মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বিষয় বৈচিত্র্য এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস

পুতুলনাচের ইতিকথা (১৯৩৬) উপন্যাসটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গাওদিয়া নামের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে লিখেছেন। গ্রামের মানুষের জীবন-যাপন, চাওয়া-পাওয়া, সুখ-স্বপ্ন উপন্যাসের বিষয়। হারু ঘোষের মৃত্যুর সংবাদে উপন্যাস শুরু হয়েছে এবং শশীর বিষণ্নতা দিয়ে উপন্যাস শেষ হয়েছে।

গাওদিয়া গ্রামের ছেলে শশী কলকাতা থেকে ডাক্তারি পাস করে এসে গ্রামে ডাক্তারি করে। এক বাদল-সন্ধ্যায় শহর থেকে ফেরার পথে সে দেখে পরাণের বাবা হারু বজ্রপাতে মরে আছে। শশী তাকে মাঝির সাহায্যে নৌকায় তুলে নেয় এবং গ্রামের লোকজনকে নিয়ে সৎকার করে। লেখক এ উপন্যাসে দেখিয়েছেন মানুষের মনের বিভিন্ন জটিল দিক। নারী পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষণ, যৌন সম্পর্ক পরিবার এবং সমাজজীবনকে কতটা প্রভাবিত করে উপন্যাসে তা ফুটে উঠেছে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস

 

শশীর বাবা গোপাল দাসের পেশা দালালি ও মহাজনী আবার যামিনী কবিরাজের বউ সেনদিদির সাথে গোপালের নাম জড়িয়ে আছে। এ সব নিয়ে বাবার সাথে শশীর দ্বন্দ্ব। গ্রামে শশীর কোন যোগ্য বন্ধু নেই। তাই তার সাথে কারো অন্তরঙ্গ সম্পর্কও নেই। পরাপের বউ কুসুম তাকে ভালোবাসে। সে কুসুমকে প্রশ্রয় দেয় কিন্তু কোনো স্বীকৃতি দেয় না। কুসুমের ননদ মতির অসুখে শশী ব্যাকুল হয়। কুসুম মতির বিয়ে দিতে চাইলে শশী তাতে মত দেয় না।

শশীর কলেজের বন্ধু কুমুদ যাত্রা দলের সাথে গাওদিয়া এসে মতিকে পছন্দ করে। কিন্তু শশী বিয়েতে মত দিতে পারে না, চিন্তা করে সে নিজেই মতিকে বিয়ে করতে পারে। কিন্তু মতি কুমুদকে পছন্দ করে। বিয়ে করে তারা বোহেমিয়ান হয়। শশী কুসংস্কার বিশ্বাস করে না। এ দিকে সূর্য বিজ্ঞানে পারদর্শী যাদব পণ্ডিত শশীকে বলে রথের দিন তিনি দেহত্যাগ করবেন। এ কথা ছড়িয়ে পড়লে যাদব পণ্ডিত আর তার স্ত্রী আফিম খেয়ে রথের দিন মারা যায়। আর তাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরির জন্য দান করে যায়।

শশী এই মৃত্যুর রহস্য বুঝতে পারে কিন্তু কিছু বলে না। যাদব পণ্ডিতের রেখে যাওয়া টাকায় শশী দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করে। শশীর বোন বিন্দুকে তার বাবা নন্দলালের সাথে বিয়ে দিয়েছে, নন্দলাল তাকে রক্ষিতার মতো রেখেছে জেনে শশী তাকে গ্রামে নিয়ে আসে। কিন্তু দেখা যায় বিন্দু সেই জীবনেই অভ্যস্থ হয়ে গেছে। ফিরে যায় কলকাতায়। আবার কুসুমও অস্থির হয়ে ওঠে।

 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস

 

শশীকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় সে বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য স্থির করে। কুসুমের বাবা নিতে আসে। তখন শশী কুসুমকে বাধা দেয়। কিন্তু কুসুমের ভেতরের প্রেম অপমানে অভিমানে ভোতা হয়ে গেছে। সে আর ফেরে না:

“শশীর অঙ্ক কষে ভালোবাসার স্বরূপ উপলব্ধি করেই কুসুম তাকে ‘মানুষ নয়’ (শ্লেষার্থে দেবতা) বলে উল্লেখ করেছে।

কুসুম বলে

“লাল টকটকে করে তাতানো লোহা ফেলে রাখলে তাও আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যায়, যায় না?

লেখক এভাবে দেখিয়েছেন জীবনের বিভিন্ন জটিল দিক। অন্যদিকে, সেনদিদি বেশি বয়সে বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা যায়। শশী বুঝতে পারে এ ছেলে গোপালের । এ নিয়ে শশী আর গোপালের বন্য হয়। এক পর্যায়ে শশী গ্রাম থেকে চলে যেতে চায়। হাসপাতালে নতুন ডাক্তার নিয়োগ করে। এ রকম অবস্থা দেখে গোপাল তার ছেলে নিয়ে চলে যায়।

নতুন ডাক্তারকে বেতন দিয়ে বিদায় করে শশী রয়ে যায় গ্রামে। তার বয়স বাড়তে থাকে। পুরোনো মুখ খোঁজে যাদের আর কখনো পাওয়া যাবে না। শশী হয়ে ওঠে গ্রামের একজন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসে যৌন সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন।

Leave a Comment