

বিমলকে ভালোবাসে লাবণ্য। কিন্তু বিমল তাকে পাত্তা দেয় না। একদিন লাবণ্যদের পরিবারের সঙ্গে নগেন যায় লখনৌ। তাদের যাওয়ার সংবাদ পেয়েই প্রমীলা বিমলের সঙ্গে স্টেশনে যায়। নগেনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরে আসে। নগেনের একটা চিঠিতে বিমলের চাকরি হয়। এদিকে অধর শান্তা আর বিমলের ব্যাপারটি বুঝতে পারে। সে বিমলকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে অপমান করে। অফিস ছুটি নিয়ে শান্তাকে সময় দেয়।
শান্তাকে গান শোনায়, তারা দাবা খেলে। শান্তাকে খেলায় জিতিয়ে দেয়। কিন্তু সবই নিষ্ঠুরভাবে করে অধর। শান্তা হাঁপিয়ে ওঠে। তারপর অধর ঘোষণা করে তারা এ পাড়া থেকে চলে যাবে, এ বাড়ি ভাড়া নিয়ে অন্য পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে। খবর শুনে বিমল ক্ষুব্ধ হয়, শান্তাকে ভুল বোঝে। অধর বিকেলে বাইরে গেলে শান্তা বিমলের কাছে বিদায় নিতে আসে। বিমল তখন কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে।
সে শান্তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। শান্তাকে নিয়ে অন্য কোথাও বাসা নিতে চায়। শান্তা রাজি হয় না। বিমল পাগলের মতো শান্তাকে বুকে তুলে নেয়, তার মুখে চুম্বন করে। অন্যদিকে অধর ফিরে এসে অন্ধকার ঘর থেকে সব দেখে। শান্তা বাড়ি ফিরলে শান্তাকে মরতে বলে সে বাইরে চলে যায়। শান্তা ছাদ থেকে উঠানে লাফিয়ে পড়ে। কয়েকদিন পর শান্তার মৃত্যু হয়। অধর শান্তাকে হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যায়। নগেন লাবণ্যকে বিয়ে করে। বোনের অপমানে বিমল নগেনের দেওয়া চাকরি ছেড়ে দেয়। অধর নিজেকে সামলে নিয়ে প্রমীলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিমল রাজি হয় না। সে প্রমীলাকে বলে।

“আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য শান্তার মত তোকে ও একটু একটু করে ভাঙবে। ” (২, পৃ-১৬৩)
অনেক কষ্টে বিমল একটি দৈনিক পত্রিকার অফিসে প্রুফ রিডারের চাকরি জোগার করে। রাতে বাড়ি ফিরে ছাদে গিয়ে দেখে প্রমীলা আলিশার উপর উঠেছে। বিমল তাকে শক্ত করে ধরে। বিমলের কথায় প্রমীলা বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে বলে:
“আমাদের কেন এমন হল দাদা? তোমার আর আমার?” (২খ, পৃ-১৬৭)
প্রমীলা ঘুমিয়ে পরলে শান্তার রক্ত মাথা ব্যান্ডেজটা বিমল পুড়িয়ে ফেলে। সে ভাবে
“এটা রাখিলে চলিবে না। তার অনেক কাজ।”(২, পৃ-১৬৭)
উপন্যাস শেষ হয়েছে জীবনে বেঁচে থাকার আশা নিয়ে
“এই জীবন জয়ী সাধনাই মানিকের সাধনা। ”
জীবনের পথপরিক্রমায় দুঃখকে জয় করে, বেঁচে থাকাকে জীবনের প্রধানতম উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।