আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবন ও সাহিত্য। যা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঁচটি উপন্যাসে জীবন ও সমাজ এর অন্তর্ভুক্ত।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবন ও সাহিত্য
মানুষ কে, কোথায় যাবে, কী তাঁর উদ্দেশ্য, কেন বেঁচে থাকা, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও কেন জীবনের পেছনে ছোটা, কিংবা সে কী চায়, কেন চায়, আবার যা পায় তা কেন সুখকর হয় না, সুখ কী- এমনি হাজারো প্রশ্ন চিন্তাশীল মানুষকে তাড়িত করে। শুধু তাড়িতই করে না, কখনো মানুষের মাথায় এসে ভর করে মিয়োসিস প্রক্রিয়ায় বিভক্তির মতো খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় এবং তার মানসচেতনা হয়ে ওঠে জটিল। এই অনুভূতিই উঠে আসে সাহিত্যে তাই
“সাহিত্যে রসসর্বস্বতা, জীবনসর্বস্বতা, সমাজসর্বস্বতা, রাষ্ট্রসর্বস্বতা বা প্রয়োজনসর্বস্বতা বলে কিছুই নেই- যা আছে তা অনুভূতি ও উপলব্ধির সর্বস্বতা। ” এই অনুভূতি ও উপলব্ধি ব্যাপকভাবে, বিপুলভাবে দেখা যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায়। এ সম্পর্কে তিনি নিজে বলেছেন।
“জীবনকে আমি যে ভাবে ও যতভাবে উপলব্ধি করেছি অন্যকে তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ ভাগ দেওয়ার তাগিদে লিখি। আমি যা জেনেছি এ জগতে কেউ তা আনে না ( পড়ে পাতা নড়ে জানা নয়)। কিন্তু সকলের সঙ্গে আমার জানার এক শব্দার্থক ব্যাপক সমভিত্তি আছে। তাকে আশ্রয় করে আমার খানিকটা উপলব্ধি অন্যকে দান করি। দান করি বলা ঠিক নয় পাইয়ে দেই। তাকে উপলব্ধি করাই। আমার লেখাকে আশ্রয় করে সে কতকগুলো মানসিক অভিজ্ঞতা লাভ করে- আমি লিখে পাইয়ে না দিলে বেচারী যা কোনদিন পেতো না।

এই যে নিজেকে পাওয়া, এই পাওয়া না হলে লেখা ‘সাহিত্য’ হয় না। যে লেখায় নিজেকে দেখা যায়, চারপাশের আবহ দেখা যায়, জীবনকে উপলব্ধি করা যায়, সেই লেখা প্রত্যেকের কাছে সাহিত্যিকমান সম্পন্ন। মানুষ যেখানে নিজেকে দর্শন করতে পারে, সেখানেই তার আগ্রহ, আবেগ, আকুতি।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ তাদের আপন আপন ক্ষেত্রে এবং আপন আপন স্বকীয়তায় নিজেকে চিনতে জানতে অনুভবকে শাণিত করতে মানিকের লেখার দারস্থ হয়। জীবন চেতনাকে অবলম্বন করেই সৃজনশীলতার প্রকাশ, শিল্পের উদ্ভব। জীবনের তুচ্ছ এবং খণ্ড সময়ও ফেলনা নয়। একটি ছোট সময় একটি জীবনের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, আবার হতে পারে অসহনীয়, মানুষের মনের হঠাৎ চাওয়া কোনো আকুতি একটি জীবনকে দিতে পারে প্রশান্তি, আবার ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়।
অসতর্ক কোনো চিন্তা জীবনের ক্ষেত্র পরিবর্তন করতে পারে, একটি ছোট সুখ চাইতে গিয়ে কেউ প্রচণ্ড দুঃখের দহনে বীভৎস আত্মাহুতি দেয়। মানবজীবনের এই সুখ দিকে মানিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়েছেন এবং রচনা করেছেন তাঁর বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে একজন সমালোচক মন্তব্য করেছেন:
“মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দুঃখী আর সাহসী লেখক যিনি জীবনকে বাস্তবভূমিতে দেখেছেন, বাস্তবের গভীরে ঝাঁপ দিয়ে জীবনের জটিলতাকে ধরতে চেয়েছেন। অভ্যস্ত জীবনযাত্রার শৃঙ্খলের মধ্যে নয়, দুর্দমনীয় জীবন-প্রবাহের মধ্যে তিনি জীবনের রহস্য সন্ধান করেছেন, যেখানে মানুষ জীবন প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে পুরনো বিশ্বাস ও আশ্রয়কে ফেলে যায়। তিনি দুঃসাহসী লেখক, জীবনের জটিলতা ও গভীরতা অন্বেষণে সদাতৎপর। আর সে কারণেই আপাত- সিদ্ধিকে পিছনে ফেলে সত্যকে জানার ব্যাকুলতায় এগিয়ে চলেন, উপন্যাসের প্রসঙ্গ ও পদ্ধতি নিয়ে বারবার দুঃসাহসিক পরীক্ষা করেন।
বাস্তবজীবনকে তার পরিবেশ সমেত তুলে ধরতে চেয়েছেন বলেই রোমান্টিকতা পরিত্যাগ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বস্তুবাদকে, বিজ্ঞানদৃষ্টিকে, মানবজীবনে আর্থনীতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়াকে – মার্কসবাদকে গ্রহণ করেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিজীবনে বিজ্ঞানকে সন্তানসম আসরে লালন করেছেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে, ছক কেটে, পরিকল্পনা করে শুরু হয়েছে। কিন্তু সাহিত্য তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়। তিনি কোনো রকম পরিকল্পনা ছাড়াই সাহিত্যজীবন শুরু করেন। বিরামহীন সাহিত্যচর্চা তাঁকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। তারপর ডাক্তারের পরামর্শে বিয়ে করে তিনি সংসারজীবন শুরু করেন।
তাঁর জীবন যেমন বৈচিত্র্যময়, সাহিত্যও তেমনি বৈচিত্র্যময়। তিনি নিজেকে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। এবং লেখা শুরু করার তিন-চার বছরের মধ্যেই তাঁর সে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তিনি তাঁর বড়দার কাছে লেখা চিঠিতে লিখেছেন।
“তিন চার বৎসরের মধ্যে বাঙ্গালা সাহিত্যের অধিকাংশ সমালোচক স্বীকার করিয়াছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরবর্তী যুগে আমি সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ লেখক।
তিনি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ারও পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর ভাগ্য প্রসন্ন ছিল না। বিজ্ঞানপ্রেমিক মানিককে দুরারোগ্য ব্যাধি বিপর্যস্ত করে দেয়। তবে তিনি লেখাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এবং আমৃত্যু তাঁর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন ছিল সাহিত্য রচনা।