আজকের আলোচনার বিষয়ঃ মাও সে তুঙ এর দেশে । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

মাও সে তুঙ এর দেশে । মওলানা ভাসানী
মওলানা ভাসানীর প্রকৃত নাম আবদুল হামিদ খান। ১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্য হয়। তিনি মক্তবে শিক্ষাগ্রহণ শেষে কিছুকাল মক্তবেই শিক্ষকতা করেন- পরে ১৮৯৭ সালে আসামে চলে যান। ১৯১৯ সালে কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়ে তাঁর দশমাসের কারাদন্ড হয়।
১৯২৪ -এ তিনি আসামের ধুবড়ি জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে এক সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সেখান থেকেই তাঁর নামের সংগে যুক্ত হয় ভাসানী শব্দটি। একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে। তিনি ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদী কন্ঠ। দেশীয় শোষকদের বিপক্ষে তার হুঁশিয়ারী বারবার উচ্চোরিত হয়েছে।
১৯৩০ সালে মওলানা ভাসানী কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালে। ১৯৫৪তে তিনি এ.কে ফজলুল হকের সংগে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।
তিনি আসামের কৃষক-প্রজা আন্দোলন (১৯২৬), টাঙ্গাইলের সন্তোষে জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের বিদ্রোহ (১৯৩১), রাজশাহীর নওগাঁতে কৃষক সম্মেলন (১৯৩৪), আসামে বাঙ্গাল খেদা বিরোধী আন্দোলন (১৯৩৫), আসামে জাতিসত্তার নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে লাইন-প্রথার বিরোধিতা (১৯৩৭), রংপুরের গাইবান্ধায় কৃষক প্রজা সম্মেলন (১৯৩৮), মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক লাহোর সম্মেলন (১৯৪০), রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৫২), যুক্তফ্রন্ট গঠন (১৯৫৪), এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির দাবিতে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাগমারী সম্মেলন (১৯৫৬), ‘ঘেরাও’ আন্দোলন পরিচালনা ও আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ (১৯৬৮), এবং আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), সন্তোষে জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান (১৯৭০), স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার দাবী (১৯৭০), সাপ্তাহিক ‘হক কথা প্রকাশ, ফারাক্কা মিছিল (১৯৭৬) প্রভৃতি ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
মওলানা ভাসানী এদেশের নির্যাতিত নিরন্ন মানুষের প্রতিটি সংগ্রামে অকুতোভয় সৈনিকের মতো আজীবন লড়েছেন। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রনীর। ১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর এই মজলুম জননেতা ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ১
চীন সরকার এবং চাইনীজ পিপলস্ ইন্সটিটিউট অব ফরেন এ্যাফেয়ার্সের পক্ষ থেকে চীনের বিপ্লব দিবস (১৯৬৩ইং) উপলক্ষে মওলানা ভাসানীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও সে নিমন্ত্রণ তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন। ২৪শে সেপ্টেম্বর (১৯৬৩ইং) তিনি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডঃ আব্দুল করিম ও ব্যারিষ্টার শওকত আলী খানকে (যিনি দোভাষীর দায়িত্বে ছিলেন) সংগে নিয়ে ঢাকা থেকে করাচী যান। সেখানে তিনি হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়ায় হংকং ঘুরে পিকিং যাবার পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে যায়। পরে চীন সরকারের পাঠানো এক বিশেষ বিমানে করে তিনি রেঙ্গুন থেকে কুনমিং হয়ে পিকিং পৌঁছান।
৪৯ দিন চীনের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সফরশেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তাঁর সফর অভিজ্ঞতার বিবরণ ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘জনতা’ পত্রিকায় ১৪টি অধ্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। পরে সেগুলি ‘মাও সে তুঙ এর দেশে’ নামে গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে।
মাও সে তুঙ এর দেশে অন্যান্য ভ্রমণ কাহিনীর মত নয়। লেখক এতে রোজনামচা রাখেননি। কাহিনীও রয়েছে খুব কম। মূলত সমাজতান্ত্রিক চীনের সামগ্রিক সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা বইটির বৈশিষ্ট্য। এতে মাও সে তুঙ এর লেখা কয়েকটি কবিতার অনুবাদ, বাণী এবং তাঁর নিজ হাতে লেখা কবিতাসমূহের পান্ডুলিপির কিছু অংশ মুদ্রিত হয়েছে। বিখ্যাত লং মার্চের মানচিত্র বইটিতে সংযোজিত হওয়ায় গ্রন্থের গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দুই
কুনমিং থেকেই চীনের সীমান্ত শুরু। নতুন নির্মিত কুনমিং এর বিমান বন্দরে নেমে লেখক সেখানকার ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য বুঝতে পেরেছিলেন। নাগরিক অভ্যর্থনায় বিশেষভাবে তাঁর চোখে পড়েছিল চীনা জনগণের সুশৃংখলার দিকটি। কুনমিং এ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর তিনি আকাশ পথে তিন ঘন্টার ব্যবধানে পিকিং পৌঁছান।
সেখানে বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন চীন সরকারের সহকারী প্রধানমন্ত্রী মার্শাল চেন-ই এবং সরকার ও কমিউনিষ্ট পার্টির শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। পিকিং এয়ারপোর্টের সবুজের সমারোহ তাঁকে যুগ্ধ করেছিল। আলাপ আলোচনায় তিনি জেনেছেন গত ১৪ বছরে চীনের ৭০ কোটি মানুষ ২০০ কোটি নতুন গাছের চারা লাগিয়েছে। বিপ্লবের আগে পিকিং এ সবুজ খুব একটা চোখে পড়ত না। পার্বত্য অঞ্চলেও কোন বৃক্ষ ছিলনা। এখন সেখানেও অনেক মূল্যবান গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে পিকিং এ এখন সবুজের ছড়াছড়ি সর্বত্রই চোখে পড়ে।
লেখককে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছে সে দেশের জনগণের হাসি। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে এমনটি ছিল না। তিনি দেখেছেন চীনের মানুষ টিকে থাকার জন্য লড়ছে না, বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে। সেদেশে শ্রেণীবৈষম্য লেখকের চোখে পড়েনি। বিভেদহীন সমাজব্যবস্থায় সেখানে সবাই সমান। মাও সে তুঙ এর যোগ্য নেতৃত্বেই সেদেশের এই রূপান্তর সম্ভব হয়েছে।
সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নাগরিক জীবনকে মানবিক মর্যাদা দিয়েছে। আমলাতন্ত্রের অভিশাপযুক্ত চীন ব্যক্তি নয় সমষ্টি স্বার্থকেই বড় করে দেখে। তাই প্রত্যেকটি মানুষকে তারা উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছে। তারা অধিকার এবং রাজনীতি সম্পর্কে প্রত্যেকেই সচেতন। বিপ্লবোত্তর চীনের প্রতিটি মানুষই তাই সচ্ছল। সাত সপ্তাহে লেখক সেদেশের বহু জায়গা ঘুরেছেন দুর্নীতির বদলে তিনি সেখানে দেখে এসেছেন সততা। গণচীনের সর্বত্র একই ছবি লেখককে মুগ্ধ করেছে।
সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থার অগ্রগতি চোখে পড়বার মত উন্নত। যাতায়ত ব্যবস্থার অব্যাহত উন্নতির লক্ষ্যে চীনারা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও রেলপথ, স্থলপথ, বিমান বন্দর নির্মাণ করছে। সীমান্ত এলাকার সাথে প্রত্যেক অঞ্চলের যোগাযোগের সুবিধার্থে তারা সীমান্ত এলাকাকে উন্নত যাতায়াতের উপযোগী করে তুলেছে। সেদেশের সর্বত্রই নরগঠনের প্রয়াস লেখকের চোখে পড়েছিল। স্বদেশের সার্বিক উন্নয়নে চীনারা প্রত্যেকেই যে আন্তরিক ও অনলস কর্মী এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
চীনে তাত্ত্বিক শিক্ষার সাথে ব্যবহারিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন করা হচ্ছে। দশ বছর আগের একজন সাধারণ শ্রমিক পরবর্তীকালে হয়েছেন কারখানার ডিরেক্টর। চীন মানুষ নিয়ে, জীবন নিয়ে গবেষণা করছে। তরুণ-বৃদ্ধ সবাই কৃষিবিদ্যা শিক্ষা কোর্স করছে। কৃষকশ্রেণী প্রত্যেকেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সমগ্র দেশ জুড়ে রয়েছে কমিউন ব্যবস্থা। প্রত্যেক কমিউনেই রাখা হয়েছে কৃষিবিদ্যালয়। সেদেশে কোন নিরক্ষর লেখকের চোখে পড়েনি ।
কমিউনিষ্ট পার্টির কালেকটিভিজমে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য্য বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে যে ধারনা করা হয়, চীন ঘুরে তা লেখকের কাছে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি দেখেছেন তারা প্রত্যেকেই পরম নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে এবং স্বতঃস্ফূর্ত হয়েই নির্ধারিত কাজের বাইরেও বাড়তি কাজ করে থাকে। এ ব্যাপারে কোথাও কোন চাপাচাপি নেই। মুলত দেশের প্রতি অকৃত্রিম টানের তাগিদেই তারা অতিরিক্ত শ্রমের দায়িত্ব পালনে কিছুমাত্র বিরক্তি বা কষ্ট অনুভব করেনা। তিনি সর্বত্রই দেখেছেন চীনের প্রত্যেকটি মানুষের মনেই কাজ করছে একটি মাত্র চিন্তা দেশাত্মবোধ।
রাষ্ট্র চালনার জন্য আমলাতন্ত্রের বিকল্প নেই এ মতবাদও সেদেশে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সামন্ত ধনিক শ্রেণীর হাতে বন্দী সর্বময় ক্ষমতা মুক্তি পেয়ে পরিণত হয়েছে জনগণের ক্ষমতায়। জনগণের সর্বময় ক্ষমতাকে সরকারী কর্মচারীরা সম্মানের চোখে দেখে। ১৯৪৯ সালের পহেলা অক্টোবর গণ-প্রজাতন্ত্র-চীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেখানে অবসান ঘটে সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী ও মুত্সুদ্দী-আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী শাসন ও শোষণের ।
চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। সেখানকার গ্রামাঞ্চলে কৃষি সমবায় প্রথা চালু করা হয় ১৯৫৬ সালে। সমবায় প্রথা চালু করায় সেদেশের শিক্ষাক্ষেত্র ও রাজনৈতিক কর্মকান্তে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। কৃষি সমবায় থেকেই কৃষকরা নিজেদের উৎসাহে গড়ে তোলে আরও উন্নত সমবায়। ক্রমে এই সমবেত সমবায়গুলিই গণকমিউনে পরিণত হয়। এখান থেকে এ ধারণাই স্পষ্ট হয় যে গণ-কমিউন গঠন করেছিল চীনের জনসাধারণ, কমিউনিষ্ট পার্টি নয়।

কমিউনের আদর্শ হলো ব্যক্তি নয় সমষ্টির ভাবনা। চীনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে কমিউনের ভূমিকা স্বীকার্য সত্য। চির দুর্ভিক্ষের দেশ চীনে বিপ্লবের পরে কেউ আর না খেয়ে থাকছে না। জনগণ সেখানে এখন স্বনির্ভরতায় সচ্ছল। কমিউন ব্যবস্থায় চীনারা কাজ অনুযায়ী মজুরী পেয়ে থাকে। শুধুমাত্র পারিশ্রমিকের জন্যই নয় দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে তারা ব্যক্তিগত তাগিদই বেশী অনুভব করে। মোটের ওপর কমিউন ব্যবস্থা দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত নিঃশেষিত চীনকে দিয়েছে নতুন জীবনের দিক নির্দেশনা ।
বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে লেখক বলেছেন Justice is delyed Justice denied (বিলম্বিত বিচার, বিচার অস্বীকৃতিরই নামান্তর) এ ধারা চীনে নেই। বিগতদিনের অনেক বিষয়ের মত বিচার বিভাগ থেকেও তারা মন্থরতাকে দূর করেছে। চীনের নির্বাচন ব্যবস্থা চারটি পর্যায়ে বিভক্ত। কমিউন, কাউন্টি, প্রাদেশিক ও জাতীয়। রাজনৈতিক অপরাধীদের ভোটাধিকার নেই সেখানে।
নতুন চীনে প্রত্যেকটি নারী তাদের সামন্ত যুগে হারানো মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। সমস্ত দেশ ঘুরে কোথাও একটি পতিতালয় খুঁজে পাওয়া যাবে না অথচ চীয়াং কাইশেকের আমলে গণিকালয়হীন শহর চীনে কল্পনাও করা যেত না। চীনের মুক্তি সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সক্রিয় ছিল বলে আজ তাদের এই মুক্ত অধিকার কার দান নয়- তাদেরই অর্জিত অধিকার।
চীনের জনসংখ্যা বিপদ নয় সম্পদ। জনসমষ্টিকে যদি কাজে লাগানো যায় তাহলে তা সমস্যা না হয়ে সম্পদ হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি মানেই দুর্ভিক্ষ নয়। কারণ নবজাতক একটি মুখের সংগে দু’টি হাতও নিয়ে আসে। সেই হাতকে কাজে লাগিয়ে অবশ্যই দ্বিগুণ উৎপাদন সম্ভব। আর তা চীনারাই প্রমাণ করেছে প্রথমবারের মত। সমস্ত অভাবের মূলে যে শোষণ ছিল তা থেকে মুক্তি পেয়ে তাদের খাদ্য ঘাটতি থেকে শুরু করে যাবতীয় সমস্যা দূর হয়েছে।
লেখক চীনের বিরাট অংশ ভ্রমণ করে দেখেছেন নতুন চীন একাই পৃথিবীর দু’চারটি স্থানের সমস্যা মোকাবেলা করতে সক্ষম। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে সেখানে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা একটুকরো জমি কোথাও অনাবাদী ফেলে রাখে না। সেদেশের রাস্তার দুধারে তাকালেই লক্ষ লক্ষ ফলবান বৃক্ষের সারি দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো সৌন্দর্যবৃদ্ধির সাথে সাথে অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করেছে।
তারা এক সারিতে নয় সাত সারিতে এসব গাছের চারা লাগিয়ে দিচ্ছে। এবং গাছগুলোর নিচে যে খালি জায়গাগুলো পড়ে থাকছে তাতেও তারা বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ করছে। পরিশ্রমের দ্রুত গতিতে চীনারা এগিয়ে চলেছে শুধু সামনের দিকে সাফল্যের দিকে। তাদের কোথাও কোন কিছুর কমতি নেই বরং বেড়েই চলেছে উত্তরোত্তর।
মৎস্য উৎপাদনেও চীনারা অনেকখানি এগিয়ে গেছে। বিপ্লবের আগে সেদেশে যেসব মাছের নাম তারা জানত না মাও সে তুঙ এর চীনে এখন তা প্রতিদিনের খাবার তালিকাভুক্ত হয়েছে। লেখক দেখেছেন তারা কোন জলাশয় খালি ফেলে রাখেনা। প্রত্যেকটি জলাশয়ে মাছ চাষ করে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে তারা বিশ্ববাজারে মাছ রফতানী করার কাজে ব্যস্ত। বন্যার প্রমত্ততাকেও চীনারা রুখে দিয়েছে তাদের প্রখর বুদ্ধিমত্তার গুণে।
হোয়াংহো ইয়াংসি প্রভৃতি নদীর খর-ধারাকে তারা কোন উন্নত যন্ত্র নয়- বাঁশ, ঝুড়, কাঠ আর কোনাল দিয়েই বাঁধ দিয়ে দিয়েছে। বন্যা প্রতিরোধের সাথে সাথে তারা মরু অঞ্চলকেও করেছে সুজলা, সুফলা। লেখক দেখেছেন চীনের উষর ভূমিও এখন শস্যে ভরেছে। সাম্রাজ্যবাদী শোষণের মত প্রকৃতির শোষণও সেদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে চিরতরে।
নতুন চীনের ইস্পাত শহর আনসানে গিয়েছিলেন লেখক। চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা আনসান ষ্টীল এর আয়রন ফ্যাক্টরীটি পরিদর্শন করাই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য। বিরাট এই কারখানায় ঢুকে লেখকের মনে হয়েছিল এটি কোন সাধারণ ফ্যাক্টরী নয়, যেন একটি আস্ত শহর।
সাম্রাজ্যবাদের আমলে এই কারখানায় প্রায় দশহাজার শ্রমিক কাজ করত। তারা ছিল এখানকার দাস শ্রমিক। এদের মজুরী এতই কম ছিল যে দুবেলা দুমুঠো খাবারের সংস্থান পর্যন্ত তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠত। শেষকৃত্যের খরচ যোগাতে পারত না বলে আত্মীয়-স্বজনের মৃত দেহগুলি ফ্যাক্টরীর একটি গর্তে ফেলে দিয়ে সৎকার করা হতো।
নতুন শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দেড়লক্ষ। সাম্রাজ্যবাদীরা চলে যাবার সময় ভেবেছিল এ কারখানা চালু করতে তাদের অন্তত চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় লেগে যাবে। কিন্তু তারা চলে যাবার পর চীনারা চল্লিশ দিনও এ কারখানা বন্ধ রাখেনি। বিদেশী শাসন ও শোষণ মুক্ত চীনে প্রত্যেকটি মানুষই পেয়েছে নতুন করে বাঁচবার অধিকার, মানুষের অধিকার। লেখক শিল্প শহর আনসান ঘুরে দেখেছিলেন সেখানে প্রতিটি শ্রমিকের জন্য রয়েছে আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং আনন্দের নিশ্চিত ব্যবস্থা ।
চীনের মহান নেতা মাও সে তুঙকে কাছ থেকে জানবার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। বিপ্লবী নেতা মাও সে তুঙ শুধু একজন রাজনীতিবিদই নন, একজন উঁচু দরের কবিও। তাঁর কবিতার মূল সুর বিপ্লব। সেখানে কল্পনাবিলাসীর ছোঁয়া মেলেনা। মাও সে তুঙ চীনের বাহাত্তর কোটি মানুষকে প্রকৃত মানুষ হবার পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর উন্নত আদর্শ ও সঠিক দিকনির্দেশনায় নতুন চীনের প্রতিটি মানুষ প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়েছে। এরকম রূপান্তরিত একটি মানুষ মাঞ্চু সম্রাট পুষ্ট ।
বিপ্লবের পূর্বে চীনের মাঞ্চু সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ছিলেন পুঈ। তার সাথে লেখক দেখা করেন এবং তার জীবনধারার পরিবর্তন সম্পর্কে নানা তথ্য জানতে পারেন। পুঈ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানীদের প্রতিনিধিত্ব করে চীনে চালিয়েছিল নির্মম অত্যাচার। রাজকীয় বিলাসিতায় অভ্যস্ত পুই, বাইরের জগৎ সম্পর্কে সে কিছুই জানত না। সে জানত না কি করে পথে ঘাটে চলতে হয়। রাজপরিবারের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কোন সম্ভাব ছিল না। এক কথায় তাদের হৃদয় ছিল ভাবলেশহীন যান্ত্রিক। মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের মধ্যে ছিল না।
কিন্তু নতুন চীনে সে এখন নতুন পুঈ। তার সরল স্বীকারোক্তিতে সে বলে অতীতের পুঈ আর বেঁচে নেই; সে মরে গেছে। বিগতদিনের কথা স্মরণ করতে সে লজ্জা পায়। ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে সে অতীতের অত্যাচারী সম্রাট পুঈকে।

নতুন চীনে সে এক বোটানিকেল গার্ডেনের তত্ত্বাবধায়ক। ১৯৪৯ সালে কমিউনিষ্ট পার্টি ক্ষমতায় এলে পুঈ ভেবেছিল এবার তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে। কারণ চীনের ইতিহাসে যখনই কোন রাজবংশ ক্ষমতা দখল করেছে তখনই সিংহাসনচ্যুত সম্রাটদের সংগে তার গোটা পরিবারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। কিন্তু তার ধারনা সত্য প্রমাণিত হয়নি।
সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বন্দী পুঈকে চীনে এনে তাকে রাখা হয় কমিউনিষ্ট পার্টির বন্দী শিবিরে। এ শিবির মানুষকে শাস্তি দেবার জন্য নয়। এ শিবির ব্যক্তির শোধনাগার। এখানে মানুষ ফিরে পায় তার লুপ্ত হয়ে যাওয়া মনুষ্যত্ব। এই শিবিরেই তার আত্মিক শুদ্ধি ঘটে। এবং সে নিজেকে একজন নতুন মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করে। সে আজ সর্বস্তরের মানুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। বিপ্লবোত্তর দেশে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষের জীবনে অভ্যন্ত হতে পেরে গর্বিত। এমনি করেই বদলেছে চীনের প্রতিটি মানুষ চানের পুরোনো পরিবেশ। লেখক দেখেছেন সে দেশের প্রতিটি মানুষই সততার জীবন্ত ভাস্কর্য।
চীনের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে লেখক স্পষ্ট করে বুঝতে পেরেছিলেন এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাতিন আমেরিকার কৃষক, শ্রমিক, সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য চীন মুক্তির এক সুমহান আদর্শ এবং সেই লক্ষ্যে কিভাবে পৌঁছানো যায় সে সম্পর্কে প্রক্রিয়াগত পদ্ধতিগুলো শিখিয়ে দিয়ে নতুন চীন এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিন
মওলানা ভাসানী রচিত চীন ভ্রমণ কাহিনীতে পাকিস্তানের সাথে গণচীনের তুলনামূলক আলোচনার বিষয়টি গুরত্বপূর্ণ। চীন দেশের সাথে স্বদেশের সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ আলোচনায় দু’দেশের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে আকাশ- পাতাল ব্যবধান তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে। আবার সাদৃশ্যও খুঁজে পেয়েছেন তিনি কোথাও কোথাও। এরকম দৃষ্টান্ত খুব কম হলেও এ সংক্রান্ত আলোচনা রয়েছে তাঁর গ্রন্থে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে চীন দূরপ্রাচ্যের একটি দেশ হলেও এটি বৃহত্তর এশিয়া মহাদেশের একটি বৃহত্তম দেশ। একই মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত দু’টো দেশের একটির ব্যাপক অগ্রগতি এবং অপরটির চরম অধঃগতি এই বৈপরীত্য লেখককে যেমন পীড়া দিয়েছে, তেমনি আবার উদ্দীপ্তও করেছে। গ্রন্থের শুরুতেই তিনি বলেছেন :
চীন দেখে এসেছি। এখন আমার যে বয়স তাতে নতুন করে দীক্ষা নেবার সময় নেই। সম্ভবও নয়। কিন্তু তবু চীন, মাও সে তুঙ আর তাঁর সাধীদের হাতে গড়া বাহাত্তর কোটি মানুষের দেশ চীন দেখে আমি অন্তত নতুনভাবে নিজেকে, আমার দেশকে চিনতে পারার সুযোগ পেয়েছি। এই আত্মোপলব্ধি আমার নিজের কতখানি রূপান্তর আনতে পারবে, তা বলা কঠিন; আর আমার দেশকেই বা কতখানি সাহায্য করতে পারব সে প্রশ্ন আমার কাছেই দুরূহতর। ২
চীনের সীমান্ত শহর কুনমিং বিমানবন্দরে পা রেখেই লেখক সেদেশের সাথে পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনার পার্থক্যটি বুঝতে পেরেছিলেন। পাক-সরকার মনে করে সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হলে শত্রুরা সহজেই দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে পারে এবং দেশের ক্ষতি করতে পারে। এই যুক্তিতে বিশ্বাসী পাকিস্তান সীমান্ত এলাকাকে বছরের পর বছর ধরে অনুন্নত অবস্থায় ফেলে রাখছে এবং দেশের অগ্রগতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে চীন সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সাথে সীমান্ত শহরের যোগাযোগের সুবিধার্থে সেখানকার যাতায়াত ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে এবং এ ব্যাপারে সেদেশের প্রত্যেকটি নাগরিকই গভীরভাবে সচেতন। নিজ দেশের খোঁড়া যুক্তি আর অন্ধ স্বার্থপরতা তাঁর মনকে তীব্র ঘৃণায় সংকুচিত করে তুলেছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন
কুনমিং চীনের এক সীমান্ত শহর। এখানকার বিমান বন্দরটি নতুন নির্মিত। চীনের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে আমাদের দেশের সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যটা এখান থেকেই বুঝতে শুরু করলাম। চীনা জনসাধারণ দেশব্যাপী যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নততর করার জন্য প্রতাহ কোথাও না কোথাও নতুন রেলপথ, স্থলপথ কিংবা বিমান বন্দর নির্মাণ করছে।
সীমান্ত এলাকার সাথে দেশের দূরতম অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুততর করা তাদের প্রয়াস। আর আমরা সীমান্ত এলাকাকে যাতায়াতের দিক দিয়ে উপেক্ষিত রেখে নিচ্ছি। কারণ আমাদের আতঙ্ক হচ্ছে যে, আমাদের তৈরী রাস্তা দিয়ে যদি শত্রু ঢুকে পড়ে। পূর্ব-পাকিস্তানে বিমানবন্দর নির্মাণে আমাদের সরকারের অসীম অনিচ্ছা- যুক্তি কি না দেশরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন উদ্ভট যুক্তি বিশ্বের অন্য কোন দেশে কেউ কখনও তুলেছেন কিনা আমার সন্দেহ আছে।
চীনের সবুজ শ্যামলিমা লেখককে মুগ্ধ করেছে। এতদিন সোনার বাংলার সবুজ দেখে তাঁর মুগ্ধ দুচোখ চীনের সবুজ দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়েছে। অরণ্যানী ঘেরা স্বদেশের কথায় লেখক বলেছেন চীনের সবুজ দেখলে বোঝা যায় বাংলার সৌন্দর্য ক্রমশই লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কারণ চীনের মতো বাংলায় পরিকল্পিতভাবে গাছপালা লাগানোর কোন সরকারী বেসরকারী উদ্যোগ নেই।
আমরা বলি আমাদের দেশ সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা কিন্তু দিন দিন শ্যামলিমা আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পিকিং বিমান বন্দরে নেমে দেখলাম সবুজের সমারোহ। বিমান বন্দর থেকে শহর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে লক্ষ লক্ষ গাছ, সবগুলিই প্রায় নতুন লাগানো। আমার ধারণা আগামী দশ বৎসরের মধ্যে এই লক্ষ লক্ষ গাছের নাম হবে কোটি কোটি টাকা। চীনের প্রত্যন্ত প্রদেশগুলি ঘোরার সময় দেখেছি সারা দেশব্যাপী বৃক্ষ রোপনের বিপুল উদ্যোগ। শুনেছি গত ১৪ বছরে চীনের ৭০ কোটি মানুষ ২০০ কোটি নতুন গাছ লাগিয়েছে। সমগ্র দেশের প্রাকৃতিক রূপ গত দশ বছরে অনেক বদলে গেছে। 8
স্বদেশের কিছু প্রচলিত ধারণার সাথে লেখক চীন দেশের আসল চেহারার কোন মিল খুঁজে পাননি। নিজ দেশের উদ্ভট বানোয়াট যুক্তি, আশ্চর্য সব গল্পগাঁথা চীন ঘুরে তাঁর কাছে একেবারেই হাস্যকর মনে হয়েছে। এসব বাজে প্রচারণার তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কমিউনিষ্ট দেশে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বাঁধা ব্যক্তিজীবন মর্যাদাহানির যে চিত্র পাকিস্তানে পরিচিতি পেয়েছে তার বিরুদ্ধাচরণ করে তিনি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করেছেন।
চীন দেশ ঘুরে দেখলাম এত বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারেনা। চীনের মানুষ, সে রিক্সাচালক হোক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হোক, তার কর্মক্ষেত্রের বাইরে একজন থেকে আরেকজনকে স্বতন্ত্র করে চেনা সম্ভব নয়। মাও সে তুঙ এবং চীনের বিপ্লবীরা মানুষকে যে আত্মসম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন আমাদের দেশে তা অকল্পনীয়। ৫
মাও সে তুঙ এর দেশে লেখককে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করেছে সে দেশের লোকের হাসি। লেখক নিজ দেশে ফিরে এসে সে হাসির সংগে স্বদেশের মানুষের মুখ মিলিয়ে দেখেছেন খুঁজে পাননি সেই স্বতঃস্ফূর্ত হাসি । বাংলার মানুষ দারিদ্র্যের চাপে হাসতে ভুলে গেছে। তারা কোনরকমে জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গলদঘর্ম হচ্ছে।

অপরদিকে চীনারা টিকে থাকার জন্য নয়, বেঁচে থাকার সংগ্রামে জয়ী হয়ে মানুষের মত বেঁচে আছে। চীনের মানুষের সামগ্রিক সচেতনতা এবং পাশাপাশি নিজ দেশের মানুষের শুধুমাত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম তাঁকে আহত করেছে। তিনি অবাক হয়েছেন এই ভেবে- একই মানুষ দেশে দেশে অথচ স্বভাবদোষে তাঁর স্বদেশ কিভাবে প্রত্যাশিত জীবন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সাম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী, আমলাতান্ত্রিক শাসন-শোষণের অভিশাপ যুক্ত নতুন চীনের চেহারা লেখককে স্বস্তি দিয়েছে। যে শাসন ব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় ধনিক শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে এবং সমাজে শ্রেণীবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে সেই স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার হাত থেকে চীন আজ মুক্ত। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের কথায় তিনি মুষড়ে পড়েছেন। আহত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন-
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আমাদের আমলাতন্ত্র তাদের সাম্রাজ্যবাদী দীক্ষাগুরুদের নিকট থেকে প্রাপ্ত মনোভাব আজও ত্যাগ করতে পারেনি। ফলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে প্রগতির স্থান নিয়েছে প্রতিক্রিয়া, উন্নয়নের বদলে উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতা, জনসাধারণের অধিকারের অস্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো ধ্বংস সাধন। ৬
সেদেশে মানুষে মানুষে পার্থক্য লেখকের চোখে পড়েনি। একদিন কৃষি বিভাগের কয়েকজন পদস্থ সরকারী চীনা কর্মকর্তাসহ তিনি কমিউন দেখতে যান। সেখানে তাদের দেখে কমিউন চাষীরা কেউ তটস্থ হয়ে ওঠেনি। বরং পদস্থ কর্মচারীরাই তাদের সাথে বিনীতভাবে কথা বলেছেন। এ দৃশ্য লেখকের অন্যভ্যস্ত চোখকে বিস্মিত করেছিল কারণ স্বদেশের মাটিতে এমন চিত্র কখনই তাঁর চোখে পড়েনি।
পাকিস্তানে তিনি বরাবরই দেখে এসেছেন পদস্থদের সামনে অধীনস্থদের কেমন একটা বিপন্ন ভাব যা একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনে বড় ভূমিকা পালন করেছে কমিউন ব্যবস্থা। লেখক সেদেশের বহু জায়গা ঘুরে দেখেছেন কমিউন ব্যবস্থার গুণে পাল্টে গেছে সেখানকার সামগ্রিক চিন্তাধারা। চীন ঘুরে লেখক কোথাও সম্বলহীন লোক দেখতে পাননি। অথচ পাকিস্তানের যত্রতত্র চোখে পড়ে অসহায় মানুষের ভীড়।
চীন দেশের সাথে লেখক স্বদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের পার্থক্যটিও লক্ষ করেছেন। নিজ দেশে রাজস্বের বেশীটাই মাথাভারী ও গণস্বার্থ বিরোধী আমলাতন্ত্রের পেছনে যায় করা হয়। তার উপর নানা শর্তে বিদেশী ঋণভারে জর্জরিত হওয়া সত্ত্বেও হাহাকার শোনা যায় শাসন বায় মিটিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যহত হচ্ছে অর্থাভাবে। আর এই অজুহাত দিয়ে মোটা অংকের খাজনা চাপানো হচ্ছে অসহায় অনাহারক্লিষ্ট নিরুপায় মানুষের কাঁধে।
চীনের রাষ্ট্রীয় বায় পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশী। তা সত্ত্বেও সেখানকার মানুষের ওপর বাজনার ভার অনেক কম। তাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান এবং বাস্তবমুখী। প্রশাসন যাতে বায় চীন সরকার সীমাবদ্ধ রেখেছেন। আমলাতন্ত্র সেখানে নেই। নিজ দেশের কথায় লেখক বলেছেন দেশের রাজস্বের সিংহভাগ আমলাতন্ত্রের পেছনে ব্যয় করা হয় আর এজন্য পবিত্র অসহায় মানুষের ওপর চাপানো হয় ট্যাক্স খাজনা।
চীনে ট্যাক্স, খাজনা পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম। সেখানে কৃষকরা কৃষি আয়কর ছাড়া অন্য কোন কর দেয়না। লেখক বলেছেন চীন যেভাবে আমলাতান্ত্রিক চক্র থেকে দেশকে মুক্ত করেছে তা জানবার জনা পাক-প্রশাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রতিনিধিদল সেদেশে পাঠানো উচিত।
নতুন চীনে প্রত্যেকটি মানুষের আয় প্রায় সমান। যা কিছু তারতম্য আছে তা প্রায় চোখে পড়ে না। পাকিস্তানে এই তারতম্য প্রকট। স্বদেশের কথায় লেখক বলেছেন দেশে কিছু লোক আছে যারা টাকা খরচের উপায় খুঁজে পায় না যেখানে সিংহভাগ লোকই দারিদ্র্য সীমার নীচে জীবনযাপন করে।
চীনের এমন কোথাও কোন পদস্থ ব্যক্তি তাঁর নজরে পড়েনি যাকে কৃষক মজুরদের সাথে বছরে এক মাস কাজ করতে না হয়েছে। তিনি সেদেশের মানুষের মধ্যে কোন অহমিকা বোধ দেখতে পাননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে রিক্সাচালক পর্যন্ত সবাই সেখানে সমমর্যাদা সম্পন্ন। নিজ দেশের কথায় তিনি বলেছেন পাকিস্তানে এমনটি চিন্তাও করা যায় না। মানুষে মানুষে প্রভেদ চোখে পড়ে দেশের সর্বত্র।
ঔপনিবেশিক শাসনাক্রান্ত দেশগুলোতে দুর্নীতি যেভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিল স্বাধীনতার পরেও সেসব থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন সম্ভব হয়নি। চীনের কোথাও কোন দুর্নীতি তাঁর নজরে পড়েনি। দশ ভাগ মানুষের শোষণ থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করে তারা নব্বই জনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করেছে।
পাকিস্তানের শাসনব্যাবস্থার কথায় লেখক বলেছেন রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুর্নীতিতে ভরা। পাকিস্তানে রয়েছে দু’টো শ্ৰেণীঃ একটি শোষক ও অপরটি শোষিত শ্রেণী। এই শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব দেশের সর্বত্রই স্পষ্ট।
তিনি আরও বলেছেন চীন থেকে পাকিস্তানের শিক্ষা নেয়া উচিৎ কি করে কোন প্রক্রিয়ায় দেশকে শোষণ মুক্ত করতে হয়। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চীনের মানুষের কিভাবে নৈতিক উন্নতি ঘটেছে তা লেখকের চোখ এড়ায়নি।
চীনাদের সততা লেখককে মুগ্ধ করেছে। তিনি পিকিং এর এক কাপড়ের দোকানে গিয়েছিলেন কিছু কাপড় কেনার জন্য। দোকানী তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিল ফেরার পথে হংকং থেকে কিনে নিতে। হংকং এ দাম কম পড়বে বলে সে জানিয়েছিল। নিজ দেশের কোথাও তিনি এমন ব্যবহার পাননি কখনও। একজন সাধারণ দোকানীর কাছে পাওয়া এরকম সৎ ব্যবহার তাঁকে অবাক করেছিল। চীনের কোথাও বখশিশ প্রথা তাঁর চোখে পড়ে নি। সেখানে কাউকে বখশিশ দিতে চাইলেও সে তা প্রত্যাখ্যান করে। অথচ পাকিস্তানের সর্বত্রই এ প্রথা এক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের মানুষকে চেয়ারম্যান মাও সে তুঙ আর তার সহকর্মীরা কি আশ্চর্যভাবে রূপান্তরিত করেছেন, না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না। আমি একদিন পিকিং এর এক কাপড়ের দোকানে কি একটা যেন কিনতে গিয়েছিলাম। দোকানদার আমাকে একটা কাপড় দেখিয়ে বলল-
ঃ আপনি এটা এখান থেকে না কিনে ফেরার পথে হংকং থেকে কিনলে অনেক সস্তায় পাবেন। এ ধরনের কাপড় হংকং এ দাম কম। মানুষ এত সৎ হতে পারে?

তিনি লক্ষ্য করেছিলেন বিপ্লবের পরে চীনের সর্বত্রই বহু রাস্তা, ব্রিজ, বাঁধ নির্মিত হয়েছে যা একবারও ভাঙ্গেনি বা ফাটল ধরেনি কোথাও। দেশের কথায় লেখক বলেছেন স্বাধীনতার পরে পাকিস্তানেও কিছু কিছু নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর প্রায় সবগুলোই ভেঙ্গেছে বা ভাঙ্গনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও লেখক নিজ দেশের সাথে চীনের বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন। যে মন্থরতা স্বদেশের বিচার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য চীনে তা অনুপস্থিত।
সেদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার বহু তফাৎ লক্ষ্য করেছেন তিনি। চীনের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় সেখানে কোন নিরক্ষর লেখকের চোখে পড়েনি। সমগ্র চীন জুড়ে প্রতিটি মানুষকে শিক্ষিত করে তুলবার বিরাট আয়োজন তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সেখানে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রী সেদেশে বিনা বেতনে অধ্যয়ন করে।
চীনের কমিউন ব্যবস্থা লেখকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। কমিউনের মাধ্যমেই যে সমগ্র দেশ আজ সাফল্যের শিখরে এসে পৌঁছিয়েছে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। গণচীনের দৃষ্টান্তমূলক সাফল্যের পাশাপাশি স্বদেশের হাজারো সমস্যা জর্জরিত বিপন্ন চিত্রটি তাঁকে স্বভাবতই পীড়া দিয়েছে।
সেদিন কমিউনের বন্ধুদের কাছে বিদায় নিয়ে হোটেলে ফেরার পথে গণচীনের এই আশ্চর্য সাফল্যের পাশাপাশি আমার স্বদেশের সমস্যাকীর্ণ ছবিটিই আমার চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছিল। পূর্ব- পাকিস্তান সহ গোটা পাকিস্তান আজও একটি কৃষিপ্রধান দেশ।
আমাদের দেশে শিল্পের যেটুকু বিকাশ ঘটেছে তা নিতান্তই সীমাবদ্ধ। সরকারী হিসাবেই এটা পাওয়া যায় যে, আমাদের দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা মাত্র বারো ভাগ আসে শিল্প থেকে। ভাই, আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতির বিকাশের মূল নিহিত রয়েছে কৃষি অর্থনীতির অগ্রগতির মধ্যে অথচ এক সর্বনাশা সংকট গ্রাস করেছে আমাদের কৃষি অর্থনীতিকে। ফলে জনসংখ্যার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কৃষকদের জীবনকে ঘিরে রেখেছে দুঃখ দুর্দশার অন্ধকার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের মাতৃভূমি পরিণত হয়েছে চির দুর্ভিক্ষের দেশে। ৮
সিল্কের দেশ হিসেবে খ্যাত চীনের কোন মানুষকে লেখক সিল্ক কাপড় পড়তে দেখেননি। সেখানকার কোন মানুষ বিলাসীতা পছন্দ করে না। তারা প্রত্যেকেই সুতী কাপড় পরে এবং তাদের পোশাকের রং নীল। বিপ্লবের আগের চীনে শীত কাপড়ের অভাবে লোক মারা যেতো। কিন্তু বিপ্লবোত্তর চীনে একটি লোকও আর বস্ত্রের অভাবে মরছে না। বিপ্লবের আগের চীনের সাথে তিনি স্বদেশের চেহারার হুবহু মিল দেখতে পেয়েছেন।
তিনি লক্ষ্য করেছেন চীনারা একটুকরো জমিও অনাবাদী রাখে না। প্রতিবছরই তারা খাদ্য উৎপাদনের পরিমান বাড়িয়ে চলেছে। এক সময়ের চির দুর্ভিক্ষের দেশ নামে পরিচিত চীন এঁকোর বলে বলীয়ান হয়ে নিজ দেশের সমস্ত সমস্যা মোকাবেলা করে এখন পৃথিবীর যে কোন দু’-চারটি স্থানের দুর্ভিক্ষের মোকাবেলা করতে সক্ষম। চীনের সাথে পাকিস্তানের তুলনা করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন পাকিস্তানে প্রচুর জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে যার কোন সদ্গতি করা হয় না।
আজ চীনে এক টুকরো জমিও বিনা চাষে পড়ে নেই। আমাদের দেশের প্রতিটি অঞ্চলই আমি পরিভ্রমণ করেছি পায় হেটে, নৌকায় করে, ঘোড়ার পিঠে চেপে, গরুর গাড়ীতে করে, দেখেছি রাস্তার দুধারে হাজার হাজার একর জমি পতিত হয়ে যুগ যুগ ধরে পড়ে রয়েছে।
চীন অনেক বড় দেশ। মানুষও বেশী এখানে। তবে এত বড় দেশের কোথাও লেখক অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখতে পাননি কখনও। পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে চীনারা খুব সচেতন। নিজের দেশের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন পাকিস্তানে পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ উদযাপন করে পথ-ঘাট পরিষ্কার করা হয় বটে, তবে সপ্তাহ গেলেই তা আবার স্তুপীকৃত হয়ে ওঠে। লেখক তুলনামুলক আলোচনায় বোঝাতে চেয়েছেন চীনারা কোন প্রকার আড়ম্বর ছাড়াই মূল কাজে আগ্রহী আর পাকিস্তানীরা কাজ নয় আয়োজনকেই বড় করে দেখে।
পাকিস্তানের সাথে গণচীনের প্রাকৃতিক দৃশ্যের কিছুটা মিল লেখককে আপন দেশের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিল। বাংলার উর্বর মাটিকে যদি দেশের জনগণের শ্রমশীল হাত আরও উপযোগী করে তুলতে পারতো তাহলে চীনের মতো পাকিস্তানও সমস্ত সংকট কাটিয়ে উঠতে পারত বলে লেখকের বিশ্বাস ।
রেল পথের দু’ধারে সেদিন দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ দেখতে দেখতে আমার স্বদেশের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। যব আর গমের আন্দোলিত শীর্ষের অপূর্ব সমারোহ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামলীম মাটির বুকেও সঞ্চিত রয়েছে যে সুধা, শ্রমকিনাঙ্ক হাতের স্পর্শে তা হেমন্তে এমনি করেই ভরে তোলে ফসলের মাঠ, অবশ্য অনাবৃষ্টি বা বন্যা যদি না তা আগেই গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু সেই সোনার ফসল কতটুকু যায় কৃষকের ঘরে ১০
চীন সম্পর্কে বহু অপবাদ ও অপব্যাখ্যাকে লেখক ভুল প্রমান করেছেন। সমাজতান্ত্রিক দেশের যে ভয়াবহ চিত্র অন্যান্য দেশ এবং তাঁর স্বদেশ তুলে ধরেছিল তা চীন না দেখলে তাঁর কাছে অজানাই থেকে যেত বলে তিনি জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কখনই স্বীকৃতি দেবেনা বলে যে গুজব রয়েছে তাও ভুল। লেখক সেখানে গিয়ে দেখেছেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদই সমাজতান্ত্রিক এই দেশটিকে সবচেয়ে বেশী মর্যাদা দিয়েছে।
চীন ভারত আক্রমণ করেছিল; একথাও মিথ্যে কিংবদন্তী হয়ে আছে। এ ব্যাপারে তিনি মার্কিন জেনারেল ম্যাক্সওয়েল টেলারের রিপোর্টটি পড়ে দেখবার অনুরোধ জানিয়েছেন। চীন যে অপরের এলাকা গ্রাস করেনি বার্মা, নেপাল, পাকিস্তান আরও অন্যান্য দেশের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিই তার প্রমাণ।
তিনি চীনকে বিশ্বের সাথে তুলনা করে দেখেছেন সেদেশকে বাদ দিয়ে বিশ্ব হয়ে পড়ে খন্ডিত। চীন পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের বন্ধু, মুক্তির দিশারী। পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদকে তাড়িয়ে চীন আজ পুরোপুরি শোষণ মুক্ত স্বনির্ভর দেশ। নতুন চীন বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে নতুন জীবনের এক মহামন্ত্র।

চার
মাও সে তুঙ এর দেশে ভ্রমণ কাহিনী হলেও সমাজতান্ত্রিক চীনের একটা পরিচিতি গ্রন্থও বটে। এর প্রতিটি বাক্যে প্রকাশ পেয়েছে সমাজতন্ত্রের প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা ও কমিউনিষ্ট সমাজব্যবস্থায় তাঁর অবিচল সমর্থন। তাঁর চীন ভ্রমণ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও তিনি কারও মুখের দিকে চেয়ে কথা বলেননি। তিনি বর্ণনায় কোথাও অস্পষ্ট নন, সংকুচিত নন। সপ্রতিভ প্রকাশ ভঙ্গির ঋজুতা তাঁকে দিয়েছে এক আলাদা বৈশিষ্ট্য।
তাঁর রচনাশৈলী সাবলীল। জ্ঞানী জননেতার অনর্গল বলতে পারার ক্ষমতা লেখনীতেও স্পষ্ট ছাপ রেখেছে। সমগ্র গ্রন্থটিতে তাঁর কমিউনিষ্ট আদর্শে উজ্জীবিত মানসলোক যেমন করে আন্দোলিত তেমন আর কোন কিছুই জোরালো হয়ে উঠতে পারেনি। চীন দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে, সেদেশ সম্পর্কে তাঁর ভালোলাগাগুলোকে অবাধ আবেগে লিখেছেন তিনি। তবে তা তথ্য নিষ্ঠাকে কখনও অতিক্রম করেনি। সমাজতান্ত্রিক দেশটি সম্পর্কে সবটুকু বলেও তিনি না বলতে পারার বেদ নয় আহত হয়েছেন।
চীনকে যেভাবে দেখিয়াছি, যেভাবে অনুভব করিয়াছি, আমার অক্ষমতার জন্য তাহার গভীরতা আপনাদের সামনে হাজির করিতে পারিলাম না। যে কথাটি যেমন করিয়া বলিতে চাহিয়াছি, তেমন করিয়া বলিতে পারিলাম কই? আর তাই এ কথাটি অকপটে উল্লেখ করিয়া রাখিতে চাই যে, যে- চীনের চিত্র আমার এই বইটিতে প্রকাশিত হইল, চীন তাহার চাইতেও অনেক মহৎ, চীনের মানুষ আরও অনেক বড়। ১১
তাঁর সফর অভিজ্ঞতা পড়তে গিয়ে কেবলি মনে হয়েছে এ যেন কোন অদেখা চীন নয়। বর্ণনাশৈলীর স্বচ্ছ পারিপাট্যে তিনি যেন একটি দৃশ্যমান চীনকেই পাঠকের চোখের সামনে এনে হাজির করেছেন। ভ্রমণ করার জন্যই যে তিনি ভ্রমণ করেননি এ গ্রন্থই তার উপযুক্ত প্রমাণ। সৌখিন ভ্রমণে অনেকেই যান। পূর্ব- পাকিস্তানের এমন অনেকেই বহু দেশ ভ্রমণে গিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বয়সে তরুণও ছিলেন কিন্তু এভাবে আর কেউ এই মননশীল পরিশ্রমলব্ধ জ্ঞানে কিছু বলেও যাননি- লিখেও না।
বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধতাকে ডিঙ্গিয়ে লেখক যেমন চীনের বহু জায়গা ঘুরে দেখেছেন তেমনি তাঁর বর্ণনাকেও করে তুলেছেন সম্পূর্ণ সুন্দর। তাঁর পুরো বর্ণনায় কোথাও কোন অবসন্নতা চোখে পড়ে না। এর মূলে রয়েছে লেখকের কর্মঠ মন। কোথাও এতটুকু নিরাপ্তরিক নন তিনি।
চীনকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস গ্রন্থের সর্বত্রই লক্ষ্য করা যায় এবং এ ব্যাপারে তাঁর গভীর আন্তরিকতা, ধৈর্য ও অক্লান্ত পরিশ্রম স্বতোৎসারিত, সহজাত। কেন তাঁর এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়াস ? একি চীনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত নাকি কমিউনিষ্ট রাজনৈতিক মনোভাব । প্রকৃত পক্ষে এসব সন্দেহ তর্ক বিতর্ক সব কিছুকেই ছাপিয়ে উঠেছে তাঁর সত্যানুসন্ধিৎসা যা চীন সম্পর্কে একটি অখন্ড সত্যকে উচ্চারণ করেছে সরলভাবে।
চীনের কাছ থেকে শেখার এবং চীন সম্পর্কে আরো বেশী জানার প্রয়োজন আমাদের। পৃথিবীর রূপ পরিবর্তনের মহাপ্রয়াসে চীন প্রতিদিনই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ সত্য আজ আর কারো পক্ষে অস্বীকার করে লাভ নেই। কোন দেশের কোন সামরিক একনায়ক চীন সম্পর্কে কি বলল, চীনের প্রভাব এবং তার মহত্ব বিচারে তা কোন মাপকাঠি নয়।

এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাতিন আমেরিকার শোষণমূলক সমাজ ব্যবস্থায় জর্জরিত সকল দেশের সকল সরকার যদি একই সঙ্গে চীনের বিরোধিতা করে, তবুও চীন চীনই থাকবে। চীন থাকবে এ তিন মহাদেশের মুক্তিকামী মানুষের মনে শক্তি, অনুপ্রেরণা আর আদর্শের দীপ শিখার মত। ১২
তিনি চীন সম্পর্কে নিন্দুকের সমস্ত মিথ্যাচারকে পরীক্ষা করে মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন এবং দিয়েছেন প্রয়োগিক ব্যাখ্যা। শুনতে পাওয়া আর দেখতে পাওয়ার ভেতর যে বিস্তর ফাঁক রয়েছে তা তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার হয়েছে। ভুল আক্রান্ত মানুষের ভাবনাগুলোকে তিনি সত্য আর সুন্দরের অকাটা যুক্তিতে সাজিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন।
প্রতিক্রিয়াশীলদের বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি তাঁর সঠিক উপাত্ত উপস্থাপন করে তাঁর শৈলীকে করেছেন উন্নত। চীন ঘুরে লেখক যে বোধের উপলব্ধিতে অন্য মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন তা এই গ্রন্থে গভীর হয়ে উঠেছে। চীন দর্শনের আগে বহু অপপ্রচার অপব্যাখ্যা তাঁর মনে যে দোলাচলের সৃষ্টি করেছিল চীন ঘুরে তা একটি স্থির বিন্দতে এসে দাঁড়িয়াছে। তিনি সবিনয়ে নিজের ত্রুটিকে করুণা করেছেন।
চীন দেখে এসে আজ নিজের উপরই করুণা হচ্ছে। গিয়েছিলাম চেয়ারম্যান মাও সে তুঙ ও কমিউনিষ্ট পার্টির শাসন সম্পর্কে দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব নিয়ে, ফিরে এসেছি মানুষের মহৎ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নিশ্চিত সম্ভাবনা মনে নিয়ে। ১৩
লেখকের নৈপুণ্য গুণে ভ্রমণ-কাহিনীটিতে চীনের সবগুলো দিকের আলোচনাই এসেছে। নতুন চীনের প্রত্যেকটি দিক যেমন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি অর্থাৎ এর অবকাঠামো-উপরিকাঠামোর সামগ্রিক দিকগুলো নিয়ে তিনি খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
চীন সম্পর্কে কোন অস্পষ্টতার অবকাশ তিনি রাখেননি কোথাও। স্বদেশে আন্তর্জাতিকতায় চারিপাশ থেকে চীন সম্পর্কে মিথ্যা গুজব আক্রান্ত লেখক সন্ধানী চোখ মেলে তাকিয়েছেন সে দেশের সর্বত্র। আর তাঁর সত্যোপলব্ধির যথায ব্যবহার ঘটেছে গ্রন্থের বহু জায়গায়। প্রতিভাকে যথাযথ ব্যবহারে তিনি কোথায়ও অপ্রতিভ নন।
চীনে যাবার সুযোগ পাবার পূর্ব পর্যন্ত শুনেছি, কমিউনিষ্টরা শ্রমিকদের বন্দী শিবিরের মধ্যে আটক করে রাখে আর তাদের পিঠে চাবুক মেরে জোর করে কাজ করিয়ে নেয়। চীনে যেয়ে দেখলাম, এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। দেশটাই এখন শ্রমিক আর কৃষকদের। তারাই তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা। চীনের মানুষ যে যে-কাজেই নিয়োজিত হোক না কেন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করে। যাচ্ছে। নির্ধারিত ডিউটির বাইরেও সকলকেই প্রায় পরিশ্রম করতে দেখেছি। জোর করে হয়ত নির্ধারিত ডিউটি করানো যায়; কিন্তু তারপর বাড়তি খাটুনি এবং নিষ্ঠাও কি কেবল চাবুক মেরে আদায় করা যায় ? ১৪
আলোচ্য গ্রন্থে শুধু চীনের চিত্রই নয়, এতে রয়েছে পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদের আংশিক ইতিহাস, নানা দর্শন, চীনের বিপ্লব ও অন্যান্য দেশের সংগে তুলনামূলক আলোচনা। এই তথ্যবহুল আলোচনা গ্রন্থের গুরুত্ব আরও অধিক বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে লেখকের সদা জাগ্রত ও জিজ্ঞাসু মনের পরিচয় সুপ্রকট। রচনাসৌষ্ঠবে ও কাহিনীর সুনিপুণ পরিচর্যায় তাঁর ভাষা ঝকঝকে পরিপাটি ও অলংকার বহুল।
বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে চীনের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পদ্ধতিগুলো যেভাবে লেখকের আত্মোপলব্ধিতে গাঢ় হয়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি তীর্যক ভাষায় স্বদেশের বৈষম্যভরা নড়বড়ে চেহারার যে ছবি তিনি সর্বসমক্ষে অনাবৃত করেছেন তা প্রকৃতপক্ষে তাঁর দেশ কল্যাণের নিভৃততম অনুভূতির প্রকাশ মাত্র।
তবে অতি আবেগ এবং পুনরুক্তি কখনও কখনও রচনার সৌন্দর্য নষ্ট করেছে। চীনের সমস্ত কিছু তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তিনি অনেকটাই মোহগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রতি তাঁর একচেটিয়া প্রশংসা তাঁকে রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট করে তুলেছে মনে হয়।
কমিউনিষ্ট চেতনার কারণেই যেন তিনি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। বর্ণনার বহু জায়গায় বিরুদ্ধবাদীদের মত খন্ডনের প্রয়াসে। তিনি হয়ে উঠেছেন আক্রমণাত্মক। অবশ্য এতে দোষের কিছু নেই। কারণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এটি তাঁর সত্যোপলব্ধির সরল স্বীকারোক্তি ; যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছতা দিয়েছে।
বর্ণনার শেষের দিকে বিপ্লবী নেতা মাও সে তুঙ -এর আর এক অজানা পরিচয়, তাঁর কবিসত্তা এবং রচিত কবিতাসমূহের নানা বিশ্লেষণ গ্রন্থের সাহিত্যিক মূল্য বৃদ্ধি করেছে। সেই সাথে লেখকের শিল্পরূপ বিশ্লেষণের জ্ঞান তাঁর প্রতিভাকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা।
সার্বিক বিচারে ‘মাও সে তুঙ এর দেশে সমাজতান্ত্রিক চীন সম্পর্কে জানবার জন্য ভালো একটি বই। মওলানা ভাসানীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ নৈপুণ্যগুণে এ ভ্রমণ কাহিনী একটি সার্থক সাহিত্য হয়ে উঠেছে। ভালো সাহিত্যের জন্য যে উপাদানগুলো প্রয়োজন তার সবগুলোই রয়েছে এ কাহিনীতে।
গ্রন্থের সর্বত্রই মওলানা ভাসানীর প্রকাশভঙ্গির ঋজুতা, তাঁর ভাষা প্রয়োগ ও বাক্যবিন্যাস খুব সহজেই মনে করিয়ে দেয় মওলানা ভাসানী শুধু একজন বড় রাজনীতিবিদই নন, একজন সুলেখকও বটে। তাঁর মেধা-মনন ও প্রয়োগিক ব্যাখ্যা মিশ্রিত রচনা পাঠককূলে আদৃত হয়েছে। মৌলিক বিচারে কিছু একঘেঁয়েমী থাকা সত্ত্বেও মওলানা ভাসানীর চীন ভ্রমণ কাহিনী ঔজস্বী শৈলী গুণে সুপাঠ্য ও সুসাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।