সমাগম উপন্যাস । বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়: সমাগম উপন্যাস । এটি বাংলাদেশের উপন্যাসের শৈলীবিচার এর রূপক প্রতীকী শিল্পশৈলীর উপন্যাস এর অন্তর্গত।

 

সমাগম উপন্যাস

 

সমাগম উপন্যাস

‘সমাগম’ (১৯৬৭) শওকত ওসমানের (১৯১৭-১৯৮৯) নিরীক্ষামূলক শিল্প অভিপ্রায়ের অপূর্ব উপন্যাস। ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে রচিত তাঁর নিজস্ব চিন্তা ও মতাদর্শকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কয়েকজন বিশিষ্ট অথচ ব্যক্তির আত্মার সম্মিলনে প্রকাশ করেছেন। বৈরী সমাজ ও বিরুদ্ধ রাষ্ট্রের সময়-সংকটে যখন অনেক কিছুই মেনে নেয়া যায় না অথচ প্রতিবাদ করাও সম্ভব নয়, তখন সচেতন শিল্প-বিবেক কখনো কখনো নিরীক্ষাময় ফ্যান্টাসির আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ক্যান্টাসি, অবাধ কল্পনারই ফসল।

বাস্তবে যা করা সম্ভব নয়, ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে অবাধ কল্পনার সাহায্যে সে অপূর্ন ইচ্ছার প্রকাশ করা সহজ। বিভাগ (১৯৪৭) উত্তর বাংলাদেশে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর সামরিক ও স্বৈরাচারী মনেবৃত্তির প্রেক্ষাপটে শওকত ওসমান সমাগম’ এর মত ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে নিজের অপূর্ণ ইচ্ছা ও বিবেকী বক্তব্যকে প্রকাশ করেছেন। ফ্যান্টাসির আপ্রয়ে, রূপক-প্রতীকের সংকেতে বক্তব্য প্রকাশের কৌশল হিসেবে এশিল্পাঙ্গিক খুবই প্রাসঙ্গিক।

শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি’ ও ‘রাজা উপাখ্যান’-এর চেয়ে ‘সমাগম এর পটভূমি আরো বিস্তৃত। সম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বশান্তি ও মানবিক প্রত্যয়ে সার্বজনীন কল্যাণকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন তিনি সমাগম উপন্যাসে। উপন্যাসের কল্পকাহিনী খুবই কৌতূহল উদ্দীপক । ঢাকার একটি দৈনিক পত্রিকার অনুবাদক জুহার গৃহতত্য আলী বাগানে কাজ করতে গিয়ে একটি হলদে তুলট কাগজে লেখা পত্র পায়। মধ্যযুগীয় বাংলা হরফে লেখা চিঠির পাঠোক্ষর করে জুহা জানতে পাবেন, সহস্র মঘী সহ রোজ রবিবার।

অর্থাৎ পরবর্তী মহাকবি আলাওল তাঁর বাড়িতে বেড়াতে আসবেন। আনন্দিত জুহা এই উপলক্ষে নিজ আগ্রহে মাইকেল মধুসুদন দত্তও রমা বর্ণা, পুত্র ফুয়ার আগ্রহে জর্জ বার্নাড’শ দ্বিতীয় পুত্রের আগ্রহে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বন্ধু প্রাণশশীর আগ্রহে হাজী মুহাম্মদ মহসীনকে আমন্ত্রণ জানান। আলাওলের চিঠির সূত্রে এভাবে বিশ্বের এ বিশিষ্ট মনীষীদের কল্পিত সমাগম ঘটে জুহার গৃহে।

নিমন্ত্রিত প্রত্যেক মনীষীই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে বন্ধু সমাগমে একত্রে আনন্দে, হাসিতে, আড্ডায়, সমকালীন বিশ্বের নানা সংকট ও সমস্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হন এবং সমাধানের পথ বোজেন। বস্তুত, এই সম্মিলনে আগত সকল মনীষীই অভিন্নভাবে সম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ ও নিপীড়নের বিরোধী। তাঁরা সকলেই বিশ্বশান্তি ও সার্বজনীন মানবিক কল্যাণের অতন্ত্র সৈনিক।

 

সমাগম উপন্যাস

 

জুহার গৃহে তাঁদের এ সমাবেশকে বলা যায় এ যেন এক আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন। জুহার বন্ধু সৈয়দ বোকজার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মানুষের বিশ্বভ্রাতৃত্ব অক্ষয় হোক।’ বানড শ বলেন- ‘ধ্বংস হোক, সাম্রাজ্যবাদীগণ ও তাদের অনুচরেরা ধ্বংস হোক।’ রবীন্দ্রনাথ সুললিত কণ্ঠে বলেন- ‘সুখীতের’ আরো সমৃদ্ধতর হোক আগামীদিনের পৃথিবী।’ এভাবে শওকত ওসমান সমাগম উপন্যাসে সূক্ষ্ণ ও গভীরতর মানবিক প্রত্যয়কে অভিব্যঞ্জিত করেছেন।

“সমাগম’ এর কাহিনী বন্ধহীন হলেও যথেষ্ট কৌতূহল উদ্দীপক, চরিত্র আদর্শায়িত, পূর্বনির্ধারিত, ভাষা মজলিশী ও কৌতুকাবহ, সময় মাত্র একরাত্রি। বিষয় ও মজলিশী পরিবেশের উপস্থাপনার কারণে ঔপন্যাসিক সংলাপময় নাট্যশৈলীর (dramatic manner) পরিচর্যা করেছেন। এ উপন্যাসের রূপকার্য তুলনামূলকভাবে পরিপক্ব ও সর্বজনীন। ফ্যান্টাসিধর্মী হলেও এ-উপন্যাসের শৈলী ও প্রকৃতি রূপকীয় (allegorical) স্বপ্নালোকের ফ্রয়েডীয় ব্যাকরণ এখানে অনুসৃত হয়নি।

অস্বভাবী কল্পনার মধ্যে যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, বর্ণবাদ, জাতিশোষণ, ও শ্রেণীশোষণ-পীড়িত সভ্যতার মুক্তি আকাঙ্ক্ষা এ উপন্যাসের শিল্প অভিপ্রায়ের মূলমন্ত্র। দু’ধরনের চরিত্র এসেছে এখানে, মৃতলোক থেকে আলাওল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হাজী মুহাম্মদ মহসীন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বার্নাড’শ, রমা রনা ও লিও টলষ্টয় প্রমুখ এবং জীবিত ও সমকালীন চরিত্রদের মধ্যে জুহা, জাউন, ফুয়া, সৈয়দ বোকজা, পাষণ্ড, তেজোদীন ও মোয়াবত।

কল্পিত রাতে নিমন্ত্রিত অতিথিগণ সমবেত হয় যথাসময়ে। প্রথমে এসেছেন কবি আলাওল। উপন্যাসের শুরু হয়েছেন আলাওলের আত্মকাহিনীর বর্ণনা দিয়ে। আলাওল তাঁর পদ্মাবর্তীকাব্যে যে আত্মপরিচয় দিয়েছেন, ঔপন্যাসিক সেই আত্মকাহিনীর উপন্যাস ভাষা রচনা করেছেন এভাবে:

উম্মত্ত ঢেউ বজরার চারপাশে আছাড়ে আছড়ে পড়ে। মারাগণ বদর বদর রবে নড়ি ফেলে সন্দ্বীপ ছাড়িয়ে আমাদের বজরা তখন বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। কৃষ্ণপক্ষ। চাঁদ কখন উঠবে, তার ঠিকানা নেই। সমস্ত রাত্রি হয়ত অন্ধকারে পাড়ি দিতে হবে। ভাবলাম, শামাদান জ্বেলে মালিক মুহাম্মদ জয়সীর পদুমাবৎ কাব্যখানা একবার পড়া যাক। অনেক কাল আগে পড়া। ওসতাদের কাছে তখন নতুন মাত্র হিন্দী জবান শিখছি। বেশ ভাল লেগেছিল। কিন্তু ভাষার উপর দখল ছিলনা।

উৎসাহের তলা বেয়ে হয়ত আসল রস গড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু বেশ মজাদার। সিংহলের রাজকন্যা পদ্মাবতীকে বিস্মৃত হোতে পারিনি। আশ্চার্য ক্ষমতা করিব। মনে এই জাতীর জোয়ার ভাটার খেলা। জনাব শামশের কুতুবের কাজে বাপজান বড় পেরেসান। তিনি অন্ধকারে চিন্তামগ্ন বা ইষৎ তন্ত্রা উপভোগ করছিলেন। সুমসাম অঞ্চার..।** শ্রোতা হিসেবে রমা রলাঁ, বার্নার্ড শও রয়েছেন।

আলাওল তার কাহিনীতে হার্মাদের সঙ্গের লড়াইয়ের বর্ণনা করছিলেন, হেছোদীন বলে উঠেন- একালে হার্মাদদের জুলুমে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যু বরণ করছে, হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। তখন তিনি উত্তেজিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেন হাজী মুহাম্মদ 4. মহসীন খুবই সাদা সিধে ত্যাগী পুরুষ হিসেবে চিত্রিত। মুহার স্ত্রী জাইদুনের কাছে তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন। মানব সেবাকেই তিনি শ্রেষ্ঠ ধর্ম মনে করতেন, তাই তিনি সেই পথই ধরেছিলেন। কিন্তু জাইদুন তাকে যুক্তি দিয়ে বলেন :

“আসলে আপানারা দারিদ্র্য পুষে রাখতে চান। আর তার জোরে দানবীর, দাতা ইত্যাদি নাম কেনার পক্ষপাতী। আপনারা আসলে মানব প্রেমিক নন। আপনি দুঃখ-দরিদ্রা যেমন দেখে গেছেন, জনাব মহসীন, তার চেয়ে বিশেষ কিছু পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ আপনাদের গোড়াটাই ছিল ভুল। দস্যুরাই এখনও দানবীর।

 

সমাগম উপন্যাস

 

বস্তুত, দানশীলতা দিয়ে সমাজের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করা নয়, বরং দারিদ্র্যকে লালন করা হয়। দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করতে হলে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। উপন্যাসে বার্নাড’শকে নিমন্ত্রণ করা হয় জুহার পুত্র কুয়ার অনুরোধে। বার্নাডশকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে জুহার আপত্তি ছিল, কারণ :

বার্নাড শকে নেমন্তন্ন করা অনেক ঝামেলা। এলে হয়তো ঝগড়া বেঁধে যাবে কারো না কারো সঙ্গে। ঠোঁক কাটা ত আর দুনিয়ার লেখকদের মধ্যে ঐ হচ্ছে নারদ। কাইয়ার একটা খুঁৎ পেলেই হয়। ঢুকবে সুচ, বেরুবে ফাল।

অবশ্য উপন্যাসে বার্নাড শকে তেমন বির্তকে লিও হতে দেখা যায় না। বরং গুহার বন্ধু পাষন্ড ও তেছোদীন বার্নাড’শয়ের নানা দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেন। মাইকেল মধুসুদন, বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ’র পরিচয় করিয়ে দিলে শ’যখন জানালেন তিনি বিদ্যাসাগরের নাম কখনো শুনেন নি, তখন মাইকেল তাঁকে কঠোর সমালোচনা করেন।

“আমার স্মৃতি তার তুলনা সে নিজে। A great humonist, Social reformer a great Swordsman, মানুষ হিসেবে কত বানার্ড শ বিদ্যাসাগরের চটির সুখতলায় ঢুকে যেতে পারে।

বানার্ড শ তখনো নির্বিকার অনুত্তেজিত। সৈয়দ বোকব্জা তাঁকে যখন ইউরোপের ভাঁড় A clown may not – know a noble man ভাঁড় মহৎ ব্যক্তিকে চিনতে নাও পারেন। বলেন, তখন শ’ রেগে ফেটে পড়েন এবং বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বলেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের পানাহারের প্রথম টোস্টে সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস কামনা করে শ’ দরাজ কণ্ঠে বলেন – ‘To the dying soul of the world imperiatism. সাম্রাজ্যবাদের মুমূর্ষু আত্মার ধ্বংস কামনা করে বলেন :

মাছা ডাঙ্গায় তোলায় বেশী আনন্দ নেই। আনন্দ হচ্ছে গেঁথে খেলানোর মধ্যে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষে থেকে আমি এই Gold digger Swine দের মৃত্যু কামনা করেছি।

উপন্যাসে রমা রুলার চরিত্র শান্ত মহিমান্বিত। আলাওল যখন এ যুগের হার্মাদদের ধ্বংস করার জন্য আকুলতা প্রকাশ করেন, তখন রমা রলাঁ বলেন There are, indeed great artists who express themselves. But greatest of them are : those whose hearts beat for all men.’ রমা রলাঁকে সৈয়দ বোকজা তাই ইউরোপের আত্মা বলে আখ্যায়িত করেন। এভাবে মনীষীদের তর্কবিতর্কে জুহার গৃহ আড্ডায় মুখরিত হয়ে ওঠে রাত্রি।

তাদের তর্ক-বিতর্কের মাঝখানে উপস্থিত হন রবীন্দ্রনাথ এবং লিও টলস্টয়। এঁরা আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন না যদিও তবু এঁদের উপস্থিতিতে আড্ডা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং এরা বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ মানবিকতার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। রাত্রি শেষে পানাহারের পর বিদায় লাগ্নে সমবেত মনীষীদের কণ্ঠে উচ্চারিত সংলাপে তাদের আন্তরিক কামনায় স্পষ্ট হয় বিশ্বশান্তি, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী, মানবিক প্রত্যয় :

“মানুষের বিশ্বভ্রাতৃত্ব অক্ষয় হোক।”

” ধ্বংস হোক, সাম্রাজ্যবাদীগণ ও তাদের অনুচরেরা ধ্বংস হোক। ”

“মানুষের নির্বোধতম সংগঠন হিসেবে ধ্বংস হোক যুদ্ধ।”

“সুখীতর, আরো সমৃদ্ধতর হোক আগামী দিনের পৃথিবী।

সমাগম উপন্যাসে মৃতলোক থেকে আগত কল্পিত আত্মার এই তর্কবিতর্ক আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভট, সঙ্গতিবিহীন মনে হলেও এজ্ঞানগর্ভ কথোপকথন অর্থহীন সংলাপ মাত্র নয়। এঁদের এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় সমকালীন বিশ্ব সংকটের স্বরূপ যেমন নির্দেশিত হয়েছে, তেমনি এর সমাধানের ইঙ্গিতত্ত্ব ধ্বনিত হয়েছে। মৃত অথচ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ নিজ নিজ জীবনাদর্শ ও দৃষ্টি ভঙ্গিগত পার্থক্য সত্ত্বের উপন্যাসে নিগূঢ় ঐক্যসূত্রে বিদ্যমান এঁরা সবাই সাম্রাজ্যবাদ যুদ্ধ, শোষণ, নির্যাতনের বিরোধী, শান্তি ও মানবিক কল্যাণে একমত। শওকত ওসমান এভাবে ফ্যান্টাসির আশ্রয়ে রূপক ও প্রতীকের সংকেতময় আবহে সমাজ ও সমকালের সংকটকে শিল্প অভিপ্রায়ে ব্যক্ত করেছেন।

সমাগম উপন্যাসটি চারটি পালায় বিভক্ত। প্রথম পালার প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আগমনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। দ্বিতীয় পালায় আলাওল, হাজী মুহাম্মদ মহসীন, বার্নাড শ, রমা রলা, মাইকেল মধুসূদন দত্তকে জুহা ও তার বন্ধুদের মুখোমুখি করা হয়েছে।

তৃতীয় পালায় বিদ্যাসাগর এসে যোগ দিয়েছেন এবং জুহার স্ত্রী জাইদুন সক্রিয় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। চতুর্থ পালায় এক্সটেমপোর বা ক্ষণোক্ত নাটকের দুটি দৃশ্য অভিনীত সমবেত মনীষীদের বিদায়ের আগে উপস্থিত হন রবীন্দ্রনাথ ও টলস্টয় এবং কাহিনীর শেষ হয়েছে মনীষীদের আন্তরিক অভিপ্রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কাহিনীর উপস্থাপনা যেমন কৌতূহল উদ্দীপক, তেমনি আড্ডার আবহে, তর্কবিতর্কে, সংলাপে যথেষ্ট কৌতুকরস পরিবেশিত।

 

সমাগম উপন্যাস

 

“আলী সহকারী আরি-যুক পাটোয়ারীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। কিন্তু এই নামের এমনই বিদঘুটে লেজুড়। তাই কিঞ্চৎ তফসীরের প্রয়োজন আছে। অবশ্যি স্বয়ং মন্ত্রীনাথ হয়ত বিশপৃষ্ঠা ফেঁদে বসতেন। এযুগের টীকাকার অত লম্বা দড়ি ব্যবহারে অপারগ। … টেবিলে ঢাকা ঠান্ডা ভাত, কিন্তু গরম তরকারী অর্থাৎ ভাঙানো তরকারী প্রতরিত্রেই আলি পরিবেশন করত। জুহা তাই ঠাট্টাচ্ছলে বলত, আলি সহ-কারী ।

ইংরেজী ‘কারী” বাংলা তরকারী মনস্তত্ত্বের অনুসঙ্গ নিয়মে আলী সহ কারী। শেষে আলি সহকারী। শুধু আলীর নাম নয়, জুহার অন্যান্য বন্ধুদের নামকরণে যথেষ্ট হাসির উদ্রেক করে। যেমন, সৈয়দ বোকজার নাম সম্পর্কে :

সৈয়দ বোকজার আসল নাম কেউ জানেনা। যে যোফাইল দেখলে আপনার কাছে নিহিতাপ শরৎকালের কথা মনে হবে, সৈয়দ বোকলা তেমনই প্রোফাইলের অধিকারী। ….. এহেন সৈয়দ জাদা একবার প্রাণ-প্রাচুর্যের শুঁতানিতে দু’ঘণ্টায় দল বোতল বিয়ার, পাঁচ পেগ হুইস্কি সাবড়ে দিয়েছিলেন। বন্ধুরা বললে- হে নরপুর, তুমি সত্যই বোতল-কোডল জান। সেই থেকে সংক্ষেপে সৈয়ন বোকঞ্জা, খ্যাত বা অখ্যাত।

অর্থাৎ সংক্ষেপে, সৈয়দ বোতল- কোতল-জান= সৈয়দ বোকজা। অনুরূপ ভাবে প্রাণ শশী আঢ়া পাষন্ত, তেরছা চোখ উদ্দীন=তেছোদীন, মোয়ায়েদ বক্তৃত=মোয়াবক। এবং তাদের বাকবৈদগ্ধ্যের মধ্যেও যথেষ্ট হাস্যপরিহাস রয়েছে। যেমন :

-এই যে পায়, তুমিও এখানে, বলতে বলতে জাইদুন ঘরে ঢুকল।

নমস্কার বৌদি। দেখা হলেই গাল দেবেন এটি (হুহার দিকে আঙুল) কোন কান্ড?

-এটি । বেশীর ভাগই pro-কান্ত আর অন্যথায় কুষ্মান্ড। এই দ্যাখো না কি কাজ বাধিয়ে বসেছে।

সমাগম উপন্যাসে যেসব চরিত্রকে উপস্থিত করা হয়েছে, তাদের স্থান ও কালগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন, আলাওল সতেরোপিতকের মধ্যভাগের কবি, হাজী মুহাম্মদ মহসীন (১৭৩২-১৮১২) বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) মধুসূদন (১৮২৪-১৮৭৩) রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) এরা সবাই এই উপমহাদেশের সমাজিক ও সাহিত্যের জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র।

অপরদিকে টলস্টয় (১৮২৮-১৯১০) (রাশিয়া) জর্জ বার্নাড’শ (১৮৫৬-১৯৫০) (আইরিশ) এবং রমা রলাঁ (১৮১-১৯৪৪) (পারস্য) প্রমুখ তাঁদের স্থান, কালগত ব্যবধান, দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরিত্য সত্ত্বেও উপন্যাসে তাদের তর্কবিতর্কে সংলাপে অতীত ও বর্তমানের সময়গত সীমারেখা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সমাগত মনীষীদের রচিত গ্রন্থ থেকে অনেক উদ্ধৃতি ব্যবহারের ফলে তাদের জীবনদৃষ্টি ও চরিত্র বাস্তব হয়ে ওঠেছে এবং তাদের সমকালীন যুগমানস ও ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার চরিত্রগুলো অধিক জীবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করেছে।

সর্বোপরি বলা যায়, সমাগম নাট্যাঙ্গিক বিন্যাস, বৈঠকীডঙ্গে উপস্থাপিত শওকত ওসমানে নিরীক্ষাধর্মী এক শিল্প-অভিপ্রায়। ‘এ-উপন্যাসে রূপকাধারে উচ্চারিত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শোষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ও ক্ষোভ আর এর বিপরীতে ব্যক্ত হয়েছে। বিশ্বভ্রাতৃত্ত্ব শোষণহীন মানবতা ও বিশ্বশান্তির প্রতি এক উদগ্র কামনা যা সমগ্র বিশ্ব ও মানবজাতির প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম। “ বিষয় বস্তুর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংলাপের অন্তবর্তনে সৃজিত ‘সমাগম’ বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে ফ্যান্টাসি শিল্পশৈলীর নিঃসঙ্গ উদাহরণ।

 

সমাগম উপন্যাস

 

সমাগম উপন্যাসের ভাষা বিষয় উপযোগী এবং চরিত্রের মানস্ অভিব্যক্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সংলাপে বিদেশি শব্দের যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে বিশেষত আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি শব্দ ও বাক্যের প্রয়োগ এ উপন্যাসের অন্তর্জাতিক পটভূমির সঙ্গে যুক্তিযুক্ত বৈঠকী বা আড্ডার ভাষায় পরিহাস প্রিয়তা থাকে। এ উপন্যাসের ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয় । যেমন :

সাহকবি আমি মুসলমানের ছেলে। আমি (Gin) জ্বী-ভক্ত।

পাষন্ড- আমি হিন্দুর সন্তান (Rum) রাম ভক্ত।

মোয়াবক তৌৰাঝাগ ফেরুরা …… তৌরাস্তাগ ফেরুরা ….

জুহা আমি কবি রসিক Vermouth ভাঁড়মু পিয়াসী –

মোয়াকে – তৌরাস্তাগ ফের ……

পাষন্ড ভাঁড়মুতে শেষ পর্যন্ত …. (সমাগম / পৃ. ২৩)

বাক্যের রূপবন্ধনে কৌতুকসের জন্য কখনো আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি শব্দের সহজ ব্যবহার লক্ষনীয় :

“বাবা, ইংরেজী-বাংলা জবানে এমন মাখামাখি আছে বলেইত কমনওয়েলথী গাঁটছড়া এ্যায়সা মজবুত (সমাগম/পৃ.২)

বস্তুত, সমাগম উপন্যাসের ভাষা সম্পর্কে উদ্ধৃত বাক্যের ভাবার্থই যথার্থ। এখানে ‘জবানে’ হিন্দি, ‘এ্যায়সা উর্দু শব্দ, ‘মজবুত’ ফারসি, ‘কমনওয়েলথী’ (ই-প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়েছে বাংলা শব্দের মত) ইংরেজি শব্দগুলোর অর্থ যথাক্রমে ‘জবানে কথায় বা ভাষায়, কমনওয়েলথ একটি সংস্থার নাম সাধারণ মঙ্গলের জন্য রাজনৈতিকভাবে সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জ ‘এ্যায়সা’ এরকম, ‘মজবুত’ সুদৃঢ়। বিভিন্ন ভাষার শব্দের স্বচ্ছন্দ্যে ব্যবহারে বাক্যের রূপবন্ধ গঠিত।

Leave a Comment