আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পকার। যা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের এর অন্তর্গত।

১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পকার
বাংলাদেশের ছোটগল্প প্রথম থেকেই দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। চল্লিশের দশকেই শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ আরো কয়েকজন প্রতিভাবান গল্পকারের পরিচয় পাওয়া যায়।
পরবর্তীতেও শিল্পদক্ষ গল্পকারদের আবির্ভাব ঘটে। চল্লিশ-পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে আবির্ভূত কোন কোন গদ্যশিল্পী সত্তর, আশি এমনকি নব্বই দশকেও বেশকিছু ভাল গল্প লিখেছেন। এদের মধ্যে কোন কোন লেখকের রচনা সংখ্যার দিক থেকেও প্রচুর।
আবার স্বাধীনতাত্তোর কালেও কিছু তরুণ প্রতিভাবান গল্পকারেরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মোট কথা, সত্তর, আশি ও নব্বই দশক তথা বাংলাদেশের সাহিত্যের অতি সাম্প্রতিককাল প্রবীণ ও নবীন গল্পকারদের পদচারণায় সমৃদ্ধ ।
স্বাধীনতাউত্তরকালে আবুল ফজল ও আবু রুশদ মতিন উদ্দিনের একটি করে গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থ দুটিরই গল্পগুলিতে একচ্ছত্রভাবে নাগরিকজীবনই স্থান পেয়েছে। আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩) বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের জগতে শিল্পসফল ছোটগল্পকারদের মধ্যে সর্বাধিক প্রবীণ।
চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে রচিত তাঁর গল্পগুলিতে বাংলার গ্রামজীবন অন্যতম প্রধান স্থান পেয়েছিল। গ্রামীন জীবনের বাস্তবতাকে তিনি তাঁর গল্পে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তীতে প্রকাশিত তাঁর একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘মৃতের আত্মহত্যা’য় (১৯৭৮) গ্রামীণ জীবন সংশ্লিষ্ট তেমন কোন গল্প নেই।
আবুল ফজল একটি বিশেষ রাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই গ্রন্থের গল্পগুলি রচনা করেন এবং এই পটভূমিকে কেন্দ্র করেই গল্পগুলিতে তার বিবেক জাগরূক।
আবু রুশদ মতিনউদ্দিন (১৯১৯) মূলতঃ নাগরিক শিল্পী। কলকাতা শহরে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এজন্যই তিনি তার সবগল্পেই নিজ জীবনের একান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নগরকেন্দ্রিক জীবনকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। ‘মহেন্দ্র মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ (১৯৮৫) গ্রন্থটির গল্পগুলিও এর ব্যতিক্রম নয়।
আবু রুশদ প্রথাগত ছোটগল্প রচনায় পারদর্শী, বক্তব্যের ঋজুতায় ও চমকময় পরিণতি সৃষ্টিতে তাঁর নৈপূণ্য অনস্বীকার্য। ১ এ গ্রন্থটির গল্পগুলিতে সাহিত্যিক তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আবু জাফর শামসুদ্দীন (১৯১১-৮৮) একটি বিশিষ্ট নাম। চল্লিশের দশকে তিনি সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হন এবং দেশ-কাল-সমাজসচেতন এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্য রচনা করেন। “একজন প্রগতিশীল লেখক হিসেবে তিনি সুপরিচিত। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রতি বিশ্বাসী এবং মার্কসীয় দর্শনের প্রতি আস্থাশীল একজন লেখক ছিলেন। ২
তিনি ঢাকা জেলার কালীগঞ্জ থানার একটি সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারের সন্তান। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেননি। কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলার বাণী প্রভৃতি বিখ্যাত পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমীর অনুবাদ বিভাগের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত ছিলেন। রাজনীতির অঙ্গনেও আবু জাফর শাসুদ্দীনের বিচরণ ছিল। তিনি চল্লিশের দশকে এম.এন. রায়ের র্যাডিক্যাল ডেমোক্রেটিক দলের অনুসারী ছিলেন। পাকিস্তান অভ্যুদয়ের পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় কমিটির তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতি সম্মেলনের তিনি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি আফ্রো-এশীয় লেখক সমিতির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রভৃতিও রচনা করেছেন। উপন্যাসে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৮৩)সহ অন্যান্য বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় আবু জাফর শামসুদ্দীনের লেখায় রাজনীতিসচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। সমকালীন রাজনৈতিক আবহ তাঁর রচনাসৃষ্টিতে সহজেই অনুভূত হয়। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে সম্পৃক্তিতে আবু জাফর শামসুদ্দীনের শিল্পীমানস গঠিত হয়েছে মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদের সমন্বয়ে যা তার সাহিত্যের বিষয় প্রকরণ ও অন্তর্নিহিত ভাব ও বক্তব্যে প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবাদী জীবনদৃষ্টি নিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন কাহিনীসূত্র, চরিত্র, ভাষা ও গদ্যসাহিত্যের ধারাবাহিকতা। আবু জাফর শামসুদ্দীনের ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – নিখুঁত সমাজ বাস্তবতার পটভূমিতে কাহিনী বিন্যাস ও – চরিত্র নির্মাণ। “৩
সমাজ কাঠামোতে বিভিন্ন শ্রেণী অবস্থান, তাদের জীবনযাপন, এবং মানসপ্রবণতাকে তিনি তাঁর গল্পে চিত্রিত করেছেন। সমাজের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তাঁর রচনার একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেছে। তাঁর গল্পে সমাজ বাস্তবতা মৌলিক রূপরেখাতে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি গল্পের গঠন প্রকরণ ও আঙ্গিকের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সচেতন শিল্পী। তিনি গল্পে তাত্ত্বিক বর্ণনার পরিবর্তে জীবনের বাস্তবতাকেই শিল্পিত করে তুলেছেন।
তাঁর রচনাশৈলী প্রসঙ্গে ড. রফিকউল্লাহ খান মন্তব করেছেন “ইতিহাসের বঙ্কিম – ঘটনাপ্রবাহ কখনো কখনো নাটকীয় আকস্মিকতায় আন্দোলিত হলেও নাট্যরীতি আবু জাফর শামসুদ্দীনের অশ্বিষ্ট ছিলো না। বিচিত্র জীবন ও চরিত্রের সমাবেশ সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিকের নির্লিপ্ত নিষ্প্রাণ অবলোকনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে মাত্র।”৪ এই সর্বজ্ঞ ও মুক্ত দৃষ্টিকোণ ও আটপৌরে সহজ বর্ণনাত্মক ভাষায় তিনি ছোটগল্পে চিত্রিত করেছেন দেশের মানুষের জীবনযাপন ও সমস্যার স্বরূপ।
গ্রামীণজীবন তাঁর গল্পে একটি বিশাল স্থান জুড়ে আছে। সত্তর ও আশি দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সঞ্চরণশীল তাঁর লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন গ্রামের অবস্থা, যুদ্ধপরবর্তী স্বপ্নভঙ্গুর মানুষ এবং আবহমান গ্রামবাংলার দরিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের সমস্যা- সকল বিষয়ই বাস্তবতা নিয়ে শিল্পিত হয়ে উঠেছে।
শওকত ওসমান (১৯১৭-৯৮) অনন্য প্রতিভাধর কথাসাহিত্যিক। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে তাঁর মত শক্তিমান শিল্পদক্ষ সাহিত্যিক বিরল। তাঁর জন্মস্থান পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে। তিনি একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। তিনি ১৯৩৩ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৩৯ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনা করতেন। ১৯৭২ সালে সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করার জন্য ঢাকা কলেজ থেকে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন। তিনি সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৮৩) সহ বহু পুরস্কার লাভ করেন।
শওকত ওসমান সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করেন কবিতা লেখার মাধ্যমে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। শওকত ওসমানের সাহিত্যরচনার শুরু চল্লিশের দশকে এবং নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত তা অটুটগতিতে প্রবহমান।
দীর্ঘকালের সাহিত্যচর্চা ও সুপ্রচুর সাহিত্যসম্ভারে শিল্পমান ক্ষুণ্ণ হয়নি কোথাও। তাঁর জীবনবাদী প্রগতিশীল, সচেতন শিল্পী সত্ত্বার সফল প্রকাশ ঘটেছে উপন্যাস, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ কথাসাহিত্যের প্রায় সকলক্ষেত্রেই। পরিণত শিল্পক্ষমতা, দৃঢ় ও সংহত ভাষ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর বিপুল সাহিত্যসম্ভার।
শওকত ওসমানের ছোটগল্পের সংখ্যা শতাধিক। প্রকরণ ও বিষয় বৈচিত্র্যে ভরপুর তাঁর ছোটগল্পেসমূহে তিনি সংবেদনশীল ও অনুভূতিপূর্ণ হৃদয় দিয়ে যুগদ্বন্দ্বকে উপলব্ধি করেছেন সচেতনভাবে শিল্পব্যঞ্জিত করেছেন – সমাজের অবক্ষয়-কুসংস্কার-ধর্মান্ধতা-শোষণ-দারিদ্র্য, কখনও বা মূর্ত করে তুলেছেন মানবতা ও বিবেককে অধ্যাপক আহমদ কবির শওকত ওসমানের ছোটগল্পের আঙ্গিক শৈলী সম্বন্ধে বলেছেন- “শওকত ওসমান ছোটগল্পের ন্যায়শাসন মানতে প্রবলভাবে আগ্রহী। তার গল্প ঘটনা উপস্থাপনায় ও পরিণতিতে শাস্ত্রীয় ছোটগল্প হয়ে ওঠে।”৫
ছোটগল্পের নিটোল ও নিখুঁত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে, শিল্পব্যাকরণ ভঙ্গ না করেই গল্পকার তার মধ্যে বৈচিত্র্য ও ব্যতিক্রম এনেছেন- বিষয়ে ও প্রকরণে। সুদীর্ঘ সময়কাল ধরে তিনি গল্প রচনা করেছেন। বাংলার জীবনে ঘটে যাওয়া বিশিষ্ট ঘটনাবলী তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন।
যুগ সচেতন ও চিন্তাশীল লেখক হিসেবে অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব সৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। দীর্ঘকাল ধরে জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে তাৎপর্যময় এক সূক্ষ্ণ ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে সাহিত্যরূপ দান করেছেন; অথচ কোথাও ছন্দপতন ঘটেনি।
বার্ধক্যে উপনীত হয়েও তাঁর অবিশ্রান্ত লেখনি তরতাজা ও সতেজ। আমৃত্যু তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে দান করে গিয়েছেন সুপাঠ্য, শিল্পসৌকর্যময় ও সুচিন্তিত সাহিত্যসৃষ্টি। তাঁর গল্প বর্ণনাভঙ্গি আকর্ষক ও নিটোল।
শওকত ওসমানের সাহিত্যসম্ভার কেবল পরিমাণেই সুপ্রচুর নয়; শিল্পমানগতভাবে তা যেমন উচ্চমানসম্পন্ন, বিষয়গত দিক দিয়েও বৈচিত্র্যময়। বিভাগ পূর্বকালের নানান ঘটনা, রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক পটভূমি, মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক সমস্যা, সামাজিক অবক্ষয়, দাম্পত্যজীবন, মধ্যবিত্তজীবনের নানান দিক, মানবিক মূল্যবোধ, শোষণ-নিপীড়ন, দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ, মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, জীবনসংগ্রাম, মানুষের জীবনের বৈচিত্র্যময় রূপ- বহু বিষয় এসেছে তার গল্পে। বলা যায়, বিষয় বৈচিত্র্যে গল্পকার একপ্রকার সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছেন।
“শওকত ওসমান দেশ-কাল-পাত্রকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, ফলে তাঁর গল্পে যুগ, জীবন ও পরিবেশ অত্যন্ত সূক্ষ্ণ কায়দায় বিশেষ কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থতার মধ্য দিয়েই চমৎকার শিল্প-ব্যঞ্জনা লাভ করে। তাতে তাঁর উদ্দেশ্য যেমন সিদ্ধ হয়, তেমনি তার চতুর প্রয়োগে শিল্পের নান্দনিক বৈশিষ্ট্যকেও অক্ষুণ্ণ রাখে। ৬
রূপকগল্প অথবা গল্পে প্রতীক ব্যবহার শওকত ওসমানের গল্পের একটি ব্যতিক্রমী ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। রূপকগল্পের মধ্যদিয়ে তিনি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যটি পাঠককে জানান। “ষাটের দশকের সামাজিক- রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরুত্থান স্বাধীনতা-উত্তরকালেও শিল্পীর আত্মপ্রকাশকে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করে। ফলে, সঙ্গতকারণেই তাঁর কাছে রূপক ও প্রতীক শৈল্পিক অনিবার্যতা লাভ করেছে। ৭

স্বাধীনতাউত্তর সময়ের তুলনায় স্বাধীনতাপূর্ববর্তীকালের তাঁর রচনাসম্ভারে এ শ্রেণীর গল্প অধিক পাওয়া যায় । স্বাধীনতাপরবর্তীকালের গল্পগুলি অধিকাংশই বর্ণনাধর্মী ও বক্তব্যপ্রধান।
শওকত ওসমান একজন প্রকৃত সমাজসচেতন ও যুগসচেতন শিল্পী। যুগদ্বন্দ্ব ও সমাজবাস্তবতাকে তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে উপলব্ধি করেছেন। একজন বিবেকবান শিল্পীর দায়িত্ববোধ অনুভূত হয় তার রচনায়। সমাজের রূঢ় ও বাহ্যিক বাস্তবতাকে তিনি যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি মানবমনের অন্তবর্তী নানান সুর- অসুর ভাবকেও রূপায়িত করেছেন। রাজনীতিসচেতনতা তাঁর লেখনির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
জাতীয় ও আন্ত জার্তিক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বকে কখনও বর্ণনাত্মকভাবে, কখনও বা উপনিবেশিক শক্তির, কখনও বা স্বৈরাচারের যাতাকলে পিষ্ট মানুষের দারিদ্র্যপেষণ ও মনোবৈকল্য তার অনেকগল্পেই উপজীব্য হয়েছে। মানুষের পারস্পারিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব মধুরতাও অনেক গল্পেই বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন হানাদারদের নির্যাতন ও বাঙালীর প্রতিরোধ তাঁর অনেক গল্পেই বিষয় হিসেবে পাওয়া যায়।
নিম্ন, মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণী তাঁর গল্পে যুগপৎভাবে স্থান করে নিয়েছে। গ্রামীনজীবন ও মানুষ তার গল্পে বাস্তবভাবে উপস্থিত হয়েছে। স্বাধীনতাপূর্ববর্তীকালে তার গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত গল্পের সংখ্যা অনেক। কিন্তু স্বাধীনতাউত্তরকালে রচিত গল্পে গ্রামীণ পটভূমিকে তিনি খুব কমই ব্যবহার করেছেন। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সমাজে সৃষ্ট নানান সমস্যা ও অবক্ষয়ই এসময়ে তাঁর গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে। এসময়ে রচিত তাঁর অধিকাংশ গল্পই শহরকেন্দ্রিক।
শাহেদ আলী চল্লিশের দশকের মধ্যভাগ থেকে গল্পরচনা শুরু করেন; আশির দশক পর্যন্ত তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত লেখনী সঞ্চরণশীল। তিনি ১৯২৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫১ সালে অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে সর্বক্ষণিক রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং ‘৫৪-এর নির্বাচনে খেলাফতে রব্বানী পার্টির পক্ষ থেকে সংসদসদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য ছিলেন। তিনি তমদ্দুন মজলিস ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। তিনি কিছুকাল সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে তিনি ইসলামিক একাডেমীর প্রকাশনা বিভাগে যোগদান করেন।১৯৮২ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুবাদ ও সঙ্কলন বিভাগের পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামিক বিশ্বকোষ প্রকল্পের অন্যতম সম্পাদক। তিনি ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৪)সহ অন্যান্য পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি ২০০২ সালে মৃত্যুবরণ করেন ।
শাহেদ আলী মূলতঃ ছোটগল্পকার। তাঁর রচনা সংখ্যার দিক দিয়ে স্বল্প। তার সাহিত্যমানস ইসলামী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত। কিন্তু তা গোঁড়ামী ও অন্ধতার গাঢ়তায় আচ্ছন্ন নয়, তার ধর্মীয় মূল্যবোধ মুসলিম ঐতিহ্য ও মানবতায় উজ্জ্বল। “তাঁর ধর্মবিশ্বাস অত্যন্ত সুদৃঢ় সুতরাং ধর্মবিশ্বাসের আওতায়ই তিনি সাহিত্যের শুভবোধের জন্ম দিতে চেয়েছেন। “৮ স্বাধীনতার পূর্ববর্তীকালেই মূলতঃ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেই তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগুলি রচিত হয়েছে। তবে সত্তর ও আশির দশকে রচিত গল্পগুলোও শিল্পমানসম্মত ও সংবেদনশীল ও জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তুর ধারক।
শাহেদ আলীর ছোটগল্প মাটির সোঁদাগন্ধস্নাত পল্লীর মানুষের জীবনের সহজ-সরল গল্প। নগরের বাসিন্দা হয়েও শাহেদ আলী তার গল্পে পল্লীবাংলার জীবন ও মানুষকেই এঁকেছেন। শহরকেন্দ্রিক গল্পগুলির অধিকাংশই নিচতলার মানবেতর জীবনযাপনকারী অন্নহীন মানুষের কাহিনী। সমসাময়িক অন্যান্য গল্পকারদের তুলনায় শাহেদ আলীর গল্পে গ্রামবাংলার চিত্র অধিক উপজীব্য হয়েছে।
আধুনিক জীবন জটিলতা, অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত সমাজ ও মানুষ তার গল্পে প্রায় অনুপস্থিত। মধ্যবিত্তের হতাশা-গ্লানি, নাগরিক জীবনের ক্লান্তি-অবক্ষয় প্রভৃতি বিষয় যা আধুনিক গল্পকারদের গল্পের প্রধান বিষয় হিসেবে স্থান পাচ্ছে, শাহেদ আলীর রচনায় তা প্ৰায় স্থান পায়নি। বরং নিভৃতপল্লীর দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের কথাই তিনি দরদ দিয়ে বলেছেন। পল্লীর দরিদ্র মানুষের চিত্রে মানবতার ও পারিবারিক বন্ধনের স্নিগ্ধ রূপটি জীবনঘনিষ্ঠ চেতনায় এঁকেছেন। তার রচনায় একটি পরিচ্ছন্ন স্নিগ্ধতা অনুভূত হয়। এই বৈশিষ্ট্যটি তার সাহিত্যসৃষ্টিকে একটি বিশেষ স্থান দিয়েছে।
শাহেদ আলীর গল্পের চরিত্রগুলো দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় পথ ধরে ততটা অগ্রসর হয়নি, বরং অধিকাংশক্ষেত্রে জীবন ও সমাজ ধর্মীয়বোধের পরিচ্ছন্নতায় লালিত হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের সুদৃঢ় ধর্মবোধের আলোকেই তিনি তার গল্পের মর্মমূল ও চরিত্র নির্মাণ করেছেন।
তার গল্পের চরিত্রগুলির অর্ন্তজগতে একটি সংহত সংযম লক্ষ্য করা যায়। তিনি অশিক্ষিত, দরিদ্র, মানবেতর জীবনযাপনকারী ব্যক্তিচরিত্রগুলি দৃঢ় সততা ও অপরূপ মানবিক মূল্যবোধের আলোকে নির্মাণ করেছেন। তার নির্মিত চরিত্রগুলির অশুভ থেকে শুভের দিকে যাত্রার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। চরিত্র নির্মাণে তার সুগভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সহানুভূতি অনুভূত হয়।
শাহেদ আলী সমাজসেচেতন শিল্পী। তিনি বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে তার গল্প নির্মাণ করেছেন। জীবন বাস্তবতা, অভাবতাড়িত, ক্ষুধাকাতর মানুষ, নিরক্ষর মানুষ, শোষণ ও নিপীড়ন, সাংসারিক জীবন, জীবনসংগ্রাম সকল বিষয়ই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গভীর সহমর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি লক্ষ্য করেছেন এবং সাহিত্যে তার রূপায়ন করেছেন। তার গল্পে সংবেদনশীল ও অনুভূতিপ্রবণ শিল্পীমনের সাথে সমন্বয় ঘটেছে বাস্তবতা বোধের। তাই তিনি কেবল গ্রাম্য সরলতাকেই তুলে ধরেননি, গ্রামের দ্বৈততাকেও চিহ্নিত করেছেন।
শাহেদ আলীর গল্পের ভাষা কবিত্বময় এবং সহজ-সরল ত্রুটিমুক্ত। তার বিচিত্র কর্মময় জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে বাস্তব ও জীবনঘনিষ্ঠ লেখনী ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। গ্রামীণ পটভূমি হিসেবে অধিকাংশ গল্পে তিনি বৃহত্তর সিলেটের গ্রামাঞ্চল ও হাওড় অঞ্চলের জীবনচিত্রকেই চিত্রায়িত করেছেন।
জনপ্রিয় টিভি নাট্যকার নাজমুল আলম চল্লিশের দশকে সাহিত্যরচনায় আবির্ভূত হন। তাঁর রচিত গল্প, উপন্যাস ও নাটক শিল্পোত্তীর্ণ ও জনপ্রিয়। নাজমুল আলম ১৯২৭ সালে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার অন্ত গত বানিয়াকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৪৬ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন এবং ১৯৮৬ সালে কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর গ্রহণ করেন। টেলিভিশন, বেতার ও মঞ্চে তার বেশকিছু রচনা নাট্যরূপ হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
তাঁর রচিত কাহিনী চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘এশিয়া উইক’ ম্যাগাজিন কর্তৃক এশিয়ার শ্রেষ্ঠ গল্পকারের সম্মান লাভ করেন। ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৮), জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৬), টেলিশনাস পুরস্কার (১৯৮৯) সহ অন্যান্য পুরস্কার লাভ করেন।
নাজমুল আলম একাধারে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের দক্ষ রূপকার। তার গল্পে একদিকে যেমন নাগরিক জীবনের বাস্তবতা ও জটিলতা, নানান দ্বন্দ্ব্বমূখর সমস্যা, পক্ষিলতা, হতাশা স্থান পেয়েছে, তেমনি গ্রামীণ সমাজের দ্বৈততা, বিশ্বাসভঙ্গ, অনাচার, শোষণ, কুসংস্কার স্থান পেয়েছে। শহর ও গ্রাম উভয়কেই পটভূমি হিসেবে তিনি স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করেছেন।
উভয় পরিবেশের জীবনযাত্রার বাস্তব ও জীবনঘনিষ্ঠ উপস্থাপনে সফল হয়েছেন। তার সাহিত্যকর্ম স্বভাবের দিক থেকে, চরিত্র সৃষ্টির দিক থেকে বিচিত্রতর। আবহমান গ্রামবাংলার নিসর্গে, শহরের জটিল জীবনযাত্রায় বিরাজমান যন্ত্রণা, হতাশা, ক্ষোভ, লাঞ্ছনার পাশাপাশি রূপায়িত করেছেন জীবনের আশা ও আনন্দের উজ্জ্বল দিকটি। দৃষ্টিভঙ্গির তীক্ষ্ণতা ও ব্যপ্তি দিয়ে উপলব্ধি করে সাবলীল গদ্যভাষায় উপস্থাপন করেছেন মানুষের প্রতিদিনের হাসিকান্না, সুখ-শোক, আশা-আশাভঙ্গের রূপটি।
তিনি গল্পে কোন তত্ত্বকথার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেননি, বরং গল্পগুলি অনেকটা ক্যামেরার মত চিত্র তৈরি করে গিয়েছে একের পর এক। তিনি জীবনধর্মী শিল্পী। মনস্তত্ত্ব তার গল্পে অনুপস্থিত নয়, তবে তা তত্ত্ব থেকে বাস্ততার পথ ধরেই অধিক অগ্রসর হয়েছে। তার গল্প বর্ণনায় একের পর এক ঘটনার সন্নিবেশ পাওয়া যায় এবং ঘটনা ও সংলাপের মধ্য দিয়েই চরিত্রের বিকাশ। অথচ নিছক ঘটনা বর্ণনার মধ্যদিয়েই তিনি অপূর্ব শিল্পরস সৃষ্টি করেছেন।
একজন দক্ষ ছোটগল্পকারের প্রয়োজনীয় মানসিক সংযম ও সুমিতিবোধ এবং শিল্পের সুতীক্ষ্ণ কলাকৌশল তার আয়ত্তাধীন। প্রবীণ সাহিত্যিক আবুল ফজল মন্তব্য করেছিলেন- “…….. সমাজ আর সামাজিক জীবনকে বাদ দিয়ে আজ কোন গল্প উপন্যাসের কথাই ভাবা যায় না। নাজমুল আলমও তাই করেছেন। …….. মনে হয় দেশের সামাজিক জীবনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নিবিড়। “৯
সাহিত্য জীবনের শুরুতেই আলাউদ্দিন আল আজাদ নিজের যে সদর্প অস্তিত্ব ঘোষণা করেন তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন পরবর্তী সাহিত্য সৃষ্টিতেও। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু জীবনঘনিষ্ঠ, রচনাশৈলী কাব্যময়। গভীর জীবনবোধ নিয়ে তিনি তার সাহিত্যে মানবজীবনের নানান দিক ফুটিয়ে তুলেছেন।
তার রচনায় নানান সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা লক্ষ্যণীয়। মানবমনের আন্তবিশ্লেষণ ও ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্বের সঙ্গে যুক্তজীবন উপস্থাপন তার শিল্পরূপায়নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফ্রয়েডীয় তত্ত্বচিন্তাকে শৈল্পিক অবয়বে এনে নর-নারীর যৌনজীবনের চিরন্তন। সত্যতাকে উপস্থাপন করেছেন তার গল্প-উপন্যাসে।
বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ও শিল্পসত্যের সমন্বয়ে জীবনকে মনোজৈবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এঁকেছেন। চরিত্রের বিন্যাসে সঙ্কট, মনোবিকল, অন্তর্যন্ত্রণা ও যৌনবিকৃতিকে চিহ্নিত করেছেন। এর সাথে অস্তিত্ববাদ বা পরাবাস্তবতার মত সাহিতের অন্যান্য মতবাদের লক্ষণ তার ছোটগল্পে পাওয়া যায়।
শিল্পীর নিস্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচর্যা তার গল্প-উপন্যাসে লক্ষ্যণীয়। জীবনের বাস্তবতাকে তিনি সচেতন ও পরিপূর্ণ বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং এই অভিজ্ঞতাকে একটি নৈর্ব্যক্তিক অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে সাহিত্যে প্রকাশ করেছেন। “ জীবনকে বহু কৌণিক অবয়বে প্রত্যক্ষ করার অভীপ্সায় মানুষের অন্তর ও বাহির-উভয় ক্ষেত্রেই নিরাসক্তভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন তিনি। ১০ জীবনদৃষ্টি প্রয়োগে তিনি পরিপূর্ণ বাস্ত- -ববাদী। তার ছোটগল্পসমূহে নিবিড় জীবনবোধ ও বিষয় বৈচিত্র্য অপূর্ব শিল্পসৌকর্যে প্রকাশ পেয়েছে।
আলাউদ্দিন আল আজাদের প্রথম দিকের সাহিত্য মার্কসবাদ তথা সাম্যবাদী চিন্তাধারায় পুষ্ট ছিল। তার এসময়ের রচনায় শ্রেণীসংগ্রামের কথা সর্বহারাদের জীবনসংগ্রামের কথা পাওয়া যায়। দেশের দরিদ্র-শোষিত- বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-বেদনার কথাকে তিনি তার শিল্প সৃষ্টির প্রতিপাদ্য করেছেন। এ পর্যায়ের গল্পগুলোতে গ্রামীণ জীবনের রেখাপাত অধিক পরিমাণে পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে তিনি ক্রমশঃই শিল্পীমনের গভীরতায় জীবন ও জগতকে প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। নিরন্ন নিরক্ষর দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি তার গল্পে শিক্ষিত শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিস্তজীবনের মর্মবেদনা ও টানাপোড়েন স্থান করে নিতে থাকে। তবে তার রচনা থেকে পল্লীবাসী মানুষের জীবনচিত্রও বিদায় নেয়নি। বস্তুতঃ তিনি গ্রামীণ ও নাগরিক উভয়জীবনের রূপকার। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী আর্থ-সামাজিক দুর্দশা তার গল্পে বিশিষ্ট স্থান পেয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের গল্পরূপায়নে তিনি যুদ্ধকালীন অস্থিরতার মধ্যেও নর-নারীর লিবিডো ও মনস্তত্বকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের একজন প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক। “পঞ্চাশের দশকের গল্পকারদের মধ্যে আলাউদ্দিন আল আজাদ ছিলেন নির্ভরযোগ্য গল্পকার। এই দশকের ঐতিহ্যগত জীবনবাদী ও বাস্তবমুখী ধারাটির প্রবর্তক এবং পথিকৃৎ দুই-ই তিনি।” ১১

সৈয়দ শামসুল হক ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। সাংবাদিকতা দিয়ে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রয়োজক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক সকল ধরনের সাহিত্যসৃষ্টিতেই খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৬), একুশে পদক (১৯৮৯), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ( ৩বার, চিত্রনাট্য, সংলাপ, গীতিকার)সহ অন্যান্য পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলাদেশের সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হকের বিশিষ্টতা সাহিত্যরসের নতুনত্ব সৃষ্টিতে। সাহিত্যসৃজনে প্রকরণে ও বিষয়বৈচিত্র্যে নয়— তাঁর বিশেষত্ব অভ্যন্তরীণ রসসৃষ্টিতে। যৌনতার বিশ শতকীয় অনুসন্ধিৎসাকে তিনি তার রচনাসমূহে গুরুত্বের সাথে স্থান দিয়েছেন। এ ব্যাপারে শিল্প বা শ্রীলতার দাবি থেকে সত্যের দাবিকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। সৈয়দ শামসুল হক তার রচনায় ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বকে সচেতনভাবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন, তবে সেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা অপেক্ষা রোমান্টিকভাব বিলাসই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যসমূহে মানবজীবন ও মানবমনের বিশ্লেষণে নৈপুন্য দেখা যায়। তিনি চরিত্রের মনোবিশ্লেষণেই অধিক আগ্রহী। সমাজজীবন ও মানবজীবনের নানান প্রতিকূলতা ও সমস্যাই তার গল্পের বিষয়বস্তু হলেও গল্পের চরিত্র হিসেবে নগর ও গ্রামীণ উভয় চরিত্রই তার গল্পে স্থান পেয়েছে। তবে নাগরিক চরিত্রের জটিলতা ও মনো-অন্বেষাই তার গল্পে অধিক স্থান দিয়েছেন।
জীবনের উপরিতলের পরিবর্তে মনো- অম্বেষাই তার রচনার বৈশিষ্ট্য। বস্তুতঃ প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য শিল্প-সাহিত্যের গভীর সংস্পর্শে ফ্রয়েডীয় চিন্তা-চেতনা তার রচনায় শিল্পবৈশিষ্ট্য ধারণ করে। কিন্তু মানুষের যৌনজীবনের সাথে মানবমনের চিরন্তনতাকে তিনি কবিদৃষ্টি দিয়ে গ্রহণ করে বিজ্ঞানের উর্ধ্বে শিল্পকে উন্নীত করেন। তিনি যৌনতার সংশ্লেষকে জীবনের এক অপরিহার্য বিষয়রূপে তার রচনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তার সাথেই মানবমনের এক অদম্য পিপাসার বন্ধনটিও চিহ্নিত করেন।
জীবনকে যথাযথ বিশ্লেষণে শিল্প অনুসঙ্গটি তিনি অটুট রেখেছেন এবং যৌনতাকে এনেছেন মানবজীবনের কথকতায় প্রমানসিদ্ধ অনিবার্যতায়। ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ তত্ত্বকে তিনি সচেতনভাবে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। তবে তার লেখনির গীতল স্পর্শে তা রোমান্টিক অনুভাবনায় পরিণত হয়। তার লেখনির কাব্যময় ঢঙ গল্পের চরিত্রের জীবনচর্যা ও পরিণতিকে রোমান্টিক গীতময় কাব্যকথায় পরিণত করে। এক কথায় “সৈয়দ শামসুল হক নগরমনস্ক রোমান্টিক লেখক, তাঁর গল্পের ভাষাও রোমান্টিক কাব্যময়। “১২
তবে তার ভাষা অতি কাব্যময় হলেও বর্ণনাভঙ্গি সংহত, ঋজু এবং আড়ষ্টতাহান ও স্বতঃস্কৃত। নগরমনস্ক রোমান্টিক কবি ও গল্পকার হলে স্বাধীনতাত্তোর তার কিছু গল্পে গ্রামীণ শোষণ ও অনাচার-কুসংস্কারের চিত্র বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে বিমূর্ত হয়ে উঠেছে।
শহীদ আখন্দ (১৯৩৫) স্বাধীনতাউত্তর সময়ের গল্পকার হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তিনি শাহরিক মধ্যবিত্ত জীবন সংলগ্ন গল্প লিখেছেন। তাঁর গল্পগুলি সমাজ-বাস্তবতায় ঘনিষ্ঠ ।
রাবেয়া খাতুন (১৯৫) কথাসাহিত্যিক হিসেবে বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে স্বীয় আসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার ছোটগল্পে তিনি বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা ও মুক্তিযুদ্ধ তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক এবং সমাজ বাস্তবতার একজন গভীরদ্রষ্টা।
শওকত আলী ১৯৩৬ সালে দিনাজপুরের দিনাজপুরের রায়গঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি অধ্যাপনায় নিযুক্ত ছিলেন। সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন। ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৯০)সহ বহু পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন।
শওকত আলী একজন প্রথিতযশা ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে শক্তিমান শিল্পভাষ্যে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। সমসাময়িক আধুনিক জীবনবোধ ও শিল্পধারণাকে অন্তরে ধারণ করেও গতানুগতিকতা থেকে তার অবস্থান স্বতন্ত্র।
মূলতঃ গ্রামজীবনকে তিনি তার গল্পে এঁকেছেন। দিনাজপুর অঞ্চলের দরিদ্রপল্লী ও সাঁওতাল উপজাতির জীবন ও বাস্তবতাকেই তিনি তাঁর গল্পসমূহে প্রতিপাদ্য করেছেন। আধুনিকতার মোহে জড়িয়ে না পড়েও যে লেখায় সমকালের বাস্তবতার নানা খাত স্পষ্ট করে তোলা যায়, শওকত আলীর গল্পে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর গল্পের একটি লক্ষ্যণীয় হল, প্রতিবাদী চরিত্র সৃষ্টি । দীর্ঘদিন ধরে শোষন-বঞ্চনায় বিপর্যস্ত মানুষের প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠার চিত্রটি তাঁর অধিকাংশ গল্পের বিষয়বস্তু। “ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন বাস করলেও শওকত আলী নগরজীবনকে গল্পের বিষয় করেননি।
তিনি গ্রামের নিরন্ন ও খেটে খাওয়া মানুষের যন্ত্রনা ও বঞ্চনার বিপর্যস্ত জীবনচিত্র আঁকেন। …………… কিন্তু বিপন্ন জীবনের চিত্র এঁকে শওকত আলী দায় সারেন না, তিনি শ্রেণী সচেতনশিল্পী, তাই শোষণে পীড়নে জর্জরিত মানুষদের প্রতিশোধকামী ও সংগ্রামী করে তোলে। ১৫
বস্তুতঃ গ্রামবাংলার সমাজবিন্যাস, শ্রেণীসংগঠন ও শ্রেণীসংগ্রামের মর্মবৈশিষ্ট্যের দ্বন্দ্ব জটিলতার স্বরূপ শওকত আলী সম্যকভাবে অনুধাবন করেন। তার সাহিত্যসৃষ্টি তার সমাজ-অধ্যয়নের পরিচয়বাহী। তিনি গল্পে গ্রামের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের কথাকেই সফল শিল্পরূপ দিয়েছেন। তার সৃজিত চরিত্রে অস্তিত্ব-অভীপ্সা, সঙ্কট-উত্তরণ ও সংগামী চেতনার উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়।
শ্রেণী শোষণ ও ধর্মশোষণের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিশোধস্পৃহা জাগরিত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত তাঁর গল্পের দু’একটি রেখছিত্রে ভাস্বর। তাঁর এই বিষয়সন্ধান ও রচনাশৈলীর মর্মমূলে অবস্থান করে সর্বশোষণমুক্ত জীবন আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপিত মানবসত্ত্বা ও শিল্পীসত্ত্বার সমন্বয়। তাঁর সৃষ্টি কথাসাহিত্য যেন প্রতিবাদী চেতনা প্রকাশের এক আধুনিকতম শিল্পপ্রক্রিয়া।
শওকত আলীর গল্প মানবিক আবেদনে পূর্ণ। তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রগুলির মধ্য দিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা ফুটে ওঠে- আঞ্চলিক জীবনধারার পটভূমিতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের আর্তিতে তা বাজায়, প্রতিশোধ ও প্রতিবাদে তা ক্ষুরধার। মানব-মানবীর যৌনজীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার সাধারণ বিষয়গুলিকেও তিনি সহজ অথচ লক্ষ্যভেদী বর্ণনায় প্রকাশিত করে তুলেছেন।
বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-মীথের ব্যবহার তাঁর কিছু শিল্পসৃষ্টিকে ভিন্ন আমেজ দিয়েছে। কৃষক জীবনের আর্তিকে শ্রেণীসংগ্রামের বৃহৎ আঙ্গিকে স্থাপন করে সচেতন অথচ অনুভূতিপ্রবণ এবং শিল্পশক্তিসম্পন্ন সৃষ্টি তাঁর শক্তিমান সাহিত্য প্রতিভার পরিচয় বহন করে। তাঁর গদ্যভাষা স্বচ্ছন্দ ও ঋজু। ছোটগল্পের বিশেষ উপযোগী ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন। তাঁর রচনায় উপমার ব্যবহার স্বল্প।
তাঁর গল্পের রীতিকৌশল ও বাঁধুনী বেশ শক্ত ও মজবুত যা শিল্পরসের যোগান দেয়। তাঁর রচনার কলা-কৌশল গল্পের আঙ্গিক পারিপাট্য তাঁর অভ্যন্তরীণ ভাবের সংহতি আনয়নে চমৎকার নির্মাণশক্তিরূপে কাজ করেছে। সাহিত্যাঙ্গনে শওকত আলীর আবির্ভাব ঘটে ষাটের দশকে। তবে স্বাধীনতার পূর্বে তার একটি মাত্র গল্পগ্রন্থ ও একটি উপন্যাসগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনতাউত্তরকালেই তাঁর অধিকাংশ সাহিত্য রচনা প্রকাশিত হয়।
সহজ-সরল ভাষায় রচিত বিশিষ্ট লেখক বশীর আল হেলালের (১৯৩৬) গল্পসমূহে মূলতঃ নাগরিক জীবনেরই নানান জটিলতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে হানাদারদের নির্যাতন ও বাঙালীদের আত্মত্যাগের মহিমা ও তাঁর গল্পে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
আল মাহমুদ (১৯৩৬) কবি হিসেবেই প্রথমতঃ খ্যাতি লাভ করেন। স্বাধীনতাউত্তরকালে তিনি গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হন। কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্য রচনাতেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। আল মাহমুদের ছোটগল্পগুলি পরিকল্পিত লেখকের যত্নশীলতার ছাপ সুস্পষ্ট। গল্পকারের সুগভীর চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ও মানুষজীবনের দ্বন্দ্ব জটিলতার প্রতি মনোযোগিতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি গল্পে মানুষ ও তাঁর হৃদয়বৃত্তির সকল প্রকার চৈতন্যের দ্বার উন্মোচন করে জীবনের পরিচয় নির্মাণ করেছেন। মানুষের বিচিত্র স্বভাব, অনুভূতি ও ইচ্ছার স্বরূপ তাঁর লেখনিতে দ্যুতিময় হয়ে ওঠে।
আল মাহমুদ তাঁর গল্পে নর-নারীর দৈহিক প্রেমচেতনাকে গুরুত্বের সাথে স্থাপন করেছেন। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাচেতনার মধ্যে যৌন চাহিদা যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, আল মাহমুদ তাঁর গল্পে সেই জৈব কামনাই উপজীব্য করেছেন। “এ ব্যাপারে আল মাহমুদকে দুঃসাহসীই বলতে হবে। কেন না আমাদের গল্পে এমন লালসালিপ্ত গল্প অন্য কেউ লিখেছেন বলে মনে হয় না।” ১৪
যৌনতার প্রকাশ তাঁর গল্পে বার বার ঘুরেফিরে এসেছে, তবে তাঁর গল্প শিল্পের দাবি পূরণ করেছে। বস্তুতঃ তাঁর শিল্পসত্ত্বার মধ্যদিয়েই তিনি মানব- মানবীর যৌনজীবনকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু ও ঘটনার বৈচিত্র্য আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন তাঁর গল্পে অঙ্কিত হলেও তা গতানুগতিকতা থেকে পৃথক। যুগ বৈশিষ্ট্যকে লক্ষ্য রেখে সমাজজীবনের নানান অনুষঙ্গ, বিচিত্র মানুষকে তিনি তাঁর গল্পে এঁকেছেন।
আল মাহমুদের গল্পে গ্রামবাংলাই অধিকাংশ স্থানে পটভূমি হিসেবে এসেছে। গ্রামের উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন জীবনকে তিনি তাঁর গল্পে চিত্রিত করেছেন। তাঁর গল্পের চরিত্রেরা বিচিত্র পেশাজীবী বেদে, শিকারী, ফকির-দরবেশ, আদিবাসী কন্যা, বেশ্যা, সুন্দরবনাঞ্চলের মানুষ, সুগন্ধিবিক্রেতা ইত্যাদি। তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক কলাকৌশল ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির সমন্বয় গল্পগুলিকে স্বার্থকতা দান করেছে। তাঁর গল্পে নারী ও প্রকৃতিকে তিনি বিশেষ স্থান দিয়েছেন। নারীর অন্তর্নিহিত শক্তি, সংযম ও মমত্বকে তিনি তাঁর গল্পে অতি উজ্জ্বল দ্যুতিতে প্রকাশ করেছেন। নারী সৌন্দর্য বর্ণনায় তাঁর কবিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেননি। ১৯৫৪ সালে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার প্রুফরিডার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন পত্রিকার সাথে জড়িত ছিলেন। শিল্পকলা একাডেমীতে পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন সময় কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহন করেন। বাংলাদেশের একজন সুবিখ্যাত কবি। কবি হিসেবেই তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কবিতায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৮), একুশে পদক (১৯৯০), নাসিরউদ্দীন পদক (১৯৯০)সহ অন্যান্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
বাংলা ছোটগল্পে একটি অপরিহার্য নাম হাসান আজিজুল হক। তিনি বাংলাদেশের ছোটগল্পকারদের অন্যতম। তিনি ১৯৩৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কাটোয়ার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ১৫৬ সালে খুলনার দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন।
রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রাজশাহী সিটি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীকালে সিরাজগঞ্জ কলেজ, খুলনা গার্লস কলেজ ও দৌলতপুর বিএল কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে যোগদান করেন এবং বর্তমানে সেখানে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
হাসান আজিজুল হক ষাটের দশকে গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হন। প্রথম গল্পগ্রন্থই তাঁকে সার্থক গল্পকারের আসনে বসিয়ে দেয়। তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ তাঁকে পরিণত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি দেয়। পরবর্তীতে তাঁর শিল্পোৎকর্ষতা অটুট গতিতে প্রবহমানতা লাভ করে। হাসান আজিজুল হক একজন আধুনিক গদ্যশিল্পী হিসেবে যুগের জটিলতা ও জীবন জিজ্ঞাসাকে যেমন স্পর্শ করেছেন, শিল্পশরীর নির্মিতিতেও এনেছেন নতুনত্ব।
তাঁর শিল্প নির্মাণকৌশলে ভাবাবেগে প্রবণতা নেই। গল্পের অবয়ব ও অন্তর নির্মাণে তিনি নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বিষয় ও কৌশল অনুসারে রোমান্টিসিজম, সুররিয়ালিজম, ন্যাচারালিজম ইত্যাদির প্রভাব তার রচনায় পাওয়া যায়। সঙ্কেত ব্যবহার ও বর্ণনায় রহস্যময়তা সৃষ্টি তাঁর শিল্পকৌশলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সমাজজীবনের অবক্ষয়-হতাশা, শোষণ-নিপীড়ন ও দারিদ্র্যের বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্যরূপায়ণ তাঁর গল্পে দেখা যায় ।
হাসান আজিজুল হক তাঁর গল্পে গ্রামজীবন ও দরিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের কথা বলেছেন। যুগ যুগ ধরে শোষিত অসহায় মানুষেরা সমাজ ও সমাজপতিদের যাতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে। এই নিষ্পেষণ থেকে বেরিয়ে আসার আকুতি দেখা যায় হাসান আজিজুল হকের গল্পে। বিষয়ভাবনা প্রকাশে জীবনকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় দেখবার প্রবণতা তাঁর গল্পেকে উৎকর্ষের নতুন মাত্রা দান করে। ”
প্রতীকী ব্যঞ্জনায় তিনি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যক্ত করেন, দারিদ্র্যক্লিষ্ট নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের ও অনুকাতর শ্রমজীবী মানুষের জীবনচিত্র পরিস্ফুট করতে চেয়ে তিনি এই কথাও বলতে চেয়েছেন সমাজ প্রক্রিয়ায় মধ্যে এমন একটা শোষণ ও পেষণের ব্যবস্থা আছে যা মানুষকে চরম অসহায়তার মধ্যে নিয়ে যায়। এর থেকে মুক্তি লাভ ছাড়া উপায় নেই। হাসান আজিজুল হক বরাবরই মফঃস্বলবাসী, কিন্তু মননে ও মেধায় পুরোপুরি আধুনিক। ১৫
হাসান আজিজুল হকের গল্পের একটি প্রধান আকর্ষণীয় বিষয় ভাষা। তিনি উপমা-উৎপ্রেক্ষার অলঙ্কার পরিয়ে গদ্যশরীরকে কেবল সৌন্দর্যময় করে তোলেন না, ভাষার অপরূপ ব্যবহারে তিনি গদ্যশরীরে আত্মা নির্মাণ করেন। তাঁর রচনারীতি ও বর্ণনাভঙ্গিতে কাহিনীর বাস্তবতাকে যেন প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয়। তিনি বস্তুনিষ্ঠ গল্পকার। ভাষারীতি ঋজু অথচ শাণিত। গল্পের গতিতে স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্যণীয়। তীর্যক ও কৌতুকপূর্ণ কতক ঢঙ তাঁর অনেক গল্পেই লক্ষ্য করা যায়। ভাষার পারিপাট্য ও কলাকৌশলে তাঁর গল্পগুলি সার্থক শিল্পের অন্ত র্ভূক্ত।
সঙ্কেত ও রহস্যময় গল্পকথনভঙ্গি হাসান আজিজুল হকের গল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। গল্পসমূহে একটি বিশেষ বক্তব্যকে তিনি প্রতীক-সঙ্কেতের আশ্রয়ে একটি রহস্যময় ভঙ্গিতে প্রকাশ করেন। এর সাথে সমন্বিত হয় বাব্যময়তা। কাব্যময় ভাষা ব্যবহার তাঁর গদ্যকে শ্লথ করে না, বরং সঙ্কেত ও রহস্যময়তার মধ্য দিয়ে বাস্ত ব ও রূঢ় বক্তব্য প্রকাশকে বিশিষ্টতা দান করে।
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ষাটের দশকে আবির্ভূত শক্তিমান শিল্পপ্রতিভাধর গদ্যশিল্পী। তিনি ১৯৩৯ সালে কুষ্টিয়ার আমলাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পাবনা ও বগুড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
এরপর সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে উচ্চশিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং গণযোগাযোগে এমএস এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাংলা একাডেমীতে যোগদান করেন। এরপর বাংলাদেশ অবজারভারে কিছুকাল কর্মরত ছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও জনসংযোগের পেশায় কেটেছে দীর্ঘকাল। দীর্ঘ আটাশ বছরের বিদেশবাসের পর দেশে ফিরে বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম এনজিও ‘প্রশিকা’য় তথ্য পরিচালক এবং ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের খণ্ডকালীন প্রফেসর হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।
জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনা পাঠকপ্রিয়তা তরল ধারায় বহমান নয়। তাঁর সঙ্কেতময় প্রতীকী গদ্যভাষার কঠিন কর্ম দাবি করে রসিক পাঠক চিত্তের মেধা, শ্রম ও কাব্যপিপাসা। তিনি সাহিত্যসৃষ্টিতে সাধারণ বহিরঙ্গের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বকে গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছেন।
মানবজীবনের দুঃখ-যন্ত্রণার দিকগুলো উপস্থাপনে লেখকের সহমর্মিতা উপলব্ধি করা যায়। দীর্ঘ প্রবাসজীবন সত্ত্বেও জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনার পটভূমি বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নগরজীবন যেমন তাঁর লেখায় বিধৃত হয়েছে, গ্রামীণ লোকজীবনও সোঁদামাটির গন্ধ নিয়ে যথাযথ ও অকৃত্রিমভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির সংখ্যা সীমিত। ষাটের দশকের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর তিনটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর দীর্ঘকাল পরে প্রকাশিত হয় ‘প্লাবনভূমি গল্পগ্রন্থটি।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন অতিবাহিত করা সত্ত্বেও তাঁর গল্পগুলিতে গ্রামবাংলার জীবন প্রতিপাদ্য হয়েছে এবং গল্পের ঘটনা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ ও বাস্তব। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্প বাংলাদেশ শুধু নয়, বাংলা ভাষার যে কোন ভাল গল্পের পাশে জায়গা পেতে পারে। ১৬ মানবমনের অবগাঢ় অনুভূতির স্বরূপবৈচিত্র্য উন্মোচন করেন, সূক্ষ্মতম আলোকিত সত্ত্বাসমূহকে উঠিয়ে নিয়ে আসেন গল্পের পাতায় এবং শ্রেণীসচেতনতার মর্মমূলে তাকে স্থাপন করেন। তিনি বাস্তব ও শিল্পকে একটি সরলরেখায় যেন নিয়ে আসেন যেখানে শিল্প ও বাস্তব নিজস্ব সত্ত্বাকে অটুট রেখে পরস্পর মিশে একাকার হয়।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রাহাত খান ১৯৪০ সালে কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ১৯৫৯ সালে স্নাতক এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে সাংবাদিকতায় পশ্চিম বার্লিনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর জার্নালিজম থেকে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।
তিনি কলেজে অধ্যাপনার মধ্যদিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৬৯ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটির কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ছোটগল্পে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৩)সহ অন্যান্য পুরস্কার লাভ করেন।
রাহাত খান তাঁর গল্পে লেখনীর স্বচ্ছন্দ গতিতে গ্রাম ও শহরের পটভূমিকায় মানুষের বহিবাস্তবতা ও আন্তঃর্বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার রচনায় বৈচিত্রময় মানুষের জীবন চিত্রিত হয়েছে এবং তাদের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হয়েছে। ইতিবাচকতা তাঁর রচনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তিনি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং আধুনিক জীবনের চলিষ্ণু সমস্যা চিত্রণের পাশাপাশি স্বপ্নে-উদ্বেল জীবন আকাঙ্ক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর গল্পে যৌনতার উপস্থিতি বিস্তৃত ও খোলামেলা।

বিচিত্র মানুষ তার গল্পের চরিত্র হয়ে ভিড় করে ফড়িয়া, দালাল, গুন্ডা, রক্ষিতা, ধূর্ত ব্যবসায়ী, আদর্শহীন থ্রিলার লেখকেরা, এর পাশাপাশি ভালো মানুষেরাও তাঁর গল্পে উপস্থিত হয়েছে। চরিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে। চরিত্রগুলো নির্মিত হয়েছে গল্পকারের সুগভীর জীবনবোধ ও মননের সূক্ষ্মদৃষ্টিতে, শিল্পীমনের মমত্ব ও সহমর্মিতায়। তবে রাহাত খানের গল্প কেবলমাত্র ঘটনাকেন্দ্রিক জীবনের বাস্তব চিত্র উপস্থাপনাই তাঁর লক্ষ্য ।
আঙ্গিকের বৈচিত্র্যময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা সুপরিকল্পিত কলানিপূর্ণ ভাষাশৈলী নির্মাণে গল্পকারের মনোযোগ নেই। তার গল্পের ভাষা সহজ ও সরল। রচনারীতির স্বাচ্ছন্দ্য, ভাবের সহজবোধ্যতা ও পাঠক সম্মোহনী পরিবেশন তাঁর গদ্যরীতির বৈশিষ্ট্য। তার গল্প পড়লে মনে হয়, লেখক যেন সৃষ্টির আনন্দেই সাবলীল গতিতে। লিখে গিয়েছেন। তার গল্পে বাকচাতুর্য নেই। কিন্তু এই চাতুর্যহীন সহজ সাবলীল ভঙ্গি ও বিষয়ের বাস্তব ও সূক্ষ্ম উপস্থাপন তাঁকে একজন দক্ষ গল্পকারে পরিণত করেছে।
বিপ্রদাস বড়ুয়া (১৯৪০) স্বাধীনতাত্তোর কথাসাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি শিল্পোত্তীর্ণ ভাষ্যে রচনা করেছেন মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-হতাশাকে। গ্রাম-শহর পটভূমিতে মানুষের সমাজজীবনের বাস্তব সমস্যাকে শিল্পায়িত করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে বহু গল্প লিখেছেন।
মাহমুদুল হক ১৯৪০ সালে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাতে জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি ব্যবসার সাথে জড়িত। সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন।
মাহমুদুল হক প্রথাগত অর্থে জনপ্রিয় বা বহুপ্রতা লেখক নন। শিল্পবৈশিষ্ট্যে তিনি বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের বিশিষ্ট শিল্পী। তাঁর রচনার পরিমাণ খুবই সামান্য কিন্তু তা ভরপুর নানান বিষয়বৈচিত্র্যে। মাহমুদুল হক দৃষ্টি ফেলেছেন জীবনের ধূসর ধুলিমলিন পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায়।
জীবনের পিছনে থাকে যে আলাদা জীবন, যে বৈপরীত্য, যে অসঙ্গতি কিংবা আলো-আঁধারির অবস্থান, মাহমুদুল হক তাকে রূপ দিয়েছেন তাঁর সৃজিত কথাসাহিত্যে। তাঁর শিল্পীসত্ত্বা যেন এই দোদুল্যমান সমাজজীবনের সামগ্রিক জীবনাচরণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি তাঁর গল্পে একটি সহজ-সরল জীবন ও কোমল কঠিন জীবনকে পাশাপাশি ফুটিয়ে তুলেছেন।
বহু বিচিত্র মানবজীবনের তিনি এক দক্ষও কুশলীস্রষ্টা ভাষাশৈলীস্বকীয়তায় উচ্চাঙ্গের শক্তিধর লেখক। নগরায়নের যুগেই তাঁর সাহিত্যপ্রাঙ্গনে আবির্ভাব ঘটলেও, গ্রাম ও শহরের চিত্র অঙ্কনে তিনি সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অভিজাত ও অন্ত্যজ চরিত্র নির্মিতিতে তিনি শিল্পোত্তীর্ণ। ভাষার ক্ষেত্রেও তিনি আশ্চর্যরকম আটপৌরে, অথচ তারই মধ্যে কবিতার চিত্রকল্পময় লাবণ্য মিশিয়ে সৃষ্টি করেন এক ইন্দ্রজাল।
চরিত্রের সংলাপে স্থান-কালভেদে আঞ্চলিক ও পরিমার্জিত দুই ভাষার ব্যবহারে গদ্যকে গতিশীল করেছেন। তার ছোটগল্পে গ্রাম বাংলার যাপিতজীবনের একটি বাস্তবচিত্র পাওয়া যায়।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আবদুশ শাকুর (১৯৪১) শহরকেন্দ্রিক গল্প লিখেছেন। নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনই তাঁর গল্পে ঘুরেফিরে এসেছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩) বাংলাদেশের একজন উচ্চাঙ্গের কথাসাহিত্যিক। বিষয়ভাবনা, ঘটনাবিন্যাস ও শিল্পপ্রকরণে এক ব্যতিক্রমী, ঋদ্ধ ও আধুনিকতাস্পর্শী গল্পকার। ত৭ার গল্পের জীবনদৃষ্টিগত বক্তব্য ও প্রকাশভঙ্গির স্বকীয়তাই তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের ধারায় বিখ্যাত করেছে। তাঁর গল্পে পুরনো ঢাকার জীবনই অধিকাংশ স্থলে পটভূমি হয়েছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩) বাংলাদেশের ছোটগল্পে ভাষা ও মেজাজে এক বিপ্লবী অভিনবত্বের সূচনা করেন। ষাটের দশকে সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হলেও স্বাধীনতাপরবর্তীকালেই তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচনা শহরকেন্দ্রিক, বিশেষতঃ নিম্নবিত্ত মানুষের হতাশা ও ক্লেদকে ফুটিয়ে তুলেছে।
বুলবুল চৌধুরী ১০৮৭ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ঢাকা জেলার কালীগঞ্জে। জীবন ও শিল্পের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন গল্পকার বুলবুল চৌধুরী তাঁর গল্পসমূহে। বিচিত্র মানুষ এবং মানুষের জীবন- এটিই তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু।
সত্তর দশকে যখন অধিকাংশ গল্পই রচিত হয়েছে শহরের পটভূমিতে, তখন বুলবুল চৌধুরী তাঁর অধিকাংশ গল্পের পটভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছেন গ্রামীণ জীবন। তাঁর ছোটগল্পে গ্রামীণ জীবন ধরা দিয়েছে চিরন্তনত্ব আর সদ্য নতুনত্ব নিয়ে। মানব-মানবীর প্রেম-বিচ্ছেদম হত্যা-ভালবাসা, অন্নকষ্ট এবং নিসর্গের বৃষ্টি-উদ্ভিদ-বাঁশঝাড়-নদী বুলবুল চৌধুরীর গল্পে সবকিছুরই সজীব উপস্থিতি। চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাতেই তাঁর অধিক আগ্রহ। চরিত্রগুলিতে তাঁর গভীর দরদ অনুভূত হয়।
সেলিনা হোসেন ১৯৪৭ সালে রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রামে। তিনি ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও ১৯৬৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি ১৯৭০ সালে গবেষণাসহকারী হিসেবে বাংলা একাডেমীতে যোগদান করেন। বর্তমানে পরিচালক হিসেবে সেখানে কর্মরত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই সেলিনা হোসেনের লেখালেখির সূচনা। পশ্চিমবঙ্গের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ‘যাপিত জীবন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাস পাঠ্যসূচিভুক্ত। শিলচলে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ৫টি উপন্যাস এমফিল গবেষণাভুক্ত।
তিনি প্রবন্ধ রচনার জন্য ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক (১৯৬৯), উপন্যাসে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮০), জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার, ১৯৯৬, ১৯৯৭) সহ অন্যান্য বহু পুরস্কার সম্মানিত হয়েছেন।
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একটি অপরিহার্য নাম সেলিনা হোসেন। বাংলাদেশের মানুষ, তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর লেখার জগৎ। প্রতিকূল সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিবেশে ব্যক্তিমানুষের অসহায় ও বেদনাময় জীবনকে অবিমিশ্র হ্রদয়াবেগে তুলে আনেন তাঁর কথাসাহিত্যে।

কখনও বা জীবনের উদ্দমতা অনুরাগের গভীরতায় লাভ করে চিত্রধর্মীরূপ। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা— ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ তার লেখায় নতুন মাত্রা অর্জন করে। তবে তাঁর রচনা কেবল সঙ্কীর্ণ জাতীয়তায় আবদ্ধ নয়, তা বিশ্বমাত্রা লাভ করে মানুষের সূক্ষ্ম মনস্তত্ব বিশ্লেষণেও তিনি পারঙ্গম। তিনি গভীর মমতায় গ্রামবাংলার সংগ্রামশীল মানুষের জীবন অঙ্কন করেছেন। তাঁর সমস্ত কথাসাহিত্যে তীক্ষ্ণ সমাজসচেতনতা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়।
সেলিনা হোসনের লেখনীর ভাষা কাব্যময় ও গতিশীল। তাঁর শিল্পী হৃদয়ের গভীর আবেগ তাঁর ভাষার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। তাঁর ভাষা ব্যবহারে এক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়। তিনি চলতি রীতির মধ্যে অচেনা অপ্রচলিত শব্দ বসিয়ে বাক্য তৈরি করেন।
সেলিনা হোসেনের লেখায় গ্রামীণ জীবনচিত্র দেখা যায়। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম, সমুদ্র উপকূল, পার্বত্য এলাকা, হাওড় অঞ্চল ও সেখানকার মানুষের বিচিত্র কল্লোলিত জীবন তাঁর গল্প উপন্যাসে পাওয়া যায়। জীবনবোধের বস্তুনিষ্ঠতা তা লেখকমানসের বৈশিষ্ট্য। অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনা ও সংগ্রামী সৃজন-সম্ভাবনায় সীমাহীন আস্থা সেলিনা হোসেনের বিষয় ভাবনার মৌল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
সেলিনা হোসেন মূলতঃ প্রতিবাদী ও প্রত্যাশায় বিশ্বাসী। তাঁর রচনার একদিকে পাওয়া যায় অতি রোমান্টিক অনুভূতিশীল চেতনাপ্রবাহ, অন্যদিকে আবেগদীপ্ত সংগ্রামমুখীনতা। তাঁর শিল্পদৃষ্টি তীক্ষ্ণ, সঙ্কেতময় ও গূঢ়সঞ্চারী। সমকালীন মধ্যবিত্তের সত্ত্বাসঙ্কট রূপায়ণে তিনি মর্মমূলে স্পর্শ করে চেতনাশ্রয়ী ব্যক্তির জীবনবাস্তবতা ও টিকে থাকার জীবনপরিধির মধ্যেও প্রাগ্রসর চৈতন্য ও সত্যের অমিত সম্ভাবনাকে নির্দেশ করেছেন। তিনি ব্যক্তির আত্মসঙ্কটকে সমগ্রের সত্ত্বা সঙ্কটে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
কায়েস আহমেদ ১৯৪৮ সালে পশ্চিবঙ্গের হুগলী জেলার বড় তাজপুরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যয়ন করেন। তবে পরীক্ষা দেয়া হয়নি। ছাত্রজীবনেই তিনি লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন। ‘৬০-এর দশকে কামাল বিন মাহতাবের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ছোটগল্প’ পত্রিকায় যুগ্ম- সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ঢাকার উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৯২ সালে তিনি উদ্বন্ধনে আত্মহত্যা করেন।
কায়েস আহমেদ বাংলাদেশের ছোটগল্পের অন্যতম শক্তিশালী লেখক। দেশ-কাল-জাতি-সমাজ সম্পর্কে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণসম্পন্ন দৃষ্টি তাঁর ছোটগল্পে লক্ষ্য করা যায়। আঙ্গিক ও ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার গল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, কিন্তু তাতে কোন উৎকট আধুনিকতার প্রকাশ নেই। সংহত ব্যক্তিত্বের শিল্পময় স্পর্শ অনুভব করা যায় এই স্বল্পায়ু প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিকের রচনার সর্বত্র।
প্রবল এক নৈঃসঙ্গ ও অতীত স্মৃতিচারণায় অবগাহন তাঁর রচনামৈলীর বিশেষ দিক। তাঁর গল্পের অধিকাংশ চরিত্রই একক ও বিচ্ছিন্ন এবং বৈরী পরিবেশে অসহায়ত্বের শিকার। তাঁর চরিত্রগুলি প্রতিবাদী ও সচেতন নয়, নতমুখী আত্মমগ্ন। কায়েস আহমেদের গল্পে সামান্যপ্রেক্ষিতের বহু বিস্তৃত বৃত্তে উপনীত হয়ে সেখানকার নানান শ্রেণীর মানুষ, আন্তর্মানুষিক সম্পর্ক, নিম্নবিত্ত-বিত্তহীনের সমূহ সঙ্কট ও তাদের পারস্পারিক সংঘাতের বৃত্তান্ত এক মনোজাগতিক সমন্বয়ে উন্মোচিত হয়েছে।
নাসরিন জাহান বাংলাদেশের নতুন কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে বিশিষ্ট। তাঁর গল্পগুলিতে জীবন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। তাঁর গল্পগুলিতে জীবনবাস্তবতা ফুটে ওঠে। তাঁর গল্পে শাহরিক জীবনই প্রাধান্য পেয়েছে।
নতুন প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে মইনুল আহসান সাবের প্রতিভাবান এবং শিল্পধারাবাহিকতায় বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। তাঁর গল্পগুলি শহরকেন্দ্রিক জীবনবাস্তবতা নিয়ে রচিত।
হুমায়ুন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলন স্বাধীনতাউত্তরকালে বাংলাদেশে সর্বাধিক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক। সমাজজীবনের নানা বিষয়, মানুষের প্রেম ভালবাসা, হতাশা, দারিদ্যকে গ্রাম অথবা শহরের পটভূমিকায় তাঁদের গল্পে উপস্থাপন করেছেন। তবে তাঁদের রচনা পাঠকপ্রিয়, চিন্তা ও জীবনদৃষ্টি অগভীর, শিল্পায়নের নিরিখে দুর্বল ।
আতা সরকার ১৯৫২ সালে জামালপুরের বকসীগঞ্জের পাখীমারায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পেশাগত জীবনে তিনি একজন্য ব্যাংকার। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তরুণ প্রজন্মের গল্পকারদের মধ্যে আতা সরকার অন্যতম শক্তিমান লেখক।
তাঁর গল্পে স্বাধীনতাপূর্ববর্তী সামরিক শাসনের কলুষিত রাজনৈতিক- সামাজিক অপঅধ্যায় এবং স্বাধীনতাপরবর্তী স্বপ্নহীনতা, নৈতিক অবক্ষয়, অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা তাঁর শিল্পদক্ষ কলমে শানিতভাবে প্রকাশিত। শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্ব এবং ব্যবধানের বাস্তবরূপ সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এর পাশাপাশি স্থান পেয়েছে বর্তমানকালে মানুষের মানসিক দারিদ্র্যা, হীনমন্যতা, অপপ্রয়াস এবং সামাজিক বৈকল্য ।
প্রকাশভঙ্গিতে তিনি কখনও স্পষ্ট, কখনও বা কটাক্ষকে আশ্রয় করেছেন অনিয়ম-অবিচারকে ফুটিয়ে তুলতে। তাঁর প্রতিবাদী মানসিকতা ও সাহিত্য সম্পৃক্তি কৈশোর থেকে লক্ষ্যণীয়। তাঁর কৈশোরে সম্পাদিত সাহিত্যপ্রতিকার সব কপিই আইয়ুব সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। সত্তরের দশকে তাঁর লেখা গল্প প্রকাশের অভিযোগে কারারুদ্ধ হন পত্রিকার সম্পাদক।
সত্তর দশকে আবির্ভূত ছোটগল্পকারদের মধ্যে জাফর তালুকদার অন্যতম প্রভাবশালী লেখক। সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে তাঁর বেশ কিছু শিল্পসম্মত গল্পে গ্রামীণ সমাজ ও জীবনের ছবি পাওয়া যায়। জাফর তালুকদারের জন্ম বাংলা ৯ অগ্রহায়ণ ১৩৫৯ সালে বাগেরহাট জেলার মল্লিকের বেড় গ্রামে। তিনি ১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কলেজজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রতিষ্ঠা করেন কবিদের সংগঠন ‘কবিতাসারথি’। ‘অক্ষর’ নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা খুলনা থেকে প্রকাশ করেন। দেশ-বিদেশের সরকারি বেসরকারি পত্রিকায় ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাথে জড়িত ছিলেন। এসময় ক্রান্তি নামক সাহিত্যপত্রটি ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের কথাশিল্পী সংসদের সাথে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ফিলিপিন্সের ‘রেডিও ভেরিতাস এশিয়া’র বাংলাদেশের সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মনোজগতের নানাবিধ জটিলতাকে তিনি শিল্পদক্ষতায় প্রকাশ করেছেন। মূলতঃ প্রকৃতি ও মানুষকে তাঁর গল্পে ওতপ্রোতভাবে নিবিড় অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থিত হয়। তিনি গভীর পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে মানুষকে অবলোকন করেন- এবং উন্মোচন করেন সত্যকে যেখানে মানুষ কেবল মানুষ হয়ে নেই- বহু বিচিত্র রূপ, ভঙ্গি আর খোলসের থেকে উঠে আসা চেনা-অচেনা মুখ। গ্রামীণ দৃশ্যপটকে গল্পে ধারণ করেছে দক্ষিণ বাংলার সুন্দরবন অঞ্চলের এক অজানা দিগন্ত তিনি ক্রমশ উন্মোচন করেছেন তাঁর লেখায়। গল্পে চিত্রায়িত দৃশ্যপট উন্মোচন করেছেন তা এই সময়ের এক মানবিক দলিল ।
মুস্তাফা পান্না আশির দশকের একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। তরুণ প্রজন্মের একজন আধুনিক লেখক হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর গল্পের বিষয় নির্বাচনে গ্রামীণ জীবনের অন্ত্যজ শ্রেণীকে বেছে নিয়েছেন গল্পসমূহের এক বিরাট অংশ জুড়ে । প্রকৃতির সাথে মানুষের সংগ্রাম, প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পারিক জীবনপ্রবাহ, বাংলাদেশের গ্রামের কিছু অন্ত্যজ জীবনপ্রণালী রূপায়ণে তাঁর গল্পসমূহ একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ অর্জন করেছে। নাগরিক জীবনে এমনকি গ্রামীণ জীবনেও অবহেলিত অন্ত্যজজীবনকে গল্পের প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এই আধুনিক কথাশিল্পী অপূর্ব শিল্প কৃতিত্ব এবং ব্যক্তিমানসের প্রসারতাকে প্রমাণ করেছেন।
স্বাধীনতাপরবর্তী তিন দশক জুড়ে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকেরা দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই মানুষের বাস্তবজীবন ও মনঃস্তত্ত্বকে শিল্পায়িত করেন। এ ক্ষেত্রে সাহিত্যাঙ্গনের প্রথিতযশা লেখকেরা এবং প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখকেরা সমভাবে নিজস্ব সামাজিক অঙ্গীকারবদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বর্তমান যুগবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমাজবাস্তবতাকেই তাঁরা গুরুত্ব দিয়েছেন, এরই প্রেক্ষিতে আলোড়িত হয়েছে মনস্তত্ত্ব ও অন্যান্য অনুষঙ্গ। গ্রামীণ জীবনরূপায়ণের ক্ষেত্রে কথাশিল্পীদের অনেকেই তাঁর লেখনী ধারণ করেছেন। আবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, শহীদ আখন্দের মত গল্পকারদের কাছ থেকে গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত উল্লেখযোগ্য তেমন কোন গল্প পাওয়া যায় না।
বিপ্রদাশ বড়ুয়া বা রাবেয়া খাতুনের গল্পে গ্রাম পটভূমির উপস্থিতি থাকলেও বৃহত্তর ধারাবাহিকতায় সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেনি। এসকল শিল্পদক্ষ গল্পকারগণ শহরকেন্দ্রিক জীবনজটিলতাকেই অধিক শিল্পসফল ও তাৎপর্যময়রূপে উপস্থাপন করেছেন।
তরুণ প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে মঞ্জু সরকার, হরিপদ দত্ত, কায়েস আহমেদ, বুলবুল চৌধুরী, আতা সরকার, জাফর তালুকদার, মুস্তাফা পান্না প্রমুখ সাহিত্যিকেরা গ্রামজীবনের নানারূপ তাদের লেখার এক বিরাট অংশজুড়ে নিয়ে এসেছেন। যা তাদের সমসাময়িক অন্যান্য লেখকদের থেকে ব্যতিক্রমী। শহীদুল জহির, মনীশ রায়, মহীবুল আজিজ, মোস্তফা হোসাইন, ঝর্ণা রহমান, রায়হান রাইন গ্রামসম্পর্কিত স্বল্প সংখ্যক যে গল্পগুলি লিখেছেন, সেগুলো বক্তব্য ও শিল্পবৈশিষ্ট্যে তাৎপর্যময়।
প্রকৃতিপক্ষে একটি নতুন রাষ্ট্র ও উন্নয়নশীল দেশের নানান সমস্যা বিক্ষুব্ধ জীবনে নাগরিক বাস্তবতা নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যিকদেরকে অধিক আলোড়িত করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সাহিত্যিক তাঁর স্বভাবসুলভ সংবেদনশীলতা ও সচেনতার থেকে বিশাল বাংলাকে কখনও বিস্মৃত হবেন না।