হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

আজকে আমরা আলোচনা করবো হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ। যা তারাশঙ্করের তিনটি উপন্যাস : কৌমজীবনের রূপায়ণ এর তারাশঙ্করের উপন্যাসে কৌমজীবনের রূপায়ণ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

হাসুলীবাঁকের উপকথা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস এবং সমগ্র বাংলা সাহিত্যেরও একটি কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। উপন্যাসটিতে সমাজগতি তথা ইতিহাসের গতিরেখা অসামান্য নৈপুণ্যে রূপায়িত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বাংলার সামাজিক রূপান্তরের চিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে তেমনি ওই রূপান্তর-প্রক্রিয়ায় যে কৌম-জনগোষ্ঠীকে অবলম্বন করে উপন্যাসখানি বিকশিত হয়েছে, সেই শ্রেণির সামগ্রিক জীবনধারাও বস্তুনিষ্ঠ ও অনুপুঙ্খ রূপায়ণে প্রতিভাসিত হয়েছে।

উপন্যাসটিতে কাহার নামে পরিচিত একটি আদিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব, বিকাশ ও পরিণতি ইতিহাসশাসিত কালের পরিচর্যায় শিল্পসৃজন করেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। কাহারকৌমের অবিমিশ্র বাস্তব অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনের স্বরূপ তথা ওই আদিম গোষ্ঠীর টোটেম, প্রত্নপ্রতিমা (archeytypes) এবং উপকথা-উদ্ভূত বিশ্বাস ও জীবনসত্য হাঁসুলীবাঁকের উপকথায় জীবন্ময় হয়ে উঠেছে।

কোপাই নদী যেখানে হাঁসুলীর মত বাঁক নিয়েছে তার তীরেই বাঁশবাদী গ্রাম। নদীর তীরটি নিবিড় বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা বলেই এর নাম বাঁশবাদি। আড়াইশত বিঘার এই গ্রামে মাত্র ত্রিশঘর কাহার আদিবাসীর বাস। দুটি পুকুরের চারধারে এদের বসতি। অপেক্ষাকৃত ভদ্রলোকের বৃহৎ গ্রাম জাঙালের অবস্থান বাঁশবাদির উত্তরে।

পশ্চিমে গ্রামের গা ঘেঁষে বেলতলায় কাহারদের দেবতা কালারুদ্রের সহচর বাবাঠাকুরের আসন। নৃতাত্ত্বিকদের আলোচনায় আদিবাসী কাহার সম্প্রদায়ের কোনো শাখা-গোষ্ঠীর উল্লেখ না থাকলেও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাঁসুলীবাঁকের উপকথা-য় কাহারদের স্থানীয় দুইটি গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন। এরা হচ্ছে বেহারা কাহার ও আটপৌরে কাহার। ১২৫০ বঙ্গাব্দে নীলকর সাহেব মেস্তর জনকিন্স জাঙাল ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পত্তন নেন।

তিনি নীল চাষের সুবিধার জন্য বেহারা কাহারদের দিয়ে পুকুর কাটান। উত্তরকালে নীলকর সাহেবরা জমি হাসিল ও নীল চাষের কাজেও কাাহারদের শ্রম ব্যবহার করে । মূলত ওই সময় থেকেই বাঁশবাদিতে কাহার সম্প্রদায়ের বসতি গড়ে ওঠে। যে-সব কাহার ইংরেজ নীলকরদের কেবল পাল্কী বহন করত তাদেরকে বলা হত বেহারা কাহার। আর কাহারদের যে-অংশ অষ্ট-প্রহর নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে বউ-ঝিসহ চাকরান-ভোগীর মতো কাজ করত তাদেরকে বলা হত আটপৌরে কাহার।

পেশাগত কারণে কাহার সম্প্রদায় দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলেও তাদের ধর্মভিত্তি ও ‘করণ-কারণ’ ছিল অভিন্ন। জনকিন্সের সময় থেকেই এই দুই গোষ্ঠী কাহারদের মধ্যে গোষ্ঠীগত শ্রেষ্ঠত্বের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। আটপৌরেরা অষ্ট-প্রহরের কর্মী বলেই নিজেদেরকে বেহারা কাহারদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত।

জনরোষ ও ঐতিহাসিক নীল-বিদ্রোহের পর নীলকুঠি উঠে গেলে চৌধুরীকর্তারা এই অঞ্চলের মালিকানা করায়ত্ত করেন। কাহাররা পূর্বের ন্যায় চৌধুরীকর্তাদের বাড়িতেই বেহারা ও প্রহরীর কাজ করত। এ-সূত্রে চৌধুরীকর্তাও তাদের বসবাসের ‘ভিটাপত্তনি’ বহাল রাখেন।

এভাবে বহুকাল ধরে দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত কাহার সম্প্রদায় বাঁশবাদিতে বসবাস করে আসছে। যে ‘বর্তমান’ সময়পটে উপন্যাসের সূচনা হয়েছে তাতে দেখা যায়, বেহারা কাহারদের মাতব্বর বানোয়ারি আর আটপৌরে কাহারদের মাতব্বর পরম। কোশকেঁধে বেহারা কাহার অপেক্ষাকৃত বেশি পরিশ্রমী এবং সংখ্যায়ও তারা অধিক।

নীলকর সাহেরদের আমল থেকেই মূলত কৃষিজীবী এই আদিবাসী সম্প্রদায় ভদ্রশ্রেণীর সেবাদাস হিসেবে কাজ করে আসছে। তাদের জীবনের ঘটে যাওয়া সব ঘটনাকেই তারা নিজেদের ভাগ্যলিখন বলে মনে করে। তাদের দেবতা কালারুদ্র। এই কালারুদ্রই তাদের ভালমন্দের নিয়ন্তা।

প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুর সঙ্গে তারা দেবতার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে বের করে। কালারুদ্র প্রকৃতপক্ষে শিবেরই স্থানিক রূপান্তরিত দেবতা। কর্তাবাবা বা বাবাঠাকুর তাঁর সহচর। বাঁশবনের ধারে শেওড়া ঝোঁপের মধ্যবর্তী বেলতলাই ব্রহ্মদৈত্যতলা। এখানেই অদৃশ্য কর্তাবাবার অবস্থান। বাবা ঠাকুর এখান থেকেই কাহার সম্প্রদায়কে প্রতিপালন, শাসন ও রক্ষা করেন।

কাহারদের বিশ্বাস ওই বেলতলাতে গেরুয়া বসন ও দণ্ডধারী কর্তাবাবা পায়ে খড়ম, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ও ধবধবে পৈতার শোভা নিয়ে ন্যাড়া মাথায় সারা রাত ঘুরে বেড়ান। কাহারদের সুরক্ষা ও শান্তিবিধান কর্তাবাবার কর্তব্য। বাঁশবাদির কাহারদের জীবনপরিক্রমার কেন্দ্রস্থল বাবাঠাকুরের অবস্থানস্থল ওই বেলতলা। হাঁসুলীবাঁকের বাঁশবাদিতে কাহার গোষ্ঠীর প্রতিটি ক্রিয়াকর্মের মধ্যেই বাবাঠাকুরের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টির প্রশ্ন জড়িত। এই আদিবাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় তাদের জীবন।

কাহারদের অতিলৌকিক বিশ্বাস, কুসংস্কার আর ধর্মবোধের মধ্যেই তাদের জীবন গণ্ডিবদ্ধ। হাঁসুলীবাঁকের বাঁশবনের ঘন অন্ধকারের মতোই তাদের জীবন অন্ধবিশ্বাস আর পূর্বপুরুষের ‘রীতকর্মে’র ধারাবাহিকতায় চলমান। বাঁশবনের নিচের জমাট অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা ‘আলো’কে তারা পাপ আর অধমের্র সংকেত মনে করে। বাঁশবাদির বাঁশবন আর ঘন জঙ্গলের অন্ধকারের মধ্যে কাহারদের বেড়ে ওঠা এবং এই অন্ধকারকে ঘিরেই তাদের জীবন।

‘কালারুদুর আবাসস্থলও অন্ধকার অরণ্যে এক অতিলৌকিক আবহ তৈরি করে রেখেছে। ‘কালারুদ্দু’ বা কালারুদ্রকে কাহাররা ‘বুড়ো শিব’ নামেও ডাকে। বেলতলার বাবাঠাকুরেরও দেবতা এই ‘কালারুদ্দু’। কালারুদ্রের প্রধান ভক্ত নিচু জাতের লোকই হয়ে থাকে আদিকাল থেকেই গোষ্ঠীগত এই নিয়তি কাহারদের জীবনবিশ্বাসের অংশ। তাদের বিশ্বাস ও নিয়তির নিগূঢ় পরিচয় সুচাঁদ পিসির বিবৃত উপকথায় বিধৃত হয়েছে উপন্যাসে।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

কাহারদের বিশ্বাস প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অকাল মৃত্যু, ফসল না হওয়া বা অধিক ফলন ইত্যাদি সবকিছুই বাবা ঠাকুরের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। আর তাই বেলতলার মহারাজ কর্তাবাবার প্রতি সমগ্র কাহার গোষ্ঠীর এত ভয়। কর্তাবাবার সন্তুষ্টি বিধানে তারা তৎপর। সব আদিবাসী সম্প্রদায়ের মতো কাহার সম্প্রদায়েরও নিজস্ব গোষ্ঠীজীবনের শাসন-শৃঙ্খলের পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে হাঁসুলী বাঁকের উপকথার কাহারদের গোষ্ঠীজীবনেও।

বাবাঠাকুরের পূজা পরিচালন ও তাকে তুষ্ট রাখার দায়িত্বও অনেকটা গোষ্ঠীপ্রধান বনওয়ারীর ওপর ন্যস্ত। তথাপি বেলতলার মহারাজ অদৃশ্য কর্তাবাবা কাহার সম্প্রদায়ের কাছে অধিক জীবন্ত। কর্তাবাবার প্রতি কাহারকৌমের ভয়মিশ্রিত অতিলৌকিক বিশ্বাস দ্বারাই পরিচালিত হয় তাদের জীবন। দেবতা কালারুদ্র যদিও কাহারদের কাছে অধিকতর শক্তিমান তবু কালারুদ্রের চেয়ে বাবাঠাকুরকেই তারা বেশি উপলব্ধি করে।

কেননা বাবাঠাকুর অধিক জাগ্রত। কাহারদের বিশ্বাস বেলতলায় অবস্থান করে কাহারকুলকে সর্বদা বাবাঠাকুরই রক্ষা করে যাচ্ছেন সকল আপদ থেকে। কাহারদের কাছে বাবাঠাকুর কালারুদ্রেরই ছায়া। কাহারদের সমাজ জীবন, অর্থনীতি, কৃষি, পেশা, ঘর- বাড়ি নির্মাণ, ‘অন্ত’ অর্থাৎ রঙের খেলা বা প্রেমের খেলা ইত্যাদি সবকিছূই নিষেধ বা সম্মতির বেড়াজালে আবদ্ধ। ভয় আর শঙ্কাপূর্ণ হলেও বাবাঠাকুরের ‘খান’ ওই বেলতলাই তাদের মহাপবিত্র স্থান।

দুই

হাঁসুলী বাঁকের কাহার পাড়ার জীবনে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ওয়মিশ্রিত উপকথা, সংস্কার আর লৌকিক বিশ্বাস। দেবতা কালারুদ্র, বেলতলার মহারাজ কর্তাবাবা আর তাদের পিতৃপুরুষদের নিয়েই তৈরি হয়েছে কাহারদের উপকথা। হাঁসুলী বাঁকের আদ্যিকালের বুড়ি’ কথক সুচাদ পিসি হেসে কেঁদে, নেচে-গেয়ে অথবা ঝগড়ার ভঙ্গিতে বিবৃত করে ওইসব উপকথা। আর উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র পাগল, ছড়া আর গানে অর্থাৎ সুর ও ছন্দে সে-সব উপকথাকেই ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে।

উপকথাগুলোর অভ্যন্তরেই নিহিত রয়েছে কাহারদের জীবনবিধান। কালারুদ্র আর তার সহচর বাবাঠাকুর কেন্দ্রিক উপকথা সর্বদা তাদের মুখে মুখে প্রচারিত হয়। কাহার সম্প্রদায় হাঁসুলী বাঁকে ঘটে যাওয়া যে-কোনো ঘটনার সঙ্গেই ওইসব উপকথার যোগসূত্র খোঁজে, পেয়েও যায়।

উপন্যাসেরও শুরু হয়েছে কর্তাবাবা সম্পর্কিত একটি উপকথা দিয়ে। বাঁশবনের ভেতর থেকে ক্রমাগত শিস ধ্বনিত হওয়ায় – কাহারদের ধারণা জন্মে যে, – কর্তাবাবা কোনো কারণে রুষ্ট হয়েছেন বলেই ব্রহ্মদৈত্যতলার ‘থান’ থেকে শিস ধ্বনিত হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা তিনি বেলতলার জঙ্গল থেকে চলে যাচ্ছেন। নদীর ধার দিয়ে চলে যাবার সময় কাহারদের শিস দিয়ে জানিয়ে যাচ্ছেন তাঁর প্রস্থানের কথা। এর প্রাথমিক কার্যকারণ সূত্রও তারা খুঁজে বের করে।

তাদের দৃঢ় বিশ্বাস কর্তার থানে ত্রুটিযুক্ত পাঁঠা বলি দেওয়া হয়েছিল বলেই কর্তাবাবা ক্ষেপেছেন। কর্তাবাবার অসন্তুষ্টিই কাহারকৌমের সবচেয়ে বিপদের কথা। এ ধারণার সরব সমর্থক কাহারদের উপকথার কথক সুঁচাদ বুড়ি। সুঁচাদের মুখে দেবতারই সাবধানবাণী যেন ধ্বনিত হয় এভাবে,

“ভাল লয়, ভাল লয়, এ কখনো ভাল লয়। কাহারদের উপকথায় আছে বাবার দয়ায়ই হাঁসুলী বাঁকের সমৃদ্ধি। তিন পুরুষ আগে চৌধুরীরা সামান্য গৃহস্থ আর সাহেবদের নীলকুঠির গোমস্তা ছিল। নীল কুঠির অবস্থাও তখন বিলুপ্তির পথে। একদিন শুরু হল কোপাইয়ের বান। রাতে এল তুফান। অন্ধকার সেই ঝড়- জলের রাতে সবকিছু ভাসতে লাগল। সাহেব-মেম গাছে চড়ে বসল। নদীতে আলোকোজ্জ্বল সুসজ্জিত নৌকা দেখা গেল। নৌকা এসে থামল হাঁসুলী বাঁকের দহের মাথায়। সাহেব সেই নৌকা ধরতে গেলেন মেমের নিষেধ না শুনে। তখন মেমও নামল জলে। কিন্তু তখন হঠাৎ বাবার থান থেকে বেরিয়ে এলেন ‘কস্তা’।

সুচাদ শিহরিত কন্ঠে বলতে থাকে সেই উপকথা : ‘এই ন্যাড়ামাথা, ধবধব করছে রঙ, গলায় রুদ্দাক্ষি, এই পৈতে, পরনে লাল কাপড়, পায়ে খড়ম কত্তা জলের উপর দিয়ে বড়ম পায়ে এসে বললেন— কোথা যাবে সায়েব? নৌকো ধরতে? যেয়ো না, ও নৌকা তোমার লয়। সায়েব মানলে না সে a কথা। বললে— পথ ছাড়, নইলে গুলি করেঙ্গা। করা হাসলেন, বেশ, ধরাঙ্গা তবে নৌকো।

সাহেব-মেম নৌকা ধরতে গেল আর কোমরজল হয়ে গেল অথৈ জল। ডুবে মরল সাহেব-মেম চৌধুরী সাহেবের কাছেই গাছে চড়ে ছিলেন। বাবা তাকে নেমে আসার আদেশ দিলেন। চৌধুরী তখন ভয়ে কম্পমান। তিনি দেখলেন যে, জল মাত্র হাঁটু পর্যন্ত। কত্তা হেসে বললেন— ওরে বেটা, ভয় নাই, নাম্। তুই ডুবরি না। ….ও নৌকো তোর। আমার পূজো করিস, দেবতার কাছে মাথা নোয়াস, অতিথকে জল দিস, ডিগ্রিরীকে ভিখ দিস, গরীবকে দয়া করিস মানুষের শুকনো মুখ দেখলে মিষ্টি কথা বলিস।

যবের কাছে ছিলেন লক্ষ্মী, তোকে দিলাম। যতদিন আমার কথা মেনে চলবি উনি অচলা হয়ে থাকবেন। অমান্য করলে ছেড়ে যাবেন, আর নিজেই ফল ভোগ করবি।৩

সেই কর্তাকেই এত অপমান। তাঁর পূজো হয় খুঁতো পাঠায়? এরপর আর কত্তা’ থাকবেন কি করে, চলে যাচ্ছেন— তাই শিস দিয়ে জানিয়ে যাচ্ছেন। কত্তা বাবার দয়ায় চৌধুরী পেলেন যক্ষের ধন, হলেন কাহারদের মনিব। কিনলেন জলের দামে সমগ্র কুঠির জমিদারি। কর্তা বাবা তখন থেকেই থাকতেন শ্যাওড়া বনের বেলতলায়। কাহারদের দেখাশোনার জন্যই ওই বেলতলায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন তিনি।

কাহাররা বলে সাহেবদের আমল ছিল তাদের সুখের সময়। সেই সাহেবরা গেল, এলো চৌধুরী। বানের জল নেমে গেলে জীবন সংগ্রামে যেসব কাহার বেঁচে রইল তারা এল থামে। এসে দেখে তারা নিঃস্ব। ঘর-দুয়ার নেই, জমি নেই, বাড়ি নেই। কাহারদের তখন চরম দুর্দিন।

চৌধুরী তখন নতুন জমিদার। সুচাদের ভাষ্যে হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় আছে সেই দিন— ‘কাহারেরা বুক চাপড়িয়ে কেঁদেছিল, সে কান্নায় পূজো বাড়ির ঢাকের বাদ্যি ঢাকা প’ড়ে যেয়েছিল। যে প্যাটের জ্বালায় গা ছেড়ে দিয়ে ভিখ লাগতে গিয়েছিল কাহাররা, কুটুমবাড়িতে ‘নেনো’ হয়ে ছিল এতদিন মা, সেই প্যাটের জ্বালা পাসরণ হয়ে গেল।

হাঁড়ি চড়ালে না; ‘আন্না-বান্না’ দূরে থাক, পূজো বাড়ির পেসাদ— সেও কেউ মাগতে গেল না। তা’পরে হল কি মা, শেষকালে ‘নউমী’ পুজোর দিনে সে এক অবাক কাণ্ড । হঠাৎ চৌধুরী বললেন- যা, ভিটেগুলো তোদের ছেড়ে দিলাম, ভিটে থেকে তোদের বাস তুলে দোব না, সে বজায় রাখলাম। ওই চাকরানটুকু রইল, কালে-কস্মিনে পাল্কির দরকার হ’লে বইতে হবে। তবে জমি পাবি না। হ্যাঁ, কৃষাণি মান্দেরী কর—থাক্। কাহাররা তবে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

পিতিপুরুষদের ভিটে থাকল ‘মন্তরায়’ এই ভাগ্যি। … সেও তোমার ওই কত্তা মশায়ের দয়া। চৌধুরীকে তিনি স্বপন দিয়ে দিয়েছিলেন অষ্টমির ‘আতে’—মানুষকে ভিটে ছাড়া করতে নাই। কাহারদিগে তুলে দিলে আমার ‘ওষ’ হবে তোর ওপর। হাসুলী বাঁকের কাহাররা জানে বেলতলার কর্তাবাবা কাহারদের সর্বময় কর্তা।

তাই তারা কর্তার রোধ দৃষ্টিকে, ক্ষুণ্ণ হওয়াকে ভায় পায়। এর প্রতিকারে তারা কর্তার ‘খানে’ পূজো দেয়, আসর বসায়। সেই আসরে সুচান কর্তার মহিমার উপকথা বিবৃত করে।

শিসকে কেন্দ্র করে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র কাহার পাড়ায়। কৌমের এই মহাসংকটকালে করালীর পলিত কুকুর কালুয়ার সহসা নাক-মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরে যাওয়াকে কাহারেরা কর্তার ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধরে নেয়। নাকে কাটা দাগ দেখে তারা বুঝে ফেলে কর্তা খড়ম দিয়ে চেপে মেরেছে কালুয়াকে।

করালী তার কুকুরের মৃত্যুর পর অনুসন্ধানে বের হয় কে এমন করে কামড়ে মারল তার কুকুরকে? কে এমন করে শিস দেয় বাঁশবনে? অবশেষে বাঁশবনের চারদিকে আগুন লাগিয়ে শিস প্রদানকারী এবং তার কুকুরের দংশনকারী বিচিত্র বর্ণের চন্দ্রবোড়া সাপকে মেরে ফেলে করালী। বাঁশবনে আগুন দেখেও কাহাররা ভাবে কর্তার রোষেই সেখানে আগুন জ্বলছে।

চন্দ্রবোড়াটিকে আগুনে পুড়িয়ে মারার পর কাহাররা আবিষ্কার করে, এটি কর্তাবাবার বাহন। সাপটির মৃত্যু তাদের কাছে এক ভয়াবহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আদিকালের সব বিধান সুচাদের স্মৃতিতে সঞ্চিত। সেই বিধান দিল পূজা চাই। প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য কর্তাবাবার পূজো দিতে হবে— ‘ফুলে বেল পাতায়, তেলে-সিঁদুরে, ধূপে-প্রদীপে, আতপে-চিনিতে, দুধে রস্তায়, মদে মাংসে, কাপড়ে দক্ষিণায় – সমারোহ ক’রে পূজো।

যে করেই হোক বাবাঠাকুরকে সম্রষ্ট করতে হবে। তাঁর বাহনকে পুড়িয়ে মারার অপরাধে কাহারকুল মহাপাপিষ্ঠ হল। তাদের উপকথা সে কথাই বলে। কর্তাবাবার পূজায় তাঁর ‘খান’ পরিষ্কার করবার সময় সেয়াকুলের ঝোঁপ থেকে কালকেউটে বের হলে কাহাররা করজোড়ে প্রণাম করে।

কাহারদের ধারণা কেউটেটি বাবাঠাকুরের বাহনের সঙ্গী করালীর কৃত পাপের দায় 1 থেকে মুক্তির জন্য কৌমের মাতব্বর হিসেবে বনওয়ারীকে উদ্যোগ নিতে হল। কিন্তু মহাপাপের যথাযোগ্য শাস্তি না দিয়ে বনওয়ারী করালীকে পাখীর সাথে বিয়ে দিয়ে গ্রামে ফিরিয়ে আনে চন্দনপুর থেকে। বনওয়ারী বাবা ঠাকুরের ‘খানে’ প্রণাম করে ভয়ে ভয়ে কল্পনা করে বাবাঠাকুরের রুদ্র মূর্তি ।

আদিম আরণ্যক অন্ধকারের সঙ্গে লুকিয়ে থাকা কাহারদের উপকথা, লৌকিক বিশ্বাস আর কুসংস্কারের কাহিনী তাদের জীবনের সঙ্গে আষ্টে-পৃষ্টে আবদ্ধ। এই লৌকিকতা আর কুসংস্কারগুলোই তাদের জীবনের গতিপথের নিয়ামক। কাহারদের বিশ্বাস কালারুদ্রের প্রধান ভক্ত হয় নিচু জাতের লোক। তাদের ধারণা বান গোসাই বা বাবাঠাকুরের পুণ্যেই কাহাররা নিচু জাতের হয়েও কালারুদ্রের পূজা করতে পারে। নইলে তাদের কী সাধ্য ছিল বাবার স্থানে যাওয়ার। বানগোসাই বর চেয়ে নিয়েছিলেন কালারুদ্রের সঙ্গে তারও পূজা হবে ।

কৃষিজীবী কাহারগোষ্ঠী তাদের কৃষি জীবনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত করেছে নানা কল্পকাহিনী। এসবে বিশ্বাস নিয়েই চলে তাদের কৃষিকাজ। চুরি করা থেকে দেবতার উদ্দেশে পূজা নিবেদন, সবকিছুই তাদের সংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। কুমারী মাটিকে চাষযোগ্য করার পূর্বে দেবতার উদ্দেশে তারা পূজা দেয়। ভাল ফসলের জন্য এবং উৎপন্ন ফসল তুলেও দেবতার সন্তুষ্টির জন্য তারা আয়োজন করে পূজার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটায়ও কাহাররা কালারুদ্রের মহিমা প্রত্যক্ষ করে যুদ্ধের ব্যাপার কালারুদ্রের মন মহিমা। তিনিই লাগান যুদ্ধ। তার চড়কের পাকে ঘটে বড় বড় ব্যাপার। আকাল আসে, মহামারণ আসে। যুদ্ধও এসেছে।’ কালের অগ্রযাত্রায় সভ্যতার আলোকোজ্জ্বল চন্দনপুর তাদের উপকথার দক্ষিণপুরী। উপকথায় আছে – সবদিক পানে চেয়ে দেখো, মন চায়তো হাঁটতেও পার, কিন্তু দক্ষিণ দিক পানে চেয়ে দেখো না ; ও দিকে, ও পথে হেঁটো না।’

চন্দনপুর বাঁশবাদির উত্তরে হলেও এটিই কাহারদের জীবনে নিষিদ্ধ ‘দক্ষিণপুরী’। ওখানে গিয়েই সবাই জাত খোয়ায়। ওই দিক থেকেই তাদের ধ্বংস আর অধর্ম নেমে আসে। কাহারদের বিশ্বাস কর্তা তাঁর বেলগাছে বসে রুদ্রাক্ষের মালা জপেন আর হাঁসুলী বাঁকের দিকে দৃষ্টি রাখেন। তিনি প্রসন্ন হলে কাহারদের সমৃদ্ধি সুনিশ্চিত। আবার তাঁর কুদৃষ্টি পড়লে রোগ, শোক, অজন্মা থেকে তাদের মুক্তি নেই।

বেলতলার দহে বাবা স্নান করেন মনের সুখে। বনওয়ারীর কালো বউ সেখানে পড়েছিল বলে বাবার বাহন তাকে দহে ডুবিয়ে মেরেছে। হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় প্রেতযোনির অস্তিত্ব স্বীকৃত। কাহাররা সেসব চোখে দেখেছে। বাঁশবনে, হাঁসুলী বাঁকের মাঠে জলার পাশে, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে তারা কাঁদে, গান গায়, কেউ ঘরের চালে পা ঝুলিয়ে বসে, কেউ মাঠে মাঠে আগুন নিয়ে খেলা করে।

আবার কেউ পথ ভুলিয়ে অন্যপথে নিয়ে যায়, যে পথে রয়েছে নিশ্চিত অপমৃত্যু। আর আছে নিশির ডাক : পরিচিতদের রূপ ধরে যে নিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। এসব প্রেতাত্মা মায়া অথবা হিংসার বশে হাঁসুলী বাঁকের মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। কোপাইয়ের কূলে কূলে, হাঁসুলী বাঁকের মাঠে-মাঠে বাঁশবাদির ঘন পল্লবের নিচে হাঁসুলী বাঁকের এইসব উপকথার অলৌকিক জগৎ প্রেতলোক পরলোক পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

তিন

হাঁসুলী বাঁকের কাহারদের আর্থনীতিক জীবন বিপর্যস্ত হলেও তাদের পূজা-পার্বণ-নৃত্য-গীত কোনকিছুরই কমতি নেই। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্য্যায় রাঢ়-পল্লির মানুষ। হিন্দু-সমাজের উচ্চ বর্ণের দেবতার পাশাপাশি অন্ত্যজ শ্রেণির নানা লৌকিক দেব-দেবীর পূজা-অর্চনার কথা তিনি জানতেন। লৌকিক বিশ্বাস, কুসংস্কার, ভীতিসংকূল জীবন আর পিতৃপুরুষের কথার প্রতি বিশ্বাসই যে কাহারদের কৌম জীবনের নিয়ামক তাও তাঁর জানা ছিল।

কাহারেরা দেবতার পূজা দিয়েছে ভক্তিমন্ত হয়ে, নানা উপকরণে সজ্জিত করেছে বাবা ঠাকুরের থান। এ-সব তারাশঙ্করের চোখে দেখা বলেই কাহারদের সংস্কৃতিজীবন তথা নৃত্য-গীত, পূজা- পার্বণের চমৎকার বর্ণনা তিনি উপস্থাপন করেছেন হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে। চৈত্র সংক্রান্তিতে বার্ষিক গাজন উৎসবের মাধ্যমে কাহাররা তাদের প্রধান দেবতা কালারুদ্রের পুজো দেয়।

এতে প্রধান ভক্ত চড়কের পাটার গজালের ডগায় শয়ন করে। সে আগুনের ফুলের ওপর নাচে। চড়কের পাটায় চড়ে কাহার পাড়া ঘুরে আবার এক বছরের জন্য বাবা যান জল-শয়ানে কালিদহের মাঝে। হাড়ি, ডোম, বাউরি, কাহার নিচু জাতের যে কেউ কালারুদ্রের ভক্ত হতে পারে। কাহার প্রধান বনওয়ারী গাজনের পাটায় শুয়ে কাহারকুলের মঙ্গল কামনা করে। নানা বর্ণিল সাজে এই পুজো হয়। সদগোপ মহাশয়রাও এই গাজনে শামিল হন।

দেবতা কালারুদ্রের সহচর বেলতলার কর্তাঠাকুরকেও তারা ঘটা করে পুজো করে; পাঁঠা, ভেড়া, হাঁস বলি দেয় তাঁর উদ্দেশে। মদ কাহারদের পূজার অন্যতম উপকরণ। পুজোয় তারা অর্ঘ্য দেয় মুগসিদ্ধ, বরবটি সিদ্ধ আর এক বোতল পাকি মদ।

নবান্নে কাহারদের উল্লাস চিরদিনের। ভদ্রলোকের পুজোতেও তারা আনন্দ করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে। তবে নবান্ন উৎসব তাদের কৌম জীবনের প্রথানুসারেই উদ্যাপিত হয়। গাজন, ধর্মপূজা, আমুক্তি বা অম্বুবাচি, মা বিষহরির পূজা, ভাদ্র মাসে ভাজো পরব, আগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন, পৌষ মাসে লক্ষ্মী পূজা কাহারদের ধর্মজীবনের প্রধান পার্বণ। কাহার নারীরা মঙ্গলচণ্ডী ব্রত পালন করে।

ওই ব্রত অনুষ্ঠানে তারা নানা দ্রব্য তৈরি করে আনন্দ করে, নিজেরা যায় এবং অন্যকে খাওয়ায়। এছাড়া কাহারকৌমে মনসা ও বান গোঁসাইয়ের পূজারও প্রচলন আছে। জলের দেবতা ইন্দ্রের কাছে জল চেয়ে তারা ইদ পুজোও করে। এই পুজো সদৃজাতিরা আয়োজন করলে কাহাররা সানন্দে কায়িক শ্রম নিয়োগ করে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

হাঁসুলী বাঁকের প্রচলিত উপকথার মুখ্য গায়েন পাগল আর কথক নসুবালা। তারা নিজেরাই ঘেটু ও ভাজোতে গান বাঁধে আর নেচে নেচে গায়। রাতে মেয়েদের আলাদা আসরে বসে সুচাদ প্রধান গায়েন হিসেবে উপকথার গানও পরিবেশন করে। এক্ষেত্রে স্মরণীয় যে, উত্তরকালের রচনা গুরুসারী-কথা (১৯৬৭)-তে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাঁসুলী বাঁকের নসুবালা, সুচাদ ও করালীকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছিলেন উপন্যাসের পটে।

আদিকালের অন্ধকার আরো ঘনীভূত হয় যখন কাহারপাড়ায় রাত নামে। কেরসিনের ক্ষীণ আলোয় কাহাররা তখন কর্তা ঠাকুরের নাম দিয়ে নালিস বসায়। ছেলেরা রাতে ঢোল বাজিয়ে ধর্মরাজের ‘বোলাম’ (স্তবগান ), মনসার ভাসান, ভানু-ভাঁজোর গান ও মা দশভূজার পাঁচালী গায়। শুধু ধান কাটার সময়ে কাহারপাড়ায় পুজো-পার্বণে কিছুটা ভাটা পড়ে কর্মব্যস্ততার জন্য।

কাহার পাড়ায় সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে আদিকালের অন্ধকার মিশে যে অন্ধকার নামে তার ভয় থেকে বাঁচার জন্য দল বেঁধে ঘেটু গান পরিবেশিত হয়। কাহারপাড়াতে বেশ কিছু ঘেটু গানের দল আছে। এতে একদল অপর দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। কাহার জীবনের বাস্তবচিত্র ফুটে ওঠে এই ঘেটু গানে। অসংখ্য ঘেটু গানের উল্লেখ আছে আলোচ্য উপন্যাস হাঁসুলীবাঁকের উপকথায়। সমসাময়িক কাহার জীবন নিয়েও ঘেটু গান রচিত হয়। যেমন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রচিত একটি ঘেটু গান

সায়ের লোকের লেগেছে লড়াই

ষাঁড়ের লড়াইয়ে মরে উখাগোড়াই

ও হায়, মরব মোরাই উখাগোড়াই।

আবার চন্দনপুরে রেললাইন নির্মাণের ফলে সৃষ্ট কাহারদের সমস্যা নিয়েও তারা ঘেটু গান তৈরি করে

লালমুখো সায়ের এল কটা কটা চোখ —

দ্যাশ-বিদ্যাশ থেকে এল দলে দলে লোক-

— ও সায়েব আস্ত

ও সায়ের আস্তা বাঁধালে- কাহার কুলের অন্ন ঘুচালে

পাল্কী ছেড়ে র্যালে চড়ে যত বাবু লোক।

– ও সায়েব আস্তা

দিবসের শ্রমক্লান্ত কাহাররা রাতে মদ খেয়ে নেচে গান গায়, হাসি তামাসা রঙ্গ-ব্যঙ্গে মেতে ওঠে। বিনোদনের বড় মাধ্যম তাদের কাছে এটাই। পাগল, নসুবালা আর সুচাঁদ মাতিয়ে রাখে এ-সব আসর। নসুবালা গান ধরে

লষ্টচাঁদের ভয় কি গো সই, কলঙ্ক মোর কালো ক্যাশে

কলঙ্কিনী রাইমানিনী- – নাম রটেছে ন্যাশে দ্যাশে ।

হাঁসুলী বাঁকের ‘গানের কোকিল’ পাগল সেই সুরে সুরে মিলিয়ে গাইতে গাইতেই আসরে এসে যোগ দেয়।

শ্যাম কলঙ্কের বালাই লয়ে

ঝাপ দিব সই কালী হে

কালীলাগের প্রেমের পাঁকে মজব আমি অবশেষে।১১

—গানগুলি হাঁসুলী বাঁকের প্রাণ। এসব গান ও হুড়ায় ছড়িয়ে আছে কাহার সংস্কৃতির বিচিত্র উপকরণ। ভাজো পার্বণ কাহারদের আরেকটি আনন্দ উৎসব। ইন্দ্র রাজার পূজার শেষ স্থানটির মাটি নিয়ে এসে কাহাররা বেদি তৈরি করে জিতাষ্টমীর দিন ভাঁজো সুন্দরীর পুজো করে।

ভাঁজো পার্বণের দিন কাহার পাড়ায় সারাক্ষণ চলে রঙের খেলা অর্থাৎ প্রেমের খেলা। তখন তাদের আনন্দের সীমা থাকে না। লতা-পাতা ফুলে ভাঁজোর বেদি সাজিয়ে মেয়ে পুরুষ সবাই আকন্ঠ মদ পান করে নাচে, গান গায়, তামাসা করে। নিয়ম আছে ওই রাতে সবাইকে নির্ঘুম থাকতে হয়। এ-উৎসবে কাহাররা কাউকে কিছুতে বাধা দেয় না। এটি পিতৃপুরুষের বিধান। সারারাত মদে, ঢোলে-মাদলে চলে উন্মাতাল নাচ আর গান। পাগল ভাজোর গান ধরে।

কোন ঘাটেতে লাগায়াছ ‘লা’ ও আমার ভাঁজো সখি হে !

আমি তোমায় দেখতে পেছি না।

তাইতো তোমার খুঁজতে এলাম হাঁসুলীর ই বাঁকে

বাঁশবনে কাঁশবনে লুকাল্‌ছ কোন্ ফাঁকে !

ইশারাতে দাও হে সখি সাড়া

তোমার আঙা পায়ে লুটিয়ে পড়ি গা

ও আমার ভাঁজো সখি হে !

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

চার

হাঁসুলী বাঁকের কাহারদের যেমন বিচিত্র উপকথা, তেমনি বিচিত্র তাদের জীবন। বাঁশবাদির বাঁশবনের অন্ধকারে তারা ঢেকে রাখে না তাদের প্রেম ভালবাসা আর জৈবিক আকর্ষণকে। কাহারদের প্রেম ভালোবাসায় লজ্জা, ভয় কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীর ঘৃণার পরোয়া নেই। জৈবিক তাড়নাই তাদের কাছে মুখ্য। সেজন্য মাঝে মাঝে কাহারদের তরুণী মেয়ে বানের জলে খরস্রোতা কোপাই নদীর মতো ক্ষেপে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

হাঁসুলী বাঁকের বাঁশবনের বেষ্টনীতে প্রাগৈতিহাসিক কালের আঁধার বাসা বেঁধে থাকে। সুযোগ পেলেই ওই অন্ধকার দ্রুত ধাবিত হয় কাহার বসতির মধ্যে। সেই অন্ধকারে কোপাইয়ের বানের মতোই হারিয়ে যায় কাহার নর-নারী। নিন্দা হয়, কিন্তু নিন্দনীয় কাজ মাত্রই অপরাধ নয় কাহার-সমাজে।

কাহার নর-নারী যখন ‘অন্তের খেলায়’ অর্থাৎ প্রেমের খেলায় মেতে ওঠে তখন তারা কোন কিছুর বাধা মানে না। তাদরে প্রেম দেহজ চেতনা সমৃদ্ধ। তাই তো দেখা যায়, হাঁপানী রোগী স্বামী নয়ানকে ছেড়ে পাখি গিয়ে ওঠে করালীর ঘরে। বন্যা ও দুর্যোগের রাত্রে কাহার বধূ গতি-বদল করে এক গাছ থেকে অন্য গাছে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

পাখির মা বসন্ত চৌধুরীদের ছেলের সঙ্গে প্রেমের খেলায় মাতে। পাখির চেহারায় চৌধুরীদের ছেলের সাদৃশ্য স্পষ্ট ; তাতেও কারো উদ্বেগ বা লজ্জা নেই। এ-ধরনের উদ্বেগ বা লজ্জা কাহার জীবনে বেমানান। করালীর মা তিন বছরের শিশু করালীকে রেখে পরপুরুষের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। কাহারদের মাতব্বর বনওয়ারী পরমের বউ কালোশশীর সঙ্গে বটতলার আদিম অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পিছপা হয় না।

হাঁসুলী বাঁকের প্রচলিত উপকথায় আছে তুফান বানে ঝাঁপ দিয়ে যুবতী বউ পালায় যার ওপর তার মন পড়ে তার কাছে। চন্দনপুর রেললাইনে খাটতে এসে ঘর ছেড়েছে, জাত দিয়েছে বহু কাহার মেয়ে। খুটি আর বেলে নামের দু-জন দেশত্যাগ করেছে মুসলমান রাজমিস্ত্রির সঙ্গে। ‘অঙের নেশায় তারা সন্তানকে পর্যন্ত ভুলে যায়।

সিধু আর ‘জগধাত্তি’ ঘর ছেড়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ভালবাসার পুরুষরা তাদের সঙ্গে নেয়নি, এখন তারা ঝিয়ের কাজ করে আর রাত্রিতে সেজে গুজে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। কাহার পাড়ার এসব নিয়ে কারো লজ্জা বা ঘৃণা নেই। যেন সবই স্বাভাবিক। রঙের খেলার প্রসঙ্গে পাখি জগৎকে বলেছিল— যার সঙ্গে মেলে মন, সেই আমার আপনজন’ কোপাই নদীর মতো পাগলামি কাহার মেয়েদের কখনোই যায় না।

রাত্রিকালে জাঙ্গাল আর চন্দনপুরের ছোকরারা শিস ও সিটি দেয়, উঠানে ঢিল ছুঁড়ে ইশারা জানায় কাহার মেয়েদের। মা-বাবা, পিসি মাসি জানলে সমস্যা হয়না, স্বামী, ভাই কিংবা ননদ শুনলে সমস্যা বাধে। কাহারদের যৌন জীবনের শিথিলতার পরিচয় এই উপন্যাসের নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে। বউয়ের রোজকার, বিটার রোজকার কাহার পাড়ায় ‘শাক-ঢাকা মাছ’।” এ-সবকে তারা স্বাভাবিকভাবে বিধির বিধান বলেই মানে।

কাহারদের বিশ্বাস সং জাতির সেবা করা ও ময়লা আবর্জনা ধারণ করাই তাদের কাজ। ঈশ্বর তাদের এই জন্মে ভদ্রলোকের কাজ করার জন্যই পাঠিয়েছেন, কেননা— ‘কাহারদের মেয়েরা সতী হলে অনুজনের পাপ ধরবে কারা, রাখবে কোথা?

কাহার পাড়ার পারিবারিক জীবনেও আছে ভয়াবহ কিংবদন্তির অস্তিত্ব। বনওয়ারীর পূর্বপুরুষ স্ত্রীকে পরপুরুষগামী হতে দেখে বুকের ওপর চেপে বসে পাথর দিয়ে মাথা ছেঁচে মেরেছিল। রতনের পূর্বপুরুষ চড় দিয়ে মেরে ফেলেছিল নিজের বোনকে। পরমের পূর্বপুরুষ তার স্ত্রীকে হাতে-পায়ে বেঁধে মুখে কাপড় চেপে ধরে মেরেছিল। গুপীর পূর্বপুরুষ তার স্ত্রীকে মেরেছিল বিষ খাইয়ে।

হাঁসুলী বাঁকের কাহার নারী-পুরুষদের চেতনার ঐতিহ্যগত এইসব মানসিকতা এখনো বহমান। কাহার পুরুষ স্ত্রীর বর্তমানে পুনরায় বিয়ে করলে কিছুই করার থাকে না প্রথমার। শাঁখা আর নোয়া খুলে গালাগাল দিতে দিতে স্বামীগৃহ ত্যাগ করে চলে যেতে হয় তাকে ; খুঁজে নিতে হয় অন্য কোনো কাহার-পুরুষের ঘর। সতীনের ঘর কাহার মেয়েদের অসহ্য। স্বামী বিয়ে না করে কোনো মেয়েকে ঘরে এনে রাখলে তাদের আপত্তি থাকে না। কিন্তু বিয়ে করলে তারা সহ্য করে না। কারণ স্বামীর ওপর কাহার নারীরা নির্ভরশীল নয়। রূপ-যৌবন এবং পরিশ্রম করার সামর্থ্যের কারণেই তারা কোনো না কোনো কাহার পুরুষের ঘরে ঠাঁই করে নিতে পারে।

হ্যাঁসুলী বাঁকের উপকথার কাহার মেয়েদের মধ্যে বিরল ব্যতিক্রম বনওয়ারীর স্ত্রী গোপীবালা আর পাখির মা বসন্ত। বসন্তের ব্যতিক্রমতার কিঞ্চিৎ পাখির মধ্যেও পরিলক্ষিত। বনওয়ারী সুবাসীকে বিয়ে করলেও গোপীবালা বনওয়ারীর সংসারে থেকে যায় কাহার নারীর দীর্ঘকালের ঐতিহ্য ভঙ্গ করে। অন্যদিকে পাখির মা তার মনের মানুষ চৌধুরী বাড়ির ছেলের কথা আজীবন ভুলতে পারেনি। মনের মানুষের মৃত্যুর পর অন্য কোনো ঘর বাঁধেনি সে। পাখিও করালীর সুবাসী হরণ সহ্য করতে না পেরে আত্মাহুতি দেয়। সহজেই ধারণা করা যায় যে, কাহার নারীদের আচরণ সর্বদাই জৈব-প্রবৃত্তি দ্বারা সম্পন্ন হয় না ।

যৌন জীবনের শৈথিল্য কাহারদের কাছে তেমন গর্হিত নয়। আলোচ্য উপন্যাসের নারী-পুরুষ সম্পর্কই প্রমাণ করে তাদের অসংযত জৈব তাড়নার দিকটি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-সৃষ্ট হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-র কৌমজীবন সংশ্লিষ্ট এমন অবাধ যৌনাচারকে কোনো-কোনো সমালোচক অতিরঞ্জিত ও আরোপিত বলে মনে করেছেন। তবে তা সমর্থনযোগ্য নয়।

‘ভারতের নানা স্থানের বিভিন্ন কৌম সমাজের গতিবিধি, রীতিনীতি এক প্রকার নয়। তাবৎ গোষ্ঠীর সকল সংবাদ আমাদের নখদর্পণে নেই, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে টোডা, কুরুদ, মুন্ডা, মরিয়া, রাজবংশী, মুডুয়ার, খানিয়া এবং তিব্বতীয়দের মধ্যে স্ত্রীলোকের বহুপতিত্ব, পরপুরুষ গমন, অবিবাহিত যুবক-যুবতীর মিলন কিছু দুর্লভ ঘটনা ছিল না।’১৫

প্রাচীন যুগের নিচু জাতের সামাজিক নীতিবন্ধনে যে শৈথিল্য ছিল চর্যাপদ ও অন্যান্য প্রাচীন রচনায় তার প্রমাণ মেলে। সুতরাং কৌম জীবনের উক্ত জীবনাচার অসংগত ও আরোপিত নয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে গল্পে বেদে, কাহার, বাউরি, বাগ্মি প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণির যে প্রেমের কথা বলেছেন, সে-সব তাদের প্রবল জীবনী শক্তির সঙ্গে মানানসই। এদের আচরণ তথাকথিত সভ্য মানুষের মত বিবেক-তাড়িত, সংশয়ের দ্বন্দ্ব জর্জরিত নয়।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

পাঁচ

ভারতীয় সকল আদিবাসীর পোশাক পরিচ্ছদ আর ঘরবাড়ি সাদামাটা ও সংক্ষিপ্ত ধরনের। কাহারদের ঘরবাড়ি পোশাক পরিচ্ছদও সেরকম। আড়ম্বর বা বিলাসিতা কৌমজীবনে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। কাহারদের বসতি অবশ্য স্থায়ী। তারা অন্যান্য যাযাবর আদিবাসীর মত জীবন যাপন করে না।

পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটার প্রতি তাদের গভীর মমত্ববোধ এই উপন্যাসেও প্রকাশিত। কৃষিজীবী এই জনগোষ্ঠী চাষযোগ্য সমতল উর্বর স্থানে বসবাস করতে পছন্দ করে। মাটির দেওয়াল এবং খড়ের ছাউনি দিয়ে এদের বসত ঘর তৈরি হয়। তাদের ঘর বানে ডোবে, ঝড়ে ওড়ে, আবার গড়েও ওঠে। বাঁশবাদির বাঁশ, মাটি, হাঁসুলীবাঁকের নদীর ধারের ‘সাবুই’-এর দড়ি এবং খড় তাদের ঘর তৈরির প্রধান উপকরণ। বাবাঠাকুরের বারণ আছে বলে কোঠা ঘর তারা তৈরি করে না।

কাহারদের বিশ্বাস কোঠা ঘরে শয়ন করার অধিকার সদগোপ আর বাবুদের। মাটির দেওয়াল তারা রং আর গিরিমাটি দিয়ে সাজায়। ঘর তৈরির ব্যাপারেও কাহারদের কিছু সংস্কার আছে। তাদের ধারণা বাবার নিষেধ উপেক্ষা করে কোঠা ঘর তৈরি করলে নিশ্চিত অপঘাত মৃত্যু আসে। কোৱা ঘর তৈরি ক্যের পর উত্তরি ভাই তাদের কাছে পাপের শামিল। উপন্যাসে দেখা যায় করালীর নির্মীয়মাণ কোঠা ঘর কাহার পাড়ার অমঙ্গল আশঙ্কায় বনওয়ারী ভেঙে ফেলে।

পোশাক-পরিচ্ছদও কাহার পুরুষদের খুবই সংক্ষিপ্ত। চাষের সময় পুরুষেরা অর্ধেক দিন গামছা পরেই কাটিয়ে দেয়। বাকি সময় তারা ছয় হাত সমান মোটা কাপড় অর্থাৎ ধুতি পরে। অবসরে বাইরে গেলে তারা হাঁটু বহরের কাপড় পরে এবং কোচাটি উল্টে নিয়ে কোমরে গুঁজে দেয় এবং ভাঁজ করা গামছা কাঁধে ঝোলায়। বিয়েতে পালকি নিয়ে গেলে গামছাটি তারা ক্ষারে কেঁচে নেয়, সযত্নে রক্ষিত পুরোনো ফতুয়া গায়ে দেয়।

কাহার মেয়েরা সাজতে পছন্দ করে। শাড়িই তাদের একমাত্র পরিধেয় বস্ত্র। মোটা কাপড়ের তিনটি শাড়ি হলেই একজন কাহার নারীর বছর চলে যায়। তবে বাইরে যাওয়ার জন্য তাদের মিহি ফুলপাড়ের শাড়ি চাই। এই কাপড়ের জন্য অবশ্য তাদের খুব একটা ভাবতে হয় না, নিজেরাই খেটে যোগাড় করে নেয়। ঘর-দুয়ার আর জামা-কাপড় থেকে কাহারদের সরল জীবন-যাপনের একটি ছবি পাওয়া যায়। যুদ্ধের বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও সামান্য কাপড়ের জন্য কাহাররা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয় ।

ছয়

বেহারা কাহারদের আদি পেশা ছিল পালকি বহন। ইংরেজ আমলে কাহাররা ইংরেজ সাহেব মেমদের পালকি বহনের সুবাদে বেহারা প্রতি দশ বিঘা করে জমি পেত চাষের জন্য। আবার নীল চাষের যুগে নীল চাষ করলে বিঘা পাঁচেক চাষের জমি বরাদ্দ ছিল তাদের জন্য। কাহারদের আরেক গোত্র আটপৌরে কাহাররা সাহেবদের আট প্রহরের বাঁধা চাকরান হিসেবে খাটত। নীল চাষের যুগে এরাই লাঠি হাতে নীলের জমি দখল করত জমিদারের হয়ে।

আটপৌরে কাহাররা লাঠি হাতে পাহারা দিত আর বেহারা কাহাররা নীল চাষে বিরত সাধারণ গৃহস্থের জমির ফসল চষে লুঠ করে নিয়ে আসত। বেহারা কাহার ছিল চাষের কাজে দক্ষ। জ্ঞান গঙ্গা ও বিয়ের পালকি বহনের কাজেও ডাক পড়ত তাদের। ইংরেজদের নীল কুঠি উঠে গেলে বেহারা কাহারদের পালকি বহনের কাজ কিছুটা কমে আসে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হাঁসুলী বাঁকের চৌধুরীরা সমগ্র সাহেবডাঙা কিনে নিলে কৃষিকর্মে দক্ষতার জন্য নতুন জমিদারের কাছ থেকেও তারা জমি বরাদ্দ পায়। এই সময় আটপৌরেরা কিছুটা সমস্যায় পড়েছিল। কারণ তারা ছিল অপেক্ষাকৃত কৃষিশ্রম বিমুখ। ফলে নানা প্রকার অনৈতিক কাজ, বিশেষত চৌর্যবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে তারা। তবে চৌধুরীদের বাড়িতে আটপৌরেদের আদি পেশা তখনো বজায় ছিল।

উত্তরকালে বেহারাদের পালকি বহনের কাজ আরও হ্রাস পায়। তবে ‘জ্ঞান-গঙ্গা’ ও বিয়েতে তাদের ডাক পড়ত অনিবার্যভাবে। এছাড়া ভার বহনের কাজে তাদের কদর বজায় ছিল সর্বদা। দেড় মন বোঝা নিয়ে অনায়াসে তারা দশ ক্রোশ পথ যেতে পারত। ক্রমে কাহাররা বেশি মাত্রায় কৃষি নির্ভর হয়ে পড়ে। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে দেখা যায় জমিদার ঘোষদের জমি তারা ভাগে চাষ করে। এছাড়া ঘর ছাওয়ার মৌসুমে তারা বাবুদের ঘর ছেয়ে দেয়। এক্ষেত্রে কাহারদের বেশ সুনাম। গৃহ নির্মাণে তারা বাবুই পাখির মতোই দক্ষ।

কাহার মেয়েরাও পুরুষের পাশাপাশি কৃষিকাজে অংশ নেয়। মেয়েরা চন্ননপুরে’ দুধ বিক্রি করতে যায়। কেউ কেউ সেখানে বাবুদের বাড়িতে ঝি এর কাজও করে। কাহার জনগোষ্ঠী মূলত একটি কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী। জমিতে প্রাণপাত করেও তারা সব সময় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে যথোপযুক্ত মূল্য পায় না। নানা অজুহাতে তাদের ঠকানো হয়।

হাঁসুলী বাঁকের উপকথায় আদিবাসী এই জনগোষ্ঠী তাদের স্বগ্রাম বাঁশবাদির বাইরে অন্য কোন কাজ করাকে জাত খোয়ানোর শামিল বলে মনে করে। চন্দনপুরের নগদ উপার্জন তাদের কাছে পাপের পথ বলেই পরিগণিত। তাই তারা শত বঞ্চনা সয়েও বাঁশবাদি কেন্দ্রিক কৃষি নির্ভর জীবন যাপনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ। জমিদার মহাজনরা সব সময় তাদের স্বার্থে কাহারদের ব্যবহার করেছে। কাহাররা নিম্ন মানের জমিই চাষের জন্য বন্দোবস্ত পেত।

মাটির রুক্ষতা, জলের অপ্রতুলতা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাহারদের কৃষিকর্মের নিত্য বৈরি । আবার কোনো দুর্যোগে ফসল কম হলে ভূমি মালিক ফসলের পূর্ণ অংশ দাবি করে। ফলে, কাহাররা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। কৃষি-জীবনে কাহার সম্প্রদায় সামন্ত্রতান্ত্রিক অপব্যবস্থার শিকার হয়েছে সর্বদা। উত্তরকালে উপন্যাসের উপান্ত-পর্বে যুদ্ধের প্রভাবে সমাজে আলোড়ন দেখা দিলে পরিবর্তন ঘটে ভূমি মালিকের দৃষ্টিভঙ্গির।

জাঙালের বাবুরা এবং ঘোষ পরিবারও ওই সময় কৃষিনির্ভরতা পরিহার করে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দেয়। ফলে নতুন এক ধরনের শিল্প- উপনিবেশ তৈরি হয়। কাহারদের কৃষিনির্ভর জীবনে এর প্রভাব পড়ে গভীরভাবে। তথাপি পিতৃপুরুষের ‘রীতকর্মে’ বিশ্বাসনির্ভর কাহার গোষ্ঠী তাদের আদি পেশা কৃষিতেই প্রাণপণে স্থির থাকতে চেয়েছে। কিন্তু কাহার গোষ্ঠীর উদ্ধৃত চরিত্র ‘ডাকাবুকো যুবক’ করালী আবহমান কাহার সংস্কৃতির অনিবার্য ভাঙনের প্রতীক হয়ে দেখা দেয় সমকাল-পরিত কাহার জীবনের একটি বিশেষ স্তরে।

করালী প্রত্যাখ্যান করেছে বংশগতিধারায় প্রবাহিত কাহার-সংস্কৃতি জীবনবোধ ও বিশ্বাসের মৌল ভিত্তি। বেহারা ও আটপৌরে উভয় ধারার কাহার ঐতিহ্য অমান্য করে সে নতুন যুগের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। কৃষি কিংবা ভারবহন দুটোকেই উপেক্ষা করে সে চন্দনপুরে রেললাইনের কাজে অংশ নিয়েছে। তার এই বিদ্রোহ সূচনায় ভাঙনের সংকেত হলেও শেষে আর তা সংকেতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কাহার পল্লির তরুণ সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত আগ্রদূত করালীর আদর্শকে অবিকল্পরূপে অনুসরণ করেছে।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

সাত

যুগে যুগে ভূমিকেন্দ্রিক সামন্ত অপসংস্কৃতির শিকার হয়েছে হাঁসুলী বাঁকের কাহারকুল। কৃষিজীবী কাহাররা জমির ভোগদখলের অধিকার পেয়েছে সর্বদা কিন্তু ভূমির মালিকানা তারা কখনোই পায়নি। সামাজিক- রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে ভূমির মালিকানার পরিবর্তন ঘটলে কাহার জনগোষ্ঠী ছুটেছে নতুন ভূমি মালিকের কাছে জমি প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। তাই জমি তাদের কাছে চিরকালই আরাধ্য বস্তু।

আলোচ্য উপন্যাসে কালোশশীর মুখে বাবুদের সাহেবডাঙা ক্রয়ের সংবাদ শুনে বনওয়ারীকে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল হয়ে উঠতে দেখা যায়। আটপৌরে পরম সেই জমি বন্দোবস্ত নিতে গিয়েছে এই সংবাদ শুনে বনওয়ারী নিজেকে বোকা ভাবে। অতঃপর বনওয়ারীও ছোটে জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার আশায়। পরমের মতো সব কাহারই রাতে ঘুমিয়ে জমির স্বপ্ন দেখে। সাহেবডাঙা নতুন বাবুদের ক্রয়ের সংবাদে কাহার মজলিশে বনওয়ারী-কালোশশী কেন্দ্রিক সরস রসালাপেরও তাল কেটে যায়।

কাহারদের দু-বিঘা করে জমি পাওয়ার প্রসঙ্গটি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় সূক্ষ্ম অনুভবময়তায় উপস্থাপন করেছেন এভাবে: ‘চোখগুলি জ্বল জ্বল করছে— কয়লার মধ্যে পড়া আগুনের ফিনকির মত। অনেক ধরনা দেবার পর জমিদারদের কাছ থেকে কাহাররা যে সামান্য জমি পেত সেটাও অনুর্বর আর চাষ অনুপযোগী। কাহাররা রাতদিন স্ত্রী-পুরুষ সবাই মিলে মাটি কেটে সেটাকে চাষযোগ্য করে তুলত। জমিতে যাতে পাথর না পড়ে সে জন্য বাবাঠাকুরের কাছে প্রার্থনা জানাত। শেষে পুজো দিয়ে জমি খোঁড়ার কাজে নামত।

‘হাঁসুলী বাঁকের দেশ কড়াধাতের মাটির দেশ। এ দেশের নদীর চেয়ে মাটির সঙ্গেই মানুষের লড়াই বেশি। গ্রীষ্মে নদী শুকিয়ে ধূ ধূ বালির মরুভূমি হয়ে যায়। কোদাল দিয়ে সে মাটি কাটা অসম্ভব। গাঁইতি দিয়ে সামান্য করে কাটা গেলেও প্রতি আঘাতে আগুনের ফুলকি ওঠে। এমনি ধারার মাটি কেটে কাহার জনগোষ্ঠী চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করে। বাবুরা উৎকৃষ্ট মানের জমি রেখে নিম্নমানের অবশিষ্ট জমি বিনা সেমিতে কাহারদের দেয়। তারা এই সামান্য পাওয়াতেও নিজেদেরকে ধন্য মনে করে।

অদম্য আগ্রহে চলে মাটি কাটার কাজ। কুমারী মাটিকে প্রণাম করে হাঁসুলী বাঁকের বনওয়ারী বলে, ‘তোমার অঙ্গে আঘাত করি নাই মা, তোমার অঙ্গকে মার্জনা করছি। সেবা করছি। তুমি ফসল দিও। ভূমিকে মাঝের মতই দেখে কাহাররা। জমি তৈরির সময় আধ হাত পরিমাণ পাথরের স্তরের নিচে উৎকৃষ্ট মাটি দেখে বনওয়ারী গাঁইতি দিয়ে অদম্য বিক্রমে পাথর ভাঙতে থাকে। পাথর ভেঙে তার কণা ছিটকে কপালে আঘাত করে।

রক্ত ঝরতে দেখেও বনওয়ারী বলে, “অক্ত’ নিয়েছেন মা-বসুমতী। কাহার সম্প্রদায় জানে ভূমিই তাদের একমাত্র ভরসা ও আশ্রয়স্থল। তারা আরও জানে,’ মা-বসুমতী যেমন দেন, তেমনি নেন। মা বসুমতী ধানে চালে ফসলে তাদের খাদ্যের যোগান দেন কিন্তু বিনিময়ে মৃত্যুর পর দেহ পুড়িয়ে ছাইটি তাঁকে দিতে হয়।

আর জীবৎকালে দিতে হয় নখ চুল আর রক্ত। তাই ভূমির সাথে কাহারদের রক্তেরই সম্পর্ক। মাটির সাথে তাদের সম্পর্কের গভীরতার জন্যই জীবন ও প্রকৃতি-অভিজ্ঞ বনওয়ারী মাটি থেকে পিঁপড়া উঠে আসতে দেখে আসন্ন ঝড়-জলের সংকেত বুঝে নেয় ।

শত প্রবঞ্চনা সত্ত্বেও হাঁসুলী বাঁকের কাহার জনগোষ্ঠী ভূ-স্বামীদের প্রতি থেকেছে প্রতিবাদহীন। সবকিছুকেই তাদের ভাগ্য ও বিধির বিধান বলে তারা মেনে নেয়। এই মাটি গ্রীষ্মে যেমন কঠিন, বর্ষায় তেমনি কোমল। হাঁসুলী বাঁকের কাহারদের বিশ্বাস, এই মাঠের ফসল-তরকারীতে যার পেট ভরে না, সমগ্র পৃথিবীর কোথাও তার পেট ভরবে না। এটি তার কুটিল এবং কুঁড়ে স্বভাবেরই সাজা।

কাহাররা নিজেরা ‘গতর খাটিয়ে চাষ করে মনিবের ঘরে ফসল তুলে দেয়। কারণ এ হল ভগবানের বিধান, বাবাঠাকুরের হুকুম’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন মাঠ প্রায় ফসল শূন্য, তখনই জমিদারেরা ঘোষণা করে সায়েবডাঙার জমি যাত্রা চাষ করেছে তাদের ফসল এবার বাবুদের বামারে জমা দিতে হবে। খাজনা এবার তারা নেবেনা।

কারণ যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্য শস্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে কাহার মাতব্বর বনওয়ারীর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হয়। — কত সাধের সায়েবডাঙার জমি। কি পরিশ্রম ক’রে পাড়ার লোকের শ্রদ্ধার খাটুনি নিয়ে সে যে এই জমি তৈরি করেছে, সে বাবুরা জানেন না জানে সে, জানতেন বাবাঠাকুর; জানেন ভগবান হরি।” 30

ত্রুটিপূর্ণ ভূমিব্যবস্থা, অনাধুনিক কৃষিপদ্ধতি এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কাহার জনগোষ্ঠীর জীবন বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কৌমের সংস্কারাচ্ছন্ন জীবনধারাও তাদের আর্থনীতিক দুরবস্থার জন্য বহুলাংশে দায়ী। সামান্য মুড়ি-লঙ্কা খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রমে সক্ষম কৃষিজীবী কাহারদের জীবনে। আর্থনীতিক স্বাচ্ছন্দ্য অর্জন অলীক কল্পনা মাত্র।

উপরন্তু কাহারদের জীবনে সর্বদা উদ্যত সুদ, খাজনা ও সেলামি সংক্রান্ত অঙ্কশাস্ত্রীয় জটিল হিসেবের কৃপাণ। দাদনের মারপ্যাঁচে চিরকাল ধরেই ঠকে আসছে তারা। খাজনা, দাদন কিংবা বন্ধকীর শুভঙ্করী হিসাব তারা জানে না। কাহারদের কাছে সে হিসাব এক আশ্চর্যই হয়ে থেকেছে সর্বদা। ‘আশ্চর্যকে ঘেঁটে দেখে তার স্বরূপ নির্ণয় করার মত বুদ্ধির তাগিদ ওদের নাই। যদি বা আদিকালে কখনও ছিল, বারবার ঘা খেয়ে, তা মরে গেছে। সাহেব, সদৃগোপ, বাবুদের শাসন ঠেলে কখনও তা কঠিন এবং ধারালো হয়ে আশ্চর্যকে ভেদ ক’রে ছেদ করে দেখবার মত নির্ভয় বিক্রম লাভ করতে পারে নাই।১৭

রুক্ষ আর অনুর্বর মাটির সাথে কাহারদের যেমন সংগ্রাম তেমনি নীরব সংগ্রাম তাদের জমিদারদের বিরুদ্ধেও। সামন্ত প্রভুরা কাহারদের ঠকায় কিন্তু তারা প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রাচীনকাল থেকেই নিয়ম মতো বাৎসরিক হিসাব না করে দেনার দায় বৃদ্ধি করে তাদের কাছ থেকে বাঁশ ঝাড় বা বৃক্ষ নিয়ে দেনা মাফ করত, অথবা চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণ বৃদ্ধি পেত। ফলে জীবন ধারণের জন্য প্রতিনিয়তই তাদের যুঝতে হয়েছে।

প্রচণ্ড পরিশ্রমী এই জনগোষ্ঠী জমির অভাবে, সুষ্ঠু ব্যবস্থপনার অভাবে কৃষিকর্ম করেও প্রয়োজনীয় আর্থনীতিক প্রতিফল লাভে বঞ্চিত হয়েছে। উপরন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাদের আর্থনীতিক জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে দেয়। কৃষিনির্ভর এই জনগোষ্ঠীর কর্ষণযোগ্য জমি যুদ্ধের কাজে ব্যবহার শুরু হলে তারা যুদ্ধনিয়ন্ত্রিত কাঁচা পয়সার বাজারে শস্যহীন অবস্থায় এক অন্ধকার জগতে নিক্ষিপ্ত হয়। আর এভাবেই এই কৌম জনগোষ্ঠীর বিপর্যয় হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

আট

কালিক গতিধারায় সবকিছুই বিবর্তিত হয়। বাঁশবাদির বাঁশবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন কাহারদের জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে সময়ের রথ বাঁশবাদির কাহারপাড়ায় রেখে যায় বিপর্যয়ের রথচিহ্ন। মূলত সমাজবিজ্ঞানের নিয়মেই হাঁসুলীবাঁকের কাহারদের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে বিপর্যয় অনিবার্যভাবে নেমে আসে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনধারা রক্ষায় নিয়ত সংগ্রামী কাহারকুল স্বভাবতই ব্যর্থ হয় সময়ের শাসনকে প্রতিহত করতে।

ফলে, অমোঘভাবেই তাদের মেনে নিতে হয় আবহমান কাল ধরে লালিত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অস্তি ত্বের পরাজয়। কাহার সম্প্রদায়ের জীবনধারায় পরিবর্তন উপন্যাসের প্রথম পর্বে সংকেতিত হয়েছে সুচাঁদ পিসির এই আক্ষেপোক্তিতে ‘সাহেবরা গেল, কাহারদের কপাল ভাঙল ….. আমলই পাল্টিয়ে গেল। সাহেব আমলের অবসানে কাহারদের পেশাগত জীবনে পরিবর্তন আসলেও আর্থনীতিক অস্বাচ্ছন্দ্যে কাহারকুল যত না দিশাহারা হয়েছে তার চেয়ে অধিক ভীত হয়েছে স্বাজাত্য বিসর্জনের আশঙ্কায়।

কাহার জীবনের নিস্তরঙ্গ স্বাভাবিকতায় প্রথম ভাঙনের সংকেত হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসের প্রতীকী চরিত্র করালী। চন্দনপুর রেললাইনে কুলির গ্যাঙম্যান হিসেবে কাজ ক’রে কাহারসমাজের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে সে। কাহার সমাজে প্রতীকী পরিবর্তন আনয়ন করে এই করালী। এই করালীকে চন্দনপুরে ঠেলে দেয় ঘোষবাবু। নগদ মজুরিতে অভ্যস্ত কাহার গোষ্ঠীর ছিটকে পড়া এক নতুন মানুষ এই করালী।

চন্দনপুরে গিয়ে সে শেখে নবা ন্যায়-নীতি, খোঁজে ঘটনার কার্যকারণ সম্পর্ক; জন্ম নেয় তার মধ্যে মান-অপমান বোধ। নগদ অর্থ উপার্জনের দস্তে কাহারদের দারিদ্রপিষ্ট অথচ পরিতুষ্ট অজ্ঞানতাকে সে আঘাত করে চন্দনপুরের প্রাক্- ধনতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা আলোকিত হয়ে সে আঘাত করে গোষ্ঠীদেবতার প্রতিনিধি বাবাঠাকুরকেও। আর এভাবেই করালীর সূত্রে চন্দপুরের নতুন হাওয়ার অনুপ্রবেশেই কাহার পল্লিতে পরিবর্তনের প্রথম ধাক্কা এসে লাগে।

সামন্ততান্ত্রিক কৃষি অর্থনীতির ধারক বনওয়ারীর ‘ধমক’ ও ‘খবরদারী কে অগ্রাহ্য করে ক্রমে করালীর সাথে কাহার পাড়ার তরুণদের কয়েকজন কাজ নেয় চন্দনপুরে। তারাও কাহার পল্লিতে ভিন্ন সংস্কৃতির আমদানি শুরু করে বনওয়ারীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। সমাজ পরিবর্তনে নতুন-পুরাতনের চিরায়ত দ্বন্দ্বের বিষয়টি বনওয়ারী ও করালী চরিত্রের মাধ্যমে স্বভাবসুলভ বিশিষ্টতায় প্রাণবন্ত করে তুলেছেন ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। কালের যাত্রায় সামন্ততন্ত্রের অবসানে সূচিত হয় পুঁজিবাদী সমাজ।

পুঁজিবাদের অগ্রযাত্রায় পুরাতন সামন্তপ্রভুরাই পরাভূত হয়। পুঁজিবাদী সমাজে গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা আর ব্যবসা- প্রতিষ্ঠান। শিল্পের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয় চাষের জমি। অধিক মুনাফার প্রত্যাশায় কৃষির চেয়ে শিল্পের দিকে নব্য ধণিক শ্রেণির মনোযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাক্-ধনতান্ত্রিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাহার সম্প্রদায় ভূমিহীন ও কর্মহীন হয়ে নিরুপায়ভাবে কারখানা-শ্রমিকে পরিণত হয়। ভারতীয় ত্রুটিপূর্ণ ভূমি-ব্যবস্থাপনার নির্মম শিকার এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী।

কাহার নারীরাও চন্দনপুরে গিয়ে আর ফেরে না। চন্দনপুরের শ্রমজীবন তাদের আকৃষ্ট করে। শিল্প বিকাশের সাথে সাথে কাহার জনগোষ্ঠীর শিকড় ভূমি থেকে উলিত হয়ে যায়। কারখানার মালিকগণ কাঁচা টাকার প্রভাবে সহজে আকৃষ্ট করে নিরুপায় দারিদ্র্যক্লিষ্ট কাহারদের। ফলে, চন্দনপুর-কেন্দ্রিক কারখানা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে করালীর মতো অনেকেই। কৌমসংস্কৃতির প্রতিভূ বনওয়ারীর কাহারদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিপর্যয়ে শেষ পর্যন্ত অসহায়ের মতো আর্তচিৎকার করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না ।

হাঁসুলী বাঁকের কাহারদের কৌমসংস্কৃতি ও জীবনধারায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথ ধরে। সমকালীন বিশ্বরাজনীতি কাহারদের অজ্ঞাতেই তাদের জীবনধারায় নিয়ে আসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। ভূমি-উলিত এই জনগোষ্ঠীকে আমূল পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায় এই মহাযুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে ধান, চাল, কলাই, গুড় সবকিছুর দাম চড়েছে। তাই জমিদাররা সব ফসল ঘরে তোলায় ব্যস্ত হলে কাহারদের মধ্যে দেখা দেয় হাহাকার।

কাহার-মানসিকতার প্রেক্ষাপটে তাদের জীবনে যুদ্ধের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এঁকেছেন এভাবে: যুদ্ধ, নাকি জোর ‘যুদ্ধ’ লেগেছে। সেই যুদ্ধের জন্যই নাকি এ দিকেও অনেক ব্যাপার হবে। লাইন বাড়বে! কোথা নাকি উড়োজাহাজের আড্ডা হবে। গোটা রেললাইনই নাকি যুদ্ধ-কোম্পানি নিয়েছে কেড়ে। অনেক নতুন লোক নেবে। অনেক খাটুনি, অনেক মজুরি ।

দেশ-বিদেশ, রেভুন না কোথা বোমা পড়েছে! ‘জাপুনি’ না কারা আসছে! কলকাতা থেকে লোক পালাচ্ছে। চন্ননপুরেও নাকি আসছে কলকাতার লোক। চন্ননপুরে হৈ-হৈ পড়ে গিয়েছে। ১৮ বাঁশবাদিতে রাস্তা-ঘাট নির্মিত হয়, যুদ্ধের তাঁবু পড়ে। যুদ্ধের প্রয়োজনেই বাঁশবাদির সব বাঁশ উজাড় হয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনেই যায়। যুদ্ধ-কোম্পানি যুদ্ধের প্রয়োজনে কাহার পল্লির চিরকালীন শান্ত অন্ধকার ঘুচিয়ে দিয়ে সব গাছ আর বাঁশ কেটে পাল্টে দেয় বাঁশবাদির ভৌগোলিক চেহারা।

উদরের দায় বড় দায়- সে দায়েই কাহার সম্প্রদায়ও স্ব-ভূমি, স্ব-কৌমসংস্কৃতি ছেড়ে যুদ্ধের কাজে অংশ নেয় শ্রমিক হিসেবে। চন্দনপুরে ভিড় জমায় তারা বাঁশবাদি ছেড়ে। এদের মধ্যে যারা যুদ্ধের খাতায় নাম লিখিয়েছে, ধর্মকে পরিত্যাগ করেছে, স্বাজাত্য ত্যাগ করেছে, তারাই শুধু বেঁচে থাকার অন্ন যোগাড় করতে সমর্থ হয়েছে- পিথিমীতে যুদ্ধ বেঁধেছে। যুদ্ধ চলছে সায়েব মহাশয়দের মধ্যে। জিনিসপত্রের নাকি দর চড়বে! ধান চাল গুড় কলাই সমস্ত কিছুরই দর উঠবে। তাই মণ্ডলেরা ‘সতর’ হয়েছেন একটি ভাড় গুড় যেন না সরে। সরাবে আর কে? সরাবে তো কাহাররাই। ১৯

পাকা রাস্তা ধরে চন্দনপুর থেকে মোটরে চড়ে যুদ্ধ আসে কাহার পাড়ায়। ওদিকে চন্ননপুরে আর সব বাবুমহাশয়দের ‘গেরামে’ শহরে লেগেছে গান্ধীরাজার কাণ্ডকারখানা। লাইন তুলেছে, সরকারী ঘরদোর জ্বালাচ্ছে…. চাল ধানের দর হু হু করে বাড়ছে। বলছে আরও বাড়বে। এ অবস্থায় কাহারদের আর রইল কী? বাঁশবাদির অন্ন তাদের ঘুচে যায়।

দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দলে দলে কাহার নরনারী চলে চন্দনপুর যুদ্ধের কাজে নগদ উপার্জনের আশায়। কাহারদের অন্নদাত্রী হাঁসুলী বাঁকের বাঁশবাদির চিত্র পাল্টে গেছে ইতোমধ্যে। সবাই পালিয়েছে বাঁচার তাগিদে । রুগণ বনওয়ারী এবং তাকে ঘিরে পাগল আর নসুবালা রয়েছে বাঁশবাদির শেষ দৃশ্যপট অবলোকনের জন্য। বাঁ খাঁ চারিদিক, বাঁশবন উজাড়, বড় বড় বট অশ্বত্থ গাছ পর্যন্ত বিলুপ্ত।

চারদিকে তীব্র আলোর ছটা; সবুজ নেই, রয়েছে কেবল দু-চারটি শীর্ণ বৃক্ষ। হাঁসুলী বাঁকের চিহ্ন নেই। বনওয়ারীর সাজানো কাহার সমাজ আর নেই। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী সুবাসী বনওয়ারীরকে পরিত্যাগ করে করালীর সঙ্গে চলে গেছে। অভিমানী পাবি আত্মহত্যা করেছে। বসন্ত চৌধুরীবাড়ির এঁটো কাঁটা বেয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। পাগল ও নসু হাঁসুলী বাঁকের বাইরে ভিক্ষা করে গান গায়। করালী চন্দনপুর আছে। অনেক কাহারকে সে যুদ্ধের কোম্পানীতে কাজ পাইয়ে দিয়েছে।

উপকথার কথক চাদ এখন চন্দনপুরে উপকথা পরিবেশন করে আর ভিক্ষা করে। হাঁসুলী বাঁকের *উপকথার ছোট নদীটি ইতিহাসের বড় নদীর সঙ্গে মিশে গেল। কাহারেরা এখন নতুন মানুষ ! পোষাকে- কথায়-বিশ্বাসে তারা অনেকটা পাল্টে গিয়েছে। মাটি ধুলো কাদার বদলে যাবে তেলকালি, লাঙল কাস্তের বদলে কারবার করে হাম্বর-শাবল গাঁইতি নিয়ে। তবে চন্ননপুরের কারখানায় বেটেও তারা না খেয়ে মরে, রোগে মরে, সাপের কামড়ের বদলে কলে কেটে মরে, গাড়ি চাপা পড়ে মরে। কিন্তু তার জন্য বাবা ঠাকুরকে ডাকে না।

ইতিহাসের নদীতে নৌকা ভাসিয়ে তাদের তাকাতে হচ্ছে কম্পাসের দিকে বাতাস দেখার যন্ত্রটার দিকে। – এভাবে সামাজিক, আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক কারণে পেশা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা থেকে উলিত হয়ে পড়ে গোষ্ঠীবদ্ধ কাহার সম্প্রদায়। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বভূমি ও স্বাজাত্য আধুনিক অর্থনীতি ও রাজনীতির কারণে যেভাবে বিপর্যন্ত ও বিলুপ্ত হল তারই শিল্পিত কাহিনী হাঁসুলী বাঁকের উপকথা ।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

নয়

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে একটি বিশিষ্ট কৌম জনগোষ্ঠীর ভাষা প্রয়োগে দক্ষতা ও বাস্তবানুগত্যের পরিচয় দিয়েছেন সর্বত্র। উপন্যাসে তিনি কাহার সম্প্রদায়ের মুখের কথা ব্যবহার করেছেন বাস্তবানুগ করেই। সর্বজ্ঞ ঔপন্যাসিকের ভাষ্যে মান্য চলতি ভাষার ব্যবহার এই উপন্যাসে সাবলীল রূপ লাভ করেছে। এতে ব্যবহৃত পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষা বীরভূমের রাঢ় অঞ্চলেরই বিশেষায়িত উপভাষা।

রাঢ়ের আদিবাসীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের মুখের ভাষা ব্যবহারে বাস্তবতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আদিবাসী কাহারদের প্রচুর প্রবাদ, ছড়া, গান ব্যবহার করেছেন উপন্যাসটিতে। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি পরীক্ষা ও নিরীক্ষা প্রবণতার পরিচয় দিয়েছেন সর্বদা। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলির সংলাপের মধ্যে উদ্ধৃতি-চিহ্ন দ্বারা বিশিষ্ট শব্দ বা শব্দগুচ্ছকে চিহ্নিত করেছেন, এমনকী তার অর্থও ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন।

রাঢ়ী উপভাষা থেকে বীরভূমের নিজস্ব উপাদানগুলোকে পৃথক করে দেখানোর জন্যই তাঁর এই প্রয়াস। উপন্যাসে মান্য চলতি ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক রাঢ়ী উপভাষা এবং বীরভূমের নিজস্ব ভাষিক উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে। যেমন— নিনতেলে পানু বললে তা আবার মানিস না।

কাহারপাড়ার পিতিপুরুষরে রোপদেশে নাতি মেরে মুরুব্বির মুখের ওপর বুড়ো আঙ্গুল লেড়ে দিয়ে চন্দনপুরে মেলেছে কারখানায় কাজ করছিস।” কিংবা, ‘নিমতেলে পানু বেশ গুছিয়ে এবং চিবিয়ে কথা বলতে পারে। সে-ই বলছিল— মাতব্বর যদি শাসন করতে ‘তরাস’ করে, তবে দুই নোকে ‘অল্যায়’ করলে তার শাসন হবে কি করে? ‘আজা’ হীনবল হলে আজা’ লষ্ট। এতবড় ‘অন্যায়ে’ মুরুব্বি বাক্যটি বার করলে না মুখ থেকে। ২২

এ ছাড়া আদিবাসীদের লোকজ জীবনের সাথে তারাশঙ্করের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ মেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ছড়া ও গানের ব্যবহারে। এ-সব গানে কাহার জীবনের প্রাত্যহিক চিত্র ফুটে উঠেছে তাদেরই ভাষার মিশ্রণে। যেমন :
জাতি যায় ধরম যায় মেলেচ্ছো কারখানা ও-পথে যেয়ো না বাবা কত্তাবাবার মানা মেয়েরা ও পথে গেলে, ফেরে নাকো ঘরে বেজাতেতে দিয়ে জাত যায় দেশান্তরে লক্ষ্মীরে চঞ্চল করে অলক্ষ্মীর কারগানা ও-পথে হেঁটো না মানিক কত্তাবাবার মানা
উপন্যাসে সর্বজ্ঞ ঔপনাস্যিকের ভাষায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়র প্রমিত বা মান্য চলতি ভাষারই আশ্রয় নিয়েছেন।

কোপাই নদীর বন্যার বর্ণনায় ওই ভাষারীতির দৃষ্টান্ত দ্রষ্টব্য : ‘কাহারদের মেয়েও যেমন রাগ পড়লে এসে চুপ ক’রে গাঁয়ের ধারে বসে থাকে, তারপর এক পা, দু’পা করে এসে বাড়ির কানাচে শুয়ে গুনগুন কারে কাঁদে কি গান করে, ঠিক ধরা যায় না তেমনিভাবে কোপাইও দু’দিন বড়জোর চারদিন পরে আপন কিনারায় নেমে আসে, কিনারা জাগিয়ে খানিকটা নীচে নেমে কুল-কুল শব্দ ক’রে বয়ে যায়।

সর্বজ্ঞ ત দৃষ্টিকোণে লেখক এভাবেই গোটা উপন্যাসে মান্য চলতি ভাষা ব্যবহার করেছেন। আঞ্চলিক ভাষার শব্দাধিক্যের দুর্বোধ্যতায় পাঠকের রসাস্বাদনে যেন বিঘ্ন না ঘটে তাতেও লেখক সতর্ক। পাত্রপাত্রীর মুখের ভাষাতেও সহজ স্বাভাবিকতা বজায় রেখেই তিনি পাঠকের কাছে পেশ করেছেন। পাখিকে বলা নসুর সংলাপে তার প্রমাণ মেলে দে বুন, দে, আরও ঘা কতক দে। আমি লারলাম ওকে বাপ মানাতে আমি লারলাম। তু দেখ বুন এইবার।

গদাগদ কিল মারবি, আমি বলে দিলাম। এক্ষেত্রে চরিত্রের ভাষাও পাঠকের অবোধ্য নয়। উপন্যাসের মূল লক্ষ্য যে পাঠক, এ কথা তারাশঙ্কর বিস্মৃত হননি বলে সর্বত্র এই ধারা বজায় থেকেছ। চরিত্র অনুযায়ী ভাষা নির্মাণেও তিনি স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বসন্ত বনওয়ারীকে রেশন কার্ড হাতে দিয়ে যখন বলে— হ্যাঁ! কেরাচিনি, চিনি— এই সবের কাড। নেওনাইন বোড থেকে দিয়েছে। ২৬

কিংবা নসু বালার কথায়, ‘শুধু ওদর? লোভ পাপ, বুয়েচ ব্যানোকাকা, পাপ, পিথিমীতে পাপের ভারা ভরতে আর বাকি নাই। একটি লোক দেখলাম না যে ধম্মের মুখ তাকায়। २५ তখন তার উল্লিখিত ভাবাবেগ সম্পর্কে কোনো সংশয় থাকে না। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আলোচ্য উপন্যাসে বীরভূমের নিজস্ব সংস্কৃতি-জাত বহু শব্দ ব্যবহার করেছেন।

এর মধ্যে ব্রত উৎসব সংক্রান্ত- বেরতোর, ভাদু-ভাঁজোর গান, ঘেটুর গান; দেবদেবী সংক্রান্ত— ধর্মরঞ্জো, থান, চন্ননের চণ্ডী, কত্তা, কালারুদ্দু ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষি, পেশা ও লোকবিশ্বাস সংক্রান্ত অনেক শব্দও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই রচনায় ব্যবহার করেছেন। ছড়া, কথা, প্রবাদ, গান ব্যবহারে আঞ্চলিক কৌমচারিত্রের আনুগত্য লক্ষণীয়।

হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে তারাশঙ্করের ব্যতিক্রমী সৃজনশীলতার পরিচয় মেলে। উপকথাকে আশ্রয় করে একটি গোষ্ঠীর জীবনের হাসি-কান্না, বিশ্বাস-নির্ভর সমাজের ভাঙন-যন্ত্রণা এবং তাদের উন্মলিত হওয়ার দেশ-কাল নির্ভর কার্যকারণ-সম্পর্কযুক্ত কাহিনী সৃজনই বর্তমান উপন্যাসের প্রতিপাদ্য।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কাহিনীর প্রয়োজনে বারবার উপকথার সংযোজন করেছেন। কিন্তু এতে কাহিনীর গতি শ্লথ যেমন হয়নি তেমনি পাঠকেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি। যেমন, বনওয়ারীরর গাজনের প্রধান ভক্ত হওয়ার প্রসঙ্গে বান গোসাইয়ের উপকথার প্রসঙ্গ টেনে আনা। আবার সুবাসীর মতিগতির প্রতি বনওয়ারীর সংশয় প্রকাশে সুচাঁদ পিসীর উপকথার রাজকন্যার প্রসঙ্গ টেনে আনা, কন্যার নাক দিয়ে সরু সূতার মত সাপ বের হয়ে ফুলে অজগর হওয়ার ঘটনা।

এ-সব কৌমকথা উপন্যাসের পরিবেশ সৃজনের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়েছে। বিস্তৃত উপকথাই উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে, নিয়ন্ত্রণ করেছে, আবার নিয়তি-নির্ভরও করেছে। তাই উপন্যাসের কাহিনীর সংগঠনে উপকথার ভূমিকা অনস্বীকার্য। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসে উপমা ও প্রতীকের ব্যবহারও লক্ষণীয়। উপন্যাসের নামকরণে যে হাঁসুলী বাঁকের কথা বলা হয়েছে তাকে লেখক হাঁসুলীর মতো বাঁক নিয়েছে বলেই হাঁসুলী বাঁক বলেছেন।

আরও বলেছেন ওখানে নদী অল্প জায়গার মধ্যে এসে বাঁক নিয়েছে। এই বাঁকের মানুষ কাহারদের জীবনও একটি মাত্র অনুষঙ্গে প্রকৃতপক্ষে বাঁক ঘুরেছে, বিবর্তিত এবং উলিত হয়েছে। হাজারো সমস্যায় যে কাহার-গোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে টিকে ছিল, সভ্যতার করাল গ্রাস হয়ে বিশ্বযুদ্ধ এই গোষ্ঠীকে উলিত করে দিয়েছে। এটি হাঁসুলী বাঁকের সঙ্গে কাহারদের জীবনের প্রতীকী সাযুজ্যের ইঙ্গিতবহ। কোপাই নদীর হাঁসুলীর মতো এই বাঁকটি বাঁশ ঝাড় দিয়ে ঘেরা, আবার কাহার সম্প্রদায় এই বাঁশবাদিরই বাসিন্দা।

বাঁশঝাড়ের ধর্ম একত্র ও দলবদ্ধ হয়ে বেড়ে ওঠা। কাহার জনগোষ্ঠীও এই বাঁশঝাড়ের মতোই সংঘবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে একদিকে সেই গোষ্ঠীবদ্ধতার প্রতীক বাঁশঝাড় বিলুপ্ত হয়েছে, অন্যদিকে বাঁশবাদির কাহার সম্প্রদায় উলিত হয়েছে তাদের নিজস্ব জীবনধারা থেকে। নিঃসন্দেহে এগুলো গভীর প্রতীকী তাৎপর্যবাহী এবং সতর্ক ঔপন্যাসিকের শিল্পবোধ পরিসুত বিশেষ অভিপ্রায়েরই শিল্পপ্রকাশ।

উপন্যাসের শিরোনাম হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-র সাথেও উপকথার সার্থকতামণ্ডিত গভীর তাৎপর্য মিশ্রিত। উপকথার যেমন শেষ নেই, তেমনি কাহার গোষ্ঠীর জীবনের উপকথারও শেষ নেই। উপকথার ছোট নদীটি ইতিহাসের বড় নদীতে মিশে গেল’। -উপকথা ইতিহাসে পর্যবসিত হলেও তা উপকথারই – ইতিহাস হয়ে রইল। উপন্যাসের শেষে দেখা যায় নসুবালা, সুচাঁদ আর পাগল কাহার ইতিহাসের আধুনিক নগর চন্দনপুরে ঘুরে ঘুরে নতুন কাহার রূপে কাহারপাড়ার উপকথাই বলে যায়।

হাঁসুলী বাঁকের উপকথা কোনো ব্যক্তি বিশেষের জীবনের উত্থান-পতন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিংবা সুখ-দুঃখের কাহিনী নয়। এটি গোটা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের কাহিনী। কাহিনীর কোনো একমুখিনতা নেই। মূল কাহিনীর গতিধারায় ছোট ছোট কাহিনী এসে মিলেছে প্রাসঙ্গিকভাবে। মহাকাব্যের মতোই এই উপন্যাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা স্থান লাভ করেছে।

মহাকাব্যের ন্যায় এখানেও একটি ক্ষুদ্র নৃ-জাতি বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক জীবনকাহিনী উপস্থাপিত হয়েছে। মহাকাব্যে যেমন লোকায়ত ক্রিয়া ও ভাবনা এক অলৌকিক নিয়তিশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, এখানেও আমরা তাই দেখতে পাই। মহাকাব্যে আধুনিক আরণ্যক জীবনের শক্তি, সাহস, উদ্দামতা ও প্রচণ্ডতা বিদ্যমান থাকে, এ উপন্যাসেও সেই জীবন আভাসিত।

বনওয়ারী ও করালী যেন মহাকাব্য থেকে নেমে আসা দুইটি মহাপরাক্রমশালী চরিত্র, আদিম শক্তি ও সাহস নিয়েই তারা পরস্পরের মুখোমুখি হয়। ঠিক যেন রাম-রাবণ, ভীম-দুর্যোধন কিংবা হেক্টর- একিলিস। করালী এবং বনওয়ারীর গর্জনও আরণ্যক আকাশ প্রকম্পিত করে। আর এসব বৈশিষ্ট্যের জন্যই এই উপন্যাসের কাহিনী মহাকাব্যিক বিশালতা লাভ করেছে।

হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস করা হয়েছে মোট আটটি পর্বে। শেষপর্বটি ছাড়া সবকটি পর্ব আবার কয়েকটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত।

প্রথম পর্বে কৌমের পরিপ্রেক্ষিত এবং বর্তমান অবস্থা সংযোজিত হয়েছে। এই পর্বে কাহারদের শান্ত, নির্লিপ্ত কৌমজীবনে শক্তি ও যৌবনের দুর্ধষতায় করালী আনে ভাঙন আর মহা অশান্তি। তার ঔদ্ধতা বিপর্যস্ত ও বিমূঢ় করে কাহার সমাজকে।

দ্বিতীয় পর্বের প্রধান বিষয় করাণী ও পাখির বিবাহে বনওয়ারী এবং প্রবীণদের আপত্তি বনওয়ারী এবং কালোশশীর রঙের খেলা, কালোশশীর প্রতি বনওয়ারীরর কামনা ও পাপবোধের বিস্তার। এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত বনওয়ারীর প্রায়শ্চিত্তের সংকল্পে এই পর্বের সমাপ্তি।

তৃতীয় পর্বে বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে বাঁশবাদির উপকথার আরেক কথক উচ্ছল প্রাণ পাগলের উপস্থাপপিত কথাবার্তা এবং কালোশশীর ডাকাত স্বামী পরানের সঙ্গে বনওয়ারীর সংঘাতের প্রসঙ্গ। এই সংঘাত দুই কাহার সর্দারের সংঘাত। এ পর্বটি বিষাদাচ্ছাদিত হয় সর্পাঘাতে কালো বউ-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

চতুর্থ পর্বে কৌমের পরাক্রমশালী সমাজ-প্রধান বনওয়ারীর দৈহিক ও মানসিক ক্ষয়ের সূত্রপাত।

তবু তার মধ্যে সক্রিয় থাকে সংস্কার, বিধি-নিষেধ রক্ষার আপ্রাণ প্রয়াস। করালীর পাকা ঘর নির্মাণ ও চন্দনপুরে চলে যাওয়া, বনওয়ারীর অশুভ দ্বিতীয়-বিবাহ কাহার সমাজের বিলুপ্তির সূচনা করে।

পঞ্চমপর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জনিত কারণে কাহার সমাজের উচ্ছ্বলিত হবার কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পায়। এই পর্বেই পরাজিত বনওয়ারীর আর্ত হাহাকারের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে ভারি হয়ে ওঠে বাঁশবাদির পরিবেশ।

ষষ্ঠ পর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটের সঙ্গে সঙ্গে বন্যার করাল গ্রাস কাহার পাড়াকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। এই মহাপ্রলয়ে শুধু টিকে থাকে ‘ডাকাবুকো’ করালী।

বর্তমান উপন্যাসে বহু বিচিত্র চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে। প্রতিটি চরিত্র স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। একটি গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে প্রত্যেকটি চরিত্র। তথাপি যে চরিত্র গোটা কৌম সমাজের ঊর্ধ্বে উঠে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সে হল বনওয়ারী। কাহার পাড়ার সে সর্দার। শৌর্য-বীর্য, তেজস্বিতা, দৃঢ়তা, নম্রতা ও ন্যায়বোধের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত হয়েছে বনওয়ারী চরিত্র।

কাহার সমাজের প্রথা, ধর্মবিশ্বাস ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য সে প্রত্যয়ী। কাহার সংস্কৃতির লঙ্ঘনকারীদের সে উপদেশ দেয়, শাস্তি দেয়। সকলে তাকে মান্য করে এবং তার নির্দেশ পালন করে। ব্যতিক্রম শুধু করালী। করালী কাহারকুলের নীতিধর্মের বিরুদ্ধাচরণকারী। বনওয়ারী করালীর অপরাধ সত্ত্বেও তাকে কাহারকুলের সীমার মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছে তার শক্তির সম্ভাবনাময় মাঙ্গলিক প্রয়োগের আশা পোষণ করেছে।

অথচ করালীই বনওয়ারীর নিজ জীবনে নিয়ে আসে চরম ট্রাজেডি। শেষে কঠোর কঠিন বনওয়ারীও রঙের খেলায় মেতে উঠেছে। কালোশশীর মৃত্যুর পর তারই দোসরভুল্য সুবাসীকে সে বিয়ে করেছে। আবার এই সুবানীকেই কেড়ে নিয়েছে অমিত শক্তিধর করালী। বনওয়ারীর পরাজয় একটি প্রাচীন মহাবৃক্ষের পতনেরই সমতুল্য। নতুন যুগ এবং পরিবর্তনের প্রতীকীচরিত্র করালী।

সে উদ্ধত, দেববিদ্বেষী, আদর্শহীন, নতুন গড়ে ওঠা কারখানার স্থল ভোগবাদী শ্রমিক। কাহার পাড়ার ঐতিহ্যিক রীত-করণের বিরোধী, বিপ্লবী একটি চরিত্র সে। তার কাছে অর্থ আর ভোগই একমাত্র আরাধ্য বিষয়। অপরের স্ত্রীকে বিবেকহীনের মতোই সে ছিনিয়ে নিয়েছে বারবার। তাকে উপলক্ষ করেই বাঁশবাদিতে নেমে আসে ধ্বংসের তাণ্ডব।

হাঁসুলী বাঁকের অবিস্মরণীয় চরিত্র আদিকালের বুড়ি সুচাঁদ পিসি হাঁসুলী বাঁক-কেন্দ্রিক উপকথার গোড়ার কথা বলে যায়। প্রত্যেকটি চরিত্রের অতীত ইতিহাস সুচাদ পিসির নখদর্পণে। ঝগড়ার সময় সে নেচে নেচে তা বলে যায়। কাহার পাড়ার নারীচরিত্রগুলো উপন্যাসে মধ্যবর্তী ভূমিকা পালন করেছে। উপকথার প্রয়োজনেই তাদের উপস্থাপনা। তবে তাদের স্বকীয়তা বজায় থেকেছে সর্বত্র।

কাহার নারী পাখি যেন দুরস্ত হলদে পাখি। দুঃসাহসে নয়ানের ঘর ছেড়ে সে ডাকাবুকো করালীর কণ্ঠলগ্না হয় : আবার করালী তাকে পরিত্যাগ করলে অপমানে আত্মহত্যা করে। কালোশশী শান্ত অথচ ‘রঙের খেলায় বনওয়ারীর সাথে মত্ত থেকেছে আমৃত্যু। বনওয়ারীর স্ত্রী গোপীবালার রূপ না থাকলেও গুণের কমতি ছিল না। গৃহকর্মে নিপুণ গোপীবালা বনওয়ারীর জীবনে ‘লক্ষ্মীর ভাঙারে’র সমৃদ্ধি এনেছিল।

অন্যদিকে, কাহার জীবনের সঙ্গে বেমানান একটি চরিত্র পাখির মা বসন্ত। শাস্ত্র অনুত্তাল এই নারী প্রথম জীবনের ভালবাসাকে সারাজীবন সঙ্গোপনে বুকে ধারণ করে রেখেছে। হাঁসুলী বাঁকের আরেকটি বিচিত্র চরিত্র নসুরাম, নসুবালা নামে যার সমধিক পরিচিতি। পুরুষ হয়েও নারীর মতো তার চলাচল। ছোটবেলা থেকে নারী বেশ নিয়ে নারীর মতো চলতে চলতে সে নসুরাম থেকে নিজের অজান্তেই নসুবালা হয়ে পড়ে।

নেচে গেয়ে উচ্ছলতায় মেতে থাকে নসুবালা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মধ্যে নারীর চিরন্তন মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। বাঁশবাদি ছেড়ে নসু করালীর সাথে চন্দনপুর যায়নি। রুগ্‌ণ বনওয়ারীর সেবা করেছে পাগল কাহারের সাথে মাতৃ মমতায়। বয়স হয়ে শুকসারী- -কথা উপন্যাসে সেই-ই ভাদুর মা হয়েছে।

মেয়েরা না বিইয়ে কানাই-এর মা হতে পারে, নিঃসন্তান রমণীকে ‘নেই রামের মা’ বলেও সম্বোধন করা যেতে পারে, কিন্তু একটি পুরুষ কি মা হতে পারে, ভাদুর মা? নসুরালা আদৌ মেয়ে নয়, সে পুরুষ, বাল্যাবধি মেয়েসুলভ বেশবাস, আচার আচরণে সে নসু থেকে নসুবালা হয়ে গিয়েছিল।

ভালু কে? …এক জমিদার কন্যা কৃষ্ণকে ভালবেসে জীবন দিয়েছিল, সেই থেকে মানবী ভাদু মানুষের পূজা পেয়ে আসছে। জমিদার কন্যা ভাদু দেবী হয়ে গিয়েছে। এই ভাদুরই মা নসুরালা।” উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র এমনি করে লোকজ কাহিনীর ধারার লোকয়ত ঔজ্জ্বল্য লাভ করেছে। উপকথার গতিধারাকে এই সব চরিত্র চলনে-বলনে কখনে বেগবান করে পৌঁছে দিয়েছে চিরায়ত শিল্পের উচ্চতায়।

 

হাঁসুলীবাঁকের উপকথা উপন্যাসে কাহার জীবনের রূপায়ণ

 

দশ

হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-য় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষের জীবনের মতোই বিশেষ অঞ্চলের একটি কৌম গোষ্ঠীর বিবর্তন ও বিলুপ্তির চিত্র উপকথার আশ্রয়ে অঙ্কন করেছেন। উপকথা-আশ্রিত কৌম সমাজের অন্তরালে মানুষের জীবনেরে নিত্যকালের ভাঙাগড়ার কথা ব্যক্ত হয়েছে উপন্যাসে। সমাজপতির অনিবার্য পরিবর্তন কীভাবে একটি কৌমসমাজের জীবনেও আঘাত হানে তারই শিল্পমূর্তি হাঁসুলী বাঁকের উপকথা উপন্যাস।

উপকথা এবং বাস্তব ইতিহাস এখানে একাকার। হাঁসুলী বাঁকের কাহার পাড়া বাস্তব ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে যে জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের বর্ণনা করেছেন তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় মানবমনের সূক্ষ্ম, কোমল জগতের চেয়ে রূঢ় অগ্নিগর্ভ জগৎকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন হাঁসুলী বাঁকের মানুষের আদিম প্রবৃত্তি, ক্রোধ, লালসা, হিংসা এবং শক্তিমত্তাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।

বহির্জগতের দ্বন্দ্ব সংঘাতেই তাঁর আগ্রহ। মনোজগতের স্পর্শকাতর বৃত্তিগুলির বিরোধ-বৈপরীত্যে তিনি অনাগ্রহী। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় স্বভাবগতভাবেই পুরাতনের প্রতি দরদি থাকলেও সমাজগতিকে তিনি অস্বীকার করেননি।

আলোচ্য উপন্যাসে লেখক দেখিয়েছেন নতুনের প্রতিনিধি করালী এবং পুরাতনের ধারক বনওয়ারীর সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্বের ধারায় যুদ্ধজনিত পরিবর্তনের পথ ধরে কীভাবে কাহার সমাজে পরিবর্তন এসেছে, উপকথার সমাজটি কীভাবে শাহরিক সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছে। উপন্যাসে কেবল ব্যক্তিচরিত্রের ঘটনা এবং মনোসংঘাতের ছবি পাওয়া যায় বনওয়ারী চরিত্রের মধ্যে।

যে ওই কৌম সংস্কৃতির প্রতিভূ হয়েও পরিণামে এক হৃতগৌরব সত্তা, পরাভূত মানুষ। লোকজীবনের জৈব তাড়নাকেই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রেমে রূপায়িত করেছেন এ উপন্যাসে। সুচাদের নাতনী বসনের মেয়ে পাখি হাঁপানি রোগাক্রান্ত নয়নকে ছেড়ে নবযুগের বার্তাবাহক করালীর কাছে ছুটে এসেছে জৈবিক আকর্ষণেই।

দেহমনের তীব্র আকর্ষণে পাখির মতো কালোবউও স্বামীকে ছেড়ে হয়েছে বনওয়ারী- মুখী। কাহার সম্প্রদায়ের শিথিল যৌনজীবনের ছবি যেমন এখানে সহজপ্রাপ্য, তেমনি নারীর অদম্য আকাঙ্ক্ষারও সহজ প্রকাশ লক্ষণীয়।

সমকাল সচেতন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় কৌমসমাজের বিবর্তনের পটভূমিকায় যুক্ত করেছেন আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে। সমাজ জীবনে ওই বিবিধ প্রভাবেই যে অপ্রতিরোধ্যরূপে সবরকম পরিবর্তন- বিবর্তন আসে এই সত্য আলোচ্য উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা করেছেন ঔপন্যাসিক।

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা- বিশেষ আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর প্রত্নপ্রতিম উপকথার জগতে বিচরণ করলেও, ঐ বিশেষ জনগোষ্ঠীর উপকথা-নির্ভর জীবনে নতুন কালের অভিঘাত কীভাবে সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্ব ও সত্যকে বাস্তবায়িত করেছে সমাজ-রাজনীতি-নৃবিজ্ঞানের সমন্বিত পর্যবেক্ষণে তা উদ্ভাসিত হয়েছে। ফলে হাঁসুলী বাঁকের উপকথা-য় সমাজগতির অনিবার্য পরিণতি লাভ করেছে সার্থক শিল্প প্রমূর্তি।২৯

উপকথা আর বাস্তবতার দ্বিমাত্রিক কাহিনী সমান্তরালভাবে উপন্যাসটিতে প্রবহমান। উপকথা-নির্ভর কাহারসমাজের জীবনধারা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত কাহার-সম্প্রদায়ের গোষ্ঠীজীবনের বিপর্যয়ের কারণ। ঔপন্যাসিকের সমাজজ্ঞান, কালচেতনা ও রাজনৈতিক বোধের শৈল্পিক প্রয়োগে কাহিনীর দ্বিস্রোত অবলীলায় একীভূত হয়েছে উপন্যাসে।

এ কথা সত্য নতুন পুরাতনের দ্বন্দ্বে লেখক নিরাসক্ত থাকতে পারেননি। করালীর জয় এবং বনওয়ারীর পরাজয়ে লেখক নির্দ্বন্দ্ব নন। বনওয়ারীর প্রতি লেখকের আসক্তি প্রবীণ এবং পুরাতনের প্রতি তাঁর দুর্বলতারই স্মারক। তথাপি একটি আদিম জনগোষ্ঠীর বাস্তব চিত্র এবং তাকে দেশ-কালের মাত্রা ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন সত্যে প্রতিষ্ঠার যে শিল্পকৌশল লেখক এই উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন তা নিঃসন্দেহে বিরল।

আর তাই হাঁসুলী বাঁকের উপকথা আর উপকথা থাকেনি, একটি কৌমের পদ্য-মহাকাব্যে পরিণত হয়েছে। আর এরই মধ্য দিয়ে রচনাটি হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শিল্পসার্থক ও চিরায়ত উপন্যাস।

Leave a Comment