চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

 

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

 

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

ভ্রমণের নেশা মানুষের মজ্জাগত। আদিমকালে গোষ্ঠীগতভাবে যাযাবরবৃত্তি মানুষের জীবনের অংশ ছিল। তারপরে মানুষ ঘর বেঁধেছে। সমাজ গড়ে তুলেছে, কিন্তু তাঁর স্বভাবের অন্তর্গত যাযাবরবৃত্তি লোপ পায়নি। অজানাকে জানার জন্য ও বিচিত্র পৃথিবী দেখার আশায় সারা পৃথিবীতেই মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। “পুণ্য সঞ্চয়ের আকাঙ্খায় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিবর্গ পথের বিভীষিকা উপেক্ষা করে তীর্থস্থান দর্শন করেন।

সমাজে-সংসারে বীতস্পৃহ জনও অজানালোকের পথে অগ্রসর হন। আবার কেউবা নির্ভেজাল স্বাস্থ্যলাভের জন্যে কিংবা গুণীজনসান্নিধ্য প্রত্যাশায় ভ্রাম্যমান। ফলে পরিব্রাজকের সংখ্যা নগণ্য নয়। “১ মধ্যযুগের পৃথিবীখ্যাত কয়েকজন পর্যটক হলেন ইবনে বতুতা, মার্কোপোলো, লিভিংস্টোন, ভাস্কে-দা-গামা, মেগাস্থিনিস, আলবিরুনী, নিকিতিন, টমাস রো, দেলা ভালে প্রমুখ।

মধ্যযুগে বাংলাদেশ থেকে অনেকে ধর্মপ্রচার ও বিদ্যাচর্চার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করতে অতীশ দীপঙ্কর গিয়েছিলেন তিব্বতে। বহির্বিশ্ব থেকে বঙ্গদেশে এসেছেন অনেকে। নাম করা যেতে পারে ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং (চীন), ইবনে বতুতা (মরক্কো), মানরিক (পর্তুগাল), বার্ণিয়ের ও তাভার্ণিয়ের (ফ্রান্স), র্যালফ ফিচ (ইংল্যান্ড) প্রমুখ নামকরা পর্যটকদের। তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে সেকালের বাংলার জনজীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিবরণ পাওয়া যায়। মধ্যযুগে বাংলার ইতিহাস রচনা করার জন্য সেসব বিবরণ খুবই উপকারী। ২

 

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

 

সেকালে দেশের ভেতরেও অনেকে ভ্রমণ করতেন প্রধানত ধর্মীয় কারণে। চৈতন্যদেবের দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিজয়রাম সেনের “তীর্থমঙ্গল” একটি উল্লেখযোগ্য কাব্য। কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষাল নামক একজন ধনাঢ্য কাশীযাত্রীর সঙ্গে কবি কাশী গিয়েছিলেন। আসা-যাওয়ার পথে তাঁরা যেসব বিখ্যাত স্থান দর্শন করেছিলেন, সেগুলির বিবরণ নিয়ে রচিত হয়েছে কাব্যটি। ৩

উনিশ শতকে বাঙালীদের যোগাযোগ ছিল মূলত ইউরোপ তথা ইংল্যান্ডের সঙ্গে। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর বিলেতে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। রাজা রামমোহন ১৮৩১ সালে বিলেত গিয়েছিলেন এবং ১৮৩৩ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ফ্রান্সে। সেই শতকে আরো গিয়েছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত (১৮৪৮-১৯০৯), শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৯), বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২), গিরিশচন্দ্র বসু (১৮৫৩- ১৯৩৯) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। তাঁদের সবাই ভ্রমণ কাহিনী লিখে গেছেন।

বিশ শতকে ভ্রমণের পরিধি ও ভ্রমণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ইউরোপ ব্যতীত এশিয়া-আমেরিকা অনেক ভ্রমণ করেছেন। একজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনি সিলেটের রামনাথ বিশ্বাস (জ. ১৮৮৫)। এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকা এই তিন মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন তিনি। রচনাও করেছেন কয়েকটি ভ্রমণ কাহিনী।

এভাবে ঊনিশ-বিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণসাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ শাখা গড়ে উঠে। সব লেখার আকৃতি-প্রকৃতি এক ছিলনা। “কেউ লিখেছেন দিনপঞ্জীর আকারে, কেউবা পত্রের মাধ্যমে কিংবা স্মৃতিচারণায় ব্যক্ত করেছেন পর্যটক তথা প্রবাসজীবনের কাহিনী। অনেকে শুধু তথ্য পরিবেশনেই তৃপ্ত, আবার কারো তথ্য শুধুমাত্র পরিবেশন ও প্রকাশভঙ্গীর গুণে সাহিত্যরসমন্ডিত কাহিনী হয়ে উঠেছে। ৪

 

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

 

দুই

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়ে পূর্ববাংলায় বেশ কটি ভ্রমণ কাহিনী রচিত হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ববাংলায় দ্রুত একটি মধ্যবিত্তশ্রেণী গড়ে উঠতে থাকে। তাঁদের অনেকে বিদেশে গিয়েছেন- দেশে ফেরার পর কেউ-কেউ তা নিয়ে সাহিত্যও রচনা করেছেন। অধিকাংশই গিয়েছিলেন ইউরোপ- আমেরিকা ও মুসলিম দেশসমূহে অল্প ক’জন গিয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন। শেষোক্তরা নিজেদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে যা রচনা করেছেন, সেগুলিই বর্তমান গবেষণার বিষয়।

সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীন সফর অবলম্বন করে রচিত ভ্রমণ কাহিনীগুলি নিয়ে গবেষণা করার একটি বিশেষ কারণ আছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা মানব সভ্যতার বিকাশের স্তরকে যে ভাবে নির্দেশ করেন, তাতে সর্বশেষ পর্যায়ে রয়েছে সাম্যবাদী সমাজ। তারই প্রারূপ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় ও ১৯৪৯ সালে চীনে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী শক্তিসমূহ তীব্র শ্ৰেণীসংগ্রামের পর দুই দেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে যত্নবান হয়। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে মানবসভ্যতার জন্য এটি ছিল এক মহান পরীক্ষা। সারা পৃথিবী অপার কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিল রাশিয়া ও চীনের প্রতি।

অপরদিকে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ সমাজতন্ত্রের অভ্যুদয়ে বিচলিত হয়ে সর্বপ্রকারে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধাচরণে প্রবৃত্ত হয়। অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমন, অপপ্রচার সবই পরিচালিত হয়েছিল পুঁজিবাদী শক্তির দ্বারা। সেই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া ও চীন তাদের অর্জনসমূহ বিশ্ববাসীকে দেখাতে আগ্রহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই পটভূমিতে ১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণে গিয়েছিলেন।

 

চীন ও রাশিয়া ভ্রমণ অবলম্বনে রচিত বাংলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা

 

তৎকালীন পূর্ববাংলায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী বিপুল সংখ্যায় বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীরা ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিরোধী এবং পাশ্চাত্যের সঙ্গে জোটবদ্ধ। পঞ্চাশের দশকে পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবীরা যাবার সুযোগ পেতেন প্রধানত বিলাত-আমেরিকা ও মুসলিম বিশ্বে। ১৯৫৭ সালে মাত্র একজন রাশিয়া গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ষাটের দশকে অবস্থার পরিবর্তন হয়।

পাকিস্তান সরকার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারসাম্য রাখার জন্য সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করে। পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন আসে। সরকারী পর্যায়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ঐ দুই দেশের সফর বিনিময় হয়। লেখক-শিল্পী- সংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা দুই দেশ ভ্রমণ করেন।

দেশে প্রত্যাবর্তন করে তাঁরা আবেগমথিত ভাষায় নিজেদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। এগুলি নতুন জগত দেখার বিস্ময়বিমুগ্ধ আলেখ্য ; গতানুগতিক অর্থের ভ্রমণ কাহিনী নয়। সেজন্য এগুলিকে নির্বাচন করা হয়েছে গবেষণার জন্য। ভ্রমণকারীদের চোখে রাশিয়া ও চীনের কোন দিকগুলি বেশি ধরা পড়েছে, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে এই গবেষণায় ।

এ ধরনের ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে দশটিঃ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহহাব বশিকপুরীর ‘দেখে এলাম রাশিয়া (১৯৬১), রোকাইয়া জাফরীর ‘লেনিনের দেশে লালনের মেয়ে (১৯৬৬), শহীদুল্লাহ কায়সারের পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ’ (১৯৬৬), সুফিয়া কামালের ‘সোভিয়েটের দিনগুলি’ (১৯৬৮), জসীম উদ্দীনের ‘যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮), আবুল কালাম শামসুদ্দীনের ‘নতুন চীন নতুন দেশ’ (১৯৬৫), আবদুল আহাদের ‘গণচীনে চব্বিশ দিন’ (১৩৭৩), ইব্রাহীম খাঁর ‘নয়াচীনে এক চক্কর’ (১৯৬৭), আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ‘মাও সে- তুঙ এর দেশে’ (১৯৬৮), মুহম্মদ আবদুল খালেক-এর ‘পদ্মা থেকে ইয়াংসি’ (১৯৬৯)।

গবেষণাপত্রে চারটি অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে রাশিয়া ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে পাঁচটি বই এর কালানুক্রমিক আলোচনা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে চীন ভ্রমণ কাহিনী নিয়ে পাঁচটি বই এর কালানুক্রমিক আলোচনা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে একই বিষয় নিয়ে পশ্চিম বাংলায় রচিত তিনটি ভ্রমণ কাহিনীর সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা হয়েছে। লেখকেরা হলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (রাশিয়ার চিঠি), প্রবোধকুমার সান্যাল (রাশিয়ার ডায়েরী) এবং মনোজ বসু (চীন দেখে এলাম)। চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে উপসংহার।

Leave a Comment