আজকে আমরা বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করবো। যা সর্বজনীন উৎসব এর অন্তর্গত।

বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি বিকাশে ঋতুভিত্তিক উৎসবের ভূমিকা
পাললিক জনপদে বসবাসকারী বাঙালির স্বকীয় সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে, ঋতুভিত্তিক উৎসব তার জাতিসত্তার লালন, বিকাশ ও সুরক্ষায় সহায়ক হয়ে এসেছে যুগে যুগে। যদিও স্থানভেদে এর ধরন ছিল বৈচিত্র্যময়। নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্নতাবোধে আচ্ছন্ন, শ্রমকান্ত মানুষ পুনরুজ্জীবিত হয় এই উৎসবের মধ্য দিয়ে। ঋতু উৎসব দেয় ইচ্ছে পূরণের তাগিদ।
আদিম গুহাবাসী মানুষ ইতিহাসের বিস্তীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে সভ্যতা, প্রগতি, জ্ঞান আর সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ধারায় এগিয়ে চলেছে। নিজেকে অন্বেষণ করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করে যে প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেই প্রকৃতির সান্নিধ্যই তাকে অনিঃশেষ নির্মল রাখবে। তাই আদিম যাযাবর মানুষ ঋতুবৈচিত্রো সময়-উপযোগী ‘আর্তব উৎসব অর্থাৎ কৃষি উৎসবে মিলিত হতো। ঋতুভেদে উপযুক্ত শস্য ঘরে তোলার সেই ধারায় এসেছে নববর্ষের আমানি উৎসব’ এবং নতুন ফসলের ‘নবান্ন’ উৎসব (শামসুজ্জামান, ২০১৪ ২৮-২৯)।
সভ্যতার ক্রমবিকাশেও প্রকৃতি-ভক্ত মানুষ তার চারপাশের নিসর্গ, প্রকৃতির রূপান্তর আর ঋতু পরিক্রমাকে উপেক্ষা করতে পারেনি কখনো। কারণ ঋতুবৈচিত্র্যই নির্ধারণ করে দিয়েছে তার টিকে থাকার আদর্শ পরিবেশ, বেঁচে থাকার কৌশল।
তাই নতুন শস্য প্রাপ্তির নবান্ন উৎসবে অনাগত দিনগুলোয় অভাব-অনটন ঘোচানোর কামনা করে। তার জীবনে পৌষ-পার্বণ আসে সুফল প্রাপ্তির আশির্বাদ হয়ে। বর্ষবরণে বাঙালির যেমন প্রত্যাশা থাকে অতীতের অপ্রাপ্তি থেকে উত্তরণের, তেমনি বর্ষায় আর শরতে প্রকৃতির সুজলা, সুফলা, শস্যসমৃদ্ধ হয়ে ওঠাকে উদযাপন করে প্রাণ প্রাচুর্যের বাহক হিসেবে। আর বসন্তে নব রূপে সজ্জিত প্রকৃতির বন্দনা যেন নিসর্গের প্রতি ভালবাসার প্রকাশক।
যেহেতু বাঙালির বড় কোনো ধর্ম-নিরপেক্ষ উৎসব নেই, তাই ঝতুভিত্তিক উৎসবগুলো ব্যাপক পরিধি নিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি উৎসব হিসেবে প্রভাব বিস্তার করেছে সমাজে। আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানবচরিত্র গঠনে বিশেষভাবে প্রভাবশালী হয়, এমন ধারণা থেকে আবু জাফর শামসুদ্দীন বলেন :
বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু। প্রতিটি ঋতু মাত্র দুমাস স্থায়ী। চরম আবহাও এখানে নেই। উৎপাদন পদ্ধতি এক আবহওয়া সংস্কৃতি ও সভ্যতার পটভূমি। বাংলার লোক সংস্কৃতির চরিত্র, বৈশিষ্ট্য এবং বাংলাভাষাভাষীর মন ও মানস গঠনে তার ভূমিকা বুঝতে হলে উক্ত বিষয়গুলো স্মাক আৰু ঘ ১৯৮৮ – ১৫-১৯)
মূলত সময় পরিক্রমায় সভ্যতা ও সংস্কৃতির নববিধ রূপও জলবায়ু প্রভাবিত, এ কথা মেনে নিতে হয়। আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো না থাকলে, গোটা মানব জাতির অস্তিত্ব হয়তো সংকটের মুখে পড়ত। ‘যদিও সব বৈচিত্র্য স্বত্ত্বেও সকল উৎসবই চরিত্রে একটি জায়গায় এক উৎসব মাত্রেরই একটি না একটি উদ্দেশ্য আছে। এবং আনন্দ তাদের অঙ্গ, প্রায় ক্ষেত্রেই প্রধান উপজীব্য (আতোয়ার, ১৯৮৫ : ৫)। এমন – কথার সাথে সহমত প্রকাশ করে সৌমিত্র শেখর লিখেছেন :
আনন্দের জন্যই উৎসব। উৎসব হারিয়ে গেলে আনন্দ লোপ পায়। আনন্দ না থাকলে বেঁচে থাকা কষ্টের, হয়তো অর্থহীনও। নবান্ন যদি হারিয়ে যায় চিরতরে, বাঙালির জীবনে আনন্দের একটি স্রোত নিশ্চিতভাবেই কমবে। (সৌমিত্র, ২০১৪ ১০২ )
এই আনন্দ ঐতিহ্যের মাঝেই বাংলার লোকায়ত সমাজ। এই সমাজব্যবস্থা কৃষিনির্ভর বিধায়, এখানকার প্রাত্যহিক জীবন প্রণালী, লোকশিল্প, লোকসাহিত্য, লোকনৃত্য, লোকক্রীড়া প্রভৃতি লোকসংস্কৃতির পরিমণ্ডলে কৃষিভিত্তিক জীবনকে প্রতিনিধিত্ব করে। মোমেন চৌধুরী (২০১৪ : ১০২) বলেন, ‘আমরা অবগত যে, লোকসংস্কৃতি একান্তভাবেই ঐতিহ্য নির্ভর, আঞ্চলিক, সমন্বয় ও রূপান্তরধর্মী, সম্প্রসারণশীল এবং সতত সৃষ্টিশীল।

আর প্রকৃতির অভিনব সৃষ্টিশীলতায় ঋতু-উৎসব বাঙালির কাছে ধরা দিয়েছে নব নব রূপে, নবজীবন লাভের প্রেরণা হয়ে। তাই উৎসবের মিলিত শক্তি দুর্নিবার। এর কাছে অসহায় সাম্প্রদায়িক শক্তি। বিশ্বজিৎ ঘোষের মতে :
এমনি এক সময় পর্বে, মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত দিনে, বাঙালির জীবনে নববর্ষ বা বৈশাখ এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শক্তিউৎস হয়ে, বাঙালি জাতির অস্তিত্বের চিরায়ত উৎস হয়ে। পয়লা বৈশাখ মানে বাঙালির ঐতিহ্য অন্বেলা, পয়লা বৈশাখ মানে বাঙালির আপন শিকড়-অন্বেষা। পয়লা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনকে একট সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে না দেখে, দেখতে হবে ঔপনিবেশিক আমলের মতো রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে। (বিশ্বজিৎ, ২০১৯ ২৫২-২৫৩)
ঔপনিবেশিক আমল কেন, বলা যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই উৎসব শিক্ষণীয় এক সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি মিলনের কথা বলে। সংস্কৃতির সূত্রে বহুধা-বিভক্ত জাতি খুঁজে পায় এক মোহনায় মিলনের অন্তর্তাগিদ ও অবলম্বন, যা অনেকের কাছে শঙ্কার, এমন উল্লেখ করে মফিদুল হক লিখেছেন :
বৈশাখী চেতনা শঙ্কিতও করেছে অনেককে যেমন একদা করেছিল পাকিস্তানি শাসকদের যারা ভেবেছিল এ দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে, ধর্মীয় ঐক্যে গড়বে জাতীয় ঐক্যের ভিত। এই উগ্র ধর্মান্ধতা তাদের ঠেলে দিয়েছিল চরম বিভ্রান্তির দিকে এবং চোখে ঠুলি পরিয়ে হিংসার ভাবাদর্শে আচ্ছন্ন করেছিল চিত্ত।। (মফিদুল ২০১৯ ২১৬)
তবে, প্রকৃত ইমানদার এবং মুসলিমসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারকবাহক মানুষেরা এই সাম্প্রদায়িক চতুরতার বিরোধী। উৎসবের নামে সবাইকে এদেশের ধর্মবিশ্বাসীদের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়ার কৌশলটি মাত্র গোটা কয়েকের, উল্লেখ করে আল মাহমুদ লিখেছেন :
আমরা মনে করি এদেশের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের সাথে এদেশের কবি-সাহিত্যিকদের প্রকৃতপক্ষে কোনো বিবাদ বা বিরোধ ছিলো না। …. এদেশে আর যাই হোক ধর্মীয় আন্দোলনের কোনো নেতাই বিশেষ করে ইসলামী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো নেতা, কর্মী বা আলেম সমাজের কেউ সাম্প্রদায়িকতাকে উচ্চে তোলার ইন্ধন যোগান না।
এদেশের মুসলিম সমাজের কোনো দ্বায়িত্বশীল ব্যক্তিই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী নন। বরং তারা এদেশের হিন্দু ও খৃস্টান ভাইদের ধর্মীয় অধিকারে যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। আসলে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ এই কথা বা শব্দটি এদেশের বামপন্থী প্রগতিবাদীদের আবিষ্কার।’ (আল মাহমুদ, ২008 ৯৬)
আসলে প্রগতিশীল এবং মানবিক চেতনায় সামাজিক আদর্শদের বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে ঋতুভিত্তিক উৎসব। অপরের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার সাথে সাথে শ্রেণিসম্পর্ক জোরালো করতে তাগিদ দেয় এই উৎসব সম্মিলন। উৎসবের মাধ্যমে ‘ব্যক্তি আমি’কে ছাপিয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় ‘বহু আমি’র মাঝে। একের অপ্রাপ্তির বেদনা অন্যের প্রাপ্তির আনন্দে ভাগ করার উপলক্ষ হয়ে আসে ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো।
প্রগতিশীল সংস্কৃতি
প্রগতি অর্থ অগ্রগতি। মূলত চিন্তা, জ্ঞানে ও কর্মে সমুন্নত হয়ে এগিয়ে চলাই ‘প্রগতি’ শব্দের সমার্থক। প্রগতিশীলতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: উল্লেখ করে ইমরান এইচ সরকার এর বিশদ ব্যাখ্যা করেন। ‘প্রগতিশীলতা, মুক্তচিন্তা, ধর্মবিদ্বেষ : একটি বিশ্লেষণ (২০১৫), প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, স্থবির, ঘুনেধরা সমাজ যখন গুণগতভাবে ও সুসংহতভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলে, তখন সে সংস্কৃতি হয়ে ওঠে প্রগতিশীল সংস্কৃতি।
চেতনায় বিপ্লব ঘটানো, দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনা এবং ভাবনাকে শাণিত করা প্রগতিশীল সংস্কৃতির কাজ। বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ এবং তজ্জনিত কারণে সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে সক্ষম এমন মতবাদ প্রগতিশীল মতবাদ। অপর পক্ষে, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং – সামাজিকভাবে সীমাবদ্ধ বিধান প্রতিক্রীয়াশীল মতবাদের অন্তর্ভুক্ত।
বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতির উৎস ধর্ম নয়, বরং লোকায়ত চিন্তা ও ভাবাদর্শ, যা প্রজন্ম – পরম্পরায় চলে আসছে। মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে আধুনিক লিখিত সাহিত্যে কিছু ধর্মীয় ও অলৌকিক বিষয় থাকলেও পালা, পল্লিগান, যাত্রায় এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিস্তার লক্ষণীয়।
মূলত ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও উদারপন্থী মতবাদ এমন উল্লেখপূর্বক হায়দার আকবর খান রনো ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম বাঙালি সংস্কৃতি (২০১৭) নিবন্ধে বলছেন :
পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে অনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কাজে আসেনি। এখনো যারা মনে করে, মুসলমানিত্ব পরিচয়ের জন্য বাঙালিত্ব ঘুচিয়ে দিতে হবে, তারা মুর্খের স্বর্গে বাস করে। তারাই পয়লা বৈশানের বিরোধিতা করে, আলপনা আঁকাকে সুন্দর আর্ট হিসেবে না দেখে আলপনার গায়ে কালি লাগায়, ভাস্কর্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে জানে না।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখ যাবে, আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মীয় চেতনা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করেনি। বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি – যা আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে ছিল এবং এখনো আছে তা খুবই শক্তিশালী হায়দার আকবর, ২০১৭)
বাঙালির চিন্তা পদ্ধতিও যেন প্রভাবিত, অনেকক্ষেত্রে শর্তযুক্ত। যে প্রকাতায় ধার্মিক মানে প্রতিক্রিয়াশীল এবং সংস্কৃতিমনা মানে প্রগতিশীল। তবে ব্যক্তির প্রগতিশীলতা ধর্ম পালন বা সংস্কৃতি পালনের মাপকাঠিতে বিবেচ্য হতে পারে না উল্লেখ করে দিলশানা পারুল তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা – প্রগতিশীলতা বনাম মৌলবাদ : বাংলাদেশের – ‘বাইনারি’ রাজনীতি’ (২০২০) নিবন্ধে বিষয়টির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে
প্রগতিশীল মানে প্রগতি, গতির সামনের দিকে, মানে যেই চিন্তা মানুষের সভ্যতা এবং সংস্কৃতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে সেটাই প্রগতিশীল চিন্তা। এখন এই চিন্তা পদ্ধতি যদি আপনাকে সামনের দিকে পথ না দেখায় তাহলে এটা প্রগতিশীল চিন্তা না। আপাত অর্থে আমাদের মনে হয় এই ব্যক্তি সংস্কৃতি চর্চার সাথে যুক্ত আছেন মানে উনার চিন্তা তুলনামূলক আগানো হবে, মৌলবাদী বা করে হবে না।
আবার ধর্মচর্চা করে বলে আমরা ধরে নেই যে, এর চিন্তা মৌলবাদী বা কূপমণ্ডুক হতে বাধ্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে আপনি কথা বলতে যেয়ে এইরকম অসংখ্য শিল্প সাহিত্যিক পাবেন যাদের রাষ্ট্র রাজনীতি, মানুষ, সমাজ-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু নিয়ে অত পরিষ্কার ধারনা নেই বা তারা খুব বেশি হয়তো ভাবছেনও না। আবরা দাড়ি টুপি পরা অসংখ্য মুসল্লী পাবেন যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সমস্ত কিছু নিয়ে অনেক গভীর পর্যন্ত ভাবছেন, ভারতে পারছেন। (পারুল, ২০২০ )
আলোচনা দৃষ্টে বলা যায়, প্রগতিশীলতা এক অর্থে কল্যাণমুখী প্রক্রিয়া। মানুষের মানবিক, আর্থসামাজিক এমনকি রাষ্ট্রিক উন্নয়নে প্রগতিশীল নেতৃত্বের অপরিহার্যতা তুলে ধরে আবুল কাসেম ফজলুল হক ‘জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ (২০১৮) নিবন্ধে লিখেছেন, জনসাধারণকেই নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হয়, জনগণ নিষ্ক্রিয় থাকলে, জনগণের মধ্যে চাহিদা না থাকলে কখনো জনকল্যাণকর বা প্রগতিশীল নেতৃত্ব দেখা দেয় না।
যে জনসাধারণ যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয়, সেই জনসাধারণ তখন ঠিক সেই রকম নেতৃত্ব সৃষ্টি করে। নেতৃত্বের মধ্যে জনচরিত্রের প্রকাশ থাকে এবং নেতৃত্বের দ্বারা জনচরিত্র গঠিত হয়।
সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, ক্রমপরিবর্তনশীল এই প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা কাম্য নয়। নিয়ন্ত্রণের ধারায় ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণও এখানে অপরাধ বলে বিবেচ্য হয়। প্রগতিশীল সংস্কৃতি মূলত কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি, অন্ধবিশ্বাস, প্রথাগত ও পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মানুষকে বিরত রাখতে সচেষ্ট হয়। চিন্তা, জীবনচর্চা আর স্বাধীনতায় পরিশীলিতবোধ প্রগতিশীল সংস্কৃতির সুসংগঠিত রূপ। এর পরিচয় থাকে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষায়, চিন্তায় ও কর্মে। প্রগতিশীল সংস্কৃতিকে বলা যায় একটি সচেতন জাতির সমষ্টিগত ব্যক্তিত্ব।
তাই এ সিদ্ধান্তে আসাই যায়, বাংলাদেশের ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো সর্বজনীন এবং এগুলো প্রগতিশীলতাকে ধারণ করে। আত্মকল্যাণবোধ, মানবিক উন্নয়ন ও সমন্বয়াধর্মী পথকে সর্বজনীন উৎসবগুলো প্রশস্ত করে। দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে, উন্নত সমাজ নির্মাণের লড়াইয়ে সৃষ্টিশীল উৎস হয়ে উঠতে পারে প্রগতিশীল ঋতুভিত্তিক উৎসব।

প্রগতিশীল সংস্কৃতি ও ঋতুভিত্তিক উৎসব
বাঙালির জীবনে ঋতু পরম্পরায় বিভিন্ন উৎসব আসে যায়। এই ঋতুউৎসব শুধু ব্যক্তি বা সমাজব্যবস্থাকে ভিন্নতর উচ্চতায় তুলে দেয় না, একটা জাতিকেও সৃজনশীলতার নব প্রতিভায় সমৃদ্ধ করে। যে-জাতির উৎসব নেই সে জাতি নিষ্প্রাণ, বন্ধ্যা, নীরক্ত ও সম্ভাবনাহীন; উল্লেখ করে শামসুজ্জামান খান (২০১৩ ৯০) বলেন, যে-কোনো জীবনবাদী মানুষ নব-আনন্দে বাঁচার জন্য, জাতীয় সৃষ্টিশীলতার নানা দিগন্ত উন্মোচনের জন্য, নতুন নতুন শক্তির উৎস আবিষ্কারের জন্য নতুন নতুন উৎসব চায়।
তবে উৎসবের বাহ্যিক ও অন্তর্নিহীত সৌন্দর্য এবং আত্মজাগরণের যে শিক্ষা, তা যেন অনেকাংশেই অবজ্ঞাত। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বঞ্চনা, সংকীর্ণ সম্প্রদায়-চেতনা। অথচ, ঔপনিবেশিক আমলে পয়লা বৈশাখ উদযাপন ছিল একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ; এমন উল্লেখ করে বিশ্বজিৎ ঘোষ জানাচ্ছেন
নববর্ষ-উৎসবের অন্যতম শিক্ষাই হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও মিলিত জীবন প্রবাহ। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রে বিরাজ করছে এক বিশাল শূন্যতা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন আসন্ন মৃত্যুমনায় কাতর। চারদিকে কেবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারের গোপন প্রকাশ্য প্রতিযোগ। বাংলাদেশ এখন বিদেশি দাতাদের খবরদারির অবাধ নী চারদিকে বিরাজ করছে হতাশা, নৈরাজ্য আর চরম হতা। (বিশ্বজিৎ ২০১৯ ২৫৩ )
অবস্থা দৃষ্টে, অপসংস্কৃতির এই আগ্রাসনে আমরা ভুলতে বসেছি জাতি হিসেবে বাঙালির মর্যাদা। ফলে, বাংলার কৃষ্টি-কালচার-ঐতিহ্য, বিশ্বমানবতার নেতৃত্বদানের মতো মহত্ব ও মানবিকতার আদর্শ থেকে বিস্তৃত জাতি বিভ্রান্তির অতলে নিমজ্জমান, উল্লেখপূর্বক আসাদ বিন হাফিজ (২০০৪ : ২২৭ ) মনে করেন, অপসংস্কৃতির ধারক বাহক একজন মানুষ থেকে সংস্কৃতিবান একজন মানুষের চিন্তা চেতনা অবশ্যই পৃথক। আর এ চিন্তা চেতনা পৃথক হওয়ার কারণে উভয়ের কর্মও পৃথক হতে বাধ্য।
সংস্কৃতি বিষয়ক পূর্ব অধ্যায়ে আলোচনা সূত্রে বলা যায়, ভাব-চিন্তা-কর্মে ও আচরণে জীবনের অর্জিত স্বভাবের শোভন অভিব্যক্তি এবং জীবিকা-সম্পৃক্ত জীবনাচরণ সবই সংস্কৃতির প্রকাশ। যার প্রভাব সাহিত্য, শিল্প, ঐতিহ্যে, লোক-সংস্কৃতিতে গভীর। আহমদ শরীফ মনে করেন :
ভাব-চিন্তা-কৃতির যে অংশ হিতকর ও গৌরবের তা-ই যেমন ঐতিহ্য বলে খ্যাত, তেমনি জীবন চর্নার যে অংশ সুন্দর-শোভন ও কল্যাণকর তা-ই সংস্কৃতি, বাদবাকী কৃতি বা আচার মাত্র। এ ভৌলে যাঁরা মাপেন তাঁদের কাছে জীবনচর্যার কিংবা জীবনযাত্রার সবটাই সংস্কৃতি নয়। তাদের সংজ্ঞায় নগরবিহীন সভ্যতাও নেই। আমাদের ধারণায় সংস্কৃতির উৎকর্ষে সভ্যতার উদ্ভব। সংস্কৃতির বস্তুগত ও মানসসমূত অবসানপুষ্ট জীবনপদ্ধতির সার্বিক ও সামগ্রিক উত্তরাধিকারই সভ্যতা (আহমদ শরীফ, ২০০৬ঃ২২ )
এই সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে উন্নতির চেষ্টা। প্রগতিশীল সংস্কৃতি একদিকে আত্মগঠনের এবং অন্যদিকে সমাজ পুনর্গঠিত করার ব্যাপার। এর বিকাশমান ধারায় ব্যক্তি ও সমষ্টির মানবিক উন্নয়ন, পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্য ঘটে বলেই মত সমাজবিজ্ঞানীদের।
নিজের উন্নতির প্রয়োজনেই মানুষ তার সার্বিক উন্নয়ন করতে চায়। এটা তার সহজাত উৎকর্ষ প্রচেষ্টা। আবুল কাশেম ফজলুল হক জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে ( ২০১৮) লিখেছেন, মানুষ শুধু বেঁচে থেকেই সন্তুষ্ট থাকে না, উন্নতি করতে চেষ্টা করে। আর নিজের উন্নতির প্রয়োজনে পরিবেশকেও সে উন্নত করতে চায়। এটাই মানুষের কৃষ্টিমানতা বা সংস্কৃতিমানতা। প্রগতিশীল সংস্কৃতি তার সেই উন্নয়ণ, উৎকর্ষ, সৌন্দর্য ও পূর্ণতাপ্রয়াসে সংস্কার প্রচেষ্টা :
সমাজজীবনে যত মন্থর গতিতেই হোক, পর্যায়ক্রমে অন্যায় কমানো ও ন্যায় বাড়ানো সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রগতিশীল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই সঙ্গে দর্শন, বিজ্ঞান ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষ তার সংস্কৃতিক সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। বিপ্লবে ও ন্যায়যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে। কিন্তু প্রতিবিপ্লবে ও অন্যায় যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে না, থাকে অপসংস্কৃতি। (আবুল কাসেম, ২০১৮ )
সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে উন্নতির বা প্রগতির প্রকাতা, চিন্তা ও চেষ্টা। মানুষের মনোদৈহিক উন্নয়ন, আর্থ সামাজিক ও রাষ্ট্রিক উন্নয়ণে প্রগতিশীল নেতৃত্বকে অপরিহার্য মনে করেন সমাজবিদগণ। তাই সংস্কৃতির সর্বজনীন কল্যাণবোধে, জীবনযাত্রার প্রকাশ-ই প্রগতিশীল সংস্কৃতির পরিচায়ক। এ ক্ষেত্রে ঋতুভিত্তিক উৎসব কিভাবে তার পরিপূরক, সে বিষয়ে আরও আলোকপাত করা যাক।
বাংলার লোকউৎসব সমষ্টি-চেতনার ফলস্বরূপ বলে মনে করেন মাধুরী সরকার। তাঁর মতে (২০১৪ to), সংহত সমাজের সৃষ্টি বলে সমগ্র সমাজের বাসনালোক মুক্তি পায় উৎসব-কলায়, মানুষের আচার-আচরণে, নাচে-গানে। ‘নবান্ন’, ‘পৌষালী’, ‘তোষলা’ – এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।
সংস্কৃতি বিষয়ক পূর্ব অধ্যায়ে আলোচনা সূত্রে বলা যায়, ভাব-চিন্তা-কর্মে ও আচরণে জীবনের অর্জিত স্বভাবের শোভন অভিব্যক্তি এবং জীবিকা-সম্পৃক্ত জীবনাচরণ সবই সংস্কৃতির প্রকাশ। যার প্রভাব সাহিত্য, শিল্প, ঐতিহ্যে, লোক-সংস্কৃতিতে গভীর। আহমদ শরীফ মনে করেন :
ভাব-চিন্তা-কৃতির যে অংশ হিতকর ও গৌরবের তা-ই যেমন ঐতিহ্য বলে খ্যাত, তেমনি জীবন চর্যার যে অংশ সুন্দর-শোভন ও কল্যাণকর তা-ই সংস্কৃতি, বাদবাকী কৃতি বা আচার মাত্র। এ তৌলে যার মাপেন তাঁদের কাছে জীবনচর্যার কিংবা জীবনযাত্রার সবটাই সংস্কৃতি না। তাঁদের সংজ্ঞায় নগরবিহীন সভ্যতাও নেই। আমাদের ধারণায় সংস্কৃতির উৎকর্মে সভ্যতার উত্তর। সংস্কৃতির বস্তুগত ও মানসম্ভূত অবদানপুট জীবনপদ্ধতির সার্বিক ও সামগ্রিক উত্তরাধিকারই সভ্যতা। (আহমদ
এই সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে উন্নতির চেষ্টা। প্রগতিশীল সংস্কৃতি একদিকে আত্মগঠনের এবং অন্যদিকে সমাজ পুনর্গঠিত করার ব্যাপার। এর বিকাশমান ধারায় ব্যক্তি ও সমষ্টির মানবিক উন্নয়ন, পরিবেশের সংস্কার, রূপান্তর ও নবজন্ম ঘটে বলেই মত সমাজবিজ্ঞানীদের।
নিজের উন্নতির প্রয়োজনেই মানুষ তার সার্বিক উন্নয়ন করতে চায়। এটা তার সহজাত উৎকর্ষ প্রচেষ্টা। আবুল কাশেম ফজলুল হক জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে সংস্কৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে ( ২০১৮) লিখেছেন, মানুষ শুধু বেঁচে থেকেই সন্তুষ্ট থাকে না, উন্নতি করতে চেষ্টা করে। আর নিজের উন্নতির প্রয়োজনে পরিবেশকেও সে উন্নত করতে চায়। এটাই মানুষের কৃষ্টিমানতা বা সংস্কৃতিমানতা। প্রগতিশীল সংস্কৃতি তার সেই উন্নয়ণ, উৎকর্ষ, সৌন্দর্য ও পূর্ণতাপ্রয়াসে সংস্কার প্রচেষ্টা
সমাজজীবনে যত মন্থর গতিতেই হোক, পর্যায়ক্রমে অন্যায় কমানো ও ন্যায় বাড়ানো সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রগতিশীল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই সঙ্গে দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটায়। বিপ্লবে ও ন্যায়যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে। কিন্তু প্রতিবিপ্লবে ও অন্যায় যুদ্ধে সংস্কৃতি থাকে না, থাকে অপসংস্কৃতি। (আবুল কাসেম, ২০১৮)
সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে থাকে উন্নতির বা প্রগতির প্রবণতা, চিন্তা ও চেষ্টা। মানুষের মনোদৈহিক উন্নয়ন, আর্থ সামাজিক ও রাষ্ট্রিক উন্নয়ণে প্রগতিশীল নেতৃত্বকে অপরিহার্য মনে করেন সমাজবিদগণ। তাই সংস্কৃতির সর্বজনীন কল্যাণবোধে, জীবনযাত্রার প্রকাশ-ই প্রগতিশীল সংস্কৃতির পরিচায়ক। এ ক্ষেত্রে ঋতুভিত্তিক উৎসব কিভাবে তার পরিপূরক, সে বিষয়ে আরও আলোকপাত করা যাক।
বাংলার লোকউৎসব সমষ্টি-চেতনার ফলস্বরূপ বলে মনে করেন মাধুরী সরকার। তাঁর মতে (২০১৪ ৮০), সংহত সমাজের সৃষ্টি বলে সময় সমাজের বাসনালোক মুক্তি পায় উৎসব-কলায়, মানুষের আচার-আচরণে, নাচে-গানে ‘নবান্ন’, ‘পৌষালী’, ‘ঘোষণা’ – এর প্রকৃষ্ট নিদর্শন।
একুশ শতকে প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনে বিপর্যয়-বিপন্নতায় আচ্ছন্ন মানুষ মানসিক প্রশান্তি আর মুক্তির আনন্দ খুঁজে পায় অসাম্প্রদায়িক লৌকিক উৎসবে। রবিউল হুসাইন বলেন :
শুভ্র বোধ থেকে উৎসারিত মানবতার স্বরূপ বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি আলোচিত দিক নির্দেশনার সুযোগ করে দেয় যা দেশের ভবিষ্যতকে আরও গৌরবময় ও প্রীতিময় করনা পথে সবাইকে অপ্রসারিত করে। এই মঙ্গলময় বোধই আমাদের ভবিষ্যতের পথকে আলোকন করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে সাহায্য করে। রবিউল ২০০৮ 010)
ঋতুভিত্তিক উৎসব মানুষের আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন, সমাজের প্রতিচ্ছবি। এই উৎসব উদ্যাপনের বিশেষত্ব এখানেই। কোনো সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক জীবন তার উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়, এমন মত দিয়ে সুমহান বন্দ্যোপাধ্যার নবান্নে প্রসঙ্গ এনে বলেন :
কৃষিজীনী বাঙালি সমাজ ছাড়াও আরও নানা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবান্ন বা সমগোত্রীয় উৎস লক্ষ করা যায়। এই সমস্ত সম্প্রদায়ের নবান্ন জাতীয় উৎসবের মধ্যে বাঙালির নবান্নর তুলনামূলক আলোচনা করলে অর্থনীতি আর ধর্মের অন্তলীন যোগসূত্র উৎসমূলে কিভাবে রয়েছে তার একটি সূত্র যেন আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়। (সুমহান, ২০১৪ -83-82)
দীপককুমার বড় পড়া মনে করেন, নবান্নে সারা বছরের খাবার ঘরে ওঠে। শুধু তাই নয়, গ্রামীণ সমাজের সম্বৎসরের পরিকল্পনা, লৌকিকতা, চিকিৎসা, সামাজিকতা সবকিছুতেই এ উৎসব প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন :
আদতে কৃষি বা শব্দ উৎসব বলেও এর ব্যাপকতা শুধু কৃষি বা শস্যের মধ্যে আটকে নেই। ছড়িয়ে পড়েছে পরিবার থেকে পাড়ায় এবং তারও বাইরে। যেন হামীদ জীবনকে ধরে রাখার উৎস এই নবান্ন। … এর সঙ্গে আছে পারিবারিক আনন্দ কিংবা সমমান ২০১৪ ৭৪ )
নববর্ষ উৎসব ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাঙালি পালন করেন, যেখানে বিত্ত আর সামর্থ্যের বিষয়টি গৌণ, এমন মত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের। এই উৎসবের রূপটি ধর্মীয় নয় বিধায়, নববর্ষের উৎসবটি আর দশটা উৎসব থেকে আলাদা, উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ধর্ম ও গোত্রনির্ভর উৎসবের ভিড়ে নববর্ষ আমাদের জানিয়ে দিয়ে যায় আমাদের সংস্কৃতিটি মানুষে মানুষে মিলন প্রতিষ্ঠা করে এই সংস্কৃতি বিভাজন ও বৈষম্যকে প্রত্যাখ্যান করে।’ (মনজুরুল, ২০০১ ২৫)।
ঋতুভিত্তিক উৎসব মানুষের প্রকৃতিগত চেতনার সঙ্গে যুক্ত। এমন অসাম্প্রদায়িক উৎসবের গণ্ডি নির্ধারণ করা দুঃসাধ্য বলে মনে করেন সংস্কৃতজনেরা। ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো যে সামাজিক বা পারিবারিক রীতির অংশ, তা স্বীকার করেছেন আমিনুর রহমান সুলতান (২০১৪ : ৫৬)। তিনি ঐতিহ্যমণ্ডিত লোক-উৎসবের ব্যপ্তি লোকজ সংস্কৃতির অপরিমেয় শক্তিকে উপলব্ধি করার কথা বলেছেন।
কৃষিনির্ভর বাংলায় সাহিত্য, সংস্কৃতি, উৎসব, পার্বণ সবকিছুই শস্য ও প্রকৃতি কেন্দ্রিক। শস্য বেশিরভাগ আয়োজনের কেন্দ্র হলেও ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলোয় প্রাধান্য পায় প্রকৃতিবন্দনা। তিতাশ চৌধুরীর (২০১৪ঃ৫৪) মতে, বাঙালির মননে নিবিড়ভাবে যুক্ত সর্বজনীন উৎসব ব্যাপারটির ভেতর নিহিত থাকে এক পৰিত্ৰ আনন্দ।
ঋতুভিত্তিক উৎসব-আনন্দের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকে মেলা। আর কোনো মেলাই ধর্মীয় প্রভাবে সীমাবদ্ধ না। মেলায় বিভিন্ন লোকজ সামগ্রী, গাহস্থ উপকরণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসব উপভোগ করার সুযোগ মেলে ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের। সর্বজনীন এই উৎসবের গুরুত্ব বিষয়ে মৃত্যুঞ্জয় রায় মনে করেন, অনেক কষ্টের মাঝেও মানুষ মেলার আয়োজন করে, মেলায় যায়, আড়ং খরচ জমায় মেলার গান বাঁধে। শত দুঃখের মাঝেও উৎসব আর মেলায় আনন্দে মেতে ওঠে :
মেলা মানেই মেলা অর্থাৎ অনেক মানুষের মিলন মেলায় কেনো ধর্ম বর্ণের বাছ বিচার থাকে না। সবাই মেলায় যায়। কেউ যায় আনন্দ করতে, কেউ যায় বাণিজ্য করতে, আবার কেউ যায় পুণ্য লাভের আশায়। বিভিন্ন লোকছ সামগ্রী কেনা বেচার এক মোক্ষম জায়গা হল মেলা। সার্কাস, পুতুল নাচ, কবিগান, জারিগান, যাত্রাপালা ইত্যাদিও অনেক মেলায় পরিবেশিত হয়। …. এখন যে কোনো মেলাই সব মানুষের মিলনভূমি। ছোট-বড়, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-দরিদ্র সবাইকে মেলা যেন মিলিয়ে দেয়। অন্তত মেলার সময়টা যেন আমরা সবাই এক হয়ে যাই, ভুলে আমাদের বিষে তাই যে কোন মেলায় দিয়ে মনে হয়, এই মহামিলন আমাদের অক্ষত হোক। আমরা সক মানুষ সমান হই সকলে মিলে আনন্দ উৎসব করি। (মৃত্যুঞ্জয়, ২০১০ – ১২৩)
মহামিলনের আনন্দ সমাবেশে ভিত্তিক উৎসবের দিনটি খুব কাঙ্ক্ষিত থাকে মানুষের কাছে। চৈত্র সংক্রান্তি, বর্ষবরণ, আষাঢ় উদযাপন, শরৎ বন্দনা, হেমন্তের নবান্ন উৎসব, পৌষমেলা, শীতের পিঠা উৎসব বা বসন্তবরণ অনুষ্ঠান বিভিন্ন আচার আনুষ্ঠানিকতায়, ব্যবহারিক আয়োজনে সমাজব্যবস্থাকে বিকশিত করে এসেছে, আবহমানকাল ধরে।
এই দিনগুলো ঘিরে থাকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও। মানুষে মানুষের মিলন ও ত্যাগের আনন্দে যেমন মিশে থাকে পরিতৃপ্তির আমেজ, ঘটে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ, তেমনি মানসিক দূরত্ব ঘোচানোর এক আনন্দ উপলক্ষ, নতুন প্রেরণা এই ঋতুভিত্তিক উৎসব। পারিবারিক বা ধর্মীয় উৎসবগুলোয় সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে বিধি-বিধান থাকলেও, তু উদযাপনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি বেশ সাবলীল। পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে একে-অন্যের সাথে মিলিত হয়ে এবং হতাশা ছাপিয়ে নতুন জীবনবোধে উজ্জীবিত হয়ে সামাজিক সখ্যের ভিত দৃঢ় করে ঋতুভিত্তিক উৎসব।
জনগণের স্বীকৃত ধারণার ভিত্তিতে তার এই উৎসবগুলো হয়ে ওঠে প্রগতিশীল। কতু-উৎসব ভাবনায় প্রগতিশীল সংস্কৃতি যেমন স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার, তেমনি তা সজ্ঞান সতর্ক চর্চারও ব্যাপার। অসাম্প্রদায়িক এই সাংস্কৃতিক উৎসবে প্রগতির জন্য মানুষ তার আদিম সত্তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নৈতিক সত্তার অনুসারী হয়ে ওঠে। প্রগতি কার্যকর হয় প্রতিক্রিয়াশীলতার মোকাবেলায় মুক্তবুদ্ধি মানুষদের সাথে নিয়ে।
ঋতুভিত্তিকত উৎসবে প্রগতিশীল সংস্কৃতির ভূমিকা
উৎসবের সেই আনন্দদায়ী রূপ আজও আছে, বরং তার অনুষ্ঠানে প্রধান অংশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বা সবটুকু জায়গা জুড়ে। আধুনিক জীবনের অসহনীয় ব্যস্ততা আর দিন যাপনের গ্লানির মধ্যে, থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া-বড়ি-ঘোড় জাতীয় কর্মমালার একঘেয়েমির ভেতর, আজও মানুষকে দেয় হাঁফ ছাড়বার অবকাশ, সেই সঙ্গে মনটাকে আনন্দের খোলা হাওয়া খাইয়ে নতুন কর্মোদ্যমের জন্যে চাঙা করে তোলার সুযোগ।
ঈদে, দুর্গাপূজা, বড়দিন ইত্যাদির মতো ধর্মীয় উৎসবে মানুষ ঘরমুখো ছুটে আসে কেবল ধর্মের টানে নয়, ওই অবকাশ আর সুযোগের টানেও। বস্তুত ঐগুলিই হয়ে ওঠে উৎসবকালে তার প্রধান আকর্ষণ। ঘরে ফিরলে সে পায় দুটি দিন আজকের মানুষের কাছে উৎসবের সবচেয়ে বড় মূল্য সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য এইখানেই। তার থেকে আনন্দদায়ী অনুষ্ঠান এখন মানব সমাজে আর নেই।
একসময় নবান্ন, পৌষ-পার্বণ, উৎসব, আচারে ঐক্যের দিকটি যেমন মুখ্য ছিল, তেমনি লৌকিক উৎসবগুলো ছিল বিনোদনের অংশ। সময়ের সাথে উৎসব আয়োজনে প্রগতিশীলতার সেই সংস্কৃতি, সেই উচ্ছ্বাসে অনেকটা ভাটা পড়লেও, এই ঋতু উৎসবের উপযোগিতা এখনও অমলিন বাংলার প্রতিটি গৃহে। মোমেন চৌধুরী লিখেছেন :
লৌকিক পালা-পার্ক, বিশেষ করে এখন বৃদি পর্যায়ে যেগুলো আছে, সেগুলোর ব্যাপকতা অনেক কমে এসেছে তবে যেটুকু এখনো আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে পাই, তার অনেকটাই সাংস্কৃতিক চেতনাপ্রসূত। (মোমেন, ২০১৪ঃ ৪২)
এই চেতনাকে, এই স্ফূলিঙ্গকে আরও উজ্জ্বল করে তোলার দ্বায়িত্ব অসাম্প্রদায়িক বাঙালির। নইলে, জাতি হয়ে উঠবে আত্মপরিচয়বিস্তৃত, স্বতন্ত্র্যচেতনা রহিত, শিকড়-বিচ্ছিন্ন জাতি। সামাজিক অবক্ষয় রোধে সংস্কৃতি এক রক্ষাকবচ এ কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ। শিল্পকলা পদক ২০১৭ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন :
একটি জাতির তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে শুদলা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমের চেতনা বিকাশসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য জাগিয়ে তুলতে সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিশু, কিশোর ও যুবকদেও ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষবাষ্প থেকে দূরে রাখতে তাদের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের জানাতে হবে, আমাদের এই মাতৃভূমিতে জঙ্গিবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। হাজার বছর ধরে নানা জাতি-ধর্মের মানুষ এই ভূখণ্ডে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের সুমহান ঐতিহ্য। (আবদুল হামিদ ২০১৮ )
সাম্যবাদী সমাজ গঠনের ইতিহাস পর্যালোচনা করে, সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ স্মারক সংকলন এর উদ্ধৃতি দিয়ে অনুপ সাদি তাঁর ‘সংস্কৃতি সম্পর্কে লেনিনবাদ হচ্ছে বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের প্রগতিশীল সংস্কৃতি’ (২০১১) নিবন্ধে লিখেছেন, লেনিন সংস্কৃতিকে শান্ত জীবনের উপাদান হিসেবে দেখেননি। মার্কসের হাতে ঢেলে সাজানো অর্থশাস্ত্রে শ্রেণিসংগ্রাম উত্তরণে যেমন সাম্যবাদীদের দিক নির্দেশনা দিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবেই লেনিন প্রলেতারিয়েত সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
লেনিন মনে করেন, সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলার জন্য বুর্জোয়াদের থেকে ক্ষমতা নিজেদের কাছে নেওয়া দরকার। এজন্য বিশেষজ্ঞদের কাছে টানতে হবে। সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতা জাতিকে এক উচ্চতর প্রলেতারিয় গণতন্ত্র দিতে পারে কিন্তু এর ফলে আমলাতন্ত্র দৃঢ় হয়। ক্ষমতা মেহনতি মানুষের থাকে না। এজন্য আইনই যথেষ্ট নয় প্রয়োজন কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন, যা গড়ে ওঠে দীর্ঘ মেয়াদি প্রচেষ্টায়।
এই প্রচেষ্টায় ধর্ম প্রভাবিত না হয়ে মনুষ্য পরিচয় প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকরা। ‘ধর্মান্ধতার অন্ধকার নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান করতে হবে (২০১৭) প্রবন্ধে জেবুন্নেসা চপলা মনে করেন, বাঙালির প্রথম পরিচয় সে একজন বাঙালি। তাই বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসই তার জাতিসত্তার মূল ভিত্তি। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র – বাংলার প্রত্যেক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জনগণকে মুক্তি দেয়া। শুধু তাই নয়, বাঙালি হবে একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি।
ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মিশ্র আদর্শে বাংলা ভূখণ্ড পরিচালিত হবে। অথচ, এই ভূখণ্ডে বিবেকবান, অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিবাদী মনের মানুষ যেন আর তৈরি হতে না পারে সেজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে ছলে-বলে-কৌশলে, এমন আশঙ্কা করে জেবুন্নেসা আরও বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভারতবর্ষের ইতিহাস, বাংলাদেশের সংবিধান, অর্থনীতি, আইন, সমাজ ব্যবস্থা, মানবাধিকার এবং নৈতিক জ্ঞান ছাড়া বেড়ে উঠলে সাম্প্রদায়িক এবং ধর্মান্ধতার অন্ধকার সে জাতির সঙ্গী হবে সেটাই স্বাভাবিক।
এই উগ্রপন্থী চিন্তা থেকে তাদের ফিরিয়ে আনার বিশেষ শিক্ষা প্রদানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান করতেই হবে। বাঙালিয়ানার সাংস্কৃতিক শেকড়ের খোঁজে বের হলেই জানা যাবে সভ্যতার সুপ্রাচীন ইতিহাস, পরিষ্কার হয়ে যাবে ইসলামিক ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস আর আজও চারিদিকে ধর্ম নিয়ে ঠোকাঠুকির কারণগুলো। তাঁর মতে
শেকড়ের ইতিহাস না জানলে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে না বুঝলে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ এর বহুমাত্রিক কারণগুলো কখনই জানা যাবে না। এগুলো বুঝতে হলে সামাজিক বিজ্ঞানের মাল্টিডিসিপ্লিনারি জ্ঞানকে অবহেলা করলে চলবে না। বর্তমান বাংলাদেশের জন্য ক্রিটিক্যাল থিংকিং, বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী শিক্ষা, ডিকলোনাইজেশন অফ টস’ ভীষণ জরুরী যা সাম্প্রদায়িক মানসিকতার মানুষদের চিন্তাকে উগ্রবাদ থেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে। (জেবুন্নেস ২০১৭)
এভাবেই সমাজে সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে সুনাগরিক তৈরি করা যেমন সম্ভব, তেমনি কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক অন্ধকার দূর করাও সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এই সংস্কৃতি চর্চার প্রচলিত বেদনাদায়ক রূপটি তুলে ধরেন এস. এ. জাহাঙ্গীর আলম। প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত মিশন-ভিশন অর্জন প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের বিকল্প নেই’ প্রবন্ধে (২০২১) তিনি উল্লেখ করেন :
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন রাজনৈতিক চর্চা বন্ধ রাখা হয় কোনো কারণে, তখন শুধু প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার রাজনীতির চর্চাই বন্ধ থাকে মাত্র। বিপরীতে সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতি যেহেতু ধর্মাশ্রয়ী চরিত্র নিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয়, কাজেই এসব ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চা দুর্বার গতিতে বিনা বাধায় বিস্তার লাভ করে থাকে। (জাহাঙ্গীর আলম, ২০২১)
তাই সুস্থ ধারার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চা সমাজে যত কমতে থাকে প্রগতিশীল মানুষের জীবনযাত্রা তত বেশি বাধাগ্রস্ত হবে, বিপদের সম্মুখীন হবে, সমাজে অস্থিরতা বাড়বে, যুব সমাজের অবক্ষয় শুরু হবে, সর্বোপরি সমাজ তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে অসারে পরিণত হবে। আর এই অসারতার অন্ধকার প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য অবারিত সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করেন জাহাঙ্গীর আলম।
এক সাক্ষাৎকারে বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষৎ এবং সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী বলেন, বাঙালিকে সংস্কৃতিমুখী করে তোলার সাথে প্রকৃতিবান্ধব করে তোলাও জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি হয়তো কিছুটা সংস্কৃতি বান্ধব হয়ে উঠেছে, কিন্তু প্রকৃতির সাথে এই প্রজন্মের যোগ নেই বললেই চলে। তারা চাঁদের সৌন্দর্য দেখে না, গাছের ফাঁকে এর অদ্ভূত রূপ জানে না।
এই প্রজন্ম দেখেনি ভরা নদীর সৌন্দর্য, শরতের আকাশ, কাশফুল, প্রকৃতির সাথে সখিতা নেই তাদের। প্রকৃতি প্রাকৃতিক ধ্বংসের হাত থেকে প্রাণিকূলকে সুরক্ষা দেয়। বায়ুদূষণ রোধ করে। প্রকৃতি বাঁচিয়ে না রাখলে ধ্বংস হবে সমাজ। এই প্রকৃতিই যে সুরক্ষিত রাখে জাতিকে, তার কতটুকু উপলব্ধি করে মানুষ। এসব কারণেই ঋতুভিত্তিক উৎসব অনিবার্য। উৎসবের বিবর্তনের মাঝেও যত বেশি এই উৎসবগুলো আয়োজন করা হবে, তত বেশি মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে যে প্রকৃতি বান্ধব হবার বিকল্প নেই।
এছাড়াও আমাদের দেশীয় ফল, ফুল চেনা, নানা নকশা আর স্বাদের পিঠার সাথে পরিচিত হওয়া, এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে, এই শিল্পের সাথে পরিচিত হতে সহায় ঋতু-উৎসবই।
বিবর্তনের ধারায় অনেক কিছুই আসবে, কিন্তু কখনই একটি জাতির শেকড় বিচ্ছিন্ন হওয়া কাম্য নয়। অবারিত আকাশ সংস্কৃতি থেকে কতটুকু গ্রহণ করবো সে রুচিবোধ জরুরি। তা কখনই বাঙালি স্বকীয়তা ছেড়ে নয়। তবেই সংস্কৃতির শেকড় হবে মজবুত এবং সে পথে পথভ্রষ্ট হবে না এই প্রজন্ম।
ভাবনার বিষয় হলো, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব দিকেই বাঙালির অঢেল সম্পদ আছে, কিন্তু তা গ্রহণ করার মতো মানসিকতা বা যৌক্তিকতা আমরা বিবেচনায় আনতে পারছি না। শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি হলেও রুচির জায়গাটা গড়ে উঠছে না। এমন আশঙ্কা থেকেই যেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছিলেন, রুটির লড়াইয়ের সাথে রুচির লড়াইটাও জরুরি। রুচির লড়াইটা হয়ে উঠছে না। কারণ সেখানে সংস্কৃতি নেই।
তাই শেকড়ের সন্ধান পেতে, এই ভাবনাকে মননে পৌঁছে দিতে ঋতু উৎসবগুলো জরুরি। বাঙালি যেন অর্থ বিত্তের সাথে সাথে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটায়, ঐতিহ্যকে বলিষ্ঠ করতে পারে সেজন্যই কতু উৎসব।
প্রতিপাদ্য বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বলা যায়, মানবতার উন্নয়ন মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানবিক চেতনায় সমৃদ্ধ সমাজগঠনে ঋতুভিত্তিক উৎসব সুষম সমাজ গঠনকে নিশ্চিত করে। একবিংশ শতকে মানবিক সভ্যতা যত রকম বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে, তার মধ্যে সাংস্কৃতিক হামলাই সর্বাপেক্ষা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঁজিবাদী সভ্যতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতি সুস্থ সংস্কৃতির ধারাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৈরি করছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। তাই জাতির বিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি করার বিকল্প নেই। দৃশ্যমান এই পৃথিবীর বাইরেও যে বিরাট জগৎ, বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাদিবস অর্জনের গৌরব সবকিছু ধারণ করেই গতিশীল – হয়েছে বাঙালির প্রগতিশীল সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি আত্মবিশ্লেষণের পথকে যেমন দেখিয়ে দেয়, তেমনি সমতাভিত্তিক উদারতা গ্রহণের শিক্ষাও দেয়।
ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল এই উৎসবগুলোর যেমন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে, তেমনি এগুলো মানুষকে একে অন্যের পরিপূরক ও সহযোগী করে। সুশীল সমাজের চিন্তা, কর্মে, সহিষ্ণুতায় সুকুমার বৃত্তিগুলোকে জাগ্রত করতে অসাম্প্রদায়িক উৎসর গুরুত্ববহ। অপরাধ প্রবণতা আর দুর্নীতির পথ পরিহার করে, জাতিকে একই আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা চেতনায় গড়ে তুলে ঐক্যের ভিত মজবুত করতে সহমর্মী পরিবেশ তৈরি করতে, সর্বোপরি বাঙালি জাতি হিসেবে সমুন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ তৈরি করে প্রগতিশীল ঋতুভিত্তিক উৎসব।
পরিশেষে বলতে হয়, সব আনন্দ আয়োজনের মর্মকথা সহমর্মিতার মাধ্যমে শান্তির বিকাশ সাধন। বর্ণগত বা আর্থিক অবস্থানগত শ্রেণিভেদের ঊর্ধ্বে যে অবস্থান, বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণসাধনে তুভিত্তিক উৎসব সেই আদর্শ মৈত্রী সম্মেলন হিসেবে ভূমিকা রাখে। এ উৎসবে মানবিক মূল্যবোধের ও সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের বিকাশ ঘটে। সমঝোতা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সংবেদনশীলতার নানামাত্রিক প্রকাশ ঘটে। ঋতুউৎসব জীবন-সংসারের অবসাদ ভুলিয়ে অহিংসা, অভেদ আর বিবেচনাবোধের প্রসার ঘটায় ।
এখান থেকে গড়ে ওঠা মূল্যবোধ সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে এই প্রবণতা গঠনমূলক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিধিবিধান আত্মিক উন্নয়নের পাশাপাশি সমষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত করে, বাঙালির শিকড়সংলগ্নতার সাথে সংস্কৃতির সংযোগ স্থাপন করে। সর্বজনীন ভিত্তিক উৎসবগুলো।