সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ সোভিয়েটের দিনগুলি । যা চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের রাশিয়া ভ্রমণ কাহিনী এর অন্তর্গত।

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

১৯১১ সালের ২০শে জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদ মাতুলালয়ে সুফিয়া কামালের জন্ম। তাঁর পৈতৃক নিবাস শিলাউর, কুমিল্লা। গৃহেই তিনি শিক্ষালাভ করেন। তিনি মূলত কবি ও সমাজসেবিকা। কর্মজীবনে সুফিয়া কামাল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেন।

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমান খাওয়াতিনে বাঙ্গলার সহকর্মী, ওয়ারী মহিলা সমিতি, নারী পুনর্বাসন সংস্থা, বেগম ক্লাব, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী, ছায়ানট, লেখিকা সংঘ প্রভৃতি সংগঠনের সংগে তিনি জড়িত ছিলেন শুরু থেকেই। এছাড়াও তিনি দীর্ঘদিন ছায়ানট ও বাংলাদেশ সোভিয়েট মৈত্রী সমিতির সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ :-

গল্প : ‘কেয়ার কাঁটা’ (কলিকাতা, ১৯৩৭)। ভ্রমণ কাহিনী : ‘সোভিয়েটের দিনগুলি’ (১৯৬৮)। স্মৃতিকথা : ‘একাত্তরের ডায়েরী’ (১৯৮৯)। আত্মজীবনীমূলক রচনা : ‘একালে আমাদের কাল’ (১৯৮৮)। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছেঃ ‘সাঁঝের মায়া’ (১৯৩৮), ‘মায়া কাজল’ (১৯৫১), ‘উদাত্ত পৃথিবী’ (১৯৬৫), ‘মন ও জীবন’ (১৯৫৭), ‘প্রশস্তি ও প্রার্থনা’ (১৯৫৮), ‘দীওয়ান’ (১৯৬৬), ‘মৃত্তিকার ঘ্রান’ (১৯৭০), ‘মোর যাদুদের সমাধি পরে’ (১৯৭২), ‘স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন’ (১৯৭৬)। আরও রয়েছে শিশুতোষ : ‘ইতল বিতল’ (১৯৬৫)। ‘নওল কিশোরের দরবারে’ (১৯৮১)।

তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে :

বুলবুল ললিতকলা একাডেমী (১৯৫৯)। পাকিস্তান সরকারের তমঘা-ই-ইমতিয়াজ, ১৯৬১ ( প্রত্যাখ্যান, ১৯৬৯)। বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২)। বেগম ক্লাব পুরস্কার (১৯৬৪), লেনিন পুরস্কার (১৯৭০)। লেখিকা সংঘের নূরুন্নেসা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী পুরস্কার (১৯৭৬), একুশে পদক (১৯৭৬)। নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭)। শেরে বাংলা জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৭)। রিক্সা শ্রমিক সমিতির পদক (১৯৮৮)। ঢাকা লেডিজ ক্লাব পুরস্কার (১৯৮১)। মুক্তধারা মহিলা পুরষ্কার (১৯৮২)। ফুলকী শিশু পুরস্কার (১৯৮২)। জেব উননিসা মাহবুব উল্লাহ ট্রাষ্ট পুরস্কার (১৯৮৩)। কথাকলি শিল্পী গোষ্ঠী পুরস্কার (১৯৮৩)। পাতা সাহিত্য পদক (১৯৮৩)। শহীদ নূতন চন্দ্ৰ সিংহ স্মৃতি পদক (১৯৮৫), কবিতালাপ (১৯৮৫)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব (১৯৮৬)। রুমা স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৮)। জসীম উদ্দীন পদক (১৯৮৯)। বিজনেস এন্ড প্রফেশনাল ওইমেন্স ক্লাব পদক (১৯৯১)।

বিদেশ থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে : সংগ্রামী নারী পুরস্কার, চেকোশ্লোভাকিয়া, ১৯৮১, (চেকোশ্লোভাকিয়ার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন পুরষ্কার। বিশ্বের ১৬টি দেশের ১৬জন সংগ্রামী মহিলাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়)। বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউইয়র্ক পদক (১৯৮৯)। মেম্বার অব কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্র সনদ (১৯৮৯)। ক্লাব অব বোষ্টন সনদ (১৯৮৯)।

১৯৬৭ সাল। “ইন্টার ন্যাশনাল উইমেন্স ডে” এর আসর বসছে সোভিয়েটের রাজধানী মস্কো নগরীতে। মূল অধিবেশনের দিন ঠিক হয়েছে ৮, ৯ ও ১০ই মার্চ। এতে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বেগম হাবিব রহিমতুল্লাহ ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেগম সুফিয়া কামালকে ডেলিগেট মনোনীত করা হয়েছে।

২৮শে ফেব্রুয়ারী ইসলামাবাদ থেকে মিনিষ্ট্রি অব লেবার ফোনে সুফিয়া কামালকে একথা জানায়। ৩রা মার্চ মস্কোতে উপস্থিত থাকবার কথা থাকলেও পাসপোর্ট, ভিসা, টিকিট, পাথেয় হেলথসার্টিফিকেট ইত্যাদি পেতে দেরী হওয়ায় তিনি মূল অধিবেশনের আগের দিন ৭ তারিখ মস্কোতে গিয়ে উপস্থিত হন। অধিবেশন শেষে তিনি আরও কিছুদিন সেদেশে অবস্থান করেছিলেন।

দু’সপ্তাহে সোভিয়েট ইউনিয়নের মস্কো থেকে লেনিনগ্রাড়, সেখান থেকে জর্জিয়া তিবলিসির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর ০৪-০৪-৬৭ইং তারিখে তাঁর সম্মানে সোভিয়েট কন্সাল জেনারেল কর্তৃক এক সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সম্বর্ধনার উত্তরে তিনি সোভিয়েট দেশের নারীর উন্নত অবস্থানের পাশাপাশি সেদেশের সামগ্রিক সাফল্যের দিকটিও উল্লেখ করেন।

মস্কো অধিবেশন শেষে দেশে ফিরে এলে বহু লোক তাঁর কাছে সোভিয়েট ইউনিয়ন সম্পর্কে তথ্যাদি জানতে আগ্রহী হয়। তিনি মৌখিকভাবে তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করলেও তাঁর এ ভ্রমণ কাহিনী যাতে দেশের সকল আগ্রহী পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে সেজন্য ‘সোভিয়েটের দিনগুলি’ নামে গ্রন্থ রচনায় হাত দেন। চারটি অধ্যায়ে এ ভ্রমণ কাহিনী লিখিত হয়েছে। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে।

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

দুই

লেখিকা ৬ই মার্চ পি.আই.এ. বোয়িং এ করে করাচী পৌঁছেন। করাচী থেকে ভোর ছ’টায় এরোফ্লোট যোগে তাসখন্দ হয়ে বেলা ৩টায় মস্কো বিমানবন্দরে এসে নামেন। নির্ধারিত তারিখের পরে আসায় অভ্যর্থনার পরই তাঁকে সরাসরি ক্রেমলিন প্রাসাদের অধিবেশনস্থলে এসে সকলের সংগে পরিচয় পর্ব সমাধা করতে হয়। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানী ডেলিগেট বেগম হাবিব রহিমতুল্লাহ আগেই সেখানে উপস্থিত হয়ে পাকিস্তানের পরিচয় দিয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় সংগীত গেয়ে শোনায় পাইওনিয়ার হাউসের শিশুর দল। সংগীত শেষে দেখানো হয় প্রসিদ্ধ রাশিয়ান ‘ব্যালে’ সোয়ান লেক। এছাড়াও প্রখ্যাত গায়ক গায়িকার কন্ঠে দেশের গান, মুক্তির গান, স্বাধীনতার গান, শরীর চর্চা ও কমিক দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে তাঁরা হোটেল ইউক্রিনায় ফিরে আসেন। ক্লান্তিতে আছন্ন থাকা সত্ত্বেও লেখিকা মস্কোকে দেখবার আগ্রহ নিবৃত্ত করতে পারেননি। রাত জেগে হোটেল থেকে যতদূর দেখা যায় সেসব চোখ ভরে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন।

৮ই মার্চ সকালে ইনস্টিটিউট অব এশিয়ার বাংলা ভাষাতত্ত্ববিদ ডঃ বিকোভার সাথে তাঁর পরিচয় হয়। মিসেস বিকোভার সানন্দ আন্তরিকতা, ছিপছিপে গড়ন ও সাদাসিধে ধরণ লেখিকার ভালো লেগেছিল। মস্কোর অধিবেশনে ৮৫টি দেশের ২০০ জন মহিলার উপস্থিতি এবং স্থানীয় আরও অনেকে মিলে বহু জনের সমাগমেও কোথাও কোন বিশৃংখল ঘটনা ঘটেনি সেখানে।

ডিনারে, লাঞ্চে, বিভিন্ন পার্টিতে অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রুশরা সুষ্ঠু নিয়মের মধ্যে চলাফেরা করে বলে কোথাও কোন গোলমাল নেই সেদেশে। ফ্রেন্ডশীপ হাউসের অধিবেশনে ৮৫টি দেশের মহিলা প্রতিনিধিদের মধ্যে অনেকেই স্বদেশের হয়ে বক্তব্য রাখেন। উল্কিচিহ্ন আঁকা আফ্রিকান মহিলাদের ঋজু ভঙ্গি তাঁর ভালো লেগেছিল। আসর শেষে লাঞ্চের পর প্রত্যেকটি দেশের ডেলিগেটরাই এক একটি রুশ পরিবারের আতিথ্য গ্রহণ করেন।

৯ই মার্চের আসরে মহিলা নেত্রী নীনা পাপোভা পূর্ব পাকিস্তানের কবি ও সমাজসেবিকা সুফিয়া কামালকে অধিবেশনের শেষদিনে বক্তব্য রাখার জন্য অনুরোধ জানান। ঐদিন লাঞ্চের পর ফ্রেন্ডশীপ হলে ভিয়েনাম ফিলাশো স্লাইডে দেখানো হয় স্বাধীনতার জন্য ভিয়েতনামের মা বোন ভাই পিতার সংঘবদ্ধ সংগ্রাম। সন্ধ্যায় মস্কোর রিসেপশন হলে সমস্ত ডেলিগেটদের রিসেপশন দেয়া হয় ষ্টেট এর তরফ থেকে। এ অনুষ্ঠানে কিছু পুরুষও উপস্থিত ছিলেন। জমজমাট আসরের স্বতঃস্ফুর্ততা ছিল আনন্দদায়ক।

ফ্রেন্ডশীপ হাউসে অধিবেশনের প্রথমভাগে অনেকেই বক্তব্য রাখেন। তাঁরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব দেশের সংগ্রামে নারীদের আত্মনিয়োগ ও ত্যাগের কাহিনী বর্ণনা করেন। ১০ই মার্চ আসরের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন মহাকাশচারিণী ভ্যালেনটিনা তেরেশকোভা; আর তাঁর অনায়াস আকাশ ভ্রমণ, মহাশূণ্যের দৃশ্যাবলী এবং অভিজ্ঞতার কথা। লেখিকা তাঁর সাথে পরিচিত হতে পেরে আনন্দে উচ্ছল হয়ে ওঠেন।

লাঞ্চের পর পাকিস্তান দূতাবাসে গিয়ে সালমান আহমদ আলী (এ্যামবাসাডর) ও বেগম হাবিব রহিমতুল্লাহর সাথে তাঁর নানা কথা হয়। জনাব সালমান আলী তাঁকে আসরের বক্তব্যে পাকিস্তানের দুই অংশের কথাই বলবার জন্য পরামর্শ দেন। বিকেলের আসরে সঙ্গীত এবং ‘ব্যালে’ পরিবেশিত হয়।

১১ তারিখ অধিবেশনের শুরুতে হল্যান্ড, পোল্যান্ড, আরব রিপাবলিক, সউদী আরব ও ইরানের প্রতিনিধিরা তাঁদের মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখেন। আরবী ভাষার বক্তৃতা লেখিকাকে মুগ্ধ করেছিল। এ অধিবেশনে লেখিকা তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানের নানা উন্নয়মুখী কর্মকান্ডের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রভৃতি বিষয় এবং নারীজাগরণের অগ্রদূতী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের নাম উল্লেখ করেন।

তিনি মাতৃভাষা বাংলায় পেশ করেছিলেন তাঁর বক্তব্য। প্রোগ্রাম শেষে হোটেলে ফেরার পর সোভিয়েট-পাকিস্তান সমিতির সেক্রেটারী কাতায়েভ এবং ওখানকার বাংলা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক দানিলচুক এবং আরও কয়েকজন শিক্ষাবিদদের সংগে তাঁর দেখা হয়। জালাল এবং জলিও (লেখিকার পরিচিত) ছিল তাদের সাথে। রাত ১০টায় লেনিনগ্রাদের ট্রেন থাকায় তিনি কিছুটা তাড়াহুড়ো করে জলি ও জালালকে নিয়ে তাদের ইউনিভার্সিটি দেখতে যান মেট্রোতে চেপে। সেখানে গিয়ে বহুদিন পর বাঙ্গালী খাবার খেয়ে খুশী হন।

পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, সিলোন, ইরান, বুলগেরিয়া এই পাঁচ দল যাচ্ছে লেনিনগ্রাদ ও জর্জিয়া। বাকীরা যাচ্ছে অন্যান্য জায়গায়। সারারাত বরফের মধ্যে দিয়ে ট্রেনে চেপে সকাল ৮টায় লেনিনগ্রাদ পৌঁছলে মহিলারা তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে হোটেলে নিয়ে যান। সেখানে অন্যান্য দলের সবাই এসে পৌঁছালে ২৫০ জন মহিলা একত্রে ব্রেকফাটে বসেন।

আলাপ আলোচনায় মহিলা দিবসের প্রসঙ্গটি প্রাধান্য পায়। চেয়ারম্যান মাদাম আন্নাবাইকোভার আপ্যায়ন ও অমায়িক ব্যবহার প্রত্যেককে মুগ্ধ করেছিল। ওখান থেকেই এক চক্কর শহর দেখবার ব্যবস্থা হওয়ায় তাঁরা সুন্দর রাস্তা, অনেক মনুমেন্ট, লেনিন এর মূর্তি ও বিভিন্ন বাড়ী-ঘর দেখে প্রচন্ড বরফ পড়তে শুরু করায় হোটেলে ফিরে আসেন।

সন্ধ্যা ৭টায় ছিল মারিনেস্কি থিয়েটার-কীরোড অপেরা হাউসে ব্যালে দেখবার প্রোগাম। অপূর্ব ব্যালে এবং হলঘরের সৌন্দর্য ডেলিগেটদের অভিভূত করে। পরদিন সকালে তাঁরা যান মেয়েদের পরিচালিত একটি কাপড়ের মিল দেখতে। মিল ঘুরে লাঞ্চের পর তাঁরা আসেন স্খলনে প্যালেস-এ। ইটালিয়ান ভাস্কর্য মন্ডিত বিরাট স্মলনে প্যালেস এ লেনিনের বাসগৃহ রয়েছে। এছাড়াও এ প্যালেস বিপ্লবের নানা ইতিহাসের সংগে জড়িত।

স্মলনে থেকে তাঁরা সন্ধ্যায় বিপ্লব-পূর্ব স্থাপত্য এবং মুসলিম প্রভাব সম্পন্ন ফ্রেন্ডশীপ হাউসে আসেন। ফ্রেন্ডশীপ হাউসের ডিনার এবং নাচ গান ছিল আনন্দদায়ক। ডেপুটি মেয়র মাদাম কাইকোভা তাঁদের সম্বর্ধনা জানিয়েছিলেন, আলোচনা সভায় তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কিত নানা বিষয় দেশ, ভাষা প্রকৃতি, আবহাওয়া এবং জীবন-যাপনের ঘরোয়া ব্যাপারও জানতে চেয়েছিলেন।

রুশ দেশীয় ঐতিহ্যের প্রধান কেন্দ্র লেনিনগ্রাদে দেখবার মত প্রচুর জিনিস রয়েছে। স্মলনে প্যালেস, হারমিটেজ, সমাধি ক্ষেত্র, মর্মর মূর্তি, ক্যাথিড্রাল, উইন্টার প্যালেস, এসেম্বলি হাউস, আর্টস বিল্ডিং ত্রিয়োভস্কি প্যালেস, রাষ্ট্রাল প্যালেস, নেভা নদীর উপর ছয়শো সেতু, ২৫০ টা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রভৃতি দেখলে মনে হয় সাজানো ছবির মেলা। শুধুমাত্র লেনিনগ্রাদে ২ হাজার ডাক্তার, ১৭ হাজার শিক্ষিকা এবং ২৫ হাজার ছাত্র আছে ইউনিভার্সিটিতে। সমগ্র লেনিনগ্রাদে ষাট লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষা লাভ করছে।

সময়ের স্বল্পতায় লেখিকা সেখানকার দর্শনীয় স্থাগুলো পলকমাত্র পরিদর্শনের সুযোগ পান। বিরাট সংগ্রহশালা হারমিটেজে পৃথিবীর যাবতীয় দুষ্প্রাপ্য জিনিস, ৭ ফুট উঁচু পিটার দি গ্রেট -এর মূর্তি, ভলতেয়ারের অপূর্ব মর্মর মূর্তি (১৭৮১ সনে স্থাপিত), হল প্যালেস স্কোয়ার, উইন্টার প্যালেস, আলেকজান্দার কলাম-৪৯ মিটার উঁচু ৬ শত টন ভারী, পোলান্ড যুদ্ধের জয়স্তম্ভ, অরোরা ক্রুজার, জারের সমাধি, ত্রিয়োভস্কি প্যালেস, ম্যাক্সিম গোর্কীর সমাধি প্রভৃতি লেখিকাকে মুগ্ধ করেছিল।

১৪ মার্চ রাত ২টায় তাঁরা জর্জিয়া পৌঁছান। অভ্যর্থনার পর তাঁদের ভিবলিসি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন শহর ঘুরতে বেরিয়ে তাঁরা শহীদ স্মরণে মনুমেন্ট, অনির্বাণ অগ্নিশিখা, রূপালী মসজিদ, গার্ডেন অব হিরো, বীরদের মর্মর মূর্তি, প্যালেস অব স্পর্টস, প্রাচীন কবর স্থান, মেয়েদের পরিচালিত বিস্কুট, মিষ্টি চকোলেট ও টফি তৈরীর কারখানা প্রভৃতি পরিদর্শন করে হোটেলে ফিরে আসেন।

বিকেলে পুরানো জর্জিয়া মুন্সনেভাতে গিয়ে প্রেত্রাকের নকশাখচিত একটি গীর্জা দেখেন তাঁরা। সন্ধ্যায় ১০৫ বছরের এক বৃদ্ধের তৈরী বাগানে গিয়ে লেখিকা অভিভূত হন তার সংগ্রহ দেখে। তাসখন্দের খাবার মান তুলনামূলকভাবে মস্কো ও লেনিনগ্রাদের চেয়ে ভালো ছিল বলে প্রতিনিধিরা সবাই খুশী হয়েছিলেন।

হোটেলে ফিরে লেখিকা পাকিস্তানী এ্যামবেস্যাডর সলমন আলীর ফোনে জানতে পারেন সোভিয়েট-পাকিস্তান মৈত্রী সমিতির প্রেসিডেন্ট ডঃ সিদারেঙ্কো তাঁকে জর্জিয়া থেকে মস্কো ফেরার পর আরও তিনদিন থেকে যাবার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

১৬ই মার্চ জর্জিয়ার তেলাবিব গ্রামের একজন মহিলা যিনি ডেলিগেট হিসেবে মস্কোর অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন, তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন প্রতিনিধিদের। সেখানে পাইওনিয়ার হাউসের ছেলেমেয়েদের উপস্থিতি এবং রান্নার অভিনব প্রক্রিয়া দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। সন্ধ্যায় তোলাবিষ থেকে ৫০ মাইল দূরে সেখানকার মিউনিসিপ্যালিটির মহিলা চেয়ারম্যানের বাড়ীতে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। পথে যেতে যেতে যাদুঘর, মদের কারখানা কারও বহু প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখে তাঁরা ডিনারে পৌঁছেন। রকমারী খাবারের সাথে নাচ-গান আনন্দ উচ্ছলতার ভেতর দিয়ে খাবার পর্ব শেষ করে তাঁরা হোটেলে ফিরে আসেন রাত ২টায়।

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

পরদিন গভর্ণর হাউসের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে মাদাম ভিক্টোরিয়া ইভাননা (মিনিষ্টার অব এডুকেশন) ডেলিগেটদের সম্বর্ধনা জানান। সেখান থেকে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে শিশুদের নানারকম শিক্ষাপদ্ধতি দেখে তাঁরা ফিরে আসেন লাঞ্চে। খাবারের পর সিটি মিউজিয়াম দেখবার প্রোগ্রাম।

মোগল যুগের প্রচুর নিদর্শন ছাড়াও সভ্যতার নানা ইতিহাস, ঐতিহ্য তারা সংরক্ষণ করে রেখেছে পরম যত্নে। আশ্চর্যের বিষয় লেখিকা সেখানে ঢাকাই চিরুনি, নরুন, আয়নাও দেখতে পেয়েছিলেন যা ঢাকায়ও দেখা যায় না। বিকেলে ৭৬০ ফুট উঁচু ককেসাস-এর এক চূড়ায় অবস্থিত মিনিস্ট্রি অব কাউন্সিলে যান তাঁরা। মাদাম কামাদা (কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট) প্রতিনিধিদের অভ্যর্থনা জানিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। নাচ গান নানারকম খাবার আলাপ-আলোচনা হাসি আনন্দ প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে প্রোগ্রাম শেষ হয়।

১৮ই মার্চ লেখিকা জর্জিয়া থেকে মস্কো ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে কো-অপারেটিভ মিনিস্টার তাঁকে স্বাগত জানিয়ে কো-অপারেটিভ হাউসে নিয়ে যান। মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত বিরাট রান্না বিভাগ পরিদর্শন করেন তিনি। বিকেলে ট্রেড ইউনিয়ন থেকে ফিরে পাকিস্তান এ্যামবেসির দ্বিতীয় সেক্রেটারী শেখ নাজিমউদ্দীনের আমন্ত্রণে পাক- ডেলিগেটসহ তাদের ইন্টারপ্রেটাররা সন্ধ্যা ৭টায় ডিনারে যোগ দেন। পরদিন মস্কোর এক ম্যারেজ হাউসে গিয়ে সেখানকার বিয়ে পদ্ধতি ও অন্যান্য কালচার প্রতিনিধিদলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

১৯শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী প্রতিনিধিসহ অন্যান্য ডেলিগেটরা যে যার দেশে চলে যাবার ফলে ঐদিনই লেখিকাকে পাক-সোভিয়েট মৈত্রী সমিতির আতিথ্য গ্রহণ করতে হয়। লাঞ্চের পর নতুন দোভাষী নিকোলাই ও জলিকে নিয়ে তিনি লেনিন লাইব্রেরী, পুশকিন লাইব্রেরী, জারের কবর মস্কোর ঘন্টা, ক্রেমলিন-এর বাইরে রেড স্কোয়ার প্রভৃতি দেখে হোটেলে ফিরে আসেন।

২০শে মার্চ সকালে ফ্রেন্ডশীপ হাউসে পৌঁছালে নীনা পাপোভার সেক্রেটারী মিঃ দানিলভ ও মিঃ ইভানভ (নীনা পাপোভার সমিতির সহ-সভাপতি) লেখিকার সংগে ঘরোয়া আলোচনায় মিলিত হন। এদিকে বৈরুত সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে ইসলামাবাদ থেকে কোন খবর না আসায় লেখিকাকে বৈরুত যাবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

দুপুরে ফ্রেন্ডশীপ হাউসে লাঞ্চ সেরে বলশাই থিয়েটারে গিয়ে তিনি দিওয়ান-ই আম, দিওয়ান-ই খাস, শিশ মহল ও লাহোরের শালিমার বাগ-এর সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পান। মোগল কারুকার্যের সূক্ষ্মতা ও রুচিশীলতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সন্ধ্যায় থিয়েটার প্রোগ্রামে পুরোনো আমলের একটি জলদস্যুর গল্পের অভিনয় দেখান রুশ শিল্পীরা। সেখানে প্রসিদ্ধ নৃত্যশিল্পী ইন্দ্রানী রহমানের সাথে তাঁর পরিচয় হয়।

২১শে মার্চ ফ্রেডশীপ হাউসে রাজনীতিবিদদের সংগে আলোচনায় পাকিস্তানের প্রসঙ্গ বেশী করে আসে। পাকিস্তানী খাবার, পোশাক প্রভৃতি বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পায়। ফ্রেন্ডশীপ হাউস থেকে তিনি যান ইন্সটিটিউট অব এশিয়ায়। সেখানে বহু পণ্ডিত ব্যক্তির সংগে তাঁর পরিচয় হয়। এদের মধ্যে ইন্সটিটিউট অব এশিয়ার পাকিস্তান বিভাগের প্রধান ও পাক-সোভিয়েট মৈত্রী সমিতির সহ-সভাপতি অধ্যাপক ইউ বি.ডি. গানকোভস্কি, ডঃ ভস্কালিয়েভ, ডঃ পলোস্কায়া, ডঃ বায়ানত, প্রফেসর মস্কালিয়াস্কো, মাদাম শেরকোলিনা, মাদাম বিকোবা, মিঃ দানিলভ উল্লেখযোগ্য।

সন্ধ্যা ৬টায় ২৩শে মার্চের উৎসব ও ঈদ-উজজোহা উপলক্ষে প্রোগ্রাম ছিল ফ্রেন্ডশীপ হাউসে। বিরাট আয়োজন করেছে তারা। পাক দূতাবাসের সবাই এবং সোভিয়েটের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে জমে উঠেছিল আসর। কবি হিসেবে লেখিকাকে তাঁরা আপ্যায়িত করেন বিশেষ মর্যাদায় অনুষ্ঠান শেষে ডঃ সিদারেঙ্কো পাকিস্তানী আতিথেয়তার প্রশংসা করে তাকে মূল্যবান ফুল উপহার 1 দেন। দেশের প্রশংসা অন্যের মুখে শুনে খুশী হয়ে ওঠে লেখিকার মন।

রাতে হোটেলে ফিরে মাদাম বিকোবা, রনজিৎ বসু, ডঃ শান্তি রায়কে ফোন করে ২২শে মার্চ সকালে দেশে ফিরবার কথা জানিয়ে তাদের তিনি বিদায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। ২২শে মার্চ ভোরে তিনি জালাল এবং জলিকে নিয়ে রাশিয়ার বিখ্যাত দোকান ‘গুম’ ঘুরে হোটেলে ফিরে এসেই দেখতে পান মাদাম বিকোবা, কাতায়েভ, নীনা, ডঃ দানিলচুক, নিকোলাই এরা সবাই এসেছে। পাসপোর্ট এবং টিকিট পেয়ে তিনি তক্ষুনি সবাইকে নিয়ে এয়ারপোর্টে চলে আসেন।

বিমান বন্দরে জলি ও জালালসহ সবাইকে বিদায় শুভেচ্ছা জানিয়ে মস্কো সময় ৯টার এরোফ্লোটে চেপে তেহরান-এর মেহেরাবাদ হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

তিন

সুফিয়া কামাল স্বদেশের বহু জায়গা ঘুরে দেখবার সুযোগ পেলেও দেশের বাইরে যাওয়া তাঁর এটাই প্রথম। লোকমুখে তিনি সোভিয়েট দেশ সম্পর্কে নানা কাহিনী শুনেছেন, তবে স্বচক্ষে দেখবার অভিজ্ঞতা তাঁর এবারই নতুন। সোভিয়েট ইউনিয়ন ঘুরে তিনি সেদেশ সম্পর্কে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেদেশের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ও পাকিস্তানের সাথে রাশিয়ার তুলনামূলক আলোচনায় দু’দেশের মধ্যে সামঞ্জস্য ও তফাগুলো তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে তুলে ধরেন।

সোভিয়েট দেশে গিয়ে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে নিয়েছিলেন কবি, সাহিত্যিকরা সেখানে সর্বজনপ্রিয় এবং সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কারণ কবি এবং সমাজসেবিকার পরিচয় পেতেই তাঁরা লেখিকাকে প্রবল আগ্রহে ঘিরে ধরে এবং তাঁর দু’এক লাইন হাতের লেখা পাবার জন্য অধীর হয়ে ওঠে।

ঈস্ট পাকিস্তান- এই কথাটি আর কবি ও সামাজসেবিকা বলে আমার পরিচয় দেওয়াতে অত অল্প সময়ের মধ্যেই এতজন আমাকে আদরে আপ্যায়নে এমন আন্তরিকতার সাথে কাছে টেনে নিলেন যে আমি যে কবি এবং কবি যে সর্বজনপ্রিয় এবং সম্মানিত সে যেন নতুন করে জানলাম। কেউ বলে তোমার ভাষায় নাম লিখে দাও, কেউ বলে দু’লাইন বাংলা কবিতা লিখে দাও। আল্লাহর কাছে শোকর করি, ২দিনের প্লেন জার্নির ধকলেও মাথাটা ঠিক রেখেছিলেন। আর বারবার মনে পড়ছিল। শাহাবুদ্দীনকে ছেলেটা ভাগ্যিস বাক্সভর্তি কার্ড ছাপিয়ে দিয়েছিল, তাই রক্ষা। সবাইকে দিয়ে রেহাই গেলাম। ৫টায় এই পরিস্থিতির শেষ হল। ২

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের সম্মান এবং দেশপ্রেম সম্পর্কিত প্রতীক রক্ষা করা সোভিয়েট দেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেশে এমনটি তাঁর চোখে পড়েনি বলে আহত কণ্ঠে তিনি বলেছেন-

গুণীকে সম্মান দান ও দেশভক্তির প্রতীক রক্ষাই হয়ত সোভিয়েটের ধর্ম। দেয়াল জোড়া ডবল কাঁচের জানালা দিয়ে সে দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল, নজরুল, বেগম রোকেয়াকে আমরা কোথায় রেখেছি! স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদ দেশভক্ত সন্তানদের স্মৃতি আমাদের কোথায় ? ভাষা আন্দোলনের মা-বোন- বধূরা আছে ? তাঁরা কারা ? এসব কি আমাদের ইতিহাসে থাকবে ৩

সোভিয়েট ইউনিয়নে কোন নিরক্ষর মানুষ তাঁর চোখে পড়েনি। রাষ্ট্র পরিচালিত সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রসার সর্বত্রই তিনি দেখতে পেয়েছেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, সেদেশের প্রায় প্রত্যেকটি নাগরিকই বই পড়তে আগ্রহী। লেখক ও বৈজ্ঞানিকদের কদর সেখানে সবচেয়ে বেশী।

সে দেশ কবি-সাহিত্যিকদের কদর জানে। লেখক আর পাঠকের মধ্যে এমন নিবিড় সম্পর্ক বোধ হয় আর কোন দেশেই নেই। নিরক্ষরতা নেই বলে পাঠকের সংখ্যা খুব বেশী বলা যায়, সারা দেশ জুড়েই তাদের পাঠক। এক একটি বই ছাপা হচ্ছে লাখ লাখ কপি; আর সে যদি ইয়েভতুসেনকার কবিতা হয়, তা হলেত কথাই নেই; সব কপিই মুহূর্তে নিঃশেষ। শুনলাম সোভিয়েট সমাজে লেখকেরা ও বৈজ্ঞানিকেরা সবচেয়ে বেশী মর্যদার অধিকারী। আর্থিক দিক থেকেও তাঁরা সবচেয়ে বেশী সচ্ছল। আর সে তুলনায় অনেক পশ্চিমী দেশে আজও লেখকেরা খ্যাতি অর্জন করেও আর্থিক দিক থেকে প্রয়োজনমত সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেন না । ৪

লেখিকা লক্ষ্য করেছিলেন সাম্যের দেশ সোভিয়েটে কোন শ্রেণীবৈষম্য নেই। দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ হিসেবে শিশুরা সেখানে সবচেয়ে বেশী কাঙ্খিত ও আদরণীয়। অধিক সন্তানের মায়েরা সেদেশে সবচেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী। এক কথায় রাষ্ট্রীয় সুব্যবস্থার ফলে রুশবাসীরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সার্বিক বিকাশে যথার্থ পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে।
পাইওনিয়ার হাউস। শত শত শিশুর সুন্দর স্বাস্থ্যোজ্জ্বল মুখের হাসিতে উদ্ভাসিত।

শ্রেণীভেদ নেই, ধনী-দরিদ্র মধ্যবিত্ত বলে কোন বর্ণ-বিভেদ নেই। সকল মায়ের সব সন্তান এখানে একত্রিত। ফুলের মত শত শত শিশু এখানে শিক্ষালাভ করছে, স্বাস্থ্য অর্জন করছে, সাম্য-ঐক্য-স্বাধীনতা-শান্তির মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। শিশুরা এখানে প্রকৃতির আশীর্বাদের মত; যে মা যত বেশী সন্তানের জননী হয়েছেন তাঁর মর্যাদা তত বেশী। তাঁকে সন্তানসহ যথাযোগ্য ভাতা দিয়ে প্রচুর অবসর দেয়া হয় স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য ।

সোভিয়েটবাসীর একাগ্রতা, নিষ্ঠা ও সাধনা লেখিকাকে মুগ্ধ করেছিল। শুধুমাত্র কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমেই তাঁরা আজ শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সকলের চেয়ে বড় এবং উন্নত জাতি। নিরন্তর ত্যাগে ও শ্রমে নিজের দেশকে তাঁরা তুলে ধরতে পেরেছে বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে। তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন তাদের এই ব্যাপক উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে রয়েছে সেদেশের নারী জাতির অবদান। দেশপ্রেমে সেখানকার নারী-পুরুষ সমভাবে নিয়োজিত। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে তিনি এইরূপ সমতা আশা করেন।

সেখানকার লোকদের মহান দেশপ্রেমমূলক কর্যকলাপ দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিশেষ করে মেয়েদের যে শক্তিময়ী রূপ রাশিয়ায় দেখলাম তা অভূতপূর্ব। আমরা মস্কো থেকে লেনিনগ্রাদ তিবলিসি ঘুরে এলাম। দেখলাম মেয়েদের হাতে মিল, ফ্যাক্টরী, কারখানা, ট্রেড ইউনিয়ন, কো-অপারেটিভ কর্মসংস্থা সমস্তই আশ্চর্য শৃঙ্খলার সংগে পরিচালিত হচ্ছে।

সোভিয়েট ইউনিয়নে মহিলাদের যে কর্মক্ষমতা, স্বাধিকারবোধ ও আত্মচেতনা দেখতে পেয়েছি তাতে আমি খুব চমৎকৃত হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, সোভিয়েট মেয়েদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং তাদের পথ অনুসরণ করে আমাদের মত অনুন্নত দেশগুলির মেয়েরাও একদিন সারা বিশ্বে গৌরবের স্থান পাবে। ৬

সোভিয়েট দেশের যে বৈশিষ্ট্যটি লেখিকার চোখে বিশেষভাবে ধরা পড়েছিল সেটি; সেদেশের নারীর সম্মান, অধিকার ও মর্যাদাবোধ। সেদেশের সর্বত্রই তিনি দেখতে পেয়েছেন নারীরা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রনী ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক নারী বিদস উপলক্ষে তাদের জানানো হচ্ছে বিশেষ অভিনন্দন। স্বদেশ ভাবনায় লেখিকা পাকিস্তানী নারীর অবস্থানকে রুশ নারীর অবস্থানে উন্নীত করবার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন-

সারা দুনিয়ার মেয়েদের জন্য এই আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসটি স্মরণীয় হওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের দেশের ক’জন মা-বোনই বা এ খবরটি রাখেন- ক’জন পুরুষ-বা এ দিনটিতে তাদের মাকে, বোনকে, স্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, উপহার দিচ্ছেন ? আমি রাশিয়ায় দেখে এলাম ৮ই মার্চ পুরুষেরা কিভাবে মেয়েদের সম্মান জানান।

তারা এগিয়ে এসে কর্মরতা মহিলাদের সাহায্য করেন, অনেক সময় তাদেরকে বিশ্রাম নিতে দিয়ে নিজেরা সে কাজ সেরে নেন-এমনকি রান্না-বান্নার কাজও। তাছাড়া, ফুল আর হরেক রকম উপহার তো আছেই। আমি আশা করি, আগামীতে আমাদের মেয়ে-পুরুষেরা এই দিনটি সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। ৭

সোভিয়েট রাষ্ট্র মা ও শিশুর প্রতি সবচেয়ে বেশী মনোযোগী। মা ও শিশুর সার্বিক বিকাশে যাবতীয় গুরুত্ব প্রদান সে দেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেখানে মায়েদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা আছে। শিশু প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীরা মায়ের আদর্শে বাচ্চাদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে, বড় করে তোলে। সোভিয়েট সরকার মনে করে জাতির ভবিষ্যৎ হিসেবে শিশুকে যোগ্য করে তুলবার ব্যাপারে মায়েদের ভূমিকা অগ্রণীর আর তাই মাকেও তারা দেন অসীম মর্যাদা। স্বদেশের কথায় লেখিকা আক্ষেপ করে বলেছেন-

মস্কো থেকে লেনিনগ্রাদ, সেখান থেকে জর্জিয়া, তিবিলিসির শহরে-গ্রামে যেখানেই গেলাম নারীদের কর্মতৎপরতায়, সেবা-সৌকর্যে, শান্তি-সুশৃংখলায় পরিচালিত হচ্ছে সে বিরাট দেশের শিশু প্রতিষ্ঠানগুলি। সর্বত্র মায়েদের মর্যাদা অসীম। চারটি সন্তানের মাতা সেখানে স্টেট পেনশন প্রাপ্ত হয়। আমাদের এখানে মেটারনিটি লীভ বড় জোর ৩মাসের, ওখানে ৬মাস থেকে ১ বৎসর পর্যন্ত। শিশুর ভার রাষ্ট্র বহন করে। তাদের শিক্ষা-দীক্ষা খাওয়া পরা স্বাস্থ্যরক্ষার ভার জীবন যাপন পন্থা সমস্তই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উঁচু-নিচু ভেদ নেই, ইসলামের আদর্শেই এরা প্রতিষ্ঠা করেছে সাম্য মৈত্রী। আর আমরা কী করছি। ৮

সোভিয়েট দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের তৎপরতা ও সংখ্যাধিকা তাঁর চোখে পড়েছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান তাঁকে বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের নারীস্থানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

মায়েরা বোনেরা মেয়েরা সন্তান ভাই স্বামীর সহযোগিতায় সংসার সমাজ দেশ জাতিকে কী করে উন্নত মহান সাম্য ও শান্তির পথে চালিত করছে তা বিস্ময়কর। রাষ্ট্র পরিচালনায় নারী এগিয়ে এসেছে জ্ঞানে- বিজ্ঞানে, দর্শনে, সেবায়, মিল-ফ্যাক্টরি-কারখানা কো অপারেটিভ-ট্রেড ইউনিয়ন- সর্বস্থানে। তাদের দাওয়াত রক্ষা করতে গিয়ে বেগম রোকেয়ার কথাই মনে হল। তাঁরই স্বপ্নের সৃষ্টি এ নারীস্থান সত্যিই বাস্তবায়িত হয়েছে- হোক না সে পৃথিবীর যে কোনই দেশে, যে কোন জাতির মধ্যে রুশদের আর একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখে পড়েছিল; সেটি সেদেশের মানুষের শৃংখলা ও কর্তব্যবোধ।

আতিথেয়তায়ও তাঁরা প্রশংসার দাবী রাখে। আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মেলনের মত বিরাট আয়োজনেও লেখিকা কিছুমাত্র বিশৃংখলা দেখতে পাননি। তাদের সুষ্ঠু ও সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে করেছে সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণ। সেদেশে আগত অতিথিদের সুবিধার্থে সব অনুষ্ঠানেই তারা স্ব-স্ব দেশের ছোট ছোট পতাকা ব্যবহার করেন। এতে প্রতিনিধিরা সহজেই বুঝতে পারেন কার কোথায় যেতে হবে। স্বদেশ ভাবনায় লেখিকা রুশ নিয়মাদর্শের মত অনুকরণীয় আদর্শের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি এরা রাখছে না, অপূর্ব আত্মীয়তার ভাব নিয়ে সুখ সুবিধা আরাম আনন্দের উপাদান জুগিয়ে চলেছে। ২০০ মহিলা, তাদের ইন্টারপ্রেটার, দেখা শোনার জন্য মহিলা, বাইরের স্থানীয় মহিলাদের আনাগোনা অভ্যর্থনা সবকিছু সুচারু সুষ্ঠুভাবে আন্তরিকতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে- এ ও তো একটা দেখবার মত জিনিস বলে আমার মনে হল।

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

আমাদের ছোট বেলায় দেখেছি নওয়াব বাড়ীর সুবৃহৎ পরিবার একান্নে প্রতিপালিত হচ্ছে। সে তো বাঁদী-গোলাম বাবুরচি-খানসামা-মেট- মশালচির হাতের সাহায্যে। এখানে সমস্ত কিছুই শিক্ষিতা সুরূপা সুবেশী মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত। মনটা ভরে ওঠে। সাধ হয় প্রার্থনা জাগেঃ আমরা, আমাদের দেশও যেন এমনি হয় ! ১০

রুশদের সংগ্রহ, সৌন্দর্যবোধ ও সাধনায় এক ভিন্নধর্মী আবেদন পরিলক্ষিত হয়। লেখিকা সেদেশের যেখানেই গিয়েছেন দর্শনীয় স্থানগুলোতে দেখতে পেয়েছেন তাদের রুচিবোধের অপূর্ব শিল্প সৌকর্য। পুরাকালের শিল্প নিদর্শন ও সভ্যতাকে আগলে রাখা রুশদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। চিত্রকলায়, সংগীতে, সাহিত্যে, নৃত্যে, অভিনয়ে অর্থাৎ কলানৈপুণ্যের প্রতিটি শাখায় তারা পুরাতনকে সম্পৃক্ত করে রেখেছে।

লেনিনগ্রাদ সিম্ফনি, ককেশিয়ান নাচ, ইউক্রেনিয়ান নাচ, রাশিয়ান নাচ-সবই দেখানো হলো। এক এক দেশের জাতীয় পোশাক, দেশের ঐতিহ্য, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক একটি নাচের অভিব্যক্তি সেই কত যুগ আগের কাপড় অলঙ্কার হাব-ভাব চরিত্র এঁরা নিপুণভাবে ফুটিয়ে পরিবেশন করলেন। ১১

সবচেয়ে দেখাবার জিনিস ছবিগুলি। সভ্যাতাও আজকের নয়। মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি প্রজ্ঞায় উজ্জ্বল বিভাসিত এক একটি কাল। উত্থান পতন গৌরব হৃতমান এই নিয়ে কালচক্রের আবর্তন বিবর্তন কী অদ্ভুত। মানুষের শক্তি সাধ্য সাধ সাধনায় আশা-আকাঙ্খায় গড়ে ওঠে সভ্যতা।

মহাকালের ভ্রূকুটিকুটিল নেত্রপাতে কঠোর কালের হাতে আবার তার অবসান। কী যে আশ্চর্য! দেখে দেখে আমার মনে হল দিল্লী আগ্রা লক্ষৌ ফতেপুরসিক্রি লাহোর হায়দরাবাদ মূলতান পোশোয়ার এর মুসলিম ভাস্কর্য ঐশ্বর্যের কথা। এখানেও মুসলিম কালচারের প্রাধান্য। আমাদের বাংলাদেশ ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, চাটগা-র পুরাতন ঐতিহ্য কি কোথাও কম ? কিন্তু এত সুন্দর সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা অনেক জায়গায় শিথিল । ১২

তিনি লক্ষ্য করেছিলেন রুশদের জানবার আগ্রহ প্রবল। প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি দিকগুলো জেনে নিতে তাদের কোন ক্লান্তি নেই। সঠিক তথ্যটি জেনে নেয়া তাদের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তান সম্পর্কে বহু তথ্য তারা লেখিকার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।

সুনিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রুশরা সবাই সন্তুষ্ট। লেনিনের প্রতি তাদের রয়েছে অকুণ্ঠ ভক্তি শ্রদ্ধা। ষ্ট্যালিনের কোন চিহ্ন কোথাও তিনি দেখতে পাননি। লেনিনের প্রতিমূর্তি পথে পার্কে সব জায়গায় তাঁর নজরে পড়েছিল। মহান নেতা লেনিনকে তারা জীবনের আদর্শ হিসেবে জানে।

রুশ দেশের খাবার লেখিকার পছন্দ হয়নি। তারা সাধারণত সেদ্ধ খাবার খায়। পানির পরিবর্তে তারা মদ পান করে। মাংস রুটি মদ ফলমূল তাদের প্রধান খাবার। পাকিস্তানের সাথে যা একেবারেই মেলে না। পাকিস্তানীরা ভাত এবং মাছই বেশী পছন্দ করে।

মাখন রুটি পনির ডিম মাছ গোশত সব কিছুই ছিল। সিদ্ধ! আর ছিল বোতলভরা আধসের আন্দাজ দই। পানির বদলে ভদকা, শ্যামপেন, কনিয়াক। আমি আর সিলোনী মেয়ে মাঠিলডা প্রায় নিরামিষাশী। পানি চাওয়ায় এক গ্লাস গরম পানি এসে পড়ল দেখে কান্না পেল। পরে বুঝিয়ে বলাতে প্রতি বেলা প্রতিদিন ঠান্ডা পানি পেতে আর বলতে হয়নি। ১৩

তবে খাবারের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে সোভিয়েট রাষ্ট্র খুব সচেতন। সোভিয়েটের খাদ্য কারখানাগুলোর যেটাতেই তিনি গিয়েছেন লক্ষ্য করেছেন আশ্চর্য সচেতনতা। প্রতিটি কর্মী সেদেশে প্রতিটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে সচেতন। তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন খাদ্য সামগ্রীগুলোতে তারা কোথাও কোন হাতের ছোঁয়া লাগায় না। ঝক্‌ঝকে মেশিনের সাহায্যে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রতিটি সামগ্রী প্রস্তুত হয়ে আসে। এমনকি কেউ কারখানা পরিদর্শনে এলে তাদেরকে বিশেষ এ্যাপ্রন পরে ভিতরে ঢুকতে দেয়া হয়।

মেয়েদের পরিচালিত বিসকুট মিষ্টি চকোলেট টফি তৈরীর কারখানায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। তেতলায় উঠে কোট ও স্কার্ফ খুলে রেখে ওদের দেওয়া সাদা ওভারঅল পরে ভিতরে ঢুকতে দিল বিরাট ব্যাপার। প্রকান্ড মেশিন থেকে টফি লজেঞ্জ -এর ঘন খামির বের হয়ে আসছে, দস্তানা পরা হাতে গরম গরম সেই খামির মেয়েরা ঠেলে অন্য মেশিনের মুখে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তা আবার অন্য দিক দিয়ে টফি হয়ে বের হয়ে আসছে, সাথে সাথে তা কাগজে প্যাক হয়ে নিচের বড় ড্রাম ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। ১৪

সোভিয়েট দেশের বিয়ে পদ্ধতির সাথে লেখিকা স্বদেশের ইসলামী প্রথার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। বর- কনের সম্মতিক্রমে বিয়ে রেজিস্ট্রি করা হয় সেদেশে। বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে।

সকালে গেলাম এখানকার ম্যারেজ হাউসে। বিরাট বাড়ী। সেখানে কাপড় ফুল গয়না সেন্ট পাউডার সব পাওয়া যায়। দলে দলে বর-কনের দল ঢুকছে, কিনছে বা ভাড়াও নাকি পাওয়া যায়। কাপড় গয়নায় সেজেগুঁজে বর-কনে বরযাত্রীদল-সহ হল-এ আসে। রেজিস্ট্রার ও ম্যাজিষ্ট্রেট উপস্থিত আছেন, সবাই মহিলা। বর-কনে রেজিস্ট্রি খাতায় নাম সই করে। রেজিষ্ট্রারের সামনে আংটি পরানো হয়।

ম্যাজিষ্ট্রেট এসে বিয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে দেন- বাস বিয়ে হয়ে গেল। সবাই চুমু দেয় আর উপহার দেয়। আনন্দে সবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমরা ২টি বিয়ে দেখলাম। বেগম সাহেবা একটি মাথার কাটা উপহার দিলেন। আমি দিলাম ফুল। বর-কনের সম্মতি নিয়ে অনাড়ম্বর বিয়ে। ইসলামী প্রথাওত এই। তারপর হোটেলে গিয়ে রাতভর উৎসব আনন্দ করতে বাধা নেই। ১৫

রুশ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লেখিকাকে মুগ্ধ করেছিল। সেদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির সাথে তিনি স্বদেশের কিছু কিছু জায়গার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর বর্ণনা :

বিকেলে চা খেয়ে রওয়ানা হলাম মিনিস্ট্রি অব কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মাদাম কামাদার ওখানে। ৭৬০ ফুট উঁচু ককেসাস -এর এক চূড়ার উপরে এই মিনিস্ট্রি হল। যাবার পথের দৃশ্য কিছুটা আমাদের চাটগাঁয়ের উঁচু নীচু পাহাড়ী পথের মতো। চাটগাঁ সিলেটের মতো আঁকাবাঁকা পথের দু’পাশে শীতের সন্ধিভরা মাঠ। তারপর পথ পাহাড়ের গাঁ বেয়ে ঘুরে ঘুরে যেন মালাকন্দ হতে সোয়াত যাবার পথের মতো। বেশ ভালোই লাগছিল পথটির দৃশ্য। ১৬

শুধু সেদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেই নয়, রুশ নারীরূপের সৌন্দর্যও তাঁকে অভিভূত করেছিল। বিশেষ করে তাদের নজর কাড়া গায়ের রং সবারই মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ প্রসঙ্গে তার বর্ণনা :

অসংখ্য মহিলার ভিড়ে রাস্তা অপূর্ব শোভায় ভরে উঠেছে, কোট টুপি স্কার্ফ -এর রঙে। আনন্দ ও স্বাস্থ্য যেন মাখানো এদের গোলাপী গালের রঙে। সত্যিই স্বাস্থ্যবতী এদেশের মেয়েরা, আর বড় সুন্দর রঙের অধিকারিণী। নামতেই জনে জনে ফুল দিয়ে আলিঙ্গন করলেন। ১৭

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

সোভিয়েট দেশের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সাথে পাকিস্তানের কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও সময়ের দিক থেকে দু’দেশের মধ্যে রয়েছে তিন ঘন্টার ব্যবধান। পাকিস্তানের চেয়ে তিন ঘন্টা পেছনে চলে সোভিয়েট সময়। ঢাকা সময় যখন ১১টা ১৫মিনিট, মস্কোতে তখন বাজে ৯ টা।

আরও একটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চোখে পড়েছিল; রাশিয়ায় কোন টিপস্ দেবার রেওয়াজ নেই। আন্তরিক এবং স্বতঃস্ফুর্ত সাহায্যের বদলে কেউ পয়সা দিতে চাইলে তাঁরা সেটাকে অসম্মানজনক মনে করে।

রাশিয়ায় কোন টিপস্ দেবার দস্তুর নেই, ওটা ওরা অতিথিদের কাছ থেকে নেওয়া অপমানজনক মনে করে। ১৮

চার

সাহিত্যাঙ্গনে সুফিয়া কামালের অনুপ্রবেশ ঘটেছে কাব্যচর্চার মধ্যে দিয়ে। গদ্যরচনায় তিনি অনায়াস না হলেও অনাগ্রহী নন। ঠিক কবিতার ক্ষেত্রে যতখানি প্রাঞ্জল গদ্যরীতিতেও তার কাছাকাছি বলা যায়। আবেগ, সারল্য এবং মমতামিশ্রিত সহজ প্রকাশভঙ্গি তাঁর রচনাশৈলীর বৈশিষ্ট্য।

মানবতার প্রতি লেখিকার প্রতীতি ও শ্রদ্ধাবোধ গ্রন্থের বহু জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিন্তাকে অতিক্রম করে তাঁর চেতনা ও মূল্যবোধ সামগ্রিকভাবে মানবকল্যাণের দিকেই ধাবিত হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ভিনদেশে যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে নিয়ে নয় বরং সমগ্র দেশ ও জাতির সম্ভ্রম এবং মর্যাদার কথাই ভেবেছেন। স্বভাবজই মনে যখন দ্বিধার ছায়া পড়েছে তখনই তিনি আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ় হয়ে উঠেছেন। প্রত্যয়ের বলিষ্ঠতায় তিনি এগিয়ে গেছেন সমস্ত শঙ্কাকে এক পাশে ঠেলে রেখেই।

পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল কোমল বাংলা দেশের সমস্ত মা-বোন মেয়েদের তরফ থেকে এত সামান্য এত ক্ষুদ্র আমি যে যাচ্ছি, কতটুকু আমার শক্তি, কতটুকু সাধ্য। এযে কত বিপুল দায়িত্ব। বিরাট ভার। আল্লাহ আমাকে এ ভার বইতে দিলেন, আমার চেয়ে যোগ্যতর কারুর হাতে না দিয়ে একি আমি বইতে পারব ?

আমার দেশের মান-সম্মান সম্ভ্রম ইজ্জত, আমার দেশের সন্তানদের পরিচয় তাদের পথযাত্রার আলোরেখা কি আমি বয়ে নিতে পারব অচেনা অদেখা সেই দেশে ? এত গুরুভার যে এ যাত্রার, প্লেন ছাড়বার আগে তা অনুভব করতে, ভাবতে পারিনি- মনেই হয়নি। মনে মনে অল্লাহকে বল্লাম : তুমি আমার দেশের, তোমার দেওয়া শ্যামল কোমল বাংলার মেয়েজাতির ইজ্জত যেনো বজায় রেখো। ফিরে আসি বা না আসি বাংলার মেয়ে ভীরু নয়, ভীতু নয়, সংগ্রামে সাহসে সংকল্পে স্বদেশে বিদেশে তারা মাথা উঁচু করে চলতে জানে, এ প্রতীতি যেন ভূমি আমাকে দিয়ে ক্ষুণ্ন করোনা। ১৯

প্রকৃতির বহিরঙ্গ রূপ তাঁর সৌন্দর্যাভিসারী মনকে টেনে নিয়ে গেছে সৃষ্টির অপার রহস্যে। নিসর্গের অশেষ সৌন্দর্য দর্শনে তাঁর অতৃপ্ত আত্মার আর্তি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর রচনায়। বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
প্লেন চলেছে মস্কো। নিচে তুষারমণ্ডিত পর্বত শ্রেণী। হয়ত হিমালয়। আমি চেয়ে আছি। কত দেশ নগর যে বেড়ালাম আর এমনি চেয়ে চেয়ে কত দিন-রাত যে কেটে গেল! এ চোখের তৃষ্ণা আমার কখনও মিটল না ।

অনেকে তন্দ্রায় ঢুলে পড়েছেন। কেউ কেউ এয়ার সিকনেসের বড়ি খেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বেশ বাম্পিং ও হচ্ছে মাঝে মাঝে। আমার দু’চোখ ভরে এই না দেখা শোভা দেখছি। নদী- মাতৃক শ্যামল দেশের মেয়ে আমি এ শুভ্র তুষার গাত্রে আমার পূবের দেশের আলোক কণা বিচ্ছুরিত হচ্ছে নানা রঙ্গের রূপ রেখা হয়ে। মনে পড়ছে বিশ্ব কবির বন্দনা গীতি :

তোমার বিশাল বিপুল ভুবন

করেছ আমার নয়ন লোভন

গিরি পরি বন শ্যামল শোভন

তুমি ধন্য ধন্য হে। ”

তুমি ধন্য। আমিও ধন্য!

“আমারে তুমি অশেষ করেছ

এমনি লীলা তব। ”২০

জাগতিক জীবনের কোন বাধাই তাঁর শিল্পবোধকে বিপন্ন করতে পারেনি। অনুভবের স্বাভাবিকতার জন্যই তিনি অনিবার্য ভাবে রোম্যান্টিকতায় পর্যবসিত। ক্লান্তিতে ক্লেদে, বিষাদে অবসাদে, আনন্দে-বেদনায়, প্রাপ্তিতে-ক্ষতিতে যে কোন অবকাশেই তিনি রোম্যান্টিক। প্রকৃতির চিত্র এসেছে বার বার তাঁর লেখায় সৌন্দর্যের সহচর হয়ে।

অত রাত্রে আমি ত খেলাম না, আর অন্যেরা কেউ খেলেন কিনা জানিনা। যে যার কামরায় ঢুকে পড়েছেন। আমি ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে চেয়ে দেখলাম বাইরে লক্ষ আলোর মালা পরা ককেসাস পর্বতের নৈশ রূপ। কী যে দেখলাম। আল্লাহ্ যে আমার মতো অযোগ্যাকে কত সম্পদ দান করলেন! দু’চোখে যে কত সৌন্দর্যের সম্ভার মেলে দিলেন। স্তরে স্তরে বাড়ী-ঘর পথ স্তম্ভ। এক পাশে রিকোবা নদী, অপর পাশে উত্তুঙ্গ ককেসাস পর্বত। ছোট বেলায় কাহিনীতে শোনা। কোহকাহাফ মুল্লুক। পরীদের দেশ। রাতের বেলায় এ রূপ দেখে দেখে যেন আর চোখ ফেরাতে পারিনা। জানালার সামনেই রাস্তার ওপারে প্রকান্ড ঘড়ি, ভোর ৫ টার ঘন্টা পড়ে গেল। এতক্ষণে একটু শোবার ইচ্ছে হল। ২১

নিষ্ঠা ও একাগ্রতার খন্ডিত চিত্রগুলোর মধ্যেই তাঁর নির্মল অন্তরের নির্ভেজাল স্বরূপটির দেখা মেলে। সম্পদে-বিপদে তিনি বিচলিত নন। আনন্দে আঘাতে তিনি আন্দোলিত হলেও নিঃশেষিত নন। বরং আপন ঐশ্বর্যে সমুজ্জ্বল। সোভিয়েট দেশের অপ্রতুল সম্মান, আন্তরিক আবাহন, হৃদয়মিশ্রিত আতিথেয়তা, আপ্যায়ন, চোখ বাঁধানো সৌন্দর্য, প্রাচুর্য কোন কিছুই তাঁকে স্বদেশ প্রেমের ব্যাকুলতাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি।

এত মানুষের মুখ দেখে আর ওদের আদর আপ্যায়নে বড় ব্যস্ত থাকতে হয়, এ ব্যস্ততাও তো একটা সৌভাগ্য। ওরা বলে, লিট্‌ল সুইট লেডি, তুমি কবি, একটা কবিতা বল। বাংলায় বল, শুধু স্বরটা আমরা শুনব। কেউ বলে তুমি এখানে থেকে যাও, তুমি ছয়টি সন্তানের মা। এখানে পেনশন পাবে। কেউ বলে, একটা গান শোনাও।

মিসেস রঘু রামাইয়া হাসেন আর বলেন, আপনাকে ওরা খুব ভালোবেসে ফেলেছে। থেকে যান আপনি। মিসেস কাউর বল্লেন, রাশিয়ান ভাষা শিখতে আমি ত আছি, জলি আছে, জালাল আছে-আপনি থেকে যান, এরা আপনাকে পছন্দ করেছে। আমি হাসি। আর আমার মন বাংলাদেশ, পদ্মা-মেঘনা-বুড়ীগঙ্গার তীরে তীরে আকুলি-বিকুলি করে বেড়ায়। ২২

উন্নত সোভিয়েটের নিশ্চিত জীবন, মহান আদর্শ প্রভৃতিকে অভিনন্দন জানাবার পাশাপাশি লেখিকা প্রিয় পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষের জীবনে অনুরূপ শাস্তির প্রার্থনা রেখেছেন গ্রন্থের বহু জায়গায়। পৃথিবীর উন্নত দেশ সোভিয়েট ইউনিয়নের সাথে সাধের পাকিস্তানের যেখানেই তিনি ব্যতিক্রম দেখেছেন সেখানেই তাঁর লেখনি স্বদেশের লাঞ্ছিত মানবতার জন্য সমবেদনায় হাহাকার করে উঠেছে।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মায়েরা সকালে উঠে সন্তানকে কী খেতে দেবেন সে দুশ্চিন্তায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে দিন-মাস-বছর কাটাচ্ছেন। ওদিকে মস্কো নগরীর কো-অপারেটিভ সোসাইটি থেকে ছয় লক্ষ শিশু নাগরিক তাদের পড়াশোনা, হাওয়া বদল, খেলাধূলার সুযোগ লাভ করে আসছে। অন্য সব প্রদেশের কথাও চমকপ্রদ কম নয়। ২৩

তাঁর রচনাশৈলীতে আধ্যাত্মিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অনুভূতিপ্রখর মুহূর্তগুলোতে তিনি বিধাতাকেই বারবার স্মরণ করেছেন। ধর্মপ্রাণা বাঙালী হৃদয়ের খোদাভক্তি তাঁর গ্রন্থের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে।

এক সময় বারান্দায় শীতের মধ্যেও এসে দেখলাম ঈদুজ্জোহার চারদিনের চাঁদ মেঘশূণ্য গগণে হাসছে। এই চাঁদ আমি কত মাইল দূরে থেকে দেখছি, আমার আপনজনেরা দেশবাসীরা আমার দেশে হলেও এই চাঁদই দেখছে! ১১টা, ওখানে হয়ত এখন একটা কি দুইটা বাজে। আল্লাহর দুনিয়া কত বড়। মানুষের জন্যইত সৃষ্টি। সারা মন ভরে উঠল রসিক কবি মহান স্রষ্টার সৃষ্টিসুধারসে। ২৪

 

সোভিয়েটের দিনগুলি । সুফিয়া কামাল

 

নারী চিত্তের কোমল অনুভূতিগুলোর মায়াবী পরশ মেলে তাঁর রচনায়। রমণীসুলভ বৈশিষ্ট্যগুলো অপরিহার্য ভাবেই এসেছে কাহিনীতে। ফলে রচনাটি যে একজন নারীরই সৃষ্টি তা বুঝে নিতে কষ্ট হয়না পাঠকের। নারী হৃদয়ের ইমেজ গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি লাইনকেই স্পর্শ করেছে।

কী অদ্ভূত। বাঙলা দেশের একটি অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারের পর্দানশীন ঘরের মেয়ে আমি। আর একান্ত একা এই পৃথিবীর এক প্রান্তে অজানা ঘরের পরিবেশের একটি হোটেলের কামরায় আমি ২৫

আমার শাড়ী-দেশী সুতী শাড়ী দেখেই বোধ হয় বেশ ভীড় করে দু’য়ে দুইয়ে চারে পাঁচে আমাকে দেখে যেতে লাগলেন, কেউ কেউ বল্লেন ইন্ডিয়া ? ২৬

সোভিয়েটের দিনগুলি’-তে বঙ্গনারীর কোমল লালিত্যটুকুর পরিচয় যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে নারী মেজাজের অন্তর্গত নানা বৈশিষ্ট্য। পশ্চিম পাকিস্তানী ডেলিগেট মিসেস হাবিব রহিমতুল্লাহর নিষ্ক্রিয় অভিব্যক্তি তাঁর মনে যে একটা চাপা অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল তার মৃদু আভাস তিনি গ্রন্থের দু’এক জায়গায় না ছড়িয়ে পারেননি। যদিও এতে কোন স্বাভাবিকতার অভাব ছিলনা।

বেগম সাহেবা তিন দিন আগে এসেছেন; ভাবলাম আজ তিনি হয়ত কিছু বলবেন; কিন্তু কিছুই বললেন না তিনি। আমি ত দেরী করেই এসেছি, মনটাও অস্থির লাগল। সব দেশের মেয়েরা তাদের দেশের হয়ে কিছু না কিছু বলছে, আমাদের পাকিস্তানের পরিচয় অজ্ঞাত রেখে খেয়েদেয়েই বাড়ী রওয়ানা দিতে হবে নাকি ২৭

হেডফোন লাগিয়ে নানাদেশের নানা ভাষা শুনলাম। ইংরেজী থেকে কিছু কিছু নোটও করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু কতক্ষণ পরে মাথা কেমন গুলিয়ে উঠল শুনব, না দেখব, না নোট করব ? আশপাশে সাবারই দেখি সেই দশা। হাতের কলম থেমে গেছে সবারই। সবাই চেয়ে আছে মঞ্চের দিকে। পাশে দেখলাম বেগম সাহেবা নেই, কখন তিনি উঠে গেছেন খেয়াল হয়নি। কোথায় গেছেন তাও জানিনা। ২৮

সুফিয়া কামালের যে বৈশিষ্ট্যটি তার গ্রন্থে বিশেষভাবে ধরা পড়েছে সেটি তাঁর চরিত্রের মিষ্টি নিরঅহংকারটুকু। স্বভাবজাত কল্যাণবোধ, সারল্য, নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও সংবেদনশীলতা তাঁকে সম্ভ্রান্ত করে। তুলেছে সকলের কাছে। অক্ষমতা প্রকাশে তিনি যতটা পারঙ্গম যোগ্যতার প্রকাশে ঠিক তার উল্টো।

স্ব- প্রশংসায় তিনি প্রাইশই বিব্রত সবাই ফুলের মালায় আমাকে ঢেকে দিলেন, সবচেয়ে বিপদ ও দারুণ অবস্থা হল আমার যখন মিঃ গানকোভস্কি বললেনঃ বহু যুগ আগে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসছিলেন এদেশে, আর আজ এক কবিকে আমরা পেলাম। তখন আমার মাথা ঘুরে ঘামে সর্ব শরীর ভিজে উঠছিল অত শীতের মধ্যেও। কোথায় রবীন্দ্রনাথ। আর কোথায় আমি। তওবা! তওবা ও কথা ভাবা যায় নাকি ২৯

তিনি মূলত কবি। রচিত ভ্রমণকাহিনীর শুরুতেই তিনি তাঁর কবি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সমগ্র কবিতাটিতে সোভেয়েট বিপ্লবের মহান বিজয়, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, মানবতার জয়গান ও অর্জিত স্বাধীনতার গতিময় সমৃদ্ধিকে সুস্বাগত জানানো হয়েছে।

শতাব্দীর অর্ধপথ পাড়ি দিয়ে আসে

জাগ্রত যে জনগণ মুখর উল্লাসে

বিপুল বিস্ময় পৃথিবীর-

জয় জয় জয়গান কাস্তে হাতুড়ির।

জয় মানবতা। স্বাধিকার

যে জাগালো নব চেতনার

মহান লেনিন

তার জয়গানে ভরে দিন। ৩০

বেগম সুফিয়া কামালের সাহিত্যরীতি অনেকটাই ব্যবহারিক কথন প্রণালীর কাছাকাছি। গভীর অভিনিবেশের প্রয়াস সেখানে অনুপস্থিত। প্রায়শই বক্তব্যকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি তাঁর সাহিত্য পদ্ধতি। অর্থাৎ মেধা ও মননের সীমিত ব্যান্ডির সীমাদ্ধতাকে তিনি অতিক্রম করতে পারেননি বলেই তাঁর রচনা নিতান্ত সাধারণ। আল্লাহই জানেন। যে দিনের ভাত-পানি তিনি মস্কোতে রেখেছেন সেই দিনই ত আসব। তাই সান্ত্বনা। যাহোক একঘন্টা ধরে বাস চলে ক্রেমলিনে প্যালেস অব কংগ্রেস-এ এসে থামল। কোথায় বাক্স- পেটারা, কোথায় হাত মুখ ধোয়া। ঢুকে পড়লাম হলের মধ্যে। ৩১

তারপরও সুফিয়া কামালের রচনায় এমন একটি নিবিড় ভালোলাগার ইমেজ রয়েছে যার আবহ সৃষ্টির কৃতিত্ব তাঁর একান্ত আপনার। প্রকৃতির মত সহজ উৎসারিত তাঁর রচনাধারা। মস্কোতে নারী সম্মেলনে গিয়েছিলেন তিনি।

মূলত নারী প্রসঙ্গই বেশী আলোচিত হয়েছে ভ্রমণকাহিনীতে। তবু অন্যান্য দিকের আলোচনা ও নানা তথ্যের গুরুত্বও কম নয়। সবচেয়ে বড় কথা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এতবড় দেশের খুঁটিনাটি জানা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এরই মধ্যে যেটক তিনি পেরেছেন রাতদিন খেটে বলতে গেলে বিরতিহীন ভাবেই ঘুরে দেখেছেন, জেনে নেয়েছেন।

সমগ্র সোভিয়েটের উন্নত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষ; বিশেষ করে নারীর লক্ষ্যযোগ্য সম্মানজনক অবস্থানের ব্যাপকতা তাঁর নির্মাণ কৌশলে স্পষ্ট হয়েছে। সোভিয়েট দেশ ও জাতির বিরাট সাফল্যের মূল উৎস উদ্ঘাটনে তাঁর শ্রম সবচেয়ে বেশী সক্রিয় ছিল। গভীর ব্যাপ্তি ও মননশীলতার অভাব সত্ত্বেও তাঁর রচনা কথপকথনের ঢংএ এক আনন্দ উচ্ছল বর্ণনাধারায় সার্বজনীন হয়ে উঠেছে।

Leave a Comment