আজকের আলোচনার বিষয়ঃ নয়াচীনে এক চক্কর । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের চীন ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

নয়াচীনে এক চক্কর । ইব্রাহীম খাঁ
১৮৯৪ সালে টাঙ্গাইল জেলার শাহবাজ নগর গ্রামে ইব্রাহীম খাঁর জন্ম হয়। তিনি ১৯১২ সালে পিংলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রাস, ১৯১৪-তে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে এফ.এ. ১৯১৭-তে কলকাতা সেন্টপলস কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স, এবং ১৯১৯ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে এম.এ. পাশ করেন। শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর জীবন শুরু। টাঙ্গাইলের করটিয়া ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয়কে ন্যাশনাল স্কুলে পরিণত করা তাঁর জীবনের প্রথম কৃতিত্ব।
১৯২৪ সালে আইন পাশ করে তিনি ময়মনসিংহের জজকোর্টে ওকালতি পেশায় যোগদান করেন। ১৯২৬ সালে করটিয়ার সাদত কলেজ প্রতিষ্টা তাঁর জীবনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজনীতির সংগে জড়িত ছিলেন।
তিনি ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের মনোনয়নে অবিভক্ত বাঙলার আইন পরিষদের সদস্য, ১৯৫৩-তে গণ-পরিষদের সদস্য এবং ১৯৬২-তে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে তিনি যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে ভুয়াপুর হাই স্কুল, ভুয়াপুর বালিকা বিদ্যালয়, ভুয়াপুর কলেজ, করটিয়া জুনিয়র গালর্স মাদ্রাসা ইত্যাদি।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে নাটক : ‘কামাল পাশা’ (১৩৩৪ বাং), ‘আনোয়ার পাশা’ (১৩৩৭বাং), ‘ঋণ পরিশোধ’ (১৯৫৫ইং), ‘ভিস্তি বাদশা’ (১৩৫৭বাং), ‘কাফেলা’; উপন্যাস : ‘বৌ বেগম’ (১৯৫৮); গল্প গ্রন্থ : ‘আলু বোখরা’ (১৯৬০), ‘উস্তাদ’ (১৯৬৭), ‘দাদুর আসর’ (১৯৭১), ‘মানুষ’; স্মৃতিকথা : ‘বাতায়ন’ (১৩৭৪ বাং), ‘লিপি সংলাপ’; ভ্রমণ কাহিনীঃ ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’ (১৯৫৪), ‘পশ্চিম পাকিস্তানের পথে ঘাটে’ (১৯৫৫); শিশু সাহিত্যঃ ‘ব্যাঘ্র মামা’ (১৯৫১), ‘শিয়াল পন্ডিত’ (১৯৫২), ‘নিজাম ডাকাত’ (১৯৫০), ‘বেদুইনের দেশে (১৯৫৬), ‘ছোটদের মহানবী’ (১৯৬১), ইতিহাসের আগের মানুষ (১৯৬১), ‘গল্পে ফজলুল হক’ (১৯৭৭), ‘ছোটদের নজরুল’ ইত্যাদি। বৃটিশ আমলে তিনি ‘খান সাহেব’ ও ‘খান বাহাদুর’ এবং পাকিস্তান আমলে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ উপাধি লাভ করেন।
১৯৬৩-তে নাটকের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৭৬-এ একুশে পদক লাভ করেন। শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজসেবা ও রাজনীতির বিভিন্ন দিকে ইব্ররাহীম বা’র অবদান রয়েছে। তবে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহীম খাঁ হিসেবে। ২৯-০৩-৭৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১
১৯৬৬ সালের ২রা এপ্রিল পাকিস্তান লেখক সংঘের পক্ষ থেকে চীন যাত্রার এক আমন্ত্রণ পত্র ইব্রাহীম খাঁর হাতে এসে পৌঁছায়। সংঘের পক্ষ থেকে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে এই ডেলিগেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের ইউনেস্কো বুক প্রমোশনের ডিরেক্টর কবি ইবনে ইনশা, লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দুর হেড মিঃ ওয়াকার আজিম, এবং ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডাঃ কোরায়শী, লাহোর হাইকোর্টের ব্যারিষ্টার মিঃ এজাজ বাটালুভী এবং উর্দু উন্নয়ন বোর্ডের অন্যতম সদস্য পীর হোছাম উদ্দিন, পূর্ব পাকিস্তানের কবি জসীম উদ্দীন ও ডাঃ মুহম্মদ এনামুল হক সহ দলনেতা ইব্রাহীম খাঁ সাতসদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ২০শে এপ্রিল চীনে যান।
বাইশ দিন চীনের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সফর শেষে তাঁরা ১৪ই মে তারিখে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর প্রায় বছর দেড়েকের মধ্যেই তাঁর ভ্রমণ কাহিনী ‘নয়াচীনে এক চক্কর’ নামে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে সেদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীক রীতি-নীতি আচার- আচরণ সহ নানা ইতিহাস ও দর্শনতত্ত্বের আলোচনা স্থান পেয়েছে। এর পরিশিষ্ট অধ্যায়ে রয়েছে চীনের আদ্যপান্ত ইতিহাস যা চীনকে জানবার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

দুই
২০শে এপ্রিল প্রতিনিধিদল ক্যান্টন পৌঁছলে চীনা শিশুর দল তাঁদের বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা জানায়। ক্যান্টন থেকে পিকিং যাবার পথে সাংহাই এ তাঁরা ঘন্টা খানেকের জন্য অবতরণ করেন। সেখানে স্থানীয় চীনা লেখক সংঘের পক্ষ থেকে তাঁদের স্বাগত জানানো হয়। ঐদিনই রাত ১১টায় প্রতিনিধিদল পিকিং পৌঁছান। বিমান বন্দরে অতিথিদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন চীনা লেখক ইউনিয়নের সহসভাপতি সহ অনেকে।
অভ্যর্থনা শেষে হোটেলে যাবার পথে লেখক দেখেছিলেন প্রশস্ত রাস্তার দু’পাশ আগলে রেখেছে সুদৃশ্য পপুলার জাতীয় বৃক্ষের সারি। পথের মায়াময় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রতিনিধিদল পিকিং এর জাতীয়তা হোটেলে এসে পৌঁছান। হোটেলের চীনা খাবার লেখকের পছন্দ হয়েছিল। পরিপূর্ণ তৃপ্তির সংগে তিনি আহার পর্ব সমাধা করেছিলেন।
২১শে এপ্রিল শুরু হয় তাঁদের বিভিন্ন স্থানে ঘোরার পালা। প্রথমেই যান তাঁরা বাদশাহী পার্কে। সেখানে বাদশাহী আমলের শিল্প সৌকর্য, সৃষ্টির নিখুঁত নিপুণতা প্রভৃতি তাঁদের মুগ্ধ করে। সার্বক্ষণিক সরকারী প্রহরার সতর্কতা সত্ত্বেও সে আমলের বহু অজানা তথা তাঁদের কানে এসে পৌঁছায়। বিকেলে পিকিং এর রেল ষ্টেশন ঘুরে রাতে চীনা লেখকসংঘ আয়োজিত নৈশ ভোজে সেদেশের আনুষ্ঠানিক ভোজের রীতিনীতি সহ নানা অজানা তথ্য তাঁরা সংগ্রহ করেন। অনুষ্ঠানটি প্রচুর রসিকতা ও আনন্দ উচ্ছ্বাসের ভেতর দিয়ে শেষ হয়।
পরের দু’দিন তাঁরা জাতীয় ইতিহাসের যাদুঘর, জাতীয় চিত্র প্রাসাদ, মুক্তি সংগ্রামের যাদুঘর, সিঙ বংশীয় চীনা সম্রাটের উপাসনা মন্দির, পিকিংয়ের অপেরা প্রভৃতি বিখ্যাত স্থান পরিদর্শন করে চীনা ইতিহাসের নানা বিষয়ের অজ্ঞাত তথ্যের সন্ধান পান। অল্প সময়ের মধ্যেই লেখক বুঝতে পেরেছিলেন সেদেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে রাখা হয়েছে দেশের শক্তি ও সমৃদ্ধির পক্ষে অনুকুল পরিবেশ।
২৪শে এপ্রিল তাঁরা চীনের মহাপ্রাচীর দেখতে যান। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে চীনের দিগ্বিজয়ী সম্রাট হোয়াংতির নির্দেশে এই প্রাচীর নির্মিত হয়। প্রাচীরের বিরাট সৌন্দর্য, এর বিচিত্র ইতিহাস কাহিনী, কিংবদন্তী, শোকগাথা প্রভৃতি প্রতিনিধিদলের হৃদয়ে মুগ্ধতার আবহ সৃষ্টি করেছিল।
ফেরার পথে মিং রাজাদের সমাধি ক্ষেত্রে যান তাঁরা। সমাধিপথের মায়াময় সৌন্দর্য দর্শক হৃদয়কে নির্বাক করে দিয়েছিল। ভূমি থেকে ত্রিশ হাত নীচে পাতাল পুরীতে প্রবেশ করে প্রতিনিধিদল প্রাসাদের বিপুল ঐশ্বর্য, নিঝুম স্থাপত্যের সৌন্দর্য, রাজ রাজরার বহুবিধ সখ, পৌরাণিক গল্পগাথা ও নানা বেদনাময় ইতিকথাসহ প্রাসাদের নির্মাণশৈলী দেখে অভিভূত হন।
পরদিন পিকিং এর প্রাসাদ যাদুঘরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে মিং বংশীয় রাজাদের বিপুল ঐশ্বর্য আর নিখুঁত স্থাপত্য সৃষ্টির পরিচয় মেলে। বিকেলে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখেন পাক-দল। ১৮৯৮ সালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বিরাট এলাকা জুড়ে এটি স্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্র- ছাত্রীদের আন্তরিক উচ্ছ্বাস উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে তাঁরা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন।
২৬শে এপ্রিল পিকিং এর একটি সরকারী প্রেস দেখেন তাঁরা। বিশাল আয়তন বিশিষ্ট প্রেসটির পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সুচারু অঙ্গসজ্জা তাঁদের ভালো লেগেছিল। বিকেলে একটি নাগরিক সমাবেশে যোগ দিয়ে প্রতিনিধিদল বুঝতে পারেন চীন দুনিয়ার মজলুমদের মুক্তির একটি আদর্শ ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরদিন তাঁরা চীনা বাদশার গ্রীস্মাবাস দেখতে যান। প্রাসাদ প্রাঙ্গনে পৌঁছে দেখেন এটি শুধুমাত্র একটি প্রাসাদ নয়, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা ছোট খাট একটি শহরও বটে। সেখানে তাঁরা পাহাড়ে উঠে এবং হ্রদের জলে বজরায় ঘুরে বেড়িয়ে কিছুটা সময় উপভোগ করেন। মধ্যাহ্ন ভোজে খাবার টেবিলে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা প্রাধান্য পায়। বিকেলে চীনা রিপাবলিকের সহসভাপতি ও বৈদেশিক মন্ত্রী মার্শাল চেন-ই তাঁদের চায়ের দাওয়াত দেন। পার্টিতে উভয় দেশের বক্তাদের মধ্যে মতবিনিময় করা হয় এবং পাক-চীন মৈত্রীর সাফল্য কামনা করা হয়।
পিকিংয়ে নজরুল – ইকবাল দিবস উপলক্ষে (পিকিং রেডিওর উর্দু ব্রডকাষ্টার) ডাঃ আলীয়া প্রতিনিধিদলকে নিমন্ত্রণ করেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে উভয় পক্ষের সাহিত্য বিষয়ক বক্তব্যের পর রাতের ভোজে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২৮শে এপ্রিল পিকিং লাইব্রেরীর অভ্যন্তরে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান বিশাল এই লাইব্রেরীটিতে ৭৫ লক্ষেরও বেশী বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে। চীনা ভাষার বিশ্বকোষ দেখে বিস্মিত হতে হয়।
ফেরার সময় তাঁরা লাইব্রেরীতে কিছু পাকিস্তানী বই উপহার দিয়ে আসেন। চীনের মসজিদ দেখবার ইচ্ছে প্রকাশ করলে দোভাষী তাঁদের পাঁচশ বছরের পুরোনো এক মসজিদে নিয়ে যান। পুরোনো হলেও এটি কোথাও এতটুকু বিকৃত হয়নি। মসজিদের পরিচ্ছন্নতা এবং শ্রীমন্ডিত পরিবেশ তাঁদের ভালো লেগেছিল।
চীনের আড়াই হাজার বছরের পুরানো শহর ওহাঙ এ বেড়াতে যান প্রতিনিধিদল। আজাদীর পর মাত্র ১৫ বছরের মধ্যেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই শহরটির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে রাতে তাঁরা ওহাঙ এর অপেরা দেখতে যান। চীনা সংস্কৃতির মধ্যে জীবনের কথা এবং আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার সম্ভাবনাময় ইঙ্গিতগুলোই বেশী চোখে পড়ে। পরদিন শহরের এক ডারী মেশিনের কারখানায় তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেদেশের যন্ত্র শিল্পের প্রকৃতি এবং কারখানার শ্রমিকদের চলমান জীবনের উন্নত দিকটি তাঁদের আলোড়িত করে।

ওহাঙ-এর ইস্পাত মিলটি পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম স্থানীয়। প্রতিনিধিদল ইস্পাত তৈরীর পদ্ধতিসহ মিলের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেন, পরে তাঁরা সেখানকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আয়োজিত নৈশ ভোজে গিয়ে বহু দেশের প্রতিনিধিদের সংগে মিলিত হন। তাঁদের মুখে সাম্রাজ্যবাদীদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের নির্মম কাহিনী হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্নিত হয়। পাক-দলও তাঁদের বক্তব্যে প্রায় দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন পিষ্ট পাকিস্তানের মুক্তির দৃষ্টান্ত তুলে ধরে দুনিয়ার স্বাধিকার আন্দোলনরত জাতির মুক্তি কামনা করেন।
কমিউনিষ্ট দেশে ১লা মে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনের সংগে জড়িয়ে আছে শ্রমিক শ্রেণীর আত্মাহুতির ইতিহাস। তাই এই দিনটিকে তারা নির্ধারণ করেছে জীবনের মহান আদর্শের দিন হিসেবে। আত্মত্যাগের মহোৎসব পালিত হয় এই দিনে। প্রতিনিধিদল এই দিনটির বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন এবং আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করেন।
ওহাঙ থেকে বিদায় নিয়ে রেলযোগে ক্যান্টন যাবার পথে তাঁরা দেখতে পান সেদেশের কোথাও কিছুমাত্র জমি অনাবাদী পড়ে নেই। ক্যান্টনের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেকটাই পাকিস্তানের মত। সাদৃশ্য এতটাই যে প্রতিনিধিদল বারবার স্বদেশকে মনে করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। সেখানকার সবচেয়ে নাম করা হোটেলে তাঁদের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়। মিস ওয়াও নামের একজন তরী তাঁদের দোভাষীনির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মার্জিত রুচিবোধ, বুদ্ধিমত্তা এবং পাণ্ডিতপূর্ণ অভিব্যক্তি পাক-দলকে মুগ্ধ করেছিল। বিকেলে তাঁরা শহরের ১৪তলা হোটেল, সেখানকার যাদুঘর প্রভৃতি ঘুরে দেখেন।
৩রা মে তাঁরা ক্যান্টনের একটি কমিউন দেখতে যান। সেখানকার স্থানীয় কর্তারা কমিউনের ভেতরের কার্যক্রমগুলো ঘুরে দেখতে সাহায্য করেন। কার্যক্রমগুলোর সর্বত্রই রয়েছে সুকঠোর পরিশ্রমের ছাপ। লক্ষ্য করবার মত বিষয় মানুষের পরিশ্রমী বাহুবলের কাছে প্রকৃতির খেয়াল সম্পূর্ণরূপে বশ্যতা স্বীকার করেছে।
ক্যান্টনে শিল্পজাত দ্রব্যের মেলা চলছিল। ৪ঠা মে তাঁরা সেখানে গিয়ে দেখেন দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে তাদের উদ্ভাবনী শক্তির যে পসরা সাজানো হয়েছে তার দৃষ্টান্ত বিরল। ১৯৪৯ সালের আগে মুৎসুদ্দীদের কবলে নিপতিত চীনের চেহারা ছিল ঘোরতর শোচনীয়। এহেন পতনমুখীনতা থেকেই উঠে আসে কিছু বিপ্লবী চেতনা, যাদের অক্লান্ত সাধনায় মুক্তি পায় সমগ্র চীন দেশ ও জাতি। ঐদিনই তাঁরা হযরত ছা’দ বিন আবি ওক্কাজের মসজিদ দেখতে যান। এটি চীনের প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত।
শাহী মঞ্জিলের নমুনায় তৈরী এই মসজিদ স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন। তাঁরা ছা’দ বিন আবি ওক্কাসের মাজার জিয়ারত করেন এবং মাজারের বিভিন্ন দিক পরিদর্শনকালে এর রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত যত্নের অভাব লক্ষ্য করেন। পরে তাঁরা শহীদবাগে যান। শহীদ বাগ স্থানটির সংগে জড়িয়ে আছে চীনের অনেক নির্মম ইতিহাস।
১৯২৭ সালে ক্যান্টনে কৃষক-শ্রমিক আজান রাষ্ট্রের যোদ্ধাদের ওপর চিয়াঙ কাইশেকের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্থানটিকে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে এই শহীদবাগ। রাতে সিনকিয়াও প্রদেশের সংস্কৃতি পার্টি আয়োজিত সঙ্গীতানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন প্রতিনিধিদল। শিশু শিল্পীদের অপূর্ব সঙ্গীত পরিবেশনা দলকে মুগ্ধ করেছিল।
রাতে চীনের সাহিত্যিক বন্ধুদের আয়োজিত ভোজে ২৩ রকম যাবার পরিবেশন করা হয়। চীনা খাবারের চমৎকারিত্ব যেন বলে বোঝানো যায় না। ৫ই মে তাঁরা হ্যাঙ চো’ যান। স্থাপত্য সৌন্দর্যে, নৈপুণ্য প্রাচুর্যে, প্রকৃতির অকৃপণ ঐশ্বর্যে, রুচিবোধে, আধুনিকতায় হ্যাং চো হয়ে উঠেছে নিসর্গের অপরূপ স্বপ্নপুরী। ৬ই মে শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তাঁরা সেখানকার একটি কমিউন দেখতে যান। কমিডনের খুদে খুদে ছেলেমেয়েরা গান গেয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাদের প্রচুর আনন্দ দিয়েছিল। এরপর তাঁরা হ্রদের জলের স্নিগ্ধ হাওয়ায় নৌ-বিহারে বেরিয়ে পড়েন।
চীনারা প্রত্যেকেই বৃক্ষ প্রিয়। বাদশাহী আমলের বহু প্রাসাদ ঘরবাড়ী কাঠ দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। সেদেশের সর্বত্রই সুদৃশ্য গাছের সারি পরিলক্ষিত হয়। চীনকে ফুলের দেশ বললে ভুল বলা হবে না। বড় আকারের কোন বাগান প্রতিনিধিদলের চোখে না পড়লেও সেদেশের সর্বত্রই ছড়িয়ে থাকা ফুলের প্রাচুর্য তাঁদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল ।
৬ই মে তাঁরা সাংহাই-এ চলে আসেন। সেখানে ঝাঁক ঝাঁক ফুলের মত শিশু তাঁদের অভ্যর্থনা জানায়। প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার দর্শকের ভীড়ের সমুদ্র ঠেলে তাঁরা সুসঙ হোটেলে এসে পৌঁছান। পরদিন এক বিরাট শিল্প প্রদর্শনী প্রাসাদে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাসাদের অঙ্গসজ্জায় রয়েছে মাও সে-তৃপ্ত এর মর্মর মুর্তি পাদমূলে রাশি রাশি ফুল আর ঝাউবনের বাহার।
প্রাসাদের দরজা পার হতেই চোখে পড়ে দুজন দুর্দান্ত সিপাহীর ব্রোঞ্জ মূর্তি। মোটর গাড়ি প্রস্তুত করা হয় এ কারখানাটিতে। প্রাসাদের শিল্পঘর ঘুরে তাঁরা চীনের সংগ্রামী কবি লুসানের অমর স্মৃতিবাহী স্মৃতিসৌধ প্রাসাদটি দেখেন এবং তাঁর কবর জেয়ারত করেন। বিকেলে এক কর্মীসদনে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান দেয়ালে দেয়ালে ছবির মাধ্যমে বিধৃত করা হয়েছে সেদেশের বিভিন্ন কর্ম জীবনের ইতিহাস।
দর্শনার্থীদের মধ্যে যারা শিক্ষার্থী তারা এইসব চিত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। কর্মীসদন থেকে বের হয়ে বসুধা প্রাসাদে যান তাঁরা। এখানে পৃথিবীর যে কেউ এসেই বিচিত্র ক্রীড়ায় অংশ নিতে পারেন।
চীনের নাপিতরা চুল দাড়ি কেটে জনগণের কাছ থেকে পয়সা রোজগার করেন না। তারা ষ্টেট অফিসার। সরকার থেকে বেতন পান। সেদেশের নর-নারীরা একই রকম পোশাক পরে। বিলাসদ্রব্যের অভাব না থাকলেও ঐসব সামগ্রীকে তারা প্রত্যেকেই একযোগে বর্জন করেছে।
সাংহাই এর ইস্পাত কারখানাটি বিরাটত্বের দিক থেকে পৃথিবীর মধ্যে নবম। সাড়ে ছয় হাজার কর্মী এখানে কাজ করে। চীনের প্রত্যেকটি মানুষ প্রাণপণ খাটুনি করে শুধুমাত্র দেশের প্রতি অন্তরের টানের তাগিদে ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির জন্য নয়। সে দেশের শিশুরা সকলের কাছেই প্রিয় ও আদরণীয়। তাদের নিরলস জীবনযাত্রা বিস্ময়ে চেয়ে দেখবার মত বিষয়।
দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে শিশুদের উপযুক্ত শিক্ষায় ও কর্মে শিক্ষিত করে তোলা হয়। বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় সেখানকার প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের মান সমান এবং প্রত্যেকটি শিশুই একই মাপের জীবন প্রণালীর ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে। ধনে, মানে, আনে, ঐশ্বর্যে দেশকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবার জন্য শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকলেরই দেশঅন্ত প্রাণ। বিকেলে একটি শিশু প্রাসাদ দেখতে যান প্রতিনিধিদল। শত শত শিশু কিশোরদের আনন্দ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে উচ্ছল বেড়ে ওঠার সহজ ও স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক পদ্ধতিগুলো তাদের মুগ্ধ করেছিল। চীনারা শিল্প সামগ্রীর মত মানুষ গড়ার কারখানাও বানিয়ে রেখেছে সর্বত্র।

সাংহাইয়ে নিখিল চীনা লেখক সংঘের একটি শক্তিশালী শাখার পক্ষ থেকে পাক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রাসাদতুল্য বাড়ীতে চীনা লেখক লেখিকারা তাঁদের অভ্যর্থনা জানায়। অনুষ্ঠানে চীনা সাহিত্যের অতীত ও বর্তমান ধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। রাতে অতিথিদের সম্মানে আয়োজিত ভোজে তারা ২০ রকম খাবার পরিবেশন করেন। ভোজন বিলাসী চীনারা ভোজের টেবিলে প্রায়শই বহু প্রকার খাবার পরিবেশন করে থাকে। টেবিলে নানা রকম গল্প, রসিকতা প্রভৃতির ভেতর দিয়ে আহার পর্ব শেষ হয়।
১১ই মে তাঁরা সেখানকার একটি মিডল স্কুলে যান। ছাত্র-ছাত্রী সবাই সেখানে একসংগে পড়াশুনা করে। সেদেশে কোন ছাত্র-ছাত্রীকেই বেতন দিতে হয় না। স্কুলগুলোতে উন্নত শিক্ষার পরিবেশ রয়েছে। সেখানে স্কুলগুলোতে কোন ধর্মঘট হয় না এবং শহরের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
১১ই মে দেশে ফেরার কথা থাকলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে তাঁদের যাত্রা স্থগিত রাখা হয়। ঐদিন তাঁরা সূচো রওনা হয়ে যান। সূচোর পথে যেতে যেতে চোখে পড়ে রাস্তার দু’পাশে সারি সারি বৃক্ষ। ক্ষেতগুলো কোনটি শস্যে ভরা কোনটি রোপনের জন্য তৈরী। সেচের জন্য রয়েছে বহু খাল, মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাহাড়। সূচি শিল্পের জন্য এ শহর বিখ্যাত। শহরের দর্শনীয় স্থান বাঘের পাহাড় ঘুরে দেখেন পাক-দল।
মন্দির আবাস এবং কল্পকাহিনী সমৃদ্ধ বাঘের পাহাড়টির সৌন্দর্য হৃদয়কে মোহাবিষ্ট করে। সূঁচোর বিখ্যাত বাজারে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান সূচি শিল্পের নানা নৈপুণ্য। সূঁচো মূলত বাগানের দেশ বলে বিখ্যাত। তবে যুদ্ধে যুদ্ধে সেসব বাগান প্রায় সবই বিলীন হয়েছে কালের গর্ভে। সূঁচো থেকে ১৪ই মে তাঁরা সাংহাই চলে আসেন।
এবার দেশে ফেরার পালা। আসন্ন বিদায় ব্যাথায় প্রত্যেকেরই হৃদয় ভারাক্রান্ত। কারউ মুখে কোন খাবার উঠল না। টেবিলের খাবার টেবিলেই পড়ে রইল সেদিন বিষাদের স্তুপ হয়ে। রাত সাড়ে সাতটায় তাঁরা সাংহাই থেকে দেশের উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে যান। সেখানে অনেক নামকরা লেখক লেখিকা তাঁদের বিদায় সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন।
তিন
লেখক চীনে বাইশদিন অবস্থান করেছিলেন। এই স্বল্প সময়ে চীনের নানা জায়গা ঘুরে তাঁর পর্যবেক্ষণে সেদেশের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসহ, পাকিস্তানের সাথে সেদেশের মিল ও অমিলের যে বিষয়গুলো ধরা পড়েছে তা তিনি গ্রন্থে বিধৃত করেছেন।
ক্যান্টনে নেমে চীনাদের অভ্যর্থনার বিপুল সমারোহ লেখককে প্রথম মুগ্ধ করেছিল। এতে তিনি শুধু বর্ণাঢ্য বস্তুর চাকচিক্যই লক্ষ্য করেননি, তাঁর দৃষ্টি ছাপিয়ে হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল সেদেশের মানুষের কলা নৈপুণ্য, রুচিবোধ ও আর্টের সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ দিকগুলো।
ক্যান্টন বিমান বন্দরে আমাদের জাহাজ নামল। হাওয়ারী মেজবান এসে বল্লেন, এখানে আমরা একঘন্টা থামব; নেমে গিয়ে বেড়িয়ে আসতে পারেন।
নামলাম। দেখলাম, বিমানবন্দর কারো অভ্যর্থনার আয়োজনে মহাসমারোহে মেতে উঠেছে। ষ্টেশনময় ফুল আর আনন্দমুখর লোকের এন্ড আনাগোনা। ষ্টেশনের এক পাশে একটি ফুলের টিলা, মাথা সমান উঁচু।
ঘরে ঘরে ফুলগুলি ক্রমে মাটিতে নেমে এসেছে। কি বিচিত্র সে ফুলের রং ভাবলাম, ফুলের টবগুলিকে অপূর্ব নৈপুণ্যের সঙ্গে এরা সাজিয়ে রেখেছে সমস্ত মিলিয়ে যেন একটি গাছের বিভিন্ন পল্লবে বিভিন্ন রঙের ফুল।
আমরা বিমান বন্দরের বিশ্রামাগারের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বাঁশের ডান্ডার আগায় লাল টুকটুকে রঙের বিরাট পতাকা কাঁধে বয়ে আসছে মেয়েদের দল একে একে মনোরম ভঙ্গিতে দৌড়িয়ে আসছে। তাদের পরণে নীল প্যান্ট, গায়ে নীল কোর্ট, মাথায় ফুল, হাতে ফুল, কাঁধে পত পত রক্ত- পতাকা। তারা একে একে শ’দুই এসে সারি বেঁধে দাঁড়াল বিমান বন্দরের আঙিনায়। তারপর ঐ পোশাকে ঐ পতাকা নিয়ে একই ভঙ্গিতে দৌড়িয়ে এল শ’দুই কিশোর। তখন ওরা কিশোর- কিশোরী মিলে পতাকা দুলিয়ে মাথা হেলিয়ে গান ধরল
একতাই বল, একতাই বল,
নাই ওতে ভুল, নাই ওতে ছল,
একতাই বল।
হঠাৎ ফিরে চেয়ে দেখি, সেই ফুলের টিলাটিতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এক একটি মেয়ে টিলা ভেঙ্গে চলে আসছে। এতক্ষণে বুঝতে পেলাম, ফুলের পাহাড়টা ওরাই নিজ দেহভূষা দিয়ে গড়েছিল।
লেখক লক্ষ্য করেছিলেন নেতাকে সেদেশে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়। সর্বত্রই তাদের এই নেতাপ্রীতি ও বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ মানব জীবনকে করে তুলেছে বিরোধহীন সুন্দর।
বিমানবন্দর ছেড়ে আমরা পিকিন শহর পানে চল্লাম। চীনারা নেতা মেনে চলে নিজের নেতাকেও, পরের নেতাকেও। আমি আমাদের ডেলিগেশনের নেতা, এজন্য ওরা আমাকে নিল এক নম্বর ভাল গাড়ী এক নম্বর দোভাষী আর আমার সাথে চল্লেন ওঁদের লেখক ইউনিয়নের সভাপতি। হোটেলে গিয়ে দেখলাম, আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছে বিশেষ রকম বিছানা-পত্র সজ্জিত বিশেষ একটি কামরা আর তার সংলগ্ন একটি সুশোভিত বৈঠকখানা। চীন ভ্রমণকালে সর্বত্রই লক্ষ্য করেছি নেতার জন্য ওদের বিশেষ স্থান, বিশেষ অভ্যর্থনা, বিশেষ আয়োজন ৩
গাছ এবং ফুলের প্রতি চীনাদের ভালোবাসা অকৃত্রিম। এবং তারা প্রত্যেকেই উপবন প্রিয়। সমগ্র দেশজুড়ে সুশৃংখল বৃক্ষের সুসজ্জিত সারি আর দেশময় ছড়িয়ে থাকা বিচিত্র ফুলের অপূর্ব সমারোহ মানব চিত্তকে করে তুলেছে পাপহীন সুন্দর। বৃক্ষের সবুজ আর রকমারী ফুলের বর্ণিল সুন্দরে প্রতিফলিত হয় সেদেশের মানুষের সুন্দর অন্তর। শুধু সৌন্দর্যেই নয় বনজ সম্পদেও তারা হয়ে উঠছে অকল্পনীয় ধনী।
১. চীনারা ফুলের পাগল। মনে পড়ল কয়েকদিন আগে চীনের পথে দেখেছি আলবেনিয়ার সভাপতি ওমর খায়রোর প্রতি সম্বর্ধনা জ্ঞাপন। খায়রো আসছেন, তাঁর পথের দুধারে দাঁড়িয়ে গেল হাজার দশেক কিশোর-কিশোরী। তাদের কারো হাতে ফুলের মালা অপূর্ব কৌশলে সে মালা তাদের উপরে ঘুরছে আর ঘুরছে। তাদের কারো হাতে ফুলের তোড়া, কারো হাতে বা রুমাল তথা ফুলের পাঁপড়ী। অভ্যর্থনার এ ফুলময় রূপ আর কোন দেশেই দেখি নাই। এ বিদ্যায় চীনারা ওস্তাদ । ৪
২. চীনের যে অল্প স্থান দেখার সুযোগ হল, তার কোথাও বিরাট আকারের কোন ফুলের বাগান নজরে পড়ে নাই। কিন্তু এখানে ওখানে সেখানে ছোট ফুলের বাগান ছড়িয়ে আছে। ফুলের টব আছে বাড়ীর আঙ্গিনায়, সিড়ির দুই পাশে, বারান্দার কিনারে, বাইরের বৈঠকখানায়, দুয়ারের পাশে, ভিতরের বৈঠকখানার কোণে কোণে হয়ত টেবিলের উপরেও।

লেখক বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন দেশীয় গ্লানিকে যতদূর সম্ভব তারা আড়াল করে রাখে অন্যের কাছে। কারণ তারা জানে অন্তর্গত বিরোধ এবং পক্ষপাতিত্বের মতো অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো অন্যের কাছে উপস্থাপন করার মধ্যে কোন বীরত্ব বা পান্ডিত্য নেই।
শান্তির পাহাড় থেকে নেমে ফিরে আসার পথে দোভাষী বল্লেন, ১৬৪৪ খ্রীষ্টাব্দে কৃষক বিদ্রোহীরা পিকিন দখল করে বসে। এই সময় মিং বংশের শেষ সম্রাট চুয়াঙ চেন পিকিনে রাজত্ব করছিলেন। পরাজয়ের গ্লানি থেকে আত্মরক্ষার জন্য সম্রাট একদা গোপনে শাহী মঞ্জিল থেকে বের হয়ে এসে এই পাহাড়ের পাদদেশের একটি গাছের ডালে ফাঁসি নেন।
ভাবলাম, শান্তির পাহাড় জীবনে এ সম্রাটকে বুঝি শাস্তি দিতে পারে নাই, তাই সে শান্তি দিয়েছিল মউতের পেয়ালায়। দোভাষীকে বল্লাম, জায়গাটা দেখালেন না কেন? তিনি চুপ রইলেন। মনে হয় দেশের গ্লানির কোন চিত্রকে তারা বিদেশীর সামনে তুলে ধরতে নারাজ। চেঙ্গীজ খাঁ যে চীন সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন এবং তাঁর পৌত্র কুবলাই যে চীনে মহা শান-শওকতে রাজত্ব করেছিলেন আজকের চীনারা সে কথার আলোচনায় যেতে একান্ত অনিচ্ছুক।৬
আর একটি বিষয় তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল; সেদেশে বৌদ্ধমূর্তিগুলি সংরক্ষণ করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু অতীতের মত সেসবের প্রতি তাদের কোন বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ নেই। এর মূলে রয়েছে মূলত সময়। বয়ে চলা সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল মানুষের মন কেবলি বদলে যায় কালের হাওয়ায়।
লেখক চীনের যেখানেই গিয়েছেন সর্বত্রই তাঁর চোখে পড়েছে দেশীয় সমৃদ্ধির পক্ষে তাদের শিক্ষণীয়। প্রচারের ব্যাপকতা। সেদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে, চিত্রশালায়, কর্মীসদনে, শিল্পে, সংস্কৃতিতে, সাহিত্যে, শহরের দেয়ালে দেয়ালে দেশের ইতিহাস চিত্রের মাধ্যমে বিধৃত করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ নন্দনতত্ত্বের সাথে শিক্ষার যোগ ঘটিয়ে তারা বিষয়গুলোকে অধিক আকর্ষণীয়, গ্রহণীয় এবং ডারুরী করে তুলেছে জনগণের কাছে।
বিভেদহীন সমাজব্যবস্থা সেদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রেণীবৈষম্য চীন থেকে একেবারেই উঠে গেছে। সেদেশের কোথাও কেউ কখনও শ্রেণীদ্বন্দ্বের খপ্পরে পড়েন না। মুসলিমরা নতুন চীনে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন। সংখ্যালঘু বলে তাদের কখনও আলাদা চোখে দেখা হয় না বা তারা সমাজের কোন কিছু থেকে বঞ্চিত নন। ধর্মীয় ব্যাপারেও সেখানে কোন চাপাচাপি নেই। ব্যক্তিগতভাবে যে যার মত ধর্মচর্চা করতে পারেন। কোন বাঁধা নিষেধ নেই।
হাটতে হাটতে একটা মুসলমান দোকানে গিয়ে পড়লাম। আমাদের পোশাক পরিচ্ছদে তার বুঝতে দেরী হল না যে আমরা তার স্বধর্মী। ওহ আমাদের পেয়ে তার কি বিপুল আনন্দ। দোকানের কোথায় যে আমাদের রাখবেন- তিনি টের পাচ্ছিলেন না। আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে বল্লেন, বেশ ভাল আছি স্বাধীনভাবে ব্যবসা ধর্মকাজ করবার ব্যাপারেও সরকারের তরফ থেকে কোন বাধা-বিপত্তি নেই।
অনুসরণ করবার মত দেশাত্মবোধ তাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখক আরও লক্ষ্য করেছিলেন দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রতি চীনাদের শ্রদ্ধাবোধ ঈশ্বরভক্তির তুল্য। মুক্তি আন্দোলনের মুক্তি যোদ্ধাদের নিয়ে তারা বিভিন্ন ধরণের ফিল্ম তৈরী করেন এবং সেসব ফিল্ম দেখবার জন্য প্রচুর দর্শক সমাবেশ হয়। কোন কোন ছবি ছয়মাস ধরে চললেও ভীড় কমে না। চীনারা কাব্যপ্রাণ, শিল্পপ্রাণ এবং সৌন্দর্যপ্রিয়। তবে সেদেশের সাহিত্য চর্চায় প্রেম সংক্রান্ত কিছু নেই বললেই চলে। দেশীয় উন্নয়নের পটভূমিতেই তারা লেখেন বেশী।
লেখক দেখেছিলেন চীনের প্রত্যেকটি মানুষ আত্মিক শুদ্ধিতে শুদ্ধ। আদর্শে, নৈতিকতায়, সততায়, মহানুভবতায় সেদেশের প্রত্যেকটি মানুষ হয়ে উঠেছে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। আজাদীত্তোর চীনের অভাবনীয় সাফল্যের মূলে যে মানুষ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে সে নিজেকেও করেছে সম্পূর্ণ উন্নত। ফলে সমগ্র দেশ এক স্বর্গীয় ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নয়াচীনের সবচেয়ে বড় কীর্তি কি? নয়াচীন তার দেশের মানুষের নৈতিক আদর্শের বাস্তবায়নে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তার তুলনা বর্তমান জগতে আর কোথাও নাই। নয়াচীনের কেউ অন্যের কাছে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায় না। ভিক্ষা নিশ্চিহ্নরূপে উধাও হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে নারীর দেহদানের পেশা নয়াচীনের অতীতের কল্পনার কাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
নয়াচীনে চুরি বাটপাড়ি নেই। ৭০ কোটি মানুষের দেশ। সে দেশে একটি মানুষও চুরি করে না; এ স্বাভাবিক নয়। কিন্তু চুরি বাটপাড়ির সংখ্যা এমন অবিশ্বাস্য রকমে কমে গেছে যে সে দেশে চুরি নাই একথা সঙ্গত ভাবেই বলা চলে। নয়াচীনে কুকুর নেই- চোর নেই কুকুর তাড়িয়ে নেবে কাকে ?
নয়াচীনে কিছু হারায় না। জিজ্ঞাসা করলাম, নয়াচীনে কি তবে কবি, দার্শনিক, ছুফী, বিরহী কেউ নেই ? বল্লেন, আছে কিন্তু তারা কিছু ভুলে ফেলে গেলে সে চীজ পথ খুঁজে বের করে তাদের ঘরে গিয়ে পৌঁছে। একথা তখন বিশ্বাস হয় নাই, পরে বিশ্বাস করতে হল।
চীনের মানুষ ঐশ্বর্য বিলাসীতার মোহমুক্ত। এমনকি নারীরাও সেখানে কোন সৌখিন সামগ্রী ব্যবহার করেন না। আভরণে, অলংকারে নারীকে দর্শনীয় গুতুল সামগ্রী সাজিয়ে রাখার নামে যে তাদের প্রকৃত স্বাধীনতাকে খর্ব করা হতো নতুন চীনে তা নেই। আজাদীত্তোর চীনে প্রতিটি নারী সমাজের শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। সেদেশে নারীর জন্য বিশেষ পোষাক বা বিশেষ সাজসজ্জার রীতি নেই।
পুরুষের মতই তাদের রয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা। অর্থাৎ অসাম্য ভুলে তারা এক মানুষ জাতি হিসেবে দেশের কল্যাণার্থে একযোগে একটি আদর্শকেই বেছে নিয়েছে। মানুষকে সম্মান করা চীনাদের চরিত্রের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে বয়স্কদের প্রতি তারা বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। জীবন চলার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বয়স্কদের জন্য রয়েছে আলাদা মর্যাদা।
চীনের ক্যান্টনের সাথে পাকিস্তানের প্রচুর সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছিলেন লেখক। হঠাৎ করে স্বদেশ ভেবে প্রতিনিধিদলের কেউ যদি ভুল করে বসত তাহলে তাদের বিশেষ অপরাধী করা যেতো না।
২রা মে, ক্যান্টনের আকাশের মেঘ, ক্যান্টনের হাওয়ার আর্দ্রতা, ক্যান্টনের মাঠের সবুজ শসা সবই পূর্ব পাকিস্তানকে মনে করিয়ে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের কোন আবুশামাকে ঘুমের মধ্যে এনে ক্যান্টনের কোন কুটীর প্রাঙ্গনে বিছানায় রেখে দিলে ভোরে চোখ মেলে সে নিঃসন্দেহে ভাববে যে সে নিজ দেশেরই কোন পল্লীতে ঘুমিয়ে রাত কাটাচ্ছিল।
সে দেশের যে বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল; সেটি হচ্ছে চীনাদের সব কিছুই বিরাট বিশাল। তিনি চীনের যেখানেই গিয়েছেন বিরাটত্বের ব্যাপারটি প্রথমেই তাঁর চোখে পড়েছে। প্রাসাদ, মঞ্চ, বিভিন্ন স্থাপত্যকীর্তি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দর্শনীয় স্থানসহ দেশের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ বহু বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে।
বিরাট বিরাট বিরাট বলতে বলতে আমাদের জিভ হয়রান হয়ে আসে, অথচ চীনে এসে যা দেখেছি তার বেশীর ভাগেরই প্রথম পরিচয় চেষ্টায় ঐ শব্দটি ব্যবহার করতে হয়। আমরা শিল্প প্রাসাদে এসে দেখি এও এক বিরাট প্রতিষ্ঠান। মস্ত বড় আঙ্গিনা, তার মধ্যে মস্ত বড় দালান, ছাদ বহু উচ্চ, অর্ধ গোলাকার।
কম মশলাযুক্ত চমৎকার রান্না চীনা খাবারের বৈশিষ্ট্য। স্বাদে গুণে ও মানে এর চমৎকারিত্ব বলে বোঝাবার নয়। খান্দানী চীনা খানার জুড়ি সে দেশ ছাড়া আর কোথাও মেলা ভার। তাদের খাবার পদ্ধতিটিও আলাদা; পাকিস্তানের সাথে যা একেবারেই মেলে না। চীনারা সুদৃশ্য কাঠি দিয়ে অত্যন্ত শৈল্পিক ভঙ্গিতে খাবার তুলে যায়। ভাত, মাছ, মাংস, রুটি, শাকসব্জি ছাড়াও সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি তারা খায়। তবে ব্যাঙের ছাতা, বাঁশের করল, লিচুর শুটকী এগুলো তাদের প্রিয় খাবার।

তাদের খাবার টেবিলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রচুর ফলমূল রাখা হয় টেবিলে এবং আহার পর্ব শেষে চা বা কফি তাদের চাই-ই। এরা গরম পানি পান করে তাছাড়া অন্যান্য পানীয়ও রয়েছে। চীনা ভোজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বহু সংখ্যক রকমারী খাবার যা স্বাদে গুণে ও মানে সবার সেরা। শুনে অবাক হতে হয় কোন কোন ভোজে যাবার এর পদ সংখ্যা নাকি ৭০ থেকে ৮০ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায়।
চীন দেশ ও জাতি এক এবং অভিন্ন আত্মা। দেশের প্রত্যেকটি জিনিসকে সে জাতি নিজের বলে জানে এবং জীবন দিয়ে তা আগলে রাখে। স্বদেশের সমৃদ্ধির লক্ষ্যে চীনারা প্রাণ দিয়ে কাজ করে। সেখানে কোন রকম ফাঁকির প্রবণতা নেই। কারণ আপনাকে ঠকানোর প্রবণতা বোধ হয় কারোরই থাকে না। স্বদেশের কথায় লেখক আক্ষেপ করে বলেছেন পাকিস্তানে উন্নয়নের নামে যে প্রহসন চালানো হয় তা সর্বত্রই প্রকট। দেশীয় সমৃদ্ধির নামে সেখানে ব্যক্তিগত উদরপূর্তির প্রতিযোগিতা প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্পষ্ট। এর মূলে রয়েছে সমগ্র দেশ ও জাতির মধ্যে আত্মিক বিচ্ছিন্নতা।
সেদেশের যে বৈশিষ্ট্যটি লেখকের সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছিল সেটি হচ্ছে চীনারা প্রত্যেকেই অনলস কর্মী। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেদেশের প্রত্যেকটি মানুষকে ক্ষেতে খামারে কাজ করতে হয়। বয়স্করাও কাজে যান। তবে তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত সহজ কাজের ব্যবস্থা আছে। সাম্যের আদর্শকে তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফলিয়ে তুলেছে।
চার
যে কোন লেখাতেই লেখকের মানসভঙ্গীর একটি নিজস্ব পরিচয় নিহিত থাকে। সেটি কখনও খুব গোপনে ; কখনও বা বেশ মোটা দাগে। সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ ভঙ্গিগুলোর খোঁজ খবর নিতে প্রায়শই বেশ বেগ পেতে হয়। তবে মোটা দাগগুলোর ক্ষেত্রে গলদঘর্মের হাত থেকে যেমন নিষ্কৃতি পাওয়া যায় তেমনি মেলে একটা শ্রমহীন ঝরঝরে আনন্দ ; কখনও সে আনন্দ সম্পূর্ণ। ‘নয়াচীনে এক চক্কর’ তেমনি একটি সম্পূর্ণ আনন্দের ভান্ডার।
অসামান্য পান্ডিত্যের দাবিদার সবাই যেমন নন তেমনি আবার অনেকেই। গ্রন্থের লেখক ইব্ররাহীম বা তাদেরই একজন। আবরণমুক্ত হালকা চটুল অথচ তাত্ত্বিক পরিহাসের ভেতর দিয়ে মূল কথাটি সহজ করে বলতে পারা তাঁর রচনাশৈলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ জ্ঞান প্রসূত তথ্যের সাথে হালকা অথচ আকর্ষণীয় ইমেজ মিশ্রিত প্রকাশ কৌশলে তিনি অসাধারণ।
সমগ্র কাহিনীর মধ্যে তাঁর একটা সতেজ রসোচ্ছল মন সজীব বৃক্ষের মত ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তৃতি মেলেছে অনায়াস ভঙ্গীতে। ছোট ছোট সরল বাক্য পরবে ভরাট হয়ে উঠেছে নেশার মাদকতা। আর এই মদির বর্ণনা শেষ পর্যন্ত পাঠককে নেশায় বুঁদ না করে ছাড়ে না।
কিন্তু চীন কেবল আমাদের স্মৃতির সুদূরেই ঝিকিমিকি করছে এমন নয়- চীন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। চীনের আবিষ্কার করা চা বিহনে আমাদের আজকের নাস্তার টেবিল অচল। চীনা মাটির পেয়ালায় ঠাঁই না পেলে চা কেঁদে বেকরার চীনামাটির বাসন-কোসন না হলে বিবিরা মেহমানের দস্তরখানের ধারে যেতে নারাজ। টব ছোৱাহী যা কিছু বানাতে যাও- চীনামাটি চাই।
চীনামাটির বিচিত্র চীজ ছাড়া কোন সৌখিনের শো-কেস পূর্ণাঙ্গ হয় না। চীনের চোগা না হলে আমাদের মাওলানা সাহেবদের পোশাকের জউস বাড়ে না। চীন এদেশে আগে থেকেই লীচুর কলম পাঠিয়ে না রাখলে ফেরদৌছী ফলটা পেতাম কোথায় ? আর ঐ ফল না পেলে নজরুল চুরি- কাব্য লিখতেন কি করে ? চীন আমাদের কড়কড়া মার্কা শর্করাকে মধুর দানার মত মোলায়েম চিনি বানিয়ে আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। চীনা মাটির ফুলদানী না পেলে মালীর মন ওঠে না : চীনা মাটির আবতাবা না হলে বাবুর্চীরা সরবত তৈরীতে হাত দিতে চায় না।
চীনা বাদাম ভাজা না পেলে বাচ্চু মিঞার চাঁদ মুখে মেঘ সঞ্চার হয়। ঝালরদার মুকুটসহ ঐ যে সুন্দর চিলিম, ও চীনের ঐ অবদানের কথা আমাদের আল-বোলা বিলাসীরা কখনোই ভুলতে পারে না। ১১
জীবনের সুন্দরতম মুহূর্তগুলোয় হৃদয় কতটুকু প্রবল হয়ে উঠতে পারে ঠিক ততখানি ভাবোচ্ছ্বাস প্রকাশের প্রাবল্য উদ্গত হয়েছে তাঁর বর্ণনভঙ্গিতে। অন্তরে যে আনন্দ ভর করে উঠেছে হৃদয়ের চঞ্চলতায় বেজে উঠেছে তার উদ্বেল ঘন্টা। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ না দিলে উপরের কথাগুলো নিতান্তই খাপছাড়া হয়ে উঠবে।
আমার হাতের কাঁপুনিতে চায়ের পেয়ালাটা দুলে উঠল। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আজ কি মাসের কোন তারিখ, ফরহাদ ” ?
“এপ্রিলের ২রা।
মাসের একটি দিন বেশী করে বলছ না তো?
না – না – দাদু – না
তবে জলদী লিখে দাও যে আমি যেতে রাজী।
কলম হাতে নাও,
এক্ষুণি ফিলফোর।
“যেমন হুকুম।
‘সাধারণ চিঠি দিলে চলবে না, বুঝলে? রেজেষ্ট্রী করে দাও।
‘বেশ, তাই হবে।
“ওঁহো, কেবল রেজেষ্ট্রী করলে চলবে না- এ.ডি. রেজেষ্ট্রী কর।
এ.ডি. রেজেী করেই দেব।
তা ছাড়া আরো একটু কাজ করতে হবে; লেফাফার উপর একটা “জলদী বিলির” টিকিট লাগিয়ে
দাও।
”বেশ, তাই দেব।
‘কিন্তু কেবল ওতে চলবে না, বুঝলে? একেতো পত্র, তার উপর রেজেষ্ট্রী ও তো চলবে মাল- জাহাজের মত গদাই লম্বরী গতিতে। কাজেই উপরন্তু একটা তার করে দাও।
“যেমন আদেশ,
আরে কেবল তোমার সাদা মাঠা তারে চলবে না; তারটা এক্সপ্রেস করে দাও। “তাই দিচ্ছি।
কাছে বসা ছিল নাতী আলম। সে বল্ল, নানু, অমন একটা খোশ-খবর পেলে আমি পত্র, তার সব ভুলে গিয়ে দিতাম আঠার ইঞ্চি মাপের সাড়ে তিন হাত উঁচু একটা লাফ’। বল্লাম, ওরে ও অকাল কুষ্মান্ড, তোরা দুই নামান্ডুল সামনে না থাকলে আমি বাহাত্তর বছরের বোঝাটা ঘাড় থেকে ক্ষণিকের জন্য নামিয়ে রেখে অমন কিছু যে করে বসতাম না তা কে জানে ? ১২
ঈশ্বরভক্তি ও অভক্তির রহস্য উদ্ঘাটনে তিনি যে জ্ঞানপ্রসূত ব্যাখ্যারোপ করেছেন তা নিঃসন্দেহে সত্য উপলব্ধির বাস্তব প্রকাশ। জীবনাবেগ কখন কিভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে সে সম্পর্কিত একটি অনিবার্য তথ্য উন্মোচিত হয়েছে সরল সত্যে। ধর্মীয় অনুভূতির মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবনে মানবাত্মার এই নিত্য ওঠা-পড়া সর্বকালের এক শাশ্বত সত্য।
বিরাট কল্পনা ছিল এই বাদশাদের : তারা অপরাহ্নে দেহে একটুখানি মুক্ত হাওয়ার পরশ দেবেন- তারই জন্য এই বিপুল আয়োজন। একই সঙ্গে তাদের আরো এক উদ্দেশ্য জড়িত ছিল। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেবতা মন্দিরে বসে ধ্যানের প্রশান্তি লাভ করবেন- এই জন্য চূড়ার উপর স্থাপিত হয়েছিল এক মনোরম মন্দির। মন্দিরের ভিতরে ও চারপাশের বারান্দায় ছিল বহু বৌদ্ধমূর্তি। আজ তার একটিও নেই। শূন্য বেনী পড়ে আছে।
এই পাষাণ মন্দিরের দেহ যেমন অটুট, এ মন্দিরের স্মৃতিও যদি তেমনি অটুট থেকে থাকে তবে নিশ্চয় এর মনে পড়ে, কত সন্ন্যাসী, গৃহী রোজ এসে এর বেদী- মূলে মাথা ঘুড়ে মরেছে আর প্রার্থনা করেছে কত দীর্ঘদিনের স্বপন পোযাবর। ধীরে মন্দির যাত্রীর বেদনার সঙ্গে উপলব্ধি করেছে, এ দেবতারা তাদের জন্য কিছুই আর করতে পারছে না। ক্রমে তারা মন্দিরকে উপেক্ষা করে চলে গেছে। অবজ্ঞাত দেবতারাও তেমনি ধীরে পড়েছে সরে এমন-ই হয়।
কেবল প্রতিমা নয়, ধর্মের আচার অনুষ্ঠান ও যতদিন থাকে আদর্শের প্রতীক, যতদিন তাদের বুকে প্রেরণা থাকে প্রাণময় ততদিন তাদের কাছে এসে মানুষ জীবনে নরম উপলব্ধির সাড়া পায়। তারপর সে মন্দির আচার অনুষ্ঠান ক্রমে হারিয়ে ফেলে তার অন্তরের বাণী হয়ে পড়ে তারা অকর্মন্য প্রবঞ্চনা। মহীরুহের প্রথমে ঝরে পড়ে পাতা, তারপর খসে পড়ে তার পরব। ক্রমে ক্রমে তার শাখা-প্রশাখারা ভেঙ্গে পড়তে থাকে। অবশেষে একদিন মূল গাছ অসহায়ভাবে হয় ভুমিদা ১৩
ভ্রমণ কাহিনীতে রয়েছে লেখকের জীবনাদর্শের একটি প্রচ্ছন্ন দিক। দেশের প্রতি তাঁর গভীর ভাবনার অন্তগূঢ় মঙ্গলাকাঙ্খা, দেশ অনাচারীদের কটাকে প্রতিফলিত হয়েছে এবং বর্ণিত নিন্দার কৌশলগত ভঙ্গিটিকে ছাপিয়ে উঠেছে তাঁর স্বাজাত্যবোধ। স্বদেশীদের নিলা সরাসরি বিদেশীর কানে তিনি তুলতে নারাজ অথচ ইঙ্গিতটি করেছেন এমনি কৌশলে যে সহজেই মূল বক্তব্য ধরা পড়ে।
আমি এক দেশের কথা জানি যে দেশের লোকেরা তোমাদের মতই দেশ-প্রেমিক কিন্তু তারা বোকার যত দেশ-প্রেম করতে গিয়ে নিজের পায় নিজে কুড়াল দেয় না। ১৪

আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে আরো রসপূর্ণ করবার ক্ষমতা তার স্বভাবজ বৈশিষ্ট্য। আসর মাতিয়ে রাখতে পারেন না সবাই কিংবা কিছুটা পারঙ্গম হলেও প্রতিপক্ষের আক্রমণে পুরোপুরি সফল হতে পারেন না। লেখক এক্ষেত্রে সকলকে হারিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের হাত থেকে জয়ের পতাকাটি ছিনিয়ে এনে বিভায়ীর বেশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর রহস্য কৌতুকস্নিগ্ধ অথচ গভীর। বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে এইসব বসনির্যাস তাঁর রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য।
চীনা লেখক সংঘের সহ-সভাপতি আমার পানে চেয়ে বল্লেন, মাফ করবেন, আমি কিন্তু আপনার উদরের দৈর্ঘ্য মেপেজুকে ভেবেছিলাম টেবিলের সমস্ত থানা উজাড় করেও আপনি জিজ্ঞাসা করবেন, আরো আছে ? আমি বল্লাম : হিসাবে একটা ভুল করছেন, বন্ধু। আমার লম্বা উপর আসলে নদীর মত আর আপনার ফুটবলের মত গোলাকার উদরটি সমুদ্র বরাবর। ইয়াংশী নদী যত দীর্ঘই হোক, চীন সাগরের কাছে সে কি ?
কমরেড লী চী বল্লেন, ‘বেশ আপনার এ থিসীস কবুল আর বাকী থানার দায় থেকে আপনি যুক্ত ১৫
গল্প বলায় লেখকের অসামান্য দক্ষতা। গল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। চট করেই একটি আশ্চর্য কাহিনী ফেঁদে বসে এক মোহন আবহ সৃষ্টির দক্ষতা তাঁর আরোপিত কিছু নয় স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। শুধু বলা বা সৃষ্টিতেই নয় গল্প জমাতেও পারেন তিনি। আর এই আর্টের আকর্ষণই পাঠককে কাছে টানে মুগ্ধ করে।
গ্রন্থটির বর্ণনাশৈলীতে এমন এক প্রাণময় জীবন্ত ভাব ফুটে উঠেছে যে পড়তে গেলেই হৃদ চোখ মেলে দেখতে পায় এক অতি নিকট দৃশ্য। চারিপাশের দৃশ্যাবলীর বর্ণনা দেয়া একটা সহজ কাজ তবে একে সাহিত্যে রূপ দেয়া নিতান্তই কঠিন এবং দুর্লভ গুণ। এই গুণের অধিকারী হলেন ইব্রাহীম খাঁ।
গ্রন্থের লেখক বিভিন্ন বিষয়ে যে সুপন্ডিত ছিলেন এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। নানা বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন তিনি। গুণীজনের উদ্ধৃতি ব্যবহারের ব্যাপকতা গ্রন্থের সর্বত্রই চোখে পড়ে। আসলে তিনি আনন্দ-বেদনায় আপন অন্তরের অনুভূতি প্রকাশে প্রায়শই যে কাব্যিক পরিমণ্ডলের আশ্রয় নিয়েছেন তা ব্যক্তি বিশেষের সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে সঙ্গত শুধু তাই নয় এই প্রয়োগ তাঁর আর্তির মধ্যেও বিধৃত। চীনের মহাপ্রাচীর যা পৃথিবীর ৭ম আশ্চর্যের একটি বলে খ্যাত সেই মহাসুন্দরের অন্তরালেও যে বয়ে চলেছে নীল বেদনার নহর এক দরদী কবির আর্তিতে তা পূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রাচীর নির্মাণ কাজে প্রিয় স্বামীর মৃত্যুতে বিরহিনী প্রিয়ার মর্মস্পর্শী হাহাকার কবির ভাষায় তুলে ধরে লেখক স্ব-বেদনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
তবে কিছু আঞ্চলিক, আটপৌরে শব্দের ব্যবহার কোথাও কোথাও এমনি বেমানান হয়ে উঠেছে যা গ্রন্থের শিল্পসত্ত্বাকে অনেকখানি ম্লান করে দিয়েছে। এমনি কিছু শব্দ যেমন একটা গাছ গাড়, একটা গাতা কর’, ‘রাতে ফিলিম দেখতে গেলাম’, আজ ছয়মাস যাবত ফিলিম চলছে, তবু রোজ টিকিট নিয়ে পাড়া পাড়ি। “আমার ভেতরেও বহুত গোর্খা জমা হয়ে আছে। গোস্বা, গাড়, পাতা, ফিলিম, পাড়া পাড়ি প্রভৃতি শব্দগুলিতে যদিও একটা আন্তরিকতার ছোঁয়া আছে তবু প্রচলিত ভাষারীতিতে শ্রুতিকটু ঠেকছে।
ইব্রাহীম খাঁর ভাষারীতি প্রায়শই ব্যবহারিক কখন প্রণালীর কাছাকাছি গেলেও প্রবহমান জীবনের উপজীব্য বিষয়গুলোকে সাহিত্য ফলিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন।
কবি ইবনে ইন্শা কবি তো বটেই, রস রচনাতেও তিনি ওস্তাদ। মেজাজে স্নিগ্ধ, বৈঠকে দোঁপে রাজা, যুক্তিতে সক্রেতিসের সতেলা ভাই। তার ছোহবত যে কারো পক্ষে লোভনীয়। অধ্যাপক ওয়াহীদ কোরায়শী বসুতে বিশাল, মশায় কামড় দিলে সহজে ধরতে পান না যে সে বিহঙ্গম প্রবরটি দেহের কোন দূর কেন্দ্রে শিঙ্গা লাগিয়ে বাইতমিনান বসে আছে। ১৬
তৎসম শব্দ যথাসম্ভব পরিহার করেছেন তিনি। সহজ সুন্দর ভাষায় জনগণের উপযোগী সাহিত্য রচনায় সরলতা ছাড়াও বাংলার গ্রামীন মেজাজকে তুলে এনেছেন তিনি সচেতনভাবে। কিন্তু তাঁর ভাষা অগভীর বা হালকা নয়, ঐতিহ্যবাহী বঙ্গভাষার ঐশ্বর্যে তা সমৃদ্ধ। এক কথায় ভাষার উপরে তার দখল ছিল পুরোদস্তুর। শব্দচয়নে, উপমা নির্বাচনে, বাক্য নির্মাণে, অলঙ্কার ব্যবহারে তাঁর জাগ্রত শিল্পসত্তা যাত্রা করেছে সাহিত্যের রূপ লাবণ্যের দিকে।
আমরা চীনে চলেছি- চীনকে জানতে, চীনকে জানাতে। পরিচয়েই প্রীতি। আমরা পরিচয়ের পাত্রে প্রীতি দেব, প্রীতি নেব। পরিচয়ের অজেয় সেতু গড়ব আমরা আকাশ পথে। সে সেতুর লক্ষযোজন নীচে পড়ে থাকবে হিমালয়ের গর্বিত শিখরেরা। এভারেষ্ট কাঞ্চনজংঘা লজ্জায় তুষারের চাদর মুড়ি দিয়ে মুখ লুকাবে । ১৭
গ্রন্থটি বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনায়, অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে ও রোমান্টিকতার মেধাবী মিশ্রণে নিঃসন্দেহে হয়ে উঠেছে একটি সুখকর সাহিত্য।