বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 আজকে আমরা বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র আলোচনা করবো।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবন (১৯৭২-২০০০) আমার এম.ফিল গবেষণাপত্রের শিরোনাম। ২০০৪ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিষদের অনুমতিক্রমে অধ্যাপক আহমদ কবিরের তত্ত্বাবধানে এ গবেষণাকর্মে যোগদান করি। স্বাধীনতাপরবর্তীকালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব চেতনা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়।

ফলে আমাদের দেশের সৃজনশীল কথাসাহিত্যিকরা নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐহিত্য ও জাতীয় চেতনাকে বাঁধাহীনভাবে ধারণ ও প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করতে থাকে। একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে দেশ তার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। এই হতাশা থেকে জনমনে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় তা সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

দেশ ও মানুষ জর্জরিত হয় দারিদ্র্য ও অবক্ষয়ের আঘাতে। সাধারণ মানুষের জীবনই আধুনিক কথাসাহিত্যের মূল বিষয় হিসেবে স্থান পায়। স্বভাবতঃই আমাদের দেশের সাহিত্যিকেরা সমসাময়িক মানুষের জীবন ও সমস্যাকে তাদের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। আধুনিক সমাজজীবন ক্রমান্বয়ে নগরমুখী হলেও আমাদের দেশের প্রাণ এখনও গ্রামেই নিহিত আছে। নাগরিক জীবনের চিত্রও উঠে এসেছে।

নগরমুখী জীবনবাস্তবতায় গ্রামের অবস্থান এবং দেশের আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রাম-মানুষের জীবনচিত্রের স্বরূপ ও প্রকৃতিতে কথাসাহিত্যে রূপায়নের প্রকৃতিটি চিহ্নিত করাই এই গবেষণাপত্রটির মূল পরিধি। বর্তমান সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গ্রাম-জীবনের নানান দিক কথাসাহিত্যিকেরা কতটা তুলে ধরেছেন এ বিষয়টিই এখানে আলোচিত হয়েছে।

গবেষণাকর্মটি করার ক্ষেত্রে প্রবীণ ও নবীন উভয় প্রজন্মের লেখকদের গল্পসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায় ‘১৯৭২-২০০০ কালসীমায় বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রাম-বাংলার অবস্থা’ শিরোনামে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এর প্রেক্ষিতে দেশের বিরাজমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সঙ্কট আলোচিত হয়েছে। কেননা, একটি দেশের মানুষের জীবন নিয়ন্তা এই তিনটি বিষয়- রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ।

গ্রামজীবন বাস্তবতার স্বরূপ আলোচনা প্রসঙ্গে এ বিষয়টির অবতারণা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছি। এ বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে এ সংক্রান্ত সর্বজনসম্মত নির্ভরযোগ্য বইয়ের সাহায্য নিয়েছি। দ্বিতীয় অধ্যায় ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পকার’ শিরোনামে আলোচ্য সময়কালের প্রবীণ ও নবীন গল্পকারদের ব্যক্তিমানস ও শিল্পমানস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি। একজন লেখকের আদর্শগত চেতনা ও শিল্পপ্রবণতার প্রত্যক্ষ ফসল তার রচনা। এজন্যই এ অধ্যয়টি অবতারণা করে আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম হল ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র।’ এ অধ্যায় ছোটগল্পে গল্পকারদের বিধৃত গ্রামজীবনের বিষয়ভাবনাটি তুলে ধরেছি এবং এর আলোকেই এ কালপর্বের ছোটগল্পে বাংলাদেশের গ্রামীণজীবন ও এর সমস্যার স্বরূপ রূপায়ণের প্রকৃতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। চতুর্থ অধ্যায় গ্রামজীবনভিত্তিক ছোটগল্পগুলির শিল্পমূল্যায়ন’ শিরোনামে এসব গল্পের শিল্পপ্রবণতা আলোচনা করা হয়েছে।

এছাড়া গবেষণাপত্রটির শুরুতে ‘প্রস্তাবনা’ ও শেষে ‘উপসংহার’ শিরোনামে দুটি অধ্যায় সংযোজিত করেছি। গবেষণাকর্মটিতে উপাত্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে গল্পকারদের মূলগ্রন্থসমূহ পাঠ করেছি। এছাড়া স্বাধীনতাপরবর্তীকালের ছোটগল্প সম্পর্কিত বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচকদের আলোচনা- নিবন্ধ ও পুস্তকের সাহায্য নিয়েছি। এছাড়া প্রাসঙ্গিক কিছু পুস্তকের সহায়তা নিয়েছি।

আমার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ কবিরের তত্ত্বাবধানে আমি এই গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেছি। তার সহৃদয় সহায়তা ও পরামর্শ আমাকে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে সহযোগিতা করেছে। প্রতিকূল নানা পরিস্থিতিতে তাঁর সহানুভূতি ও কর্মসম্পাদনে নানান উপদেশ- পরামর্শ ও উৎসাহ দান আমাকে প্রেরণা ও উদ্দীপনা যুগিয়েছে।

আমার বাবা ও মায়ের নিরন্তর উৎসাহ দান ও সর্বাত্মক সহযোগিতা, আমার দুই অনুজার আন্তরিক সহযোগিতা, আমার স্বামী ড. আবদুল করিমের আন্তরিক আগ্রহ, সহায়তা ও ধৈর্য আমার পক্ষে এই গবেষণার কাজটি নির্বিঘ্নে সম্পাদনে একান্ত সহায়ক হয়েছে।

আমার সহপাঠী ও বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হোসনে আরার ও বাংলা একাডেমীর পরিচালক অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থগার কর্তৃপক্ষ এই গ্রন্থাগারটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আমার কাজের যে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছে তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

সূচিপত্র

  • বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের প্রস্তবানা

প্রথম অধ্যায়

  • ১৯৭২-২০০০ কালসীমার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গ্রামবাংলা

দ্বিতীয় অধ্যায়

  • ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোট গল্পকার

তৃতীয় অধ্যায়

  • ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ১
  • ১৯৭২-২০০০ পর্বের ছোটগল্পসমূহে গ্রাম-বাংলার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র পর্ব ২

চতুর্থ অধ্যায়

  • গ্রাম জীবন ভিত্তিক ছোট গল্পগুলির শিল্পমূল্যায়ন

উপসংহার

বাংলা সাহিত্য গণচেতনা ও যুগচেতনা সমান্তরালভাবে ক্রিয়াশীল। উনিশ শতকের বিশের দশক থেকে গণমানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সচেতন সৃষ্টি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। উনিশ শতকের বাংলা রচনায় দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার, এবং শ্রেণী শোষণের কাহিনী বিরল উপজীব্য নয়।

বিশেষতঃ নাটকে জমিদার ও নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের কাহিনী ও প্রতিবাদের চিত্র দেখা যায়। সামাজিক অবক্ষয়ক কটাক্ষ করতেই প্রহসন ও নকশা জাতীয় রচনাগুলি সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ শতকের প্রথম থেকে বিশ্বব্যাপী পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে অনাস্থা এবং এর অন্ধকার দিকের প্রভাবে সাহিত্যে নৈরাশ্য, বিষণ্ণতা, বিচ্ছিন্নতা দানা বেঁধে ওঠে।

মার্কিসীয় চিন্তার প্রভাবে শ্রেণী সচেতনতা ও শ্রেনী সংগ্রামের চিত্রও পরিপুষ্ট রূপ ধারণ করে। এর সাথে ফ্রয়েডীয় চিন্তা চেতনার প্রভাবে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলির অন্ধগলিও দৃষ্টিগোচর হয়। নবউদ্ভূত এর সাহিত্যিক চেতনা ও মতাদর্শের অতলস্পর্শী চিহ্ন বিদ্যমান তিরিশোত্তর বাংলা বাক্যে। বাংলার লোকজ-অন্ত্যজ জীবনের আকাঙ্ক্ষা- হতাশা বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেই পরিব্যপ্ত হয়েছে, তাই বাংলা সাহিত্য পেয়েছে মানিক বন্দ্যোপাদ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র মত উপন্যাস ।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

শ্রেণী শোষন, রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে পাই সুকান্ত ভট্টাচার্য, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবিকে, বলা যায়। সমাজের শোষন-নিপীড়ন তথা সামাজিক অব্যবস্থার চিত্র বাংলা সাহিত্যের বিরল নয়। বিভাগোত্তরকালের চিত্র বাংলা সাহিত্যের বিরল নয়। বিভাগোত্তরকালের সাহিত্যেও এ চিত্র স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।

দেশবিভাগকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকেরা দেশ-বিভাগের পূর্বে কলকাতাকেন্দ্রিক ছিলেন এবং আধুনিক শিক্ষা ও মুক্ত বুদ্ধিকে অন্তরে ধারণ করেছিলেন। তাদের আধুনিক ও মুক্ত চিন্তার আলোকেই তারা তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাহিত্যের প্রাণভূমি কলকাতার মূল তাত্ত্বিক জাংকে আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আধুনিকতার উপস্থিতি সৃষ্টি লগ্ন থেকেই।

এ সময় থেকেই সাহিত্যিকগণ সমাজ ও রাজনীতি সচেতন। মানুষের জীবনের অসঙ্গতি, বৈরী পরিস্থিতি, রূঢ় বাস্তবতাকে সাহিত্যে উপস্থিত করতেই তারা আগ্রহী। সময় এগিয়ে যাবার সাথে সাথে মুল কেন্দ্রটিকে অটুট রেখেই আসর হয়েছে বাংলাদেশের কথা সাহিত্য। ধীরে ধীরে কথা সাহিত্যে নন্দন। তত্ত্বের অপেক্ষা বাস্তবতাই অধিক স্থান দখল করে নিতে শুরু করেছে। এজন্যই স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে শিল্প অপেক্ষা বাস্তবতার দাবীই প্রাধান্য পেয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশকের গল্পসমূহ তাই সমাজ জীবনের এক অকাট্য দলিল।

দেশ-কালের ছায়াপাত সাহিত্যে নতুন ঘটনা না কিন্তু স্বাধীনতাপরবর্তী কালের সাহিত্যে সমাজ সচেতনতার দিক থেকে একটি গণমুখীচেতনা সমৃদ্ধ সাহিত্যের ধারা অন্য নেয়। এ সময়ের সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল । শিল্প অপেক্ষা সত্যের দাবীকেই জোর দেয়। এদিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের ছোটার সার্থকতা প্রমাণ করেছে।

 

বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামজীবনের সূচিপত্র

 

যদিও এ সময়ের গল্পে আঙ্গিকগত নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিবর্তন দেখা যায়, বিষয়ভাবনাতেও সৃষ্টি হয়। নানান বৈচিত্র্য, গল্পের ভাষা ব্যবহারও হয় আঙ্গিক ও বিষয়ানুগ, কিন্তু এই ত্রিশ বছরে নন্দনতাত্ত্বিক ধারণাতেও একটি পরিবর্তন এসেছে। অবশ্য কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবোধের পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। পরিবর্তিত মূল্যবোধের পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত সাহিত্যের ধারায় পরিবর্তন আসে।

সামাজিক জীবনে জীবনে মানসিতার উম্মেষ ও ক্রমবিকাশ এবং সমসাময়িক সাহিত্যের মধ্যে সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেইজন্যই ছোটগল্পে কিংবা সাহিত্যের অন্য কোন শাখায় প্রচলিত বা ধারাবাহিক মূল্যবোধ ও ধারণার ব্যতিক্রম কোন নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু যুগ পরিবর্তন ও নানান নিয়ামক ঘটনা যা পরিপার্শ্বিকতাকে গল্পে যথাযথভাবে তুলে ধরাতেই গল্পকারের সার্থকতা।

গল্পকার তার শিল্পদক্ষতার সাহায্যে যুগ যন্ত্রণা ও জীবন বাস্তবতার চিত্রকে বাস্ত বায়িত করেন। এ ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর এই শেষ তিন দশক জুড়ে বাংলাদেশের সাহিত্যে গ্রামীণজীবন নানান সমস্যা নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের ছোটগল্পে গ্রামীণজীবন বিধৃত হয়েছে এবং এক্ষেত্রে ছোটগল্পকারেরা যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি লোকজীবনের একটি নির্ভরযোগ্য দলিল।

Leave a Comment