আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ জীবন : কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান উত্তর । যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর অন্তর্ভুক্ত।

জীবন : কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান উত্তর
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ‘শহরতলী’ উপন্যাসে তিনি বলেছেন:
“তার কুলি মজুরাই ভালো। এদের যদি আপন না করিবে, আপন হইবে কারা? সত্যপ্রিয়র মতো যারা বড়োলোক, অথবা জ্যোতির্ময়ের মতো যারা ভদ্রলোক? বড়োলোক, ভদ্রলোক আর ছোটলোক, বিগড়াইয়া অবশ্য গিয়াছে সকলেই, তবু অভাবে যারা বিগৱাইয়া গিয়াছে তারা এখনও মানুষ আছে খানিক খানিক। আর এ অবস্থায় জীবন কাটাইয়া খানিক খানিক মানুষ থাকাও কী সহজ গৌরবের কথা! ২৪
মানিক কৈশোর থেকেই অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হন। টাঙ্গাইলে থাকাকালীন মাঝিদের সঙ্গে এবং গাড়োয়ানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তাদের জীবনকে জানার আগ্রহ সে সাক্ষ্য দেয়। এছাড়া নিজের মধ্যবিত্ত পরিবারে দাদা এবং দিদিদের মন-মানসিকতা, কৃত্রিমতা, ন্যাকামি, ভণ্ডামি তাঁকে বিশেষভাবে পীড়া দেয়। সঙ্গত কারণেই মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত সম্পর্কে তাঁর মনে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়, তিনি নিম্ন শ্রেণির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। লেনিন বলেছেন:
“নিজেদের রক্তেমাংসেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করে। জীবনের গভীরতম আবেগগুলোর মধ্যদিয়েই মানুষ অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপে রাজনৈতিক ধারণার দিকে এগিয়ে যায়।’
১৯৪৪ সালের পর থেকে মানিকের জীবন একদিকে দারিদ্রপীড়িত সংসার জীবন, অন্যদিকে দেশের সংগ্রামে একাত্মতা। ১৯৪৫ সালে ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা ক্রিয়াশীল হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে দেশে যুদ্ধের ভয়াবহতার চিহ্ন বিদ্যমান থাকে। মানুষের সাধারণ বোধের পরিবর্তন ঘটে।
প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধের অবনতি ঘটে। তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন জোরদার হয়। মার্চে মহম্মদ আলী পার্কে ফ্যাসিস্ত বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় সংঘের নাম পরিবর্তন হয়ে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ হয়। সংঘ যতদিন সক্রিয় ছিল, তিনি এর সম্মুখ সারির পুরোধা ছিলেন। চিন্মোহন সেহানবিশ বলেছেন:
“[… ….. সে নায়কতা শুধু সম্মেলনের ভাষণ বা আনুষ্ঠানিক কাজকর্মেই সীমাবদ্ধ … থাকে নি। আমাদের সংঘের ৪৬, ধর্মতলা স্ট্রীটস্থ দপ্তরের দৈনন্দিন খুঁটিনাটি কাজে, বয়স বা আলাপে, ‘পরিচয়ের শুক্রবাসরীয় বৈঠকে- সর্বত্রই তা সমানভাবে জীব হয়ে উঠত । ২৬
সংঘের বুধবারের বৈঠকে লেখকরা তাঁদের সদ্যরচিত গল্প, কবিতা, নাটক পড়ে শোনাতেন, সুরকাররা গান গাইতেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও গল্প পড়ে শুনিয়েছেন। এ বৈঠকে দিলখোলা আলোচনা হত। অনেক আনকোরারাও মানিকের লেখা নিয়ে কাঁচা আলোচনা করত। মানিক একমুখ হাসি নিয়ে সে আলোচনা শুনতেন, কখনো হয়তো জোড়ালো সমর্থন বা প্রবল প্রতিবাদ করতেন, কিন্তু অধৈর্য হতেন না।
পরবর্তী তিন বছর সংঘের সম্মেলন স্থগিত থাকে। ১৯৪৯ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্বতন সমিতির যুগ্ম সম্পাদকের অন্যতম সম্পাদক হিসেবে তিনিই সম্মেলনে রিপোর্ট পেশ করেন। আবার ১৯৫৩ সালের ১১-১৫ এপ্রিল সংঘের পঞ্চম ও শেষ বার্ষিক সম্মেলনও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বেই অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়া ১৯৪৮ সালে ‘মার্কসবাদী’র প্রথম প্রবন্ধ সংকলনে তাঁর প্রগতি সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা প্রকাশিত হয়। ‘মার্কসবাদীর’ পঞ্চম সংকলনে রবীন্দ্র গুপ্তের ‘বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা’ প্রবন্ধটিকে নিয়ে বিতর্কের জের ‘পরিচয়’, ‘নতুন সাহিত্য” এবং আরো কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
নৌবিদ্রোহ, রসিদ আলী দিবস বা ২৯ শে জুলাই- এর অগ্নিগর্ভ দিনে তিনি স্থির হয়ে বসে থাকেন নি। কখনো মজুরদের মিছিলের সঙ্গে গিয়েছেন, কমিউনিস্ট পার্টির দপ্তরে বসে আলোচনা-পর্যালোচনা করেছেন, কখনো কখনো পথচারীদের কাছে থেকে সংগ্রামের টাটকা খবর জেনে নিয়েছেন। আজাদ হিন্দি ফৌজের তিন সদস্যের বিচারকে কেন্দ্র করে তাদের দণ্ড মওকুফের দাবিতে কলকাতার ছাত্র সমাজ ১৯শে নভেম্বর ধর্মতলার মোড়ে সুদৃঢ় অবস্থান নেয়।
এখানে ছাত্র পুলিশের সংঘর্ষ বাধে, গুলিতে নিহত হয় রামেশ্বর। দুইদিন নগর জীবন সংগ্রামের অগ্নিশিখায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এই রাজপথ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আকর্ষণ করে। গুলির মুখে ছাত্রদের মৃত্যু নেশা মানিকের মনের নেশাকে লজ্জিত করে। তিনি কয়েকদিন মদ পান থেকে বিরত থাকেন। ডিসেম্বর মাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চারদিন রেডিওতে প্রবন্ধ পাঠ করেন।
প্রবন্ধ গুলির একটি হলো- ‘সাহিত্যে যুদ্ধের প্রভাব এবং অন্যগুলি আঠার উনিশশতকীয় প্রায় অর্ধশতাধিক সংগীতকার সম্পর্কে পরিচিতিমূলক বেতার ভাষণ । সংগীত সংক্রান্ত আগ্রহ মানিকের নতুন নয়, ছোট থেকেই তিনি হারমোনিয়ান বাজিয়ে দরাজ গলায় গান গাইতে পারেন এবং বাঁশি বাজান। ১৯৪৬ সালের ১৬ই জানুয়ারি ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন:
“সন্ধ্যার পর হঠাৎ মনে হল সংগীতের সুরে মানুষের হাসবার কাঁদবার সম্পর্ক আছে। দুঃখে মানুষ যেভাবে কানে কয়েকটা সুরে তার স্পষ্ট রূপ মেলে। এ বিষয়ে চিন্তা করে প্রবন্ধ লিখতে হবে। শেষজীবনে একাকী বা কন্যাদের নিয়ে তিনি শ্যামা সংগীত গাইতেন। শ্যামা সংগীত ছাড়া শেষ জীবনে তাঁর প্রিয় গান ছিল- ‘অন্ধজনে দেহ আলো..’, ‘ও পরবাসী, চলে এসো ঘরে।
১৯৪৫ সালে বাংলার সেরা লেখকদের কয়েকজন ‘আমার গল্প লেখা’ পর্যায়ে বেতার ভাষণ দেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ই মে তারিখে ‘গল্প লেখার গল্প’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন। এ বছর থেকেই তিনি নিয়মিত ডায়েরি লেখা শুরু করেন। ডায়েরির পাতায় তাঁর ব্যক্তিজীবন এবং গল্প উপন্যাসের প্লট পাওয়া যায়। কয়েকটি প্লটকে তিনি শেষ পর্যন্ত লেখেন নি। গল্প-উপন্যাসের বিষয়বস্তু সমসামরিক কৃষক-মজুরের ঘটনা, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিভিন্ন বোধ। নীরেন্দ্র চক্রবর্তী বলেছেন:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই বোধ হয় প্রথম বাঙালী সাহিত্যিক, আমাদের শিক্ষাগত নানাবিধ পূর্ব সংস্কার এবং চিন্তাগত নানাবিধ ভাবালুতা সম্পর্কে যার বিন্দুমাত্র মোহ ছিল না।
মানিকের পারিবারিক ধারা তাঁর জীবনে সর্বদাই প্রভাব ফেলেছে। এই পরিবারে তাঁর স্ত্রী এবং চারটি সন্তানও বিদ্যমান। ১৯৪৫ সালে জানুয়ারি মাসে তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন:
ভালবাসতে না দেওয়াই চরম নিষ্ঠুরতা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো গল্প বা উপন্যাসের কথা চিন্তা করে লিখেছেন, না-কি একান্ত নিজের জীবনকে কেন্দ্র করে লিখেছেন তা আজ আর জানবার উপায় নেই। তবে এই একটি বাক্য লিখে নিচে নিজের নাম স্বাক্ষর করে তিনি মানব জীবনের একটি গভীরতম দিককে তুলে ধরেছেন। তাঁর পারিবারিক রিক্ততা সকল অবস্থাতেই ছিল। ১৬ই আগস্ট তিনি লিখেছেন:
” ভোরে উঠে শুনলাম রাত্রে রান্নাঘর থেকে সব চুরি হয়ে গেছে গুড়, তেল, তরিতরকারী, কলাই করা বাটি সবকিছু।
দাঙ্গার ভেতরও জীবন চলমান। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাংসারিক দায়িত্ব পালন করতেই হয়। ১৭ই আগস্টে ডায়েরি লিখনে পাওয়া যায়, তিনি বাজার পর্যন্ত যেতে পারেন নি, ট্রাম ডিপোর দিকে রাস্তার ধার থেকে তরকারী কিনে এনেছেন, মুসলিম বস্তির ভিতর দিয়ে গিয়ে দোকান থেকে সিগারেট, মুসলমানদের দোকান থেকে আলু সরষের তেল কিনে এনেছেন। এর ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় সাংসারিক বাজারের দায়িত্ব মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুরোপুরিই পালন করতে হয়েছে। ‘স্মরণ করি’ প্রবন্ধে অমিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
….. মন ছিল মানিকের অসীম সাহসপূর্ণ। হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময় টালিগঞ্জের বাড়ির চতুর্দিকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা। তখনকার মুসলমান প্রধান টালিগঞ্জে রাত দিন খুনোখুনি, বাড়ির সকলে পালিয়ে এলো হিন্দু প্রধান পাড়া বালিগঞ্জে। কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অকুতোভয়ে পাহারা দিতে রইল সে বাড়িতে, নিরবচ্ছিন্ন একা। বৃদ্ধ পিতার নিত্য আহার্য মাগুর মাছ দাঙ্গার ভিতরে না পাওয়া গেলে পাছে তাঁর অসুবিধা হয়, সে জন্য ওই হাঙ্গামার ভিতরেও জেলে পাড়া ঘুরে রোজই বালীগঞ্জে এসে দিয়ে যেত মাগুর মাছ। ৩১
পিতার ব্যাপারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদাই সচেতন ছিলেন। ১৯৫৪ সালের ২৮শে জুলাই তিনি তাঁর সেজদিদিকে ক্ষোভের সঙ্গে চিঠি লিখেছিলেন:
“নিজের বাড়ি থেকে ৮৪ বছর বয়সের বাপকে যারা তাড়ায়, তাদের কিছুদিন জেল খেটে প্রায়শ্চিত্য করা উচিত মনে করি।
২৬শে ডিসেম্বর ১৯৫৫ সালের একটি চিঠিতে পাওয়া যায়:
“অন্য কোথাও যাইতে যাবার দারুণ অনিচ্ছা, ডলির সেবা ছাড়া একবেলা চলে না।”

আরেকটি চিঠিতে পাওয়া যায়:
“পিতার সঙ্গে খুঁটিনাটি ব্যাপার নিয়ে ঝগড়াঝাটি করা চলে পিতারও অনেক রকম দোষ থাকে। কিন্তু পিতৃত্বকে যে অস্বীকার করতে চাইবে, যে বলবে ঐতিহ্য বলে কিছু নেই—তাকে আমি অসভ্য অমানুষ বলব। তাকে আমি ধিক্কার দেব।
সন্তান হিসেবে পিতার প্রতি তাঁর যে দায়িত্ববোধ ছিল, পিতা হিসেবেও তাঁর দায়িত্ববোধ কম নয়। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ডায়েরির পাতায় মানিকের জ্যেষ্ঠ কন্যা টুটুর টনসিল অপারেশনের কথা জানা যায়। এ বিষয়ে তিনি চিন্তিত এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি গোরা হিন্দু এবং কমিউনিস্টের স্বরূপও বুঝতে পারেন।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজাফফর আহমদ যাকে সকলে কাকাবাবু বলতেন, কাকাবাবুর কাছে গাড়ির ব্যবস্থা চাইলে তিনি দিলীপ বসুর গাড়ির ব্যবস্থা। করে দেন। কিন্তু সে সময়ে দিলীপ বসুকে না পেয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পূর্ণিমার’ পিনাকভূষণের কাছে গাড়ির জন্য যান, কিন্তু সে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফিরিয়ে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন।
“একটা গল্পের জন্য দশবার বাড়ীতে ছুটেছে এই পিলাকভূষণ।” অতপর দিলীপ বসু গাড়ি করে টুটুকে বাড়ি পৌঁছে দেয়, আইসক্রিম কেনার জন্য নিজে নেমে যায়, নিজের বাড়ি থেকে বরফ এবং থার্মোমিটার দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ সম্পর্কে লিখেছেন,
“কোথায় পিনাকভূষণ জয়হিন্দবালা- কোথায় দিলীপ বসু কমিউনিষ্ঠ্যালা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃগীরোগ সর্বক্ষণই সঙ্গী। ১৯৪৬-এর ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৪৭-এর জুন পর্যন্ত রোগের আক্রমণ সংক্রান্ত একটি তালিকা তিনি করেছেন। এতে দেখা যায় ভোরে, দুপুরে, ট্রামে, বাড়িতে যে কোনো অবস্থাতেই তাঁর রোগের আক্রমণ হতো।
অর্থনৈতিক ব্যাপারেও তিনি চিন্তিত হয়ে পরেন। তাই তিনি তাঁর গল্পের জন্য ৩৫ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা নির্ধারণ করেন। আবার তাঁর শ্যালিকাকে পাত্রপক্ষের সামনে নিজের বাড়িতে এে দেখানোর ব্যাপারে অপারগতা জানান। তবে তিনি যে সাধ্যমত সকলের সঙ্গে হৃদ্যতা বজায় রাখতেন ১৯৪৭ সালের পহেলা নভেম্বর লেখনীতে তা পাওয়া যায়।
দাদা, বৌদি, মেজনা, মেজবৌদি, মেদিনীপুর, মানু, আরডি, বুকি ইত্যাদির কাছে বিজয়ার পত্র।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি খুব মমতাবান ছিলেন। মানিকের না লেখা কবিতা সুকান্তের লেখায় ফুটে উঠেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ সম্পর্কে লিখেছেন।
“আমার বিদ্রোহের চারাগুলি সবুজ হয়েছে ওর মনে/ আমার সাধ হয়েছে ওর সার্থকতা।”৩৮
সুকান্তের যক্ষ্মা হলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব বিচলিত হয়ে পরেন। তিনি লেখেন:
“চৈত্রের পরিচয়ে তুমি সূর্য হতে চেয়েছো।
তোমার যক্ষা হয়েছে!
তোমার তরুণ রশ্মি দেখে ভেবেছিলাম,
বাঁচা গেল, কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ।
তোমার যক্ষা হয়েছে!
দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জনতার সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদাই একাত্ম ছিলেন। ১৯৪৬ সালে আজাদ হিন্দু ফৌজ সদস্য রশিদ আলীর মুক্তির দাবিতে ১২ই ফেব্রুয়ারি থেকে চারদিনব্যাপী ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ বিক্ষোভ শুরু হয়। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন।
ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল হিন্দুরা যেন এ আন্দোলনে যোগ দান করতে না পারে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সফল হয় না। সর্বস্তরের জনতার ক্ষোভে সরকারী যানবাহন দগ্ধ হয়, অফিস আদালত ভাঙচুর হয়। সরকারের সৈন্যরা পথচারী ভদ্রলোক ও দোকানীদের ধরে এনে জোর করে রাজপথের ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করায়। সৈন্যরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও রাস্তা পরিষ্কার করতে বলে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অস্বীকৃতি জানালে সৈন্যরা তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ১৯৪৬ সালের প্রথম সাত মাস সমগ্র ভারতে আন্দোলন -সংগ্রাম চলে- ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে এইটি গৌরবমণ্ডিত সময়। কিন্তু আগস্ট মাসে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ডায়েরিতে দাঙ্গা ভয়াবহতা সম্পর্কে লিখেছেন:
“১৬ অগাস্ট ১৯৪৬ শুক্রবার
[.. ….] আজ হরতাল-direct action day দাঙ্গার সংবাদ শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। [… ….. কালীঘাট অঞ্চলে শিখদের সঙ্গে মুসলিমদের ভীষণ সংঘর্ষ হয়েছে শুনলাম। ফাঁড়ির ওদিকে নাকি গোল বেধেছে। মসজিদের সামনে ভিড় দেখে এলাম। I… ….. সন্ধ্যার পর ফাঁড়ির দিকে আগুন লেগেছে নজরে পড়ল। রাত প্রায় ১০টায় পার্টির দুটি ছেলে এলো। পীস কমিটি গঠনের চেষ্টা হচ্ছে- সকালে যেতে হবে।
১৭ অগাস্ট ১৯৪৬ শনিবার
সকালে পীস কমিটি গঠনের জন্য ডাকতে এলো না, একটু আশ্চর্য হলাম। …………. বস্তির মুসলমানেরা খুব ভয় পেয়ে গেছে। [… […] কলাবাগানের সেই হেঁটো কাপড় ভুঁড়িওলা ভদ্রলোক ও একজন মুসলমান বললেন, তাঁরা কলাবাগানে ঠিক থাকবেন-বাইরে থেকে কেউ এসে যাতে গোল না করে দেখবেন। আমারাও যেন আমাদের পাড়ায় শান্তি বজায় রাখি।
খুশী হলাম। বাজারের খালের পুলের কাছে পশ্চিমা গয়লা গাড়োয়ানরা নাকি নেতা চৌধুরীর হুকুমে মুসলমানদের মারছে-ঘরে আগুন দিয়েছে। তারা পাছে আসে এ বস্তির মুসলমানদের সেই ভয়টা স্পষ্ট। বিকালে এ অঞ্চলে শান্তি-সভা হবে শুনলাম। খুশী হয়ে নিজে বার হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে।
[… ….] মসজিদের কাছে আনোয়ার শা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট সরকার কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে তারপর এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যেরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নীচে যেতে এল বিরোধিতা হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট-মসিলমানরা এই করেছে, ওই করেছে। ‘ব্যাটা কমিউনিস্ট’ বলে আমার মারে আর কি। প্রায় দেড়শো লোক মিলে ধরেছিল ।

১৮ অগাস্ট ১৯৪৬ রবিবার
পাকিস্তানের দাবী বাতিল করা হচ্ছে ব্যাটারা টের পাচ্ছে। যেখানে মুসলমানেরা দলে ভারি সেখানে যে হিন্দুরাও টের পাচ্ছে আমার এ যুক্তি উড়ে গেল। ….. …] ক’জনকে বক্তৃতা করতে দেওয়ায় মারটা খেলাম না। [… …] লাঠি হাতে এক ছোকরা পথ আটকে ছিল- ফের আমায় ভিড় ঘিরে ধরল। এক ছোকরা লাঠি দিয়ে মারে আর কি। [… …. ‘শালা কম্যুনিষ্ট।’ ‘মুসলমানের দালাল।’ রব উঠছিল চারিদিকে। [… … ..]
১৯ অগাস্ট ১৯৪৬ সোমবার
রেডিওতে নাকি খবর দিয়েছে ৩০০০ মৃত: L………… কয়েকজন মুসলমान নেতাদের- সারোয়ার্দিকে গাল দিলেন। কয়েকজন হিন্দু হিন্দু নেতাদের মুণ্ডুপাত করলেন। তাঁরা টের পেয়েছেন যে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট নেতাদের নাচাচ্ছে -কংগ্রেস লীগ দুয়েরই নেতাদের।
এ বছরের প্রথম দিকেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চট্টগ্রামে ছাত্র ফেডারেশনের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে যান। সেখানকার মিলিটারি বর্বরতার অভিজ্ঞতা তাকে মর্মাহত করে। এ সম্পর্কিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয় ২০ জানুয়ারি ১৯৪৬, জনযুদ্ধ পত্রিকায়। ১৯৪৭ সালে প্রগতি লেখক সংঘ, কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের সঙ্গে একযোগে দাঙ্গা বিরোধী মিছিলের ব্যবস্থা করে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, বিশেষ করে যে সব অঞ্চলে দাঙ্গার আশংকা বেশি সে সব এলাকায় সাহিত্যিকরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শান্তির প্রতি তাঁদের অবস্থার কথা ঘোষনা করেন।
এই সাহিত্যিকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, জ্যোতির্ময় রায় ছিলেন। ফেব্রুয়ারিতে তিনি রাজশাহী ও বরিশালে সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার নামে দেশ বিভাগ হয়। এ সময় উষান্ত সমস্যা দেখা দেয়। কলকাতায় শহরতলীর উদ্বাস্তু সংকট মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। এদিকে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দমনের জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইন বিল উত্থাপন করে।
এই বিল প্রত্যাহারের দাবিতে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলন শুরু করে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও এনের সঙ্গে একাত্ম হন। ২৮ শে ডিসেম্বর বোম্বাই-এ প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন শুরু হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গপ-সাহিত্য শাখার সভাপতি হিসেবে এ সম্মেলনে যোগ দেন।
সম্মেলনের আগের নিম সরকার সম্মেলন নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে ছাত্ররা নিষেধ অমান্য করে সম্মেলন করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে, গুলি বর্ষণ করে, অকথ্য অত্যাচার করে। এ সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন,
“২৯ শে হরতাল শান্তিপূর্ণ-পরদিন সম্মেলনের অনুমতি দিলে কি দোষ হত?”৪১
এই সফর মানিকের সফল সফর হয়। তিনি লিখেছেন:
“কমবেশি সব সভাপতি ও বক্তার লিখিত অলিখিত বক্তৃতা একঘেয়ে, পুরানো গতানুগতিক। আমার বক্তৃতাই সাড়া জাগিয়েছে। সমাজ সাহিত্য জনগণ সম্পর্কে এ সব কথা বোধহয় সম্মেলন ২৫ বছরে কখনো শোনে নি।
কয়েকদিন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বোম্বাই ঘুরে দেখেন। এখানে তিনি যোগেশ্বরী গুহা দেবেন। এলিফ্যান্ট কেভস যান। সেখানে বিভিন্ন মূর্তি দেখে তিনি মুগ্ধ হন। পাহাড় কেটে গুহা, পাথর খুঁদে বিরাট আশ্চর্য সব মূর্তি। তিনি লিখেছেন বিরাটত্বের অনুভূতি তাঁকে অভিভূত করে দেয়। ত্রিমূর্তি, পার্বতীর বিবাহ, রাবণের কৈলাস উত্তোল– মূর্তিগুলি তাঁকে মুগ্ধ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন যেখানে গেছেন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সকল কিছু অবলোকন করেছেন। তাঁর দেখার সুক্ষ্ম দৃষ্টি-ই তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাঁর ডায়েরিতে এই সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে
“জোয়ারের মুখে ফিরতি-জোর বাতাস পক্ষে। প্রবল ঢেউ-নৌকা উঠছে পড়ছে-অনেকের মুখ ভয়ে শুকনো। পালের টানে জোরে চলছে সকালে লেগেছিল চার ঘন্টা, এবার সোয়া ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম!’
তিনি বোম্বে গিয়ে বিভিন্ন সামাজিক নিমন্ত্রণও রক্ষা করেন। সংসারের প্রতি কর্তব্যবোধ ও স্ত্রী প্রতি ভালোবাসা তাঁর ডায়েরিতে পাওয়া যায়:
” ১০০০ দেশী charminar সিগারেট কিনলাম-নিজামে তৈরি। প্রায় সাড়ে চার পয়সা প্যাকেট-যদি চলে তবে সিগারেট খরচ কমবে। ডলির দুখানা শাড়ি কিনলাম।”
এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় টানাটানির সংসারে তিনিও খরচ কমাতে চান, কিন্তু সিগারেটের নেশা তাঁকে গ্রাস করেছে। খরচের ব্যাপারে তিনি সর্বদাই শঙ্কিত। কলকাতা রওনা হওয়ার সময় তিনি দেখেন ইন্টার ক্লাস ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৫৭ টাকা ৭ আনা। তিনি চিন্তা করেন প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য খরচ না দিলেই হয়েছিল। যুক্ত প্রদেশ দিয়ে আসতে ট্রেন থেকে অনাবাদি জমি দেখে তাঁর কষ্ট হয়। মাটির অল্প নিচেই পাথর, তাই চাষ কম হয়। ট্রেনে ডাইনিং কারে খেতে গিয়ে ইংরেজের হতাশা দেখে তিনি তৃপ্তিবোধ করেনঃ
“ভাইনিং কারে খেতে গেলাম। ইংরাজের রাজকীয়তার নিদর্শন। ঝকঝকে পালিশ- সাজানো টেবিল চেয়ার বত্রিশটি আলোর ঝলমল। সাতআটজন খানসামা-ত্রিশ- বত্রিশজন খানা খেতে পারে, ফর্সা ধবধবে পোষাক -খাবার দেওয়ার সময় আবার হাতে সাদা গ্লোবস পরে।
রূপোলি চকচকে কাঁটা চামচ, দামী প্লেট। [… ….] একটি মাত্র ইংরেজ, প্রথম থেকে গম্ভীর মুখে বই পড়ছে। পঞ্চাশ, পুষ্ট, ভরাট মুখ, কপালে রেখার আভাস, ধৈর্যের স্থৈর্য্যের অবতার-সিধে হয়ে ঠায় বসে আছে ….. …] কি হতাশা চোখে। এ ডাইনিং কার তার এই রাজত্ব কালো আদমি বেদখল করেছে।’
ইংরেজ সম্পর্কে তাঁর এই তৃপ্তিবোধ তাঁর চরিত্রের স্বজাতি প্রীতি প্রকাশ করে। অন্যদিকে তিনি নিজের সাহিত্যের প্রতি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই সিনেমার কাছে আত্মবিক্রয় করেন নি। ‘সন্তা করা চলবে না’ এই নির্দেশ মেনে নিয়ে ‘পুতুল নাচের ইতিকথ’র ছায়াচুক্তি সই করেন। ১৭ই জানুয়ারি ১৯৪৮। ৩০শে জানুয়ারি গান্ধিজি দিল্লিতে প্রার্থনাসভায় পিস্তলের গুলিতে নিহত হলে তিনি বেদনার্ত হয়ে ওঠেন।
“সমস্ত মন প্রাণ যেন হায় সর্ব্বনাশ। বলে আর্তনাদ করে আঘাতে মুহ্যমান হয়ে গেল। ৪৬

সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর যেমন চেতনা, নিজের পরিবার নিয়ে তা কোনো অংশে কম নয়। এই দিন তাঁর ছেলে টুবলুর পা হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত ফুটন্ত ডালে পুড়ে গেলো-এই নিয়ে তিনি খুব বিচলিত হন। ডাক্তার ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে গেলে তিনি শিয়রে বসে থাকেন। দায়িত্ব-কর্তব্যের আড়ালে তাঁর একটি সৌখিন মন ছিল। পহেলা মে তিনি আব্দুল উৎসবে লাঠিখেলা দেখতে যান। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল প্রখর। তিনি নিজে সৎ ছিলেন এবং তাঁর চারদিকের অসৎ ব্যক্তিদের তিনি ঘৃণা করতেন। ‘পরিচয়’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত অমরেন্দ্র প্রসাদ মিত্র সম্পর্কে ৩০ এপ্রিল তারিখে ডায়েরিতে লিখেছেন।
“পথে পথে অমরেন্দ্রঃ উনি ওই রকম প্রত্নতত্ত্ব নাম মাত্র, গণিকা সম্পর্কে উৎসাহী! ৪৭
এই অমরেন্দ্রকে পরবর্তীতে সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রেও অনভিজ্ঞ দেখা যায়:
“বুধবারের বৈঠকে অমরেন্দ্রবাবু ১ ঘণ্টা বললেন-ক্ষয়িষ্ণু বুর্জোয়া সাহিত্য। বললেন বিশ্রী এলোমেলো, পুনরুক্তি, অস্পষ্ট প্রকাশ। শুধু পড়ে শেখা-ধরাবাঁধা চিন্তা। নীরেনবাবু তার হয়ে প্রশ্নের জবাব দিলেন। নীরেনবাবুর পড়াশোনাও আছে-কিছু চিন্তাশক্তিও আছে-বলেনও ভালো। তবে কিছুটা dogmatic অধ্যাপকীয় । সাজপোষাক সম্পর্কে উদাসীন-ময়লা একখানা কাপড় পরেছেন। সাহিত্যের নিজস্ব গতি এবং সামাজিক গতির সম্পর্ক সম্বন্ধে ধারণা এঁদের অস্পষ্ট।”৪৮
পরিবারের ভেতরে এবং বাইরে মানুষের অসংলগ্ন আচরণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতাও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। তাই ১৯৪৯ সালে তিনি নিজের বাড়ি বিক্রি করে ছেলেদের মধ্যে টাকা ভাগ করে দেন। বছরের শুরুতেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভাড়া বাড়ি খুঁজতে তৎপর হন। ১৮ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে অবশেষে বরানগরে বাড়ি খুঁজে পান।
বাড়ি বিক্রির আগে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দুই রুমের ভাড়া বাড়িতে ওঠেন এবং আমৃত্যু তিনি এ বাড়িতেই ছিলেন। তাঁর অন্য ভাইয়েরা নিজস্ব বাড়িতে ওঠেন। মানিকেরই শুধু বাড়ি ভাড়ার হাঙ্গামা। একটি লরিতেই তাঁর সমস্ত সংসার নিয়ে তিনি বরানগরের ভাড়া বাড়িতে উঠে যান। এমনকি মালের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও জায়গা হয়। তাঁর বৃদ্ধ পিতারও কোথাও ঠাঁই হয় না তিনি মানিকের সঙ্গেই থেকেছেন। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন:
“আমি না আনলে একা বস্তিতে অন্ধকার ঘর ভাড়া নিতে হবে। বাবা সব বিলিয়ে দিয়েছেন, আর টাকা নেই, সুতরাং খাতিরও নেই। আশ্বাস দিয়ে এলাম। আমার দুই খানা মাত্র ঘর, পার্টিশন করে নিতে হবে। এক ছেলে পঁচিশ শ টাকার বেশি মাইনে পায়, অন্য তিন ছেলের একজন রাঁচিতে অন্য ২ জন কলকাতায় বাড়ি করেছে তাঁর এই অবস্থা। স্বার্থপর সমাজে এটাই স্বাভাবিক ।”৪৯
বাড়ি বিক্রির কয়েক দিন আগে মানসিক ধাক্কায় তাঁর পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-ই ছিলেন তাঁর একমাত্র কাছের মানুষ। জ্যেষ্ঠ পুত্র সম্পর্কে তাঁর ক্ষোভ মানিকের কাছে বলে তিনি মনের ভার লাঘব করেন। এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“দাদা ছাত্র হোস্টেলে। মেদিনীপুর থেকে দেশে গিয়ে গোয়ালন্দে টিকিট টাকা সব চুরি-এক চেনা ভদ্রলোকের সাহায্যে কলকাতায় এসে পাপার হোস্টেলে। দাদা ছিল না-পরিচয় জেনে হোস্টেলের চাকর ঠাকুর বাবার অনিচ্ছা না মেনে স্নানাহার করাল। দাদা ফিরেই ‘আপনি কেমন লোক? খবর না দিয়ে এসে খেলেন-চাকর ঠাকুরের উপোস করতে হবে।’ ঘাটাল থেকে সকলের ম্যালেরিয়াগ্রস্ত হয়ে বিবাহিত দাদার বাড়ী কসবায় মার অবস্থা শোচনীয়। দাদা একটা ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা করায় না-
শেষে বৌদি বলে বলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। কেউ বাড়িতে এলেই দাদার মুখ গম্ভীর হয়ে যায় কারো সঙ্গে ভাল করে কথা কয় না। বাবা নাকি দাদার জন্য কিছু করে নি-স্কলারশিপের টাকায় পড়েছে। সেটা যেন সম্ভব নিজের চেষ্টায় বড় হলে কি বাপের উপর অভক্তি জাগে?”
২৬শে জানুয়ারি পিতার জ্বর কমলে স্বস্তি পেয়েছেন, তা লিখেছেন। এ বছরই জানুয়ারিতে ট্রামের প্রথম শ্রেণির ভাড়া এক পয়সা বাড়ে। যাত্রীরা এর কোনো প্রতিবাদ করে না। ভদ্রলোকরা মনে করে তাকে তো মাত্র একটি পয়সা দিতে হচ্ছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যাত্রীদের কোনো নীতি নেই, অন্যায় করে একটি পয়সা কেউ আদায় করলে সেটা সহ্য করাও যে অন্যায় এই বোধটিও কারো মধ্যে নেই।
অন্যায়ে মানুষের নির্লিপ্ততা তাঁকে পীড়া দেয়। তবে এর কয়েকদিন পরই রাজনৈতিক বন্দিমুক্তির দাবিতে এক দুর্বার ছাত্র আন্দোলন দেখা দেয়। কংগ্রেসী রাজ্য সরকার ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশ এবং পরে মিলিটারি নামায়। সরকারের এই বর্বরতা সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ডায়েরিতে পরপর কয়েকদিন লিখেছেন। এতে সরকারের প্রতি তাঁর ক্ষোভ ধরা পড়েছে
“কি বর্বরতা! কার আইনের মান রাখতে হত্যাকাণ্ড? একটি ১২ বছরের ছেলে- তাপস-গুলিতে মরেছে।
ছাত্ররা দৃঢ়-খালি হাতে গুলির বিরুদ্ধে লড়ছে। হাঙ্গামা আরও ছড়িয়েছে। আজ আরও ৫ জন নিহত বহু আহত। জনসাধারণ সরকারী বর্বরতায় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে। সরকার যে কতদূর জন-অপ্রিয় হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। … জনতার বিক্ষোভ পুলিশ দিয়ে ঠেকানো যায়? …..
আজ পুলিশের সাহায্যে মিলিটারী আমদানী। কলেজ ট্রিট দিয়ে যেতে শুধু পথে নয়- সিনেট হাউসে প্রেসিডেন্সী কলেজের ভেতরে সৈন্যের ঘাটি দেখে মনে হয় অদ্ভুত দৃশ্যই বটে। কলেজের হাতে বন্দুক তাক করে সৈন্য !
অন্যায়টা ছাত্রদের। আজ এতকাল ১৪৪ ধারা চাপানো হয়েছে, স্বভাবতই সেটা অসহ্য হবে। একটা শোভাযাত্রা করে ১৪৪ ভাঙ্গতে চাওয়ার জন্য কাঁদুনে গ্যাস লাঠি গুলি চালালে ছাত্ররা ক্ষেপবে না? নিরীহ প্রাণহীন সুবোধ বালক যদি ছাত্ররা হয়- দেশেরই সেটা চরম দুর্ভাগ্য। ৫১
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদকীয় হিসেবে প্রকাশিত হয় মানিকের প্রবন্ধ ‘মানবতার বিচার’। এই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:
“আমি সাহিত্যিক, ভাষার কারবারী; কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে এই মহানগরীর বুকে যে ভাবে ছাত্রদলন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে তার নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নেই। [… … …] স্বাধীনতার স্বাদ ইতিমধ্যেই তিতো হয়ে গিয়েছিল, আজ বিষাক্ত লাগছে। I… ….। ঘটনাস্থল কাকদ্বীপ নয়, বুখাখালি নয়। ঘটনাস্থল কলকাতার কলেজ স্কোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। দু’শ বৎসরের ইংরেজ রাজত্বে যেখানে যা ঘটেনি, দু’বৎসরেরর অহিংসার রাজত্বে সেখানেই তার প্রয়োজন হল আজ ছাত্র হত্যা।”৫২
এ বছরও মানিকের বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান অব্যাহত থাকে। ফেব্রুয়ারির শেষে কুচবিহারে সাংস্কৃতিক সম্মেলনে যোগ দেন, তাঁর সঙ্গে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন। কুচবিহার স্টেট এমপ্লয়িজ এসোসিয়েশন এই সম্মেলনের উদ্যোক্তা। তিনি এবারই প্রথম প্লেনে ওঠেন। অসুখের জন্য তিনি প্লেনে উঠতে ভয় পান। মানিকের সময় জীবন এই অসুখ তাড়া করেছে। প্লেনের বন্ধ জায়গায় কোনো সমস্যা হবে কিনা তা নিয়ে তিনি শঙ্কিত হন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর এই ভ্রমণ আনন্দদায়ক হয়েছে
“বাসেও এর চেয়ে বেশি ধাক্কা লাগে। প্লেন ওপরে উঠলে নীচে রেবার মত পথ, হককাটা আল্পনার মত মাঠক্ষেত।অপরূপ। কিন্তু এক রকম। কিছুক্ষণ পরেই একঘেয়ে।”৫৩
কুচবিহারেও অরাজকতা। রাজা-মন্ত্রীদের প্রতাপে সাধারণ মানুষ বিপর্যন্ত। শহরে কেউ ভালো সালান তুললেও নামমাত্র নামে রাজার কিনে নেওয়ার আইন আছে। এখানে রাজা স্বাধীন রাজ্য চায়, প্রজা চায় আসাম আর কংগ্রেস একে বাংলায় মেলাতে চায়। এরকম একটি পরিস্থিতিতে সকাল-বিকাল দুবেলা সভা করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতা ফিরলেন।
নতুন করে কলকাতা নগরীকে তাঁর ভালো লাগল। আবহাওয়ায় বসন্তের ছোঁয়াচে তাঁর শরীর ভালো লাগে, লেখার জন্যও একটি নতুন তাগিদ অনুভব করেন। তাঁর কাছে মনে হয় একেবারে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ই.ই. হলে সিটি কলেজ কমার্স ছাত্রদের নববর্ষে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। তিনি বক্তৃতায় বলেন শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে ধনতন্ত্রের অবসান ঘটে নতুন যুগের আবির্ভাবের কথা। জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে ওঠার কথা বলেন।

মানিকের বক্তৃতা ছেলেদের খুব ভালো লাগে। ২৪-২৬ নভেম্বর দেশপ্রিয় পার্কে সারা ভারত শাস্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সোভিয়েত প্রতিনিধিরা ভারতে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে ফিরে যান। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“একটি অল্প বয়সী গ্রাম্য চাষী বৌ মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে এমন চমৎকার বক্তৃতা করলেন-বিধা ভয়, সংকোচ নেই, স্পষ্ট সরল ভাষা, পরিষ্কার ধারণা। কি রেটে সব বদলে যাচ্ছে তিনি যেন তার জীবন্ত প্রতীক new মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন মেয়েরা বেশি নির্বাচিত, তাই তাদের জাগরণও বেশি ঘটছে।
২৭ তারিখে সাংস্কৃতিক সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ডিসেম্বরে রাজবন্দিদের মুক্তির জন্য আন্দোলন হয়। এ সম্পর্কে মানিকের নিজস্ব মতামত ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি মনে করেছেন আন্দোলন আরো জোড়ালো হওয়া উচিত ছিল। বিনা বিচারে মানুষকে আটকে রাখার স্বেচ্ছাচারিতা সহ্য করা যায় না। বক্সা ক্যাম্পে আটকদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে তিনি লেখেন ‘বক্সা ক্যাম্পে শিল্পী-সাহিত্যিক’।
“গণতন্ত্র এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা যে সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে তার তর্কাতীত প্রমাণ হলো প্রকাশ্য বিচার ছাড়াই মানুষকে বন্দি করার আইন। [… …] বাংলার একজন সাহিত্যিক হিসাবে আমি এই প্রশ্ন ও প্রতিকারের দাবি তুলছি সাধারণ আইনে প্রকাশ্য আদালতের বিচার যখন দেশের মানুষ আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত, তখন বিনা বিচারে আটক রাখার আইন কেন?
বিদেশী শাসকের নামে রাস্তার নাম পর্যন্ত যখন অপমানজনক বিবেচিত হচ্ছে, তখন জাতীয় অপমানের প্রতীক ইংরেজের তৈরি বক্সা ক্যাম্পে বন্দিদের আটক রাখার ব্যবস্থাই বা কেন? শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিবিদেরা যখন সম্পুর্ণরূপে গণমত ও গণবিচারের যারা নিয়ন্ত্রিত, গোপন কার্যকলাপের কিছুমাত্র সুযোগ সুবিধা যখন তাঁদের বিশেষ পেশায় নেই, এবং শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণটাই যখন নির্ভর করে শিল্পী সাহিত্যিক সংস্কৃতিবিদের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার উপর- তখন বাংলার প্রিয়তম শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীরা বক্সা ক্যাম্পে আটক কেন?
পারিবারিক জীবনে লেখকের দারিদ্রমোচন কখনোই হয় না, শুধু খরচ বেড়ে যায়। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দানের কারণে অনেক প্রকাশক তাঁর লেখা প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। তিনি প্রতিনিয়তই খরচ কমানোর চেষ্টা করেছেন। ১৯৪৯ এর ৩১ শে ডিসেম্বর তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন খরচ কমানোর কথা এবং ২/৩ দিনের মধ্যে তেজের সঙ্গে কাজ আরম্ভ করার কথা। কিন্তু ১৯৫০ এর ২রা জানুয়ারি থেকেই তাঁর স্ত্রী ডলির অসুস্থতা শুরু হয়।
অন্যদিকে ছেলেমেয়েরা দক্ষিণেশ্বর কল্পতরুর মেলায় যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। অতপর সন্তানের প্রতি কর্তব্য পালনের জন্য সকলকে নিয়ে মেলায় যান। সাংসারিক এতো অস্থিরতার মধ্যেও দেশের যে কোনো পরিস্থিতি তিনি হৃদয় দিয়েই উপলব্ধি করেন। বরানগর আলমবাজার শাস্তি সম্মেলন বানচালে ১৪৪ ধারা জারি হয়, ছাত্ররা প্রতিবাদ সভা করে। পুলিশ এসে তিনজনকে ধরে নিয়ে যায়। ৯ জানুয়ারি ডায়াগনোসিস করে ধরা পড়ে তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্তা । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“এত সাবধানতা সত্ত্বেও। স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবার সংসারের রান্নার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেন সব্যসাচী। একদিকে অর্থ উপার্জনের জন্য সাহিত্যকর্ম, সাহিত্যকর্মের জন্য তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, দেশের পরিস্থিতির প্রতি চিন্তাশীল আবার স্ত্রীর অসুস্থতায় সংসারের রান্নার দায়িত্ব, পিতার যত্ন। ১৫-২৫ জানুয়ারি তিনি লিখেছেন:
“এইভাবেই চলছে। ডলির বিছানা ছাড়া ডাক্তারের নিষেধ-pelvic রহস্রষধসসধঃরড়হ-সব আমি করছি একা। বাবার বিশেষ রান্নাবান্না সেবাযত্নের এতটুকু ত্রুটি নেই। না করলে চলবে কেন? দায়িত্ব নিয়ে তা পালন করা চাই। ২৬শে ভারত রিপাব্লিক হবে। কনস্টিটিউশন শ্রমিক বিরোধী। ২৬শে ছুটি। ২৫শে ধর্মঘট ২৬শে প্রতিবাদ। কোনটাই ভাল হল না। কি করে হবে? আসলটাই এসেও আসছে না। ধরেও ধরছে না! ৫৭
যে সম্প্রদায়ের কারণে দেশ বিভাগ হলো, সেই দাঙ্গার অবসান ঘটে না। বিভিন্ন অঞ্চলে কারফিউ চলে। দোকান লুট হয়, ভারতের বুকে ধর্ম অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় চিন্তা করেন শ্রমিক রাষ্ট্র ছাড়া সমস্যার মীমাংসা নেই। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন জেলে বন্দি নিহত হয়। বিভিন্ন জায়গায় হাঙ্গামা, খুন-জখম-লুটপাট নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
ফেব্রুয়ারিতে ‘বানীপীঠ’ পাঠাগারের বার্ষিক উৎসবে লেখক স্বর্ণকমল এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মোটরে করে নিয়ে যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পাঠাগার চালানো, সংস্কার, শিক্ষা প্রভৃতির ওপর কড়া সমালোচনা করে বক্তৃতা দেন। এ মাসেই তাঁর শরীর বেশি খারাপ হতে থাকে। আবার চার সন্তানেরই জ্বর এবং হাম হয়। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করে স্বস্তিবোধ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি অসুখী নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল যে বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করছি বাড়ী ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনি বিদায় গেছে বাবা, আমি হিসেব করছি বাড়া ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাধুনি বিদায় দেব! অনেক খরচ বাঁচবে। মানুষ সন্তানকে ভয় করছে? দশমাস গর্ভ ধারণ করে মৃত সন্তান প্রসব করে যা ভাবছে, বাঁচা গেল? অভিশপ্ত সমাজ এমনি অস্বাভাবিক করেছে জীবন। মানুষের বাঁচাই দায়-সন্তানের হাঙ্গামা কে চায়। সন্তান হাঙ্গামা কেন? কোটি সন্তান সানন্দে পালন করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে কয়েকটি মানুষ পরদেশভোজী রাক্ষস সাম্রাজ্যবাদীরা । ৫৮
দারিদ্র্যের যন্ত্রণায় তিনি এমন-ই দক্ষ ছিলেন যে শেষ জীবনে দেবীপদ ভট্টাচার্যকে বলেছিলেন: “দেখো, দুটি ডালভাতের সংস্থান না রেখে বাঙলা দেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।
নরেন্দ্রনাথ মিত্র একবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে তাঁর সংসারের শ্রীহীনতা দেখে শিউরে উঠেছিলেন। তিনি বলেছেন:
“L… […] এ কি ঘরদোর, আসাবপত্রের এ কি ছন্নছাড়া চেহারা! সত্তা একজোড়া টেবিল চেয়ার। একপাশে আচ্ছাদনহীন একখানা তক্তপোষ। দেয়ালে ঠেস দেওয়া কাঁচভাঙ্গা আলমারিতে এলোমেলোভাবে রাখা একরাশ বই। বেশির ভাগই ছেঁড়াখোড়া পুরোন মাসিকপত্র। বইপত্রে পাণ্ডুলিপির এলোমেলো পাতায় অগোছালো অপরিচ্ছন্ন টেবিল। তক্তপোষের ওপর পাণ্ডুলিপির খানিকটা অংশ পড়ে আছে। আমি বিস্মিত হলাম। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাবুর ঘরের এই চেহারাই যেন সবচেয়ে মানানসই। এ যেন বাইরের ঘর নয়, স্রষ্টার মনের অন্দরমহল। সেখানে ঝড়-ঝঞ্জা বৃষ্টি-বিদ্যুতের বিরাম নেই।
বঙ্গবাসী কলেজের গিরিশ মেমোরিয়াল হলে সাহিত্যসেবক সমিতির ৩৮তম বার্ষিকী সভার সভাপতি হিসেবে যোগ দেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। আগুতোষ কলেজে জনরক্ষা সভায় তাঁকে নিমন্ত্রণ করে, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি যেতে পারেন না। ৭ আগস্ট রবীন্দ্রতিরোভাব সভা, তিনি সভায় যাওয়ার জন্য বেড়িয়ে আবার ফিরে আসেন ভাগ্নীর বিয়েতে। ১৩ আগস্ট কয়েকটি ছোট ছোট সংঘ, সমিতি, ক্লাব মিলে রবীন্দ্র স্মৃতি সভা করে, এখানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতিত্ব করেন।
বক্তৃতায় তিনি কাব্য সাহিত্যের প্রাণস্পন্দনের কথা বলেন। ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস। এই দিনে তিনি লিখেছেন রাক ফ্লাগ ওড়ানোর কথা। কারণ উদ্বাস্তুরা স্বাধীনতা পায় নি, তাছাড়া সাধারণ মানুষ যে স্বাধীনতা চেয়েছিল, তা-ও আসে নি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একে স্বাধীনতার মৃত্যুদিবস বলেছেন। বিকালে সাউথ সিঁথির মহাজাতি মিলন সঙ্ঘের বিতর্ক সভায় যান।
বিতর্কের বিষয় ছিল- ভারত বিভাগ মেনে কংগ্রেস রাজনৈতিক দূরদর্শিকার পরিচয় দিয়েছিল। বিপক্ষ দলের প্রতিযোগীদের মধ্যে একটি মেয়ে ছিল, শুধু সেই ইতিহাসের কথা বলে। সে বুঝিয়ে দেয় ইংরেজ কেন ও কিভাবে সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করেছিল, কেন ভারত বিভাগ দরকার হলো। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কাপ’টা তাকেই দেন। এবং সভায় বুঝিয়ে বলেন কেন মেয়েটিকে কাপটি দেওয়া হলো।
সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন প্রাণবস্তু, তেমনি তাঁর পরিবারেও। ১৬ই অক্টোবর সার্ব্বজনী দুর্গোৎসবের ষষ্ঠীতে মণ্ডপের উদ্বোধন সভায় বক্তৃতা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করেন, ১৭ই অক্টোবর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ঠাকুর দেখতে বের হন। আবার তাঁর শ্যালকের বাড়ি সকলে নিমন্ত্রণে গেলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অসুস্থ কন্যা শিপ্রাকে বাড়িতে বসে পাহারা দেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদাই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। নিশীথ বাবু নরেন্দ্রনাথ মিত্রকে বলেছেন:
“তিনি একেবারে সাধারণ মানুষের মতো সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকেন। তাঁর কাছে গিয়ে আবদার উৎপাত করতে কখনো আমাদের সঙ্কোচ হয় না। ৬১

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমশঃই অসুস্থ হয়ে পরেন, কিন্তু অর্থ উপার্জন তাকেই করতে হয় আর তার একমাত্র উপায় সাহিত্য রচনা। তিনি কখনোই হতাশ হন নি। ৮ আগস্ট ১৯৫১ তে লিখেছেন:
“শরীর খারাপ, টাকা নেই-খরচ কমে না। তবু কি অমানুষিক খেটে কতভাবে ব্যবস্থা করে যে সামলে উঠেছি তা কেবল আমিই জানি। [… […] এই শরীর নিয়ে যত কাজ করলাম তা শুধু মনের জোরে, মনের জোর আছে। [… … …] শরীরের জন্য। সবদিকের পীড়ন সইছে না। আবার বেশী খাটার সরকার হওয়ায় শরীরটাও সারছে না। চক্র। এ চক্র ভাঙতেই হবে।
এ বছর মানিকের চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়- পেশা, স্বাধীনতার স্বাদ, সোনার চেয়ে দামী এবং ছন্দপতন। প্রকাশকরাও লেখকদের ঠকায়। বসুমতি ২৫০০ কপির চুক্তি করে ৩৩৬৬ কপি ছাপায়, হিসেবের ফাঁকে আরো অনেক কপি রয়ে গেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পরে জানতে পারেন তিনি আরো ১০০০ কপি বইয়ের রয়্যালটি পাবেন। তিনি যদি না জানতেন তা হলে প্রকাশক এ টাকা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেছেন এদেশে লেখকদের এমনই অবস্থা। দারিদ্র্য থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি ১৯৫২ সালে মে জুন জুলাই তিন মাসের একটি প্ল্যান তৈরি করেন। এর উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি হলো:-
“কঠোর চেষ্টার যারা এই তিন মাস বর্তমান অবস্থা অনেকটা বদলাইয়া না দিলে সৰ্ব্বনাশ ঠেকানো যাইবে না । । … …. সমস্ত খরচ ও ঋণ মিটাইয়া ব্যাঙ্কে অন্ততঃ পাঁচশত টাকা সঞ্চয় করা। [… …] বাবুর (লেখক নিজেকেই বাবু বলেছেন) স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং লেখা ছাড়া অন্যভাবে রোজগারের চেষ্টা করার সময় ও সুযোগ পাওয়া। [… …] সি ও ডি কে সম্পূর্ণ কন্ট্রোলে আনা এবং সিগারেট খরচ কমাইয়া দেওয়া। […] […] যাহা না হইলে কোনমতেই চলে না কেবল সেজন্য ছাড়া সমস্ত খরচ বন্ধ ।[…] […] ৬৩
অক্টোবর মাসে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। তিনি ভিন্ন থাকা এবং খাওয়ার চিন্তা করেন। তবে ২/৩ দিনের মধ্যেই এ কলহ মিটে যায়। এরপর ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ মেলে। স্ত্রীর বুড়ো আঙ্গুল কেটে গেলে তিনি ডাক্তার আনেন, সারা রাত সেঁক দেন, চা বানিয়ে দেন। সংসারের টানাপোড়েন, অসুস্থতা, দেশের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা সকল কিছুর মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে মুক্ত রেখেছেন গান গেয়ে, বাঁশি বাঁজিয়ে। ১৯৫৩ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি তিনি লিখেছেন গানের কথা। এর আগে ১৯৫০ সালের ২০শে জুন তারিখে লিখেছেন:
“বাঁশী বাজালাম। নিজে মুগ্ধ হয়ে নিজের বাঁশীর সুরে। ১৯৫৩ সালে তিনি আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মার্চের ৫ তারিখে কমরেড স্তালিন মারা যান। ৬ তারিখ বিকেলে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে সভা হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বদাই ব্যস্ত। তবে এর মধ্যে অনেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঈর্ষা করে বিভিন্নভাবে ছোট করার চেষ্টা করে। ১৬ই মে ডায়েরিতে লিখেছেনঃ
“কাশীপুর গণনাট্যসংঘ শান্তি, সংস্কৃতি, কিচলু সম্বর্ধনা- আমি সভাপতি- ছাপা হ্যাণ্ডবিল স্বাধীনতার সকলের নাম- আমায় বাদ দিয়ে! ইচ্ছাকৃত? মানে কি?
পাড়ার দোকানাররাও তাঁকে বাকিতে সওদা দেয় না। পুরানো টাকা পরিশোধ করে তিনি ভিম নিয়ে আসেন। তাঁর স্ত্রীর গহনা পর্যন্ত তাঁকে বাঁধা রাখতে হয়। ডিসেম্বর মাসে তিনি দামোদর ভ্যালী পরিদর্শনের সরকারি নিমন্ত্রণ পান। সেখানে যাওয়ার জন্য তাঁর কাপড় নেই, গরম জামা নেই, জুতা নেই।
সবকিছু তুচ্ছ জ্ঞান করে তিনি অবশেষে ১লা জানুয়ারি ১৯৫৪ তে রওনা হন। হাওড়া স্টেশনে গিয়ে দেখেন সেখানে অনেক অনিয়ম। গাড়ি আসে নি, দুর্ঘটনা ঘটেছে। ট্রেন কখন আসবে কেউ জানে না। এই অব্যবস্থার বিরক্ত হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। এ সম্পর্কে বিমল মিত্র লিখেছেন:
“হঠাৎ অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এত অব্যবস্থা, এত অনাচার, এত অনিয়ম, এত বেহিসেব। দেশের কোথাও কি সুস্থতা, কোথাও কি শৃঙ্খলা থাকতে নেই। সারাজীবন ধরে এক সুস্থ, সুশৃঙ্খল, সুখী সমাজের বাস্তবরূপ দেখতে চেয়েছেন। ….. ….] মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় গট গট করে আবার ফিরলেন। আবার সেই প্লাটফরম হয়ে চলতে লাগলেন উল্টোদিকে, যে দিক দিয়ে এসেছিলেন। [… […] এক হাতে রঙচটা ভারী টিনের সুটকেস, আর এক হাতে লেপ-তোষক, নারকেল দড়ি দিয়ে জম্পেশ
করে বান্ডিল বাঁধা। বোঝার ভাড়ে নড়তে পারছেন না। তবু আপ্রাণ শক্তিতে আবার ফিরে চলেছেন। তাঁর চেহারার দিকে চেয়ে দেখলাম-অব্যবস্থার চাপে তিনি যেন হাপিয়ে উঠেছেন। ৮
১৯৫৪ সালেও তাঁর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হয় না, বরং তাঁর চিন্তায় আসে শুদ্ধতা ও অসংলগ্নতা। ১লা জানুয়ারিতে তাঁর ডায়েরিতে প্রথম পাওয়া যায় এক অলৌকিক কথা “মা বোধ হয় ভালোই করলেন।
এরপর থেকে প্রায়শই তিনি মায়ের দয়া, মার কাছে ক্ষমা চাওয়া, মাকে খুশি করা, ভক্তি করা ইত্যাদি কথাগুলি ব্যবহার করেন। একটি সংস্কার বোধ হয় তাঁর মধ্যে ভর করে। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন:
“কোন প্রতীক অবলম্বন না করলে প্রণামের সময় মন বিক্ষিপ্ত হয় কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে প্রতীক প্রতীক মা কে বা কেমন জানি না। মাকে নিয়ে বা মা-র দয়া নিয়ে ন্যাকামি করলে নিজের সঙ্গেই ন্যাকামী করা হবে।”
শরীর সুস্থ রাখার জন্য তিনি মদ এবং সিগারেট কমানোর চেষ্টা করেন। মানিকের অসুস্থতার সংবাদে সাহিত্যিক মহলের অনেকেই চিন্তিত হয়ে পরেন। অতুলচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের বাড়িতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের এক আলোচনা সভা হয়। ওই সভায় সজনীকান্ত দাস, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
মানিকের আর্থিক সাহায্যের যে খুব প্রয়োজন এ কথা সকলেই উপলব্ধি করেন এবং প্রত্যেকেই সভাস্থলে কিছু কিছু সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। ওই দিনই প্রায় আটশ টাকা ওঠে। পরবর্তীতে অতুলগুপ্ত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের চেষ্টায় সরকার পক্ষ থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাসিক একশ টাকা করে পেনশন ভাতা মঞ্জুর করা হয় এবং তাঁর চিকিৎসার জন্য এককালীন বারশ টাকা দেয়।
চিকিৎসার জন্য সকলে তাঁকে হাসপালে নেওয়ার কথা বলে, কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজি হন না। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এ ব্যাপারে অনেক ঝগড়া হয়। তিনি হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ অতুলচন্দ্র গুপ্তকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি নিজের মতের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেন:
“আপনাদের ভালবাসার পরিচয় পেয়ে আমি বিচলিত অভিভূত হয়ে পড়েছি। প্রীতি ও বন্ধুত্ব পেয়েছি অনেক কিন্তু আপনারা সকলে যে আমায় এত ভালোবাসেন, আমার জীবনের দাম যে এত বেশী মনে করেন, এ ধারণা ছিল না। আমি কেন হাসপাতালে যেতে অস্বীকার করছি সে সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট কৈফিয়ৎ দেওয়া দরকার।
জানি না আমার বক্তব্য আপনাদের গ্রহণযোগ্য হবে কি না। আমার সুনিশ্চিত বিশ্বাস যে নিজেকে রোগী মনে করলে এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলে আমার সর্বনাশ হবে- আমাকে মৃত্যু বরণ করতে হবে। আমার কোন রোগ নেই, আমি সুস্থ সবল সক্রিয় মানুষ- এ বিশ্বাস আঁকড়ে থাকা ছাড়া আমার কোন গতি নেই। … ..] দীর্ঘকাল চিকিৎসা চালিয়ে অকর্মণ্য মরণাপন্ন হয়ে আমি তখন সিদ্ধান্ত নিই য়ে নিজেকে আর রোগী ভাবব না।
কোন ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়েই আমি একটা পেটেন্ট ওষুধ এবং সেই সঙ্গে এত বছর ঝিমিয়ে দেওয়া ওষুধ খাওয়ার প্রতিষেধক হিসাবে বিপরীত জিনিস অ্যালকোহল সুরু করি। …… …] অ্যালকোহল বেড়ে যাবার পর এর বিপদটা টের পেয়ে আমি যে গত কয়েক বছর ডাক্তারের সাহায্য গ্রহণ করেছি, তার প্রমাণ আছে।
[… …] আজ এখন ওষুধ খেয়ে ঘুমালে কাল হাঁড়ি চড়বে না-খানিকটা অ্যালকোহল গিললে কিছুক্ষণের জন্য তাজা হয়ে হাতের কাজটা শেষ করতে পারব। এ অবস্থায় অ্যালকোহলের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় কি? ….. …] দয়া করে আমায় রোগী বানাবেন না, জোর করে হাসপাতালে টানবেন না। খাটুনি এবং চিন্তাভাবনার হাত থেকে রেহাই পেলে বাড়ীতে থেকেই আমি অ্যালকোহলকে কিছুদিনের মধ্যে বশে আনতে পারব। ৬৯
তারপর ২৪শে ফেব্রুয়ারি তাঁকে জোড় করে ইসলামিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে পুষ্টিকর খাবার, ওষুধ আর পরিমিত মদ তাঁকে আস্তে আস্তে সুস্থ করে তোলে। কিন্তু শিঘ্রই হাসপাতাল ছাড়তে সকলে নিষেধ করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হাসপাতালকে সেমিজেল বলে অভিহিত করেন। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরাও তাঁর ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি
রাখেন, মুজাফফর আহমদও তাঁকে হাসপাতাল ছাড়তে নিষেধ করেন।

হাসপাতালে মানিকের তৃপ্তিভরে খাওয়া দেখে আন্দাজ করা যায় তাঁর ভয়াবহ দারিদ্র্যের কথা। হাসপাতালে বাড়ির চেয়ে চার পাঁচগুণ ভাত, তরকারি, দুধ, মিষ্টি, ফল তিনি খেতে পারতেন। চাঁদা তুলে মানিকের চিকিৎসা হচ্ছে খবরের কাগজে পড়ে তাঁর ছোট ভাই গুপু বাড়িতে গিয়ে কথা শোনায় লজ্জায় তাঁদের মাথা কাটা যাচ্ছে। তবে কোনো ভাই তাঁকে দেখতে হাসপাতালে আসে নি। যদিও আত্মীয়, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী সকলেই তাঁকে দেখতে এসেছে। ২২শে মার্চ তাঁর মেজদা ৫০ টাকা মনিঅর্ডার পাঠায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“তবু যা হোক এক ভাই-এর কাছ থেকে সাড়া পেলাম।
২৭শে মার্চ তিনি বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু এসেই আরেক দুর্ঘটনা। জ্যেষ্ঠ কন্যা টুটু স্কুলে দুর্ঘটনায় পা ভেঙেছে, হাসপাতালে আছে। হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্লাস্টার করা হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবার সন্তানের জন্য হাসপাতালে দৌড়াতে শুরু করলেন। ২রা এপ্রিল টুটু বাড়ি আসে। এতো সমস্যায়ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে চলেছেন তাঁর লেখনি। মানিক এবং টুটু দুজনকেই আবার হাসপাতালে যেতে হয়। অক্টোবরের ২১ তারিখে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি ফেরেন। টুটু প্রায় এক বছর হাসপাতালে থাকে।
এ বছর তাঁর বৃদ্ধ পিতাও অসুস্থ হন এবং তাঁর ডাক্তারি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ১৯৫৬ সালে মানিকের বাড়িওয়ালা তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে দেওয়ার জন্য মামলা করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও উকিল ধরে মামলা চালাতে থাকেন। এ কারণে তাঁকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় এবং অর্থদণ্ড দিতে হয়। মামলার ব্যাপারে দেবী প্রসাদ ও সুভাষ সাহায্য করেন। জুলাই মাসে তাঁর শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়ে। ৩১শে জুলাই ডায়েরিতে লিখেছেন:
“ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ কী যে দুর্ব্বল বলা যায় না- বিছানা থেকে উঠবারও যেন শক্তি নেই- এ দিকে ঘরে পয়সা নেই-জোর করে তো বেরোলাম ফিরব কি না। না জেনে। ১
এরপর বাড়িতেই তিনি খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হন। বেঁচে থাকার দুর্নিবার আকাঙ্খা নিয়ে তিনি সিগারেট-মদ কমানো এবং ভালো খাওয়া-দাওয়া শুরু করেন। ২৯ শে নভেম্বর ডায়েরিতে তিনি কিছু হিসাব লিখেছেন। এই তাঁর শেষ লেখা। এর আগে ২৪শে নভেম্বর তিনি লিখেছিলেন:
“শূন্য টাকা সম্বল করে বেরোলাম। উল্টোরথে “প্রাপেশ্বর” বাবদ ৬৫ টাকা (আগে ৩৫ টাকা) পেয়েছি । ৭২
এই বাক্যের মধ্য দিয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর দারিদ্র্য জীবন এবং উপার্যন ক্ষমতা দুই-ই প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর তাঁর স্বনির্বাচিত গল্প এবং দুখানি উপন্যাস ‘হলুদ নদী সবুজবন’ এবং ‘মাশুল’ প্রকাশিত হয়। ৩০শে নভেম্বর তিনি প্রচণ্ডভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অজ্ঞান হয়ে যান। ২রা ডিসেম্বর বিকেল থেকে অচৈতন্য থাকেন।
সন্ধ্যার সময় খবর পেয়ে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, স্বাধীনতার মনি ভট্টাচার্য, পাড়ার দুটি ছেলেসহ বাইরের মাত্র সাতজন মানুষ তাঁকে বাড়ি থেকে মিউনিসিপ্যালিটির ভাঙা অ্যাম্বুলেন্সে করে নীলরতন সরকার হাসপাতালে নিয়ে যান। অর্থাভাবে ভালো গাড়ি আর মুরুব্বির অভাবে বড় হাসপাতালের ব্যবস্থা করা যায় নি। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন:
“হাতটা আর নাড়াচ্ছেন না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত নিশ্চল হয়ে গেছে। …….. ….. মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় অস্ফুট আর্তনাদ করছেন। …. […] কান পেতে শুনলাম নাঃ, নাঃ। …. ……… কিন্তু হাসপতালে পৌছাবার আগে আরও কয়েকবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একইভাবে বলেছেন- নাঃ, নাঃ। … …] ইমার্জেন্সির টেবিলে পরীক্ষার পর যখন স্ট্রেচারে করে তাঁকে উদ্ভবার্নে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা চোখের কোণ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল।
[………… পালসুদ্ধ ধরাধরি করে যখন ট্রাকে তোলা হয়, তখন একটা চোখ খোলা, একটা বন্ধ। ঠোঁটের এক পাশ একটু যেন চাপা। [… …..] আজকে ঝাঁকুনি লাগলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু লাগবে না। ট্রাকটা বড়, বড় আর পোক্ত। মধ্যিখানে সুদৃশ্য পালঙ্কের ওপর সেই মৃতদেহ। মাথা এবং পায়ের কাছে দেশনেতা, সাহিত্যিক। সামনে, পেছনে, দু’পাশে বহু মানুষ। সর্বস্তরের মানুষ। মোড়ে মোড়ে ভিড়। সিটি কলেজের সামনে মাথার অরণ্য। কিন্তু কাল কেউ ছিল না, কিছু ছিল না। [… …] মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একটা চোখ মেলে তাকিয়ে যেন সব কিছুই দেখছেন। ……… ….. দেখা আর প্রকাশ-মৃত্যুর পরও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁড়ুয্যের চরিত্র পাল্টায়নি।”৭৩
শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং সংগ্রামশীল জীবনযাপন করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। শৈশব-কৈশোরে তিনি যেমন দুরস্ত ছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেমনি তিনি সাহসী, সংগ্রামী এবং একনিষ্ঠপ হয়ে ওঠেন। তাঁর কঠোর ব্যক্তিত্ব এবং প্রবল জীবনমুখীতা তাঁকে বলিষ্ঠ সাহিত্যিক হতে সাহায্য করে।